ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৮ ১:৫১:৪১

Ekushey Television Ltd.

যে কারণে ‘বুড়ো’ কে বেছে নিলেন মালয়রা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৪:১০ পিএম, ১০ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৬:০০ পিএম, ১০ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার

মাহাথির মোহাম্মদ

মাহাথির মোহাম্মদ

‘আমি এখনও বেঁচে আছি। আমি বা আমার জোট কারো ওপর প্রতিশোধ নেবো না। দেশে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনবো।’ মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকারের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়-ই ফুটে উঠে নি:সন্দেহে। কেন মালয়েশিয়ানরা ৯২ বছর বয়সী এ ‘বুড়ো’ কে নেতা নির্বাচিত করলেন তার উত্তরও খোঁজার প্রয়োজনও বোধ হয় ফুরিয়ে যায় তাঁর এই বক্তব্যে।   

দেখার বিষয় মালয়েশিনরা কী কারণে এই ‘বুড়ো’ কে নেতা হিসেবে বেছে নিলেন। মূলত: মাহাথির মোহাম্মদ ২২ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে মালয়েশিয়াকে এক শতাব্দী এগিয়ে দিয়েছিলেন। টানা দুই দশকেরও বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় তাঁর কিছু সমালোচনা থাকলেও মালয়েশিয়ানদের স্বার্থের বাইরে কিছুই করেন নি পেশাদার চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া মাহাথির। মালয়েশিয়ায় কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তন আনেন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনে দিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পিত উন্নয়ন সাধন করেন। গোটা মালয়েশিয়াকে স্তরে স্তরে সাজান। বাণিজ্যিক, প্রশাসনিকসহ কয়েক ভাগে ভাগ করে পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলেন। স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। নাগরিক সেবা জনগণের দোঁড়গোয়ায় পৌছে দেন। তার সুদূরপ্রসারী চিন্তার এক সময়কার ঔপনিবেশ মালয়েশিয়া আজ শুধু পৃথিবীর অন্যতম আকাঙিক্ষত বাসযোগ্য নগরীই নয়, এশিয়ার টাইগারও।   

মালয়েশিয়ায় এবারের সাধারণ নির্বাচন দেশটির ইতিহাসের ১৪তম। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জোট মালয়েশিয়া শাসন করছে। মাহাথির মোহাম্মদও এই জোটের অংশ ছিলেন। ক্ষমতায়ও এসেছিলেন, ছিলেন সবচেয়ে বেশি সময় ধরে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক মনে করা হয় তাঁকে। দীর্ঘ বিরতির পর রাজনীতির মঞ্চে ফিরেই নিজের দল ও একসময়ের শিষ্য নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন মাহাথির। তাঁর বক্তব্য, যে রাজনৈতিক দল দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, সেই দলে থাকা লজ্জার। আর তাই বিরোধী পক্ষের হয়ে পুরো দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামের মাহাথির মোহাম্মদ। তার ঝুঁকিটাও কম ছিল না।

বুধবার দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। গত নির্বাচনের চেয়ে ভোট এবার কম পড়েছে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোটার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, এবার ভোট দিয়েছে ৭৬ শতাংশ ভোটার। অনুমিত এই সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে তা গতবারের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

বিসিসি ও এএফপির খবরে বলা হয়েছে মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে জয় পেয়েছে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পাকাতুন হারাপান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাকাতুন হারাপান ১২১টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ২২২টি আসনের মধ্যে তারা ১২১টি আসন পায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য নিয়ম অনুযায়ী ১১২টি আসনে জয় পাওয়ার দরকার ছিল। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনাল ৭৯টি আসন লাভ করেছে।

এই জয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় ইতিহাস সৃষ্টি হলো। এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) জোটের ৬১ বছরের শাসনের অবসান হল। ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এ জোট একটানা দেশটির ক্ষমতায় ছিল। একসময় এই বারিসান ন্যাশনালের নেতা হিসেবেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন মাহাথির। দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনীতিতে ফিরেই দাঁড়িয়ে গেলেন নিজের দলের বিপক্ষে। ৯২ বছর বয়সী এই মানুষ দেখালেন ভেলকি!

মালয়েশিয়াকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়

ক্ষমতাকালীন ২২ বছরে মাহাথির মালয়েশিয়াকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতি তার অন্যতম অবদান। কৃষি নির্ভর অর্থনীতিকে তিনি শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করেন। বিমান, টেলিযোগাযোগ খাতসহ অন্যান্য সরকারি খাতকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেন, ফলে কর্মজীবীদের কর্মসংস্থানের অবস্থা অনেক উন্নত হয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ‘ডক্টর এম’ দেশ নিয়ে তাঁর চিন্তাগুলোর বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেন। জাপানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি মালয়েশিয়াকে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, স্টিল ও গাড়ির উৎপাদক দেশে পরিণত করেন। অথচ এর আগে মালয়েশিয়া শুধু রাবার ও টিন রপ্তানি করত। টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। এই দীর্ঘ সময়ে মালয়েশিয়াকে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন তিনি। ২০০৩ সালে ক্ষমতা ছাড়েন মাহাথির। ক্ষমতায় থাকাকালীন মালয়েশিয়াকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত করার জন্য তিনি ২০২০ নাগাদ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেন যার পুরোটা বাস্তবায়ন না হলেও মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নিতে বড় ভুমিকা রেখেছে। তার অনুপস্থিতিতে দুর্নীতি রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে গেছে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে। এসব কারণেই মাহাথিরের উপর আস্থা রাখে মালয়েশিয়ানরা।

৭২ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মাহাথির আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন। রয়টার্স জানিয়েছে, মাহাথিরকে এখন তার নতুন জোটের চার দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার জন্য কাজ করতে হবে এবং কারগারে থাকা বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে করে করার পথ বের করতে হবে। দেশের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। আগের ভুলগুলো শুধরে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। একজন চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া মাহাথির মোহাম্মাদ শুধু মালয়েশিয়া নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের একজন অন্যতম সফল চরিত্র হিসাবে স্বমহিমায় ভাস্বর থাকবেন এই প্রত্যাশাই সাধারণ মালয়েশিয়ানদের।

/ এআর /

ফটো গ্যালারি



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি