ঢাকা, সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:২২:৫৯

Ekushey Television Ltd.

হিজড়াদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ নগরবাসী

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত : ০৮:০৮ পিএম, ২ জানুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৬:৪৪ পিএম, ৭ জানুয়ারি ২০১৮ রবিবার

রাজধানীতে চলছে হিজড়াদের বেপরোয়া আর লাগামহীন চাঁদাবাজি। আর চাঁদা না দিলে নগরবাসীকে করা হচ্ছে অপমান ও লাঞ্ছিত। ছাড় পাচ্ছেন না নারীরাও। সঙ্গে বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজন থাকলে তাদের কুরুচিপূর্ণ কথা আর অঙ্গভঙ্গির পরিমাণ বেড়ে যায়। এক প্রকার জোর করেই নগরবাসীর কাছ থেকে এসব চাঁদা আদায় করছে তারা।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মিরপুরের ১০নং গোল চত্বর, আগারগাঁও মোড়, বিজয় স্মরণী, কারওয়ান বাজার, উত্তরার জসীম উদ্দীন মোড় এবং আজমপুর সিগন্যাল, ১৩নং সেক্টরের দিয়াবাড়ি মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সিগনাল পয়েন্টে চলছে এমন চাঁদাবাজি। রিক্সা, সিএনজি কিংবা প্রাইভেট কার থামিয়ে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। আর চলন্ত বাসে উঠে যাত্রী প্রতি টাকা উঠানো হয়। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন পার্ক, উদ্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতেও রয়েছে তাদের দৌরাত্ম্য। তাদের চাঁদার পরিমাণ ১০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়। টাকা দিতে না চাইলে নগরবাসীকে অপমাণ ও লাঞ্ছিত করা হয়। কখনও কখনও শারীরিকভাবেও আঘাত করা হয়।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী চাঁদা দিতে না চাইলে চন্দ্রিমা উদ্যানে তাকে বর্বর কায়দায় পেটানো হয়। রাজধানীর সবুজবাগ থানার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদেরের বাসায় ঢুকে বাচ্চা নাচানোর নাম করে আদায় করা হয় ৫ হাজার টাকা। এ সময় তাদের টানাহেচড়ায় ৫ মাস বয়সী নবজাতকটি হাতে মারাত্মক আঘাত পায়। এভাবেই নগরবাসীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আর নিজেদের কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি দিয়ে জোর করে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, আরও ভয়াবহ তথ্য। এসব অপকর্মে জড়িত হিজড়াদের মধ্যে পুরুষ থেকে স্বেচ্ছায় হিজড়া হওয়া সদস্যই বেশি। অনেকেই আবার সুস্থ স্বাভাবিক পুরুষ হয়েও হিজড়া সেজে এসব কাজে লিপ্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র চাঁদাবাজিই নয়, তারা জড়িত হচ্ছে মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, দেহব্যবসা এবং খুনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে। নগরীতে রাতের আঁধার নেমে এলেই অনেক হিজড়ার রুপই পালটে যায়। নিশিকন্যা সেজে খদ্দের জুটিয়ে ছিনতাই করে রেখে দেয়া হচ্ছে তার সর্বস্ব।

রাজধানীর ঢাকাকে নিজেদের মধ্যে চার/পাঁচটি এলাকায় ভাগ করে নিয়ে এসব অপকর্ম চালানো হচ্ছে। পুরো শহরকে নিয়ন্ত্রণ করে এদের ৪-৫টি সিন্ডিকেট। আর দশটি সংগঠনের মতই চলে এদের সাংগঠিক কাঠামো।

এসব গ্রুপের প্রধান হচ্ছে হিজড়া গুরু সজীব (কাওরান বাজার ও এর আশেপাশের এলাকা), স্বপ্না (গুলশান, বাড্ডা ও মগবাজার এলাকা), কচি ও আপন (উত্তরা, কামারপাটা ও মিরপুর)।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিংবা টাকার ভাগ নিয়ে কখনও কখনও নিজেদের মধ্যেও সৃষ্টি হয় অন্তর্কোন্দল। এসব কোন্দলে বেশকিছু গ্রুপের হিজড়া খুনও হয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করতে নারাজ হিজড়া গুরুরা।

সজীব বলেন, আমার গ্রুপের হিজড়া সদস্যরা শুধু কাওরান বাজার এলাকা থেকে কাঁচা বাজার সংগ্রহ করে। আর কোনো অপরাধের সঙ্গে আমার গ্রুপ জড়িত নয়।

হিজড়া গুরু কচি বলেন, আমার কোনো গ্রুপ নেই। আমি কোনো গ্রুপ বা সিন্ডিকেট চালাই না। আমি একা ঘরেই বসে থাকি।

লোকলজ্জার ভয়ে আর প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতার কারনে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না অনেকেই। অনেকেই মনে করেন, প্রশাসনও এদের কাছে জিম্মি। আর তাদের এমন অপকর্মে খোদ পুলিশ সদস্যদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, হিজড়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা তাদের কাছে জিম্মি না। আর পুলিশ সদস্যদের তাদের মদদ দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কারও বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেই।

তবে মুদ্রার অন্য পাশে আছে সম্ভাবনার এক চিত্র। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে হিজড়াদের। তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য এবং অধিকার আদায়ে প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করে আসছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। অনেক হিজড়াকেই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে এসেছেন তারা। তেমনি এক উদাহরণ প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র অফিসার অনন্যা, যিনি নিজে একজন হিজড়া। তিনি জানান, শহরের সব হিজড়াদের একত্রিত করে সঠিক পথে আনার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এরজন্য সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আর দশজন মানুষকে যেমন স্বাভাবিক নজরে দেখা হয় আমাদেরকেও তেমন নজরে দেখতে হবে। আমাদের এ সংগঠন হিজড়াদের অধিকার আদায় এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা ইকরাম হোসেন বলেন, হিজড়াদের নিয়ে সমাজে সাধারণত নিচু ধারণা পোষণ করা হয়। কিন্তু তাদেরকেও আমাদের সমাজের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে যদি তাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হিজড়াদেরকে বিভিন্ন অপকর্ম থেকে বিরত রাখা যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, তারাও মানুষ আর তাদেরও কিছু মানবাধিকার রয়েছে। আশা রাখি, অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিজড়া সদস্যরাও একদিন সুপথে ফিরে আসবে।

/ডিডি/


 
 

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি