ঢাকা, রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২১:৩৬:৫৩

কোলেস্টেরল মুক্ত মাংসের চাহিদা মেটাচ্ছে টার্কি

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:২০ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার

টার্কি বন্য পাখি হলেও এখন গৃহে বা খামারে পালিত হচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকায় অনেকে টার্কির মাংস খেয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশেই এর মাংস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য পাখির তুলনায় টার্কির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। মাত্র ২৬ সপ্তাহ বয়স থেকে টার্কি ডিম পাড়া শুরু করে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর ১০০টি ডিম পাড়ে।

বাংলাদেশের খামারে প্রায় সব জাতের টার্কি পাওয়া যায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ব্ল্যাক, রাঙ্গিন সেট, স্লেট, ব্রোঞ্জ, রয়েল পাম্প ইত্যাদি। এর মধ্যে রয়েল পাম্পের দাম সবচেয়ে বেশি। বড় আকারের প্রতি জোড়া রয়েল পাম্প ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কম দামেও টার্কি পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির ১৫ দিন বয়সের একজোড়া টার্কির দাম মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা। ১ মাস বয়সী টার্কির জোড়া তিন হাজার টাকা। সাড়ে তিন মাস বয়সী প্রতি জোড়া টার্কির দাম ৮-১০ হাজার টাকা। পূর্ণ বয়স্ক এক জোড়া টার্কির দাম ১৩-১৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে ডিম পাড়া প্রতিটি টার্কির দাম ১০ হাজার টাকা।

রাজধানীর বিভিন্ন চেইনশপ যেমন স্বপ্ন, অ্যাগোরা ও মিনা বাজারে প্রচুর টার্কির মাংস বিক্রি হচ্ছে। তবে এখানে পূর্ণবয়স্ক প্রতি জোড়া টার্কি ১৫ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পূর্ণবয়স্ক প্রতিটি টার্কির ওজন ছয় থেকে সাড়ে আট কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব দোকানে প্রতি কেজি টার্কির মাংস ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

টার্কি পাখি মুক্ত অবস্থার পাশাপাশি আবদ্ধ অবস্থায়ও পালন করা যায়। টিন, ছন, খড়ের ছাদ দেয়া ঘর বা কনক্রিট দালানেও এরা থাকতে পারে। একটি বড় টার্কির জন্য ৪-৫ বর্গ ফুট জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। ঘরে প্রচুর পরিমাণে আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

টার্কি পালন করতে হলে এর খাবার সম্পর্কে বিস্তর ধারনা থাকতে হয়। যেসব টার্কির বয়স ৪০ দিনের ওপরে, তাদেরকে প্রতিদিন বিভিন্ন শাক-সবজি খাওয়াতে হয়। কলমি, হেলেঞ্চা, সরিষা, পালংকসহ বিভিন্ন ধরনের শাক তারা খুব পছন্দ করে। তাছাড়া ফসলের বীজ, পোকামাকড় এবং মাঝেমাঝে ব্যাঙ কিংবা টিকটিকি খেয়েও এরা জীবনধারণ করে। তবে টার্কির আদর্শ খাদ্য হচ্ছে- ধান, গম, ভুট্টা, সয়াবিন মিল, ঘাসের বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, ঝিনুক গুড়া ইত্যাদি।

টার্কির খাবার অবশ্যই স্বাস্থ্য সম্মত হতে হবে। তা না হলে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রন্ত হতে পারে। পক্স, সালমোনেলোসিস, কলেরা, রানীক্ষেত মাইটস ও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জায় এরা বেশি আক্রান্ত হয়। পরিবেশ ও খামার অব্যবস্থাপনার কারণেও অনেক রোগ সংক্রমণ হতে পারে।

কোনো অবস্থাতেই রোগাক্রান্ত পাখিকে টিকা দেয়া যাবে না। টিকা প্রয়োগ করার পূর্বে বোতলের গায়ে দেয়া তারিখ দেখে নিতে হবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ টিকা প্রয়োগ করা যাবে না।

রোগ হলে পযর্বেক্ষণের পাশাপাশি নিকটস্থ পশু হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া প্রতি দুই মাস পরপর পাখিকে রানীক্ষেত ভ্যাকসিন দিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে।

 

টার্কির মাংসের চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে-

১. টার্কির মাংস সুস্বাদু এবং মাংস উৎপাদন ক্ষমতা বেশি।

২. এটা ঝামেলাহীনভাবে দেশি মুরগির মতো পালন করা যায়।

৩. টার্কি পাখি ব্রয়লার মুরগীর চেয়েও দ্রুত বাড়ে।

৪. টার্কি পালনে তুলনামূলক খরচ অনেক কম। কারণ এরা দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি শাক, ঘাস, লতাপাতা খেতেও পছন্দ করে।

 

টার্কি খামারের বেশিরভাগ মালিকই তরুণ। এমনই একজন উদ্যোক্তা সেলিম মিয়া। রাজধানীর মুগদার মান্ডায় প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনি গড়ে তুলেছেন `কাশবন এগ্রো ফার্ম`। বাংলাদেশের টার্কির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন ইটিভি অনলাইনের দুই প্রতিবেদক আব্দুল করিমকাজী ইফতেখারুল আলম তারেক

 

ইটিভি অনলাইন : টার্কির মাংস কতটা স্বস্থ্যসম্মত বলে মনে করছেন?

সেলিম মিয়া : সাধারণত পল্ট্রি মুরগির মাংসে কোলেস্টেরল মাত্রা থাকে ২০% বা তার চেয়ে বেশি। অথচ টার্কির মাংসে কোলেস্টেরল মাত্রা ১-২ %। তাই হার্টের রোগীর জন্য এটি খুবই উপকারী।

 

ইটিভি অনলাইন : আপনার কাশবন এগ্রো খামারটি কখন, কিভাবে শুরু করেছেন?

সেলিম মিয়া : টার্কি সম্পর্কে জানতে প্রথমে ইন্টারনেটে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। তারপর নিয়ম-কানুন বুঝে কাজ শুরু করেছি। দেড় বছর আগে মাত্র ৩৩টা টার্কি নিয়ে এ খামারটি শুরু করেছিলাম। এখন এখানে তিন হাজার পাখি আছে।

ইটিভি অনলাইন : কাজ শুরু করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

সেলিম মিয়া : বাংলা ভাষায় টার্কি সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকাটাই বড় সমস্যা। তাছাড়া ইন্টারনেটে অনেক ভুল তথ্য আছে। এ কারণে শুরুর দিকে টার্কি প্রতিপালন নিয়ে অনেক বিপদে পড়তে হয়েছে। তবে এরই মধ্যে নিজের সব ভুল শুধরে নিয়েছি। এখন এটি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণীত হয়েছে।

ইটিভি অনলাইন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টার্কি পালনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

সেলিম মিয়া : এটাকে একটা শিল্প হিসেবে দেখছি। টার্কি রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। টার্কি তৃণভোজী হওয়ায় এগুলো প্রতিপালনে ব্যয় অনেক কম। অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের কাছে এর মাংসের অনেক চাহিদা রয়েছে।

ইটিভি অনলাইন : এ কাজ শুরুর পূর্বে আপনি কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেলিন কী?

সেলিম মিয়া : একবার আমরা একটা খামার দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানকার মালিক আমাদেরকে খামারটি দেখতে দেয়নি। সেদিন থেকেই প্রতিজ্ঞা করি, আমরা এমন একটি খামার গড়ে তুলবো, যেটা সবাই দেখতে পারবে। আমরা আমাদের প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছি।

ইটিভি অনলাইন : টার্কি পালন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।

সেলিম মিয়া : টার্কির মাংস পুষ্টিকর ও খুবই সুস্বাদু। পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদা মেটাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যাদের অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত মাংস খাওয়া নিষেধ, টার্কির মাংস তাদের জন্য বিকল্প খাবার হতে পারে।

ইটিভি অনলাইন : আপনার কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়ে আর কেউ কি টার্কি খামার গড়ে তুলেছেন?

সেলিম মিয়া : আমাদের থেকে টার্কি নিয়ে এবং আমাদের পরামর্শ নিয়ে প্রায় ২০০ খামার গড়ে উঠেছে।

 

ইটিভি অনলাইন : এ ধরনের উদ্যোগের ব্যাপারে বর্তমানে সরকার কী ভাবছে?

সেলিম মিয়া : সম্প্রতি গাজীপুরের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০ টার্কি নিয়ে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করছে। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনো কোনো নীতিমালা তৈরি করেননি।

ইটিভি অনলাইন : টার্কি পালনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কিভাবে সহযোগিতা করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সেলিম মিয়া : সরকার যদি এ ব্যাপারে নীতিমালা করে, তবে অনেক ভালো হবে। যেকোনো শিল্পের ক্ষেত্রে শুরুতে ট্যাক্স ফ্রি করা হয়। যদি এর ক্ষেত্রেও এরকম নীতি অনুসরণ করা হয়, তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে অনেকেই উৎসাহী হবেন। তাছাড়া সরকার যদি বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে আরও অনেকে এ ধরনের খামার দিতে এগিয়ে আসবে।

ইটিভি অনলাইন : নতুন কেউ এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে, আপনি তাদেরকে প্রথমে কী পরামর্শ দিবেন?

সেলিম মিয়া : নতুন কেউ এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে আগে ভালোভাবে টার্কি সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে হবে। লালন-পালন, চিকিৎসা, খাবার-দাবারসহ সব বিষয় বুঝে কয়েকটি খামার ভিজিট করে কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে নবীন উদ্যোক্তারা ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন।

ইটিভি অনলাইন : আপনার এ উদ্যোগের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করায় ইটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

সেলিম মিয়া : এ খামার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে আগ্রহ প্রকাশের জন্য আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

 

//ডিডি//


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি