ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ৭:৩০:১৯

দেশের পারমাণবিক ক্ষেত্র, এখনি ভাবার সময়

মো. শফিকুল ইসলাম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৬:২৭ পিএম, ১১ জুন ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০৯:০৪ এএম, ৪ জুলাই ২০১৭ মঙ্গলবার

১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজ্যান হাওয়ার্সের ‘এটমস ফর পিস’বক্তৃতা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু শক্তি ব্যবহারে বিশ্ববাসী যে মানবিক বির্পযয়ে ছিল তা থেকে দৃষ্টি সরানো। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি কীভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে আস্থায় আনা। এছাড়া পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক প্রযুক্তি যাতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয় সে লক্ষে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) প্রতিষ্ঠা করা।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৭ সালে অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আইএইএ আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৯৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনসহ ৫টি দেশের সমন্বয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধকল্প চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে এ পাঁচটি দেশ নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র অধিকারী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। অতপর আইএইএর মাধ্যমে ৫ মার্চ ১৯৭০ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য সকল দেশকে আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে আইএইএর সদস্যপদ লাভ করে, কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয় ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ৩১শে আগস্ট ১৯৭৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিটি মূলত: পারমাণবিক জ্বালানি অতিমাত্রায় সমৃদ্ধিকরণ থেকে নিবৃত্তকরণ, নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তিপূর্ণ প্রয়োগ-এ তিনটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৯১টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং এখনও স্বাক্ষর করেনি ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল। উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করলেও ঘোষণা দিয়ে তাঁরা চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার-১৫, ১৯৭৩ এর মাধ্যমে দেশে পরমাণু শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন গঠন করেন। যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আদলে দেশে পরমাণু গবেষণাগার তৈরির জন্য সাভারে ২৬৫ একর জমি বরাদ্দ দেন এবং সেখানে পরে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের বৃহত্তর পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অত:পর এ প্রতিষ্ঠানেই ১৯৮৬ সালে স্থাপন করা হয় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি।

আইএইএর প্রধান অঙ্গগুলো হচ্ছে সাধারণ সম্মেলন, নিয়ন্ত্রক সভা ও মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সচিবালয়। সাধারণ সম্মেলনে বছরে একবার এক সপ্তাহের জন্য নীতি নির্ধারণের কাজে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ মিলিত হন। তবে নিয়ন্ত্রক সভা সারা বছর ধরে একাধিকবার মিলিত হয়ে সংস্থার সনদ অনুযায়ী নীতি নির্ধারণীমূলক সকল প্রকার কাজকর্মের নিয়মিত নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। আইএইএর প্রধান কার্যক্রম হলো ১৬৮ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু মানব কল্যাণে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে-

 

১. পারমাণবিক উপাদান ব্যবহার ও এতদ্সংক্রান্ত কার্যকলাপ শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের লক্ষে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সংস্থার আইনসম্মত চুক্তির ভিত্তিতে পরিদর্শন;

২.নিরাপত্তার মান নির্ধারণ, নিয়ম ও নির্দেশাবলি প্রস্তুতকরণ এবং সেগুলোর প্রয়োগে রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা প্রদান;

৩.শক্তি, কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পারমাণবিক পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান।

বর্তমানে বিশ্বের ৩০টি দেশে ৪৪৯টি পারমাণবিক চুল্লি চালু রয়েছে, ৬০টি নির্মাণাধীন, ১৬০টি পরিকল্পনাধীন এবং আরও ৩২০টি প্রস্তাবনাধীন রয়েছে। এছাড়া সাবমেরিনে যুক্ত পারমানবিক চুল্লি ও গবেষণা চুল্লি বিবেচনায় নিলে বিশ্বে প্রায় এক হাজারটি পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে। থ্রি-মাইল আইল্যান্ড (১৯৭৯), চেরনোবিল (১৯৮৬) ও ফুকুশিমার (২০১১) পারমাণবিক দুর্ঘটনা বিশ্ববাসীকে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকে অনাস্থায় ফেলে দিয়েছে সত্য, কিন্তু প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে পারমাণবিক প্রযুক্তি একটি পরীক্ষিত ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে কারিগরি ত্রুটি, মানবভুল ও প্রকৃতির বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে প্রয়োজন নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার যা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।

সদস্যপদ লাভ থেকেই বাংলাদেশ আইএইএ’র সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আইএইএ কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এ যাবৎ মোট ১৩৮টি জাতীয় প্রকল্প এবংআঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তির অধীনে ১১১টি আঞ্চলিক প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। আইএইএর কারিগরি সহযোগিতায় পরমাণু শিক্ষা ও গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন, পানিতে আইসোটোপ কৌশল প্রয়োগ, পরিবেশ সুরক্ষা, নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিংয়ের মতো শিল্প সহায়তা, শস্য ও গবাদি পশুর উন্নয়ন এবং পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। এ ছাড়াও আইএইএর কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) এর উচ্চ ফলনশীল জাত ও লবণাক্ত সহিষ্ণু শষ্য জাতের উন্নয়ন ও উদ্ভাবন এবং দেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর ফলশ্রুতিতে বিনা ১৩টি শস্য প্রজাতির উন্নয়নে নিউক্লিয়ারসহ বিকিরণ এবং অন্যান্য অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ১৫টি সরকারি নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্র এবং ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ৪ লাখেরও বেশি রোগীকে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতি সম্প্রতি ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে।

চলতি বছরের ৩০ মে-১ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ভিয়েনায় আইএইএর কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করে দেশের এ সমস্ত অর্জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। তিনি পারমাণবিক শক্তিকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে বিদ্যুতের সবচেয়ে টেকসই উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাই বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে রূপপুর থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দুই হাজার চারশ মেগাওয়াট ছাড়াও ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পারমাণবিক উৎস থেকে আরও দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে সরকারের।

১৯৮৬ সালে আইএইএর মহাপরিচালক হেন্স ব্লিক্স সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সফর করেন। এরপর ২০১০ সালে ইউকিয়ো আমানো বর্তমান সরকারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দৃঢ়সংকল্প ব্যক্তকরণের পর বাংলাদেশ সফরে আসেন। তিনিই আবার আগামী ৩-৪ জুলাই দুইদিনের সফরে বাংলাদেশে আসবেন।

পরমাণু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল একটি জটিল, স্পর্শকাতর ও পেশাদারিত্বের বিষয়। এ ধরনের প্রযুক্তি রপ্ত করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অপরদিকে, পরমাণু প্রকৌশলবিদ্যা মানব কল্যাণে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বহুশাস্ত্রীয় উচ্চ প্রযুক্তি বিধায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় সুদৃঢ় ভৌত অবকাঠামো, পরমাণু আইন, রেগুলেসন, পেশাদারী স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, দক্ষ ও পেশাদার জনবলের প্রয়োজন। নিন্মে প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিবেচনায় এনে আইএইএর মহাপরিচালকের সাথে মত বিনিময় করলে বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার ভীত মজবুত হতে অনেকটা সহায়ক হতে পারে।

১. বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আইএইএ সেইফগার্ডস দ্রুত বাস্তবায়ন বিষয়ে সহায়তা প্রদান;

২.পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের রেগুলেশন, সেইফটি, সিকিউরিটি ও সেইফগার্ডস সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরণের কারিগরি গাইড তৈরিতে সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা প্রদান;

৩. পারমাণবিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নতকরণে সহায়তা প্রদান;

৪. দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন;

৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণে সহায়তা প্রদান।

আশা করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইউকিয়ো আমানোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষা এবং গবেষণা অধিক গুরুত্ব পাবে।

 

লেখক: ড. মো. শফিকুল ইসলাম,

চেয়ারম্যান, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি