ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই, ২০১৮ ১:৫৯:১৪

Ekushey Television Ltd.

‘প্রশ্নফাঁস নিয়ে আমরা কেউ অনুতপ্ত হচ্ছি না’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৬:৪০ পিএম, ১০ মার্চ ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০৬:৪১ পিএম, ১০ মার্চ ২০১৮ শনিবার

অধ্যাপক শফি আহমেদ

অধ্যাপক শফি আহমেদ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড বলা হলেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। প্রশ্নফাঁস আজ বড় ধরনের সমস্যা। এই সমস্যার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অনেকটাই উদাসীন বলে মনে করেন অধ্যাপক শফি আহমেদ

অধ্যাপক শফি আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ।

পাঠ্য বই সংস্কার, শিক্ষার মান, শিক্ষক সমস্যাসহ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশ্নফাঁস। এজন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ প্রশ্নফাঁসের ব্যপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যতোটা তৎপর হওয়া দরকার ততোটা তৎপর হচ্ছে না। প্রশ্নফাঁসের জন্য সরকার দায়ী তা আমি বলব না। কারণ, এতে সরকারের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। তবে, শিক্ষা মন্ত্রনালয় ব্যপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন এটাও মনে হচ্ছেনা। আমাদের সমাজে একটা ট্রেন্ড দাঁড়িয়ে গেছে, অন্যায় করলেও নানা ফন্দি ফিকির করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। এর ফলেও অপরাধীরা খুব বেশি ভয় পায় না বা পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিটাই এমন যার ফলে প্রশ্নফাঁস করা সম্ভব হচ্ছে। পরীক্ষা পদ্ধতিটা এমন হতে পারে যাতে প্রশ্নফাঁস করা যাবেনা বা ফাঁস করলেও লাভ হবেনা।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ প্রশ্নফাঁস পুরোপুরি রোধ করা কি সম্ভব?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি প্রশ্নফাঁস রোধ করা সম্ভব। একটা উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রশ্নের প্যাকেট সিলগালা করে রাখা ও পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে না খোলা। দ্বিতীয়ত, দাবি করা হচ্ছে, প্রশ্নের নৈর্ব্যক্তিক অংশ ফাঁস হয়। তাহলে তা একেবারেই আলাদা করে রাখা যায়। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর প্রথমে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন দিয়ে ত্রিশ মিনিটে তা শেষ করে খামবন্ধ করে ফেলা যায়। এরপর বর্ণনামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়া যেতে পারে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা ব্যবস্থার মানকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একদম শেষ হয়ে গেছে তা মনে করি না। মনে করুন আমাদের এবারের পরীক্ষার্থী বিশ লাখ। প্রশ্নফাঁসের ফলে হয়তো পঞ্চাশ ষাট হাজার পরীক্ষার্থী তার ফল পেয়েছে। তাই বলে আমি সাড়ে উনিশ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করব তা হতে পারেনা। কিন্তু নোংরা ব্যাপার হচ্ছে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে তা আমরা জেনে যাচ্ছি এবং এটা নিয়ে কেউ অনুতপ্ত হচ্ছি না। এই  প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে পাস করছি। এই ছেলেমেয়েগুলো এমএ পাস করে যখন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসবে, তখন ইন্টারভিউ বোর্ড বলবে, আপনি যে সময় পাস করেছেন তখন প্রশ্নফাঁস সহজ ব্যাপার ছিল। এতে ওই প্রার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রবর্তন সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসছে। আপনি কী সৃজনশীল পদ্ধতি বাতিল করার পক্ষে?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ না, আমি মোটেও সৃজনশীল পদ্ধতি বাতিল করার পক্ষে নই। বরং আমি মনে করি এটা আধুনিক ও সত্যিকারের পরীক্ষা পদ্ধতি। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি পড়ানোর যে প্রক্রিয়া বা পরীক্ষা নেওয়ার যে প্রক্রিয়া তা সঠিক নয়। অত্যন্ত হাস্যকর একটা ব্যপার, সৃজনশীলেরও গাইড বেরিয়েছে। গাইড বা নোট বইয়ের ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার জন্যই সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল, একজন শিক্ষার্থী সারা জীবন বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাথা খাটিয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারা। কিন্তু এখন দেখি বিভিন্ন স্কুলে ষান্মাসিক বা অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় গাইড বই থেকে সৃজনশীল প্রশ্ন করা হচ্ছে। তার মানে আমরা আমাদের শিক্ষকদেরও শেখাতে পারিনি, সৃজনশীল পদ্ধতিটা কী বা কীভাবে এর প্রয়োগ করতে হয়। পৃথিবীর সব জায়গায় দাঁড়ানোর জন্য, নিজের মেধা খাটানোর জন্য সৃজনশীল পদ্ধতিটা দরকার।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ একটা সময় নকলের জয়জয়কার ছিল। এখন প্রশ্নফাঁসের জোয়ার চলছে। কিন্তু পরীক্ষার্থীরা উপলব্ধি করবে, আমি সৎ থাকব। নকল করব না বা প্রশ্নফাঁস করব না- এমন কোনো বোধ কী তৈরি করা যায়?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ একজন শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী তো আমাদের পরিবারে জন্মায়। আমাদের সমাজেই তার বেড়ে উঠা। সে যদি তার পরিবারে নীতি নৈতিকতার চর্চা দেখে, স্কুলে তার শিক্ষকের মধ্যে আদর্শবোধ ও সততা দেখে, তাহলে তার মধ্যে একটা নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে। দু:খের বিষয় হলেও সত্য আমরা সেই আদর্শবোধ আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জন্ম দিতে পারছি না। এটার জন্য ওরা নয়, আমরাই দায়ী।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষে বিভিন্ন দাবি আসছে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে টেনথ্ গ্রেডের আগে কোনো পরীক্ষা নাই। এখন যে পরীক্ষা হচ্ছে, আগে তাও ছিল না। তার মানে হলো, একজন ছাত্রের বয়স অনুযায়ী তাকে যা দেওয়ার শিক্ষক তা দিচ্ছে ও ছাত্র তা ধারণ করতে পারছে। অতটুকু সততা ও বিশ্বাস ওরা নিজের প্রতি রাখে। আমরাও সেরকম উদ্যোগ নিতে পারি। কিন্তু সেজন্য প্রথম কাজ হবে এখন মান্ধারতার পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ত যেসব শিক্ষকরা আছে তাদের বিদায় দেওয়া। তবে হ্যাঁ, তাই বলে আমি শুধু শিক্ষকদের দোষ দিচ্ছি না।

অভিভাবকরা কী করছেন? এই মাত্র X এর ক্লাস থেকে বেরিয়ে আবার Y এর ক্লাসে যাওয়া, সেখান থেকে Z এর ক্লাসে। এভাবে একটা ছাত্রকে বইয়ের ব্যাগের নিচে সব সময় চাপিয়ে রেখে তার বিকাশের পথটাকেই তো বন্ধ করে দেওয়া হল। এভাবে চলতে থাকলে তো এই প্রজন্ম অসুস্থ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের ছাত্রদের মুখস্থ বিদ্যার দিকে ঠেলে দেই। এটার জন্য আমাদের সিলেবাস দায়ী। যদি আমরা আধুনিক বিশ্বের মতো সৃজনশীল পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে পারতাম, তাহলে কিন্তু ছাত্ররা মুখস্থ করতো না।

এখন বইগুলোতে যা দেওয়া আছে তা মুখস্থ না করে কোন উপায় নেই। আমাদের এখনকার স্কুল বইগুলো পড়ে শিক্ষার্থীরা খুব মজা পাবে তা ভাবার কোন কারণ নেই। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, ওটা মুখস্থই করতে হবে। আবার কিছু কিছু শিক্ষক মনে করছেন, ওই প্রশ্নের উত্তরে ওই অংশটুকুই লিখতে হবে। নয়তো নাম্বার দেওয়া যাবেনা। এভাবে শিক্ষার্থীর বিকাশ হওয়া সম্ভব না।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ ইতোমধ্যে তো বেশ কয়েকবার পাঠ্য বই সংস্কার হয়েছে। এর ফলে কোন সুফল কী আমরা পেয়েছি?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আমি পাঠ্যবই সংস্কারের ব্যপারে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। তারা বলছেন, সংস্কার করছেন। কিন্তু যে সংস্কার হচ্ছে তার কোন ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছেনা। পাঠ্য বইয়ে নাম থাকে খুব বড় বড় লোকের। কিন্তু তারা কতোটা কাজ করেন, তা আমি জানি না। তারা নিজেরাও মাঝে মাঝে স্বীকার করেন, তারা অতোটা কাজ করেন না। পাঠ্যবই সংস্কারে খুব ইতিবাচক ফল না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, খুব তাড়াহুড়ো করে পাঠ্যবই প্রনয়ণ করা। আমি বলি, ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভের বাচ্চাদের বই তৈরি করতে কয়েকজন নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকের অন্তত এক থেকে দেড়বছর সময় লাগা উচিত। আরেকটা ব্যপার হলো বই তৈরির সময় তাদের বয়স, মনস্তত্ব, শিক্ষার্থীদের পারিপার্শ্বিক আবহ- এসব বিবেচনায় আনা। কিন্তু এখন এসব মোটেও বিবেচনা করা হয়না। যে ক্লাসের শিক্ষার্থী বইগুলো পড়বে তাদের নিউট্রিশন লেভেল নিয়েও ভাবা উচিত। যেন তারা তা গ্রহণ করতে পারে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সিলেবাস পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আমাদের সিলেবাসের সূচিপত্রে বৈচিত্র থাকলেও বিষয়বস্তু খুব একঘেয়ে ও বৈচিত্রহীন। যা শুধুমাত্র মুখস্থবিদ্যায় উৎসাহী করে। এর কোন বিশ্লেষণী দিক নেই। একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার- যে ভালো চোর, সে ভালো পুলিশ হতে পারে। কারণ, সে জানে অপরাধ কোন জায়গায় সংগঠিত হতে পারে। এটাই বিশ্লেষণী ক্ষমতা। যা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনুপুস্থিত। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেওয়ার পরও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ, শিক্ষা তার পেশাগত জীবনে ফল দিচ্ছে না। মুখস্থ বিদ্যার দৌড় খুব বেশি নয়। দ্বিতীয়ত, অল্প কিছুদিন পরপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত। একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনমাস খবর নিলাম না। তা হলে তো হবে না। প্রত্যেক শিক্ষককে দশ পনের দিন অন্তর অন্তর একদিনের জন্য হলেও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। কারণ, পৃথিবী প্রত্যেক দিন আপডেট হয়।

একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আপনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা ও একুশে টেলিভিশন পরিবারের প্রতি শুভ কামনা।

/ এআর /



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি