ঢাকা, রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:০১:৪৮

মিয়ানমারকে তাদের সব নাগরিকদের ফেরত নিতে হবে

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৪৪ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বৃহস্পতিবার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর তাণ্ডবে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে লাখ লাখ মানুষ। এসব মানুষদের ঘিরে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব রোহিঙ্গা নিধন বন্ধে মিয়ানমারকে বারবার আহবান জানালেও বন্ধ হচ্ছে না। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারকে তাদের সব নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এখানে কে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ  এটা কোনো কথা নয়। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিকভাবে তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। এখানে শুধু মুসলমান না, বেশ কিছু হিন্দুও নির্যাতিত হয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে মিয়ারমারকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর সেই সময়োচিত বক্তব্যটি তুলে ধরা হলো-

মাননীয় স্পিকার, আজ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি এবং মাননীয় সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন- আমি তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলব, বাংলাদেশে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে। তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।


রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই নাগরিক এটা সবারই জানা। ১৯৫৪ সালে বার্মা অর্থাৎ বর্তমান মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উ-নু রোহিঙ্গাদের অন্যান্য যে জাতিগোষ্ঠী আছে যেমন- কাটিন, কাইয়া, মুন, রাখাইন, সান- এ ধরনের আরও বিভিন্ন প্রায় একশ` পঁয়তাল্লিশটির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি আছে- তাদের সকলের সঙ্গেই সমান অধিকার রোহিঙ্গাদের আছে- সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং রেডিওতে তা প্রচার হয়েছিল। তাদের ভোটের অধিকার ছিল; কিন্তু দেখা গেল, ১৯৭৪ সালে এই বার্মা, বর্তমান মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন শুরু করেছিল। এরপর ১৯৮২ সালে `সিটিজেন আইন` করে, সে আইনে চার স্তরবিশিষ্ট সিটিজেনশিপ প্রয়োগ করে। উদ্দেশ্যই ছিল এদের অধিকার কেড়ে নেওয়া। ২০১৫ সালে এসে এই রোহিঙ্গাদের সমস্ত ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। এভাবে একটা জাতির প্রতি এই ধরনের আচরণ মিয়ানমার সরকার কেন করছে, আমাদের বোধগম্য নয়।


মাননীয় স্পিকার, আপনি আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে শুনেছেন যে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমঝোতা স্মারক হয়। যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে। ১৯৮১-৮২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। ১৯৯১-৯২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। কিন্তু কিছু রোহিঙ্গা-রেজিস্টার্ড প্রায় ২৫ হাজারের মতো এবং আন-রেজিস্টার্ড বেশ কিছু থেকে গিয়েছিল। আমরা বারবার এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বলেছি, তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। আমি যতবার মিয়ানমার গিয়েছি, মিয়ানমারে তখনও গণতন্ত্র ফিরে আসেনি, মিলিটারি শাসকরা ছিল। তাদের অনুরোধ করেছি, এরা আপনাদেরই নাগরিক, আপনারা তাদের ফেরত নিয়ে যান। এরপর যখন গণতন্ত্র ফিরে এলো, অং সান সু চি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সঙ্গে যখনই দেখা হয়েছে, অনুরোধ করেছি, যারা আমাদের দেশে আছে তাদের ফিরিয়ে নাও। কিন্তু ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, আমরা দেখলাম ২০১২ সালে আবার রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো।
এরপর ২০১৫-১৬ সালে, আবার এই ২০১৭ সালে ব্যাপকহারে এসেছে। এই ঘটনার সূত্রপাত আমরা যেটা দেখি, ওখানে কোনো একটা গোষ্ঠী মিলিটারির ওপর হামলা করেছে, বর্ডার ফোর্সের ওপর হামলা করে। কয়েকজনকে হত্যা করে। ২০১২ সালে একবার এই ঘটনা ঘটায়। তখনই সাধারণ নাগরিকের ওপর অত্যাচার শুরু হয়।


যখন মানুষ আসতে শুরু করেছে নারী, শিশুই বেশি। নৌকাডুবি হয়ে সেখানে শিশুর লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। এমনকি গুলি খাওয়া, মাথায় এবং বুকে গুলি খাওয়া লাশ নদীতে অথবা সাগরে ভেসে ভেসে সেই লাশ চলে আসছে। সেখানে আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে।


মাননীয় স্পিকার, এই দৃশ্য দেখা যায় না! আমাদেরও তো অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঠিক যেভাবে, আমাদের ওপর অত্যাচার শুরু করেছিল, অগি্নসংযোগ করা, মেয়েদের রেপ করা, মানুষকে হত্যা করা এবং ছোট্ট শিশুকে হত্যা করা_ ঠিক সেই দৃশ্যগুলো যেন আবার চোখের সামনে ভেসে আসছে। আমাদের জন্য এটা কঠিন যে, এতগুলো মানুষকে এখানে রাখা, আশ্রয় দেওয়া। আমিও তো রিফিউজি ছিলাম ছয় বছর। `৭৫-এ যখন আমার মা-বাবা, ভাইবোন সবাইকে হত্যা করল। কাজেই একটা রিফিউজি হয়ে থাকা সেটা যে কতটা অবমাননাকর, এই যন্ত্রণা তো আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা খুব ভালোভাবে বুঝি। কিন্তু আমরা চাই, তারা তাদের ভূমিতে যেন ফিরে যায়। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়েছেন সেই নীতিমালা অনুসরণ করেই আমরা প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। মিয়ানমার সরকারকে আমি বলব, তাদের নাগরিক, শত শত বছর ধরে তারা বাস করছে। এক সময় তাদের ভোটের অধিকার ছিল। হঠাৎ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া বা তাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা, এর ফলাফল ঠিক কী দাঁড়াতে পারে সেটা কি তারা চিন্তা করেছে? এটা ঠিক যে, এক সময় আমাদের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হতো প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য। আমি যখন থেকে সরকার গঠন করেছি, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে, সোজা ঘোষণা দিয়েছি, আমাদের মাটি কাউকে ব্যবহার করতে দেব না কোনো প্রতিবেশী দেশে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য। সেটা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছি।


বারবার আমাদের বর্ডার গার্ড এবং মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। যখনই আমাদের কাছে কেউ ধরা পড়ছে, আমরা ফেরত দিচ্ছি। আমরা কখনোই এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করব না। কারণ আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।


আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ ছিল। সেই ১৯৭৬ সাল থেকে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়। ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করি। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই অশান্ত পরিবেশ মোকাবেলা করার জন্য সামরিক কায়দায় সমাধানের চেষ্টা করা হতো। আমাদের দেশে যে সামরিক জান্তারা ক্ষমতায় ছিল তারা ওই পথ অনুসরণ করত।


যখন ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করি, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে পার্লামেন্টের একটা কমিটি করে আমরা এর সমাধান করি। আমরা শান্তি চুক্তি করি এবং বাংলাদেশের যারা ভারতে রিফিউজি হিসেবে ছিল তাদের সকলকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করি। আমি মনে করি, যারা আমার দেশের নাগরিক, তারা অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকা এটা আমার দেশের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়। আমাদের নাগরিক আমাদের দেশেই থাকবে।


মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যখনই কথা হয়েছে এটাও বলেছি যে, আমাদের বহু গৃহহারা মানুষ, নদীভাঙা মানুষ, ভূমিহীন- তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকি। কাজেই আমরা এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারি।


মাননীয় স্পিকার, আপনি শুনেছেন, আমাদের পররাষ্ট্র সচিব বারবার তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেখানে গেছেন। আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেছেন, আলোচনা করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, তারা ফেরত নেওয়া তো দূরের কথা এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করল যে, আজকে সব বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী আমি যদি তাকাই আমার খুব কষ্ট হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ করার মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানরা রিফিউজি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। আমরা যেমন আইলানের লাশ দেখেছি সাগরপাড়ে, ঠিক তেমনি নাফ নদীতে দেখি শিশুদের লাশ। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, মুসলিম দেশগুলো যদি এটা অনুভব করতে পারত, সবাই যদি ঐকমত্যে থাকতে পারত; তাহলে মুসলমানদের ওপর এই অত্যাচার কেউ করতে পারত না। আমি বারবার ওআইসির মহাসচিবকে বলেছি। আমি বিভিন্ন মুসলিম দেশের নেতাদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি তখনও বলেছি, কোনো রকম সমস্যা থাকলে আমরা আলোচনা করি, আমরা সমাধান করি। কিন্তু অন্যের হাতের খেলার পুতুল কেন হবো?


কিন্তু দুর্ভাগ্য, এটা আমি দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাপী এ রকমই ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এখানে কে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এটা কোনো কথা না। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিকভাবে তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। এখানে শুধু মুসলমান না, বেশ কিছু হিন্দুও নির্যাতিত হয়ে এসেছে।


এখানে অনেকেই অং সান সু চির ব্যাপারে কথা তুলেছেন। আপনারা জানেন, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন মিলিটারি ডিকটেটরশিপ চলেছে। কেবল গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। কিন্তু সেখানেও আইন করে অং সান সু চিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি বা সরকারপ্রধান হতে দেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। কাজেই তার ক্ষমতাই-বা কতটুকু আছে, সেটাও আপনাদের বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমতা প্রয়োগ করবে পার্লামেন্টে, সেখানেও মিলিটারি প্রতিনিধি বেশি। তারা ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে। দেশ থেকে বিতাড়িত করছে।


আজকে আমরা মানবিক কারণে তাদের জায়গা দিচ্ছি। আমরা তো অমানুষ হতে পারি না। কিন্তু মিয়ানমারকে এটা স্পষ্টভাবে মানতে হবে যে, তাদেরই নাগরিক; আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে না। মিয়ানমারের এক জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন, এরা সবাই বাঙালি। বাঙালি তো শুধু বাংলাদেশে নাই, বাঙালি তো পশ্চিমবঙ্গেও আছে। বাঙালিও পৃথিবীর বহু দেশেই আছে। বাঙালি বলেই তাদের তাড়িয়ে দেবে, এ০টা কেমন কথা? তাদের ভাষা, সবকিছু আলাদা, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ আলাদা, সবই তো বার্মিজ, মিয়ানমারেরই। তো তাদের আবার কালার দেওয়া হবে কেন? আর মানুষ কখনও এদিকে আসে, ওদিকে যায়, এ রকম তো যাতায়াত করতেই থাকে, যুগ যুগ ধরে হয়েছে। এরা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারেই থেকেছে, ওখানে তাদের আদি নিবাস। তাহলে তাদের কেন এভাবে বিতাড়িত করা হবে? অত্যাচার করা হবে?


সেই সঙ্গে আমি বলব যে, যারা দুইটা পুলিশ মারল, দশটা পুলিশ মারল, কি পাঁচটা মিলিটারি মারল_ এটা মেরে তারা কী অর্জন করছে? তারা কি এটা বোঝে না যে, তাদের এ সমস্ত কারণে আজকে লাখ লাখ মানুষ, যারা নিরীহ, তাদের ঘরবাড়ি পুড়ে যাচ্ছে? তারা মৃত্যুবরণ করছে, তাদের ওপরে আঘাত করছে, ছোট ছোট শিশুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, তাদেরই মা-বোনদের ওপর পাশবিক অত্যাচার হচ্ছে। তাহলে এ অত্যাচারের সুযোগটা কেন সৃষ্টি করে দিচ্ছে? আর এ থেকে তারা কী অর্জন করেছে? হয়তো যারা এদের অস্ত্র সরবরাহ করছে, তারা লাভবান হচ্ছে। এদের অর্থ যারা জোগান দিচ্ছে, হয়তো তারা লাভবান হচ্ছে। কিন্তু আজকে তাদের এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আজকে মিয়ানমারের লোকগুলো কষ্ট পাচ্ছে।
আমি এটা বলব যে, এ সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকেও এটাও বলছি, আমরা এদের কোনোমতেই প্রশ্রয় দেব না। আমাদের যে সিদ্ধান্ত, আমরা সব সময় রক্ষা করি। মিয়ানমারকেও সে রকম ব্যবহার করতে হবে। যে কয়েকটা লোক, যারা অপরাধী তাদের খুঁজে বের করুন। কিন্তু কিছু ঠকবাজের কথা বলে এরা সাধারণ মানুষকে হত্যা করবে; ছোট ছোট শিশুরা কি অপরাধ করেছে? নারীরা কি অপরাধ করেছে? তাদের ওপরে অত্যাচার হবে, এটা আমরা কখনও মানতে পারি না। এটা কিছুতেই মানা যায় না। কাজেই তাদের এটা বুঝতে হবে, তাদেরই নাগরিক, যারা আজকে বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সকলকে ফেরত নিতে হবে। সেখানে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা আজকে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রয়োজনে `সেফ জোন` করে তাদের সেখানে রেখে নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করে দিতে হবে।


আর কফি আনান যে সুপারিশ করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কফি আনান কমিশন মিয়ানমার সরকারই গঠন করেছে। তাহলে তার সুপারিশটা তারা গ্রহণ করবে না কেন? আমাদের এখানে যারা আশ্রয় নিয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে এবং এখন যারা এসেছে, তাদের প্রত্যেক নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে হবে। এ সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে। এ সমস্যার সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। এখানে যদি কোনো রকম সহযোগিতা লাগে, হ্যাঁ, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা সেটা করব। আজকে যারা আমাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে; তাদের আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমি এটুকু বলব যে, এদের এ দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা না করেন। আর কেউ কেউ এখান থেকে নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য চেষ্টা যেন না করে। আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা যেন না করে।


ষোল কোটি মানুষকে আমরা খাবার দেই। তার সঙ্গে আরও এ রকম দু-চার/পাঁচ লাখ লোককে খাবার দেওয়ার মতো শক্তি বাংলাদেশের আছে। হ্যাঁ, তারপরে যারা সাহায্য দেবেন, ইতিমধ্যে আমাদের কমিটি করা আছে, সে কমিটির মাধ্যমে এটা দিতে হবে। আর প্রত্যেকে, যারাই ঢুকবে, প্রত্যেকের ছবি তোলা, তাদের নাম, ঠিকানা লেখা এবং তার একটা সম্পূর্ণ হিসাব আমরা ইতিমধ্যে করতে শুরু করেছি। আমি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে এবং কল্যাণ তহবিল থেকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি। সত্যিকার যারা এসেছে তাদের সম্পূর্ণ ছবি থাকবে, তাদের আইডেন্টিটি থাকবে। তাদের আপাতত মানে সাময়িকভাবে একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা, সেটাও আমরা করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছি। যদি কেউ সহযোগিতা করেন নিশ্চয়ই আমরা সেটা নেব। কিন্তু আবার এদের এ দুর্দশাকে মূলধন করে কেউ কারও ভাগ্য গড়বে, সেটা আমরা করতে দিতে চাই না। কেউ যেন এটা নিয়ে রাজনীতি না করে; মানে কোনো সাহায্য নাই, সহযোগিতা নাই বড় বড় এক একখানা স্টেটমেন্ট দিয়ে আর বড় বড় কথা বলবেন, সেটা কিন্তু হবে না, সেটা আমরা চাই না।


আমি ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে যাচ্ছি। সেখানে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বক্তব্য দেব। নিশ্চয়ই আমার বক্তব্যে মিয়ানমারের বিষয়টা তুলে ধরব। আমাদের ওখানের সংসদ সদস্যরা আছেন, জনপ্রতিনিধিরা আছেন, তাদের সকলেই এদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, আমাদের বর্ডার গার্ড থেকে শুরু করে সকলে সক্রিয় আছেন। সেই সঙ্গে আমাদের দল থেকেও ত্রাণের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু এটা সাময়িক ব্যবস্থা। অবশ্যই মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের নিজের ভূমিতে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকেই। আজকে যে প্রস্তাবটি এসেছে_ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয়, জাতিগত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ, তাদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে `পুশ-ইন` করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হেক। সংসদে এই যে প্রস্তাবটি ডা. দীপু মনি নিয়ে এসেছেন, আমরা এ প্রস্তাবটিকে সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাচ্ছি।

(সংক্ষেপিত)
//এআর

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি