ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮ ১০:২৮:৫২

ক্ষমা করো মুক্তামনি

ক্ষমা করো মুক্তামনি

বুধবার (২৩ মে) সকাল বেলায় ঘুম থেকেই উঠেই তোমার মৃত্যুর সংবাদটি চোখে পড়লো। ভালো থাক পরপারে। সুখেই থাক। আমাদের ক্ষমা করো তুমি। অকালেই তোমাকে নিয়তির কাছে হার মানতে হলো। হ্যাঁ সত্যিই এই পৃথিবী তাকে কিছু দিতে পারলো না। সবার সামনেই ছোট এই ফুটফুটে শিশুটিকে বিদায় নিতে হলো। হ্যাঁ এতোক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছিল সেই সাতক্ষীরায় বিরোল রোগে আক্রান্ত মুক্তামনির কথা।  বুধবার সকাল ৭টার দিকে সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয় ১২ বছর বয়সী শিশুটির। মুক্তামনির বাবা ইব্রাহিম হোসেন জানান, গত কয়দিন ধরেই মুক্তার অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। আজ ভোরে বমি শুরু হয়। একবার পানি খেতে চাইল। ওর দাদি গেল পানি আনতে। পানি আনতে আনতে সব শেষে। মুক্তামনির হাতের যখন অপারেশন চলে। তখন মুক্তামনিকে বলা হয়েছিল, তুমি আবার সুস্থ হবে। আবার স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। মুক্তামনি সেই সময় সাংবাদিকদের বলেছিল, আমি সুস্থ হয়ে আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে চাই। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। বড় হয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে চাই। মুক্তামনির সেই আশা পূরণ হলো না। সেই আশা অপূর্ণই থেকে গেলো। এই পৃথিবীর আলো-বাতাশে হেসে খেলে বেরে উঠা হলো না আর তার। জানা গেছে, তার চিকিৎসায় ত্রুটি ছিল না। যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই তার চিকিৎসার ভার নিয়েছিলেন। সবাই প্রায় সবাই আশা করেছিল মুক্তামনি সুস্থ হবেন। তার চিকিৎসার জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। এক অর্থে বলা যায়, তার চিকিৎসার ত্রুটি ছিল না। মুক্তামনির চিকিৎসা বোর্ডের অন্যতম ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।। তার মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর তিনি জানান, মুক্তামনির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর। তিনি আরও বলেন, জীবনে বহু রোগীর চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি, আবার বহু রোগীর মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু মুক্তামনির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর। ছোট্ট এ শিশুটির ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই মুক্তামনির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় নিয়ে আসতে বলে আসছিলাম। গতকালও সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে দুজন চিকিৎসককে তাদের বাড়িতে পাঠাই। বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসকরা জানায়, মুক্তামণির শারিরিক অবস্থা খুবই খারাপ। হাতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্মক (হিমোগ্লোবিনের অভাব) রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তখন মুক্তামনির বাবাকে বলি, ঢাকায় না হউক অন্তত সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার বাবা রাজি হয়নি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘স্যার, অনেক তো চেষ্টা করেছেন। ভাগ্যে খারাপ- ভালো হয় নাই। এখন মেয়েটা অনেক কষ্ট পাইতাছে। আর টানাহেঁচড়া করতে চাই না। আল্লাহর হাতে ছাইড়া দিছি। মরলে বাড়িতেই মরুক। আর আজ সকালেই তার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তামনিকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার তাকে ঢাকায় আসতে বলা হলেও মুক্তামনি রাজি হয়নি। সম্প্রতি তার শারিরিক অবস্থার অবনতি হয়। মুক্তামনির হাত আগের থেকে কয়েক গুণ ফুলে যায়। ব্যান্ডেজ খুলে পরিষ্কার করার সময় হাত থেকে বেরিয়ে আসছিল বড় বড় পোকা। এর আগে ঢামেক ভর্তি করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেখানকার চিকিৎসকরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুক্তামনির হাত দেখে আঁতকে ওঠেন। একইসঙ্গে হাত অপারেশনের জন্য অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা দেশেই অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কয়েক দফা অপারেশনও করেন। তবে হাতের কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। অবশেষে দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা সেবার পর এক মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসে মুক্তামনি। তবে পরবর্তীতে মুক্তামনি আর ঢাকায় যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। একইসঙ্গে মুক্তামনির অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় ঢাকায় যেতে নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে তার পরিবারও। আধুনিক এই যুগে সবক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান। অনেক বড় বড় অপারেশন করা হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এতো ব্যাপক আকারে হয়েছে যে তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এই ছোট ফুটফুটে শিশুটি ধুকে ধুকে মারা গেলো। বাঁচার আকুতি রেখে। উন্নত এই চিকিৎসা বিজ্ঞান তার ক্ষেত্রে ব্যর্থ। তাকে বাঁচাতে পারলো না। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের চিকিৎসা যদি সে পেতো হয়তো বা সেরে উঠতো। ছোট এই শিশুটি বুঝতে পেরেছিল সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে। তাইতো শেষ সময় আপন আলয় থেকে বের হতে চাননি। প্রশ্ন হচ্ছে দেশে দেশের বাইরে এতো উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেনো তাকে ওই নিভৃত পল্লীতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। তাকে বার্ন ইউনিটে কি রাখা যেতো না? যাতে বিশেজ্ঞ চিকিৎসকরা সব সময় দেখে রাখতে পারতেন। দীর্ঘ ছয়টি মাস ওই পল্লীতে থাকতে হয়েছে তাকে। এতে হয়তো শিশুটি ধরেই নিয়েছিল সে আর বাঁচবে না। এক প্রকার নিয়তির কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিল। তাই তো এই পৃথিবীর কাছে প্রকাশ্যে তার কোনো ক্ষোভ ছিল না। হয়তো মনের মধ্যে ক্ষোভ ছিল আমি কেনো সুস্থ হবো না। এই পৃথিবীর আলো-বাতাশ আমি কেনো আরও বেশি দিন উপভোগ করতে পারবো না। কেনো এতো দ্রুত আমাকে বিদায় নিতে হবে। হয়তো এমন প্রশ্ন মুক্তামনির মনে জেগেছিল। ক্ষমা করো মুক্তামনি। তোমাকে এই পৃথিবী সেই সুখ থেকে বঞ্ছিত করলো। তুমি হয়তো মন থেকে চেয়েছিলে আরও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি হোক। যাতে তোমার মতো কাউকে এভাবে চলে যেতে না হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মুক্তামনি ঢাকায় আসতে চায়নি। তার পরিবারও তাকে আর ঢাকায় নিয়ে আসতে চায়নি চিকিৎসার জন্য। কিন্তু তাকে কি আর ঢাকায় আনা যেতো না। তার জন্য আরেকবার কি ভাবা যেতো না। তার চিকিৎসায় যদি সফলতা  আসতো তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞান নতুন এক আর এক দ্বার উন্মোচন করতে পারতো। সে চেষ্টার ত্রুটি কি ছিল না? সব শেষে একটিই প্রার্থনা ভালো থাক মুক্তামনি পরপারে। লেখক: সাংবাদিক।
লেখালেখির অনুভূতি!

যখন তখন লিখতে ইচ্ছে করে না, তাই লেখাও হয় না। এ রকম অনেক বার হয়েছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ,  মাসের পর মাস চলে গেছে, অলস বসে আছি তো আছিই। মাথা থেকে লেখার মতন একটি  বাক্যও বের হয় না। এ যেন চৈত্র মাসে বৃষ্টি বিহনে কৃষকের হাহাকার! আবার কোনো সময় হঠাৎ একটি সুন্দর টপিক পেয়ে গেলে বসন্তের দখিন হাওয়া আপন মনে দোল দিয়ে যায়। আপনা আপনি নিজের মাঝে লেখার একটা জোর তাগিদ তৈরি হয়। তখন ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোনো ব্যাপারই থাকে না। আপন গতিতে ‘গোপন’ কথা হৃদয়ের গহিন কোণ থেকে শতঃস্ফূর্তভাবে উথলে উঠে। কেউ বলতেই পারেন, এখানে আবার গোপনীয়তার কী আছে, আছে বৈকি, লেখার আগে লেখকের সব কথাই তো গোপন থাকে! তাই নয় কি। এ সব গোপন কথা সবার আগে কে শুনতে পায়, কে জানতে পায়। যে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে বিশ্বস্ত - সে-ই তো। এবার দেখুন লেখকের আপন মানুষ কে বা কারা। তিনি তার মনের কথা, দশের কথা, দেশের কথা, লিখে ও এঁকে পৌঁছে দেন পাঠকদের দুয়ারে দুয়ারে, কারণ পাঠকই লেখকের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে ঘনিষ্ট। পাঠক ছাড়া লেখক বাঁচেন না। আর তাই, পাঠকের ‘লেখকবন্দনা’-র চাইতে, লেখকের ‘পাঠকবন্দনা’ আমার কাছে অধিক প্রত্যাশিত, যদিও বাস্তবে তা ঘটে না। তারও হয়তো বা একটি কারণ দেখানো যেতে পারে। কারণটি হলো, লেখক একজন, আর  পাঠক হাজার জন। এ যুক্তি বড়জোর একটি খোঁড়া যুক্তি, আমি মানতে নারাজ। এখন আসি আঁকার কথায়, ওই যে বললাম, লেখক লিখে ও এঁকে পাঠকের সামনে নিজেকে তুলে ধরেন, আপন মহিমায় আত্মপ্রকাশ করেন। আবারও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, লেখক তো চিত্রশিল্পী নন, তিনি আঁকেন কিভাবে? চিত্রশিল্পী নানান জাতের রঙ-তুলি দিয়ে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে আলোছায়ামাখা ছবি আঁকেন; পক্ষান্তরে লেখক কেবলই ছোট ছোট গাঢ় কালো হরফ দিয়ে তাঁর লেখনির মাধ্যমে আরেক কিসিম ছবি আঁকেন, যে ছবি রঙিন নয়, সাদা পটভূমিতে কালো কালো আঁচড়। তবে সব লেখকের আঁকা ছবি স্পষ্ট হয় না, পাঠকের চোখের সামনে ভাসে না, পাঠকরা বুঝতে পারেন না। অনেক লেখক অক্ষর দিয়ে ছবি আঁকতেও জানেন না। যাঁরা জানেন না, তাঁরা কাঁচা লেখক, আনাড়ি লেখক, আমি তাদেরই একজন। পাকা লেখকের বেলা কী হয় জানি না, তবে আমার মত লেখকের অভিজ্ঞতা বলে, লেখা শুরু করাটা একটা কঠিন কাজ বটে, কিন্তু একবার কলম চালু হয়ে গেলে, সফল অথবা বিফল, কাঁচা অথবা পাকা, লেখকের লেখকসত্তা লেখাটাকে একটা পরিণতিতে নিয়ে পৌঁছে দেয়। আবারও আমার কথা বলছি, কলম তো নয়, টুকটুক করে কম্পিউটার কি-বোর্ডে আঙ্গুল ঠুকে ঠুকে মনিটারের আলোঝলমল পর্দায় লিখি। এ কথা কে না জানে, আজকাল কাগজ-কলম আর লেখার আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ নয়। সময় ও প্রযুক্তি লেখালেখির প্রক্রিয়াকে বদলে দিয়েছে বটে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যে কোনো হেরফের হয়নি। লেখকের লেখা মানসম্মত হতে হলে - পাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করতে হয়, আবেগকে নাড়া দিতে হয়। তা না হলে লেখা শুধু লেখা হয়ে কাগজে শোভা পায় কিংবা বৈদ্যুতিক পর্দায় ভাসে, পাঠকের মনের গভীরে স্থান পায় না, পাঠককে ভাবায় না, হাসায় না, কাঁদায় না। এ-সব হলো সফল লেখার আবশ্যকীয় গুণাগুণ। সফল লেখা সময়ের প্রয়োজন মেটায়, পাঠকপ্রিয় হয়, তবে সফল হলেই একটি লেখা সার্থক হয়েছে, এ কথা বলা যায় না। সার্থক সেই লেখা, যেটা স্থায়িত্ব পায়, কালোত্তীর্ণ হয়। সার্থক লেখার জন্য আ’মজনপ্রিয়তা কোনো অপরিহার্য পূর্বশর্তও নয়। কলকাতার কোনো এক সাহিত্যিক এক বার বলেছিলেন, ‘সুখ আর আনন্দ যেমন এক নয়, লেখালেখির বেলা, সফলতা ও সার্থকতাও তেমনি আলাদা’।  লিখতে গেলে এসব গভীর তত্ত¡কথার বিপরীতে আমার মাঝে, মাঝে মাঝে  আরেকটা মনোস্তত্ত্বও কাজ করে। এমনও হয় যে, লেখার জন্য মনটা আনচান করছে, অথচ বিষয়বস্তু খোঁজে পাচ্ছি না, তাই লিখতে পারছি না। এ যেন গর্ভবতী মায়ের প্রসবযন্ত্রণা। একদিকে ব্যথায় ছটফট করছেন, আরেক দিকে ছোট্ট সোনামণির মুখ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে ও উত্তেজনায় মুখিয়ে আছেন, ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণ গুনছেন। এমন অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে লিখতে আজ যখন চাচ্ছি, একটা কিছু তো লিখতেই হবে, কিন্তু কী লিখব জানি না, তাই লেখালেখি নিয়েই লিখছি।  কেউ কেউ ভাবতে পারেন, এ আবার কেমন কথা, ‘লেখালেখি’ নিয়ে আবার কি লেখা হয়, এর বিষয়বস্তুই বা কী। আলবৎ হয় এবং এর বিষয়বস্তু আর কিছু না, লেখালেখির ভাবনা, চিন্তা, উপাদান, উপসর্গ, সমস্যা, সম্ভাবনা, সফলতা-ব্যর্থতা, সার্থকতা, লেখালেখির আনন্দ-বেদনা, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এ জাতীয় লেখা  আমি এ পর্যন্ত দু’টো লিখেছি। কেউ পড়তে চাইলে জানান দেবেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে আপনার দুয়ারে পৌঁছে দেব। বর্তমান লেখা হবে এই কিসিমের আমার তৃতীয় লেখা যেটা আপনারা এই মুহূর্তে পড়ছেন। এবার এ লেখার স্থান-কাল-পরিবেশের কথাটা একটু বলে নিই। আজ শুক্রবার, সপ্তাহের শেষ দিন। চারটে বাজতে না বাজতে পুরো অফিস প্রায় ফাঁকা। সবাই বাড়ি চলে গেছেন, তড়িঘড়ি হাতের কাজ সেরে আমিও ঘরমুখো হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। এমন সময় হঠাৎ ইচ্ছে হলো, দু’লাইন লিখি। ভাবলাম, অন্তত একটা ভূমিকা যদি সুন্দর করে দাঁড় করাতে পারি, তবে বাকিটা সপ্তাহ আন্তে বাসায় বসে শেষ করে ফেলব। যেই ভাবা সেই কাজ, সব ফেলে লিখতে বসে গেলাম। শিরোনাম দিলাম, ‘লেখকের অনুভূতি’। দু’তিন লাইন লেখার পর চিন্তা করলাম, নামটা কি ঠিক হলো। আমি লিখি, কিন্তু তাই বলে কি দাবি করতে পারি যে আমি এক জন লেখক বনে গেছি। লিখলেই তো লেখক হওয়া যায় না। লেখক হতে গেলে স্বীকৃতি দরকার। আমার তো স্বীকৃতি নেই, তাই লেখার  নামটা পাল্টে দিলাম।  স্বীকৃতি মানে কী, সরকারি পুরস্কার, পদপদবি, পদক, না, তা নয়। লেখকপরিচিতির জন্য পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা দরকার,  লেখকের লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ থাকা চাই, চাহিদা থাকা চাই।  স্বীকৃতি প্রসঙ্গে আমি অন্তত এক জন বাংলাদেশি লেখককে জানি - যিনি বহু বছর আগে আত্মমর্যাদার সঙ্গে সরকারের স্বীকৃতি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি বেঁচে আছেন, অব্যাহতভাবে লিখে চলেছেন শুধু পাঠকের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি নিয়ে। এই নিরহঙ্কার গুণী মানুষটির জীবনদর্শনের সাথে আমার মিলে না, তবু তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি নিছক তার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের নিষ্কলুষতার কারণে। শ্রদ্ধেয় ওই ব্যক্তির বিপরীতে আরও অনেকের কথা জানি, যারা সরকারি স্বীকৃতির জন্য রীতিমত দেওয়ানা হয়ে তদবির করে বেড়ান। দাম দিয়ে - অর্থাৎ নিজের বিবেক বিক্রি করে পুরস্কার কিনেন, তবে সব স্বীকৃতিপ্রাপ্তরা যে এরকম, সেকথা আমি বলি না। বুঝতে পারছি, বিষয়বস্তু না থাকলে যা হয়, আমার আজ তাই হয়েছে। লেখাটা এলোমেলোভাবে এগোচ্ছে, ছাড়া ছাড়া হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ কি, কোনোভাবেই তো গুছিয়ে আনতে পারছি না! এমন দোষে দুষ্ট লেখা আমার আরও আছে। এটাই প্রথম নয়, এটাই শেষও নয়, এ জাতীয় লেখা হয়তো বা আরও লিখব। ফিরে আসি, লেখালেখির অনুভূতি প্রসঙ্গে। আমি লিখছি মাত্র ১০ বছর ধরে। শুরুতে অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা যেমন ছিল এখন অন্য রকম। লেখালেখির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে আমার বোধশক্তিতে নিরন্তর পরিবর্তন ঘটেই চলেছে। কতেক জানা মতে, কতেক মনের অজান্তে। প্রথম প্রথম লিখতে খুব কষ্ট হতো। লেখা একেবারেই জানতাম না, লিখতে পারতাম না, লেখা হতই না, এলোমেলো লেখা - কী কাটব, কী রাখব, তাও জানতাম না। এমন ছিল, যখন আমার লেখার কোনো মান ছিল না, তখন তো আমার লেখা কেউ পড়তও না, তাই আমার কোনো পাঠকও ছিল না। এ-সব স্বত্বেও ধৈর্য ধরে চেষ্টা করতে থাকলাম, লেখা চালিয়ে যেতে লাগলাম। এক সময় এসে দেখলাম, মানুষ জন আমার লেখা পড়তে শুরু করেছে, ধীরে ধীরে আমার পাঠক তৈরি হচ্ছে। কিভাবে বুঝলাম, বুঝলাম, তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে। এ পর্যায়ে লেখালেখির অনুভূতি বিচিত্র ও বহুমাত্রিক মাত্রা পেলো! কেউ তারিফ করেন, কেউ সমালোচনা করেন, কেউ নিন্দা করেন, কেউ আবার গালাগালি করতেও কসুর করেন না! এমন জটিল, কঠিন ও অদ্ভুত পরিস্থিতিতে এর আগে জীবনে কখনো পড়িনি! এমন অবস্থায় মাথা ঠিক রাখা কঠিন! আমি এমনিতেই অস্থিরমনা পাতলা চামড়ার মানুষ, আস্তে আস্তে ধীরস্থিরভাবে ভাবতে লাগলাম, সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে নিজের কাজে অটল রইলাম। বোঝলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গায়ের চামড়া পুরু থেকে পুরু হতে লাগল। পাঠকপ্রতিক্রিয়াজনিত আনন্দ-বেদনাকে মিশিয়ে নিয়ে ‘গালাগালিকে গলাগলি’ (কথাটি কাজী নজরুল থেকে ধার করা) করেই পথ চলতে লাগলাম। আশা-নিরাশার দোলাচালের এই সংকটকালে ও সন্ধিক্ষণে আমার এক বিদগ্ধ বন্ধু- যার সঙ্গে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার তীব্র প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আড়াআড়ি ছিল, তার ইমেল পেলাম, আমার একটি লেখা পড়ে লিখেছে, ‘... you have acquired a literary skill...`  যদি বলি এতে খুশি হইনি, তাহলে মিথ্যে বলা হবে, তবে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালাম, ভাবলাম, এ কি স্তাবকতা, না, বন্ধুটি আমার তোষামোদ করার বান্দা নয়। যা বুঝেছে, অকপটে তাই বলেছে। তার এ কথায় নতুন করে সাহস পেলাম, উৎসাহ পেলাম। লেখা অব্যাহত গতিতে চলল। এভাবে আরও কয়েক বছর যাওয়ার পর দেখলাম, আমার লেখালেখি জীবনে একটি বাঁক বদল হয়েছে, আমার মাঝেই আমার এক উত্তরণ ঘটেছে! নির্দিষ্ট কোন মুহূর্তে সে কথা বলা মুশকিল। এখন আর লেখালেখিতে কষ্ট হয় না, বিরক্তি আসে না, এখন লিখতে গেলে আনন্দ পাই। এ প্রসঙ্গে বাকি কথা বলার আগে আরেকজন লেখকের কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কী করে এত এত লিখেন, এতে কি তার কষ্ট হয় না, বিরক্তি আসে না, জবাবে  হুমায়ূন আহমেদ যে কথা বলেছিলেন, সে বয়ান যদি আমার মুখে শুনেন, তা হলে এ রকম দাঁড়াবে। হাটবাজার, রান্নাবান্না বাদ দিলেও শুধু খাওয়াটাই একটা কঠিন কাজ। খাদ্যসামগ্রী মুখে পুরতে হয়, সাবধানে চিবাতে হয়, নিরাপদে গিলতে হয়। লোকমার সঙ্গে যদি ইলিশ কিংবা চিতল মাছের কাঁটা অথবা গরু-ছাগলের হাড্ডির ছোট্ট ভগ্নাংশ থাকে, তা হলে কাজটা নিঃসন্দেহে আরো জটিল ও কঠিন হয়ে যায়, কিন্তু তাই বলে কি খেতে কারো কষ্ট হয়, বিরক্তি আসে, খাওয়াদাওয়ায় কি কেউ কখনো অনীহা প্রকাশ করে, না, তা করে না।  কারণ আল্লাহ্ আমাদের জিহ্বায় ‘টেস্ট বাড্’ দিয়েছেন, তাই যত কষ্টই  হোক না কেন, খেতে আমাদের মজা লাগে, খাওয়ায় আমরা আনন্দ পাই এবং মনেপ্রাণে  তা  উপভোগ করি। একইভাবে  লেখালেখি যেহেতু হুমায়ূন আহমেদের খুবই ভালো লাগার মতন একটি কাজ, তাই লিখতে তাঁর কোনো কষ্ট হত না, বিরক্তিও আসত না, বরং সৃষ্টির আনন্দে লেখাকে তিনি দারুণভাবে উপভোগ করতেন এবং আজীবন করে গেছেন! কথাটা আমি প্রথম যখন শুনেছিলাম তখন এর মর্মার্থ কিছুই বুঝিনি। এখন বুঝি, অক্ষরে অক্ষরে অনুধাবন করি, বুঝি এর মানে কী। এখন লেখায় আনন্দ পাই, ভীষণ আনন্দ, যার কোনো তুলনা হয় না! এ আনন্দ সঠিকভাবে ভাষায় প্রকাশ করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি যখন লিখি, লিখতে বসি, নিজের লেখা নিজে পড়ি, পড়তে পড়তে কখনো হাসি, কখনো কাঁদি, কাটাকাটি করি, ছাঁটাছাঁটি করি, একটা একটা করে শব্দ বসাই, শব্দাবলী দিয় বাক্য বানাই, পছন্দ হলে আপন আনন্দে আপনি ভাসি। তার বিপরীতে অপাংক্তেয় শব্দ খুঁজে খুঁজে রেব করি, কসাই যেমন গোশ্ত  থেকে চর্বি কেটে  কেটে ফেলে দেয় আমি সেগুলো নিষ্ঠুরভাবে নির্দ্বিধায় ছেঁটে ফেলে দিই। একটি সুন্দর কথা যখন যোগ করি তখন যেমন ভালো লাগে তেমনি আরাম পাই যখন একটি বেখাপ্পা শব্দ কিংবা বাক্য অথবা বাক্যাংশ লেখা থেকে বাদ দিয়ে দিই। যোগে যেমন আনন্দ, বিয়োগেও তাই! এমন আনন্দ অন্য কোথাও আছে কি না জানি  না। লেখালেখির আনন্দ ব্যক্রিমধর্মী, এ কথা বলাই বাহুল্য। যোগ-বিয়োগ অর্থাৎ লেখা আর কাটা-ছাঁটা- এ দুই নিয়েই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা। লিখতে লিখতে আনন্দ আহরণ করা, এ আমার লেখকসত্তার এক অপূর্ব ও অভাবনীয় প্রাপ্তি! আমার জন্য এ এক মধুর ও তৃপ্তিদায়ক  উত্তরণ! এটা  একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়, সুখের বিষয়! এর মানে এই নয় যে আমি লেখক হয়ে গেছি।  লেখক হয়েছি কিনা, সে বিচারের ভার পাঠকদের ওপর। শুরুতে শুধু পাঠকদের জন্য লিখতাম, এখন আমি কেবল তাদের জন্যই লিখি না, নিজের জন্যও লিখি, লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। লিখতে লিখতে আপন ভ‚বনে আপনি মজে থাকি, দু’হাতে আনন্দ আহরণ করি, একা একা উপভোগ করি, লিখতে বসলে সময় কিভাবে গড়িয়ে যায় টেরও পাই না। এখন আমার পাঠক না পড়লেও আমি লিখব। আমার জন্য, নিজের জন্য। তবে এ লেখা হবে ব্যক্তি হিসেবে, লেখক হিসেবে নয়। লেখক নাম নিতে হলে পাঠকের চাহিদা থাকতেই হবে। লেখালেখিতে আমার মাঝে যে উত্তরণ ঘটেছে, তেমনি আমি আমার জীবনে আরেকটি উত্তরণের আশায় আশায় দিন গুনছি। সেটি হবে জীবনের চ‚ড়ান্ত উত্তরণ, আমার ব্যক্তিসত্তার, মনুষ্যসত্তার, চারিত্রিক দৃঢ়তার ও সর্বোপরি আমার বিশ্বাসের অঙ্গীকারের। এ নিয়ে পৃথক একটি লেখার সুযোগ আছে বৈকি। লিখতে পারব কিনা জানি না, আদৌ লিখব কিনা, সময় এলে ভেবে দেখব।  লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক -টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি। এসএইচ/

শেখ হাসিনার হাতেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

একাত্তরে স্বাধীনতার পর উন্নত দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশকে আখ্যায়িত করেছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে। সময়ের পরিক্রমায় সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। এমডিজি লক্ষ্য অর্জন, মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজি অর্জনের দৌঁড়েও এগিয়ে বাংলাদেশ নামের ছোট্ট লাল সবুজের মানচিত্রটি। দারিদ্র্যের শেকল ভেঙে সম্ভাবনার এই দেশটি আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের প্ল্যাটফর্মেও এগিয়ে। কর্মসংস্থান তৈরি, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট বা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়ও দিয়েছে বাংলাদেশ। যাদের পেছনে প্রতিবছর বাংলাদেশকে গুণতে হচ্ছে বাজেটের বাড়তি অর্থ। পাশাপাশি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা সূচকের প্রতিটিতেই অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে। এসব অর্জনের পেছনের রহস্য একজন বিচক্ষণ রাজনীতিকের যোগ্য নেতৃত্ব। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু তনয়া, দেশের দুঃখী মানুষের ভাগ্য বদলের নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের এই স্বীকৃতি অর্জন সমাদৃত বিশ্বব্যাপীও। তাই তো বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের স্বীকৃতি যেমন এসেছে জাতিসংঘ থেকে। তেমনি এর পুরোধা নেতৃত্বের সাফল্য গাঁথার স্বীকৃতিও আসছে নানা দেশ ও বিশ্বজনীন নানা প্রতিষ্ঠান থেকে। এর সবশেষটি গ্লোবাল উইমেনস লিডারশীপ। নারী নেতৃত্বে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে সম্মানজনক ‘ গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি সিডনিতে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশসহ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের বিষয়ে শেখ হাসিনার অনবদ্য নেতৃৃত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব উইমেন এই পুরস্কার দেয়। এর অর্থ সহজেই বলা যায়, একটি ভূ‚-অঞ্চলের নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবদান রেখে চলেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। যদিও আন্তর্জাতিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন নয়। গত আট বছর এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর আগেও ২৭টি পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন গণতন্ত্রের এই ধারক। তিনি সফল নেতা আর সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই স্বীকৃতি বিশ্ব অধ্যায়ে বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রাপ্তি। এ পুরস্কারগুলোর মধ্যে শেখ হাসিনা চারটি পেয়েছেন জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে। এর মধ্যে আছে, পার্বত্য শান্তি চুক্তি করায় ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক হাটপাওয়েট- বোজনি পুরস্কার, শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে ২০১০ সালে এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য পরের বছর সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে পাওয়া চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার। সবশেষ সংযোজন এই গ্লোবাল উইম্যান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড। এই পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী যে নারীরা বিশ্বকে পরিবর্তন করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করছেন তাদেরকে উৎসর্গও করেন তিনি। ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে একটি সুষ্ঠু, অধিকারভিত্তিক, লিঙ্গ বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন সাধারণের অনন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা। অতীতের কোনো সরকার তাঁর মতো বাংলাদেশের রাজনীতিক ইতিহাসে ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিক ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারীর মূল্যায়নে এমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি যতবার ক্ষমতায় এসেছেন নারীর ক্ষমতায়নে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। সিডনিতে ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ নেওয়ার আয়োজনে গিয়ে তিনি নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করতে কাজ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। একই সাথে এই অ্যাওয়ার্ড সেই সব নারীদের উৎসর্গ করেছেন, যে নারীরা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজেদের ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। পুরস্কার গ্রহণ করার পর তিনি নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ৪ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। নারী অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি একটি জোট গঠনেরও তাগিদ দেন। নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে তুলে ধরা প্রস্তাবনায় রয়েছে নারীর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রচলিত একমুখী ধারণা পরিহার করা। প্রান্তিক ও ঝুঁকির মুখে থাকা নারীরা এখনো কম খাদ্য পাচ্ছে, স্কুলে যেতে পারছে না, কম মজুরিতে কাজ করছে এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছে। যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থার দাবি। কারণ, উন্নয়ন যাত্রায় কোনো নারীকেই পেছনে রাখা উচিত নয়। তৃতীয়ত, নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা। আর চতুর্থত, জীবন ও জীবিকার সব ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম- সে দিনের বক্তব্যে এ বিষয়টিও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদক নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু তনয়া ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কবল থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কথা স্বরণ করিয়ে দেন। তুলে ধরেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নারীদের অবদানও। মুক্তিযুদ্ধে দুই লক্ষ সম্মান হারানো নারীদের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের জন্য ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি তাদেরকে বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের সংবিধানে নারী পুরুষের সমতার কথাও তুলে ধরেছেন উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এই মহাপথিক। নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা এবং নিজ দেশের স্বার্থে দলকে সংগঠিত করে সার্বিক উন্নয়নের শুরুর কথাও উল্লেখ করেন অন্যদের অনুপ্রেরণার জন্য। তাঁর জার্মানিতে থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালে পিতাসহ পরিবারের ১৮ সদস্যকে খুন করা হয়। সে সময়েরও ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরতে পারেন তিনি। এরপর বাঙালি এক নারী পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে দুঃসহ স্মৃতির রক্তক্ষরণকে জয় করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। লড়াই করছেন শুধু গণতন্ত্রের জন্যই নয়, সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধেই। যাতে প্রতিষ্ঠা পায় শান্তি ও মানবতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বেই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে ইতোমধ্যে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এই সাফল্যের দিকে তাকালেই আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, এই পরিকল্পনাও তাঁর মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ, তিনি শান্তি ও মানবতার অগ্রদূত হিসেবে আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও প্রশংসিত একটি নাম। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি এখন বিশ্ব মিডিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। একটি দেশের উন্নয়নে দরকার বিপুল অর্থের যোগান। পদ্মাসেতুসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পেই কখনো সখনো বিশ^ সম্প্রদায় বা উন্নয়ন সংস্থাগুলো প্রত্যাশিত সহযোগিতা করতে গড়িমসি করেছে। কিন্তু দেশের উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে এসবকে থোড়াই কেয়ার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একক সিদ্ধান্ত ও কঠোর দৃঢ়তায় নিয়েছেন উন্নয়নের বড় সব মেগাপ্রকল্প। সড়ক যোগাযোগের অন্যতম নেটওয়ার্ক হলো সেতু। নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। জননেত্রী শেখ হাসিনার একক উদ্যোগের কারণেই পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রস্থাপন করছে বাংলাদেশ। তাঁর সাফল্যের ভান্ডারে সম্প্রতি যোগ হয়েছে মহাকাশ জয়ের সাফল্য। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ এখন মহাকাশে। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সব সূচকে অগ্রগতি, সাফল্য আর উন্নয়নের ফানুস উড়িয়েই যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এমন কোনো খাত নেই, যে খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, মাতৃত্ব এবং শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যা দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেট এক্সপ্রেসহ আরো কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। দেশের আইটি খাতের নতুন সম্ভাবনা যশোরে ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’ উদ্বোধন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের শাসন আমলেই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সবসময় নিজেকে দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতায় বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও গোষ্ঠীর চাপ সত্তে¡ও শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচার শেষে রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই বিচার করতে পারা স্বাধীন বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছরে ডিজিটাইজেশনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করছে। ভূমি ব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের ফলে মানুষের দুর্ভোগ কমছে। ই-টেন্ডারিং, ই-জিপির ফলে দুর্নীতি কমছে। ১০ টাকায় কৃষক ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগছে। বাংলাদেশের সাফল্য গাঁথায় এমন ঘটনা অজস্র, অসংখ্য। কাজেই বলা যেতে পারে, শেখ হাসিনার দৃঢ় ও অবিচল নেত্বত্বেই এগিয়ে চলছে দেশ। চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের মত আলো ছড়াচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের স্থপতি শেখ হাসিনা। তাঁর নেত্বত্বে আগামীতে দেশ এগিয়ে যাবে, সামিল হবে উন্নত দেশের কাতারে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এই মুহর্তে তাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপকার গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। বিশ্বব্যাপী সমৃদ্ধতার আলো ছড়াক বাংলাদেশ, দীর্ঘজীবী হোন এই নেতৃত্বের ক্যাপ্টেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, এফবিসিসিআইইমেইল : muntakim.tito@gmail.com টিকে

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে শেখ হাসিনার অবদান পর্যালোচনা

সেদিনটি ছিল বৃষ্টি ঝরা দিন। আজ থেকে সাইত্রিশ বছর আগে। ভোর থেকেই ঝরছিল আকাশ চিরে মেঘভাঙা বৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে রহমতের আব; তিনি সম্ভবত বেছে নিয়েছিলেন এদিনটিকে রহমতের দিন হিসেবে। বৃষ্টি মাথায় লাখো মানুষের কলকোলাহলে মুখরিত বিমানবন্দরের চত্বরে বিমান থেকে নেমেই এসে দাঁড়ালেন সৌম্যকান্তির সেই মেয়েটি যিনি এখন একজন পরিণত ব্যক্তিত্ব। চোখে তার দুনিয়ার ভালোবাসা এদেশের প্রতিটি মানুষের জন্য। তুমুল করতালি আর জয় বাংলা স্লোগানের গমগম রবে কেঁপে ওঠা হিমেল হাওয়ায় জনসম্মুখে এসে অকুতোভয় বাবার মতো কান্নাভেজা নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন ‘আমি নেতা নই। সাধারণ মেয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী। বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য প্রয়োজন হলে এই সংগ্রামে পিতার মতো আমিও জীবনদান করতে প্রস্তুত।’ জনগণ বুঝল, যাকে যা মানায়, তাকে সে কথাই বলতে হয়। তিনি তা-ই করলেন। তখনকার জটিল-কুটিল-সংঘাতময় বাংলাদেশের ক্ষুব্ধ মানুষরা বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থানে বসালেন তাকে অতি ভালোবাসায়, মুগ্ধ হৃদয়ে। শুরু হল এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম তারই চৌকস নেতৃত্বে।নির্বাসন থেকে এসেছিলেন তিনি স্বৈরাচারকবলিত পঁচাত্তরের ঘাতক চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের শাসিত বাংলাদেশে। দিনটি ছিল একাশি সালের সতেরো মে। এমন সময় যখন অপসৃত হয়ে যাচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, তিরিশ লাখ শহীদের রক্তরঞ্জিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তির আশা। গণতন্ত্র তো পঁচাত্তরেই নিঃশেষ। চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া হল সেই চার জাতীয় নেতাকেও, যারা ধরতে পারতেন বঙ্গবন্ধুর হাল। এমন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন তিনি, যেখানে বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের জাঁতাকলে ঘাতকদের বিচার বন্ধ, মাফ পেয়ে গেলেন তারা সব দায় থেকে। পঁচাত্তরের ঘাতকরা পুরস্কৃত আর শাসনক্ষমতার গদিতে সমাসীন, জাতীয় পতাকাশোভিত সরকারি গাড়িতে বসে স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালন, দেশের ইতিহাস বিকৃত, লালবাতি গণতন্ত্রের ঘরে, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঢামাঢোল, সমগ্র জাতি সুনেতৃত্বশূন্য, অর্থনীতি প্রায় বিধ্বস্ত। এমনতর জরাজীর্ণ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন আবেগময়ী, সংবেদনশীল, দেশপ্রেমী অকুতোভয় সেই কাক্সিক্ষত নেতা, যার জন্য অপেক্ষা করছিল বারো কোটি বাঙালি। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, বাইগার নদীর তীরে হাওয়ায় ভেসে ছুটতে ছুটতে সফেদ ঢেউ গুনতে গুনতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া সেই চপলা বঙ্গকন্যাটি। যার মনের কোণে গ্রামের সরলতা আর হৃদয়ে শ্যামল বাংলাদেশ। তিনি কী আর বসে থাকতে পারেন সেনাকুঞ্জের শাসকদের মতো আয়েশী ভঙ্গিতে আরাম কেদারায়? সঙ্গে সঙ্গেই নেমে পড়লেন আসল কাজে, রাষ্ট্রকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত থেকে বাঁচাতে।দেশের মাটিতে পা রেখে যা যা করার কথা তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেছেন। তার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতৃত্বে অল্প সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। অর্জন তার অনেক। তুলে ধরলাম এখানে কয়েকটি। এক. জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে যেটি সামনে চলে আসে, তাহল মহাকাশে বাংলাদেশের অবস্থান। এই তো মাত্র এক সপ্তাহ আগে ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে নিজেদের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শেখ হাসিনার এই অর্জন বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল মাইলফলক হয়েই থাকবে না, এক সময় যারা আমাদের তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অবজ্ঞা করেছিল, তাদের প্রতিও এটি জবাব হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া তার দিকনির্দেশনায় বেশ কয়টি ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত বিশ্বজয় ধরা দিয়েছে। এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী জামদানির বুননপদ্ধতি, বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ এবং সর্বশেষে বিশ্ব নির্বস্তুক ঐতিহ্যের তালিকায় বাংলাদেশের শীতলপাটির বয়নপদ্ধতি। এর অনেক আগে তো একুশে ফেব্র“য়ারির জন্য আদায় করেছেন জাতিসংঘের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এতসব অকল্পনীয় অর্জন সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতিকে দিয়েছে কয়েক ধাপ এগিয়ে। দুই. প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হল জাতীয় গ্রিডে। ২০০৯ সালের প্রথমদিকে যেখানে মাত্র ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হতো ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, সেখানে বর্তমানে ১১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১৬,০০০ মেগাওয়াটের বেশি আর ২০২১ সালের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪,০০০ মেগাওয়াট। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির যে কমিটমেন্ট তিনি করেছিলেন ক্ষমতায় আরোহণের সময়, তা তিনি পূরণ করে দেখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্বের ভিশন আর সবলতা থাকলে অবশ্যই উন্নয়নের দিশা পাওয়া যায়। তিন. বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী ছিল যে মঙ্গা, আশ্বিন-কার্তিকের ভয়াবহ খাদ্য সংকট, তা এখন জাদুঘরে। খাদ্যে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে অর্জন করেছে প্রায়-স্বয়ংসম্পূর্ণতা। তা হয়েছে অনেক কারণে- সারের দাম কমানো, সাবসিডি দেয়া, গ্রামে গ্রামে কৃষির জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সরকারি প্রণোদনার কারণে কৃষিতে নতুন নতুন উদ্ভাবন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ, অভাবী জনপদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৃষিক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধি, কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া ইত্যাদি। চার. নিন্দুকদের চেহারায় ধুলোর ঝাপ্টা দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন দৃশ্যমান। বাংলার সব নাগরিকের নাগালে এসেছে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা। সরকারি তথ্যাবলি আর সেবা জনগণের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। প্রায় সব ইউনিয়নে ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করে সেখান থেকে প্রদান করা হচ্ছে ২০০ ধরনের সেবা। জাতীয় তথ্য বাতায়ন নামে পঁচিশ হাজার ওয়েবসাইটসমৃদ্ধ বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েব পোর্টাল তৈরির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে সারা দেশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পথ। পাঁচ. বাংলাদেশে যেসব জনগোষ্ঠী সবচেয়ে অবহেলিত ও সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত, বয়স্ক, শারীরিকভাবে অক্ষম, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত, গ্রামীণ দরিদ্র নারী, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী- এদের সবার আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নেয়া হয়েছে ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যা আগে ছিল অকল্পনীয়। ছয়. সারা দেশে বল্গাহীন টেন্ডারবাজি কোন্ সুদূরে পালিয়েছে। ই-টেন্ডার সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বস্তি এনে দিয়েছে। কাজকর্মে স্বচ্ছতা এনেছে ই-গভর্ন্যান্স। সাত. তিনি তার প্রিয় দল আওয়ামী লীগকে উন্নয়নের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। আওয়ামী লীগ এখন কমিটমেন্ট রক্ষা করতে সক্ষম সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে জাতির সঙ্গে এ দল যেসব ওয়াদা করেছিল- ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার, বিদ্যুৎ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, শিল্পায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ইত্যাদি সবই ক্রমান্বয়ে পূরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সবকিছু হয়তো কাঁটায় কাঁটায় মিলবে না; কিন্তু অতীতের তুলনায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও তার প্রমাণ মিলছে। আট. বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন তিনি। পলাতকদের দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান। এখানেই শেষ নয়। ’৭১-পরবর্তী পশ্চিমাদের অবহেলা আর অবজ্ঞার বুলি ‘বাংলাদেশ ইজ এ বট্মলেস বাসকেট’ আজ দৃষ্টান্ত গড়েছে বিশ্বে। আইনের শাসন, মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন, নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, সিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান, মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের দোরগোড়ায় পৌঁছা, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, ১০১ জন মানুষকে হত্যাকারী মুফতি হান্নানের ফাঁসির মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের নির্মূল করা, নারীর ক্ষমতায়ন, ইন্টারনেটসহ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন, সমুদ্র জয়ের মাধ্যমে বিশাল সীমানা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা অর্জন, উচ্চশিক্ষায় নারীদের ভর্তির হার প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীতকরণ, মেয়ে শিক্ষার্থীদের মাসিক উপবৃত্তি, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই ৩৬ কোটি পাঠ্যবই বিতরণ, মাদ্রাসাসহ সব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা, এমডিজি সাফল্য বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা আজ নজর কেড়েছে সমালোচকদেরও। এত দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারেনি বিশ্বের কোনো দেশ। ফলে আজ বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তারা। নয়. মাথাপিছু আয় এক হাজার ছয়শ’ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। নিুমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের দোরগোড়ায়। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা থাকলে প্রত্যাশা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করবে। দশ. এই প্রথম বাংলাদেশ তার নেতৃত্বে একটি সর্বজনগ্রাহ্য যুগোপযোগী শিক্ষানীতি পেয়েছে, যার বাস্তবায়ন দেশে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে সর্বপ্রথম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার পথ সুগম করেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংখ্যাগত ও গুণগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জেন্ডার সমতা অর্জন, উচ্চশিক্ষায় নারীদের ভর্তির হার প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীতকরণ, মেয়ে শিক্ষার্থীদের মাসিক উপবৃত্তি প্রদান, শতাধিক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ- এসব তারই যোগ্য নেতৃত্বের ফসল। শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই প্রায় ৩৬ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে সারা দেশে পৌঁছে দিয়ে বিরল নজির সৃষ্টি একমাত্র বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তারই অনুপ্রেরণায়। এগার. বাঙালি জাতির গর্ব শেখ হাসিনার আপোষহীন মনোভাব ও নির্দেশনার ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পে-স্কেলে আমূল পরিবর্তন এনে ইনসেন্টিভ প্রদান, রাজনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রত্যেক সেক্টরে তথ্য ও প্রযুক্তির ছোঁয়া, নিজ অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ, সবই তার সাহসী পদক্ষেপ। তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমতাসীন হয়েও ক্ষমতায় নির্মোহ। শতভাগ সততা নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী নেতৃত্ব দিয়ে ২১শে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে বিশ্ব-স্বীকৃতি আদায় করেছেন। বার. ২০১৭ সালে তিনি তার সততার জন্য পেয়েছেন বিশ্ব-স্বীকৃতি, ৩য় স্থানে অবস্থান সৎ নেতা হিসেবে। মিয়ানমার থেকে দশ লক্ষাধিক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মায়ের মমতা দিয়ে আশ্রয় দেয়ায় বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছেন, আখ্যা পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও সহযোগিতা আদায় করেছেন। বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থার বিস্ময়কর ও ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে, সন্দেহ নেই। প্রচুর সম্ভাবনাময় এ দেশটি আগামী তেরো বছরে আটাশতম বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে পারে যদি বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, বাংলাদেশের পর্যাপ্ত ব্র্যান্ডিং করা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে সুপ্ত সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং সর্বোপরি, জনগণের মধ্যে স্বস্তির আবহ বজায় রাখা যায়। তবে ব্যাংকিং সেক্টরের ভঙ্গুরতা, সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে নাজুকতা, অর্থনীতির প্ল্যানিং ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অপর্যাপ্ততা, দ্রুত নগরায়ণ, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতির অভাব, দুর্বল অবকাঠামোগত সূচক ইত্যাদি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় হুমকিস্বরূপ। তাই প্রয়োজন উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সঠিক মাস্টারপ্ল্যান এবং সরকারের ধারাবাহিকতা, যাতে বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষে জ্ঞাননির্ভর প্রশাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। একটি নিু-আয়ের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন উন্নয়ন-উপযোগী নেতৃত্ব। বাংলাদেশে এরূপ নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। ফলে উন্নয়নের মহাসড়কে চলার গতি বেড়েছে, বাড়তে থাকবে যদ্দিন তিনি নেতৃত্বে থাকবেন। প্রফেসর ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

জয়যাত্রায় জননেত্রী

‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আমরা এখন ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হয়েছি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম এখন অনন্য উচ্চতায় উঠেছে। প্রতিবছর ১৭ মে যখন আমাদের জীবনে ফিরে আসে, তখন স্মৃতির পাতায় অনেক কথাই ভেসে ওঠে। তবে তিনটি কারণে এবারের ১৭ মে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত `বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট` মহাকাশে উৎক্ষেপণ। এর আগে আমরা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের লাইসেন্সপ্রাপ্তির মাধ্যমে `নিউক্লিয়ার নেশন` হিসেবে বিশ্ব পরমাণু ক্লাবের সদস্য হয়েছি। আর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের গৌরবময় সুনাম এবং মহত্তর অর্জনের এই বীজ রোপিত হয়েছিল সেদিন, যেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা-১৯৮১-এর ১৭ মে ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে, স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে `৮১-এর ১৭ মে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এ বছর তার ৩৭তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বার্ষিকী। শেখ হাসিনা যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, সেদিন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, ছিল সর্বব্যাপী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ। সামরিক স্বৈরশাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত স্বদেশে তিনি হয়ে ওঠেন আলোকবর্তিকা তথা অন্ধকারের অমানিশা দূর করে আলোর পথযাত্রী। `৮১-এর ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন। কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন তিনি। একই বছরের ১৭ মে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বৃষ্টিমুখর দিনে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। লাখ লাখ মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে বিমানবন্দরে সমবেত হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলেছিলেন স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া। তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, `মানি ইজ নো প্রবলেম` এবং `আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর পলিটিশিয়ানস`। জেল-জুলুম, হুলিয়া, গুম-খুন ইত্যাদি ছিল নিত্যকার ঘটনা। রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যে `৭৭-এর ৩ ও ৪ এপ্রিল মতিঝিলের হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সমবেত হয়। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। এক বছর পর `৭৮-এর ৩ থেকে ৫ মার্চ ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। শ্রদ্ধাভাজন নেতা আবদুল মালেক উকিল সভাপতি, শ্রদ্ধেয় নেতা আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক ও কারান্তরালে থাকা অবস্থায়ই আমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয়। সেই দুর্দিনে জাতির জনক ও জাতীয় নেতাদের অনুপস্থিতিতে দলকে সংগঠিত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। `৮১-এর সম্মেলনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জীবন-পণ চেষ্টা করে সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে আওয়ামী লীগের ঐক্য ধরে রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করেছিলাম। সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে সবার সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি যখন দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যার নাম প্রস্তাব করি, তখন তা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। সেকি আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সেকি দৃশ্য! চোখের সামনে সেই ছবি ভেসে ওঠে। মনে হয়েছে, আমরা আবার বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে, যে রক্তের কাছে আমরা ঋণী, যে ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না, সেই রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনার হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিয়ে ঋণের বোঝা কিছুটা হয়তো হালকা করতে পেরেছি। শেখ হাসিনা সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আবদুর রাজ্জাক এবং আমি পুনর্নির্বাচিত হই। কাউন্সিল অধিবেশনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে শেখ হাসিনা একটি বার্তা প্রেরণ করে বলেছিলেন, `আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এগিয়ে যান।` দলের শীর্ষ পদ গ্রহণে শেখ হাসিনার সম্মতিসূচক মনোভাব সম্পর্কে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে আমি বলেছিলাম, `আমরা সকলেই একটি সুসংবাদের অপেক্ষায় আছি।` শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গণবিরোধী স্বৈরশাসকের ভিত কেঁপে উঠেছিল। `৮১-এর ১৭ মে দেশে ফিরে আসার আগে জেনারেল জিয়ার নির্দেশে `শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি` গঠন করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমরা। বিমানবন্দরে অবতরণের পর লাখ লাখ লোক তাঁকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছিল। সেদিন মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুই যেন শেখ হাসিনার বেশে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। মঞ্চে উঠে তিনি শুধু ক্রন্দন করলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হৃদয়ের আবেগ ঢেলে সেদিন বলেছিলেন, `আজকের জনসভায় লাখো চেনা মুখ আমি দেখছি। শুধু নেই প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাই, আরও অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। স্বামী-সংসার-ছেলে রেখে আপনাদের কাছে এসেছি। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমি এসেছি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই। আবার বাংলার মানুষ শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হচ্ছে। আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি। শোষণের মুক্তি। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। আজ যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আজ স্বাধীনতা-বিরোধীদের হাতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। ওদের রুখে দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের ভার সরকারের কাছে নয়, আমি আপনাদের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।` শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটানা ১৪ বছর দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (তখন একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল) হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও কাছে থেকে কাজ করেছি। এ ছাড়াও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। আমার বারবার মনে হয়েছে, যখন তাঁর কাছে বসি বা কেবিনেট মিটিং করি বা সভা-সফর করি, তখন বঙ্গবন্ধুর কথা স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। দীর্ঘ ২১ বছর পর `৯৬-এ তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন। আমি সেই মন্ত্রিসভার শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম। কাছে থেকে দেখেছি, দৃঢ়তা ও সক্ষমতা নিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। `ইনডেমনিটি বিল` বাতিল করে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করে জাতির জনকের বিচারের কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই বিচার বন্ধ করে দেয়। আবার ২০০৮-এর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে তিনি শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজই সম্পন্ন করেননি, মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ করে চলেছেন এবং ইতিমধ্যে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শেষ করে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত ৯ বছরের বেশি আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। এই ৯টি বছরে শেখ হাসিনা দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। জাতির জনককে আমরা হারিয়েছি। আমাদের প্রিয় দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যদি সেদিন দেশে থাকতেন, খুনিচক্র তাদেরকেও হত্যা করত। সেদিন জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে বঙ্গবন্ধুর রক্তে গড়া আওয়ামী লীগের পতাকা আমরা তুলে দিয়ে সঠিক কাজটিই করেছিলাম। রক্তেভেজা সেই পতাকা হাতে তুলে নিয়ে দল ও দেশকে তিনি প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ভাষায়, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি চমৎকার। এটা আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেনের ভাষায়, সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক সূচকের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকে এগিয়ে। অনেক বড় বড় প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করার পরেও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে আজ তা সমাপ্তির পথে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেলপথ, বঙ্গবন্ধু সেতুতে পৃথক রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ, মেট্রোরেল, এলিভেটরি এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ সর্বমোট ১১৯টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩,২০০ থেকে ১৬,১৪৯ মেগাওয়াট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩.৫ থেকে ৩৩.০৪ বিলিয়ন ডলার, রফতানি আয় ১০.৫২ থেকে ৩৪.৪২ বিলিয়ন ডলার, পায়রা বন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.২৮ শতাংশ করে জনগণের মাথাপিছু আয় ১৬১০ ডলারে উন্নীত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, `বাংলাদেশ ২০১৩ নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়ে উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নেবে।` সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের এসব কৃতিত্বের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত ১৪টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ২০০৮-এর নির্বাচনে রূপকল্প তথা ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেছিলেন তিনি; যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং মধ্যম আয়ের দেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ স্বপ্ন না বাস্তব। ২০২১-এ যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে, তখন আমরা পরিপূর্ণভাবে মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করব। শেখ হাসিনা যা বিশ্বাস করেন, জাতির জনকের মতো তাই তিনি বলেন এবং বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। জাতির পিতা দুটি লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা; আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন; কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই কাজটি দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অনেক দূর এগিয়ে গেল, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে মর্যাদাশালী ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। আমরা সেই পথেই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি। ইনশাল্লাহ বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। এটাই জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে আমাদের প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।tofailahmed69@gmail.com এসএইচ/

মায়ের স্বপ্ন: সৈয়দ নুরুলইসলাম   

সম্ভবত: ১৯৭৭ সাল। আমার মেট্রিক পরীক্ষার বছর। অভাব অনটনের সংসার। দুবাই ফেরত ছোট মামার সাথে মায়ের কোন এক বিকেলে রান্না ঘরে বসে আলাপচারিতার কিছু কিছু শব্দ পাশের ঘরের মাটির দেয়ালের ফাঁক গলে আমার কানে আসছিল। ছোট মামার মুখে মেঝ ছেলের প্রসঙ্গ শুনে কান খাড়া করতেই শুনতে পেলাম, মামা বলছেন `বুবু তোমার ১০ ছেলে মেয়ের এই অভাবের সংসারে তোমার মেঝ ছেলেকে দুবাই পাঠিয়ে দাও। বড় ছেলের একার পক্ষে এতবড় সংসারের বোঝা টানা সম্ভব হবেনা`।      মা উত্তরে মামা কে বলেছিলেন, না ভাই, আমি আমার ছেলেকে দুবাই পাঠাবোনা। আমার বড় ছেলে এম.কম পাশ করেছে। মেঝ ছেলেকেও আমি এম.কম পাশ করাবো। তাহলে আমার বাকি চার ছেলে এম.কম পাশ করবে। প্রয়োজনে আমি তার বাবার জমি বিক্রি করে তাকে এম.কম পাশ করাবো। মামা হতাশ হয়ে বললেন, ভালোভাবে চিন্তা করে দেখ। আমি দুবাই ফিরে গিয়ে ভিসার ব্যবস্থা করবো। মা আবারও মামাকে বলল, না ভাই, আমার ছেলে এম.কম পাশ করে একদিন দুবাইতে বেড়াতে যাবে। টাকা কামাতে না!!তুমি দোওয়া করো। মা তোমার সেই দিনের সাহসী সিদ্ধান্ত শুধু আমাকে না, তোমার ৬ ছেলেকে আজ মহান আাল্লাহ পাক কতদূর নিয়ে এসেছে। আমরা সবাই তোমার স্বপ্নের এম.কম পাশ। তোমার নাতি নাতনিরা আজ বিলাত বা আমেরিকায় পড়ালেখা করে- কেউ দেশে ফিরেছে, কেউ দেশে ফেরার অপেক্ষায়। তোমার ছেলে মেয়েরা আজ সত্যি সত্যি দুবাই সহ দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। আশির দশকে তোমার যে ছেলে স্বপ্ন দেখেছিল ফ্রিজ টেলিভিশনের মেকানিক হয়ে দুবাই গিয়ে সংসারের হাল ধরবে। সেই ছেলে তোমার সেইদিনের এক সাহসী সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ঠিকানা ওয়েল গ্রুপের পতাকা হাতে বাকি ৫ ভাইয়ের হাত ধরে আজ পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। মা, আমার কাছে প্রতিটা দিন মায়ের দিন। প্রতিটা দিন মা দিবস। ঘুম থেকে উঠে তোমার সঙ্গে ফোনে কথা না বলে ঢাকায় আমার দিন শুরু হয়না। তারপরও আজ বিশ্বব্যাপী সব ছেলে মেয়েরা মায়ের কথা ভাবছে। তাই আমিও তোমাকে নিয়ে আজ আলাদা করে ভাবছি। মা দিবসে তোমার প্রতি আমার অনেক অনেক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা। আমার জীবনজুড়ে তুমি, তুমিই আমার জীবন, তুমিই আমার প্রান। তুমিই আমার ঠিকানা। (ফেসবুক থেকে নেওয়া) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ওয়েল গ্রুপ। এসি  

চাকরিজীবী মা ও আমার শৈশব

`মা` শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে আপন শব্দ একজন সন্তানের কাছে। মাকে নিয়ে ঘিরে থাকে সন্তানদের অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি। শৈশব যেন মা ছাড়া চলেই না। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। হ্যাঁ, আমি একজন চাকরিজীবী মায়ের সন্তান। আমার শৈশব মায়ের স্মৃতিতে কিছুটা অস্পষ্ট বই কি !! এখনও মনে আছে, ছোট বেলায় আমরা ৫ বন্ধু একসঙ্গে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার বাকি ৪ বন্ধুর মা স্কুলে নিয়ে যেত তাদেরকে। আমার বন্ধুদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা রিক্সা ঠিক করা হয়েছিল। মাঝে মধ্যে আমারও জায়গা হয়ে যেত সেই রিক্সায়। না হয়, বেশীর ভাগ সময় আমি, আমার ভাইয়ার সঙ্গে রিক্সার পিছনে হেঁটে হেঁটে, দৌঁড়ে দৌঁড়ে স্কুলে যেতাম। বুঝতাম, আমার মা চাকরিজীবী, রিক্সা ঠিক করার সময় পান না। বেশি খারাপ লাগতো পরীক্ষার সময়। তখন কেজি, ওয়ান, টু তে পড়ি। প্রথম পরীক্ষার দিন আম্মু সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। হলে নির্ধারিত সীটে বসিয়ে দিয়ে একটু আদর করে আম্মু বলতন, ‘ভালো করে পরীক্ষা দিও মা। আম্মু রাতে এসে প্রশ্ন দেখবো। আম্মুর অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আম্মু এখন যাই?’ চুপচাপ ছোট্ট মেয়েটি, শুধু মাথা নিচু করে হ্যাঁ বলতাম। আম্মু স্কুলের পেছনের ফটক দিয়ে চলে যেতেন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। আমার মা যখন অফিসের উদ্দেশে হেঁটে চলেছেন চরম ব্যস্ততায়, তখন আমার বন্ধুদের মা একবার পেন্সিল বক্স ঠিক করে দিচ্ছে, একবার পানি খাওয়াচ্ছে, একবার বই খুলে কী কী যেন পড়াচ্ছে। কত আয়োজন!! অংকন পরীক্ষার দিন আমার বন্ধুদের মায়েরা জানালা দিয়ে দেখতো আর বলতো, ‘কীভাবে এঁকেছ দেখি। এটা এই রঙ করো, ওইটা ওই রঙ করো।’ আমি শুধু একবার আন্টিদের দিকে ,একবার আমার বন্ধুদের দিকে তাকাতাম। অথচ তখন আমার মা হয়তো ব্যস্ত থাকতেন অন্যের চেকের লিখা ঠিক আছে কিনা, টাকা ঠিক মত গোনা হয়েছে কি না এসব নিয়ে। টিভি, সিনেমায় দেখেছি, বাস্তবে বন্ধুদের মাকে দেখেছি, স্কুল থেকে ফেরার পর তাদের আম্মু খাইয়ে দিতেন, জামা কাপড় গুছিয়ে দিতন। আমার স্মৃতিতে মায়ের সঙ্গে তেমন কোন দৃশ্য নেই। শুনেছি আমি যখন খুব ছোট ৫/৬ মাস। একটু একটু বসতে শিখেছি তখন বাসায় কাজের মেয়ে না থাকায় আমাকে গ্রামে নানু বাড়িতে রেখে আসা হয়েছিল। মাঝে মধ্যে আব্বু-আম্মু গিয়ে দেখে আসতেন। একবার আব্বু গিয়ে নাকি দেখেন আমি মাটিতে বসে আছি। আর মাটি থেকে ময়লা নাকি কী যেন কুড়িয়ে কুড়িয়ে মুখে দিচ্ছি। ওই বয়সের স্মৃতি মনে থাকার কথা না। আমারও মনে নেই। কিন্তু ভাবতে পারেন, যেই বয়সে সন্তানেরা মায়ের দুধ খায়, মা–বাবার কোলে কোলে থাকে আমি মাটিতে বসে বসে মাটি খাচ্ছি। তারপর আবার আমার বয়স যখন ১৩-১৪ মাস, তখন আমাকে আমার বড় জেঠির কাছে রেখে আসা হয়েছিল। উনারাই গল্প করতন, আমি নাকি কিচ্ছু খেতাম না। মুরগির সঙ্গে খেতাম। মজার না বিষয়টা!! চাকরিজীবী মায়ের সন্তান আমি, আমাকে আর আমার মাকে ওই বাস্তবতাই মেনে নিতে হয়েছিল। বুদ্ধি হবার পর থেকে প্রায়-ই অসুস্থ থাকতাম। আম্মুকে অভিমান করে বলতাম, আমাকে অন্যদের কাছে ফেলে রেখেছিলা। উনারা যত্ন নেয় নাই। তাই আমি অসুস্থ থাকি। উনারা শুনলে বলতেন, তোর মা চাকরিজীবী। তোর মায়ের থেকে বেশি যত্ন আমরা নিয়েছি। কিন্তু মা-তো মা-ই হয়। চাকরিজীবী মায়েদের সন্তানেরা নাকি তাড়াতাড়ি `ম্যাচিউর` হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে এই `ম্যাচিউর` শব্দটাকে আমি অনেক ভয় পেতাম। আমার কাছে ম্যাচিউরিটি মানে হচ্ছে মায়ের সান্নিধ্য কম পেয়েই ধীরে ধীরে বড় হওয়া। তাই আমি আজো `ম্যাচিউর` হতে চাই না। আমার মতো প্রতিটি চাকরিজীবী মায়েদের সন্তানদের গল্প কিছুটা একই ধরনের। আমরা মাকে খুব কাছে পেয়েও দূরে দূরে থেকেই বড় হয়ে যাই। তাই তো, আমার বন্ধুরা যখন বাসার গল্প বলত বেশিরভাগ সময়জুড়ে থাকতেন তাদের আম্মু। আর আমাদের গল্প থাকতো কাজের মেয়ে অথবা অন্য কিছু নিয়ে। কথায় আছে, মা–মেয়ের উচ্চতা এক হয়ে গেলে মা-মেয়ে বন্ধু হয়ে যায়। আমার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয় নি। এখন আমি আর আমার মা সবচেয়ে ভালো বন্ধু। এখনও আমার মা চাকরিজীবী, আমিও চাকরিজীবী। এখনও সমান ব্যস্ততায় ব্যস্ত হয়ে সংসার করে যাচ্ছেন। এখনও কোনো কারণে আম্মু বাসায় থাকলে মনে হয় আজ শুক্রবার।  বড় হতে হতে আম্মুর যতটা কাছাকাছি এসেছি ততই বুঝতে পেরেছি, আমরা আম্মুকে যতটা না মিস করেছি, আম্মু তার চেয়ে অনেক বেশি মিস করেছে আমাদের ছোটবেলাকে। আম্মুর কাছে থেকেও উনার সান্নিধ্য না পাওয়ায় যতটা অভিমান আমাদের ভেতর আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অভিমান আম্মুর নিজের প্রতি আছে ছেলে-মেয়েকে সান্নিধ্য দিতে না পারার কারণে। আর সেজন্যই আম্মু ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে কোনোদিন কিছুর জন্য না করতেন না। যখন যেটা চেয়েছি দিয়েছে। যখন যেটা করতে চেয়েছি, সেটাই করতে দিয়েছেন। এটাই মায়ের ভালোবাসা। কোনো দিক দিয়ে একটু কমতি পড়লে, আরেক দিক দিয়ে পুষিয়ে দিতেন। তাই তো মায়ের প্রতি ভালোবাসাটাও অন্য রকম থাকে। আজ বিশ্ব `মা দিবস`। সব চাকরিজীবী ও গৃহিণী মায়েরদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব মা। আল্লাহ প্রতিটি সন্তানের ভাগ্যে মাকে দীর্ঘজীবী করুক এই কামনা। আর ভালোবাসা সেই সব সন্তাদের প্রতিও যারা বাস্তবতার খাতিরে মায়ের কাছে থেকেও মায়ের সান্নিধ্য কম পেয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যায়। অথচ কোনো অভিযোগ রাখে না। / এআর /

আমি রাজাকার : একটি আলোকচিত্র

১.আমি শেষবার এই কথাটি শুনেছিলাম ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাসে। তাড়া খাওয়া পশুর মতো দেশের নানা জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঢাকা এসে আশ্রয় নিয়েছি। তখন দেশের অন্য যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময় পাকিস্তান মিলিটারি যে কোনো মানুষকে অবলীলায় মেরে ফেলতে পারত। সেই হিসেবে ঢাকা শহর খানিকটা নিরাপদ। দেশটা ঠিকমতো চলছে দেখানোর জন্যে এখানে প্রকাশ্যে এক ধরনের শান্তিপূর্ণ অবস্থা দেখানো হয়। তারপরেও কম বয়সীদের অনেক বিপদ, তারা রাস্তাঘাটে বেশি বের হয় না। মাথায় লম্বা চুল থাকা রীতিমতো বিপজ্জনক। একদিন আমি বিপদ কমানোর জন্যে নীলক্ষেতে একটা নাপিতের দোকানে চুল কাটাচ্ছি। তখন হঠাৎ করে সেখানে একটা মানুষ এসে ঢুকল এবং আমার পাশের খালি চেয়ারটাতে খুব আয়েশ করে বসে নাপিতের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল। আলাপের বিষয় বস্তু সে নিজে, এখন সে কী করে তার কত রকম সুযোগ-সুবিধা এবং ক্ষমতা ইত্যাদি ইত্যাদি। নাপিত এক সময় মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করেন?’ মানুষটি দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘আমি রাজাকার।’মানুষটি খানিকক্ষণ গালগল্প করে যেভাবে এসেছিল সেভাবে চলে গেল। নাপিত তখন একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে আমাকে বলল, ‘হারামজাদা রাজাকারের ভাবটা দেখেছেন? শালার ব্যাটার কথা শুনলে মনে হয় দেশটা তার বাপের সম্পত্তি!’১৯৯১ সালে রাজাকারদের সম্পর্কে এর চাইতে সম্মানজনক কোনো বিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমি মনে করতে পারি না। রাজাকার কী বস্তু এ ব্যাপারে এখনো যাদের সন্দেহ আছে তাদেরকে আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যেতে বলব। সেখানে এক জায়গায় একটা রাজাকারের অন্য একটা রাজাকারের কাছে লেখা একটা চিঠি বড় করে টানানো আছে। সেখানে একজন পাকিস্তানি মেজরের নাম উল্লেখ করে বলা আছে, মেজর সাহেব ভালো ‘মাল’ পছন্দ করেন তাই প্রত্যেক দিন তাকে যেন একটি করে মেয়েকে ধরে এনে দেওয়া হয়!আমরা যারা ১৯৭১ দেখেছি তাদের কাছে রাজাকারদের চাইতে ঘৃণিত কোনো প্রাণী আছে বলে মনে করতে পারি না। রাজাকারেরা নিজেরাও সেটা জানত, তাই তারাও যে খুব বড় গলায় গর্ব করে বুকে থাবা দিয়ে ‘আমি রাজাকার’ বলে বেড়িয়েছে সেরকম মনে করতে পারি।তাই ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে যখন দেখি একজন ছাত্র নিজের বুকে ‘আমি রাজাকার’ কথাটি লিখে গর্ব ভরে দাঁড়িয়ে আছে আমি সেটি বিশ্বাস করতে পারিনি। মাথায় আগুন ধরে যাওয়া বলে একটা কথা আছে, এই কথাটির প্রকৃত অর্থ আমি এই ছবিটি দেখে প্রথমবার সেটি অনুভব করেছি।২.ঢাকা শহরের মানুষকে জিম্মি করে আন্দোলন করার জন্য আমি যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। (সেই সময়ে আমার মেয়ে হাসপাতালে ছিল তাই ঢাকা শহরকে জিম্মি করে ফেললে হাসপাতালে রোগীদের কী ধরনের কষ্ট হয় আমি নিজে সেটা জানতে পেরেছি।) সেই লেখার কারণে অনেক ছাত্রছাত্রী প্রতিবাদ করে আমার কাছে লম্বা লম্বা মেইল পাঠিয়েছিল। আমার লেখালেখির প্রতিক্রিয়া আমি কখনো পড়ি না, আমার ধারণা তাহলে এক সময়ে নিজের অজান্তেই পাঠকদের প্রশংসাসূচক বাক্যের জন্যে লিখতে শুরু করব। পাঠকেরা আমার লেখা পড়ে কী ভাবছে আমি যদি সেটি না জানি তাহলে নিজের মতো করে লিখতে পারব। কাজেই কোটাবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের লেখা সবগুলো মেইল আমি না পড়েই ফেলে দিয়েছি, তারা কী লিখেছে আমি জানি না।তবে আমার সেই লেখাটি আমি যখন লিখেছিলাম তখন আমি জানতাম না এই বহুল আলোচিত কোটাবিরোধী আন্দোলনের অন্য একটি সাফল্য হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে তরুণ সম্প্রদায়কে রাজাকার হিসেবে অহংকার করতে শেখানো, তাহলে অবশ্যই আমি ঢাকা শহরকে জিম্মি করার মতো সাধারণ একটা বিষয় নিয়ে লিখতাম না। একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া তরুণদের পচে গলে পূতিগন্ধময় রাজাকার নামক আবর্জনায় পরিণত হয়ে যাওয়া নিয়ে আমার ঘৃণাটি প্রকাশ করতাম।কিন্তু প্রশ্ন হলো বিষয়টি আমার জানতে এতো দেরি হলো কেন? আমি ফেসবুক করি না, সামাজিক নেটওয়ার্কে সময় নষ্ট করি না সত্য কিন্তু আমি তো খুবই সম্ভ্রান্ত একটা ইংরেজি দৈনিক নিয়মিত পড়ি, ইন্টারনেটে খুবই জনপ্রিয় নিউজ পোর্টালে দিনে কয়েকবার চোখ বুলাই তাহলে কোটাবিরোধী আন্দোলন করে যে বাংলাদেশের মাটিতে নূতন রাজাকারের পুনর্জন্ম হয়েছে, এই দেশের তরুণেরা নিজেদের রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ব করতে শিখেছে আমাদের সংবাদ মাধ্যম সেই খবরটি আমাদেরকে কেন জানাল না? তারা যে সামাজিক নেটওয়ার্কের কোনো তথ্য প্রকাশ করে না তা তো নয়। আমাকে একটা বিভ্রান্ত তরুণ খুন করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর ফেসবুকে আফসোস করে কিংবা আক্রোশ প্রকাশ করে যে উক্তিগুলো লেখা হয়েছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় বিশাল বড় করে ছাপানো হয়েছে সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এখানে বরং একটা উল্টো ব্যাপার ঘটেছে, কোটাবিরোধী আন্দোলনটি যে একটি “অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের আন্দোলন ‘তার ওপর আমি বুদ্ধিজীবীদের বড় বড় লেখা দেখেছি। অর্থাৎ সংবাদ মাধ্যম এই আন্দোলনটিকে একটি ইতিবাচক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। এই আন্দোলনের কারণে যে মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জন হয়েছে এবং রাজাকারদের পুনর্জন্ম হয়েছে তাতে এই দেশের সম্ভ্রান্ত দৈনিক পত্রিকার কিছু আসে যায় না। কে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাকে কে দিবে?৩.প্রথম যখন কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয় এবং সাংবাদিকেরা আমার বক্তব্য জানার আগ্রহ দেখায় তখন আমি সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছি এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছি কোটার বড় একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্যে, কাজেই কোটার বিরুদ্ধে কথা বলার সময় খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। কোনো ভাবে যেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান দেখানো না হয়। আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা কিছুই দিতে পারিনি এখন যদি জীবনের শেষ মুহূর্তে তাদের প্রতি অসম্মান দেখাই সেটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যাবে না।আমি ঠিক যে বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম সেটাই ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের চরমভাবে অসম্মান করেই শেষ হয়ে যায়নি, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটা আগে কখনো ঘটেনি সেটাও ঘটেছে—রাজাকার শব্দটিকে সম্মানিত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে এবং রাজাকারদের জন্যে ভালোবাসা দেখিয়ে যে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে সেগুলো এত অশালীন যে আমার পক্ষে মুখ ফুটে উচ্চারণ করা সম্ভব না। যদি কারও কৌতূহল থাকে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করে সেগুলো বের করে দেখতে পারে।আমি কখনোই বিশ্বাস করব না যে, এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছেলেমেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে, রাজাকারদের জন্যে ভালোবাসা দেখিয়েছে। সেরকম কিছু ঘটলে আমাদের সবার গলায় দড়ি দিতে হবে। কিন্তু যেটুকু ঘটেছে সেটাও তো কোনোভাবে ঘটার কথা নয়। যে বিষয়টি আমাকে ক্ষুব্ধ করেছে সেটি হচ্ছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কেউ বিষয়টার প্রতিবাদ করেনি। যারা আন্দোলন করছে তাদে কেউ বলেনি আমরা কখনোই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান দেখাইনি, রাজাকারদের জন্যে ভালোবাসা দেখাইনি, যারা দেখিয়েছে তাদের জন্যে আমাদের ভিতরে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নেই।আমি বহুদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি, আমি অনেক আন্দোলন দেখেছি। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন সবসময়েই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন হয়, যদি আন্দোলনটি দানা বাঁধতে শুরু করে তখন রাজনৈতিক দলগুলো সেই আন্দোলনটি নিজেদের কূটকৌশলে ব্যবহার করার জন্য ‘হাইজ্যাক’ করে নেয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যদি যথেষ্ট বুদ্ধিমান হয় তাহলে আন্দোলনটির নেতৃত্ব নিজেদের হাতে রাখতে পারে। যদি তারা বুদ্ধিমান না হয় তখন নেতৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যায়। এই আন্দোলনটির বেলায় কী ঘটেছে আমি জানি না। আমার একজন সহকর্মী একাত্তর টেলিভিশনে এই আন্দোলনের একজন নেতার সাক্ষাৎকার দেখিয়েছে—সেটা দেখে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। রাজাকার প্রীতির বিষয়টা তখন খানিকটা বোঝা যায়।আমরা যারা ১৯৭১ দেখেছি তাদের জন্যে মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটি একটি তীব্র আবেগের ব্যাপার। মুক্তিযোদ্ধার অসম্মান কিংবা রাজাকারের পুনর্বাসন আমাদের কাছে শুধু একটি ঘটনা নয় এটি আমাদের কাছে জাতীয় বিপর্যয়। নূতন প্রজন্ম কখনো সেটি আমাদের মতো করে অনুভব করতে পারবে কি না আমরা জানি না। (যদি নিজের একটা চাকরির জন্যে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে, রাজাকারদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় সেটি আমরা কখনো মেনে নেব না।৪.আমি যতদূর জানি বেশ অনেকদিন থেকে এই কোটাবিরোধী আন্দোলন চলে আসছিল কিন্তু যে কারণেই হোক আন্দোলনটি সেভাবে দানা বেঁধে ওঠেনি। তারপর হঠাৎ করে এক রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা রণক্ষেত্রে রূপান্তরিত হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বাসাটি গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেওয়া হলো এবং দেখতে দেখতে আন্দোলনটি দানা বেঁধে উঠল। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রছাত্রীরা জন্মেও এই চাকরির পিছনে দৌড়াবে না, আমি দেখলাম তারাও হঠাৎ করে এই কোটাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্যে ছুটে গেল!যারা বিষয়টা লক্ষ্য করেছেন তারা সবাই কারণটা অনুমান করতে পারেন। এই আন্দোলনটা দানা বেঁধে ওঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য। এখন হয়তো অনেকের মনে নেই, বিএনপি-জামায়াত আমলে দৌরাত্ম্যটি ছিল ছাত্রদল এবং শিবিরের। মোটামুটি বলা যেতে পারে এই আন্দোলনটা ছিল ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ। বছর কয়েক আগে আমি নিজের চোখে ‘জয় বাংলা’ এবং ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগের মাস্তানদের শিক্ষকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি। কাজেই তারা ছাত্রছাত্রীদের ওপর কী পরিমাণ নির্যাতন করতে পারে সেটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। কাজেই পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে যখন ছাত্রলীগের কর্মীরাও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনটা দেখতে দেখতে একটা জনপ্রিয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ এর আগে কখনো আসেনি।কিন্তু এর পরের অংশটি বেদনাদায়ক। ছাত্রলীগের ওপর যে বিতৃষ্ণাটুকু ছিল সেটি খুবই কৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করার কাজে ব্যবহার করা হলো এবং দেখতে দেখতে সেটি রাজাকারদের প্রতিষ্ঠা করায় কাজে লাগিয়ে দেওয়া হলো।আমার দুঃখ শুধু এক জায়গায়, হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কেউ এর প্রতিবাদ করে কিছু করল না কেউ কিছু বলল না!৫.যারা বিসিএস ক্যাডারে চাকরি পায় তাদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্যে সাভারে বিশাল একটা প্রতিষ্ঠান আছে। সেই প্রতিষ্ঠানটি মাঝে মাঝেই আমাকে আমন্ত্রণ জানায় এই বিসিএস ক্যাডারদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য। আমি সুযোগ পেলে সেখানে যাই এবং এই তরুণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলি। বেশির ভাগ কথা হয় দেশ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কথা বলা শেষ হলে অবধারিতভাবে ছবি তোলা শুরু হয়, আমি আগ্রহ নিয়ে সবার সঙ্গে ছবি তুলি।কোটাবিরোধী এই আন্দোলনটি ছিল আসলে চাকরি পাওয়ার আন্দোলন। এই সফল আন্দোলনের পর আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই চাকরি পাবে এবং তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই সাভারে ট্রেনিং নিতে যাবে। এটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয় যে হয়তো আমি তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলব।কথা শেষ হলে কোনো একজন নেতা হয়তো এসে আমাকে পরিচয় দিয়ে বলবে, আমি ২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন করেছিলাম খবরের কাগজে আমার ছবি ছাপা হয়েছিল, আমার বুকে লেখা ছিল, ‘আমি রাজাকার’। তখন আমি অবধারিত ভাবে গলায় আঙ্গুল দিয়ে তার ওপর হড় হড় করে বমি করে দেব।লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসএ/  

কৃত্রিম উপগ্রহের যুগে বাংলাদেশ

মানুষ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। এটি শুধু এ কারণে নয় যে, প্রকৃতি জগতে মানুষই সবচেয়ে সুন্দর অবয়বের সৃষ্টি। এটি এ কারণেও নয় যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই একমাত্র উদ্ধত প্রাণী, আর সব সৃষ্টি অবনত। বরং এ করণে যে, মানুষ প্রায় একশ বিলিয়ন নিউরনে তৈরি তার মস্তিষ্কটি ব্যবহার করে সমগ্র প্রকৃতি জগতটিকে বশ করার দু:সাহস দেখিয়েছে। আমরা যে মহাবিশ্বে বসবাস করি তার ব্যাপ্তি বিশাল। বিজ্ঞানীরা এগুলো নিয়ে বিস্তর চিন্তা ভাবনা করেছেন। এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তাঁরা আমাদের দিয়েছেন সে হিসেবে আমাদের এই মহাবিশ্ব প্রায় একশ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বিস্তৃত! হিসাবটা সহজ করে দেখে নিই। আলো প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে যায়। এই গতিতে আলো সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড। এই গতিতে আলো এক বছর যেতে থাকলে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে তাকে বলে, এক আলোক বর্ষ দূরত্ব। এই রকম দশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরত্বকে বলা হয় এক মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব। আর এক হাজার মিলিয়নে হবে এক বিলিয়ন। আমাদের মহাবিশ্বের বিস্তৃতি হলো একশ বিলিয়ন আলোকবর্ষ! এই বিস্তৃত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আছে প্রায় একশ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি। এক ট্রিলিয়ন মানে এক হাজার বিলিয়ন। একশ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সির মধ্যে আমরা যেটাতে আছি সেটার নাম মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে আছে অগণিত সূর্য। আমাদের আকাশগঙ্গাতেও আছে অসংখ্য সূর্য। এক একটি সূর্য নিয়ে এক একটি সৌরপরিবার। আমাদের সৌর জগতের মা-বাপ হলো সূর্য। এই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতেছে নয়টি গ্রহ। আমাদের পৃথিবীও তেমনি একটি গ্রহ। পৃথিবী নামক এই গ্রহে অসংখ্য প্রাণী আছে। তার ভিতরে আমরাই একমাত্র প্রাণী যারা সমস্ত জগতের অপার রহস্য ভেদ করার দু:সাহস দেখিয়ে বসে আছি! সেজন্যেই আমরা মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। আমরা জানি এই মহাবিশ্বের প্রকাণ্ড এইসব কর্মকাণ্ড বেহুদা নয়। এখানে বহু প্রাকৃতিক নিয়ম আছে যা মানব কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা শুধু চিন্তা করেই ক্ষান্ত হয়ে বসে রইলো না। তারা কাজেও লেগে গেলো। বিজ্ঞানীরা দেখলো যে, গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, তারা আবার নিজেদের অক্ষের উপরও ঘুরছে। গ্রহগুলোকে কেন্দ্র করে আবার ঘুরছে তাদের উপগ্রহগুলো। আমাদের পৃথিবীর উপগ্রহ হলো চাঁদ মামা। কোন কোন গ্রহের একাধিক উপগ্রহ আছে। যেমন, মঙ্গল গ্রহের আছে ২টি উপগ্রহ, নেপচুনের ১৩টি, ইউরেনাসের ২৭টি,  শনি ৩৪ টি আর  বৃহস্পতির ৬৩ টি উপগ্রহ।  বিজ্ঞান বললো, এরা গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে গ্রহের চারদিকে ঘুরছে। চিন্তাশীল মানুষেরা চিন্তা করে। চিন্তা থেকে কবি সাহিত্যিক আর শিল্পীরা গড়ে তোলেন কল্প। আর কল্প থেকে কেউ কেউ গড়ে তোলেন গল্প চিত্রকল্প। তেমনি একটি মজার কল্পকাহিনীতে কৃত্রিম উপগ্রহের ধারনা দেন একজন মার্কিন গল্পকার ১৮৬৯ সালে। এডওয়ার্ড ইভারেট হেল নামের সেই ছোট গল্পকার ‘দ্য ব্রিক মুন’ নামের এই গল্পে দেখান, একটি দুইশ ফুট ব্যাসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ভিতরে বসে যন্ত্রটির চালকরা ভুল বোতামে চাপ দেন। তারপরে যন্ত্রটি নিজেই পৃথিবীর বাইরে চলে যায় এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। এই হলো গল্প। এই গল্পের একশ বছর পর অ্যাপোলো ১১ যানে চড়ে মানুষ ঠিকই চাঁদে পৌঁছে গেছে। ১৯০৩ সালে ‘এক্সপ্লোরিং স্পেস ইউজিং জেট প্রপালশন ডিভাইসেস’ নামের বইয়ে কৃত্রিম উপগ্রহের ধারনার প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন কনস্তানতিন সিলকভোস্কি। তারপর ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর মহাকাশ যাত্রার প্রথম পদক্ষেপটির সূচনা করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা প্রথম উৎক্ষিপ্ত কৃত্রিম উপগ্রহটির নাম দেন ‘স্পুটনিক-১’ ।  স্পুটনিক মানে হলো ভ্রমণসঙ্গী। সেই একই বছর ২ নভেম্বর তারা মহাকাশে পাঠান ‘স্পুটনিক-২’, যেটি লাইকা নামের একটি কুকুরকে বহন করে নিয়ে যায় । তখন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে চলছিলো জেদাজেদি,--শক্তি, চিন্তা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি আর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিযোগিতা। ১৯৫৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মার্কিনিরা মহাকাশে প্রথম ‘এক্সপ্লোরার-১’ নামের কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়। তারপর ভস্টক-১ নামক সোভিয়েত কৃত্রিম উপগ্রহ মানুষ নিয়ে প্রথম পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। প্রথম মহাকাশচারী মানুষ হন সোভিয়েত আদম সন্তান ইউরি গ্যাগারিন।  তিনি ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ভস্টক-১ এ চড়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন। প্রথম সোভিয়েত মহিলা মহাকাশচারী ভেলেন্তিনা তেরেসকোভা মহাকাশে ঘুরে আসেন ১৯৬৩ সালে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত ৫৬টি দেশ থেকে কয়েকহাজার স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এই যাত্রায় হলো ৫৭তম দেশ। তবে পৃথিবীর মাত্র ১০ টি দেশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ও নিজস্ব উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশগুলো হলো- সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৫৭), যুক্তরাষ্ট্র (১৯৫৮), ফ্রান্স (১৯৬৫), জাপান (১৯৭০), চীন (১৯৭০), যুক্তরাজ্য (১৯৭১), ভারত (১৯৮০), ইসরায়েল (১৯৮৮), ইউক্রেন (১৯৯২) ও ইরান (২০০৯)। বর্তমানে মহাকাশে সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার, বাকিগুলো নিষ্ক্রিয় আর দিকভ্রান্ত। আর উৎক্ষিপ্ত উপগ্রহগুলোর ভিতরে কর্মক্ষম প্রায় অর্ধেক হলো যুক্তরাষ্ট্রের। এই যে এত এত কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো হচ্ছে মহাকাশে, এর কাজ কী তাহলে! আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিশ্বজগত দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।‘ হ্যা, কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বিশ্বজগতটাকে আমাদের আপন হাতের মুঠোতে এনে দিয়েছে। পৃথিবীর যেকোন দেশের যেকোন অনুষ্ঠান আমরা এখন ইউটিউবে দেখতে পারি হাতের মুঠোতে মোবাইলে। যেকোন জ্ঞান গুগলে সার্চ দিয়েই আমরা পেতে পারি মোবাইলে, ল্যাপটপে। যেকোন দেশের মানুষের সাথে আমরা মুহূর্তে যোগাযোগ করতে পারি, কথা বলতে পারি, ছবি দেখতে পারি। পৃথিবীর তাবত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) অবস্থান নির্ণয়, গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড, জরিপ ও সেনা সংশ্লিষ্ট কাজে কৃত্রিম ব্যবহার করা হয়। মোটকথা মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেলিভিশন বা রেডিও চ্যানেলের সম্প্রচার কাজ, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রযুক্তি, আকাশ-সড়ক ও জলপথে দিক নির্ণয় ও নির্দেশনায়, দূর সংবেদনশীল অনুসন্ধান, মাটি বা পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজে, মহাশূন্যে উদ্ভাবন ও আবিষ্কার, ছবি তোলা ও তথ্যসংগ্রহ, বন্যা-ঝড়সহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনা ও বিপর্যয়ের পূর্বাভাসে উপগ্রহের সাহায্য নেওয়া ছাড়া এই যুগ চলবেনা। তাহলে যাদের নেই তারা কিভাবে চলছে, আমরা কিভাবে চললাম এতদিন ! যাদের নেই তারা, যাদের আছে তাদের থেকে সেবা কিনে চলে তাদের মর্জির উপর ভর করে। এছাড়া বিভিন্ন রশ্মি শনাক্তকরণ, দুর্গম অঞ্চলে উদ্ধারকাজে সহায়তা, তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন খনি শনাক্তকরণ ইত্যাদি কাজেও কৃত্তিম উপগ্রহের ভূমিকা আছে। আমরা এবার বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করলাম। এর ফলে দেশের সম্প্রচার খাতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়সহ উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হবে। আমরা প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে কৃত্রিম উপগ্রহের মালিক হলাম এই প্রযুক্তি নিজেরা ব্যবহার করে যেসব দেশ আজো এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি তাদের নিকট সেবা বিক্রয়ও করতে পারবো। যখন ফ্রান্সে আমাদের উপগ্রহের নির্মাণ কাজ শেষ হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশে নিজের কক্ষপথে রওয়ানা হবে ‘বঙ্গবন্ধু-১’ নামের বাংলাদেশের স্বপ্ন, যখন ‘ফ্যালকন-৯’ নামের মহাকাশযানে আমাদের উপগ্রহটির উৎক্ষেপ্ত হবে ‘কেপ কারনিভাল স্পেসএক্স’ থেকে তখন আমরাই ইতিহাসের অংশ, তখন হেনরি কিসিঞ্জাররা দেখুক, ‘তলা বিহীন ঝুড়ি’ মহাকাশের পথ ধরেছে। আমাদের মহাকাশ জয়ের স্বপ্নের ইতিহাস শুরু হয়েছিলো ১৯৯৯ সালে। তারপর বহুধাপ পেরিয়ে বাংলাদেশ ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের কাছে আবেদন করে এবং অনুমোদন পাওয়ার পর নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের দরপত্র চাওয়া হয়। এরপর ফরাসি-ইতালিয়ান মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থ্যালেস আলেনিয়া স্পেসকে এই উপগ্রহটি নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’ এ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপগ্রহের নকশা তৈরি করে। আর উপগ্রহটির কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনা হয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে।  চুক্তির মেয়াদ অনুসারে প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য এ কক্ষপথ কেনা হয়েছে। এছাড়া আরও ৩০ বছর বাড়ানো যাবে এই চুক্তির মেয়াদ। তার মানে এখন পর্যন্ত অ্যারেজমেন্টে এই উপগ্রহের মেয়াদকাল ৪৫ বছর। মহাকাশের ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে এ কক্ষপথের অবস্থান। এই ঠিকানায় অবিরত ঘুরবে ‘বঙ্গবন্ধু-১’। সেবা দিয়ে যাবে বাংলাদেশের কোটি মানুষসহ বিশ্বের অগণিত মানুষকে। এই ঠিকানায় ঘুরবে বাংলাদেশের স্বপ্ন, ঘুরবে পৃথিবীর সব মুক্তকামী মানুষেরও স্বপ্ন। আমরা দলে মতে বিভক্ত, রাজনৈতিক দর্শনে, ধর্মে আর বিশ্বাসে বিভক্ত। কিন্তু আমরা এই সব মহাজাগতিক জাতীয় অর্জনে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, পৃথিবীর সব ন্যায়যোদ্ধা, মুক্তিকামী মানুষেরা এখানে দেখে যাও, মুক্তিকামী মানুষের জয় হয়, মুক্তির মন্দির সোপান তলে বারবার হয়েছে সূর্যোদয়।   লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ফেসবুকের সাতকাহন, আছে ইহুদি কানেকশন

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে যখন ফেসবুকের যাত্রা শুরু হয়, সে সময় হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লরেন্স (সংক্ষেপে ল্যারি) সামারস। যিনি একজন ইহুদি রাজনীতিক হিসেবে বেশি খ্যাত। ইহুদি স্বার্থ রক্ষায় তিনি সক্রিয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট ছিলেন তিনি। হোয়াইট হাউসে ক্লিনটন এবং ওবামা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন ল্যারি সামারস। হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সেখানকার অ-ইহুদি ছাত্র উইনকলেভস জমজ ভ্রাতৃদ্বয় ল্যারি সামারসের কাছে একটি গুরুতর চুরির অভিযোগ নিয়ে আসেন। তারা অভিযোগ করেন, সহপাঠী মার্ক জাকারবার্গ তাদের দুইজনের তৈরি করা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ডিজাইন চুরি করে ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই অভিযোগ শুনে ল্যারি সামারস ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং অভিযোগ ছুঁড়ে ফেলে দেন। তাদের হুমকি দিয়ে রুম থেকে চলে যেতে বলেন। এমনকি ২০ জুলাই ২০১১ সালে সিএনএন টিভি চ্যানেলের মানি প্রোগ্রামের এক সাক্ষাৎকারে ল্যারি সামারস জমজ দুই ভাই সম্পর্কে প্রকাশ্যে ‘অ্যাসহোল’ মন্তব্য করেন, যা ভদ্রতা বিবর্জিত কাজ বলে ধরা হয়। ল্যারি সামারসের এ ধরণের নগ্ন সহযোগিতার কারণে হার্ভার্ডে জাকারবার্গ ও তার সঙ্গী ইহুদি তরুণদের এই কাজে আর কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ডে ফেসবুক প্রজেক্টকে বিস্তৃত করতে প্রথমেই যে বন্ধুর সহযোগিতা চান তিনি হলেন ইহুদি তরুণ ডাস্টিন মোসকোভিচ। যিনি পরে ফেসবুকের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ব্রাজিলিয়ান ইহুদি এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন ফেসবুকের অন্যতম কো ফাউন্ডার বা সহ-প্রতিষ্ঠাতা যেখানে তিনি শুরুতে বিজনেস ম্যানেজার এবং চিফ ফাইন্যানশিয়াল অফিসার-সিএফও হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। হার্ভার্ডে থাকা অবস্থায় ইহুদি ভ্রাতৃসংঘ আলফা এপসিলন পাই নামের সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন মার্ক জাকারবার্গ এবং স্যাভেরিন। তারা ছিলেন এক অপরের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’। আলফা এপসিলন পাই সংগঠনটি তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়েছে, ‘এটি আন্তর্জাতিক ইহুদি ভ্রাতৃসংঘ। এ সংগঠনটি তৈরি হয়েছে ইহুদি পুরুষদের জন্য সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ করে দেয়া এবং সংঘবদ্ধতার অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে। আমরা আমাদের বন্ধন দৃঢ়তার সঙ্গে বজায় রাখি এবং ছাত্রদের হাই স্কুল থেকে ক্যারিয়ার পর্যন্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই।’ ইসরায়েলে আলফা এপসিলন পাই সংগঠনটির এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে এই সংগঠন। তারা সমাজসেবার পরিচয়ে সরাসরি অর্থ সাহায্য করে ‘ফ্রেন্ডস অফ দি ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স’ এবং ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ডে। ফেসবুকের প্রথম ব্যবহারকারী হিসাবে পরিচয় দেন মার্ক জাকারবার্গের হার্ভার্ডের সহপাঠী ও রুমমেট অ্যারিয়াল হাসিট। যিনি ফেসবুকের ইউআরএল আইডি সেভেন ধারণ করেন। তিনি এক সময় অধিকৃত প্যালেস্টাইনে বসবাস শুরু করেন ইহুদি ‘ল অফ রিটার্ন’ থিওরি অনুসারে। তিনি সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ইসরায়েলের ডিফেন্স ফোর্সের প্রচারণা সেলের স্পোকসপারসন ইউনিটে কাজ শুরু করেন। সম্প্রতি তিনি ইহুদি ধর্মযাজক বা রেবাই হিসাবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তার সম্পর্কে ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হারেটজ ১০ মে ২০০৯ সালে এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘পাঁচ বছর আগেও কেউ ফেসবুকের নাম জানতো না। এখন ইসরায়েল বা পৃথিবীর কোথাও কারো জানতে বাকি নেই এই সামাজিক যোগযোগ ওয়েবসাইট সম্পর্কে।.. তিনি এবং জাকারবার্গ একই ইহুদি সংগঠনে কাজ করেন।’ একই প্রতিবেদনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যারিয়াল হাসিট বলেন, ‘২০০২ সালে আমি মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে পরিচিত হই। আমরা একই ফ্র্যাটারনিটি বা ভ্রাতৃসংঘে যোগ দিই। যা ইহুদি কমিউনিটির কল্যাণে কাজ করে। হাসিট আরো বলেন, ‘আমরা সাবাথ ডিনার (ইহুদি ধর্মীয় খাবার আয়োজন) এক সঙ্গে খেয়েছি। প্রতি বছর আমরা ইসরায়েলের চ্যারিটির জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছি। মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়া অন্যান্য ইহুদি ছাত্রদের মতো এই সংগঠনের সদস্য ছিল। মার্ক জাকারবার্গ নিয়মিত ইয়ম কিপার এ উপবাস করতো। মাঝে মাঝে হিলেল হাউসে আসতো যা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইহুদি কমিউনিটিতে পরিচিত ছিল।’ মার্ক জাকারবার্গ ‘ইহুদিবাদ’ সম্পর্কে ‘আন্তরিক যোগসূত্র’ অনুভব করেন। ইসরায়েলের চ্যারিটির জন্য তিনি নিয়মিত দান এবং অর্থ সংগ্রহ করেন। ফেসবুকের সূচনা সময়ে এই ইহুদি তরুণদের আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন আরেক ইহুদি, জার্মানিতে জন্ম নেয়া আমেরিকার প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পিটার থিয়েল। যিনি অনলাইনে অর্থ লেনদেনের বিশাল প্ল্যাটফরম পেপল-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ইহুদিদের প্রথাগত ঐতিহ্য অনুসারে পিটার থিয়েল তার সব ব্যবসা শুধু ইহুদিদের সঙ্গেই করতে পছন্দ করেন। ১৪ জানুয়ারি ২০০৮ সালে প্রভাবশালী বৃটিশ দৈনিক দি গার্ডিয়ান প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফেসবুকের নেপথ্য নায়কদের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে পিটার থিয়েল সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়, ‘ফেসবুকের পেছনের আসল মুখটি হলেন ৪০ বছর বয়সী সিলিকন ভ্যালির ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট (বিনিয়োগকারী) ফিউচারিস্ট দার্শনিক পিটার থিয়েল।’ ২০০৪ সালের জুন মাসে যখন তিন ইহুদি ছাত্র মার্ক জাকারবার্গ, ডাস্টিন মোসকোভিচ ও ক্রিস হিউজেস তার সঙ্গে ফেসবুকের আইডিয়া নিয়ে দেখা করতে যান তখন তিনি পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। যা দিয়ে ফেসবুকের যাত্রা শুরু হয়। পিটার থিয়েলকে ইন্টারনেট জগতে ‘স্যাভি ইনভেস্টর’ বা বৈষয়িক বুদ্ধিসম্পন্ন বিনিয়োগকারী হিসাবে বলা হয়। পেপলের পর ফেসবুকের সূচনা সময়ে তার পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগকে ‘গোল্ডেন টাচ’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা বোর্ডে ছিলেন তিন ইহুদি পিটার থিয়েল, মার্ক জাকারবার্গ এবং জিম ব্রেয়ার। ইহুদি উদ্যোক্তা জিম ব্রেয়ার একজন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসাবে সিলিকন ভ্যালিতে পরিচিত। ২০০৫ সালে তিনি ফেসবুকে ১২.৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। তিনি ডেল,ওয়ালমার্ট, মারভেলসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য। ২০০৯ সালে ফেসবুকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন ইহুদি-রাশান বিলিওনেয়ার ইউরি মিলনার। টুইটারেও তার বিনিয়োগ আছে। নিউজউইক ও ওয়াশিংটন পোস্ট পরিচালনাকারী ইহুদি পরিবার মেয়ার গ্রাহামের সদস্য ডোনাল্ড ই গ্রহাম ফেসবুকের পরিচালনা বোর্ডের অন্যতম সদস্য। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাকালীন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে মার্ক অ্যানড্রেসেন হলেন নেটসক্যাপের প্রতিষ্ঠাতা। ইসরায়েলের প্রভাবশালী ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট জোনাথান মেডভেড-এর সঙ্গে ইসরায়েল সিড পার্টনারস-এ বিনিয়োগ করেন। তিনি নিজে ইহুদি না হলেও ইহুদি মালিকানাধীন ব্যবসায় তিনি তার সব বিনিয়োগ করেন। ফেসবুকের গুরুত্বপর্ণ সদস্যদের মধ্যে আছেন চিফ অপারেটিং অফিসার শেরিল স্যান্ডবার্গ। এই ইহুদি নারী ২০০৮ সালে গুগল ছেড়ে ফেসবুকে যোগ দেন। বিশ্বজুড়ে ফেসবুকের বিস্তার, মার্কেটিং, সেলস, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, হিউম্যান রিসোর্স, পাবলিক পলিসি, প্রাইভেসি এবং কমিউনিকেশনের সকল বিষয় তিনি দেখেন। শেরিল সরাসরি রিপোর্ট করেন মার্ক জাকারবার্গকে। শেরিল গুগলে যোগ দেয়ার আগে ছিলেন ইহুদি ইকোনমিস্ট ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ল্যারি সামারসের সহকর্মী। যিনি ফেসবুক প্রতিষ্ঠার সময়ে জাকারবার্গকে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে তিনি ক্লিনটন প্রশাসনের ট্রেজারি সেক্রেটারি হলে শেরিল স্যান্ডবার্গ হন তার চিফ অফ স্টাফ। ল্যারি সামারসের আরেক ইহুদি নারী সহকর্মী মারলে লেভিন। তিনি বারাক ওবামার সময়ে ল্যারির সরাসরি তত্ত্বাবধানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নে সমন্বয়ের কাজ করতেন। মারলে লেভিন তার ক্যারিয়ার শুরু করেন ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রেজারিতে ক্লিনটন প্রশাসনের অধীনে। যেখানে তিনি আইন প্রণয়ন ও জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার শ্বশুর জন ডাচ ছিলেন সিআইএ-র সাবেক পরিচালক। তার স্বামী ইহুদি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ফিলিপ ডাচ। ফলে তার পক্ষে সিআইএর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সহজ হয়। ২০১০ সালে ফেসবুকের গ্লোবাল পাবলিক পলিসির ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হন মারলে লেভিন। বিশে^র বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে আমেরিকা, এশিয়া, ইওরোপের দেশগুলোর সরকার ও এনজিওগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে ফেসবুকের ব্যবসার ক্ষেত্র বাড়ানোর দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। মারলে লেভিন আমেরিকার পলিটিক্যাল সেন্টারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অনেকগুলো ইহুদি ওয়েবসাইট মার্ক জাকারবার্গকে তার ধর্ম ও বিধিবিধান মেনে চলার কারণে ‘১০০% ইহুদি’ বা শতভাগ ইহুদি হিসাবে বর্ণনা করেছে। ওয়ার্ল্ড ইহুদি ডাইজেস্ট-এর বর্ণনায় ‘ইহুদি- আমেরিকান পরিবারে জন্ম নেয়া’ জাকারবার্গ শীর্ষ দশ প্রভাবশালী ইহুদির তালিকায় তিন নাম্বারে জায়গা করে নেন। তবে বর্তমানে জেরুসালেম পোস্টের বিবেচনায় তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ইহুদির তালিকায় এক নাম্বারে আছেন। ১৩ মে ২০০৯ সালে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস এক রিপোর্টে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেটজের সূত্র উল্লেখ করে জানায়, ‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক ইহুদি ছাত্র মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন।’কয়েক বছর আগে ফেসবুকের মুখপাত্র স্কনিট এবিসি চ্যানেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের অনেকেই ফেসবুকে আছেন যারা সরাসরি হলোকস্টের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের বাবা-মায়েরা ইওরোপ থেকে চলে আসতে বাধ্য হন। অথবা সেটা যারা করতে পারেন নি, তাদের আত্মীয় স্বজন এখানে আছেন।’ ইসরায়েল কানেকশন: ফেসবুক শুধু ইহুদি নিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ই নয়, ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ফেসবুকের সরাসরি সংযুক্তি রয়েছে শুরু থেকেই। মার্ক জাকারবার্গকে ইসরায়েলি সরকার সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। ২০০৮ সালে জেরুসালেম কনফারেন্সে টেকনোলজির ওপর প্রেসিডেন্টশিয়াল প্যানেলে গুগলের সের্গেই ব্রিন এবং ইয়াহুর প্রেসিডেন্ট সুসান ডেকার-এর সঙ্গে জাকারবার্গ উপস্থিত ছিলেন। ইসরায়েলের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৩ থেকে ১৫ মে ২০০৮ সালে জেরুসালেম ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইসরায়েলের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজের উদ্যোগে এই সম্মেলনে অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল, বর্তমান ও আগামীর জন্য টেকনোলজিকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইহুদি বিশ্বে এটা কতটা প্রভাব ফেলবে। এই অনুষ্ঠানে ইহুদি ধর্মীয় নেতা, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ ইহুদী স্বার্থে কট্টরবাদী হিসাবে পরিচিত জায়ানিস্ট নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন মার্ক জাকারবার্গ। ১১ মার্চ ২০০৮ সালে নিক ওনিয়েল লেখেন, সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস ইসরায়েলি ও বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, অ্যান্টি সেমিটিজম প্রতিরোধ যুদ্ধে সবাই যেন ফেসবুক ব্যবহার করেন। ২০১২ সালের মার্চে আমেরিকায় ফেসবুকের হেড কোয়াটার্স পরিদর্শন করেন শিমন পেরেস। এ সময় তার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ খুলে প্রথম ‘লাইক’ দেন মার্ক জাকারবার্গ নিজে। এ বিষয়ে ইসরায়েলি দৈনিক হারটেজ লেখে, মার্ক জাকারবার্গ পেসিডেন্টের ইন্টারন্যাশনাল পেজ উন্মুক্ত করেছেন। এই অনুষ্ঠানে ফেসবুকের অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড গ্লোবাল অপারেশনসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড ফিশার বলেন, ‘আমাদের সময়ের মহান নেতা ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেসকে স্বাগত জানাচ্ছি।’ এসময় ফেসবুকের চিফ অপারেটিং অফিসার শেরিল স্যান্ডবার্গ তার পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে ইসরেয়েলি ওয়াইনেট নিউজ জানায়, ইসরায়েল ফেসবুকের মাধ্যমে দেশটির পক্ষে প্রচারণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, ইসরায়েলের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনিয়েল অ্যালন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় ফেসবুক অফিসে বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে অনলাইনে জনসংযোগ বাড়াতে ফেসবুকের ব্যবহার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাপ করেন। সেখানে ইসরায়েলি সরকারের ভাবনা তুলে ধরে উপমন্ত্রী বলেন, ইসরায়েলের অনলাইন পিআর বা জনসংযোগের প্রধান প্ল্যাটফরম হিসাবে ফেসবুককে ব্যবহার করা হবে। তিনি সেখানে ফেসবুকের চিফ অপারেটিং অফিসার শেরিল স্যান্ডবার্গ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড ফিশারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিটিং করেন। ডেভিড ফিশারের বাবা স্ট্যানলি ফিশার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অফ ইসরায়েলের গভর্নর ছিলেন। বৈঠকে ইসরায়েলের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনিয়েল অ্যালন বলেন, ইংরেজি ও আরবি দুই ভাষাতেই ইসরায়েলের মেইন প্ল্যাটফরম হিসাবে ফেসবুক ব্যবহৃত হবে। ইসরায়েলের প্রতিটি দূতাবাসে ফেসবুক পেজ আছে। সেগুলোকে আরো উন্নত করে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করার ওপর তিনি জোর দেন। তিনি ফেসবুকের গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারীদের ইসরায়েলে গিয়ে সেখানকার আইটি ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে মত বিনিময়ের আমন্ত্রণ জানান। উপমন্ত্রী ইসরায়েলের ইন্টারনেট সক্ষমতার ওপর বর্ণনা করেন। তিনি টেকনোলজির এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ইহুদিদের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইন্টেল সাত হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম আন্দোলনের অংশ ‘ইনতিফাদা’-কে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ হিসাবে উল্লেখ করে ফেসবুক কর্মকর্তারা ইসরায়েলের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রীকে জানান, তারা ইসরায়েল বিরোধী পেজ ‘থার্ড ইনতিফাদা’ বন্ধ করে দিয়েছেন। পেজটি বন্ধ করার প্রতিক্রিয়া সর্ম্পকেও উপমন্ত্রীকে তারা অবহিত করেন। তারা বলেন, ‘ভবিষ্যতেও যে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধে সন্ত্রাসের প্রচারক পেজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তারা আরো জানান, ইসরায়েলে ফেসবুক একটি মার্কেটিং সেন্টার খুলতে আগ্রহী। এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ২০১২ সালে ফেসবুকের কো-ফাউন্ডার মার্ক জাকারবার্গের ছোট বোন অ্যারিয়াল জাকারবার্গ ও তার কয়েকজন সঙ্গী ইসরায়েলের শিক্ষামূলক সংগঠন ট্যাগলিট বার্থরাইট-এর আমন্ত্রণে দেশটিতে যান। প্রকাশ্যে এই সংগঠন ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে প্রতিভাশালী তরুণ ইহুদিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন, ইহুদি ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন। গোপনে ট্যাগলিট বার্থরাইট সংগঠনটির সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সরাসরি সর্ম্পক আছে। প্রবাসী ইহুদিরা এই ভ্রমণে সামরিক সদস্যদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করার সুযোগ পান। অ্যারিয়েল জাকারবার্গ ও তার সঙ্গীদের আমন্ত্রণ জানান ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস। প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি গভীর ভাবে শ্রদ্ধা জানাই জাকারবার্গ পরিবারের প্রতি। শুধু তাদের সৃষ্টিশীলতার জন্য নয়, বরং নিজস্ব ঐতিহ্যকে হৃদয়ের গভীরে লালন করার জন্য। অ্যারিয়েল ও তার সঙ্গী যারা ইসরায়েলে এসেছেন তাদের নিয়ে আমি গর্বিত।’ ইসরায়েলের স্বার্থে ফেসবুক নিয়মিত ভাবে সেন্সরশিপ চালিয়ে থাকে। আবার ফেসবুকের স্বার্থ দেখে ইসরায়েল। কয়েকটি ইসরায়েলি পত্রিকার শিরোনাম দেখা যায়,ইসরায়েল তার প্রচারণায় ফেসবুক ব্যবহার করছে (ওয়াইনেট নিউজ)ফেসবুক ও টুইটারের শত্রæদের বিপক্ষে যুদ্ধ করছে নতুন আইডিএফ ইউনিট (হারেটজ) জেরুসালেম পোস্ট-এর কয়েকটি শিরোনাম:ইসরায়েলি মন্ত্রী জাকারবার্গকে ইনতিফাদা পেজ বন্ধের আহ্বান জানান ফেসবুক ‘ইনতিফাদা ৩’ পেজ বন্ধ করে দিয়েছে ফেসবুক গান্ধীর উক্তি বন্ধ করেছেপিস টিভির অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে ফেসবুক১৩২ জনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানতে চেয়েছে ইসরায়েলইহুদি ইন্টারনেট ডিফেন্স ফোর্স ইসরায়েল বিরোধী ফেসবুক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে চুরি হচ্ছে ব্যবহারকারীর তথ্য: ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়াগুলো নানা ভাবে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করছে। ব্যবহারকারীদের নানা ধরণের তথ্য দিতে প্রলুব্ধ করছে। ফলে একজন তার সারাদিনের কর্মকাণ্ড, পরিবার, আবেগ অনুভূতি সব কিছুই সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিচ্ছেন কোনো রকম চিন্তা ছাড়া। এই কোটি কোটি মানুষের তথ্য তারা সংগ্রহ করে সেখানকার রাজনীতি, ব্যবসা, সমাজ সব কিছুতেই প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার পেছনেও কাজ করেছে ফেসবুক। মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে ফেসবুকের তথ্য। এছাড়া ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার কথা তো জানিয়ে গুগল তার মাই অ্যাকটিভিটি অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সকল তথ্য সংগ্রহ করে রাখছে। একজন মানুষ প্রতিমুহূর্তে কী করছেন তা জানা যায় ‘মাই অ্যাকটিভিটিতে’। সম্প্রতি আমেরিকায় প্রায় নয় কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের ঘটনা সোশাল মিডিয়ার প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পেতে সাহায্য করেছে। তথ্য ফাঁসের ঘটনায় আমেরিকান কংগ্রেসের ৪৪জন সিনেটরের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্যবিষয়ক ও বিচারক কমিটির যৌথ শুনানিতে ডাকা হয় জাকারবার্গকে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, যাদের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট নেই তাদের সম্পর্কে ফেসবুক কোনো তথ্য সংগ্রহ করে কিনা। উত্তরে জাকারবার্গ সরাসরি কিছু না বলে জানান, ‘নিরাপত্তার প্রয়োজনে অনেক সময় যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার করেন না, তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করে ফেসবুক।’ প্রাইভেসি-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন থেকে তথ্য সংগ্রহের এ পদ্ধতিতে শ্যাডো প্রোফাইল তৈরি করে রাখা যায়। ফেসবুক থেকে লগ আউট করার পর কেউ অন্য কোথাও অনলাইনে কাজ করলে বা কথা বললে সেটা ফেসবুক জানতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে জবাবে জাকারবার্গ বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার-সংক্রান্ত কিছু নির্দিষ্ট বিষয় রয়েছে। যদি লগ ইন করা নাও থাকে, তবেও ফেসবুক ব্যবহারকারীকে অনুসরণ করতে পারে। কেউ ফেসবুক সিস্টেমকে অনৈতিক কাজে লাগাচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য ওই ট্র্যাকিং করার প্রয়োজন পড়ে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার করুক বা না করুক, মানুষের অনলাইন ব্যবহারের অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ফেসবুক। বিভিন্ন থার্ড পার্টি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপকে কুকি ও পিক্সেল বসানোর জন্য অর্থ দেয়। এ ছাড়া লাইক, শেয়ার বাটন তো আছেই। এসবের মাধ্যমে ফেসবুকের কাছে উন্নত বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য তথ্য চলে যায়।’ কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার মাধ্যমে ফেসবুকের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় উদ্বিগ্ন সারা পৃথিবীর ব্যবহারকারীগণ। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, “বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রায় ২০ লাখ লোকের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং তাদের অনেকেরই তথ্য তাদের অজান্তেই বেহাত হয়েছে বলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে। ফেসবুকের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মাইক শ্রোয়েফার ফেসবুক নিউজরুমের এক ব্লগে এ তথ্য জানিয়েছেন। মাইক শ্রোয়েফার এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেশটিতে ফেসবুকে প্রোফাইল খোঁজা বা অনুসন্ধানের ৭ শতাংশই হয়েছে টেলিফোন নাম্বার বা ই- মেইল ঠিকানা ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২ কোটি ৮০ লাখ (সূত্র: ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাস)। সেই হিসাবে ঝুঁকির মুখে থাকা ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৬০ হাজার। সাধারণত, ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বা পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধারের সময় এই টেলিফোন নাম্বার বা ই-মেইল ঠিকানা দিতে হয়েছে এবং তারপর সেগুলো সংরক্ষণে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না বলেই তার ব্যাখ্যায় ধারণা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা এবং ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশ বা জোটের আইন লঙ্ঘনের জন্য আলাদা আলাদা তদন্ত শুরু করেছে। তবে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় কোনো আইন নেই।...কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এবং তার অভিভাবক প্রতিষ্ঠান এসসিএলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে নির্বাচন প্রভাবিত করায় ফেসবুকের তথ্যগুলো বেআইনিভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে কাজ করার লক্ষ্যে আলোচনা চালাচ্ছে বলেও ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে।” ফেসবুকের গোয়েন্দাগিরি, তথ্যপাচার, অবৈধ কর্মকা- এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির কারণে সারা পৃথিবীতেই ভারসাম্যহীনতার জন্ম হয়েছে। ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন ফেসবুকসহ সোশাল মিডিয়াকে চিহ্নিত করেছে ‘অ্যান্টি সোশাল মিডিয়া’ হিসেবে। জাতিসংঘের কর্মকর্তা ইয়াংহি লি ফেসবুককে বর্ণনা করেছেন ‘দানব’ হিসাবে। এই দানবকে দমন করার জন্য ফেসবুক থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন দেশে ‘ডিলিট ফেসবুক’ আন্দোলন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে ফেসবুক বিরোধী শক্তিশালী ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে সবার আগে। দানবের দাস নয়, সৃষ্টির সেরা মানব হিসেবেই আমরা পৃথিবীতে এসেছি। এখন প্রয়োজন সচেতনতার। আমরা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নই, কিন্তু প্রযুক্তি যেন আমাদের দাস না বানাতে পারে সে বিষয়ে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন এখানে। দানবের বিরুদ্ধে মানবের লড়াই শুরু হয়েছে। লেখক: সাংবাদিক ও সম্পাদক, বিপরীত স্রোত এমজে/

পরীক্ষায় দুর্নীতির কারণ

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। পরীক্ষায় দুর্নীতি তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যাধি। এ ব্যাধির প্রতিকার করতে না পারলে সমগ্র জাতিই ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং পরিণামে তা জাতির ধ্বংস ডেকে আনবে। আর সে জন্যই সমগ্র জাতি আজ পরীক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা জানি শিক্ষা হচ্ছে জাতির উন্নতি ও সংস্কৃতির হাতিয়ার। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান দুর্নীতির মূল শিকড় সমাজ দেহ থেকে সমূলে উৎপাটন করতেই হবে। এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক। সমাজের অন্যান্য সমস্যা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্যাকে কোনক্রমেই পৃথক করে দেখলে চলবে না। পরীক্ষায় দুর্নীতি শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার সাথে সম্পর্কিত নয়, এর সাথে সামাজিক দুর্নীতি ও জড়িত। একটি জাতির আশা আকাক্সক্ষা রূপায়নের অঙ্গীকার সাংবিধানিকভাবে ঘোষিত থাকে শিক্ষার মধ্যে। তাই শিক্ষাকে আমাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একটি স্বাধীন দেশের চাহিদা মেটানোর মতো করে সমস্ত শিক্ষার ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়নি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আগে যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। যদিও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জন্য ইতোপূর্বে স্যাডলার কমিশন, ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন, বাতেন কমিশন, মজিদ খানের শিক্ষা নীতি ইত্যাদি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তবে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে যে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিশন রাষ্ট্রীয় চার নীতি বাস্তবায়নের আলোকে একটি জীবনমুখী শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু সেই শিক্ষানীতির কিছু কিছু অংশ বাস্তবায়িত হলেও মূল নীতিকে বিসর্জন দিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে। আর রাষ্ট্রীয় মূলনীতির আলোকে যেহেতু শিক্ষানীতি ঘোষিত হয়নি সেহেতু শিক্ষা ব্যবস্থায় ও নানাবিধ সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, যার প্রমাণ পরীক্ষায় দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার। সুতরাং পরীক্ষায় দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করতে হলে আমাদের জাতীয় প্রয়োজন মেটানোর আলোকে জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষণা করতে হবে। দুর্নীতির ঢল নেমেছে আমাদের চারপাশে। সামাজিক অরক্ষয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজেরই অংশ, তাই সমাজের ব্যাপক দুর্নীতির ছোঁয়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও লেগেছে এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও দুর্নীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করে চলছে। আর সেই দুর্নীতিতে শুধু শিক্ষার্থীদের ভ‚মিকাই থাকছে না। ভ‚মিকা থাকছে শিক্ষকের এবং অভিভাবকেরও। পরীক্ষায় দুর্নীতি করতে গিয়ে শিক্ষক বহিষ্কৃত হচ্ছেন। অভিভাবকরা পুলিশের তাড়া খাচ্ছেন, পরীক্ষার সময় এ তো প্রতি বছরের সংবাদ শিরোনাম। শিক্ষায়তনে এবং সারা দেশে যখন রাজনৈতিক ও নৈতিক নৈরাশ্য চলে তখন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সততা আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরেই দেখছি সহজভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের প্রতিযোগিতা। অনেকেই অন্যায়ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভের সিঁড়িটি ব্যবহার করে সমাজের কর্তাব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে সমাজের নৈতিক ভারসাম্যকে পদদলিত করে নৈতিকতার উপদেশ বিতরণ করে চলছেন। আর এই অন্যায়ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠালাভের সিঁড়িটি আমাদের শিক্ষার্থীরা চোখের সামনে দেখছে, যার ফলে তারা খুব সহজে পরীক্ষায় দুর্নীতি করে সনদপত্র লাভের সিঁড়িটি অতিক্রম করতে চায়। তাদের মধ্যে জ্ঞানের কোন মাদকতা নেই। আজকাল প্রতি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের যে হিড়িক পড়েছে, তাতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের রাতে কিছু প্রশ্নের উত্তর কেটেছেঁটে হলে নিয়ে যায়, তাদের আকাক্সিক্ষত ফল লাভের আশায়। তাদের মধ্যে বিবেকের কোন দংশন নেই। যদি এ থেকে আমাদের উত্তরণ না ঘটে তবে জাতি হিসাবে, দেশ হিসাবে আমরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত এ দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো কোন হাতিয়ার আর আমাদের থাকবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে এরূপ একটি ভারসাম্যহীন অবস্থার মধ্যে গুটিকয়েক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ধাঁচের, তাদের শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার্থী বাছাই ভিন্নমাপের, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে এগুলোর কোন মিল নেই। পাঠক্রমের মিল থাকলেও তাদের পড়াশুনার ভিত ভিন্নভাবে গঠিত হয়ে থাকে। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ক্যাডেট কলেজ, রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল বা কলেজ এবং বড় বড় শহরে অবস্থিত কিছু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া কিছু কিছু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যগতভাবে ভালো ফল দেখতে পারে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ভালো ফল লাভ করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়। অন্যদিকে দুর্নীতির আশ্রয়ে সনদপত্রধারী বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী জীবনযুদ্ধে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে, সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিভিন্ন মানের, ধাঁচের ও পদ্ধতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে একই মানের, একই পদ্ধতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ভারসাম্য পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং হতাশা দূর হয়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ খুলে যাবে। তখন শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে বেচাকেনার কোন সুযোগ থাকবে না। তাই পরীক্ষার দুর্নীতি বোধ করতে হলে একই মানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এছাড়া আমাদের পাঠক্রমও শিক্ষার্থীর মেধানুযায়ী প্রণয়ন করা হয় না। শিক্ষার্থীদের ওপর অনেক সময় অতিরিক্ত বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারে না। শিক্ষার্থীরা অসহায় হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষায় দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এদেশে একই পাঠ্যক্রমের আওতায় দুটি ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। একটি ধারায় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অন্য ধারায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দুটি ধারায়ই সুযোগ সুবিধার ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। তাই পরীক্ষার দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সরকারকে পর্যায়ক্রমে জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকেই জাতীয়করণ করতে হবে এবং সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ৩০ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবে। আমরা জানি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উন্নত সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মাণ। এরূপ উন্নত সমাজ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যেকেই তার যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী কাজ পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় কোন পরিকল্পিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। আছে শুধু হতাশা ও শূন্যগর্ভ ভবিষ্যৎ। তাই জ্ঞান অর্জনের প্রতি শিক্ষার্থীদের কোন স্পৃহা নেই, যেনতেনভাবে পরীক্ষায় দুর্নীতির মাধ্যমে একটি সনদপত্র লাভই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমি আমার লেখার একপর্যায়ে উল্লেখ করেছি, একই ধাঁচের শিক্ষাব্যবস্থা এ দেশে চালু নেই। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের ব্যাপার যে, বড় বড় শহরে একশ্রেণির এলিট গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিশেষ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং সেখানে শিক্ষা অন্যান্য শিল্পপণ্যের মতো বেচাকেনা হচ্ছে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যারা দুর্নীতির জন্ম দিচ্ছে, তারা শিক্ষার মতো একটি উন্নত জাতি গঠনমূলক হাতিয়ারকে পাংশু করে দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। শিক্ষার মতো একটি মৌলিক অধিকারকে এভাবে খণ্ডিত করার কোনো যুক্তি নেই। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের ছাত্রসমাজের একটি সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। তারা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামে এক গৌরবদীপ্ত ভ‚মিকা রেখেছে, যার ফলে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেয়েছি। তাই ছাত্রদের উচিত স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দুর্নীতিমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করা। শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির জীবনীশক্তি, মানবদেহকে পচনের হাত থেকে বাঁচাতে আমরা যেমন দেহের জীবনীশক্তিকে চিকিৎসার মাধ্যমে সতেজ রাখি, তেমনি একটি জাতিকে বাঁচানোর জন্য শিক্ষা নামক জীবনীশক্তিকে অবশ্যই সতেজ রাখতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীর সুপ্ত জ্ঞানের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ পুনর্বার উন্মুক্ত হবে এবং সেই জ্বালামুখ থেকে নির্গত ও উপ্ত গলিত লাভা সমাজের অসাম্যতা পংকিলতা অন্যায় অত্যাচার অনাচার দলিত মথিত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডল গঠন করবে। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সৈয়দ সঈদ উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ; ব্যাচ-১৯৮২

কার্ল মার্কসের আবিষ্কার

চলতি বছরে (ইংরেজি ২০১৮ সাল) কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাঁর বিষয়ে যতো কথা বলা যায় এর মধ্যে তার প্রায় সবই বলা হয়ে গেছে। এতোদিন পরএই এখন- নতুন আর কোন কথাটি বলা যায়? যেদিন মার্কস মারা যান তার তিন দিনের মাথায় (১৭ মার্চ ১৮৮৩ সাল) লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে তাঁর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, যুগ যুগ ধরে তাঁর নাম কীর্তিত হইতে থাকবে, আর কীর্তিত হবে তাঁর সাধনা।` এঙ্গেলসের এই ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায়নি। আজ দুইশ বছর পরও আমরা তাঁর নাম  নিচ্ছি। সারা দুনিয়া নিচ্ছে। ফরাশি ইতিহাস ব্যবসায়ী ফেরনাঁ ব্রোদেল ( ১৯০২- ১৯৮৫) মার্কসের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর পরলোকগমন করেছিলেন। একে আর যাই বলুন বলতে পারেন, ভুলেও মার্কস ব্যবসায়ী বলতে পারেন না। আর এর মতেও উনিশ শতকে ইউরোপে শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক মহাত্মাদের মধ্যে - বিশেষত যারা ১৭৬০ সাল হতে ১৮২৫ সালের মধ্যে জন্মেছেন তাঁদের মধ্যে কার্ল মার্কসের নাম সর্বাগ্রগ্রণ্য। এদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন অঁরি সা সিঁমো, রবার্ট ওয়েন, শার্ল ফুরিয়ে, এতিয়েন কাবে,  ওগুস্ত কোঁত, পিয়ের জোসেফ প্রুঁধু, ভিক্তর কঁসিদেরাঁ এবং লুই ব্লাঁ। বয়সে এরা সবাই কার্ল মার্কসের বড়। কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে। আর ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ও ফার্দিনান্দ লাসালের জন্ম জন্ম যথাক্রমে ১৮২০ ও ১৮২৫ সালে। ব্রোদেল উল্লেখ করিতে ভোলেন নাই যে শেষের এই তিনজন ছিলেন জাতিতে জার্মান। ইউরোপে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে এরা সমাজের পেছনের সারি থেকে টেনে সামনের দিকে নিয়ে এসেছিলেন।   ব্রোদেল বলেছেন, নিজের সহকর্মীদের মধ্যে মার্কসের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন কেবল ফার্দিনান্দ লাসাল। ১৮৬৪ সালে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি যদি হঠাৎ নিহত না হতেন তো কার্ল মার্কসের নামাংকিত রাজনৈতিক আন্দোলনটির জয়জয়কার এখন যতোটা নিশ্চিত হয়েছে ততোটা হতো কীনা বলা মুশকিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যবসায়ী ব্রোদেলও বলতে বাধ্য হয়েছেন, মার্কসের রাজনৈতিক সাফল্যের আসল রহস্য তাঁর লেখা `দাস কাপিটাল` বা `পুঁজি` গ্রন্থের বিশ্লেষণ শক্তির যথার্থতায় নিহিত। কি সেই শক্তি? সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতার এক জায়গায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দাবি করেছেন কার্ল মার্কস যা আবিষ্কার করেছেন তা চার্লস ডারিউইনের আবিষ্কারের সমতুল্য। তিনি বলেছেন, ডারউইন যেমন সপ্রাণ প্রকৃতি জগতের বিকাশের বিধি আবিষ্কার করেছিলেন, মার্কসও তেমনি মানুষের ইতিহাস বিকাশের বিধি আবিষ্কার করেছেন। মানবজাতির ইতিহাস বিকাশের বিধি বা নিয়ম বলতে কী বুঝাচ্ছে? এঙ্গেলস বলেছেন, এই বিধি বা নিয়ম আরকিছু নহে- একটি সরল সত্য মাত্র। সত্যটি এই যে অন্য কোনো কাজে হাত দেওয়ার আগে মানুষকে খাওয়া দাওয়া করতে, মাথাগোঁজার ঠাঁই করতে আরপড়ার এক টুকরা কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হয়। এটুকুর ব্যবস্থা হলে তারা রাষ্ট্রনীতি, শিল্পকলা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির পেছনে সময় দিতে পারে। এতোদিন পর্যন্ত সাকার ভাবধারার বাড় অতি বেশি বাড়ার কারণে এই সরল সত্যটা পায়ের তলায় চাপা পড়ে ছিল। তাই এই সত্যের প্রকৃত অর্থ দাঁড়াচ্ছে এরকম, কোনো বিশেষ জাতি বিশেষ কোনো যুগে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের নগদ প্রয়োজনে যেটুকু উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে পারে অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে তার ভিত্তিতেই সেই জাতির পক্ষে রাষ্ট্র পদবাচ্য অনুষ্ঠান- প্রতিষ্ঠাণ বা আইন কানুনের গোড়াপত্তন করা কিংবা শিল্পকলা আরএমনকি ধর্মকর্ম সংক্রান্ত ভাবধারা গড়ে তোলা সম্ভব। এই ভিত্তির নিরিখে তার উপর গড়ে উঠা ধ্যান ধারনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করতে হবে, এতোদিন ধরে যা চলছিল- অর্থাৎ ধ্যান ধারণার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাখ্যা, সেরকম উল্টা পাল্টা ব্যাখা আর চলবে না। এঙ্গেলসের এই দাবি নিছক মন গড়া কথা নয়। মার্কস তাঁর পুঁজি গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধযোগে একই কথা লিখেছেন, `শেষ পর্যন্ত এই বইয়ের উদ্দেশ্য একটাই- এ যুগের সমাজ ব্যবস্থা কোনো অর্থনৈতিক বিধি বা নিয়ম অনুসারে বিকশিত হচ্ছে তা আবিষ্কার করা`। এঙ্গেলসের মতে, এই আবিষ্কারটাই কার্ল মার্কসের একমাত্র আবিষ্কার ছিলো না। সমাধির পাশের বক্তৃতায় তিনি আরো যোগ করেছিলেন, বর্তমান যুগের পুঁজিভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী আরসেই প্রণালী হতে যে বুর্জোয়া শ্রেণী জন্মেছে তাহারা যে বিশেষ বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী চলছেন সেই নিয়মটিও মার্কস আবিষ্কার করেছেন। মার্কস আবিষ্কার করেছেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে শ্রমিক শ্রেণী যে পরিমাণ নতুন মূল্যের সৃষ্টি করে তার একাংশ মাত্র তারা মজুরি হিসেবে পাচ্ছেন। বাকি বা উদ্ধৃত্ত অংশটুকু পুঁজির মালিকগণ ভোগ করে থাকেন। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস নির্দেশ করেছেন,  এই উদ্ধৃত্তমূল্যের নিয়মটা কার্ল মার্কসের দুই নম্বর আবিষ্কার। এই আবিষ্কারকে এ যুগের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদগণ নতুন নামে ডাকছেন। তাঁরা এর নাম রেখেছেন `পুঁজিগঠন` বা ক্যাপিটাল ফর্মেশন। এই আবিষ্কারের ফলে এতোদিন যে সমস্যার সমাধান নিয়ে একদিকে বুর্জোয়া অর্থনীতি ব্যবসায়ী এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রবাদী সমালোচকগণ অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছিলেন তা সহজবোধ্য হয়ে উঠলো। এই সমস্যার নাম এতোদিন ছিল শ্রমিক সমস্যা। এখন এর নতুন নাম দাঁড়ালো বুর্জোয়া সমস্যা। অর্থাৎ সমাজ হতে কীভাবে বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন উঠিয়ে দেওয়া যায়। একটা জীবনের পক্ষে এই মাপের দুটো আবিষ্কার কী যথেষ্ট নয়? আরএমন একটা আবিষ্কারের মতন আবিষ্কার যে মানুষটি করতে পারেন তাকে নির্দ্বিধায় সুখী মানুষ বলা যেতে পারে। জ্ঞানের যে ক্ষেত্রেই মার্কস হাত দিয়েছিলেন সেখানেই এমনকি গণিতশাস্ত্রেও তিনি নিজস্ব একটা কিছু আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জ্ঞানানুসন্ধানের ক্ষেত্রও খুব একটা কম ছিলো না। ছিলো অনেকগুলো আর কোনো ক্ষেত্রেই নিছক ভাসাভাসা অনুসন্ধান করে বা দায় সেরে তিনি কর্তব্যকর্ম সমাপন করেন নাই। সেদিনের বক্তৃতায় এঙ্গেলস যে কোনো কারণেই হোক আরেকটিআবিষ্কারের কথা বলতে ভুলে গেছেন। মার্কস নিজে সে আবিষ্কারের কথা বলে গেছেন। এঙ্গেলসেরও তাতে দ্বিমত ছিলোনা। জগদ্বিখ্যাত ` কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারকার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দুজনেরই কীর্তি। তবু এই ইশতেহারের মূল ধ্যান ধারনার কৃতিত্ব এঙ্গেলসও একা কার্ল মার্কসকেই দিয়েছিলেন। এই প্রধান ধারণাটির নাম শ্রেণী সংগ্রাম। মার্কস বলেছেন, শ্রেণী সংগ্রাম কথাটি বা তার অন্তর্গত অর্থটি তাঁদের নিজেদের মৌলিক আবিষ্কার নয়। তাঁদের একযুগ আগে ফরাশিদের কয়েকজন ইতিহাস ব্যবসায়ী এই ধারণাটির প্রবক্তা। এই বুর্জোয়া ইতিহাস ব্যাবসায়ীদের মথ্যে ওগুস্তিন থিয়েরি প্রমুখ কেউ কেউ ছিলেন সাঁ সিমোঁর শিষ্য। মার্কস দাবি করেছেন, শ্রেণী সংগ্রামের মধ্যস্থতায় পশ্চিম ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফরাশি প্রভৃতি দেশে বুর্জোয়া শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ করেছে। মার্কস দেখাতে চেয়েছেন যে, বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতা যে পথে এসেছে একদিন সেই পথের তার বিনাশ ঘটবে। অর্থাৎ শ্রেণী সংগ্রামেই তার অবসান হবে।  ইংল্যান্ড ও ফরাশি দেশের নতুন শাসক শ্রেণী সংক্ষেপে যাদের নাম বুর্জোয়া শ্রেণী,  একদিন শ্রমিক শ্রেণীর হাতে পরাস্ত হবেন। এই নতুন বিপ্লবী শ্রেণীর লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার দুষ্টক্ষতস্বরূপ যে শ্রেণী সংগ্রাম জারি রয়েছে তার অবসান ঘটানো। মার্কস নিবেদন করেছেন, একদিন শ্রমিক শ্রেণীর রাজ কায়েম হবে। এই ধারণাটি তাঁর নিজের পক্ষে শেষ আবিষ্কার। ইংরেজীতে এই ধারণার অনুবাদ হচ্ছে,  ডিক্টেটরশিপ অব দি প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণীর একান্ত শাসন। এঙ্গেলস তাঁর ১৭ মার্চের বক্তৃতায় বলেছেন, সকল কথার গোড়ার কথা, মার্কস ছিলেন একজন বিপ্লব ব্যবসায়ী। প্রচলিত ভাষায় পেশাদার বিপ্লবী। তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল একটাই, ছলে বলে কিংবা কৌশলে পুঁজিমালিক সমাজের উচ্ছেদ সাধন আর সেই উচ্ছেদ সাধনের কাজে তার সঙ্গে যে সবল রাষ্ট্র জাতীয় প্রতিষ্ঠাণের কল্যাণে এই ধরণের সমাজ গেড়ে বসেছে তাদের উচ্ছেদ সাধনে সর্বাত্মক শরিক হওয়াই তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা হয়েছিল। তিনি শরিক হতে চেয়েছিলেন বর্তমান যুগের প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তিসংগ্রাম। শ্রমিক শ্রেণী যে শ্রমিক শ্রেণী- বুর্জোয়া শ্রেণী যে তাদের শোষণ করছে এই সত্য খোদ শ্রমিকদের মাথায় তিনিই প্রথম ভালোভাবে ঢুকিয়েছেন। শ্রমিকদিগকে তিনি বলে দিয়েছিলোন, মুক্তিলাভ করতে হলে তার কি কি জিনিশ দরকার জবে, বা কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে। এক কথায় লড়াই করার মেজাজটা তাঁর অস্থিমজ্জায় গাঁথা ছিল। এমন মানুষের পক্ষে বুর্জোয়া শ্রেণীর ঘৃণা না কুড়িয়ে বেঁচে থাকা কী সম্ভব? এঙ্গেলস জানাচ্ছেন, মার্কস ছিলের তাঁর কালের সবচেয়ে বেশি ঘৃণাপ্রাপ্ত এবং সবচেয়ে বেশি কুৎসার শিকার ব্যক্তি। রাজতন্ত্রপন্থী আর প্রজাতন্ত্রপন্থী দুই ধরণের সরকারই তাঁকে স্ব স্ব দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার দৌড়ে বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধিরি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। এই একটি ক্ষেত্রে কে সংরক্ষণশীল আর কে অতি গ্রণতন্ত্রী সেই ভেদাভেদ করা যেতোনা। মার্কস আপন মনে কাজ করে গেছেন। একান্ত বাধ্য না হলে তিনি এই সকল কুৎসার কোনো জবাব দিতেন না। উদাহরণস্বরূপ `পুঁজি` প্রথম খন্ডের মুখবদ্ধ লিখতে বসে তিনি লিখেছেন, যে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল যাদের বিরুদ্ধে যায় তারা যে সেই গবেষণার মুন্ডপাত করবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের বিষয়টা একটু আলাদা। যে সমস্ত বিষয় নিয়ে অর্থশাস্ত্রের কাজ তাদের প্রকৃতিটা একটু অালাদা। এইসব বিষয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বা স্বার্থের সহিত জড়িত বিধায় অর্থশাস্ত্র গবেষকের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা যুদ্ধক্ষেত্রের শত্রুব্যূহে দেখা যায় মানবজাতির বক্ষে পৃথিবীর যতো চরম ধ্বংসাত্মক, পরম হীণ আরঅসুস্থ আবেগ আছে সবই এক জায়গায় এসে সমবেত হয়েছে। এদের নাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অসুর- অসুরি। শত্রুতার প্রকৃতিটা কেমন ত দেখার উদ্দেশ্যে মার্কস লিখেছেন, `উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি যদি ইংরেজদের সর্বজনস্বীকৃত চার্চ বা ধর্মসংঘের ৩৯ টি নিয়মের মধ্যে ৩৮ টি বাতিল করার দাবি তোলেন তা সহজে ক্ষমা করতে রাজি হবেন। তবে যদি তাদের আয়ের ৩৯ ভাগ হতে ১ ভাগও কমাতে চান অত সহজে ক্ষমা করতে রাজি হবেন না। কারণ মার্কস বলেছেন, আজকাল সম্পত্তি প্রথার সমালোচনার সাথে তুলনা করলে দেখবের নাস্তিকতা ছোট অপরাধ ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস যখন ` কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার` রচনা করেছেন তখনো ইউরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণী পুরোপুরি গড়ে উঠে নাই। ফরাশি একাডেমি প্রণীত ফরাসি ভাষার অভিধানে `প্রলেতারিয়েত` শব্দটি প্রথম ঢুকবার অনুমতি পেয়েছিল মাত্র ১৮২৮ সালে। মানে মার্কসের জন্মের মাত্র ১০ বছর পর আর ইশতেহারের বিশ বছর আগে। বুর্জোয়া শ্রেণী খুব সহজে এই শব্দটি উচ্চারণ করতে চাননাই। তারা এর পরিবর্তে `জনতা` শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। ইংরেজিতে একবচনে `ম্যাস` আর বহুবচনে `ম্যাসেস` শব্দের ব্যবহার ১৮৩০ সালের পর খুব বেড়ে যায়। নাপোলেয়ঁ বোনাপার্তের ভাইয়ের ছেলে লুই নাপোলেয়ঁ বলেছেন, ` এখন বর্ণভেদ লোপ পেয়েছে। অার জনতার শাসন কায়েম হয়েছে`। এঙ্গেলসের যে বক্তৃতা হতে আজ আমরা এতোগুলো কথা ধার করেছি সেই বক্তৃতায় তিনি মার্কসের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: মার্কসের মৃত্যুতে দুটো শক্তির প্রচন্ড ক্ষতি হয়েছে। প্রথম শক্তির নাম ইউরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত শ্রেণী বা শ্রমিক শ্রেণি। আর দ্বিতীয় যে শক্তিটির ক্ষতি হয়েছে তার নাম ইতিহাস শাস্ত্র। দু:খের মধ্যে বর্তমান কালের অনেক মার্কস ব্যবসায়ী এই সত্যটা আমলই করেন নাই। আআ/এমএইচ/টিকে

দি বেনিফিট অফ দি ডাউট

জীবনে বেনিফিট ছাড়া আমরা কেউই কিছু করি না, করতে চাইও না। এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ব্যাপারটা নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো সবার বেলায়ই মোটামুটি সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি অবুঝ শিশুকেও তার মায়ের কোল থেকে নিতে গেলে হাতে একটি ললিপপ ধরিয়ে দিতে হয়। আপনারা জানেন, বাংলা ভাষায় একটি কথা খুবই মশহুর, ‘নিজের বোঝ পাগলেও বুঝে।’ আর সব পাগল যে পাগল নয়,  সেটা পরখ করে দেখতে গেলেও আপনাকে ‘বেনিফিট’ এস্তেমাল করতে হবে। পাগলের হাতে পাঁচ শ’ টাকার একখানা নোট তুলে দিয়ে দেখুন সে কী করে। যত্ন  করে কোমরে গুঁজে রাখে, না তাচ্ছিল্য ভরে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এতে বুঝে যাবেন পাগলটি আসল না নকল। যাঁরা ‘ফি সাবিলিল্লাহ্’  দান-খয়রাত করে থাকেন,  তাঁরা কি বেনিফিট ছাড়া করেন?  তাই বা বলি কী করে! তাঁদেরও বেনিফিট আছে বৈকি! তবে সেটা ধরা যায় না,  ছোঁয়া যায় না এবং দেখাও যায় না। তাঁরা নগদানগদ কিছু চান না,  আর মানুষের কাছে তো নয়ই। তাঁরা তাঁদের লিল্লাহ্-সদগার বদলা আল্লাহ কাছে পরকালে হাসানা চান এবং নিয়ত সহি থাকলে তাঁরা তা পাবেনও। শুধু পাবেনই না, এক টাকায় সাত শ’ টাকা কিংবা তার চেয়েও বেশি। এবার দেখা যাক যারা আল্লাহ্ মানে না,  পরকাল বিশ্বাস করে না, তারা কী করে? তারা কী দান-দক্ষিণা করে?  আলবৎ করে। কোনো কোনো সময় বরং ধার্মিকদের চেয়ে অধার্মিকরা আরো বেশি বদান্যতা দেখায়। যে ধর্ম মানে না,  সে দরিদ্র-সেবার বিনিময়ে কোনো মানুষের কাছে কোনো বৈষয়িক বেনিফিট চায় না, মানুষটি আল্লাহ্ নিকট সওয়াবও চায় না। তবে সে যা চায়,  তা ষোল আনাই পায়। আর সেটা হল তার আত্মতৃপ্তি,  মনের প্রশান্তি! এই আত্মতৃপ্তি ও প্রশান্তির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে জানি,  কিন্তু তার বৈষয়িক মাজেজা কী?  তা আমার মাথায় আসে না! ভূমিকা শেষে এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ঊনিশ শ’ আশি দশকের একেবারে গোড়ার কথা। আমি তখন বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের একজন নতুন গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ)। আমার সুপাভাইজার কোরিয়ান বংশোদ্ভূত অধ্যাপক সাংগু কিম। টিএ হিসেবে তাঁর জন্য আমাকে সপ্তাহে বিশ ঘণ্টা কাজ করার কথা। শুরুতে তিনি আমার ব্যাকগ্রাউন্ড একটু জেনে নিলেন এবং ক্লাস-স্কেজুলের একটি কপি দিয়ে তাঁর দায়িত্ব সারলেন। আমি তাঁর ইন্স্ট্র্রাক্শন্স ঠিকমত বুঝলাম কি না,  তিনি তা বুঝে নেওয়ার দরকার মনে করলেন না। দুই কিংবা তিন দিন যেতে না যেতে ড. কিম আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। রেগেমেগে বললেন,  আমি কেন সোমবার ও বুধবার ক্লাসে যাইনি। ছেলেমেয়েরা ক্লাসে আমার জন্য অপেক্ষা করে করে দু’দিনই চলে গেছে,  পরে ডিপার্টমেন্টে কমপ্লেনও করেছে। তিনি আমাকে আরো বললেন,  ‘তুমি জান আমি তোমাকে এখনই বরখাস্ত করে দিতে পারি।’ আমি বললাম,  ‘আমি নতুন এসেছি মাত্র, নর্থইস্টার্নের নিয়ম-কানুন জানি না। আমাকে কেউ বলেনি যে, টিএদেরকে এখানে টিউটোরিয়াল ক্লাসে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে হয়। আমি ম্যানিটোবায়ও টিএ ছিলাম; সেখানে এ কাজে ছাত্রদের পড়াতে হত না। তুমি আমাকে শুধু টিউটোরিয়াল ক্লাসের স্কেজুল দিয়েছ। কী করতে হবে তা বুঝিয়ে বলনি। তুমি যদি আমাকে এখন  কাজে অব্যাহতি দাও, তাহলে আমাকে পথে বসতে হবে, আমার তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। মনে হল আমার কোনো কথাই ড. কিমের বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাঁর সন্দেহ, আমি একটি দায়িত্বহীন উচ্ছৃঙ্খল যুবক, ইচ্ছা করে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোথাও গিয়ে নেশা-টেশা করেছি! তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি বিয়ে করেছ? এখানে বউ নিয়ে থাক না একা আছ?  আমি বললাম, আমার বউ আছে এবং আমার সাথেই  শুধু তাই নয়, সে এখন অন্তঃস্বত্বা, আগস্টে আমাদের প্রথম বাচ্চা হবে। এবার তাঁর একটু দয়া হলো। নিশ্চয়ই ভেবেছেন, ‘বিবাহিত ছেলে বাপ হতে চলেছে, এত দায়িত্বহীন হওয়ার কথা নয়, অল্প সময়ে হয়তো বা সত্যি সত্যি তার কাজ বুঝে উঠতে পরেনি।’  তিনি বললেন,  ‘প্রথমবার তাই তোমাকে ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’ দিলাম। আর যদি এমন ঘটনা ঘটে তবে তোমাকে আমি তাৎক্ষণিক টিএশীপ থেকে ছাঁটাই করব।’  পয়লাবারের মত শুনলাম ইংরেজি বাক্যাংশ ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’ জেনে নিলাম তার মানে শিখে নিলাম একটি নতুন কথা। ড. কিম কথাটি এক্জেক্টলি এভাবে বলেছিলেন,  না তাঁর কথায় একটু তারতম্য ছিল,  তা স্পষ্ট মনে নেই, কিন্তু সহি কথাটি যে আমার সহিভাবে শেখা হয়নি সেটা জানলাম বুড়ো বয়সে এসে মাত্র সেদিন। সঙ্গে থাকুন, এ প্রসঙ্গে ফিরে আসব আবার। আপনারা জেনে খুশি হবেন আমার নর্থইস্টার্ন জীবনে এমন ঘটনা আর  কোনো দিন ঘটেনি,  এবং প্রথম কোয়ার্টারে তাঁরই পড়ানো গ্র্যাজুয়েট মাইক্রো ক্লাসে  স্ট্র্যাট `অ` পেয়ে পরে ড. কিমের অনেক আনুকূল্যও হাসিল করেছিলাম। সেদিন ড. কিম আমাকে ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’  দিলেন। যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন বুঝতে পারি,  ঊনিশ শ’ ষাট-সত্তরের দশকে আমার বাবাও আমাদের বাড়ির কাজের লোকদের একটি বেনিফিট দিতেন। তবে সেটা অন্য কিসিমের। শুনুন এবার সে কাহিনি। আমাদের পরিবার ছিল একটি বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। বাচ্চা-কাচ্চা, মাদ্রাসার তালবা,  মসজিদের ইমাম,  বংশানুক্রমিক পেটেভাতে কাজের লোক,  বেতনভোগ কৃষিশ্রমিক,  গরু-মহিষের রাখাল,  রান্নাঘরের হেল্পিং হ্যান্ড,  ইত্যাদি মিলে খাওয়ার লোক ছিল ৩০-৩৫-এর মত। দিনে আমরা তিন বেলা ভাত খেতাম। প্রতিবেলা ঘরে রান্না হত কমপক্ষে মাঝারি সাইজের দুই ডেকচি সাদা চালের ভাত এবং বড় এক ডেকচি লাল চালের ভাত। বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী মনিব পক্ষের জন্য ছিল সাদা ভাত এবং শ্রমিক পক্ষের জন্য বরাদ্দ ছিল লাল ভাত। এখানে বলে রাখা ভালো সাদার প্রতি আমাদের আকর্ষণ চিরাচরিত এবং তখন বাজারে লাল চালের দাম ছিল সাদার চেয়ে অনেক সস্তা। আমি লাল-সাদা দু’টোই খেয়েছি। আমার কাছে স্বাদে তেমন কোনো তফাৎ মনে হয়নি,  বরং লাল ভাত আমার কাছে সাদাটার চেয়ে বেশি মজা লাগত। তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন জানি লাল ভাতের খাদ্য উপাদান এবং পুষ্টিগুণমানও সাদার চেয়ে অনেক বেশি। এদেশে লাল চালের দাম সাদা চালের কমছে কম তিনগুণ। আজই আমি ১০ পাউন্ডের এক ব্যাগ শ্রীলঙ্কান লাল চাল কিনে এনেছি। এখন কথা হলো আমার বাবা-চাচারা যদি লাল ভাতের কিম্মতের কথা জানতেন, তাহলে কি এমন ভাতনীতি বাড়িতে চালু করতেন?  নিশ্চয়ই না। তাই আমার বাবা মনের অজান্তে বাড়ির কাজের লোকদের একটি  বেনিফিট দিয়ে গেছেন। ওই বেনিফিটকে কি বলা যায়,  ‘দি বেনিফিট অফ দি ইগনোরেন্স’ ? হোয়াই নট?   এই দুই বেনিফিট দুই ধরনের এবং তাদের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সে অমিলটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাকার বন্ধু ইবনে আয়াজ রানাকে ধন্যবাদ! সঠিক জ্ঞান ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারলে ‘দি বেনিফিট অফ দি ইগনোরেন্স’এর সমাধান সম্ভব,  কিন্তু প্রতিপক্ষের মনের খবর না জানলে ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’-এর কোনো বিহিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর মানুষের মনের কথা তো আল্লাহ্ ছাড়া কারো পক্ষে জানার কোনো উপায়ও নেই! এখানে এক কর্তা যতখানি অসহায়, অন্যজন তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এবার দেখি আজকের এ লেখার শানে-নযুলটি কী। আমার সাম্প্রতিক এক লেখায় আমি ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’ কথাটি ব্যবহার করতে গিয়ে একটি ভুল করেছিলাম। আমার লেখা ওই বাক্যাংশে ‘দি’ অর্টিকলটি মিসিং ছিল। এটা অসাবধানতার ভুল নয়, বরং জানার গলতির ভুল। লেখাটি পড়ে আমার বন্ধু আনিস চৌধুরী তাৎক্ষণিক ভুলটি ধরিয়ে দিল। আমি সাথে সাথে শুধরে নিলাম। নিতান্ত আপনজন না হলে আজকাল আর কেউ কারো ভুল ধরিয়ে দেয় না। অবশ্য তারও যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। কারো ভুল ধরিয়ে দিতে গেলে অনেক বড় ঝুঁকি নিতে হয়। ভুল শুধরাতে গেলে কোন বন্ধু কখন কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সেটা জানা খুবই কঠিন। আর জানা থাকলেই বা কী? সব সময় তো মানুষের মন মেজাজ সমান থাকে না। তাই বেশির ভাগ মানুষই কারো ভুল ধরতে যায় না। অবশ্য আমার বন্ধুদের মাঝে মাহবুব এবং আনিস তার ব্যতিক্রম। বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম, চিন্তা করলাম, এ নিয়ে একটি আলাদা শর্ট পিস লেখা যায় কি না। ভাবতে ভাবতে লিখতে শুরু করে দিলাম এবং এসে দাঁড়ালাম এই জায়গায়। বন্ধুগণ, লেখাটা কেমন হয়েছে, এর গুণমানের বিচার আপনাদের হাতে রইল, তবে আমি একে আর দু’ চারটা নিবন্ধের মত করে দেখতে চাই না। এটি একটি বিশেষ রচনা।  আজকের এ বয়ানকে যদি বলি, ‘ভুল থেকে ফুটে ওঠা ফুল’ তাহলে কেমন হয়? আর আপনারা যদি একে ফুল বলতে রাজি হন, তাহলে এ ফুল আনিসেরই প্রাপ্য। ‘...ফুটে ওঠা..’ এই ফুলকে আজ আমি সযত্নে সপে দিতে চাই বন্ধুবর আনিস চৌধুরীর করকমলে। কালের আবর্তে আনিসের হাতে এ ফুল একদিন বাসি হয়ে যাবে,  শুকিয়ে রং বিবর্ণ হবে, ফুলের পাপড়িগুলোর বাঁধন শিথিল হয়ে যাবে, কিন্তু এর সুরভি কোনো কালেও ফুরাবার নয়, বাতাসে মিশে হাওয়া হওয়ারও নয়। তাজা বসরাই গোলাপের মত যুগ যুগ ধরে সে ফুল নীরবে মধুর সুগন্ধি বিলাবে জগতের তাবৎ বন্ধুদের নাকে,  বন্ধুত্বের মহিমায় মনমাতানো সব সুর বাজাবে তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে, কানে কানে। ..ফুটে ওঠা.. ফুলের সুবাস সমীরে তরঙ্গ তুলে ছুঁয়ে যাবে সকল বন্ধুদের হৃদয়-মন,  আর অনাদি কাল ধরে শুনিয়ে যাবে বন্ধুর প্রতি বন্ধুর দাবির কথা, আবদারের কথা, বন্ধুত্বের মমতামাখা মধুর মধুর স্মৃতির কথা, প্রাণের কথা! বিয়ন্ড অল ডাউটস, ‘দি বেনিফিট অফ দি ডাউট’  অমর হউক, অমলিন বন্ধুত্বের প্রতীক রূপে! লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি