ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২১:১৯:০২

অ্যাকর্ডের সিদ্ধান্তে নাখোশ বাংলাদেশ

রিজাউল করিম

প্রকাশিত : ০৭:৩৩ পিএম, ৩ আগস্ট ২০১৭ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৭:১৬ পিএম, ৫ আগস্ট ২০১৭ শনিবার

দেশের তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কর্মরত ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড নির্ধারিত সময়ের পর আরও তিন বছর বাংলাদেশে তাদের কার্যোক্রম পরিচালনা করতে চাইছে। বাংলাদেশে পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিষয়ে তাদের পর্যকবেক্ষণ ও তদারকি ২০২১ সাল পর্যিন্ত চালিয়ে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যাকর্ড। সংস্থাটি সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছে। সরকার, গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠনসহ অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে শিগগিরই তারা এ নিয়ে আলোচনায় বসতে চায়। এর পরপরই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে অ্যাকর্ড। কিন্তু অ্যাকর্ডের এ সিদ্ধান্তে নাখোশ দেশের পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট তিন পক্ষ।

সরকারের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তকে অপ্রত্যাশিত বলা হয়েছে। মালিকরা বলছেন অহেতুক আর শ্রমিক নেতারা অতিরিক্ত খবরদারি হিসেবেই দেখছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাকর্ডকে সময় বৃদ্ধির নামে খবরদারি জোরদার করার সুযোগ না দিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ কমিটি করা যেতে পারে। যেই কমিটিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি, পরিবেশবিদ, এক্সপার্ট, গার্মেন্ট মালিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও শ্রমিক প্রতিনিধি থাকবেন। তারা কারখানাগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের তাগিদ দিতে পারে।


প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অ্যাকর্ড গঠিত হয়। ২২০টির বেশি ইউরোপীয় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং দুটি বৈশ্বিক ইউনিয়ন অ্যাকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আছে। পাঁচ বছরের জন্য অ্যাকর্ড গঠিত হয়। সেই হিসাবে আগামী বছরের মে মাসে সংস্থাটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা। তবে কারখানার সংস্কারকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় অ্যাকর্ড তাদের সময়সীমা ২০২১ সাল পর্যকন্ত বাড়ানোর চেষ্টা করছে।


এই ইস্যুতে এরইমধ্যে চার দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠকে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে অনুরোধ করা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাটসহ  ওইসব দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তটি (মেয়াদ বৃদ্ধি) নেয়ার আগে অ্যাকর্ডের উচিত ছিল বাংলাদেশ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আগে আলাপ করে নেওয়া। সিদ্ধান্তটি প্রত্যাশিত নয় বলে বৈঠকে রাষ্ট্রদূতদের জানিয়ে দিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অ্যাকর্ড প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।


অ্যাকর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিক সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, অ্যাকর্ড ২০১৩ সালে ৫ বছরের জন্য অগ্নি নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার, কারখানার কর্মপরিবেশ এসব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। তাদের হাতে এখনও এক বছর আছে। বিগত চারটি বছর তারা আমাদের কারখানাগুলো পরিদর্শন করেছে। এতে কি অর্জিত হয়েছে? তাদের পরিদর্শিত কারখানাগুলোতেও অগ্নিকান্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে তারা কি পরিদর্শন করছে? এটা পরিদর্শন নাকি খবরদারি? এছাড়া তাদের খবরদারিতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বহু শ্রমিক বেকার হয়েছেন। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পর্যবেক্ষণের দরকার হলে দেশের সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী তদারক কমিটি বা সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। অ্যাকর্ড কথায় কথায় সম্পর্ক ছিন্ন করবে আর আমাদের পণ্যের কম মূল্য দিবে তা হতে পারে না। পণ্যের মূল্য না বাড়িয়ে তাদের এ খবরদারি অহেতুক।


সরকার ও  মালিক পক্ষের সঙ্গে একই মত পোষণ করছেন শ্রমিক নেতারা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক জুল হাসনান নাইন বাবু বলেন, অ্যাকর্ডের খবরদারিতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। অনেক শ্রমিকও বেকার হয়েছেন। তাদের পরিদর্শিত কারখানা সার্টিফাই হওয়ার পরও দুর্ঘটনা ঘটেছে। তা হলে লাভ কি হল? লাভের লাভ অ্যাকর্ডের খবরদারি। আমার দেশের মালিক পক্ষের হয়রানি আর শ্রমিকদের বেকারত্ব। তাই আমি মনে করি, অ্যাকর্ডের তদারকির আর দরকার নেই। বরং দেশের সরকার, মালিক, শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদারকি সেল বা সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। যারা কারখানাগুলো পরিদর্শন করে কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেবে।  


তবে এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম সভাপতি মোশরেফা মিশু কিছুটা ভিন্ন মত পোষন করেন। তিনি একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, আমরা চাই বা না চাই তারা আমাদের ওপর খবরদারি চলবেই। কারখানা পরিদর্শনের পর অ্যাকর্ড যেসব নির্দেশনা দিয়েছিল সেগুলোর প্রায়ই এখনও অসমাপ্ত রয়েছে। বাকি এক বছরে সেগুলো পূরণ করা কঠিন হয়ে যাবে। অ্যাকর্ডের পর্য বেক্ষণ ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের সময় দেওয়া যেতে পারে।


এদিকে অ্যাকর্ডের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের তালিকাভূক্ত ১ হাজার ৫৩৪টি তৈরি পোশাক কারখানার অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও ভবনের কাঠামোগত ত্রুটির ৭৭ শতাংশ সংস্কারকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। চার শতাধিক কারখানার ৯০ শতাংশ ত্রুটি সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া সব ত্রুটি সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করেছে ৬৫টি পোশাক কারখানায়। এছাড়া সব ধরনের সংস্কারকাজ শেষ করার সাফল্য অর্জন করেছে সাতটি কারখানা।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েজ বলেন, কয়েক মাস ধরেই অ্যাকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ব্র্যান্ড ও গ্লোবাল ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের অনেক বৈঠক হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে (সময় বৃদ্ধি) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য আমিরুল হক আমিন বলেন, অ্যাকর্ডের অধীনে থাকা কারখানাগুলো অনেক সংস্কারকাজ শেষ করেছে। আরও কাজ বাকি আছে। তাই সময় লাগবে। আমি মনে করি না, অ্যাকর্ডের কারণে পোশাকশিল্পের কোনো ক্ষতি হবে। বরং কর্মপরিবেশের উন্নতি হবে, বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ও আস্থা আরও বাড়বে। তাই সময় বাড়ালে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য ইতিবাচকই হবে।
//এআর

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি