ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:২৮:২১

Ekushey Television Ltd.

হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াচ্ছে স্মার্টফোন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৩:২১ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৪:০৯ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সোমবার

যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী জিন টুয়েনজ ও তার সহকর্মীরা যৌথভাবে নতুন একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করে। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে অধিক পরিমাণে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এর কারণ কি? এর অনুসন্ধানে নেমে তারা যা দেখতে পান সেটি অনেকটা চমকে ওঠার মতো। তারা বলেন, এ গবেষণায় আমরা দেখেছি সব ধরনের পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা তরুণদের মধ্যেই বেড়েছে হতাশা, আত্মহত্যার চেষ্টা ও আত্মহত্যার প্রবণতা। এর মধ্যে রয়েছে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত ও কম সুবিধাপ্রাপ্ত তরুণ, সব ধরনের সম্প্রদায় এবং সব দেশ ও অঞ্চলের তরুণরা। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, আমাদের গবেষণায় একটি বিশেষ সমস্যা উঠে এসেছে। তা হলো, ১৯৯৫ সালের পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম, যাদেরকে আমি ‘আই জেন’ হিসেবে অভিহিত করি, তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক বেশি মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে এ অল্প সময়ের মধ্যে এমন কী ঘটেছে যে এই বিশাল-সংখ্যক তরুণ হতাশায় ভুগছে, আত্মহত্যার চেষ্টা চালাচ্ছে, এমনকি আত্মহত্যা করছে। বিভিন্ন বড় জরিপের তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখলাম, এসব সম্ভ্যব্য ঝুঁকির পেছনে ভূমিকা রাখছে তরুণদের জীবনে ঘটে যাওয়া বিরাট এক পরিবর্তন। আর তা হলো স্মার্টফোনের আকস্মিক আবির্ভাব।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের শেষের দিকে স্মার্টফোনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। আর ঠিক এ সময়টাতেই তরুণদের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। ২০১৫ সালে অন্তত ৭৩ শতাংশ তরুণের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল।

তরুণদের জীবনে ২০১২ সালের কাছাকাছি সময় থেকে একটা বিপর্যয়ের শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যর্থতা ও বিষন্নতায় ভোগা (হতাশার অন্যতম প্রধান লক্ষণ) তরুণদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত একটি বড় আকারের জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতাও ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও ভয়ানক ব্যাপার হলো, মাত্র ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের তরুণ যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, তাদের সংখ্যাও বেড়ে ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে।

শুধু মাত্র স্মার্টফোনের কারণেই হাতাশা বেড়েছে তা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন। অনলাইনে কাটানো সময়ের সঙ্গেও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় জড়িত রয়েছে। আমরা দেখেছি যেসব তরুণ দিনে পাঁচ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় অনলাইনে পার করে, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি দিনে এক ঘণ্টা বা তার কম সময় ব্যয় করা তরুণদের চেয়ে অন্তত ৭১ শতাংশ বেশি। এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে হতাশা ও আত্মহত্যার কথা চিন্তা করা, আত্মহত্যার পরিকল্পনা তৈরি করা, কিংবা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানো। মোটকথা, দিনে দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় অনলাইনে কাটানোর ফলেই তরুণদের আত্মহত্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

অবশ্য এটাও সম্ভব যে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানোর কারণে হতাশা যেমন বাড়ছে, আবার হতাশার কারণেও অনলাইনের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। তবে আরও তিনটি গবেষণায় দ্বিতীয় যুক্তিটির সম্ভাবনা কম বলেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে।

এই দুইটি বিষয়ের ওপর নিরীক্ষার জন্য দুই দল মানুষের ওপর গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সময় কাটানোর অভ্যাসই মানুষকে অসুখী করে তোলে, কিন্তু দুঃখবোধ মানুষকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে ততটা উৎসাহিত করছে না। আর তৃতীয় একটি নিরীক্ষার জন্য একদল মানুষকে এক সপ্তাহের জন্য ফেসবুক বন্ধ রাখতে এবং আরেক দলকে তাদের অভ্যাসমতো ফেসবুক ব্যবহার করতে বলা হলো। দেখা গেল, যারা ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ রেখেছে তারা সপ্তাহের শেষদিকে অন্য দলের চেয়ে অনেক কম হতাশায় ভুগেছে।

মানুষ হতাশার কারণেও অনলাইনে সময় কাটাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, এ যুক্তিটি অসম্পূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায় না যে, কেন ২০১২ সালের পরেই হঠাৎ করে হতাশা এতটা বেড়ে গেল। এ যুক্তি মেনে নিলে বলতে হয়, কোনো এক অজানা কারণে লাখো তরুণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। আর হতাশা থেকে রেহাই পেতে তারা দলে দলে স্মার্টফোন কেনা শুরু করছে। এটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় না।

অনলাইনে বেশি সময় ব্যয় করার কারণে কারও মানসিক স্বাস্থ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নাও হতে পারে। এটি অন্য কোনোভাবে বিরুপ প্রভাব ডেকে নিয়ে আসতে পারে। মূলত অনলাইনে বেশি সময় কাটানোর কারণে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ এলোমেলো হয়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমি যখন আমার ‘আই জেন’ বইয়ের জন্য গবেষণা পরিচালনা করছিলাম তখন দেখলাম, এখনকার তরুণরা তাদের বন্ধুদের সঙ্গে অনেক কম সময় কাটাচ্ছে। মানুষের মধ্যে মুখোমুখি যোগাযোগ ও সম্পর্ক রাখাটা মানবীয় সুখের একটি অন্যতম গভীর উৎস। এর অভাবে আমাদের মানসিক অবস্থা বিগড়ে যায়, মন অবসাদের দিকে ধাবিত হয়। নিজেকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও একা ভাবাটাও আত্মহত্যা ঝুঁকির একটি অন্যতম কারণ।

আমরা দেখতে পেয়েছি যেসব তরুণ বন্ধুদের সময় দেওয়ার চেয়ে অনলাইনে অধিক সময় ব্যয় করে, তারা বেশি হতাশায় ভোগার ঝুঁকিতে থাকে। ২০১২ সাল থেকে তরুণরা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এমন কর্মকাণ্ডে অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে কম সময় ব্যয় করেছে। আর অনলাইনে থাকার মতো কর্মকাণ্ড যা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে তাতে বেশি সময় ব্যয় করেছে। সব দেশ, সব সমাজেরই এই হাল।

তরুণদের ঘুমানোর পরিমাণও কমছে। তরুণদের মধ্যে যারা মোবাইল ফোনে বেশি সময় কাটায় তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর অভ্যাস ব্যাপকভাবে কমছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হতাশা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সুতরাং স্মার্টফোন যদি কম ঘুমানোর কারণ হয়, তাহলে হঠাৎ করে হতাশা কিংবা আত্মহত্যার পরিমাণ কেন বেড়ে গেছে তার উত্তর একবারেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

হতাশা ও আত্মহত্যার জন্য অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ, তিরস্কার ও মানসিক আঘাত। এগুলো আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু তরুণ যে কোনো সময়ই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন, তা তারা যে যুগেরই হোক না কেন।

কিছু সুবিধাবঞ্চিত তরুণ যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা তেমন নেই, তারাও হতাশায় পতিত হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো স্ক্রিনে বেশি সময় ব্যয় করা, মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগ না থাকা ও অপর্যাপ্ত ঘুম কিংবা তিনটিই।

এখনো এ যুক্তি পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। তাই হয়তো অনেকে বলবেন, স্ক্রিনে কম সময় কাটানোর উপদেশ দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু অনলাইনে কম সময় কাটালে খুব কমই ক্ষতি হবে। অন্যদিকে এ বিষয়ে সতর্ক না হওয়াটা ডেকে আনতে পারে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতার মতো পরিণতি। আমার মনে হয় এটা অনেক বড় ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাবে। সুতরাং অনলাইনে সময় কমানোর দিন এখনও আসেনি এমনটা মোটেই নয়। বরং ইতোমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার। 

 এসি/



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি