ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ২:৩৮:৫৯

আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশিত : ১২:২৮ পিএম, ১ অক্টোবর ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ১০:৪৩ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০১৭ শুক্রবার

আশুরা মানে হচ্ছে দশ। আশুরা শব্দটি যেহেতু মহররম মাসের জন্যই ব্যবহৃত হয় তাই ১০ই মহররমকে আশুরা দিবস বলা হয়। আশুরা তথা ১০ই মহররম-এর কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক দিবস। শুধু ঐতিহাসিক বললেই যথেষ্ট হবে না; বরং ইসলামের ইতিহাসে যতগুলো ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস আছে তার মধ্যে আশুরা হচ্ছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী এবং অতি স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস।


আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে দেখব এই ঐতিহাসিক ১০ই মহররম বিভিন্ন কারণে স্মরণীয়। এ তারিখে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বড় ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে দশটি ঘটনা খুবই প্রণিধানযোগ্য। এ দশটি ঘটনার মধ্যে দু’চারটির উদ্ধৃতি এভাবে দেয়া যায়। যেমন এ তারিখে হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল। এ তারিখে হযরত ইউনুস (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা মাছের পেট থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ দিনেই হযরত আইয়ুব (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা কুষ্ঠ রোগ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। এদিনে হযরত নূহ (আ.) আল্লাহ পাকের নির্দেশে মহাপ্লাবন নামক গজব থেকে বাঁচার জন্য কিশ্তিতে আরোহণ করেছিলেন। এই দিনেই হযরত ইবরাহীম (আ.) নমরূদের আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এমনিভাবে খুবই উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দশটি ঘটনা এদিন ঘটেছিল বলেই এ দিবসটির নামকরণ আশুরা করা হয়েছে। কিন্তু যে কারণে উম্মতে মুহাম্মদীর নিকট এ দিনটা আরও স্মরণীয় ও গুরুত্বের দাবী রাখে, তা হলো কারবালার সে মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক করুণ ঘটনা বা কাহিনী।

সে ঘটনার কথা বলতে গেলে কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে, লিখতে গেলে কলম পর্যন্ত থমকে দাঁড়ায়। আর সে ঘটনার শিকার হয়েছিলেন দুনিয়ার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল আল্লাহর হাবীব স্বয়ং জনাব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্র, কলিজার টুকরা। নামাজের সিজদা দিতে গেলে নানাজীর কাঁধ বা পিঠ মোবারকে সওয়ার হয়ে চড়ে বসতেন এবং সেই হযরত আলী ও মা ফাতেমার আদরের দুলালী হযরত হোসাইন (রা.)। এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সীমিত কলেবরের বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। কেবল সেদিন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পুরো পরিবারের লোকজনকে একত্রিত করে পরামর্শের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন সেটুকু পাঠকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি।


হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁবুতে ফিরে এসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন। এ ছিল এক অদ্ভূত বৈঠক। এর এজেন্ডা মাত্র একটি- অর্থাৎ বাঁচতে চাই নাকি মরতে চাই। পরিবারের সবার কাছে প্রস্তাব রাখলেন- তোমরা কি ইয়াজিদকে খলীফা বলে স্বীকার করতে চাও, নাকি চাও না? যদি চাও তবে তার দুটো পরিণতি আছে আর যদি স্বীকার না কর তারও দুটো পরিণতি আছে। যদি তাকে স্বীকৃতি দাও তাহলে- ১. আমরা সবাই বেঁচে যাব এবং ২. ইসলামের মধ্যে এমন এক মারাত্মক অন্যায় বা বিদায়াত ঢুকে যাবে যা কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামকে কলুষিত করে রাখবে। ইসলামে রাজতন্ত্র বৈধ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী যুগের লোকেরা বুঝতেই পারবে না আল্লাহর রাসূল কোন ইসলাম রেখে গেছেন।


আর যদি ইয়াজিদের খেলাফতের স্বীকৃতি না দাও তাহলে তার পরিণতিও হবে দুটি। ১. ইসলাম চির কলংকমুক্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারবে এবং ২. আমরা একজনও বেঁচে থাকতে পারব না। এখন বল তোমরা কি করবে? যদি বাঁচার সিদ্ধান্ত কর তাহলে ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি মরার সিদ্ধান্ত নাও তাহলে ইসলাম তার স্বস্থানে স্বমহিমায় টিকে থাকবে। এখন ভেবে দেখ জীবনকে কুরবানী করে ইসলাম বা দীনকে টিকাবে না-কি ইসলামকে কুরবানী করে জীবনকে রক্ষা করবে?


সবার কাছ থেকে জবাব এল যেহেতু ইসলামের জন্যই জীবন তাই ইসলামের জন্যই জীবনকে বিসর্জন দিতে চাই। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের লোকজন দেখলেন যে, এ মুহূর্তে জান বাঁচানো ফরয নয়; বরং জান বা জীবন দান করাই ফরয হয়ে পড়েছে। তাই তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, আমরা ইসলাম রক্ষার জন্য মরতে চাই।


দশই মহররম অর্থাৎ আশুরার এই রাতে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তা ছিল এক অভিনব সিদ্ধান্ত যার কোনো উদাহরণ ইতোপূর্বেও কোন দিন সৃষ্টি হয়নি, পরেও কোন দিন হবে না। এরপর ইমাম হুসাইন (রা.)সহ তাঁর পরিবারের লোকজনকে কিভাবে শহীদ করা হলো সে করুণ ইতিহাস সবারই কমবেশি জানা।


তাই সেদিকে না গিয়ে এতটুকু বলতে চাই- ইয়াজিদ ছিলেন আল্লাহর রাসূলের জলিলে কদর এক সাহাবীর ছেলে। তিনি অন্যায়ভাবে অর্থাৎ স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় আরোহণ করতে চেয়েছিলেন। এটুকু অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য আল্লাহ পাক তাঁর হাবীবের কলিজার টুকরার আত্মাহুতির মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে এক অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখালেন যে কোন অবস্থায়ই অন্যায়কে সমর্থন করা যাবে না, সে যত বড় শক্তিধর বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন।


অথচ বর্তমান যুগে আমরা কত হাজার প্রকার অন্যায় ও জুলুম নির্যাতন নীরবে সয়ে যাচ্ছি বা প্রশ্রয় দিচ্ছি- তা কি একবারও ভেবে দেখেছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন- তোমাদের কি হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করবে না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে- হে আমাদের রব! এ জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীগণ জালেম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের কোন বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরি করে দাও। [আন্-নিসা]


উল্লিখিত আয়াতে এমন সব মজলুম শিশু, নারী ও পুরুষদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যারা মক্কায় ও আরবের অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এ অপরাধে তাদের উপর অমানুষিক অন্যায় ও জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছিল কিন্তু তাদের হিজরত করার কিংবা কাফেরদের জুলুম থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতাও ছিল না। অথচ বর্তমান সময়টাও সে অবস্থার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এ অবস্থা দেখেও যদি আমরা চুপচাপ বসে থাকি তাহলে আর যাই হোক, আমরা বেহেশতি মুসলমানদের দলভুক্ত হতে পারব না এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে আমরা রক্ষা পাব না।

লেখক: ব্যাংকার।

//এআর


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি