ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৮ ৭:০৯:৪৯

Ekushey Television Ltd.

চে গুয়েভারা : শুভ জন্মদিন

মুঈদ রহমান

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:০৫ পিএম, ১৩ জুন ২০১৮ বুধবার

বাবা-মা’র দেয়া নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে ১৯২৮ সালের ১৪ জুন তার জন্ম। বাবা গুয়েভারা লিঞ্চ ও মা সেলিয়ার পাঁচ সন্তানের মধ্যে আর্নেস্তো গুয়েভারা সবার বড়। বাবা-মা তাকে ‘তেতে’ বলে ডাকতেন। তিনি যখন গুয়েতেমালায় যান তখন তাঁর বন্ধু নিকো তাকে ‘চে’ নামে সম্বোধন করে ( চে’র অর্থ হলো ‘হে বব্ধু’) । তার পর থেকে জগৎ বিখ্যাত এ মানুষটিকে কেউ আর ‘আর্নেস্তো’ কিংবা ‘তেতে’ বলে ডাকে না, ডাকে চে গুয়েভারা নামে।

চে’র জীবন-চলায় তার মা সেলিয়ার অনেক প্রভাব আছে বলে অনেকেই মনে করেন । কারণ তার মা ছিলেন একজন সংস্কার-বিরোধী, নারীবাদী প্রগতিশীল মহিলা। বাবা লিঞ্চ শান্তশিষ্ট স্বভাবের লোক ছিলেন। চে ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত যে জিনিষটি সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়েছেন তাহলো ‘হাঁপানি’। ইনহেলার সঙ্গে রাখতে হতো। বাবা-মা হাওয়া বদলের চেষ্টা করেও কোন ফল হয়নি। শেষতক ডাক্তার হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ‘হাপানি’ ছাড়াতে পারেননি।
অসুস্থতার কারণে স্কুল শুরুটা কিছুটা বিলম্বিত হয়। স্কুলে ভর্তি হন নয় বছর বয়সে। লেখাপড়ার চেয়ে দূরন্তপনাই ছিলো বেশী। বন্ধুরা ডাকতো ‘ফুসের’ বলে( ‘ফুসের’ মানে হলো ‘ক্ষীপ্ত ঝড়ের ছোবল’)। ফুটবল, দাবা এমনকি রাগবি খেলায় ছিলেন পারদর্শী। কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল। বাড়িতে প্রচুর বই থাকার দরুন মার্ক্স, লেনিন, এঙ্গেলস শৈশবেই পড়া শেষ। টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কির লেখা পড়ে নিপিড়িত মানুষের বেদনা অনুভব করতেন। চে’র মূল শারীরিক অবয়বটি ফুঠে ওঠে আঠারো বছর বয়স থেকে। লম্বাদেহ, চওড়া কাঁধ, মাথায় লম্বা চুল- একটা পরিণত মানুষ। তখন সে হাই স্কুলের ওপরের ক্লসের ছাত্র।

ছোটবেলায় চে’র সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। রাজিৈতক বক্তৃতা শুনতেন কিন্তু জড়িয়ে পড়া যাকে বলে তা হয়নি। বরং তৎকালীন আর্জেন্টাইন কমিউনিস্ট পার্টির লোকজনদের আচার -আচরণ তার ভালোও লাগতো না।তবে লাতিন আমেরিকাকে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিরে- কুটে খাচ্ছিলো সেটা তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন। আর লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য ডাক্তারের সহযোগী হিসেবে জাহাজে কাজ করা, দোকানে কাজ করা, ফেরি করার মতো অনেক কাজই করেছেনৃ। ঘুরে বেড়ানোটা ছিলো মূল কাজ। বাইশ বছর বয়সে বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন সমগ্র লাতিন আমেরিকা ঘুরে দেখবেন বলে। সঙ্গে ইঞ্জিন লাগানো একটি বাইসাইকেল আর লাতিন প্রকৃতি ও জীবনকে জানার আকুল অগ্রহ। বিভিন্ন এলাকার নানা রকম মানুষের নানা রকম জীবন-যাপন- চিন্তা -চেতনা তাকে নতুন কিছু ভাবতে শেখালো, ধরা পড়ল চলমান সমাজের নানা সীমাবদ্ধতা। ডায়েরিতে লিখলেন,“আমার মধ্যে নতুন এক ধারণা জন্মাচ্ছে ও রুপ নিচ্ছে তা হলো এই সভ্যতাকে ঘৃণা করা। বিশাল হৈচৈ আর হট্টেগোলের মধ্যে লোকোমোটিভ ইঞ্জিনের মতো শহরে যান্ত্রিক মানুষদের উদ্ভট জলছবি এক শান্তি বিঘ্নকারী জঘন্য চরিত্র”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাল ফৌজের কাছে জার্মানির পরাজয়, চীনে মাও সে তুং –এর গেরিলা নেতৃত্ব ও বিজয় তাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। নিজেকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী মনে করতেন। ১৯৫১ সালে তার ভ্রমণ আপাত শেষ করে আবার ডাক্তারি পড়ায় মন দেন।

১৯৫৩ সালে পড়াশুনা শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না লাতিন আমেরিকা ঘুরে-বেড়ানোর কাজ। মা সেলিয়ার আকুতি –মিনতি তাকে ক্ষান্ত করতে পারেনি। এবার যাত্রা গুয়েতেমালা। সঙ্গী মেডিকেল কলেজের বন্ধু কালিকো। চে’র ভ্রমণটাকে অমরা নিছক ঘুরে বেড়ানো ধরলে ভ’ল হবে। আসলে সে সময়টাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার সস্পদ- সম্পত্তি লুন্ঠনের চূড়ান্ত মাত্রায় ছিল। সরকারগুলো ছিল পুতুল সরকার । জনগণ ছিল নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত। গুয়েতেমালা, বলিভিয়া, চিলি, কিউবা, ভেনিজুয়েলা কোন দেশই আমেরিকার কব্জার বাইরে ছিল না। চে এ করুণদশাগুলো নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন। তবে এবার প্রয়োজনে রাজনীতিতে জড়িয়ে করতে হবে এমন বাসনাও ছিল।
১৯৫৩ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখ ফিদেল ক্যাস্ত্র’র নেতৃত্বে একদল তরুন বিপ্লবী কিউবার তৎকালীন স্বৈরশাসক বাতিস্তার বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে সান্তিয়াগো শহরের কাছে মানকাদা ব্যরাকে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ফিদেল ক্যাস্ত্র ও তার ভাই রাউল ক্যাস্ত্র’র জেল হয়ে যায় এবং দেশ ছাড়েন অনেক বিপ্লবী। তাদেরই একজন নিকো। নিকোর সঙ্গে এবং কিউবান অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে অনেক ভাব হয়। নিকোই আর্নেস্তোকে ‘চে’ নামে সম্বোধন করেন। সেই থেকে আর্নেস্তো গুয়েভারা আজতক পৃথিবীর মানুষের মনে জায়গা করে নিলেন চে গুয়েভারা হিসেবে।

হিলদা নামের একটি মেয়ে মেক্সিকোতে চে’কে কিউবান বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। হিলদার কথা একটু বলতে হয়। চে তার ভ্রমণকালে লািতন আমেরিকার পেরু, এল সালভেদর, কোস্টারিকা, পানামা, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ঘুরে বেরিয়েছেন। হিলদা পেরুর মেয়ে। সেখানকার মার্ক্সবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। রাজধানী চিলিতে চে’র সঙ্গে দেখা এবং সেসময় থেকেই বন্ধুত্ব। অভিজাত পরিবারের ডাক্তার-বুদ্ধিমান ছেলে সব কিছু ছেড়ে গরীবদের কথা ভাবছে-এ ছিলো হিলদার চে’কে ভালো লাগার কারণ। হিলদাকে পরে চে বিয়ে করেন। মেক্সিকোতেই ১৯৫৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী হিলদা- চে’র প্রথম কন্যা হিলদিতার জন্ম হয়।

হিলদা আর হিলদিতাকে নিয়ে তথাকথিত সুখী সংসার দিয়েই গল্পের শেষ হতে পারতো কিন্তু তাতে করে বিশ্ববিপ্লবী চে’র জন্ম হতো না। তা কী করে হয়! ক্যস্ত্রো’র সাথে সাক্ষাৎ-এর পর থেকেই চে নিজেকে ক্যাস্ত্রোর দলের সাথে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেললেন। প্রশিক্ষণ শিবিরে চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন। পুরোপুরি সক্রিয় বিপ্লবী যেমনটি হয়। কিন্তু সমস্যাটা হলো যে, মেক্সিকোতে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও ‘কম্যুনিস্ট’দের বেলায় তা ছিলো না। চে’র গতিবিধি-আচার- আচরণে সামাজিক বিপ্লবের আভাস পেয়েছিলো মেক্সিকান পুলিশ। চে ছিলেন মাও সে তুং-এর অনুরাগী। ব্যস ধরে জেলে পুরে দেওয়া হলো। ক্যস্ত্রোর সামনে কিউবামূখী অভিযান, এমূহুর্তে চে জেলে, তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শেষতক পুলিশের সাথে একটা রফা করে চে’কে জেল থেকে বের করে আনা হলো । কিন্তু শর্ত ছিলো চে’কে মেক্সিকো ছাড়তে হবে। চে ভাবলেন অন্য কোথাও গেলে তো হবে না তাঁকে যেতে হবে কিউবার যুদ্ধে।

যুদ্ধযাত্রায় সবমিলিয়ে বিরাশিজন, চে একাই আর্জেন্টাইন বাকিরা সব কিউবান। ভরসা হালকা নৌযান ‘গ্রানামা’। কিউবার সিয়েরে মায়েস্তায় যাবার সিদ্ধান্ত হলো । এখানকার জনগণ ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবকে সমর্থন করে এবং ২৬ জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করে। দিনক্ষণ ঠিক হলো ১৯৫৬ সালের ১৫ নভেম্বর। সেমতে রওনাও হওয়া গেল কিন্তু প্রকৃতি এতটাই বিরুপ ছিলো যে পাঁচ দিনের পথ পাড়ি দিতে হলো সাত দিনে। কিন্তু সমস্যাতো বিলম্ব না , সমস্যা হলো বাতিস্তা সরকারের কাছে এ অভিযানের খবর পৌঁছে যায়। তাই কিউবান তীরে পৌঁছানের সাথে সাথে বিমান হামলা শুরু হয়ে যায় এবং এত করে বিরাশি জনের মধ্যে ষাট জনকেই বাতিস্তার সরকার মেরে ফেলে। দিকবিদিক ছুটো ছুটি করতে গিয়ে চে’র ঘাড়েও গুলি লাগে । জখম নিয়ে চে যখন এক কৃষকের বাড়িতে অন্যান্য যোদ্ধাদের সাথে মিলিত হন তখন তারা ক্যস্ত্রোসহ মাত্র বারজন।
শসস্ত্র সংগ্রামের সফলতার একটি বড় দিক হলো জনসম্পৃক্ততা। এটা চে এবং ক্যস্ত্রোর অজানা ছিলো না। হয়তো এজন্যই সিয়েরা মায়েস্তা । অঞ্চলটি হয়ে ওঠে ছোট খাটো একটা ক্যন্টনমেন্ট। কয়েকটি বাহিনীর মধ্যে চতুর্থটর নাম ছিলো ,‘শত্রু বিভ্রান্ত করার বাহিনী’। এই বাহিনীর কমান্ডেন্ড নিযুক্ত করা হয় চে গুয়েভারাকে কী হয় না এখানে- জুতা, চুরুট, পাউরুটি, কার্তুজের বেল্ট আরো কত কী! প্রতিষ্ঠিত হয় জেলখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা, ট্রেনিং সেন্টার, স্কুল, রেডিও সেন্টার। এসবই পরিচালিত হয় স্থানীয় জনগণ এবং ২৬ জুলাই আন্দোলনের কর্মী দ্বারা। যুদ্ধ পরিচালনায় আর্থিক সহায়তা দিত স্থানীয় জোতদাররা। আক্রমনে জয় পরাজয়ের ভিতর দিয়ে ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে স্বাধীন অঞ্চল যা চে আর ক্যস্ত্রোর নিয়ন্ত্রনে থাকে। ১৯৫৮ সারের ১৬ ডিসেম্বর চে তাঁর বাহিনী নিয়ে ধ্বংস করে দেয় শান্তাক্লারার রেল ও সড়ক সেতু। বাতিস্তার বাহিনীও থেমে থাকেনি। অবিরাম বিমান আক্রমণ চালিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও চে’ বাহিনীই জয়লাভ করেছে, আত্মসমর্পণ করেছে বাতিস্তার বাহিনী।

‘জয় আমাদের সুনিশ্চিত’- চে’র এ ঘোষনা শোনার পর কিউবার জনগণকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাত্র চৌদ্দ দিন। স্বৈরাচারী বাতিস্তার পতন ঘটে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি। লাতিন আমেরিকায় মার্কিনীরা প্রথম বারের মতো মাথা অবনত করে আর বাতিস্তা তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান ডোমিনিকান রিপাবলিকে। কিউবা এখন মুক্ত। চে নিযুক্ত হন শিল্পমন্ত্রী এবং স্টেট ব্যাংকের প্রধান। কিন্তুু চে’র কথা হলো শুধু কিউবা নিয়ে ভাবলেই হবে না, ভাবতে হবে সমগ্র লাতিন আমেরিকা তথা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষদের কথা। রাশিয়ার গোয়েন্দারা চে’ কে “কৌশলগত ভয়ংকর” হিসেবে বিবেচনা করতো। চে’র এই কঠোর নীতির কারণে তাঁর মা সেলিয়াকেও তিন মাস জেল খাটতে হয়েছিলো।
তাই কিউবান সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কীভাবে লাতিন আমেরিকা থেকে মার্কিন প্রশাসনের দালালদের উৎখাত করতে হবে সে বিষয়টি সর্বদাই মনে জাগ্রত ছিলো। কিন্তু শুধু মনে জাগ্রত থাকলে তো চলবে না, বাস্তব রূপ দিতে হবে। তাহলে উপায় তো একটাই- চে’কে কিউবা ছাড়তে হবে। ছেড়েও দিলেন কিউবা, পড়ে রইল মন্ত্রিত্ব। তাকে লাতিন আমেরিকা জয় করতে হবে, হবে সাধারণ মানুষের মুক্তির ব্যবস্থা।
১৯৬৫’র এপ্রিল থেকে তাকে আর হাভানায় দেখা যায়নি। কোথায় গেলেন তিনি? নির্দ্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেন না। তবে তানজানিয়া, কঙ্গো, জার্মানিতে তার কর্মকান্ডের অনেক নজিরের কথা শোনা যায়। নিশ্চিত হওয়া গেল যখন মার্কিন গোয়েন্দারা চে’কে ঘিরে ফেলল বলিভিয়ার একটি গ্রামে। সেখানেই তাকে কাপুরুষের মতো হত্যা করা হয়।
বিশিষ্ট লেখক মনির জামান চে’র শেষ দিনটাকে লিখেছেন এভাবে-“ ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ সম্পূর্ণ মানুষটিকে গুলি করা হয় উনচল্লিশ বছর বয়সে। কিন্তু এ থেকে জন্ম নেয় এক কিংবদন্তী... আজ বিশ্বের ঘরে ঘরে বিপ্লবের উজ্জল নাম চে। আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।”
হে মহান, তোমার নব্বইতম জন্মদিনে নিপিড়িত মানুষের লাল সালাম।

লেখক: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক।

এসএইচ/

 

 

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি