ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭ ৮:৩২:৪০

১ টাকায় চিকিৎসা দিয়ে শান্তি পান তিনি

কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৮:৫৪ পিএম, ৬ আগস্ট ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০৮:৩১ পিএম, ১০ আগস্ট ২০১৭ বৃহস্পতিবার

‘‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না...ও বন্ধু’’— কালজয়ী এ গানে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদী এ সমাজ ব্যবস্থায় সবাই যখন আত্মকেন্দ্রীক তখন প্রখ্যাত শিল্পী ভুপেন হাজারিকার গাওয়া এ গানের আবেদন ক` জনের কাছেই বা গুরুত্ব পায়। তবে সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা ভেবে সবাই যে নিজেকে গুটিয়ে রাখবে তা তো নয়। সমাজে এখনও কিছু মানুষ আছেন, যারা নীরবে-নিভৃতে মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যান। ঠিক তেমনি একজন রাজধানীর রামপুরা বনশ্রীর স্থায়ী বাসিন্দা ডা. আসমা আক্তার।

লেখাপড়া করেছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে। ২০১২ সালে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর ২০১৪ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তার কর্মস্থল ঢাকার মানিকগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

২০১৬ সালের নভেম্বরে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’ এর অধীনে পরিচালিত ১ টাকার  আহারের  কর্মসূচিতে  স্বেচ্ছাসেবী কর্মী হিসেবে যোগ দেন  ডা. আসমা।  যিনি সেচ্ছায় শ্রম দিতে এসে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমারের দাশের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসাসেবায়। আর তাই ১ টাকায় গরীব, দুস্থ ও ছিন্নমূল শিশুদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে।   

১ টাকায় চিকিৎসা সেবা নিয়ে  ডা. আসমা মুখোমুখি হয়েছেন ইটিভি অনলাইনের।

ইটিভি অনলাইন : কখন থেকে চিকিৎসা সেবা শুরু করলেন?

ডা. আসমা : ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ১ টাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করি।

ইটিভি অনলাইন : কোন কোন এলাকার মানুষ এক টাকার চিকিৎসা সেবা পান?

ডা. আসমা : মিরপুরের রুপনগরের বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ, কালসি, মিরপুর সারে ১১, বেদেপল্লী, হরিজন পল্লী, বিহারি পল্লীসহ আশে পাশের দুস্থ মানুষদের এই চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি।

ইটিভি অনলাইন : আপনার মতো সমাজে বহু চিকিৎসক রয়েছেন, যারা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে টাকা উপার্জন  করেন। অথচ, আপনি সেদিকে না গিয়ে  নিজেকে কেন দুস্থ মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দিলেন?

ডা. আসমা :   দেখুন, দুস্থ মানুষের কথা তেমন কেউই ভাবে না। আমার সুযোগ আছে সেজন্য আমি এই কাজ বেছে নিয়েছি। কীভাবে তৃণমূলের দুস্থ মানুষগুলোকে সুস্থ রাখা যায় সেই চেষ্টাই করছি আমরা। সরকারি চাকরির পাশাপাশি বলতে পারেন এটাই আমার `প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ ।

ইটিভি অনলাইন : দুস্থ মানুষের সেবা  দিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন ?

ডা. আসমা : চাকরির পর অবসরের সবটুকু সময় আমি এক টাকার চিকিৎসা সেবায় দিতে চাই। একাজ করে আমি যে  আনন্দ আমি পাই তা লাখ-কোটি টাকার চেয়ে বেশি। আমি একটা সরকারি চাকরি করি, যা বেতন পাই তাতে তৃপ্ত, এর চেয়ে বেশি টাকার প্রয়োজন বোধ করি না। অন্য সময় লাখ টাকা রোজগারের চাইতে এক টাকায় মানুষের সেবা করাই আমার কাছে পরম তৃপ্তির। এখানেই আমার সাফল্য অনেক বেশি বলে মনে করি। 

ইটিভি অনলাইন : আপনার  ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনতে চাই।

ডা. আসমা : দেশের আট জেলায় এবং রাজধানীতে সুবিধা বঞ্চিতদের চিকিৎসা দিয়ে আসছি অনিয়মিতভাবে। আমরা রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখে দিই এবং তিন দিনের ওষুধ রোগীকে বিনামূল্যে দিয়ে থাকি। ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে, যারা জলে বাস করেন তাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার।

ইটিভি অনলাইন : আমরা জানি আপনার দেয়া চিকিৎসা সেবা পেয়ে অনেক শিশু, বৃদ্ধা উপকৃত হয়েছেন। তার মধ্য থেকে এমন কি কোনো গল্প আছে যা মনে পড়লে আপনার খুব ভালো লাগে?

ডা. আসমা : হ্যাঁ , সে রকম কিছু ঘটনা আছে যা মনে পড়লে ভালো লাগে। একবার বেদে পল্লীর একশিশু জন্ম থেকে মাথায় টিউমার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অভিভাবকরা অভাবের কারণে শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিতে পারছিলেন না। এক টাকায় চিকিৎসার কথা শুনে শিশুটিকে আমাদের কাছে নিয়ে আসেন। শিশুটিকে দেখার পর তাকে মেডিকেলে ভর্তি করানোর পর থেকে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

এছাড়াও,  অন্য একটি ঘটনা বলতে পারি, একজন বয়স্ক নারী যিনি আমাদের একটাকা আহারের নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকরা খেয়াল করেন যে, মহিলাটি আর খাবার নিতে আসছেন না। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তখন তাঁকে আমরা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে সব ধরণের চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করি। এরপর তিনি সুস্থ হলে বয়স্ক মহিলাটিকে আমাদের রাজবাড়ির `পারিজাত ` অনাথ আশ্রমে রাখা হয়। এখনও তিনি সেখানেই আছেন।

কেআই/ডব্লিউএন

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি