ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮ ৭:২২:৫৫

Ekushey Television Ltd.

‘গাইড বই-কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৯:৩৬ পিএম, ৫ মার্চ ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৬:১৯ পিএম, ১০ মার্চ ২০১৮ শনিবার

অধ্যাপক হাসনাত হারুন। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন চৌত্রিশ বছর। ২০১৫ সালে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যান। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি, সিলেবাস প্রণয়নসহ নানা বিষয়ে তিনি সবসময় ছিলেন সোচ্চার। সম্প্রতি সময়ের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণ হিসেবে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অভাবইকে দায়ী করেছেন এই শিক্ষাবিদ। তবে  আইনের যথাযথ প্রয়োগে প্রশ্নফাঁস রোধ করাও সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার মতো পাবলিক পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় অনুৎসাহী হচ্ছেন। পড়ালেখা তাদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের চরম প্রসার শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ করে দিচ্ছে।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতির বিভিন্ন বিষয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের মুখোমুখি হন অধ্যাপক হাসনাত হারুন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাক্ষেত্রে এ মুহুর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশ্নফাঁস। আপনার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের আলোকে এ সমস্যার জন্য কাকে দায়ী করবেন?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: বর্তমান সময়ে প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নপ্রত্র আগেও ফাঁস হয়েছে, তবে সেটা ছিল সীমিত আকারে। প্রশ্নপ্রত্র প্রনয়ণকারী, মডারেটর এবং বিজি প্রেসের কিছু দুর্নীতিপরায়ন লোক এই ধিকৃত কাজটি তখন করেছেন। আগে যেটি সীমিত পরিসরে ছিল, প্রযুক্তির কল্যাণে সেটি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়; চাকরির বাজারে বিশেষ করে সরকারি চাকুরিতে, যেসব পদে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেইসব পরীক্ষার প্রশ্নপ্রত্র ও অহরহ ফাঁস হচ্ছে। তাত্ত্বিক কথায় বলতে গেলে বলতে হবে, দায়ী মানুষের মূল্যবোধের অভাব, নৈতিকতার স্খলন। যদিও বলা হয়, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন একটি রাষ্ট্রীয় গোপন কাজ। কিন্তু কাজটি এখন আর গোপন থাকে না। গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা কেউ এই গোপন কাজটিকে গোপন রাখতে আগ্রহী নয়। সেজন্য, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে দুর্নীতিপরায়ণ একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠি সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে একের পর এক প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস করে চলছে। দুর্বল আইন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবেই এই দুষ্টচক্র বারবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠার সুযোগ পাচ্ছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী আছে বলে মনে করেন?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: উত্তরণের উপায় নেই, এমন কথা বলা বোধ হয় সমীচীন হবে না। যেকোনো সম্যসার সমাধান অবশ্যই আছে। সমাধানের পথগুলো আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। স্বদিচ্ছা, আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা, আইনের সফল প্রয়োগ থাকলে উত্তরণের পথটি অনেক সহজ হবে বলে আমার বিশ্বাস।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: নৈর্ব্যত্তিক ও সৃজনশীল পদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনেকে দাবি তুলছেন। আপনি কী তাদের সাথে একমত?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: দ্বিমত পোষণ করার মতো কোন যুক্তি এই মুহূর্তে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। কারণ, এই নব পদ্ধতির কারণে লাভের চেয়ে লোকসানের বোঝা আমাদেরকে বেশি বইতে হচ্ছে। প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস, পরীক্ষার হলে বিশৃঙ্খলা এবং অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের নৈতিক স্খলনটা এর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী। সৃজনশীলতা মানুষের একটি অন্তর্নিহিত গুণ। মানুষের এ সুপ্ত সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই প্রয়োজন গুরু এবং গুরুগৃহ। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আর্দশ শিক্ষক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো আছে কিন্তু সেই সৃজনী ক্ষমতার অধিকারী নীতিবান আর্দশ শিক্ষক কি আজ খুব বেশি একটা খুঁজে পাওয়া যাবে? আগে তো শিক্ষক নিজেকে শিক্ষক হিসেবে সৃজন করতে হবে। তারপরই শিক্ষার্থীর মনন বিকাশে সাহায্য করবে। মেধার সৃজন চর্চা’ নামে কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ দেশে আছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনার দৃষ্টিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মান কেমন? এর গলদ কোথায়?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: শিক্ষার অর্থ যদি শুধু জ্ঞানলাভ হয় যেমন ধরুন, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা দিবস; ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস-এই দুটি তারিখ হলো জ্ঞানের বিষয়। সেই বিচারে বলব, শিক্ষার মান নেহায়েৎ খারাপ নয়। কিন্তু যদি বলা হয়, ভাষা দিবস কেন, বা বিজয় দিবসের অর্থ কি, কেন আমরা বিজয় দিবস পালন করবো, সেটা কিন্তু ভাববার বিষয়। এই ভাবের জ্ঞানটা হলো সত্যিকারের শিক্ষা। সেই ভাবের শিক্ষাটার নামই হচ্ছে সৃজনশীল শিক্ষা। বলছি এই ভাবনা তৈরি করে দেওয়ার কারখানা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীর মনে এই ভাবনাগুলো কীভাবে আসবে এর সমাধানই বা শিক্ষার্থী কোন প্রক্রিয়ায় বা কি পদ্ধতিতে বের করে আনবে, তার জন্য আছেন শিক্ষক, তিনি শিক্ষার্থীর মনের ভেতর এই কৌতূহল বা আগ্রহটা তৈরি করে দেবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, গলদটা সূতিকাগারে। যিনি শিক্ষাকে সযত্নে-সম্মানের সাথে ধারণ করবেন, লালন করবেন, শিক্ষার উৎকর্ষতা ধরে রাখবেন, তিনিই শিক্ষাকে বিকিকিনির মালামাল বলে বিবেচনা করছেন। শিক্ষা এখন বাজারের পণ্য।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: পরীক্ষা তো কোন আনন্দদায়ক বিষয় নয়। অথচ আমরা সবাই বলছি, শিশুরা আনন্দের সাথে পড়ালেখা শিখবে। পরীক্ষা নামক এক ভীতিকর দানব কোমলমতি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার ক্ষুদে জ্ঞান বলে যে পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এ পরীক্ষাগুলো কচি শিক্ষার্থীর মনে ভয় তৈরি করে। অভিভাবক চায়, তার সন্তান পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাক। ছাত্র বা ছাত্রীটা কিন্তু এই একটা প্লাস মাইনেসের হিসেবটা বুঝে না। অভিভাবকের নানা মুখী চাপে শিক্ষার্থী ভুলে যায়, পড়ালেখা আনন্দের কোনো বিষয় নয়। এটা একটা ভীতিকর যুদ্ধ, যেই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এপ্লাস পাওয়া। শিক্ষা জীবনের শুরুতেই এই ভীতিকর একটা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর মনে একটা বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং তার মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। পরবর্তীতে এই বৈতরণী পার হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরাও নানা রকম অসৎ উপায় অবলম্বন করে। অন্য সব পরীক্ষাগুলো থাকতে পারে। যুগোপযোগী পাঠ্যবই, সিলেবাস তৈরি করে বিচার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন প্রনয়ণ করতে হবে। মনে হয় আমাদের সময়কার সেই বর্ণণামূলক পদ্ধতিটা খারাপ ছিল না। আমার বিশ্বাস, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। তার চিন্তা শক্তি, ভাষাজ্ঞান এবং তার সৃজনশীল ক্ষমতারও বিকাশ ঘটবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের পেশাগত জীবনে তেমন কোন প্রভাব ফেলেনা। সেক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: কথাটার সাথে আমি সম্পূর্ণরূপে সহমত পোষণ করতে পারছি না। যদি বলি এখন যারা দেশ পরিচালনার বিবিধ স্তরে আসীন আছেন তারা সবাইতো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সত্যিকারের সু-শিক্ষা অর্জন করতে পারলে, পেশাগত ক্ষেত্রে কোনো রকম সম্যসা তৈরি হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না ।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি দীর্ঘদিন ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার গুণগত বিশেষত্ব কী?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: ক্যাডেট কলেজগুলো এই দেশেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সপ্তম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ন্যাশানাল কারিকুলাম অনুযায়ী সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমে এখানে পাঠদান করা হয়। গুণগত বিশেষত্বের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে বলব, ক্যাডেট কলেজে শুধু পড়ালেখা হয় না। পড়ালেখার সাথে সাথে ক্যাডেটদের শারীরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন ক্যাডেট শারীরিক যোগ্যতা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, মনোবল, কর্ম তৎপরতা, আত্মবিশ্বাস ও দেশাত্মবোধ প্রভৃতি গুণাবলী অর্জন করে। এই বিবিধ গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয়ে, সে নিজেকে একজন সত্যিকারের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ক্যাডেটদের সুপ্ত প্রতিভা, মননশীলতা বিকাশের জন্য রয়েছে, বাধ্যতামূলক ভাবে নানা রকমের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। এর মাধ্যমে ক্যাডেটদের সৌর্ন্দযবোধ ও সৃজনধর্মী প্রতিভার বিকাশ ঘটে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরা সাধারণত কোন ধরনের পেশা নির্বাচন করতে পছন্দ করে? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট তার কতটুকু অনুকূলে আছে বলে মনে করেন?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: অনেকের ধারণা ক্যাডেটরা শুধু প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগদান করে তাদের মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে। কথাটা সম্পুর্ণ ভুল। সৃষ্টিলগ্ন থেকে ক্যাডেটরা দেশ বিদেশের সব পেশার সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনী ছাড়াও ক্যাডেটরা ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, আইনজীবী, কনসালটেন্ট, আইটি, সাংবাদিকতা, রাজনীতিবিদ সহ সরকারি- বেসরকারি ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। আমি বেশ জোরালো ভাবে বলতে পারি, প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্যাডেটরা সফলতা দেখিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। প্রতিকূলে যাবার কোনো কারণ তো দেখছি না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্যাডেট কলেজ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক র্পযায়ে জাতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি স্কুল, নিবন্ধনকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ক্যাডেট কলেজ বা আবাসিক স্কুল-শিক্ষার নানামুখী বিস্তারে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে শিক্ষাবিদ ও সমাজ গবেষকরা অভিযোগ করছেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? আজকের বাস্তবতায় কী একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: বিবিধ মাধ্যম ও ব্যবস্থার কারণে যে সমাজে বিভক্তির সৃষ্টি হচ্ছে সেই সত্যি অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সবগুলোকে একই স্রোতে টেনে এনে একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কিনা? বলতে পারি, হবে না। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষায় নতুনত্ব আনা বোধহয় সম্ভব হবে না। কারণ, ধর্মীয় শিক্ষাটা এখন শুধু ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দ্বিতীয়ত: শিক্ষার সুবিধে অসুবিধেগুলো শিক্ষাবিদ ও সমাজ গবেষকেরা বিবিধ আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে জন সমক্ষে তুলে আনতে পারেন। সুপারিশমালাও তৈরি করে দিতে পারেন। কিন্তু কার্যকরী ব্যবস্থাটা নিতে হবে, সরকারকে। সরকার এই বিষয়ে কতটুক আন্তরিক, সেটাই হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। কারণ, দেশ পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা জড়িয়ে আছেন, তাদের সন্তান, স্বজন বা নিকটতম আত্মীয় কাউকে এই দেশীয় শিক্ষাস্রোতে অবগাহন করতে হয় না। তাদের দেশ প্রেমের ঘাটতি ও জাতির কাছে কোনো রকমের দায়বদ্ধতা নেই।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দিনে দিনে কোচিং সেন্টার, গাইড ও নোটের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও মননে এর প্রভাব কেমন বলে মনে করেন? এটা কী শিক্ষকদের ব্যর্থতা নয়?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: শিক্ষকদের ব্যর্থতা কেন বলবো। শিক্ষক নামধারীরাই তো কোচিং সেন্টার চালাচ্ছে। গাইড বই, নোট বই লিখছে। বাজারে বিক্রি করছে। সেই বইগুলো ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছে, কিনতে বাধ্য করছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই গাইড বই নিয়ে আমাদের শিক্ষকেরা ক্লাসে যাচ্ছেন। সেই গাইড বই থেকেই আবার বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন করছেন। আজকের শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ে কোনো কিছুই চিন্তা করে না। তাদের হয়ে এই চিন্তা ভাবনার কাজটা বাজারের নোটবই গাইডবইগুলো করে দেয়। যেহেতু তাদের কোনো কিছু চিন্তা করতে হয় না, সেহেতু তাদের মনন ক্রিয়াও নেই। মানসিক বিকাশের প্রশ্নতো আরো দূরের কথা।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও অনেককে বছরের পর বছর বেকার থাকতে হয়। কিন্তু কেন?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: অস্বীকার করবো না, চাকরি ক্ষেত্রে পদের চেয়ে প্রার্থীর সংখ্যা কয়েকগুন বেশি। প্রতিযোগিতামূলক নানা পরীক্ষায় যাচাই বাছাই করে চাকরি দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া যোগ্যরাই চাকরি পেয়ে যায়। শিক্ষা তো শুধু চাকরি লাভের জন্য নয়। যাদের চাকরি না করলেও চলে, তারাও দেখি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে চারদিকে ছুটাছুটি করে। তবু বলবো বৃত্তিমূলক শিক্ষা, পেশাগত শিক্ষাকে গুরত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে হবে। এই ধারার শিক্ষাপদ্ধতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকেই তাদের মেধা ও যোগ্যতার বলে সম্মানজনক কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রশ্ন ফাঁস, কর্মমুখী শিক্ষার অভাব সহ নানা কারণে শিক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আপনার দৃষ্টিতে কী ধরণের সংস্কার আনলে শিক্ষাপদ্ধতি বিশ্বমানের হবে?

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: গত কয়েক দশকে শিক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারের নামে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা চলেছে। কিন্তু ভালো কোনো ফললাভ হয়নি। আমার মনে হয়, সর্ব প্রথমে যেটি সবচেযে বেশি জরুরি, তা হচ্ছে শিক্ষকতা পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবীদেরকে আকৃষ্ট করতে হবে। যেহেতু নিজেও শিক্ষক, সেই দৃষ্টিতে বলছি, ইদানিং এই পেশায় কোনো ভাল মানের শিক্ষক হবার মত যোগ্য প্রার্থী খুব একটা পাওয়া যায় না। সেজন্য বারবারে শিক্ষকের যোগ্যতার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়তঃ এই মেধাবীদের নিয়ে এসে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একজন শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি? ক্লাসে পাঠদান করতে গেলে একজন শিক্ষকের কী কী যোগ্যতা থাকা দরকার? ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শিক্ষকের সম্পর্কটা কেমন হবে? কেমন হওয়া উচিত?-এই বিষয়গুলো সর্বপ্রথমে শিক্ষককে জানতে হবে। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব তার চলাফেরা, পোশাক, তার বাচনভঙ্গি কিভাবে একজন শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করে, মুগ্ধ করে, এই সম্পর্কে একজন শিক্ষককে তার ধারণাটা স্পষ্ট করে নিতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

অধ্যাপক হাসনাত হারুন: একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সচেতনতামূলক সাংবাদিকতা অব্যাহত থাকুক।

টিকে



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি