ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই, ২০১৮ ১৩:৪৮:০১

Ekushey Television Ltd.

স্বাধীনতা যুদ্ধে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিকা

হুমায়ুন কবীর সৈকত

প্রকাশিত : ১১:৩৭ পিএম, ৮ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার | আপডেট: ০৬:২১ পিএম, ৯ এপ্রিল ২০১৮ সোমবার

একটি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস একটি অনন্য সাধারণ দলিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন আত্মদানের গৌরবগাথা। বাঙালির হাজার বছরের যুদ্ধজয়ের ইতিহাস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এ বিজয় ইতিহাসের পাতায় সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে আমাদের ত্রিশ লাখ শহীদানের আত্মদানের বিনিময়ে। দু’লাখ মা-বোনের সস্মানহানি করুণ আর্তনাদ মিশে আছে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়।

এক অদ্ভুত তত্ত্ব ‘দ্বিজাতি তত্তে¡র’ ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিমারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সামরিক ও প্রশাসনিকসহ সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করে শোষণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে বিদ্রোহের জন্ম হয়। শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে এ বাংলার সংগঠিত জনগণ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘাতপ্রতিঘাত সংঘাতময়তার পথ অতিক্রম করে অসীম সাহসিকতার সাথে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে। এ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কবর রচিত হয়। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।


১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যয়নসমাপ্ত ও অধ্যয়নরত অসংখ্য ছাত্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হাফিজ উদ্দিন: শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল শেরপুরের সাদিপুর ব্রিজে সম্মুখ সমরে সিলেট বিভাগের প্রথম শাহাদাত বরণকারী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।


নিঃসন্তান হাফিজ উদ্দিন ছিলেন এক অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মোজাহিদ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আর্মি ভেহিক্যাল মেকানিক পদে শিয়ালকোটে চাকরিরত ছিলেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে এসে সংসার জীবনের মায়া পরিত্যাগ করে শত্রুতা বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব বড়চর তাঁর গ্রামের বাড়ি। তাঁর বাড়ির কাছে পূর্ব বড়চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক সংলগ্ন তাঁরই সহযোদ্ধা শহীদ মহফিল হোসেনের সমাধির পাশে এ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলী মিয়া চৌধুরী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনের পুরোভাবে থেকে বুকের মধ্যে স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১-এ ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে ফিরে এসেছিলন তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের খোলা সবুজ চত্বরে। তিনি আমাদের প্রিয় মেধাবী সংগঠক অনলবর্ষী বক্তা, ছাত্রনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া চৌধুরী।

মরহুম আলহাজ্ব তারা মিয়া চৌধুরীর ঔরসে ও মরহুমা ফিরুজা বেগমের গর্ভে জন্ম নেয়া বড় ছেলে আলী মিয়া চৌধুরী ১৯৪৪ সালে চুনারুঘাট থানার তাউশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আলী মিয়া চৌধুরী ১৯৬৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে বৃন্দাবন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।


বাঙালি জাতিসত্তা রক্ষার মিছিলে যুবক আলী মিয়া চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নিজের অর্জনের কথা ভুলে যান। লক্ষ কন্ঠে গগনবিদারী আওয়াজ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা, গোলটেবিল না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ এবং জয় বাংলা ইত্যাদি সেøাগানের কাছে তিনি স্বাধীনতার উদ্দীপ্ত চেতনায় নিজেকে সঁপে দেন।


অতঃপর আত্মচেতনার টানে মা-মাটি-মানুষ আর প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ইস্পাতকঠিন আহŸানে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধের ২ নং সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সম্মুখ সমরের যোদ্ধা হিসেবে। এর পরের ইতিহাস যুদ্ধ, কেবল যুদ্ধ।


জীবন বাজি রেখে তুমুল যুদ্ধ।
এবং সবশেষে বিজয়।
রণাঙ্গন থেকে স্বাধীন দেশে ফিরে প্রশাসনিক ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০০১ সালে সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে স্ত্রী ও এক ছেলে এক মেয়ে রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অসীম সাহসী ও মেধাবী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া চৌধুরী।


বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক মিয়া : ৭৩ বছর বয়স্ক হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক মিয়া অসুস্থ অবস্থায় নুরপুর ইউনিয়নের শরীফাবাদ গ্রামে তার পৈতৃক বাড়িতে বর্তমানে দিন কাটাচ্ছেন।


একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, এই তো সেদিনের কথা। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলে ১৯৫৭ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই ১৯৬৩ সালের এসএসসি পাস করি। কত কথা মনে পড়ে। হায়, দিনগুলো কেমন করে হারিয়ে যায়।


তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে শরীর-মন জেগে উঠেছিল। আর তাই মুক্তিযুদ্ধে গমন। ৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এনামুল হকের অধীনে শমসেরনগর, ভানুগছা, কমলগঞ্জ অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। তারুণ্যের উদ্দীপনায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবন ছিল দেশপ্রেমে ভরপুর। ফলে শক্তিশালী পাক হানদার বাহিনী আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা একের পর এক ওদের শক্তিশালী ঘাঁটি তছনছ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। এই তো আমার দেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ।


বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর পাল চৌধুরী : শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার দাউদনগর বাজারের ডা. মৃত গিরিন্দ্র কুমার পাল চৌধুরী ও মৃত নির্মলা পাল চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র রণবীর কুমার পাল চৌধুরী ১৯৫৯ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করে সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) থেকে ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তিনি ঢাকা থেকে শায়েস্তাগঞ্জ নিজের বাড়িতে চলে আসেন।


২৫ মার্চের পর সারা বাংলার মতো শায়েস্তাগঞ্জও মিছিল আর আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়। ২৯ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী বিকাল অনুমান আড়াইটায় শায়েস্তাগঞ্জে প্রবেশ করলে রণবীর পাল বাইসাইকেলে চড়ে বন্ধু মন্টুকে নিয়ে ভারতের খোয়াই শহরে গিয়ে পৌঁছান। অতঃপর আগরতলায় গিয়ে ত্রিপুরার তদানীন্তন গভর্নর বালেশ্বর প্রসাদের সহধর্মিণী উমা প্রসাদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।


১৯৭১-এর অক্টোবর মাসে প্রশিক্ষক কে ভি সিং-এর পরিচালনায় লেবুছড়া ক্যাম্পে গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করে ৩ নং সেক্টরের অধীন সাবসেক্টর কামান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তেলিয়াপাড়াসহ অসংখ্য সফল অপারেশনে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন।


অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর কুমার পাল চৌধুরী বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হাসিম : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ ব্যাচের ছাত্র। তৎকালীন হবিগঞ্জ মহকুমার তুখোড় ছাত্রনেতা, অসীম সাহসী ও প্রখর মেধাবী ছাত্র যুব সংগঠক বাহুবল উপজেলার ৭ নং ভাদেশ্বর ইউপির পাঁচবার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হাসিম মরহুম সরাফত উল্লাহর ঔরসে মরহুমা তাজিবুন্নেছার গর্ভে ১৯৪৯ সালের ৭ জুলাই বাহুবল উপজেলার চক্রামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বিনির্মাণের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমোঘ আহ্বান সাড়া দিয়ে বৃন্দাবন কলেজ স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র মো. আবুল হাসিম কেএম সফিউল্লাহর ৩ নং সেক্টরে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর অধীনে বাংলার মুক্তির রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখেন। স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত হতে প্রেরণাদাতা হিসেবে প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব ওমর আলী, জনাব নৃপেন্দ্র দত্ত, জনাব কাজী আবদুল খালেক, জনাব আব্দুল ওয়াদুদের কথা মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।


মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল হাসিম বলেন, সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় চৌকিদার বাড়ি কালেঙ্গা ফরেস্ট বিট অফিসের কাছে অ্যাম্বুস করে আমরা ৯৬ জন পাক হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হই। যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে সরকার এই অঞ্চলকে মান্নান নগর হিসেবে ঘোষণা করে।


’৭১-এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম বলতে শুরু করেন নতুন বাজার ব্রিজ, রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের ইতিহাস। অমিত সাহসী স্কুল সহপাঠী প্রয়াত আব্দুল মতিন ছিলেন এই অপারেশন টিমের গ্রুপে লিডার। দুই বন্ধু মিলে নাইওরি সেজে রিকশা নিয়ে ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে আকস্মিক আক্রমণ করে ক্যাম্পে থাকা ১১ নারী নির্যাতনকারী রাজাকারকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করেন এবং একজনকে মারাত্মক আহত করেন। এসব অমূল্য অনিঃশেষ অমোচনীয় স্মৃতি নিয়ে এ সমাজসেবক বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে পৈতৃক বাড়িতে অবসর জীবনযাপন করছেন।


বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায়: মুক্তিযুদ্ধের অমর স্মৃতি বুকে ধারণ করে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পুরানবাজার এলাকার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ব্রজেন্দ্র লাল রায় ও মাতা আশালতা রায়ের পুত্র শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ ব্যাচের ছাত্র হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায় আজও একনিঃশ্বাসে জাতির পিতার অসামান্য অবদান তাঁর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা তাঁর নিঃশ্বাসে নেতৃত্বের কর্মকুশলতা ও তাঁর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করেন।


বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায় ১৯৭১-এর জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হেঁটে কালেঙ্গা পাহাড় হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত গোবিন্দ সিং আশরাম বাড়ি পৌঁছার পর আগরতলা কংগ্রেস ভবনে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম অন্তর্ভুক্ত করান। গৌরপ্রসাদ রায় ৩ নং সেক্টরের অধীন সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কোম্পানি কমান্ডার লে. ওয়াকিউজ্জামানের অধীনে একজন প্লাটুন কমান্ডার হিসাবে মনু নদীর তীর, নয় মৌজা, চাতলাপুর, ভিওপি, টেংরাবাজার, রাজনগর, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ, মোগলাবাজারসহ অসংখ্যা স্থানে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধরত অবস্থায় দিন কাটান।


বর্তমানে তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার ও হবিগঞ্জ জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি হিসাবে দায়িত্বরত।


বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাবিবুর রহমান: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রবল টানে সারা বাংলার মতো হবিগঞ্জও প্রকম্পিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রবল উত্তাপে হবিগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগ নেতা চুনারুঘাট থানাধীন রামশ্রী সাহেববাড়ির মরহুম সৈয়দ সামছুর রহমানের প্রথম পুত্র সৈয়দ হাবিবুর রহমান তার উদ্দীপ্ত যৌবন সমর্পণ করেছিলেন দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথের মধ্য দিয়ে মৃত্যু উপত্যকায় মুক্তির রণাঙ্গনে।


শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৬৯ ব্যাচের ছাত্র সৈয়দ হাবিবুর রহমান রওফে বাবুলকে সহপাঠী বন্ধু মহল ও রণাঙ্গনের সহযোদ্ধারা ‘পাগলা বাবুল’ বলে ডাকতেন। ২৬ মার্চ ১৯৭১ হবিগঞ্জ সদর থানা পতাকা স্ট্যান্ডে উড্ডীয়মান পাকিস্তানি পতাকা পুলিশের প্রবল বাধার মুখে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাবিবুর রহমান।


৩ নং সেক্টরের মেজর কেএম সফিউল্লাহর অধীনে সৈয়দ হাবিবুর রহমান অকুতোভয় সেনানীর মতো বীরদর্পে অসংখ্য গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিয়ে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।


স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি বাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পর ২০০৮ সালের ২৭ নভেম্বর হজব্রত পালন অবস্থায় পবিত্র মক্কা নগরীতে ইন্তেকাল করেন।


বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহীসন: সংলাপে সংলাপে মানুষের জীবনের হাসি কান্নাকে একান্ত মুন্সিয়ানা দিয়ে উপস্থাপন করে শত সহস্র দর্শক শ্রোতাকে মুগ্ধ করে এখনও তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে জীবনের ছন্দময়তা ধরে রেখেছেন আমাদের প্রিয় নাট্যজন এস এম মহসীন।


১৯৭১ এর রণাঙ্গনের শব্দ সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহসীন শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৫৭ সনে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৩ সনে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৭১ সনে প্রবাসী বাংলাদেশে সরকারের সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে শব্দ সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আগরতলা থেকে কৈলাশহর ও সিলেট পর্যন্ত প্রতিটি শরণার্থী শিবির ও প্রতিটি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের মানুষকে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত করে রাখেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী প্রাপ্ত শব্দ সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমির কালচারাল অফিসার, শিল্পকলা একাডেমীর ভারপ্রাপ্ত ডিজি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয় নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন।


বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই: ক্যাডার সার্ভিসভুক্ত প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই ১৯৪৫ সনের ৩ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানার শরিফাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আব্দুর রহিম ও মাতা মরহুমা আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৫৭-৫৮ সাল পর্যন্ত সময়কাল শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেন। পিতার চাকুরির কারণে অন্যত্র বদলি হওয়ায় তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন সমাপ্তকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ৩নং সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের নেতৃত্বে তিনি বিভিন্ন রনাঙ্গনে কৃতিত্বের সাথে অংশ নেন।


স্বাধীনতার পর ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার পর যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২৫শে মে ২০১৩ইং সনে ক্যাডার সার্ভিসভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল হাই পরলোকগমন করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত: দরাজ কন্ঠে শব্দের উচ্চারণে হাজারো মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দুরন্ত কৈশোর যৌবন পেরিয়ে আজ প্রৌঢ়ত্বের জীবন আঙিনায় দাঁড়িয়ে যিনি, তিনি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত। ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধি পিতা মৃত প্রভাত দত্ত ও মাতা রেণুবালা দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রাণেশ দত্ত শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করেন।


হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে স্নাতক শেষবর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্বাধীনতার আন্দোলনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মফস্বল শহর হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ। হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসাবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক তার শরীর মনকে উদ্দীপ্ত কওে তোলে। ২৭ এপ্রিল প্রাণেশ দত্ত শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সপরিবারে চলে যান খোয়াই পার হয়ে ভারতের আগরতলায়। সেখান থেকে আসামের লোহারবন ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার বাগচির অধীনে স্পেশাল ব্যাচ হিসাবে ৯০ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।


মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্তের যুদ্ধকালীন জীবন-স্মৃতি তাঁকে আজও আবেগ অনুভ‚তিতে ভরিয়ে রেখেছে। যে সম্মুখ সমর সংঘটিত হয়েছিল জকিগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে। বেলুচ রেজিমেন্টের এক ব্যাটালিয়ন পাক হানাদার বাহিনীর সাথে প্রায় ৫ ঘন্টা স্থায়ী এ যুদ্ধে বেলুচ ব্যাটালিয়নকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়। অগণিত বেলুচ পাক হানাদার নিহত হয়। প্রায় ১৫০ জন পাক হানাদার সৈন্য আত্মসমর্পণ করেন।


৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের অধীনে পরিচালিত যুদ্ধজয়ের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে আছেন শায়েস্তাগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণেশ দত্ত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঝারু মিয়া: হবিগঞ্জ বারের সিনিয়র আইনজীবী মো. ঝারু মিয়া শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে বৃন্দাবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে স্নাতক সমাপনি শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তরুণ ঝারু মিয়া দেশের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য দেশ হানাদারমুক্ত করার লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।


তিনি ত্রিপুরার বকুল পালাদানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে কৃতিত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাবেদ আলী: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সেনা সদস্য প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাবেদ আলী শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। নুরপুর ইউনিয়নের মরহুম সোহরাব আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবেদ আলী মেজর কেএম সফিউল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত ৩নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার লে. হেলাল মুর্শেদের নেতৃত্বে পরিচালিত মেডিকেল কোরে যোগদান করেন। ক্যাম্পে আগত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও আহত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মতিন: একজন অকুতোভয় প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মো. আব্দুল মতিন। চুনারুঘাট থানার বালিয়ারী গ্রামে জন্ম নেয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পিতার নাম হাজী ছাইম উল্লাহ। ১৯৬৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ আব্দুল মতিন বৃন্দাবন কলেজে স্নাতক সমাপনি বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মেজর কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত ৩ নং সেক্টরের অধীনে গেরিলা প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে অসীম সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করেন।


মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যে আমাদের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিছু তরুণ যুবক কিশোর দেশমাতৃকার টানে জীবনকে বাজি ধরে নিজেদের দেশপ্রেমকে শনাক্ত করেছিলেন। তাঁদের এ অসামান্য অবদানে আমরা উত্তর প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা গর্বিত, ধন্য, মুগ্ধ। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ, সকৃতজ্ঞ, বিনত অভিবাদন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার দেব রায় : মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন সমন্বয় গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা শায়েস্তাগঞ্জ বড়চর গ্রামের মৃত সচীন্দ্র দেব রায় ও মাতা মৃত ল²ী দেব রায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র সুকুমার দেব রায় ১৯৬১ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বৃন্দাবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর সিলেটের মুরারি চাঁদ (এম.সি কলেজ) কলেজে গণিত বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল তরুঙ্গমালার শরিক ছাত্র নেতা সুকুমার দেব রায় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বুকে ধারণ করে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চলে যান ভারতের আসামে। আসামের তেজপুর ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে তিনি ২নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর এ.টি.এম হায়দারের নেতৃত্বে কুমিল্লার অংশবিশেষ, আখাউড়া ও ভৈরব অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অপারেশনে অসীম সাহসিকতার সাথে অংশ নেন। নিঃসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার দেব রায় বর্তমানে এনজিও সিসিডি-এ ডেপুটি এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নির্বিঘ্নে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ বড়চর গ্রামের মৃত আ. নূরের মেজো ছেলে মো. শফিকুর রহমান। কিন্তু ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ঢেউ শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের ক্যাম্পাসে শহীদ আসাদের রক্ত ঝরার ইতিহাস গণ-আন্দোলনের ইশতেহার হয়ে এ মফস্বল শহর শায়েস্তাগঞ্জ এলাকাজুড়ে সংগ্রামের কাফেলাকে প্রলম্বিত ও প্রকম্পিত কওে তোলে। সেই কাফেলার অংশীদার হয়ে কিশোর শফিক স্বাধীনতার আদর্শে উজ্জীবিত হতে থাকলেন।


এলো ’৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকালের ইস্পাতকঠিন ডাক। যুদ্ধে যেতে হবে। যুদ্ধ করতে হবে। হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এ দেশকে করতে হবে শত্রুমুক্ত। করতে হবে স্বাধীন।
বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে যুদ্ধের মহাপ্লাবনে অতি সন্তর্পণে মে মাসের প্রথম দিকে বড় ভাই মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহাব খালাতো ভাই এমএম জহিরসহ লালচান্দ চা বাগানের কয়েকজন চা শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে ভারতের কাতলামারা সিমলায় চলে যান।


অতঃপর সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিনের ক্যাম্পে হাজির হয়ে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সহকারী কমান্ডার (সাংগঠনিক) হিসেবে কিছুদিন আগেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে নিজের পৈতৃক বাড়িতে বাস করছেন।


বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল কবির: গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা সময়ে ১৯৬৯ সালে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার সাবাসপুর গ্রামের মো. আব্দুল কবির শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সমগ্র বাংলায় গণঅভ্যুত্থানের তীব্র ঢেউ ছড়িয়ে পড়লে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে শায়েস্তাগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ছাত্রসমাজের ওপর। ছাত্রলীগের নেতা হিসাবে আব্দুল কবির এ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে জড়িয়ে রেখে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেয়ে ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে নিজের জীবনকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথমে তিনি ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে যোগদান করে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩ নং সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদের নেতৃত্বে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জীবন সংগ্রামে জয়ী দেশপ্রেমিক এই ব্যক্তি পরবর্তীতে সমাজ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। নিজ খরচে কবির কলেজ ও জহুর চাঁন বিবি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, এলাকায় কয়েকটি মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে এখনও নিয়োজিত আছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফিরোজ মিয়া : চুনারুঘাট থানার বালিয়ারি গ্রামে মৃত আব্দুল রাজ্জাকের পুত্র মো. ফিরোজ মিয়া ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার মতিউর রহমানের নেতৃত্বে গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে ভারতের কাঁচামাটি ক্যাম্পে অবস্থান করেন। অতঃপর প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি কালেঙ্গাসহ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফিরোজ মিয়া স্বাধীনতা-পরবর্তী জীবনে উবাহাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় পৈতৃক বাড়িতে জীবনযাপন করছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল দেব রায় : শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব বড়চর গ্রামের মৃত সচীন্দ্র দেব রায় ও মাতা লহ্মী দেব রায়ের পুত্র সুনীল দেব রায় ১৯৫৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জয় বাংলা জয় বাংলা’ এসব স্লোগানে মুখরিত স্কুল চত্বরের মিছিলে সুনীল হারিয়ে যেতেন। ভুলে যেতেন নিজের শিক্ষাজীবনের কথা। এ উত্তপ্ত মিছিলের পথ ধরেই একদিন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিবাহিনীতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। ফরেস্ট রেঞ্জারের চাকরি শেষে এখন অবসর জীবনযাপন করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল দেব রায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান: বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে অতি গোপনে ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে কিছুদিন গাইডের কাজ শেষে ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে লেবুছড়া ট্রেনিং ক্যাম্পে এক মাস সাত দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। অতঃপর গ্রুপে কমান্ডার আজিজুল হক তরফদারের নেতৃত্বে তিনি রেমা চা বাগানের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্পে হানা দিয়ে তছনছ করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী, সন্তান, পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন দেব: শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মনোরঞ্জন দেব ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শিঙ্গিছড়াসহ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজাকার ক্যাম্প ও পাক হানাদার ক্যাম্প আক্রমণে অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দেন। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়ি বাহুবল উপজেলার রামপুর গ্রামে অবসর দিন কাটাচ্ছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা : কিশোর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা চুনারুঘাট উপজেলার উবাহাটা গ্রামে কাজীবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম কাজী আব্দুস সালাম, মাতা মরহুমা মানিক চান বিবি।
শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬৮ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ’৭১-এ অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অগ্নিঝরা মার্চের উত্তাপ এই দামাল কিশোর গোলাম মর্তুজার শরীর ও মনে ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের অপত্য স্নেহে বেড়ে ওঠা এই কিশোর গর্ভধারিণী মায়ের ভালোবাসার প্রবল বাধাকে উপেক্ষা করে ২৯ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী শায়েস্তাগঞ্জে প্রবেশ করার সাথে সাথে হেঁটে ভারতের খোয়াই শহরে চলে যান। সেখান থেকে তিনি ভারতের বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে ২২ এমএফ কোম্পানিতে যোগদান করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।


৩ নং সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান চৌধুরীর অধীনে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প একডালা কোম্পানির স্কুল আক্রমণ করলে দুজন রাজাকার নিহত হয়। পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়।


মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর সরাসরি নির্দেশে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মর্তুজাকে তিন ইঞ্চি মর্টার প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। সেদিনের কিশোর আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্র্তুজার কাছে প্রশিক্ষণ নেয়াকে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরম পাওয়া বলে মনে করেন এই মুক্তিযোদ্ধা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক চৌধুরী (মাহতাব): মো. হামিদুল হক চৌধুরী (মাহতাব) চুনারুঘাট উপজেলার উবাহাটা গ্রামের পঞ্চায়েত বাড়ীর মৃত আব্দুল লতিফ চৌধুরীর ছেলে ’৭১ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি ত্রিপুরার খোয়াই মহকুমার অমর কলোনিতে ভর্তি হয়ে অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৩ নং সেক্টরের অধীনে সাবসেক্টর কমান্ডার এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে শাকির মোহাম্মদ, দেউন্দি, লালচান্দসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা পরেশ চন্দ্র রায়: লস্করপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কালিপদ রায়ের পুত্র পরেশ চন্দ্র রায় ১৯৬৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তার অনেক সহপাঠী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে থাকলে তিনিও ভারতের অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান করে প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর মেজর কে এম সফিউল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত ৩ নং সেক্টরের অধীনে বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বাবর আলী: ১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের বছর। এ বছরই ছিল প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. বাবর আলীর এসএসসি পরীক্ষার বছর। বাবর আলী পরীক্ষা না দিয়ে এপ্রিলের শেষদিকে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। গ্রামের বাড়ি চুনারুঘাট থানার বালিয়াড়ি থেকে বাবা হানিফ উল্লা ও মা নুরজাহান বেগমকে কিছু না জানিয়ে প্রথমে ভারতের খোয়াই শহরে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে বাঘাইবাড়ি ক্যাম্পে ট্রেনিং সমাপ্ত করে ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধীনে বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রসময় কর্মকার: স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বে সারাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজও প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। প্রতিদিনকার মিছিলে অবরোধে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উদ্বুদ্ধ তরুণ ছাত্রসমাজের উচ্চারিত স্লোগানে এ অঞ্চলও মুখরিত হতে থাকে। ১৯৬৩ সালে অধ্যয়নরত স্কুলের পাশের কর্মকার বাড়ির মৃত রসিক কর্মকারের পুত্র রসময় কর্মকার দেশমাতৃকার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হন। অতঃপর ভারতে চলে যান। অম্পিনগর ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারপর ৩ নং সেক্টরের অধীনে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যে আমাদের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিছু তরুণ যুবক কিশোর দেশমাতৃকার টানে জীবনকে বাজি ধরে নিজেদের দেশপ্রেমকে শনাক্ত করেছিলেন। তাঁদের এ অসামান্য অবদানে আমরা উত্তর প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা গর্বিত, ধন্য, মুগ্ধ। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ সকৃতজ্ঞ, বিনত অভিবাদন।

তথ্যসূত্র
১. বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৌখিক ও লিখিত বিবরণ।
২. হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড অফিস থেকে সংগৃহীত তথ্য।
৩. হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরপ্রসাদ রায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মো. আবুল হাসিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা রণবীর পাল চৌধুরী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য বিবরণী।

লেখক: আইনজীবী
মুক্তিযুদ্ধ এনসাইক্লোপিডিয়া গবেষক এবং তথ্য সংগ্রাহক



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি