ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০:১৮:৩০

‘আইটিতে বিনিয়োগের অভাবে পূরণ হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৫:৪৩ পিএম, ৯ নভেম্বর ২০১৭ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৫:৩০ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০১৭ সোমবার

দেশে আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার তৈরি হলেও কেবল ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে লোকবল সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান দখল করতে পারছে না বাংলাদেশ। এমনকি দেশীয় বাজারেও জায়গা করতে পারছে না একবিংশ শতাব্দীর সম্ভাবনাময় এ সেক্টরটি।

এ সুযোগ লুফে নিচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশ থেকে বাগিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, এমন অভিযোগ আইটি উদ্যোক্তাদের।

সম্প্রতি আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার নির্মাণ, প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থা, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ও তার বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে  ইটিভি অনলাইনের সাথে কথা বলেছেন দেশের স্বনামধন্য আইটি ফার্ম ইউওয়াই সিস্টেম কোম্পানি লিমিটেড (UY System Company Limited) এর কর্ণধার ফারহানা এ রহমান। তিনি আইটি উদ্যোক্তাদের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বেসিসের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন এর প্রতিবেদক মোহাম্মদ জুয়েল ও কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক।

এখানে তার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হল-

ইটিভি অনলাইন : আমাদের দেশে আইটি খাতের সুযোগ-সুবিধা কেমন? তরুণরা এ সুযোগটা কেমন কাজে লাগাতে পারছে?  

ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশে আইটি খাত এখন অনেক দূর এগিয়েছে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও মানুষ জানতো না, প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই উপার্জন করা যায়। দেশে এবং দেশের বাইরে এ সেক্টরে কাজের সুযোগ বেড়েছে। এমনকি কেউ চাকরি করতে না চাইলেও, ইচ্ছে থাকলে উদ্যোক্তা হতে পারেন। আমাদের দেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে এখন অনেকেই বিদেশে বড় বড় ফার্মে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার আইটি ফার্ম রয়েছে, যারা সফটওয়্যার তৈরি, ওয়েব ডিজাইন, ই-কমার্সের কাজ করে বছরে কোটি ডলার আয় করার সামর্থ্য রাখে। এছাড়া সরকারের সব মন্ত্রণালয় এখন অটোমেটেড হচ্ছে। কাগজ-কলম ছেড়ে অটোমেশনের দিকে যাচ্ছে।

ইটিভি অনলাইন : আইটি খাতে এত সুযোগ থাকার পরও আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারছি না কেন?

ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশে একজন সিইওকেই (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) সব কাজ করতে হয়। ক্রেতা নিয়ে আসা, গুণগত পণ্য নিশ্চিত করা, বিদেশে বাজার তৈরি করা, কর্মী পরিচালনা করা-সবকিছু একজনকেই করতে হয়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন সিইউকে এসব কাজ করতে হয় না। এদের ডিজিটাল মার্কেটিং অনেক শক্তিশালী। যার যার কাজ প্রত্যেকেই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেন তারা। অথচ আমাদের দেশে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। যারা তৈরি হচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ বিদেশে চলে যাচ্ছেন, না হয় উদ্যোক্তা হচ্ছেন। তবে আমি মনে করি এ খাতে আমাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়া ।

এ খাতে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো আইটি উদ্যোক্তাদের কোনো ধরণের সহযোগিতা করে না। এ বিষয়ে দেশে কোনো নীতিমালা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে না। অথচ গার্মেন্টস, ফার্মিং-এ খাতগুলোতে ব্যাংকগুলো সহজেই বিনিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে হলে অবশ্যই ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

ইটিভি অনলাইন : আপনাদের মতো আইটি উদ্যোক্তারা তাঁদের যোগ্যতা দেখিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বড় বড় কাজ নিয়ে আসছেন। বিপরীতে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরের ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ফারহানা এ রহমান : আমাদের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে সফটওয়্যার আমদানি করছে। কখনো কখনো বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে এসে সফটওয়্যার তৈরি করছে। এতে প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক ভোক্তা হয়ে পড়েছি। প্রডিউসার হতে হলে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উপর। দেশের আইটি খাতে দক্ষ জনবল যত বাড়বে, আমাদের উৎপাদন ক্ষমতাও তত বাড়বে। একই সাথে বিশ্ব দরবারে দেশীয় পণ্যের গুণাগুণ তুলে ধরতে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন।

অন্যদিকে দেশীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। স্বজাত্যবোধ তৈরি হতে হবে। দেশীয় পণ্যের উপর শতভাগ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। বিদেশি পণ্যই সেরা এই বোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবেই দেশের আইটি খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে। একই সাথে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোর বিদেশমুখী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে সফটওয়্যার তৈরির একটি চুক্তি করলেও সেটি আলোর মুখ দেখছে না। তাই দেশি উদ্যোক্তাদের এ ধরণের সুযোগ দেওয়া হলে, এ খাতে আরো বেশি প্রাণ সঞ্চার হবে।

ইটিভি অনলাইন : দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারের কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ফারহানা এ রহমান : দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সবাইকে গতানুগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের একটা অংশকে অবশ্যই কর্মমূখী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। সরকার সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই জনশক্তি বাড়বে।

ইটিভি অনলাইন : আইটি খাত সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে সরকারের কাছে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি কি আশা করেন?

ফারহানা এ রহমান : দেখুন, এদেশে আইটি খাত যতটুকু বিকাশ ঘটেছে, তার মূলে রয়েছে প্রাইভেট সেক্টর। বাজারে প্রতিনিয়তই আইটি খাতে নতুনত্ব আসছে। তার সঙ্গে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের অভাবে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। তার কারণ আমাদের সেক্টরকে অন্যান্য সেক্টরের মতো ভ্যালুয়েশান করা হচ্ছে না। যার কারণে ব্যাংকগুলো আমাদেরকে লোন দিতে চায় না। আইটি খাতের উন্নয়নে সরকারের প্রথম যে কাজটা করতে হবে, তাহলো কিভাবে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় সে বিষয়গুলো সরকারকে আরো আন্তরিকভাবে ভাবতে হবে। যাতে আমাদের মতো উদ্যোক্তারা যোগ্যতা থাকা সত্বেও শুধু বিনিয়োগের অভাবে হারিয়ে না যায়।

ইটিভি অনলাইন : ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

ফারহানা এ রহমান : ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান আসার পর সবাই এখাতে ঝাপিয়ে পড়ছে। শুধু ঝাপিয়ে পড়লেই হবে না, আমাদের ফোকাস থাকতে হবে, গোল থাকতে হবে, টার্গেট থাকতে হবে। সেটা অর্জন করার জন্য যদি কৌশল পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে তাও করতে হবে। কিন্তু টার্গেট পরিবর্তন করা যাবে না। এ লক্ষ্যে আমাদের জনবলকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা পেশাগতভাবে দক্ষ নন। কোনো কাজকেই ছোট করে দেখা যাবে না, তবেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।

ইটিভি অনলাইন : সম্প্রতি দেখা গেছে, তরুণরা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে? এই ইন্টারনেটকেই কাজে লাগিয়ে কিভাবে আয় করা সম্ভব?

ফারহান এ রহমান : ব্রডব্যান্ডের তুলনায় মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বেশি হওয়ায় এ সমস্যাটা হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মোবাইলে ফেসবুকিং, ইউটিউবিং আর গেমস নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। যত দ্রুত ব্রডব্যান্ড প্রসারিত হবে ততদ্রুত ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে ছেলে-মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হবে। তবে আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জে এখনো ইন্টারনেট সেবা পৌঁছোয়নি। এ সেবা পৌঁছালে প্রান্তিক পর্যায়েও শিক্ষার্থীরা আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

ইটিভি অনলাইন : আইটি খাতে আসতে চায়, এমন শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি? আন্তর্জাতিক মানের কর্মী হয়ে উঠতে হলে তাদের কোন দিকটির প্রতি নজর দিতে হবে?

ফারহানা এ রহমান : আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখে। কিন্তু ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে আইটি সেক্টরে ভালো করা সম্ভব নয়। তাকে যে কোনো একটি বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে এবং ঐ বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে। যেমন কেউ ওয়েব ডিজাইনিং করলে, তাকে অবশ্যই ওয়েব ডিজাইনিংয়ের খুঁটিনাটি সবই জানতে হবে। কেউ গ্রাফিক্স ডিজাইনিং করলে তাকে অবশ্যই গ্রাফিক্স ডিজাইনের সব বিষয়ে জানতে হবে। আমি সব পারি এই ধারণা থেকে তরুণদের বেরিয়ে আসতে হবে। একটা কাজ আমি ১০০ ভাগ পারি, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

ইটিভি অনলাইন : আইটি বিষয়ে পড়ালেখা না করেও কি কেউ এখানে কাজের সুযোগ পেতে পারে?

ফারহানা এ রহমান : আইটি বিষয়ে পড়ালেখা না করেও নিঃসন্দেহে এখানে ভালো করার সুযোগ আছে, তার উদাহরণ আমি নিজেই। তবে তার আগে তাকে ট্রেনিং নিতে হবে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার অনেকগুলো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে।

পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা আইটি বিষয়ে ট্রেনিং দিচ্ছে। এসব ট্রেনিং গ্রহণ করে যে কোনো শিক্ষার্থী এখানে কাজের সুযোগ পেতে পারেন। কারা আপনার এখানে কাজ করছে এমন আরেকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিপ্লোমা পাশ কিংবা আইডিবি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ছেলে-মেয়েরা এখানে বেশি আসছে। এছাড়া কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীরাতো আসছেই।

নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এমন অনেক কর্মী আছেন যারা দুই থেকে তিন বছর এখানে চাকরি করে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। তবে তার আগে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে।

ইটিভি অনলাইন : আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

ফারহানা এ রহমান : ইটিভিকেও ধন্যবাদ। ইটিভি পরিবারের প্রতি শুভকামনা রইলো।

 

 

 


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি