ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই, ২০১৮ ৩:২২:৪৬

Ekushey Television Ltd.
সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

কোটায় বিপন্ন মেধাবীর ভবিষ্যৎ

রিজাউল করিম

প্রকাশিত : ১১:৫৬ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ১১:২২ পিএম, ১১ মার্চ ২০১৮ রবিবার

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার দৌরাত্ম্যে বিপন্ন হতে বসেছে বিপুলসংখ্যক মেধাবীর ভবিষ্যৎ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ সরকারের বিভিন্ন চাকরিতে যোগ্যতার মানদণ্ডে ওপরের সারিতে থেকেও কোটার মারপ্যাঁচে ছিটকে পড়ছে তারা। আর সেখানে স্থান করে নিচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোটা পূরণ না হওয়ায় শূন্যই থেকে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ। খালি পদেও স্থান হচ্ছে না মেধাবীদের।পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে সর্বস্তরে মেধাশূন্যতা দেখা দিতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলী খান একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে এমন স্থায়ী কোটা পদ্ধতি নেই।পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য এটা করার নজির আছে।তারপর সময় শেষ হয়ে আসলে সেটা পুন মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ১৯৭২ সালে কোটা ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তার কোনো মূল্যায়ন হয়নি।

তিনি বলেন, এটার পুনঃ মূল্যায়ন করা দরকার।মূল্যায়ন করে যদি দেখা যায় এর পরিবর্তন দরকার, তবে তা করতে হবে। কেননা কোটা ব্যবস্থার ফলে মেধাবীরা সবসময় চাকরি পায় না। এতে মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে।নিয়োগ পরীক্ষাটায় তারা অংশ নেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এতে দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মেধা সংকটে পড়তে পারে।

কোটা পদ্ধতির জাতাকলে পিষ্ট সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন জোরালো হয়ে উঠছে।তাই কোটার নামে মেধার এ অবমূল্যায়ন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে তারা। চাকরি প্রত্যাশী বেকাররা বলছেন, কমসংখ্যক চাকরিপ্রত্যাশীর জন্য বেশি কোটা সংরক্ষণে একদিকে বেকার সমস্যা কমছে না, অন্যদিকে ৫৬ শতাংশ কোটায় নিয়োগ দেওয়ার প্রার্থী না পাওয়ায় আবার আসন খালি থেকে যাচ্ছে।

তাই বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে সারা দেশে একযোগে কর্মসূচি পালন করেছে তারা। গত রোববার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন করেছে তারা। এর সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতিটি জেলায় সুবিধাজনক জায়গা কিংবা প্রেস ক্লাবের সামনে এই কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানা গেছে। আন্দোলনকারীরা এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে মানববন্ধন করেছিল।

জানা গেছে, কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ চাকরি প্রত্যাশীদের আন্দোলন গত ২০১৩ সালে জেগে উঠলেও বেশি দূর এগোতে পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের বছর হওয়ায় সেটা থমকে যায়। এবার আবার নির্বাচনের বছরে কোটা সংস্কার দাবিতে মাঠে নেমেছে তরুণ বেকাররা, যারা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ভালো প্রস্তুতি থাকার পরও নিয়োগ না পাওয়া বা উত্তীর্ণ হতে না পারার জন্য তারা কোটা সংরক্ষণকে দুষছে।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোটা সংস্কারের বিষয়ে তারা প্রথমে ১০ দফা দাবি জানালেও এখন দাবি পাঁচটি। দাবিগুলো হচ্ছে—কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৫ থেকে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূণ্য পদে মেধায় নিয়োগ দেওয়া, নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা, কোটায় কোনো ধরণের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া এবং চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন কাটমার্ক ও বয়সসীমা নির্ধারণ করা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, কোটা পদ্ধতিতে যদি কোন সুবিধা না আসে, উল্টো অসুবিধা আসে তো তা তুলে দেওয়াই উচিৎ। কারণ এটা সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাই প্রকৃত মেধার মূল্যয়ন করতে এটা করতে হবে।তবে এটা একবারে নয়, ধীরে ধীরে তুলতে হবে।

সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিতে এখন ৫৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনির জন্য কোটা ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, সব জেলার জন্য ১০ শতাংশ আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। আর এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

কোটা সংরক্ষণের কারণে গত ২৮তম বিসিএসে ৮১৩টি, ২৯তম ৭৯২টি, ৩০তম ৭৮৪টি, ৩১তম ৭৭৩টি আর ৩৫তম বিসিএসে ৩৩৮টি পদ খালিই থেকেছে। আর ৩৬তম বিসিএসে কোটা পূরণ না হওয়ায় ৩৭তম থেকে তা পূরণ করা হয়েছে।

চাকরি প্রত্যাশীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হয় ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য, আর শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা। ৫০ শতাংশ নারীর জন্য কোটা ১০ শতাংশ আর সব জেলার অংশগ্রহণমূলক নিয়োগের জন্য ১০ শতাংশ কোটা। তবে সংরক্ষিত কোটা ৫৫ শতাংশের মধ্য থেকেই অপশনাল ১ শতাংশ হচ্ছে প্রতিবন্ধী কোটা। বাকি ৪৪ শতাংশ কোটা হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য।

কোটা পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলনে থাকা ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থী সাদনান নায়িম জিসান বলেন, কোটা পদ্ধতি সংস্কার লাখো বেকারের গণদাবি। দেশের কম সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় কোটা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। আর এর জন্যই অনেকে ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাচ্ছে না। এটা আমাদের সবার দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাব।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হোসেন বলেন, চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকীকরণের জন্য বার্ষিক প্রতিবেদনে একাধিকবার সুপারিশ করেছি। এমনকি ওই সময় কোটা নিয়ে পিএসসি একটি মৌলিক গবেষণা হয়েছিল। ড. আকবর আলি খান ও কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) ওই গবেষণাটি ছিল বিশ্বমানের। সেখানেও তারা মেধা কোটা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিলেন। সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও জেলাগুলো ছোট হওয়ায় আগের মতো বেশি বৈষম্য নেই। তাই জেলা কোটা তুলে দিয়ে মেধা কোটা আরও ১০ ভাগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে মেধাবীরা উপকৃত হবেন। সেই সঙ্গে ক্যাটাগরিভিত্তিক কোটার মধ্যে জেলা কোটা ঢুকানো সমতা নীতির পরিপন্থী, তারও সুরাহা হবে। এতে কোনো মহলের আপত্তি থাকবে বলে মনে হয় না।

বিভিন্ন দেশের কোটা পদ্ধতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই কোটা আছে, তবে তা অন্যভাবে। যুক্তরাষ্ট্রে কোটাধারীদের আগেই একটা নম্বর দেয়া হয়। এরপর ওপেন পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় কোটাধারীদের। আর ভারত তো কোটাকে একটা সুন্দর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেখানে কোটা আছে, তবে তা উপার্জনের ভিত্তিতে। উচ্চ আয়ের মানুষরা কোটা পায় না। এক্ষেত্রে তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকেও ছাড় দেয় না। একবার যে কোটার সুবিধা পাবে, সে আর কখনও কোটার সুবিধা পাবে না। অর্থাৎ বাবা যদি কোটা সুবিধা পায় তার সন্তানরা কোনো কোটা সুবিধা পাবে না। কেউ যদি কোটা দিয়ে কলেজে ভর্তি হয়, তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা পাবে না। আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটায় ভর্তি হয়েছে, সে কখনও চাকরিতে কোটা সুবিধা পাবে না।

বিসিএস পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক ভাইবা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আরকে//এসি

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি