ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭ ৩:২৮:১৩

বিশ্বসেরা পদার্থবিজ্ঞানী বাংলাদেশের আতাউল করিম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০১:৩৩ পিএম, ৬ আগস্ট ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০৮:০৯ পিএম, ৯ আগস্ট ২০১৭ বুধবার

বাংলাদেশের এক সূর্যসন্তান আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের শীর্ষ ৫০ জন গবেষকের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি ড. আতাউল করিম। অপটিক্যাল সিস্টেম, অপটিক্যাল কম্পিউটিং এবং প্যাটার্ন রিকগনিশনে তার অবদান অন্যতম। যারা অ্যাপ্লায়েড অপটিক্সের ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বাধিক অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি ম্যাগলেভ ট্রেনের প্রযুক্তি নির্মাণ করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।

তার গবেষণায় অতীতে ও বর্তমানে অর্থ ব্যয় করছে অপটিক্যাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস, মার্কিন সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী, নাসা, ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট, ন্যাভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি, রাইট প্যাটারসন ল্যাবরেটরি ইত্যাদি প্রথম সারির সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

মোহাম্মদ আতাউল করিমের ১৯৫৩ সালের ৪ মে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথের প্রোভোস্ট এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কর্মরত। তার বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা একজন গৃহিণী, স্ত্রী সেতারা একজন প্রাণরসায়নবিদ।

গবেষণা কর্ম

মোহাম্মদ আতাউল করিমের মোট গবেষণা ৩২৭টি। এর মধ্যে সফল এবং উল্লেখযোগ্য হলো- বায়োফিজিক্স, ননলিনিয়ার ইমেজ প্রসেসিং, ইলেক্ট্রো অপটিকাল ডিসপ্লেইস, অপটিক্যাল কম্পিউটিং অপটিক্যাল ও হাইব্রিড ইলেক্ট্রো অপটিক্যাল সিস্টেমস ডিজাইন, প্যাটার্ন/টারগেট রিকগনিশন, শ্যাওলা থেকে জ্বালানি তৈরি, ইনফরমেশন প্রসেসিং, নাইট ভিশন, ইলেকট্রো অপটিক্যাল সিস্টেম এন্ড সেন্সর ও ম্যাগলেভ ট্রেন।

ম্যাগলেভ ট্রেন

আতাউল করিম ১৯৮৭ সাল থেকে বিভিন্ন রকম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ম্যাগলেভ ট্রেনের প্যাটার্ন আবিষ্কার তাকে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ করে তোলে। আতাউল করিম ভার্জিনিয়ার নরফোকের ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাকালে ম্যাগলেভ ট্রেন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৭ বছর ধরে এ ধরনের একটি ট্রেন তৈরির চেষ্টা করছিলেন, তবে সাফল্যের দেখা পাননি। ড. আতাউল করিম ২০০৪ সালে এই গবেষণা প্রকল্পের সফলতা অর্জন করেন। এরপর মাত্র দেড় বছরে ট্রেনটির প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম হন এবং গবেষণায় পরীক্ষামূলকভাবে সফল হন।

ড. আতাউল করিম শুধু গবেষক নন, একজন ইন্সট্রাকটরও। তার গবেষণা কীভাবে প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হবে এবং কীভাবে বাস্তব রূপ নেবে তার সঠিক ও উপযুক্ত নির্দেশনা তিনি নিজেই দিয়ে থাকেন। যদিও জার্মানি, চীন ও জাপানে ঘণ্টায় ১৫০ মাইলের বেশি বেগে চলমান ম্যাগলেভ ট্রেন আবিষ্কৃত হয়েছে আগেই; তবু ড. করিম যুক্তরাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বকে এমন এক ম্যাগলেভ ট্রেন উপহার দিয়েছেন, যেটি খরচের দিক থেকে খুবই সাশ্রয়ী, দৃষ্টিনন্দন এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন। এই ধরনের ট্রেনের জন্য প্রতি মাইল ট্র‍্যাক বা লাইন প্রস্তুত করতে এর আগে গড়ে খরচ করতে হতো ১১০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ড. আতাউল করিমের নেতৃত্বাধীন দলের আবিষ্কৃত এ ট্রেনে খরচ হবে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ডলার! আকর্ষণীয় এ ট্রেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চালু হওয়ার পর এর চাকা আর লাইনকে স্পর্শ করবে না।

শিক্ষাজীবন

১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএসসি (সন্মান) শেষ করে উচ্চ শিক্ষার পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়রত অবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হন তিনি। কাগজপত্রসহ সবকিছু তৈরি থাকার পরও সেখানে আর যাওয়া হয়নি তার। অনার্স শেষ করে ফলাফল পাবার আগেই তিনি ইউনিভার্সিটি অব আলবামাতে ভর্তি হয়ে যান। ১৯৭৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে ও ১৯৭৯ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি পাশ করার পর ১৯৮১ সালে তিনি পিএইচডি করেন ইউনিভার্সিটি অব আলবামা থেকে।

প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছেন মৌলভীবাজার বড়লেখার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর বড়লেখার পিসি হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম শ্রেণিতে ৪র্থ স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। এরপর ভর্তি  হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে।

কর্মজীবন

ইউনিভার্সিটি অব আলবামা থেকে পিএইচডি করার পর তিনি আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে নতুন নতুন গবেষণা, শিক্ষকতা, আর বই লেখার কাজে নিমগ্ন হন। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সাল অবধি সেখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ডেইটনে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, ১৯৯৩ সালে অধ্যাপক পদে পদন্নোতি লাভ করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইলেক্ট্রো-অপটিক্স প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পাশাপাশি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সেখানে তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৯৮-২০০০ সাল পর্যন্ত টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে, ২০০০-২০০৪ সাল পর্যন্ত সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে এবং ২০০৪-২০১৩ সাল পর্যন্ত ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপনা করেন ড. আতাউল করিম। দীর্ঘ ৯ বছর তিনি ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্টের (গবেষণা) দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথে যোগদান করেন, বর্তমানে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভোস্ট এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর হিসাবে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি

স্কুলে থাকতেই লেখালেখি শুরু করেন আতাউল করিম। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ‘বিজ্ঞান সাময়িকী‘ ও বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকায় তার ত্রিশটিরও বেশি লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘বিবর্তন কাহিনী’ এবং ‘সাম্প্রতিক’। ‘বিবর্তন কাহিনী’তে ছিল মহাজাগতিক ও জৈবিক বিবর্তন বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। আর ‘সাম্প্রতিক’ লেখাটিতে ছিল বিজ্ঞানের সমসাময়িক বিষয়গুলোর উপর আলোচনা। ১৯৭৪ সালে প্রথম বইয়ের জন্য পাণ্ডুলিপি জমা দেন বাংলা একাডেমিতে। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর বাংলা একাডেমি কিশোর লেখকের লেখা প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করায় সমস্ত নিবন্ধ তিনি ইংরেজিতে বাংলাদেশের বাইরে থেকে প্রকাশ করেন।

তিনি ১৫টিরও বেশি গবেষণামূলক বই রচনা করেছেন। এ পর্যন্ত তার রচিত ৩২৫টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে বিশ্বের খ্যাতনামা জার্নালসমূহে। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার লেখা ও সম্পাদিত বইগুলো পাঠ্যপুস্তক হিসাবে পড়ানো হয়। তার বইগুলোর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য নাম হলো- Digital Design: A Pragmatic Approach (১৯৮৭), Electro-Optical Devices and Systems (১৯৯০), Optical Computing: An Introduction (১৯৯২), Continuous Signals and Systems with MATLAB (২০০১), Digital Design: Basic Concepts and Principles (২০০৭)।

পেটেন্ট

বেশ কয়েকটি আবিস্কারের পেটেন্ট রয়েছে ড. আতাউল করিমের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ফাইবার অপ্টিক কাপলিং সিস্টেম, ট্রাইনারি এসোসিয়েটিভ মেমরি, ইনার প্রডাক্ট এরেই প্রসেসর ফর রিট্রাইভাল অব স্টোরড ইমেজ, অপটিক্যাল প্যাটার্ন রিকগনিশন টেকনিক ও র‍্যাস্টার স্ক্যানার উইথ এ সিলেক্টেবল স্পট ডাইমেনশন

পুরস্কার

মোহাম্মদ আতাউল করিম যেসব পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এনসিআর স্টেকহোল্ডার অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯), নাসা টেক ব্রিফ অ্যাওয়ার্ড (১৯৯০), আপ এন্ড কমার্স এডুকেশন অ্যাওয়ার্ড (১৯৯০), অ্যালুমনি অ্যাওয়ার্ড ইন স্কলারশিপ (১১৯১), আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৪), আউটস্ট্যান্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৮)। এছাড়া তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘আউটস্ট্যান্ডিং পিপল অব দি টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ ও ‘আমেরিকান ম্যান এ্যান্ড উইম্যান ইন সায়েন্স’ শীর্ষক তালিকাসহ আরো বিভিন্ন সম্মানজনক তালিকায়।

সুদূর প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন ড. আতাউল করিম। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন কম্পিউটার এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্যোগ নেন বাংলাদেশে। এখন এই সম্মেলনটি এ দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী সম্মেলনে পরিণত হয়েছে। অতিথি সম্পাদকদের ৫টি দলের সহযোগিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন ২০টি জার্নাল। এসব জার্নালে আলোচনা করা হয়েছে বাংলাদেশের যোগাযোগ, কম্পিউটিং, মাল্টিমিডিয়া, নেটওয়ার্ক এবং সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়বস্তু নিয়ে। তার সম্পাদিত ‘টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ এন্ড ডিজাইন ইস্যু ইন বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ শীর্ষক বইটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বিজ্ঞানচর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

সূত্র : পিবিএন, অপটিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকা, ওল্ড ডোমেনিয়ন ইউনিভার্সিটি, আইজিআই গ্লোবাল।

 

ডব্লিউএন


 
 

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি