ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৮:৩০:৪২

Ekushey Television Ltd.

রমরমা ইলিশের বাজার

রিজাউল করিম

প্রকাশিত : ০৭:১১ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০১:৪১ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার

‘‘মামা পদ্মার রুপালি ইলিশ, লয়া যান। হালি মাত্তরে ৭শ’টিয়া। কতেকদিন গেলে আর হাইবেন না। সরকার না করছে মাছ ধরবার। ধরবার না গেলে, দাম আরও বাইর‌্যা যাইবো। নেন আরও একশ’টিয়া কম দ্যান। ফ্রিজে রাইখ্যা দ্যানগা। কতেকদিন হর খাইতে হারবেন।’’

কথাগুলো বলছিলেন খুচরা ইলিশ বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম। পাইকারী ও খুচরা মাছ বাজার হিসেবে পরিচিত রাজধানীর কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী তিনি। শুধু রফিকুল নন, ইলিশের রমরমা বাজারে ক্রেতা কাছে টানতে তার মতো অন্য ব্যবসায়ীরাও এমন হাঁক দিচ্ছেন সকাল বেলার কাওরান বাজারে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দাম নাগালের মধ্যে থাকায় ক্রেতাদের ঝোঁক এখন ইলিশের দিকে। ক্রেতাদের এ ঝোঁক কাজে লাগিয়ে বাজারে চলছে অন্য মাছের বদলে ইলিশের একচেটিয়া ব্যবসা। সকাল বেলা বাজারে এতোটাই লোকসমাগম যে, এক দোকান থেকে অন্য দোকানে যাওয়ায় কঠিন। তবু একটু কম দামে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ কিনতে ক্রেতার চেষ্টার কমতি নেই। একজনকে ঠেলে অন্যজন যাচ্ছেন পাশের দোকানে। আর উঁপচেপড়া ক্রেতার চাহিদা পূরণে একই জায়গায় পাইকারী ও খুচরা দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। বরিশাল পাথরঘাটা, ভোলা মনপুরা ও ভোলা চরফ্যাশন থেকে এ মাছ আনা হয়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, হালিতে ৫ কেজি বা তার চেয়ে বেশি এমন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৫শ’ থেকে ৩৫শ’ টাকায়। হালিতে আড়াই বা তিন কেজি এমন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকায়। আবার হালিতে দেড় থেকে দুই কেজি এমন ইলিশ হালি বিক্রি হচ্ছে ৮শ’থেকে ১ হাজার টাকায়। সবার ছোট হালিতে এক থেকে দেড় কেজি এমন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৭শ’ থেকে ৮শ’টাকায়।

কাওরান বাজার মেসার্স বরিশাল ফিস আড়ত থেকে পাইকারী দামে ৫ হাজার ৭০০ টাকায় সাড়ে ১২ হালি ইলিশ কিনেছেন খুচরা ব্যবসায়ী জুলহাস। যিনি এক মাসে আগে ইলিশ বিক্রির জন্য চাঁদপুর থেকে কাওরান বাজার এসেছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে তিনি বলেন, এখন ইলিশ বিক্রির মৌসুম। তাই মৌসুমী এ সুযোগে একটু ব্যবসা করে নিতে আমি ঢাকায় এসেছি। এখান থেকে কিনলাম এখানেই বিক্রি করছি। জায়গায় বসেই দেড় থেকে দুই হাজার টাকা লাভ। এটা অন্য সময় সম্ভব না। তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত এখানে সব বিক্রি না হলে, আশপাশের ফ্লাটগুলোতে গেলেই বিক্রি হয়ে যাবে। তবে এখন ৭০০ টাকা হালি বিক্রি করলেও শেষ পর্ন্ত ৫০০ টাকা হালিও দিতে হয়।

মেসার্স বরিশাল ফিস আড়তের স্বত্তাধিকারী বাবুল একুশে টেলিভিশ অনলাইনকে বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ প্রচুর ইলিশ ধরা পড়েছে। মানুষ এবার ইলিশ খেতেও পেরেছে। কারণ মাছ বেশি ধরা পড়ছে আমরাও বেশি আনতে পারছি। আর বাজারে যোগান বেশি হওয়ায় এর দামও কমে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ এবার ইলিশ কম দামে খেতে পারছে। তবে গতকাল আর আজ আবার দাম একটু চড়া হয়ে গেছে। কারণ মাছ আবার কম ধরা পড়ছে।

ওই আড়তের ম্যানেজার মামুন জানান, আজ মঙ্গলবার তাদের আড়তে ১০ লাখ টাকার বেশি ইলিশ মাছ বিক্রি করা হয়েছে। তারা ৩৮ বক্স ও ২ ঝুঁড়ি মাছ এনেছিলেন বাজারে। তিনি জানান, বাজারে ২৫০ থেকে ৩০০ আড়তদার আছে।  এর মধ্যে কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাই ইলিশের ব্যবসা করছে। এ ধারণা থেকে বের করতে হবে প্রতিদিন কী পরিমান ইলিশ বাজারে আসছে। এছাড়া সঠিক কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব না।

একইভাবে বাজারে বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়তের স্বত্তাধিকারী বশির গাজী জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইলিশ বেচা কেনায় রমরমা অবস্থা। তবে এখন কিছুটা কমে আসছে। কারণ, নদীতে মাছ ধরা পড়ছে কম। ফলে বাজারে মাছ গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় কম আসছে। যার প্রভাবে দামও কিছুটা চড়া হয়ে গেছে। ওই আড়তের ম্যানেজার সোহেল বলেন, যার আমদানী যেমন তার ব্যবসা তেমন। আমাদের কি পরিমান মাছ আনা হয়েছে তা বলা নিষেধ।

রাজধানীর মধ্যবাড্ডা থেকে বাজারে মাছ কিনতে আসা সোহাগ নামের একজন একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, আমি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। গত কয়েকদিন ধরে শুনছি ইলিশের দাম কমেছে। তাই আজ কাওরান বাজারে এলাম দেখে শুনে কম দামে ভালো মানের ইলিশ কিনতে। এসে লাভও হয়েছে। এক হালি নিয়েছি। দাম নিয়েছে ১২শ’টাকা। আমাকে বিক্রেতা জানালো ৪টি ইলিশ সাড়ে ৩ কেজি হবে।

আরিফুর রহমান নামের আরেক ক্রেতা বলেন, মাছের দাম কম। তবে কারওয়ানবাজারে সময়ভেদে এই ইলিশের দাম নির্ভর করে। কারণ, এখানে ক্রেতার আগমন বেশি হলে দামও বেড়ে যায়। বিশেষ করে অফিস ছুটির টাইমে মাছের দাম একটু চড়া হয়।

জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে বাজারে অনেকটা ক্রেতাদের নাগালে ছিল ইলিশের দাম। চড়া দামের কারণে সারা বছর যারা ইলিশ খেতে পারেন না তারাও এই কয়েক দিন ইলিশ খেয়েছেন। কিন্তু মধ্যবিত্তের সেই স্বস্তি আর বাকি থাকছে না। আগামী মাসের শুরু থেকে ইলিশ মাছ ধরা যাবে না টানা ২২ দিন। এবার ৫ অক্টোবর প্রথম পূর্ণিমা। চন্দ্রমাসের ভিত্তিতে প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে আশ্বিন মাসের চাঁদের প্রথম পূর্ণিমার দিন এবং এর আগে চার ও পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। এই আদেশ যে সকল জেলে বা ব্যসসায়ী অমান্য করবে তাদের কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। তাই ইলিশ শিকার নিষেধাজ্ঞার সময় আসার এই মুহূ্র্তে বাড়তে শুরু করেছে এই মাছটির দাম। গত দুই দিনের ব্যবধানে জোড়া ইলিশের দাম বেড়েছে দুইশ থেকে চারশ টাকার মতো।

হঠাৎ দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল মাছ আড়তের এক ব্যবসায়ী বলেন, একদিকে সরকারের মাছ ধরা বন্ধের ঘোষণা ও নদীতে মাছ কম ধরা পড়া। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা। এসব অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে খুঁচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

শুধু কাওরান বাজার নয়, নদী ও সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় রাজধানীর সব বাজারেই এখন কেবল ইলিশ আর ইলিশ। বাজারের পাশাপাশি প্রাচুর্যের কারণে রাজধানীর অলিগলি, পাড়া-মহল্লায়ও ফেরি করে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে মেগা শপগুলোতেও এখন প্রচুর ইলিশের আমদানি।

আরকে/ডব্লিউএন

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি