ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭ ৩:২০:১০

নূর হোসেন চত্বর কি শুধু কাগজেই?

আলী আদনান

প্রকাশিত : ০২:৫৭ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার | আপডেট: ০৫:১৬ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার

ফুলে ফুলে ঢাকা পড়েছে চত্বরটা। স্তুপের নিচে মূল বেদি। খন্ড খন্ড মিছিল আসছে। মিছিলগুলোর আয়তন বড় জোর পনের বিশ জনের। ফুল দেওয়ার পর তাদের বড় নেতা কথা বলছেন টিভি ক্যামেরার  সামনে। এই সুযোগে আলাপ করলাম মিছিলের শেষের একজনের সাথে। তার নাম রইছ উদ্দিন। পেশায় দোকানদার। জানতে চাইলাম, এই সকালে এখানে কেন এসেছেন? পানের পিক ফেলে উত্তর দিলেন, নূর হোসেন দিবসে ফুল দিতে এসেছি। জানতে চাইলাম, নূর হোসেন কে? পানের রঙে রাঙ্গা মুখখানা লজ্জিত করে বললেন, আমি নিজেও জানিনা নূর হোসেন কে। আবার জানতে চাইলাম, এই জায়গাটাকে কী বলা হয়? এবার এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন এমন বোকার মত প্রশ্ন আমার মত পরিষ্কার জামা কাপড় পড়া ছেলের কাছে আশা করা যায় না। বললেন, জিরো পয়েন্ট।

১৯৮৭ সালের এই দিনে তখনকার ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একজন যুবক বুকে পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। মিছিলটি তখন জিরো পয়েন্টে পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হন নূর হোসেন। রাজপথে জ্বলে উঠে আগুন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। ইতিহাসে তিনি হয়ে যান অমর। একজন সাধারণ যুবক মুহূর্তে হয়ে উঠেন অসাধারণ। নূর হোসেন আজ শুধু একটি নাম নয়, বরং একটি চেতনা।

নূর হোসেনের মৃত্যু বৃথা যায়নি। তার মৃত্যুর ফলে জ্বলে উঠা আগুনেই একসময় পতন হয় এরশাদ সরকারের। পরবর্তীতে সরকারগুলো প্রথমে ১০ নভেম্বর দিবস ও পরে শহীদ নূর হোসেন দিবস হিসেবে এদিনটিকে স্বীকৃতি দেয়। তিনি যেখানে নিহত হয়েছিলেন, সেই জায়গাটিকে শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার হিসেবে নামকরণ করা হয়।

কিন্তু শুধুমাত্র কাগজপত্রেই আটকে আছে নূর হোসেন স্কয়ার নামটি। সাধারণ মানুষ এ জায়গাটিকে চেনেন জিরো পয়েন্ট হিসেবে। শুধু তাই নয়, এ প্রজন্মের কাছেও নূর হোসেন অপরিচিত নাম। আবার অনেকে নূর হোসেনের নাম শুনলেও তার সম্পর্কে আর কিছুই জানেন না। আবার যারা জানেন, তাদের সেই জানাগুলো ভুল বা বিকৃত জানা। সাধারণ অল্পশিক্ষিত মানুষই শুধু নয়, বরং অনেক শিক্ষিত লোক, ছাত্র ছাত্রী বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও নূর হোসেন সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না।  

কথা বললাম ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খেতে থাকা যুবক রাসেলের সাথে। রাসেল পেশায় শ্রমিক। তিনি বললেন, আজ নাকি নূর হোসেন দিবস। তাই এত মানুষ ফুল নিয়ে আসছে। বড় বড় নেতারা আসছে। তার কাছে জানতে চাইলাম, নূর হোসেন কে? উত্তরে বললেন, আছিল এক বড় নেতা। গুলি খাইয়্যা মরছে। কেন গুলি খেয়েছিল জানতে চাইলে বললেন, রাজনীতি করত, গন্ডগোলে মরছে।

নূর হোসেন চত্বর সংলগ্ন একটি অফিসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরি করেন জসিম উদ্দিন। বাড়ি নোয়াখালীরে চৌমুহনী। তার কাছে জানতে চাইলাম, নূর হোসেন কে? বললেন, কইতে পারুম না। তয় প্রতিবছর দেখি মানুষ এখানে এসে ফুল দেয়। সাংবাদিকরা আসে, ছবি তোলে। জায়গাটার নাম জানতে চাইলে শীতের অলস কণ্ঠে জবাব দিলেন, জিরো পয়েন্ট।

ফরিদাবাদ মাদ্রাসার দু’জন ছাত্র রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। জানতে চাইলাম নূর হোসেন সম্পর্কে। সহজভাবেই উত্তর দিলেন, কখনো এমন নাম শুনেন নি। একজন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলেন, নারায়ণগঞ্জে একজন নূর হোসেন আছেন। খুনের মামলার আসামী।

মোড় সংলগ্ন ফুটপাতের একটি দোকান আব্দুর রহিমের। নিজ মুখে স্বীকার করলেন, পনের বছর গুলিস্তানের সাথে তার সর্ম্পক। তিনিও অন্য অনেকের মত দাবি করলেন জায়গাটির নাম জিরো পয়েন্ট। তবে তিনি কখনো নূর হোসেন নাম শোনেননি।

রোদ বাড়ছে। মোড়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছেন এক তরুণী। আলাপ করতে করতে জানা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন ত্রাণ-দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। তিনি বললেন, নূর হোসেন নাম শুনেছি। মাঝে মধ্যে টিভিতে দেখায়। ঐ যে বুকে পিঠে লেখা ছিল… পুলিশের গুলিতে মারা গেল…টিভিতে দেখায়তো...।

বিশ্ববদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীও দাবি করলেন জায়গাটির নাম জিরো পয়েন্ট। তবে সহজভাবে লোকেশান বোঝানোর জন্য জিপিও-র সামনে বলা হয়।

খুব ব্যস্ত ভঙ্গিমায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাস্তা পার হচ্ছিলেন দুই নারী নেত্রী। সালাম দিয়ে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম, নূর হোসেন সম্পর্কে। তাদের একজন বললেন, নূর হোসেন নেতা ছিলেন, বড় নেতা। আজকের এই দিনে তিনি বুকের রক্ত ঢেলে রাজপথ ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন। তাই আজকের এই দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উন্নয়নের রোল মডেল...বাধ্য হয়েই থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেশ করলাম, এই জায়গাটির নাম কী? তার উত্তেজনার রেশ তখনো কাটেনি। সেই ভঙ্গিমায় জবাব দিলেন, জিরো পয়েন্ট!

কেন নূর হোসেন বা নূর হোসেন স্কয়ার নিয়ে এমন উদাসীনতা বা বিভ্রান্তি তা জানতে কথা বলেছি গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি’র সাথে। তিনি বলেন, নূর হোসেন একটি আন্দোলনের প্রতীক ও সচেতনভাবেই তিনি আদর্শিক রাজনীতির ধারা বহন করেন। কিন্তু এখন রাজনীতি একটি নির্দিষ্ট বলয়ে বন্দী, মনগড়া স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রিড়ানকে পরিণত হয়েছে ইতিহাস। ফলে নূর হোসেনের আত্মাহুতি অনেকের কাছে সাধারণ বিষয়। যেখানে চেতনা ধারণ করা হয়নি সেখানে ব্যক্তি আসবে কোত্থেকে? চেতনাই তো নূর হোসেন কে অসাধারণ করেছে।

নূর হোসেন স্কয়ারে ফুল দিতে এসেছিলেন, ফিমেল এডুকেশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জিনাত রেহানা ইলোরা। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পঙ্গু। তার উপর আমরা ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। গণমাধ্যম এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেনা। আমাদের একাডেমিক সিলেবাস সিস্টেমকে ঢেলে না সাজালে এবং জাতিগত দর্শনে সবাই এক না হলে এ সমস্যা উত্তোরণ সম্ভব নয়।

যার রক্তদান একটি আন্দোলনকে টেনে নিয়ে স্বৈরাচারের গদিতে আঘাত করেছিল, মাত্র দুই বা আড়াই দশকের ব্যবধানে তিনি হারিয়ে যাবেন বা তার মৃত্যু অন্য অনেকের মত তথাকথিত রাজনৈতিক মৃত্যু হয়ে যাবে তা মেনে নেওয়াটা আমাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। নূর হোসেন শুধু এটি নাম নয়, বরং একটি আন্দোলনের প্রতীক, মুক্তিকামী মানুষের আকাংখার প্রতীক তা নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিষ্ঠা করার এখনই সময়।

এএ/ডব্লিউএন

ফটো গ্যালারি


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি