ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ৪:৪৭:৪২

Ekushey Television Ltd.

চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ দাবি

আছিয়ার চোখে শুধুই হতাশা!

রিজাউল করিম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:২৩ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০৯:২৭ পিএম, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বৃহস্পতিবার

মোছাম্মাৎ আছিয়া খাতুন। বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলায়। মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অনেক কষ্টে পড়াশুনা শেষ করেছেন মা-বাবা হারানো মেয়েটি। স্বপ্ন ছিলো পড়াশুনা শেষে ভালো একটি সরকারি চাকরি করার। চাকরি করে নিজের কষ্টের জীবনের সমাপ্তি ঘটানো। কিন্তু বিধি বাম। শিক্ষাজীবন শেষে কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেননি।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষ করতেই পেরিয়ে গেছে জীবনের ২৭টি বছর। এরপর  চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে চোখের পলকে যেন কেটে গেছে তার ৩টি বছর। এখন তার বয়স ৩০ পেরিয়ে গেছে। আপনজন হারা স্নেহের কাঙ্গাল মেয়েটি তাই এখন ঘুমাতে পারে না। একটি প্রশ্নই তার জীবনকে কুরে কুরে খায়, এতো লেখা-পড়া করে কী হলো তার জীবনে!

রাতের আধারে, একাকিত্বে তার দুচোখে এখন শুধুই হতাশা। তার সারা জীবনের কষ্ট; কষ্টই রয়ে গেল। ছোট বেলা থেকে না পেল মা-বাবার ভালোবাসা। বড় হয়ে না পেল চাকরি। আবার বয়স ৩১শে পৌঁছালেও না পেল বিবাহ বা সংসার নামক সামাজিক সুখ।

আছিয়া ভেবেছিলেন, ভালো একটি সরকারি চাকরি হলে হয়তো তার জীবনের মোড়টা ঘুরে যাবে। বিবাহের মাধ্যমে ভালো কোন পরিবারের সদস্য হতে পারবেন। সেখানে মা-বাবাসহ আপনজনদের ভালোবাসা পাবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স মাত্র ৩০ বছর হওয়ার কারণে এখন আর তিনি সরকারি চাকরির কোনো আবেদন করতে পারছেন না। তাই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন আছিয়া। দিন যাচ্ছে তার প্রেসক্লাবের সামনে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ করার দাবিরি আমরণ অনশনে।

আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে চাকরির বয়স ৩৫ করার দাবিতে চলমান অনশনে দেখা যায় তাকে। একুশে টেলিভিশন  প্রতিবেদককে দেখা মাত্রাই চোখে পানি গড়িয়ে আসে তার। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অনশন স্থলে স্বপ্নহীন চোখে, কান্নাজড়িত  কণ্ঠে তিনি এসব কথা বলতে থাকেন।

কোন দম নেওয়া ছাড়াই কাদো কাদো কণ্ঠে, ভেজা ভেজা চোখে তিনি বলেন, ভাই আমাদের পক্ষে একটু লেখেন। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন। আমাদের দাবি যৌক্তিক। আমি আর পারছি না। ছোট বেলায় বাপ-মা হারিয়েছি। শত কষ্টেও লেখা-পড়া বন্ধ করিনি। লেখা-পড়ায় অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে ৮ বছর লেগেছে। জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষাণা হওয়ার পর প্রথম ব্যাচের ছাত্রী ছিলাম আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচ হওয়ার কারণে আমাদের সময় লেগেছে অনেক বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্রী হয়েও এখন চোখে  শর্ষে ফুল দেখছি। ছাত্রী জীবনে টিউশনি করেছি। এখনও করছি। এভাবেই কী সারাটা জীবন আমার পার হবে? অনেক কষ্ট আর হতাশা থেকেই এখানে এসেছি আমি। এখন আমি রাতদিন লেখা-পড়া করছি শাহবাগের গণগ্রন্থগারে। কিন্তু আমার বয়স তো ৩০ পেরিয়ে গেছে। লেখা-পড়া যতই করি সরকারি চাকরিতে তো আর আবেদন করতে পারছি না। সরকারের কাছে মিনতি করছি আমাদের এ যৌক্তিক দাবি মেনে নিতে।  এ দাবি মেনে নিয়ে আমার মতো হাজারো চাকরি প্রত্যাশির চোখে আশার আলো আবারও জেগে উঠবে। তারা তাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাবে।

একইভাবে অনশনে অংশ নিয়েছিলেন বরিশালের আগইঝড়া রাজিহার গ্রামের সঞ্জয় কুমার দাস। সরকারি তিতুমির কলেজ থেকে লেখা-পড়া শেষ করা এ ছাত্র বলেন, আমার বয়স এখন ৩৩ বছর। বাড়ীতে আমার ৩ বোন ও দুই ভাই আছে। দেশের সর্বোচ্চ লেখা-পড়া করেও আমি এখনও পরিবারের বোঝা। আমার পরিবারের সবাই শিক্ষিত। কিন্তু কেহ চাকরি পায়নি। আমি নিজে ১২টি ভাইভা দিয়েছি। বিধিবাম এখনও কোন চাকরির সুখবর পায়নি। বয়স অতিক্রম হওয়ায় এখন চোখে ঝাপসা দেখছি। সরকার যদি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করতো তবে আমার মতো অনেকে হতাশা থেকে মুক্ত হতো।

অনশন স্থলে কথা হয় জামালপুরের ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে এমফিল অধ্যায়নরত তিনি। ৩৩ বছর বয়সী এ যুবক বলেন, আমরা ৫ ভাই ৪ বোন। আমার এক ভাই চাকরি করেন। আমি এখনও চাকরি পায়নি। তাই আশায় বুক বেধে আছি সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিলে আমাদের কোন হতাশা থাকবে না। কারণ আমরা কোনো অযোগ্য ছেলে না। যোগ্যতা আমাদেরও আছে। চোখের পলকে বয়স চলে  গেছে। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ালে আমরাও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চাকরিতে ঢুকবো।

এদিকে অনশন স্থলে অন্যান্য সদস্যরা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা বাড়ার যুক্তিতে সরকারি চাকরিতে অবসরের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। শিক্ষিত বেকার তরুণদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা ‘যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত’।

তারা বলেন, বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ছয় বছর বয়সে শিক্ষাজীবনের শুরু হয়। স্নাতক শেষ করতে ২৩ বছর লাগে। এ ছাড়া নন-পিএসসির ক্ষেত্রে চাকরিতে আবেদন শুরুর বয়স রাখা হয়েছে ১৮ বছর, যা একটি অকার্যকর আইন। ক্যাডারের ক্ষেত্রে ২১ বছর বয়সে আবেদনের আইনটিও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এ কারণে চাকরিতে আবেদনের আইনটি সংশোধন করলে বর্তমানে স্নাতক শেষে চাকরিতে আবেদনের বয়স স্বাভাবিকভাবেই তা ৩৫ বছর হয়।

সমাবেশে বলা হয়, দেশের মানুষের গড় আয়ু যখন ৪৫ বছর ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর, আয়ু বেড়ে ৫০ হলে তা ৩০ বছর করা হয়। এখন আয়ু বেড়ে ৭১ হওয়ার পরও চাকরিতে প্রবেশের বয়স কোনোভাবেই ৩০ বছর থাকতে পারে না। এ বয়স অন্তত ৩৫ হওয়া উচিত।

আরকে/টিকে



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি