ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই, ২০১৮ ১৬:১৮:৩২

Ekushey Television Ltd.

ছাত্রলীগের সম্মেলন: শেষ মুহূর্তে আলোচনায় যারা

আলী আদনান

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:০২ পিএম, ১০ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৬:৫০ পিএম, ১৩ মে ২০১৮ রবিবার

রাত পোহালেই শুরু হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দেশের লাখ লাখ তরুণ তাকিয়ে আছে ঘড়ির কাঁটার দিকে। কখন শুরু হতে যাচ্ছে সেই উত্তেজনাকর সময়? হ্যাঁ বলছি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সম্মেলনের কথা।

সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নানা জল্পনা কল্পনা, প্রস্তুতি, ব্যস্ততা চললেও সবার মূল আলোচনার বিষয় নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে। কারা আসছেন নতুন কমিটির নেতৃত্বে? কে কে হবেন ছাত্রলীগের আগামী দিনের কান্ডারী?

সময় যতো ঘনিয়ে আসছে পদপ্রত্যাশীদের দৌড় ঝাঁপ ততোই বাড়ছে। নিজ নিজ বলয়ে চলছে লবিং গ্রুপিং। নিজ নিজ অনুসারীদের নেতৃত্বে আনতে আওয়ামী লীগ নেতারা যেমন ব্যস্ত তেমনি নেতাদের মন জোগাতেও ব্যস্ত পদ প্রত্যাশীরা। তবে অনেকেই বলছেন, যতোই দৌড় ঝাঁপ চলুক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

♦শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের নানা কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভীষণ বিরক্ত। বিশেষ করে ছাত্রলীগে ব্যাপক অনুপ্রবেশের অভিযোগ থাকায় তিনি কারো উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। ইতোপূর্বে সাবেক ছাত্র নেতারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখলেও এবার তাদেরকেও কাছে ঘেঁষতে দেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেক্ষেত্রে নিজেই ছাত্রলীগের মূল নেতৃত্ব বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

ইতোপূর্বে বিভিন্ন সভা সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্ন মেধাবী ও ছাত্রত্ব আছে এমন নেতৃত্ব বাছাইয়ের পাশাপাশি পারিবারিক ঐতিহ্যকে বিবেচনায় আনতে বলেছিলেন। তবে তার সে নির্দেশ যে কথার কথা নয় তা টের পাওয়া যাচ্ছে এখন। সারা দেশ থেকে যারাই ছাত্রলীগের পদ প্রত্যাশী হয়েছেন তাদের সবাইকে সিভি পাঠাতে হয়েছে গণভবনে। সেই সিভি যাচাই বাছাই হচ্ছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়ে। তার পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া জরিপে খতিয়ে দেখা হচ্ছে পদপ্রত্যাশীদের অতীত কর্মকাণ্ড।

♦সিন্ডিকেটের অসহায়ত্ব ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ

 দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগে একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবারের সম্মেলনে ছাত্রলীগ সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাস মুক্ত হচ্ছে বলে বিশ্বাস করছে অনেক নেতাকর্মী। পদ প্রত্যাশী এক নেতা এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, আগে একটি সিন্ডিকেট নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দিতো বিধায় সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা পদপ্রত্যাশী হতে সাহস পেতোনা। নেতানা আঞ্চলিকতা, গ্রুপিং ও নিজের অনুগত যে দু`জনকে নির্বাচিত করতো অন্যরা তাদের পেছন পেছন ছুটতো। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী নিজে নেতৃত্ব নির্ধারণের দায়িত্ব নেওয়ায় ছাত্রলীগের সাধারণ নেতা কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রবল উৎসাহ। জানা গেছে গত বেশ কয়েকটি সম্মেলনের তুলনায় এবারের সম্মেলন বেশ উৎসবমুখর। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৩৪৫ জন। যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে সাধারণ নেতা কর্মীদের দাবি।

♦ বয়স নিয়ে সংশয় কাটেনি এখনো

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠণতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগ করার বয়স অনূর্ধ্ব ২৭। গত সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্ধারণের সময়ও এই বয়স কাঠামো বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। তবে এবারের সম্মেলনে বয়স অনূর্ধ্ব ২৭ নাকি ২৯ হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন নি কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদ প্রত্যাশী ক্ষোভের সাথে বলেন গঠণতন্ত্র যেমন ২৭- এর কথা লিখেছে তেমনি দুই বছর পর পর সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু দুই বছর পর পর তো সম্মেলন হয়নি। তাহলে আমরা কী দোষ করলাম। এই অভিযোগে সুর মিলিয়েছেন বয়স ২৯ এর কোটায় কিন্তু পদ প্রত্যাশী এমন বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা। বয়স নিয়ে সংশয় না কাটা পর্যন্ত নেতৃত্বের ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না অনেকেই। বয়স অনূর্ধ্ব ২৭ নাকি ২৯ হবে তা একান্তই নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর। তবে বেশ কয়েকজন আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা বিবেচনায় সভাপতি পদটি অনূর্ধ্ব ২৯- এর কোটা থেকে আসতে পারে।

♦প্রাধান্য পাচ্ছে আঞ্চলিকতা

দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যতো সমালোচনাই হোক না কেনো এবারো মূল নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এতে সন্দেহ নেই। এব্যাপারে একমত হয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও। গোপন সূত্রে জানা যায় গতকাল (৯মে) আওয়ামী লীগের দলীয় সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ ৩/এ-এর কার্যালয়ে একত্রিত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মণি, আবদুর রহমান, মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিম, এনামুল হক শামীম, দপ্তর সম্পাদক আবদুর সোবহান গোলাপ এসময় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে কী আলাপ হয়েছিল তা  বিস্তারিত জানা না গেলেও ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলাপ হয়েছে বলে জানান বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা। সেখানে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা বিবেচনায় কে কে আসা উচিত এমন প্রসঙ্গের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে বেশ কয়েকজন নেতা কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রধান দুটি করে চারটি পদের জন্য উত্তরবঙ্গ, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা এলাকা থেকে নেতৃত্ব নির্ধারিত হতে পারে বলে আলাপ আলোচনা করেন। তবে সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকায় বৈঠকে নেতারা শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানা যায়।

♦ কারা খেলছেন ফাইনাল খেলা?

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক-এই দু’টি পদের বিপরীতে ৩৪৫ টি ফরম বিক্রি হলেও সবাই কিন্তু শেষ মুহুর্তের আলোচনায় নেই। বরং নানা বিবেচনায় আলোচিত নামের তালিকা সংকুচিত হতে হতে তা এসে ঠেকেছে জনা কয়েকের তালিকায়। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজন, রুহুল আমিন, আদিত্য নন্দী, চৈতালি হালদার চৈতি, আইন সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয়, শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, প্রচার সম্পাদক সাইফুদ্দিন বাবু, বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার পারভেজ আরিফিন, সহ সম্পাদক জায়েদ বিন জলিল, সদস্য রেজুয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক হোসাইন সাদ্দাম, স্কুলছাত্র বিষয়ক উপ-সম্পাদক সৈয়দ আরাফাত, উপ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফুজ্জামান ইমরান, ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক ইয়াজ আল রিয়াদ, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শামীম, স্কুলছাত্র বিষয়ক উপ-সম্পাদক খাজা খায়ের সুজন, পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম হাবিবুল্লা বিপ্লব, সহ সম্পাদক খাদিমুল বাসার জয়, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক রাকিব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক হওয়া সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন প্রিন্স, বেগম সুফিয়া কামাল হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বুলবুল, স্যার এ এফ রহমান হলের সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক রানা হামিদ, দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার শাহজাদা, সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুল পাঠান সেতু, উপ-স্কুলছাত্র বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার বৈদ্য, জিয়া হলের সাবেক সভাপতি আবু সালমান প্রধান শাওন। তবে আলোচিত পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। সেসব প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি এড়াবে না বলে অনেকের বিশ্বাস।

♦পদ প্রত্যাশীরা কী ভাবছেন?

বর্তমান কমিটির সহ সম্পাদক এবারের সম্মেলনে পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত জায়েদ বিন জলিল বলেন, ছাত্রলীগে দীর্ঘদিন ধরে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হলেও সেই ভোটাভুটির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সাহস অনেকে পেতোনা। কারণ, সবাই বুঝতো ভোটের ফলাফল একটি অদৃশ্য প্লাটফর্ম নির্ধারণ করে। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার কথা শুনে ছাত্রলীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা উৎসাহী হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে দুটি পদের বিপরীতে ৩৪৫ টি ফরম বিক্রি হয়েছে। জায়েদ বিন জলিল এ সময় এ প্রতিবেদককে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে কাজ করার সুযোগ দেন তাহলে আমি ছাত্রলীগের অতীতের গৌরব ফিরিয়ে আনতে লড়াই করবো। ছাত্রলীগ কেন কারো পেছনে শোডাউন করবে, কোন বিনা প্রয়োজনে রাতের বেলায় ক্যাম্পাসে মহড়া দিবে-এমন প্রশ্ন তোলেন এই ছাত্রনেতা। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগ করাটা গৌরবের। নেত্রীর সিদ্ধান্ত আমার কাছে প্রথম ও শেষ কথা।

ছাত্রলীগের এবারের সম্মেলনে পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে প্রথম দিকের আলোচনায় আছেন বর্তমান কমিটির সহ সভাপতি চৈতালী হালদার চৈতী। ছাত্রলীগের ইতিহাসে এখনো মূল দায়িত্বে নারী নেতৃত্ব না আসায় (মারুফা আক্তার পপি ২০০৪ সালে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাল করেছিলেন) নানা বিবেচনায় এবার মূল দায়িত্বের কোনো একটিতে আসতে পারেন তিনি এমনটাই মনে করছেন অনেকে। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে চৈতী বলেন, "জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আমার আদর্শ, আমার মডেল। আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছি। আজীবন রাজনীতি করতে চাই।”

চৈতী এসময় আরো বলেন, আমাদের দেশের মেয়েরা রাজনীতি বিমূখ। একজন মেয়ে হিসেবে ছাত্রসমাজকে ছাত্রলীগের পতাকা তলে আনার পাশাপাশি মেয়েদের মাঝে ছাত্রলীগের ঘাঁটি শক্তিশালী করতে কাজ করবো।"

ছাত্রলীগের সম্মেলনে এবারের পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে অন্য আরেকজন হলেন কেএম ইমরান। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের একটা সোনালী অতীত আছে। আমি সেই অতীত ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে চাই। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দাবি দাওয়া নিয়ে কাজ করতে চাই। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা যেনো ছাত্রলীগের উপর আস্থা রাখতে পারে সেই ইমেজ গড়ে তুলতে লড়াই করবো।

যতো জল্পনা কল্পনাই চলুক না কেনো, ছাত্রলীগের মূল নেতৃত্ব নির্ধারণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তিনি কাদের দিচ্ছেন সেই গুরু দায়িত্ব তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে হয়তো আরো একদিন বা কয়েকদিন।

টিকে



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি