ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১৮ ১৩:২৯:২৫

Ekushey Television Ltd.

কখন অন্ত:স্বত্ত্বার সিজার করা জরুরি

ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৩:২২ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৩:২৩ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার

ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা

ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা

ডেলিভারি বা সন্তান প্রসবের বিষয়টি নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্ন আছে, রয়েছে কিছু মিথও। বলা হয়ে থাকে প্রসবের সময় হলে অন্ত:স্বত্ত্বাকে হাসপাতালে ভর্তি করালেই চিকিৎসকরা সিজারের (অস্ত্রোপচার) কথা বলে থাকেন। স্বাভাবিক প্রসবের দিকে কেউই আগ্রহ দেখান না।

কেন এমন হচ্ছে? সিজারের প্রয়োজনীয়তা আসলেই কতটুকু? কোন কোন ক্ষেত্রে সিজার আবশ্যক? সিজারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা।

প্রশ্ন : নরমাল ডেলিভারি বলতে আমরা কী বুঝি?

ডা. মাহমুদা : নরমাল ডেলিভারি মানে হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব। অর্থাৎ মায়ের গর্ভে সন্তান থাকবে শিশুটি পূর্ণাঙ্গ হওয়া পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবে শিশুর মাথা নিচের দিকে থাকবে। স্বাভাবিক নিয়মে গর্ভবতী মায়ের প্রসব বেদনা উঠবে। শেষ পর্যন্ত একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম হবে। মা সুস্থ থাকবেন। এই পুরো প্রক্রিয়অটিকে আমরা বলি স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব। তবে এই স্বাভাবিক ঘটনা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে হয় না।

প্রশ্ন : দেশে সিজার প্রবণতা বাড়ছে, এর কারণ কী?

ডা. মাহমুদা: প্রসবকালীন সময়ে আমরা সিজারিয়ানের দিকে বেশি গুরুত্ব যাচ্ছি এমনটি বলা হচ্ছে। প্রশ্ন আসতে পারে এর যথার্থতা কতখানি? এর যথার্থতার অনেকগুলো দিক আছে।

একটি হলো রোগীর দিক। এমনিতে কিছু কারণ রয়েছে যেগুলোর জন্য স্বাভাবিক ডেলিভারির বদলে অস্ত্রোপচার করে বাচ্চা প্রসব করাতে হয়। তো সেই জিনিসগুলো কী?

বেশ কিছু কারণে অস্ত্রোপাচার করতে হয়। যেমন- অন্ত:স্বত্ত্বার যদি কোনো জটিলতা থাকে। যেমন- অন্ত:স্বত্বার যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে। অথবা মা যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগে যেমন হার্টের রোগ। কিংবা মায়ের বয়স বেশি বা বয়স অনেক কম হলেও অস্ত্রোপাচার দরকার হয় অনেক সময়। অর্থাৎ অন্ত:স্বত্ত্বার বয়স ১৬ বছরের নিচে কিংবা ৩৫ বছরের বেশি হলে অনেক সময় সিজার জরুরি হয়ে পড়ে।

অন্ত:স্বত্ত্বার উচ্চতা যদি কম হয় বিশেষ করে চার ফুট ১০ ইঞ্চির নিচে হলে অস্ত্রোপাচার দরকার হয়ে পড়ে। এগুলো হলো মায়ের দিক।

বাচ্চার অবস্থান বা নানা ত্রুটির কারণেও অনেক সময় অস্ত্রোপাচার আবশ্যক হয়। গর্ভফুলটা হয়তো জরায়ুমুখের দিকে থাকে, নিচের দিকে থাকে। কিংবা বাচ্চার অবস্থান হয়তো ঠিক নেই। বাচ্চার মাথা হয়তো নিচের দিকে নেই।

অন্ত:স্বত্ত্বার জরায়ুতে টিউমার থাকলেও স্বাভাবিক প্রসব ব্যাহত হতে পারে। বাচ্চার ওজন যে রকম, বাচ্চার আকার আকৃতি যে রকম বড়, মায়ের যে তলপেটের হাড়ের খাঁচা আছে, সেটি হয়তো দেখা গেল ছোট। সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি এখান দিয়ে হয়তো স্বাভাবিক প্রসব হবে না। এই রকম কিছু বিষয় থাকে। কিংবা কোনো মায়ের হয়তো এ রকম থাকে আগে একবার কিংবা দুবার অস্ত্রোপচার হয়ে বাচ্চা প্রসব হয়েছে, সে কারণে তখন আমরা হয়তো স্বাভাবিক প্রসবের কথা চিন্তা না করে তাকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবই সমর্থন করি। এটা হলো বৈজ্ঞানিক তথ্য।

আরেকটা ব্যাপার হলো, কোনো কোনো সময় রোগীর পরিবারের দিক থেকে আমাদের ওপর চাপ থাকে, সেটা হচ্ছে অনেক দিন পরে বাচ্চা হচ্ছে, পরিবার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না ইত্যাদি। কিংবা তারা চিন্তা করছে আমরা বেশি বাচ্চা নেব না তাহলে কেন অস্ত্রোপচার করাব না। তাছাড়া ব্যথার যে বিষয়টি রয়েছে সেই ব্যথা অন্ত:স্বত্ত্বা সহ্য করতে পারবে না। আরো অনেক ভুল ধারণা মানুষের মাথার মধ্যে ঢুকে গেছে। তারা মনে করছেন, সিজার-ই ভালো। এভাবে বাচ্চা ভালোভাবে জন্ম হয়। স্বাভাবিক প্রসবে অনেক ঝুঁকি আছে। এই ভুল কিছু তথ্য অন্ত:স্বত্ত্বা ও তাদের পরিবারের মধ্যে ঢুকে গেছে।

চিকিৎসকের দিক থেকে যে বিষয়টি ঘটে, চিকিৎসক প্রসবকালীন সম্পূর্ণভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ রাখবেন, সে সময়টুকু দেবেন এবং চাহিবা মাত্র ওই চিকিৎসককে পাওয়া যাবে। অফিস সময়ের বাইরে হোক কিংবা অফিস সময়ে ভেতরে হোক- এই চিকিৎসককে পাওয়া যাবে সময়মতো এটাও আসলে সম্ভব নয়।

তাই চিকিৎসকের চিন্তা থাকে, আমি অস্ত্রোপচার করেই হয়তো ঠিকঠাকমতো একটি বাচ্চা প্রসব করব। এতে আমি চিন্তামুক্ত থাকলাম। এসব বিভিন্ন কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাচ্চার প্রসব বাড়ছে।

তবে এটাও সত্য, পৃথিবীতে অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে প্রসব বাড়লেও অনেক দেশে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের দেশে এর পরিমাণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। যেটা আসলে হওয়া উচিত নয়।

প্রশ্ন : ব্যাথার ভয়েও অনেক সময় সিজারের কথা বলা হয় পরিবার থেকে। ব্যথা কমানোর কী কোনো উপায় নেই?

ডা. মাহমুদা: অনেক রোগীর অভিভাবক রোগী প্রসবকালীন সময়ে ব্যাথা সহ্য করতে পারবে না, এমন যুক্তিতে সিজারের জন্য বলে থাকেন। মনে রাখতে হবে বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে ব্যাথা কমানো খুব কঠিন বিষয় নয়। এটা সত্য প্রসব বেদনার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো ব্যথার আসলে তুলনা করে বলা যায় না। ব্যথামুক্ত প্রসব করানো খুব সহজ ব্যাপার। কিন্তু চালু নেই বলে, কেউ করছে না দেখে একটি ভীতিকর অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেছে। তবে উন্নত বিশ্বে কিংবা আমাদের দেশেও কোথাও কোথাও ব্যথামুক্ত প্রসব হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : ব্যাথামুক্ত প্রসব কিভাবে সম্ভব, একটু খুলে বলবেন কী…

ডা. মাহমুদা : ব্যথামুক্ত প্রসব দুটো ভাবে হতে পারে। প্রসব বেদনা যখন চলবে তখন ব্যথার ওষুধ দিয়ে তার ব্যথা কমানো যেতে পারে। এভাবে শতকরা ৯০ ভাগ পর্যন্ত ব্যথা কমানো যেতে পারে।

আরেকটি হচ্ছে আমরা সাধারণত কোমরের দিকে একটি ইনজেকশন দিয়ে, যেভাবে ঠিক সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়, ব্যথামুক্তভাবে ঠিক একইভাবে প্রসব চলাকালীন মাকে ব্যথামুক্ত রাখা যায়। তখন অন্ত:স্বত্ত্বা কথা বলতে পারেন। তিনি হালকা খাবার খেতে পারেন। মা গল্প করতে পারেন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। প্রসবকালীন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত থাকতে পারেন। সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারেন সহজেই।

আমরা মনে করি, ব্যথামুক্ত প্রসব যদি চালু করা যায় তাহলে সিজারের হার অনেকখানিকমে যাবে।

দেখুন একটি মায়ের স্বাভাবিক প্রসব হয়তো হতো। কিন্তু সেই মাকে যদি অস্ত্রোপচারের একটি পদ্ধতির ভেতর যেতে হয় তবে তা সত্যিই বেদনাদায়ক। অস্ত্রোপচার মানেই তো একটি ঝুঁকি। অস্ত্রোপচারের একটি নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। একটি হচ্ছে অজ্ঞানের ওষুধজনিত ঝুঁকি। আরেকটি হচ্ছে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি। কিংবা ইনফেকশনের ঝুঁকি। কাজেই মা সেখানে (সিজারে) ঝুঁকিমুক্ত থাকছে, এ কথা বলা যাচ্ছে না।

অর্থাৎ যে মায়ের স্বাভাবিক প্রসব হতো, অস্ত্রোপচার করে প্রসব করানোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় হয়তো সে ভুগতে পারে। সে ক্ষেত্রেও ভোগান্তি বাড়ছে। আর্থিক খরচও বাড়ছে।

প্রশ্ন : প্রথম সন্তানে সিজারে হলে পরের সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করা অনিবার‌্য হয়ে পড়ে কিনা?

ডা. মাহমুদা: প্রথম সন্তানটি যদি সিজারে হয়, তাহলে কেন তা সিজার হয়েছিল তার ওপর নির্ভর করে দ্বিতীয় সন্তানটি সিজার হবে কিনা। যদি এমন হয়ে থাকে যে, আগে এমন কোনো কারণ ছিল যে কারণে মায়ের অস্ত্রোপচার করতে চিকিৎসক বাধ্য হয়েছিলেন, সেই ঘটনা আবারও ঘটতে পারে তখন আমরা সেই অন্ত:স্বত্ত্বাকে স্বাভাবিকভাবে প্রসবের জন্য আর বলি না।

আর যদি এমন হয় যে, তখন প্রসব বেদনা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে প্রসবটি আটকে যাওয়ার কারণে হয়তো স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয়নি। সে ক্ষেত্রে আবার স্বাভাবিক প্রসব হতেও পারে। তবে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হবে, যদি সঙ্গে চিকিৎসক উপস্থিত না থাকেন কিংবা যদি সেটি হাসপাতাল না হয়।

আর কোনো মায়ের যদি দু’বার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব হয়ে থাকে, তাহলে পরের বার অবশ্যই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে হবে।

লেখক পরিচিতি: ডা. মাহমুদা একজন প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন। তিনি শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং শমরিতা হাসপাতালে কর্মরত।

অনু লেখক: আলী আদনান।

 

/ এআর /



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি