ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৮ ১:৫০:১৯

আমরা জানতে চাই

আমরা জানতে চাই

  সংবাদ মাধ্যমে সেদিন আলোকচিত্র শিল্পী শহিদুল আলমের একটি ছবি ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেক কয়জন পুলিশ মিলে শহিদুল আলমকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার চেহারা বিপর্যস্ত এবং খালি পা। ছবিটি দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠেছে, কারণ আমার মনে হয়েছে এই ছবিটি আমারও ছবি হতে পারত। শহিদুল আলম যেসব কাজ করেন আমরাও আমাদের মতো করে সেসব করতে চাই, তার মতো প্রতিভাবান বা দক্ষ নয় বলে করতে পারি না। কখন আমাদের কোন কাজ বা কোন কথা আপত্তিকর মনে হবে না এবং একই ভঙ্গিতে আমাদের গায়ে হাত দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হবে না সেটি কে বলতে পারে? কিছুদিন আগে আমি ছুরিকাহত হওয়ার পর আমার রক্তাক্ত অর্ধচেতন ছবি খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল, আমার সেই ছবি দেখে আমার আপনজন যতটুকু বিচলিত হয়েছিল আমি নিশ্চিত তারা যদি দেখত একদল পুলিশ আমাকে আঘাত করে খালি পায়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা তার চাইতেও একশ গুণ বেশি বিচলিত হতো। এই মুহূর্তে শুধু শহিদুল আলমের পরিবারের লোকজন নয়, আমরাও অনেক বিচলিত। আলোকচিত্র শিল্পী শহিদুল আলমের অপরাধটি কী আমি সেটা বুঝতে পারিনি। তিনি আল জাজিরাতে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আমি সেটা দেখিনি তবে বিবিসির খবরে পড়েছি তিনি আন্দোলন দমনের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। (আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কখনো বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিই না, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একজন সাংবাদিক আমি ছুরিকাহত হওয়ার পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এই মুহূর্তে ‘টাইম’-এর একজন সাংবাদিক আমাকে ই-মেইল পাঠিয়েছে। আমি বিনয়ের সঙ্গে তাদের বলি, বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমা সাংবাদিকদের এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা আছে এবং আমি যেটাই বলি না কেন আমাদের দেশের নেতিবাচক রূপটা দেখানোর জন্য সেটা ব্যবহার করা হবে তাই আমি তাদের থেকে দূরে থাকি।) কিন্তু শহিদুল আলমের মতো একজন আন্তর্জাতিক মানুষ, একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ দেশের অবস্থাটি বিদেশি সাংবাদিককে বলতেই পারেন। সেটি যদি সরকারের সমালোচনা হয় সরকারকে সেটা মেনে নিতে হবে কিছুতেই সেটাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তার দ্বিতীয় অপরাধ হিসেবে ফেসবুক লাইভে তার বক্তব্যের কথা শুনতে পাচ্ছি, ফেসবুক লাইভ বিষয়টি কি আমি সেটা সঠিক জানি না। সেখানে তিনি কী বলেছেন সেটাও আমি জানি না, কিন্তু যেটাই বলে থাকেন সেটা তার বক্তব্য, এই বক্তব্য দিয়ে তিনি বিশাল ষড়যন্ত্র করে ফেলছেন সেটি তো বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপত্তিকর কিছু বলে থাকলে, কেন সেটি বলেছেন সেটি নিয়ে গবেষণা হতে পারে, আলোচনা হতে পারে, তার চাইতে বেশি কিছু তো হওয়ার কথা নয়। আমি শুনেছি তার থেকেও অনেক বেশি আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার পরও অভিনয় শিল্পীর অনেকে পার পেয়ে গেছেন তাহলে খ্যাতিমান সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই আলোকচিত্র শিল্পীর ওপরে এই আক্রমণ কেন? যদি সত্যিই তিনি ষড়যন্ত্র করে থাকেন আমরা সেটি জানতে চাই। একজন মানুষ তার সারা জীবনের কাজ দিয়ে একটা পর্যায়ে পৌঁছান। আমরা তখন তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসাই। তাকে সম্মান দেখিয়ে আমরা নিজেরা সম্মানিত হই। তখন যদি তাকে অসম্মানিত হতে দেখি আমরা অসম্ভব বিচলিত হই। শহিদুল আলম যেটাই বলে থাকুন সরকারের সেই কথাটি শোনা উচিৎ ছিল কোনোভাবেই সেটাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ হয়নি। আমরা কী সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকদের গায়ে হাত তুলতে দেখিনি? তাদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতে দেখিনি? সেগুলো কী অপরাধ নয়? কোনো কোনো অপরাধ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য কিছুকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে এই দেশের মূল ভিত্তিটা ধরেই কী আমরা টান দিই না? স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা মিলে অসম্ভব সুন্দর একটা আন্দোলন শুরু করেছিল। কেউ মানুক আর না-ই মানুক পৃথিবীর ইতিহাসে এটা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা সারা জীবন চেষ্টা করে রাস্তাঘাটে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারিনি তারা সেগুলো আমাদের উপহার দিয়েছে। কিন্তু এই আন্দোলনের শুরু থেকে আমার ভেতরে একটা দুর্ভাবনা কাজ করেছিল। সহজ সরল কম বয়সী ছেলেমেয়েরা যে বিশাল একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছে তারা কী সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? আমরা সবাই জানি সেই সহজ সরল আন্দোলনটি শুধু যে জটিল হয়ে উঠেছিল তা নয়- সেটি ভয়ঙ্কর রূপ নিতে শুরু করেছিল। ঝিগাতলার সেই সংঘর্ষে কারা অংশ নিয়েছিল? স্কুলে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা মারামারি করেনি। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে কেন বড় মানুষরা মারামারি করতে এসেছে? তারা কারা? এক পক্ষ ছাত্রলীগ, সরকার সমর্থক কিংবা পুলিশ হতে পারে, অন্য পক্ষ কারা? আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে জিজ্ঞেস করেছি তারাও উত্তর দিতে পারেনি। আমি অস্বীকার করছি না যে আজকাল মিথ্যা সংবাদ এবং গুজবের কোনো শেষ নেই। কয়েকদিন আগে আমার মৃত্যু সংবাদ সোস্যাল মিডিয়াতে প্রচার করা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা যখন নিজেদের ‘আমি রাজাকার’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল তখন আমি আমার প্রবল বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছিলাম। প্রফেসর আনিসুজ্জামানের সাম্প্রতিক একটা লেখা থেকে জানতে পারলাম তার মর্মাহত হওয়ার মতো এই খবরটি তিনি আমার লেখা থেকে জানতে পেরেছিলেন। তাকে কেন এই তথ্যটি আমার লেখা থেকে জানতে হলো? দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের কোনোটি কেন এই তথ্যটি প্রকাশ করল না? তাদের কারো কী মুক্তিযুদ্ধের জন্য দায়বদ্ধতা নেই? রাজাকারের জন্য ঘৃণা নেই? যাই হোক রাজাকারের জন্য আমার ঘৃণা প্রকাশ করার পর কোটাবিরোধী প্রজন্মের প্রায় সবাই আমার মৃত্যু কামনা করছে। তাই আমার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করাটি হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু অসংখ্য মিথ্যা সংবাদ এবং গুজব প্রচার করা কিন্তু তত স্বাভাবিক নয়। সরকার যেভাবে তথ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আন্দোলন দমন করার জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলো কিন্তু অনেকের ভেতরেই এক ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। সরকার কী এটি জানে? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ক্ষমা করে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? ছাত্রলীগের ছেলেরা কী অনেক ক্ষেত্রে তাদের থেকেও বড় অপরাধ করেনি? যাইহোক আগস্ট মাস বাংলাদেশের জন্য একটি অশুভ মাস। কেউ বিশ্বাস করবে কী না জানি না এই মাসটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি এক ধরনের অশান্তিতে থাকি। এই বছর আমার অশান্তিটি বেশি। আমি যখনই চিন্তা করছি আলোকচিত্র শিল্পী শহিদুল আমলকে শুধু গ্রেফতার করা হয়নি তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে আমি বিষয়টি ভুলতে পারছি না। শেষবার সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলে আমাদের অনেক শিক্ষকদের ধরে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। মনে আছে আমরা তখন আমাদের সহকর্মীদের জন্য পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করছি কিন্তু কেউ সেই লেখা ছাপানোর সাহস পাচ্ছে না। আমরা শিক্ষকরা তখন খুব অসহায় বোধ করছিলাম। এখন অনেকদিন পর আবার কেমন যেন অসহায় বোধ করছি। নিজ দেশে কেন আমরা অসহায় অনুভব করব? কী হচ্ছে আমরা কী জানতে চাইতে পারি? মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।   (লেখাটি লেখকের নিজস্ব মতামত)। এমএইচ/ এসএইচ/
মৃত্যুর এই উপত্যকা

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মাঝেই আমি খবরের কাগজের কোনো কোনো খবর পড়ার সাহস পাই না। হেডলাইনটা দেখে চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। যেন চোখ সরিয়ে নিলেই খবরটা অদৃশ্য হয়ে যাবে। খবর অদৃশ্য হয় না; থেকে যায়। তখন সাহস সঞ্চয় করে একটু একটু করে খবরটা পড়তে হয়। এয়ারপোর্ট রোডে বাস দিয়ে ধাক্কা দিয়ে রাজীব আর মীম নামে দুটি কিশোর-কিশোরীকে মেরে ফেলার খবরটি সেরকম একটি খবর। খবরের কাগজে তাদের ছবি দেখে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠেছে। আমার অনেক বয়স হয়েছে কিন্তু কেন জানি সবসময় মনে হয়, আমার বয়সটা এই বয়সী ছেলেমেয়েদের বয়সের সঙ্গে আটকে আছে। এদের দেখলে মনে হয়, আমি এদের বয়সী। এরা কী ভাবে, কী কল্পনা করে- আমি বুঝি, অনুমান করতে পারি। তাই এই দুটি কিশোর-কিশোরীর ছবিটা দেখার পর থেকে খুব মন খারাপ হয়ে আছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে নানাভাবে মৃত্যুকে মেনে নিতে হয়, আমরা মেনে নিই। কিন্তু খুনকে মেনে নিতে হয় কে বলেছে? সবাই কি জানে আমাদের দেশে যে ঘটনাগুলোকে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ বলে, সেগুলোর বেশিরভাগ দুর্ঘটনা নয়-সেগুলো পরিষ্কার খুন? ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে একজনকে মেরে ফেলা আর দুটি বাস একটি-আরেকটির সঙ্গে কম্পিটিশন করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কতগুলো কিশোর-কিশোরীর ওপর সেই বাসটি তুলে দেওয়ার মাঝে যে কোনো পার্থক্য নেই-সেটি কি সবাই জানে? সবাইকে জানতে হবে। দুর্ঘটনার ওপর কারও হাত নেই, আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুর্ঘটনাকে মেনে নিই, কিন্তু বাংলাদেশের ‘সড়ক দুর্ঘটনা’গুলো তো দুর্ঘটনা নয়, সেগুলো কেন আমরা দিনের পর দিন মেনে নিই? আমি সিলেট থাকি, মাঝে মাঝেই নানা দরকারে ঢাকা আসতে হয়। বেশিরভাগ সময় গাড়িতে আসি, হিসাব করে দেখেছি, ঢাকা-সিলেট না করে যদি সোজা গাড়ি চালিয়ে যেতাম তাহলে এতদিনে পুরো পৃথিবীটাকে অন্তত কুড়িবার পাক খেয়ে আসতে পারতাম। যতবার সড়কপথে গিয়েছি একবারও মনে হয়নি আর একটু হলে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেত! দৈত্যের মতো বাস-ট্রাক উল্টোদিক থেকে সোজাসুজি আসতে থাকে, ছোট গাড়িকে সরে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় সরে যাওয়ার জন্য রাস্তায় যথেষ্ট জায়গা থাকে না, তখন রাস্তার পাশে উঠে যেতে হয়। দৈত্যের মতো বড় বড় বাস-ট্রাক প্রবল প্রতাপে রাস্তা দখল করে চলে যায়। তাদের কেউ কখনো বলেনি রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন আছে, অন্য গাড়িকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ওভারটেক করা যাবে না। কেউ করলে কখনো সে জন্য শাস্তি দেওয়া হয়নি। পথঘাটে নিয়মকানুনগুলো জোর করে সবাইকে মানতে বাধ্য করা হলে অনেক মানুষ বেঁচে যেত। বাংলাদেশের পথঘাটে প্রতিদিন কমপক্ষে বারোজন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। আমরা এ বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাই ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটা ব্যবহার করি। যে ঘটনাটি বন্ধ করা সম্ভব সেটি দুর্ঘটনা নয়, সেটি অপরাধ। যদি সে কারণে কেউ মারা যায়, সেটি খুন। শেষবার যখন ঢাকা থেকে সিলেট আসছি তখন হঠাৎ রাস্তায় গাড়ির জ্যাম। একটু এগিয়ে দেখলাম এই মাত্র বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। রাস্তার পাশে সারি সারি মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশে একজন মানুষ হয়তো সারা জীবনে এরকম একটি ঘটনা একবার দেখে। আমি অনেকবার দেখেছি। যারা আহত তাদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যারা মারা গেছে তাদের নিয়ে কোনো ব্যস্ততা নেই। তারা রাস্তার পাশে শুয়ে থাকে। নারী-পুরুষ এবং শিশু। এক মুহূর্ত আগেও তারা জানত না, তাদের মেরে ফেলা হবে। মুহূর্তের মাঝে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়, পুরোপুরি জীবনের স্বপ্ন ও আশায় ভরপুর একজন মানুষের সবকিছু শেষ হয়ে যায়। যারা মারা যায় আমরা তাদের সংখ্যা নিয়ে কথা বলি। যারা আহত হয় তাদের কী হয়? কেউ কেউ পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়, কেউ কেউ সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। রাজীব আর মীম যে ঘটনায় মারা গেছে সেখানে আরও নয়জন আহত হয়েছে। তারা কেমন আছে? অন্ততপক্ষে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাটুকু করা হয়েছে তো? বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি আমার অফিসে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ফোন এলো। ফোন করেছে আমার প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমান সহকর্মী। টেলিফোনে সে ঠিক করে কথাই বলতে পারছিল না, হাহাকারের মতো শব্দ করছিল। কষ্ট করে কথা বলে বুঝতে পারলাম ভয়ঙ্কর মুখোমুখি একটা বাস দুর্ঘটনায় পড়েছে। সে বাসের ভেতর, চারপাশে আহত এবং মৃত মানুষ। একজন রিকশাওয়ালা বাসের জানালা দিয়ে একজন করে আহত মানুষকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সেভাবে সেও শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছেছে, তখন যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা আনা হয়েছিল। ঢাকায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, সেই সহকর্মীকে নিয়ে নরসিংদীর সেই এলাকায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে সেই রিকশাওয়ালাকে বের করে তার হাত ধরে ধন্যবাদ জানিয়ে আসি-সে একা কারও সাহায্য নিয়ে সেই বাস দুটির ভেতর থেকে আহত মানুষদের বের করে একজন একজন করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি আর করা হয়নি। মাঝে মাঝেই দুঃখ হয়, জীবনের অনেক কাজই শেষ পর্যন্ত আর করা হয়ে ওঠে না। আমি অনেক দিন থেকে ভেবেছি যে, এরকম বড় দুর্ঘটনার পর বাসের মালিকদের নামে মামলা করা উচিৎ। প্রায় সব সময়েই দেখা যায় যে, দুর্ঘটনাগুলো সত্যিকারের দুর্ঘটনা নয়। এগুলো বাসের মালিক, ড্রাইভার, হেলপারদের এক ধরনের দায়িত্বহীনতার জন্য ঘটেছে। যদি মামলা করে বাসের মালিকদের ক্ষতিপূরণে জন্য বাধ্য করা হয়, শুধু তাহলেই হয়তো তারা সতর্ক হবে। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নয়, নিজেদের টাকা বাঁচানোর জন্য তারা একটুখানি দায়িত্বশীল হবে। আমি আমার সেই সহকর্মীকে মামলা করার কথা বলেছিলাম। সে রাজি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। বাস কোম্পানির অবহেলার অনেক কারণ ছিল এবং সেই অবহেলার কারণে একজন নয়, দুইজন নয়, ষোলোজন মানুষ মারা গিয়েছিল। কতজন আহত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল তার হিসাব নেই। আমাদের দেশে মামলা শেষ হতে চায় না। ঠিক সেভাবে এই মামলার রায় পেতেও অনেক বছর চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত মামলার রায় হয়েছে, কিন্তু সেটি আমার সহকর্মীর পক্ষে নয়। আমি অবশ্যি হাল ছেড়ে দেইনি। আশা করে আছি, কোনো একবার ঠিক ঠিকভাবে বাস মালিক নামের এই প্রবল প্রতাপশালী মানুষদের বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে। একবার এ দেশে সেই নিয়ম চালু হয়ে গেলে বাস ড্রাইভারদের এই ভয়ঙ্কর দায়িত্বহীনতা হয়তো একটুখানি হলেও বন্ধ হবে। মানুষের প্রাণের জন্য কারও কোনো মায়া-মমতা নাও থাকতে পারে, কিন্তু টাকার জন্য মায়া-মমতা নিশ্চয়ই আছে। আমরা সবাই দেখেছি আমাদের দেশে পরিবহন শ্রমিকদের অনেক ক্ষমতা। তাদের দুর্ব্যবহারের উদাহরণের কোনো শেষ নেই। একজন যাত্রীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হলে তাকে অবলীলায় ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিতে পারে। একজন ড্রাইভার ঠাণ্ডা মাথায় একজন পথচারীর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। ড্রাইভার কন্ডাক্টর হেলপার মিলে বাসের ভেতর একটি মেয়েকে ধর্ষণ করেছে কিংবা ধর্ষণ করে খুন করেছে-এমন উদাহরণও আছে। মাত্র সেদিন একজন আহত কলেজছাত্রকে নিয়ে ঝামেলা হতে পারে ভেবে তাকে খুন করে পানিতে ফেলে দিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশে ওপরের যে কোনো একটি ঘটনা পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াত, আমাদের দেশে কিছুই হয় না। একজন শক্তিশালী মন্ত্রী তাদের নেতৃত্ব দেন এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, এই পরিবহন শ্রমিকরা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছে। কলেজের ছাত্র-ছাত্রী রাজীব এবং মীম মারা যাওয়ার পর আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতিক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত বিচিত্র। তিনি কয়েকদিন আগে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে সবাইকে (হাসিমুখে) জানিয়েছেন, তারা যদি সেই ঘটনাটি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে, আমরা কেন সেটি নিয়ে এত ব্যস্ত হয়েছি! যে সহজ বিষয়টি তার নজর এড়িয়ে গেছে সেটি হচ্ছে, ভারতবর্ষের ঘটনাটি ছিল একটি দুর্ঘটনা; আমাদের ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়, সেটি এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। একটুখানি দায়িত্বশীল হলেই এই ঘটনা ঘটত না। আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন সারা দেশের কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পথে নেমে এসেছে। তাদের দাবিটি অত্যন্ত মানবিক, আমরা সবাই দীর্ঘদিন থেকে এই একই দাবি করে আসছি। আমাদের সেই কথাগুলো কখনো কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি। কলেজের ছেলেমেয়েরা সেই কথাগুলো শেষ পর্যন্ত সবাইকে শোনাতে পেরেছে। আশা করছি, তাদের অত্যন্ত মানবিক দাবিগুলো শোনা হবে। আমাদের দেশটিকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর উপত্যকা হিসেবে দেখতে চাই না।   লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। এমএইচ/এসএইচ/  

ন্যায় বিচারক তাজউদ্দীন  

১৯৭১ সালের নয় মাসে বঙ্গবন্ধুর নামে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার অভাবনীয় নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করার মতো এক অসাধারণ কর্ম সম্পাদন করে। স্বাধীন দেশে অর্থমন্ত্রী হিসাবেও ছিলেন সফল। ১৯৭৪ সালে তাকে মন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয় দলের হাইকমান্ডের ইচ্ছায়। কিন্তু তিনি আদর্শ আর ব্যক্তিগত নীতিবোধে কোনও ছাড় দেননি আমৃত্যু। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত তার নীতিবোধ আর দেশপ্রেম ছিল এই ভূ-খণ্ডের রাজনীতিতে এক অনুকরণীয় ঘটনা। ১৯৭২-১৯৭৪ সালে তাজউদ্দীন আহমদ যখন অর্থমন্ত্রী তখন তার একান্ত সচিব ছিলেন আবু সাইদ চৌধুরী। এই সরকারি কর্মকর্তা তার কর্মকালীন সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। ঘটনাটি এরকম:- তাজউদ্দীন সাহেব সাধারণত আমাকে তার বাসায় যেতে বলতেন না। খুব বিশেষ কোনও কাজ থাকলে যেতে বলতেন। এ ছাড়া আমি যদি যেতাম সেটা আমার ইচ্ছা। সেই সময় রবিবারে ছুটি থাকত। এক শনিবারে আমরা কাজ সেরে রাত ১০টার পর যখন সচিবালয় থেকে ফিরছি সেই মুহূর্তে তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘চৌধুরী সাহেব, কাল আমরা কিছু অফিশিয়াল কাজ করবো। আমি পিএ-কে বলে দিয়েছি ফাইলগুলো বেঁধে গাড়িতে দিতে।’ আমি আপত্তি জানিয়ে বললাম, ‘স্যার, পুরো সপ্তাহ ধরে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত কাজ করছি। আগামীকাল ছুটির দিন, স্যার, আমার তো একটা সংসার আছে।’ তিনি বললেন, ‘চৌধুরী সাহেব, কালকের দিনটা একটু কষ্ট করতে হবে, কারণ কাল আমি কিছু জরুরি ফাইল ছাড়বো। আপনি তো জানেন ফাইলগুলো আমার টেবিলে আছে।’ পরদিন সকালে আমি তার হেয়ার রোডের বাসায় গেলাম। আমি যাওয়ার আগেই তিনি দোতলার বারান্দায় বসে ফাইল দেখা শুরু করেছেন। আমি তার পাশে রাখা চেয়ারে বসলাম। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে একটি ফাইলে লিখছিলেন। প্রায় দুই পৃষ্ঠা মতো লিখে সেটা একবার পড়ে সই করে ‘লিলি, লিলি’ ( বেগম জোহরা তাজউদ্দীন) বলে ডাকতে লাগলেন। বেগম তাজউদ্দীন রুম থেকে বের হয়ে আসতেই তিনি বললেন, ‘ওই প্রমোশন কেসটা আমি অনুমোদন দিয়ে দিলাম।’ বেগম তাজউদ্দীন বললেন, ‘তুমি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী, তুমি তোমার মন্ত্রণালয়ের কাকে প্রমোশন দেবে না দেবে সেটা তোমার ব্যাপার, এর মধ্যে আমার তো বলবার কিছু নেই।’ তাজউদ্দীন সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, ‘লিলি, তুমি ঠিকই বলেছ, কিন্তু এই কেসটার সঙ্গে তোমার একটা সম্পর্ক আছে, তাই তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।’ আমি তাজউদ্দীন সাহেবের কথা শুনে ভাবছিলাম ব্যাপারটা কী। ঠিক ওই সময় মুখে প্রশান্তির হাসি নিয়ে তিনি আমার দিকে সেই ফাইলটা এগিয়ে দিলেন। আমি আগাগোড়া ফাইলটি পড়লাম। একজন কর কর্মকর্তার পদোন্নতির ফাইল। নিচ থেকে নোটিং হয়ে উপরে এসেছে এবং পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে লেখা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি বিবেচ্য। তাজউদ্দীন সাহেব রেফারেন্স দিয়ে দিয়ে লিখেছেন এবং যার সারমর্ম হচ্ছে: আমি তার এসিআরগুলো দেখলাম। চাকরি জীবনের রেকর্ড অনুযায়ী তার পদোন্নতি পাওয়া উচিৎ। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। কারো প্রতি সন্দেহবশত কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না। যদি তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকে তবে তা আলাদাভাবে উত্থাপন করা যেতে পারে। যেহেতু নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ এখানে দেখানো হয়নি বা কোন প্রমাণও নেই, তাই আমি বিষয়টিকে বিবেচনার মধ্যে না এনে তার এই পদোন্নতি অনুমোদন করলাম। পড়া শেষ করে বললাম, ‘স্যার, এখনও বুঝিনি ব্যাপারটা যে কী, আর ভাবীকেই বা আপনি ওই কথা বললেন কেন!’ এবার তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ শুরুর মুহূর্ত কয়েক আগে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু লিলি যেতে পারেনি, ভাড়াটে সেজে কপালগুণে আর্মির হাত থেকে ছোট দুটো বাচ্চাসহ রক্ষা পায়। তারপর একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘুরতে ঘুরতে ধানমন্ডি ১৩ নম্বর রোডের লেকের পাশে পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে ওঠে পাঁচ বছরের মিমি আর এক বছরের সোহেলকে নিয়ে। সে সময় ভদ্রলোক বাসায় ছিলেন না। ফিরে এসে লিলির উপস্থিতি পছন্দ করলেন না। রাতে কারফিউয়ের মধ্যেই সেই ভদ্রলোক বললেন, আমার বাড়িটা তো একদম বড় রাস্তার পাশে, যদি আর্মি এখানে এসে পড়ে তবে সবার অসুবিধা হবে। তাই আপনি আমার সাথে আসুন, আমি আপনাকে দুটো বাড়ি পরে রেখে আসি। লিলি সেই রাতে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে বের হলো। বাসার গেটের বাইরে গিয়ে তিনি বললেন, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি একটা জরুরি জিনিস নাকি চাবি ফেলে এসেছি, এক মিনিটে নিয়ে আসছি। ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে কাঠের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লিলি আবার ভেতরে ঢুকে দরজায় কড়া নাড়ল, বেল বাজাল, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ আর দরজা খুলল না। তখন আর কোনও উপায় না দেখে লিলি সমস্ত রাত রাস্তার ওপর বাড়ি তৈরির জন্য স্তূপ করে রাখা ইটের পাশে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বড় রাস্তায় আর্মির আনাগোনা আর কারফিউয়ের মধ্যে বসে রইল। ‘এবার শুনুন, সেই ভদ্রলোকটিই এই লোক’ আমি যার পদোন্নতির কেস অনুমোদন করলাম। আমি মনে করি আমাদের জীবনের এই ঘটনার সঙ্গে তার চাকরি জীবনকে এক করে দেখা উচিৎ নয়। কেউ হয়ত কোনোভাবে জেনেছে আমার পরিবারের সঙ্গে তার এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, তাই তার ফাইলে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার কথা।’ তাজউদ্দীন সাহেবের কথা শেষ হলে আমি থমকে গেলাম। বিস্মিত হয়ে শুধু বললাম, ‘স্যার, ইউ আর এ গ্রেট ম্যান!’ তারপর আমরা আবার অন্যান্য ফাইলগুলো দেখতে শুরু করলাম। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সাংঘাতিক নৈর্ব্যক্তিক একটা মনোভাব ছিল তাজউদ্দীন সাহেবের।   লেখক: রাজনৈতিক কর্মী।    আআ/এসএইচ/

আজ আমার বাবার ২৩তম মৃত্যু বার্ষিকী

পল্লী চট্টলার প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও প্রথিত যশা ব্যক্তিত্ব মরহুম মোহাম্মদ আবুল কাশেম আমার পরম শ্রদ্ধেয় বাবা। ১৯৩০সালের ১ জানুয়ারি বোয়ালখালী উপজেলার আহলা- সাধার পাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।১৯৪৫ সালে পি সি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন,১৯৪৭ সালে কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে আই এ,১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি,এএবং ১৯৫৫ সালে বি টি পাশ করেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১ম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ইংরেজি শাস্ত্রে এম এ পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে পি সি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে পরবর্তীতে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২৬ বছর শিক্ষকতা করে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে নোয়াপাড়া কলেজে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে পুনরায় পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সাল হতে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।অবশেষে ১৯৯৫ সালের ২৪ জুলাই দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে মৃ্ত্যুবরণ করেন।তিনি বোয়ালখালী উপজেলা শিক্ষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন আদর্শ স্কাউট ছিলেন এবং আমৃত্যু স্কাউটিং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।তিনি পটিয়া থানার স্কাউটস্ এর প্রতিষ্ঠাতা কমিশনার ছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।তিনি একজন ভালো আবৃত্তিকার ও নাট্যকর্মী ছিলেন। সিরাজদ্দৌলা নাটকে `জগতশেঠ`,পলাশীর পরে নাটকে `মীরজাফর` এবং বঙ্গে বর্গী নাটকে `ভাস্কর পন্ডিত` এর অভিনয় তার অপূর্ব নাট্যশেলীর বহিঃপ্রকাশ।তিনি ছিলেন বহু পাঠ্য পুস্তক প্রনেতা ও সংকলক।তিনি ছিলেন আত্ম প্রচারে বিমুক। সেটাই তার মহিমা।তিনি পটিয়া উপজেলার সূচক্রদন্ডী গ্রাম নিবাসী মরহুম আহমদ কবির মোক্তার(এডভোকেট) এর জ্যেষ্ট জামাতা।"পরম করুনাময় বিশ্ববিধাতা তাকে চিরশান্তি দান করুক এবং বেহেস্ত নসীব করুক। লেখক: ইউএনবির বিশেষ প্রতিনিধি। এসএইচ/

ইট ভাটার করুণ কাহিনী

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। চট্টগ্রাম পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় প্রচুর ইটের ভাটা দেখা যায়। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের পিছনে একটা ইট ভাটা ছিল। একদিন বিকেলে আমি আর আমার বাবা হাটতে হাটতে ইট ভাটায় কাজ করছে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল। ফটাফট কিছু ছবি তুলে ফেললাম। কৌতূহল বশত কাচা ইট বানাচ্ছে এমন একজন নারীর দিকে এগিয়ে গেলাম কথা বলতে। উনার নাম জয়নব বেগম। বয়স ৩৭/৩৮ হবে। জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিদিন কত` শ ইট বানান? প্রতিদিন পারিশ্রমিক কত দেয়? মলিন চেহারায়, ভেজা ভেজা কণ্ঠে উনি উত্তর দিলেন, "প্রতিদিন ৬০০ ইট বানাতে হয়। বানাতে পারলে ৫০ টাকা পাই। না পারলে টাকাও পাই না মারও খেতে হয়।"মার ও খেতে হয় শুনে অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, " মার খেতে হয় কেন??" জয়নব বেগম শুরু করলেন প্রথম থেকে তার কস্টের কাহিনী। জয়নব বেগমের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। ভাল চাকরি দিবে বলে এক মামা চট্টগ্রাম নিয়ে আসে। তারপর এই ইট ভাটার ম্যানেজারের কাছে দিয়ে চলে যায়। তারপর আর কোনদিন কোন খবরও নেয়নি। এখানে উনি কাচা ইট বানায়। দিনে ৬০০ ইট বানাতে হয়। তাহলে দিন শেষে ৫০ টাকা পায়। ৬০০ ইট বানাতে না পারলে টাকাও পায় না, মার ও খেতে হয়। চট্টগ্রাম আসছে সাড়ে তিন বছর। একবারের জন্য বাড়ি যেতে দেয়নি। একবার পালাতে চেয়েছিল। ম্যানেজার আর মালিক মিলে অনেক মারছে আর গরম ইটের ছ্যাকা দিছে পেটে। শাড়িটা একটু সরিয়ে দেখালো ছ্যাকার দগদগে কালো দাগ পেটে। আমাকে কথা বলতে দেখে আরও কিছু পুরুষ-নারী এগিয়ে আসলো। সম্ভবত হাতে ক্যামেরা দেখে উনারা আমাকে সাংবাদিক বা মিডিয়া কর্মী ভেবেছিল। একটা মেয়ে, বয়স ২৫/২৬ হবে। খুব অভিমান নিয়ে বললো, " এত মন্ত্রী মিনিস্টারদের নিয়ে লেখেন। আমাদের নিয়ে একটু লিখতে পারেন না? উনারা তো সুখেই থাকে। আমাদের কস্ট একটু উনাদের জানাইতে পারেন না।" এক এক করে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। পুরুষ কিংবা নারী, সবারই গল্পগুলো একই রকম। প্রতিদিন ইট পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ইট ভাটায় পোড়ে তাদের সুখ, স্বপ্ন। সবাই এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় কিন্তু সব রাস্তা বন্ধ। পুরুষদের পারিশ্রমিক নারীদের দ্বিগুন। যেখানে নারীরা ৫০ টাকা পায় সেখানে পুরুষরা পায় ১০০ টাকা। কিন্তু একটু ভুল হলেই পুরুষদেরও সহ্য করতে হয় অমানবিক অত্যাচার। তার কিছু নমুনাও উনারা আমাকে তাদের শরীরে দেখালেন। অনেক নারী বললেন "আপা, কিছু কিছু ঘা এমন জায়গায় যে সবার সামনে দেখাতে পারছি না। আমাদের সঙ্গে ম্যানেজার জোর করে ওই সবও করে।" বুঝতে বাকি রইলো না এখানে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে অবিরত। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থার কথা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন এবং দেখলান। ইট ভাটার এলাকার ভিতরেই তাদের জন্য কয়েকটা ইটের ঘর করে দেওয়া হয়েছে। ওখানেই উনারা খায় আর রাতে ঘুমায়। এক এক রুমে ৮/৯ জন করে। এর মধ্যে হঠাৎ অফিস রুম থেকে একজন লোক মোটা একটা লাঠি হাতে বের হয়ে এলেন। উনাকে দেখে বাকিরা সবাই দৌড়ে কাজে লেগে গেলেন। অফিস থেকে বেরিয়া আসা লোকটা পরিচয় দিল, উনি সেখানকার ম্যানেজার। তারপর কিছুটা জোর করে আমাদের ওখান থেকে বের করে দিলেন। বললেন, এখানে এভাবে ওয়ার্কারদের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম নাই। কথা বললে আপনি আমাদের সঙ্গে বলবেন। এখন এখান থেকে চলে যান।" কয়েকবার সেই অসহায় মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে ফিরে আসলাম। আসার সময় কিছু ছবি তুলতে চাইলাম কিন্তু ক্যামেরাটা হাত থেকে নিয়ে নিল। তারপর ক্যামেরাটা ফেরত নিয়ে চলে এলাম। খুব কস্ট লাগছিল মানুষগুলোর জন্য। প্রতিদিন শত শত ইট আমরা বাড়ি বানাতে, ব্রিজ, ফ্লাইওভার বানাতে ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের এই ভদ্র সমাজ জানে না, ইট বানাতে যাদের ঘাম ঝরে তাদের জীবনের করুন কাহিনীগুলো। তারা পায় না কোন মিডিয়া কাভারেজ। ইট ভাটায় পুড়ে যায় তাদের জীবনের মূল্যবান সময়, সুখ, শান্তি। আর কিছু না পাওয়া স্বপ্ন। এই মানুষগুলোও হয়তো স্বপ্ন দেখে সুন্দরভাবে বাঁচার। তাদেরও সুন্দর এই পৃথিবীতে ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে নিশ্চয়ই। যারা এতো কষ্ট নিয়ে জীবন সংগ্রামে ঠিকে আছে আমাদের সমাজকে সুন্দর করতে তাদের নিয়ে কি রাষ্ট্র ভাবতে পারে না। কেনো তারা সারা জীবন বন্ধির মতো জীবনযাপন করবে। সমাজ, রাষ্ট্র যাই বলি না কেনো এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাড়ানো উচিৎ তাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে। অন্য পেশার মতো এই পেশায় যারা জড়িত তাদের মঙ্গলেও কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এমনটাই, প্রত্যাশা থাকলো। লেখক: বেসরকারি চাকরিজীবী। আআ/এসএইচ/

তাজউদ্দীনের জীবনে তিনটি ব্যতিক্রমী ঘটনা

১৯৭০ সাল। নভেম্বর মাস। এ সময় দেশব্যাপী ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়। ডিসেম্বরে ছিল নির্বাচন। অনেকে তাজউদ্দীন আহমেদের বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এমন সময় তার বাড়ির জানালায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে একটা বুলবুলি পাখির মৃত্যু হয় । অন্ধকারে লুকিয়ে ক্রন্দনরত তাজউদ্দীন আহমেদকে তার মেয়ে দেখে ফেলেন। ইয়াহিয়ার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সারাদিন আন্দোলনরত আমাদের বঙ্গতাজ মেয়েকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, "আমার বাসায় এতো মানুষের জায়গা হলো, অথচ এই ছোট্ট বুলবুলি পাখিটার জায়গা হলো না...।" ১৯৫২ সালের ২৪ মার্চ ডায়েরিতে লিখলেন ,`` আগুনে চালাঘর পুড়ে গেছে । কুপি থেকে আগুন লেগেছিল । মাচানের কিছু তক্তা রক্ষা করতে সাহায্য করি। আমি এগিয়ে যাবার আগে সবাই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।`` পরে , অনেক , অনেক বড় আকারে ওই একই ঘটনা ঘটেছিল , তার সামনে। আগুন লেগেছিল তার সামনে। কিংকর্তব্যবিমুঢ হয়ে গিয়েছিল দেশবাসী । কি করবে ভেবে পায়নি। তাজউদ্দীন আহমদ দাঁড়িয়ে থাকেননি , তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন অন্তত তক্তা হলেও বাঁচে । এই খানেই অসাধারণ তিনি। দায়িত্বপ্রবণ। স্থিরবুদ্ধি। তিনি না থাকলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেহারা অন্যরকম হতো নিশ্চিত। ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মূল কার্যালয় ছিল। সেখানেই একটা কক্ষে নয় মাস কাটিয়েছেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেখানে ছিল মাত্র একটা চৌকি, কাঠের স্ট্যান্ডের ওপর দিয়ে আটকানো একটা মশারি, একটি বালিশ, একটি মাদুর, একটি কাথা এবং একটি চাঁদর। আর ব্যক্তিগত জিনিস বলতে দুটো ট্রাউজার, দুটো হাওয়াই শার্ট, কয়েকটি গেঞ্জি, মোজা ইত্যাদি। মাত্র দুটো শার্ট পরেই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন রনাঙ্গন, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প, শরনার্থী শিবির; সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিদেশি সাংবাদিকদের। সাধারণের মাঝেও অসাধারণ তিনি। ১৯৭১ সালে যখন ভারতে বসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এবং দেশের শাসনকার্য নিয়ে ব্যস্ত, তখনকার ঘটনা। তাজউদ্দীন সাহেব সকালে অফিসে এসে দেখলেন, তার পিয়ন তখনো আসেনি । তিনি থিয়েটার রোডের পিয়নের সেই বাসায় চলে গেলেন । তার অন্য এক কর্মচারী অফিসে এসে, তাকে না পেয়ে সেই পিয়নের বাসায় গেলেন । গিয়ে দেখেন, বাসায় আর কেউ নেই, শুধু প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব জ্বরে আক্রান্ত পিয়নের মাথায় বদনা দিয়ে পানি ঢালছেন । রাজনীতি যে মানুষের জন্য, বৈষম্য দূর করার জন্য বঙ্গতাজকে যে পেরেছে এতো মানবিকতার , মানুষকে বুকে টেনে নিতে। বুদ্ধিমানরা ইতিহাসের সঙ্গে যায় , নির্বোধ ইতিহাসকে টেনে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন আমাদের সমকালীন সঙ্গীদের অন্যতম সে জন, যিনি ইতিহাসের গতিপথকে সচেতনভাবে অনুসরণ করেছেন । মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন , `` লাশের পাহাড়ের নীচে পাকিস্তান এখন মৃত ও সমাধিস্থ ``। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জার সরকারের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেয়। তাজউদ্দীনের ভাষায়, ‘পাকিস্তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি…সংগ্রামের এক পর্যায়ে আমেরিকা প্রশ্ন তোলে, স্বাধীনতা চাও নাকি মুজিবকে চাও। এর উত্তরে আমি বলেছিলাম, স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই।’ সত্যিই তাজউদ্দীন সেদিন সব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জাতির জনকের নিঃশর্ত মুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন। এই সুবিশাল অর্জনে তিনি কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো শুধু ধাত্রীর কর্তব্য পালন করেছি মাত্র।’ তাজউদ্দীন আহমদের কথা ও তার প্রতিটি কাজের মধ্যে আমরা দেখি মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় তীক্ষ্ণ সজাগ, দূরদর্শী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এক আত্মপ্রচারবিমুখ ত্যাগী নেতা ও মানুষকে। নতুন প্রজন্ম তাকে ও তার মতো ইতিহাস নির্মাণকারীদের যতই চিনবে ততই উজ্জ্বল হবে ইতিহাসের আকাশ ও ভবিষ্যতের পথটি। তাই ত মোশতাকরা জানত কাকে সরালে সব কাজ হবে। তাই করলো। হত্যার আগে তাই ত বলে গিয়েছিলেন ` মুজিব ভাই জানল না কে তার শত্রু, কে তার বন্ধু?` আমাদের তাজ , বঙ্গতাজ আমাদের মুক্তিসংগ্রামের পুরোধা , রক্ত দিয়ে লিখে গেছেন কতটা বাঙালি, কতটা শুদ্ধ আর বিচক্ষণ ছিল তার চিন্তা । শুভ জন্মদিন হে বঙ্গতাজ , ভালোবেসে, শ্রদ্ধায় আজন্ম নত প্রতিটি বাঙালি। লেখক: লুৎফুল কবির রনি, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী। আআ/এসএইচ/

রোহিঙ্গা নির্যাতন: আইসিসিতে আইনি লড়াই

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) ১৯৯৮ সালের Rome Statute দ্বারা পরিচালিত| Rome Statute-এর ১৩ ও ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইসিসিতে যেকোনো পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার চাইবার এখতিয়ার রয়েছে। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার রয়েছে নিজেই সেই অপরাধের বিচার করবার (Territorial Jurisdiction)। অথবা আইসিসির পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র হয়ে থাকলে সেই রাষ্ট্র চাইলে তার বিচারের জন্য আইসিসির সহযোগিতা কামনা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী রাষ্ট্রকে আইসিসিকে জানাতে হবে, সে তার ভূখণ্ডে সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার করতে অনিচ্ছুক অথবা অপারগ (Rome Statute-এর ১৭(১)(ক) অনুচ্ছেদ)। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ২০১০ সালের ২৩ মার্চ Rome Statute-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তার মানে হলো ২০১০ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সংঘটিত যেকোনো আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগিতা চাইতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জানাতে হবে যে, আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার করতে সে অনিচ্ছুক অথবা অপারগ। এখন প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার বাংলাদেশ কী করে চাইতে পারে? অর্থাৎ আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো যদি মিয়ানমারে সংঘটিত হয় তাহলে বাংলাদেশ কী করে এর বিচার চাইতে আইসিসিতে যেতে পারে? এটা কি বাংলাদেশের পক্ষে আদৌ সম্ভব? অনেকে অজুহাত দেখান, আন্তর্জাতিক আদালতে কোনো রাষ্ট্রের বিচার করতে গেলে তার সম্মতি নেওয়া জরুরি। কথাটি International Court of Justice (আইসিজে)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আইসিজে হলো জাতিসংঘের কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত একটি আন্তর্জাতিক আদালত। কিন্তু আইসিসি জাতিসংঘের কাঠামো অন্তর্ভুক্ত আন্তর্জাতিক আদালত নয়। আইসিসির কার্যক্রম পরিচালিত হয় ১৯৯৮ সালের Rome Statute অনুযায়ী। সুতরাং আইসিসিতে মিয়ানমারের বিচার করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সম্মতি নেওয়া জরুরি নয়। Rome Statute-এর ১৩(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি জাতিসংঘের ‘নিরাপত্তা পরিষদ’আইসিসিতে আইসিসি-সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধ বিচারের জন্য প্রেরণ করে তবে সে ক্ষেত্রে বিচারের মুখোমুখি রাষ্ট্রের আইসিসি পক্ষভুক্ত হওয়া জরুরি নয়। অতীতে নিরাপত্তা পরিষদ ২০০৫ সালের ৩১ মার্চ লিবিয়ার ও ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সুদানের (দারফুর) বিচারের জন্য আইসিসিতে সুপারিশ করেছে। সুতরাং চাইলে বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদ আইসিসিতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারের সুপারিশ করতেই পারে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র হওয়া জরুরি নয়। আবার Rome Statute-এর ১৩(গ) ও ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইসিসি প্রসিকিউশন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাদের তদন্তসাপেক্ষে আইসিসিতে মিয়ানমার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগ এনে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে Rome Statute-এর ১২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মিয়ানমারকে একটি ঘোষণা দিয়ে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারের প্রতি সম্মতি জানাতে হবে, সদস্য হওয়া জরুরি নয়। এর আগে ২০১০ সালে কেনিয়ায়, ২০১১ সালে আইভরি কোস্টে অথবা ২০১৬ সালে জর্জিয়ায় আইসিসি প্রসিকিউশন গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তদন্ত ও মামলার কাজ শুরু করেছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে আইসিসির চিফ প্রসিকিউটর Madam Fatou Bensouda মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারের তদন্ত করার সম্মতি চেয়ে আইসিসিতে আবেদন করেছেন এবং যার শুনানি এখনো আইসিসিতে চলছে। যতক্ষণ না আইসিসি এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে, আমরা আসলেই জানি না আইসিসি কতখানি আগ্রহী এ ব্যাপারে হবে। কেননা এ কথাটি তো সত্য, মিয়ানমার আসলেই আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র নয়। আর তাই ১৯৬৯ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তিবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention on the Law of Treaties)-এর ৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেহেতু মিয়ানমার Rome Statute-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র নয়, তাই তার ওপর Rome Statute-এর কোনো দায়ভার বর্তায় না। অতএব আইসিসির প্রসিকিউশন মিয়ানমারে স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত করার এখতিয়ার রাখে কিনা তা সুস্পষ্ট নয়। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশ চাইলে আইসিসিতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারের সুপারিশ করতে পারে। প্রথমেই বলেছি, Rome Statute-এর ১৩ ও ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইসিসিতে যে কোনো পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার চাইবার এখতিয়ার সেই রাষ্ট্রের রয়েছে। এখন বাংলাদেশ যদি প্রমাণ করতে পারে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধের একটি অংশ বাংলাদেশেই সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে তবে বাংলাদেশ নিজেই সেই অপরাধের বিচারের ব্যাপারে অনিচ্ছা বা অপারগতা প্রকাশ করে আইসিসিতে তার বিচারের সহযোগিতা কামনা করতে পারে। আর এটা সম্ভব। রোহিঙ্গা মুসলিম সমস্যার কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি অনুসন্ধানে জাতিসংঘের বিশেষ দূত মিস ইয়াংঘি লি এ বছরের ২০-২৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কক্সবাজার পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শন শেষে UN office of the High Commissioner for Human Rights (UNOHCHR) একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্টে মিয়ানমারে যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে চলেছে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। UNOHCHR রিপোর্ট অনুযায়ী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সেখানকার সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং তাদের মদদপ্রাপ্ত উন্মত্ত জনতা নির্দ্বিধায় ব্যাপকভাবে গণধর্ষণ, শিশুহত্যা, নিষ্ঠুর শারীরিক নির্যাতন, গুম এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। ইয়াংঘি লি যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তার বেশির ভাগই স্বচক্ষে নিজ পরিবারের সদস্যদের নিহত হতে দেখেছেন। অনেকের পরিবারের সদস্যরা এখনো উধাও রয়েছেন। শিশুদের এমনকি যাদের বয়স আট বছর, পাঁচ বছর অথবা মাত্র আট মাস তাদেরও জবাই করে মেরে ফেলা হচ্ছে। UNOHCHR-এর রিপোর্টে আরও জানা যায়, ইয়াংঘি লি তার পরিদর্শনের সময় মোট ১০১ জন নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি দাবি করেন তারা মিয়ানমারে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও বিভিন্ন প্রকারের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। UNOHCHR রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানের বাড়িঘর, স্কুল, হাটবাজার, দোকান, মাদ্রাসা ও মসজিদ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। তাদের খাদ্যশস্য, খেত-খামার ও গবাদি পশুসমূহ লুট করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাসস্থান এবং দেশ থেকে জবরদস্তি বিতাড়ন     করা হচ্ছে। অতিসম্প্রতি মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক গণআদালতের রায় অনুযায়ী, মিয়ানমারের সেনা সদস্য, পুলিশ এবং তাদের মদদপ্রাপ্ত জনগণ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা প্রকার ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটন করছে। এই গণআদালতে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারবিষয়ক অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নানারকম তথ্য-উপাত্ত, এমনকি ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে জবানবন্দিও লিপিবদ্ধ করা হয়। এসব কিছুর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক গণআদালত মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করে তার রায় ঘোষণা করে। এদিকে আমাদের দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীরা নিয়মিতভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ওপর রিপোর্ট প্রকাশ করে চলেছেন। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায়, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অন্তত চারটি অপরাধ বিচারের জন্য বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগিতা চাইতে পারে— (১) Deportation অথবা বিতাড়ন (Rome Statute-এর ৭(১)(ঘ)অনুচ্ছেদ)। (২) Persecution অথবা নিপীড়ন (Rome Statute-এর ৭(১)(জ)অনুচ্ছেদ)। (৩) The Crime of Apartheid অথবা বর্ণবিদ্বেষ (Rome Statute-এর ৭(১)(ঞ)অনুচ্ছেদ)।(৪) Genocide (জীবনমানের ওপর আঘাত হেনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ধ্বংস করা) (Rome Statute-এর ৬(গ)অনুচ্ছেদ)। ওপরের প্রতিটি আইসিসি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ শুধু মিয়ানমারেই সংঘটিত হয়নি। বরং একই সঙ্গে যেই মুহূর্তে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে, সেই থেকে অদ্যাবধি তাদের বাংলাদেশে অবস্থান তাদের এসব অপরাধের ক্রমাগত শিকারের সাক্ষ্য বহন করে। যেহেতু ওপরের অপরাধগুলোর একটি অংশ বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়ে আসছে তাই বাংলাদেশ নিজেই আইসিসিতে তার বিচারের জন্য সহযোগিতা চাইতে পারে। এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করে দিতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ আইসিসির একটি সদস্যরাষ্ট্র, সেহেতু বাংলাদেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত আইসিসি-সংশ্লিষ্ট উল্লিখিত অপরাধসমূহের বিচারের ব্যাপারে অনিচ্ছা বা অপারগতা প্রকাশ করে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারকে নিশ্চিত করতে পারে। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যদি বাংলাদেশ এ কাজটি করেই ফেলে তবে কি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝের কূটনৈতিক তৎপরতা কোনোভাবে ব্যাহত হবে? আমি মনে করি, মিয়ানমারের ওপর বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক বিশ্বের সব ধরনের চাপ প্রয়োগ জরুরি এবং তা একই সঙ্গে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আমি বলতে চাই যে, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যার আইনি সমাধান হয়েছে কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি। আর তাই আশা করি, একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ করার মাধ্যমে আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা মুসলমান সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাব। লেখক : আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক। / এআর /

ক্ষমতার বদল হোক,রাষ্ট্র যেন বদলে না যায়

আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আর এ নির্বাচন হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের একটি মহড়া। কারণ, দলীয় প্রতীকে ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হচ্ছে। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে যেসব দল বড় ভূমিকা পালন করে, তারা হয় নিজেরাই অংশ নিচ্ছে, না হয় কাউকে সমর্থন করছে। সেদিক থেকেও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এই নির্বাচন। নিকট অতীতে হয়ে যাওয়া আমাদের খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সেখানে কোন মারামারি, দাঙ্গা বা একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার কথা কোথাও শোনা যায়নি। কিন্তু সেদিন রাজশাহীতে ছাত্রদলের সমাবেশে মোটরসাইকেলযোগে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়টাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে, সতর্ক হতে হবে এবং অত্যন্ত শক্তভাবে প্রতিহত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করার সাহস কেউ না পায়। তবে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতে করে অচলাবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে এ রকম চিন্তা করাও অমূলক। কারণ, আমাদের দেশে ‘ব্লেইম গেইম’-এর রাজনীতি আছে আমরা এটি জানি। নির্বাচন কমিশনেরও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণে বড় একটি সুযোগ এটি। জাতীয় নির্বাচনে যে রকম অসুবিধা তৈরি হতে পারে কিংবা ফাঁক-ফোকর দেখা দিতে পারে সেগুলো খুঁজে বের করে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য এটি একটি ফিল্ড ওয়ার্ক। জাতীয় নির্বাচন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে আসবে। আরেকটি বিষয়, বিভিন্ন সময় বিশেষ করে ২০১৪-১৫ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা জ্বালাও-পোড়াও, পেট্রোলবোমার মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে, যাতে নির্বাচনকালে অপশক্তির উদ্ভব না ঘটে। তবে চার বছর আগের ঘটনা নিয়ে নির্বাচনের আগে ব্যাপক ধরপাকড় করে কোনভাবেই নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করা যাবে না। নির্বাচনের সময় অনেক ধরনের অভিযোগ আমরা শুনি বিভিন্ন পক্ষ থেকে। নির্বাচনকালীন এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো সব দলের নেতা-কর্মীদের যার যার প্রার্থীর পক্ষে মাঠে অবস্থান করা। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার সকাল ১০টার মধ্যেই বাড়ি চলে গেলেন। ১০টা এগারো মিনিটে বললেন, ‘ফেইল্যুর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস!’ প্রার্থী নিজেই যখন আশা ছেড়ে দিয়ে এ ধরনের কথা বলেন তখন তার এজেন্ট এবং ভোটাররা তো কেন্দ্র ছেড়ে দিবেই। এজেন্টদের বের করে দেয়ার যে অভিযোগ তারা করেছে সেটা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না, কোথাও হলেও হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ তারা করতে পারেনি। শুরুতে বলা হচ্ছিল, ১০টা কেন্দ্রে বাধা দেয়া হয়েছে, পরে পঞ্চাশ কেন্দ্রে, তারপর সব কেন্দ্রেই। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন্ কোন্ কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর নাম বলতে পারেনি। এভাবে ঢালাও একটি অভিযোগ করে তারা নির্বাচনী ময়দান ছেড়ে দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের চোখেও এরকম কিছু ধরা পড়েনি। নির্বাচন কেন্দ্রে এজেন্ট থাকা না থাকার কথা যদি বলি, এজেন্ট থাকতে হবে আমাদের নির্বাচনী আইনে এমন কোন বাধ্যবাধকতা কোথাও নেই। কমিশনই তার ভোটারদের নিরাপত্তা এবং ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। তবে তার মানে এই নয় যে, নির্বাচন কমিশন কোন পক্ষের হয়ে কাজ করবে। কথা হচ্ছে, প্রতিবারই কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেয়ার যে অভিযোগ করা হয় এটা আমরা আর শুনতে চাই না। নির্বাচন কমিশন এবার ভাল একটি কাজ করেছে, আগেই এজেন্টদের তালিকা চেয়ে নিয়েছে। আমি মনে করি, এমন ব্যবস্থা করা দরকার, যে এজেন্ট একবার কেন্দ্রে ঢুকবে তাকে বের হতে দেয়াই উচিত না। কারণ এমনও ঘটনা ঘটেছে, এজেন্ট নির্বাচন কেন্দ্রে যায়ইনি অথচ বলা হচ্ছে তাকে বের করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিককালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির নতুন মেরুকরণের কথা শোনা যাচ্ছে। এরকম হলে তা মূলত আওয়ামী লীগ বনাম বাকি দলগুলোর একটা জোট হতে পারে এবং তাদের একমাত্র পুঁজি হবে ভারত বিরোধিতা ও ধর্ম। এই দুটি বিষয় ছাড়া তাদের খুব বেশি কিছু করার নেই। যেমন বিএনপির যে ভোটব্যাংক তা হলো মূলত ভারতবিরোধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। আজকাল বিএনপি ভারত সহনীয় কথাবার্তা বলছে। এতে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। কারণ তৎকালীন মুসলিম লীগের যে সেটআপ সেটাই মূলত আজকের বিএনপি। পুরনো এ বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে আসলে বিএনপি তো আর বিএনপি থাকছে না। জোটের ব্যাপারে বলতে গেলে অনেক সময় পুরোপুরি একই আদর্শের দল না বলেও কৌশলগত কারণে একাধিক দল একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। বামপন্থী দলগুলো একত্রে জোট গঠন করতে পারে বলে শুনেছি। ভারতে বামদল ক্ষমতায় এসেছে, অনেক বছর টিকেও থেকেছে এটা আমরা দেখেছি। কিন্তু আমাদের দেশের বামদের মধ্যে এত বিভাজন যে, আজ যদি দেখেন তারা জোট করেছে কাল সকালে দেখতে পাবেন, কেউ কেউ জোট ছেড়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে মার্কসবাদী, লেনিনবাদী বিভিন্ন তরিকার লোকজন আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যখন জোটের নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল বাঁধে কেবল তখনই আদর্শিক দ্বন্দ্বগুলোকে সামনে এনে এরা জোট ভেঙ্গে দেয়। আসলেই যদি বামদলগুলো এক হয় এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এটা অবশ্যই আমাদের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ভাল দিক। তবে জোটবদ্ধ হয়ে এলেই এই নির্বাচনে তারা খুব ভাল ফলাফল করবে না এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ, বামদলগুলো সমাজের শ্রেণী ভাঙতে চায়, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, মানুষে মানুষে সাম্য চায়, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে আত্মকেন্দ্রিকতা, সেলফিসনেস এ কারণেই মূলত মানুষ তাত্ত্বিকভাবে বামদলগুলোকে গ্রহণ করলেও আপন করে নিচ্ছে না। অনেক সময় আমাদের বামদের একটা সীমাবদ্ধতা হলো বাস্তবতার প্রেক্ষিতে পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে তারা মানিয়ে নেয়া, খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো উদার মানসিকতা দেখাতে পারে না। সোভিয়েত ইউনিয়নে সত্তর বছর সমাজতন্ত্র থাকার পরও কিন্তু এক সময় ভেঙ্গে পড়েছে। আর চায়নাতে যেটা আছে আদৌ এটাকে সমাজতন্ত্র বলে কিনা আমি জানি না। কিউবাও সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তির অনুমোদন দেবে। আরেকটি বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যে কেবল পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি তা কিন্তু না, নোয়াখালী, কুষ্টিয়াসহ দেশের অনেক জায়গায় সর্বহারা বাম, অতিবাম, চিনাপন্থী বামদেরকেও আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে বামদলগুলো ছিল তারা একটা শক্ত পক্ষ হতে পারে। কারণ, ক্ষমতার পালাবদল হবেই, তা হোক। কিন্তু রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্য তার পরিবর্তন যেন না হয়। সব সরকারই যেন স্বাধীনতার পক্ষের হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন সময় আমাদের দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রেরও পরিবর্তন হয়েছে, রাষ্ট্রটাকেই ভিন্ন এক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দল যখন ক্ষমতায় এলো তখন প্রথম আঘাতটাই তারা করল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের যে মূল কাঠামো সেটাই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেল। একইভাবে পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে এদেশে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতারই পরিবর্তন হয়নি, রাষ্ট্রটাকেই পরিবর্তন করে একটা পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হয়েছিল। তাই বলতে চাই, আমাদের রাজনীতিকে আরও পরিশীলিত করতে হলে স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোকে হারুক আর জিতুক নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। আজকের নির্বাচনে হারলেও কাল বা পরশু নির্বাচনে হয়ত তারা জয়ী হবে। সম্প্রতি বিএনপি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এদের নিয়ে যদি বিএনপি জোট গঠন করে এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে ত্যাগ করে, সেটাও শুভ উদ্যোগ। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অবদান রয়েছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা শক্ত প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের একজন। কিন্তু তাদের সঙ্গে নিয়ে আবার যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকেও সঙ্গে রেখে যদি কোন জোট হয় তাহলে সেটা টিকবে না। বলা হয়, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিতে শেষ কথা বলে একটা কথা আছে। সেটা হলো আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা। একদিকে আওয়ামী লীগ থাকবে, আর বাকি সবাই মিলে এর বিরোধিতা করবে। একটু-আধটু ন্যায়নীতি, সুশাসন এসব কথা বলবে; কিন্তু মূল যে কাজটা করবে সেটা হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার এবং ভারত বিরোধিতা। আমাদের জাতীয়তা বাঙালী না বলে মুসলিম বাঙালী বলে একটা কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করবে। সে যাই হোক, আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে মেয়াদ শেষ করতে চলেছে। সামনে আরেকটি নির্বাচনী বৈতরণী অপেক্ষমাণ। নির্বাচনকে নিয়ে সরকারের ইতিবাচক ব্যাপারগুলো যদি বলি তা হলো দেশে দশ বছর আগে সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকের যে অবস্থা ছিল সে তুলনায় এখনকার উন্নতি অভাবনীয় ও অনুকরণীয়। যে মেগা প্রজেক্টগুলো আছে- যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল সরকার পরিবর্তন হলে এই প্রজেক্টগুলো ব্যাহত হবে বলেই মনে করে জনগণ। কারণ, সরকারের পরিবর্তন হলে আগের সরকারের হাতে নেওয়া প্রজেক্টগুলো ব্যাহত হওয়ার নজির আছে এদেশে। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার আসলে ইউনিয়ন পর্যায়ে যে ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্র করা হয়েছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তিগুলো করা হয়েছিল, এরকম আরও অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাতিল করেছিল পরের সরকার এসে। সুতরাং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আবার আসলে চলমান উন্নয়ন কাজগুলো অব্যাহত থাকবে। এখন নেতিবাচক দিকগুলোর দিকে যাই। প্রথমেই শুরু করতে হয় নোবেল লরিয়েট নেইল কাইনম্যানের একটা কথা দিয়ে। সেটা হলো ‘মানুষ উপকারের চেয়ে অপকার বেশি মনে রাখে।’ তাই আওয়ামী লীগের কেউ যদি আমার এ লেখা পড়েন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, উন্নয়নের চিত্র প্রচার করার প্রয়োজন আছে, তবে তার চেয়েও বেশি দরকার এটা খুঁজে বের করা কোথায় কোথায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি যে সব সময় অর্থিকভাবেই হতে হবে ব্যাপারটা এমন না, মানসিকভাবেও হতে পারে। যেমন, কোন এমপি, তার আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ির পক্ষের লোকজন মানুষের ওপর নিপীড়ন করেছে কি-না। আওয়ামী লীগেরই ভোটার, আওয়ামী লীগ সমর্থন করে এরকম অনেক লোকও সরকারের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে অনেক নেতার কারণে। অসন্তোষের এই জায়গাগুলোর সমাধান করতে হবে। কারণ মানুষ যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় সে বুঝতে পারে রাস্তাটা পাকা হয়েছে, আগে লোডশেডিং ছিল, এখন আলো জ্বলছে- এসব মানুষ এখন দেখছে। অতএব অপকার, অসন্তোষ এসব ব্যাপার যে যে জায়গায় ঘটে গেছে সেই জায়গাগুলোকে মেরামত করাটা এখন সবচেয়ে জরুরি। লেখক : ড.মীজানুর রহমান উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

অকালে চলে যাবে, তবে কেন বেঁধেছিলে মায়ার বাঁধনে   

রাজীব মীর। চট্টগ্রাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক। ওই বিষয়টি আমার কাছে গৌন। রাজীব মীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র এবং আমরা দু’জনই এসএম হলের ছাত্র। আত্মার আত্মীয় হতে আর বেশি কিছু দরকার ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের রীতি অনুযায়ি, সিনিয়র- জুনিয়র সবাই বন্ধুর মতো। সেই সুবাদে রাজীব ভাইও ছিলেন বন্ধু!! সব ধরণের আলাপ-পরামর্শ আমরা বড় এবং ছোটদের সঙ্গে করতাম অনায়াসে। রাজীব ভাইয়ের এক বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইয়ার মেট। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় রাজীব ভাই এবং তার বোনেরা (সঙ্গে রাজীব ভাইয়ের আরেক ছোট বোনও থাকতো) আড্ডা দিতেন রোকেয়া হলের সামনে। বহুমাত্রিক আড্ডার আমিও প্রায়ই ঢুঁ দিতাম তাদের আড্ডায়। যেন ভাইবোনের আড্ডা। রাজীব ভাই সিগারেট খেতেন না, তবে আমার সিগারেটের বিল দিতেন। আমি মাঝে মাঝে নিষেধ করতাম। তিনি বলতেন, যেহেতু তুমি খাও-ই, তাহলে আর বিল দিতে সমস্যা কি।   শিক্ষাজীবন শেষে রাজীব ভাই চলে গেলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায়। আর আমি সাংবাদিকতায়। সামনা সামনি দেখা হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। তারপরও কালেভদ্রে দেখা হতো। দেখা হলেই সেই মিষ্টি হাসি, মায়াভরা মুখ। এরপর রাজীব ভাই যোগ দিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ব্যস্ততা দুইজনকেই নিষ্ঠুর করে দিলো। দেখা আর হয় না। কোথাও কোথাও মাঝে মাঝে দেখা। রাজীব ভাই বিয়ে করলেন, দাওয়াত দিলেন। অফিসের ব্যস্ততার কারণে যেতে পারলাম না। এক বছরের বেশি সময় আগে সব শেষ রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা চন্দ্রিমা উদ্যানে। মর্নিং ওয়াকের সময় দু’জন মুখোমুখি। রাজীব ভাই আগেই একদিন বলেছিলেন, তিনি ধানমন্ডি লেকে হাঁটেন। আর আমি চন্দ্রিমা উদ্যানে। হঠাৎ চন্দ্রিমা উদ্যানে কেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন- আজ এইদিকে এসেছি। বললেন, আমার মেয়ে হয়েছে- জানো তো? আমি বললাম- বিয়ে কী এক বছর হয়েছে!! রাজীব ভাই উত্তর দিলেন- তোমার দুষ্টামি আর গেল না। আবার দু’জন হাঁটতে শুরু করলাম। সেদিন কি জানতাম, এটাই শেষ দেখা। দু’জনের দু’টি পথ সত্যি সত্যি আলাদা হয়ে যাচ্ছে চিরদিনের মতো!! বিপরীত দিকে হাঁটার গতিতে যে দুরত্ব বাড়ছে, তা গড়াবে অসীমের পথে!! অনন্তলোকে ভালো থাকবেন রাজীব ভাই। আপনার বহুমাত্রিক প্রতিভা আমাদের পথ দেখাবে। আপনার অবুঝ শিশুর যদি কোন কাজে আসতে পারি, তাহলে সেখানেই হবে সম্পর্কের স্বার্থকতা। উল্লেখ্য শুক্রবার দিবাগত রাত ১.৩৭ মিনিটে ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজীব মীর। তিনি লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন। গত শনিবার তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।     এসি     

আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড

যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, দুটি সংখ্যা যোগ করলে হয় দশ, গুণ করলে হয় পঁচিশ সংখ্যা দুটি কত? যে একটুখানি যোগ-বিয়োগ গুণ ভাগ করতে পারে সেই এক মিনিটের ভেতর সংখ্যা দুটি বের করে ফেলতে পারবে। এখন আমি যদি জিজ্ঞেস করি, দুটি সংখ্যা যোগ করলে হয় দশ কিন্তু গুণ করলে হয় একশ পঁচিশ সেই সংখ্যা দুটি কত? আমার ধারণা, তাহলে অনেকেই মাথা চুলকে বলবে এরকম দুটি সংখ্যা থাকা সম্ভব নয়। যারা একটুখানি অ্যালজেবরা শিখেছে ছোট-খাটো সমীকরণ সমাধান করতে পারে তারা কিন্তু কাগজ-কলম নিয়ে সংখ্যা দুটি বের করে ফেলতে পারবে। শুধু তাই নয় হয়তো অবাক বিস্ময়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এ সংখ্যা দুটির দিকে তাকিয়ে থাকবে। গণিতের ভেতর একটু পরে পরে এরকম একটা কিছু বের হয়ে আসে যেটার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। অথচ আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের সারা জীবন বলা হয়েছে গণিত হচ্ছে রসকসহীন কাঠখোট্টা একটা বিষয়! এটা মুখস্থ করে ফেলতে হয় এবং পরীক্ষায় উগলে দিয়ে আসতে হয়। গণিতের শিক্ষক যেভাবে শিখিয়ে এসেছেন হুবহু সেভাবে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসতে হবে, নিজের নিয়মে করা যাবে না, কেউ যদি নিজের নিয়মে করতে চায় তার জন্য রয়েছে বড় বড় গোল্লা। আমরা সেগুলো দেখতাম, শুনতাম এবং বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। আমাদের দেশে গণিত অলিম্পিয়াড নামে বিশাল দজ্ঞযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর আমাদের দুঃখ একটু কমেছে। দেশের সব ছেলেমেয়েকে গণিতের এই আনন্দময় জগতটি আমরা এখনো দেখাতে পারিনি কিন্তু যারা গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে এসেছে তারা অন্তত এই রহস্যময় জগতটির ভেতর উঁকি দিতে পেরেছে। এই বছর আমরা প্রথমবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড স্বর্ণপদক পেয়েছি, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না এটি আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় একটা অর্জন। তাই বলে কেউ যেন মনে না করে আমরা বুঝি শুধু পদকের জন্য জীবনপাত করি, এটি মোটেও সত্যি নয়-তাহলে আমরা মোটেও একেবারে ক্লাস থ্রির গেন্দা গেন্দা বাচ্চাদের নিয়ে গণিত অলিম্পিয়াড করতাম না, তাহলে আমরা শুধু কলেজের সত্যিকার প্রতিবেশীদের অল্প কয়েকজনকে ট্রেনিংয়ের পর ট্রেনিং দিয়ে অলিম্পিয়াডে পাঠাতাম। আমরা আসলে পুরো দেশের ছেলেমেয়েদের গণিতকে ভালোবাসতে শেখাই যেন তারা দেশটাকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এগিয়ে নিতে পারে। এর মাঝে যদি মাঝে মাঝে পদক পেয়ে যাই সেটি বাড়তি পাওনা। এই বছর প্রথমবার স্বর্ণ পদক পাওয়ার পর আমাদের সবার এক ধরনের আনন্দ হচ্ছে, আমার ঘুরেফিরে এই আন্দোলনটি কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছে সেটি মনে পড়ছে। চুরানব্বই সালে আমি মাত্র দেশে ফিরে এসেছি তখন প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ আমার বাসায় এসেছেন। দুই-চারটি কথা বলার পরই তিনি বললেন, “বুঝলেন জাফর ভাই, পৃথিবীর সব দেশের ছেলেমেয়েরা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথ অলিম্পিয়াডে যায়, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যেতে পারে না। আমাদেরও যেতে হবে।” সেই থেকে শুরু। একটা দেশ থেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে কীভাবে টিম পাঠাতে হয়, সেই টিম কীভাবে তৈরি করতে হয় আমরা তার কিছুই জানি না। প্রথমে চেষ্টা করা হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগকে দিয়ে। সেখানকার প্রফেসর গৌরাঙ্গ দেব রায় আমার খুবই বন্ধু মানুষ। তাকে নিয়ে নানা জায়গায় চিঠিপত্র লেখা হলো, যোগাযোগ করা হলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা গেল না। এভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। তখন একদিন প্রফেসর কায়কোবাদ এবং আমি ভাবলাম সত্যিকারের গণিত অলিম্পিয়াড যদি শুরু করতে নাও পারি এই দেশের ছেলেমেয়েদের গণিতে উৎসাহী করতে শুরু করে দিলে কেমন হয়? আমরা ঠিক করলাম কোনো একটা পত্রিকায় আমরা প্রতি সপ্তাহে পাঁচটা করে গণিতের সমস্যা দেব ছেলেমেয়েরা সেগুলো করবে, গণিতকে ভালোবাসবে। পরিকল্পনা করে আমরা আর দেরি করলাম না, দুজনে মিলে তরুণ-তরুণই প্রথম আলো অফিসে হাজির হয়ে সম্পাদক মতিউর রহমানকে বললাম আপনারা পত্রিকায় বিনোদনের জন্য, খেলাধুলার জন্য কত কিছু করেন। গণিতের জন্য একটা কিছু করবেন? সপ্তাহে একদিন পত্রিকার এক কোণায় ছোট একটু জায়গা দেবেন সেখানে আমরা পাঁচটা করে সমস্যা দেব! সেটাই হবে আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন এবং সেটাই ছিল গণিত অলিম্পিয়াডের শুরু। আমরা এর নাম দিলাম নিউরনে অনুরণন এবং প্রথম সমস্যাটি ছিল এরকম একজন লোক তার বাড়ি থেকে উত্তর দিকে দশ মাইল গিয়ে একটা ভালুকের মুখে পড়ল। অনেক কষ্ট করে ভালুকের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমে দশ মাইল দক্ষিণ দিকে তারপর আবার পূর্বদিকে দশ মাইল গিয়ে তার বাড়িতে ফিরে এলো। ভালুকের গায়ের রং কি? (না, এটি তামশা নয়, এটি সত্যিকারের একটি সমস্যা)। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই গণিতকে অনেক ভালোবাসে কারণ, আমরা লক্ষ্য করলাম অনেক ছেলেমেয়ে নিউরনে অনুরণন নামে এই সাপ্তাহিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে শুরু করেছে। তখন গণিত অলিম্পিয়াডের ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটল। একদিন আমার বাসায় একজন তরুণ এসে হাজির হয়ে বলল, সে এই গণিত অলিম্পিয়াডটি নিয়ে কাজ করতে চায়। তরুণটির নাম মুনির হাসান। এতদিন ধরে আমরা বয়স্ক মানুষরা শুধু কথাবার্তা বলছি, আলোচনা করছি, শলা-পরামর্শ করেছি, পরিকল্পনা করেছি কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারিনি। মুনির হাসান এসেই কাজ শুরু করে দিল। সে ঠিক করল ছেলেমেয়েদের নিয়ে সে একটা সত্যিকারের গণিত অলিম্পিয়াড করে ফেলবে। কিন্তু সেখানে আসবে কে? মুনির হাসান বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাবা-মায়েদের বুঝিয়ে সুজিয়ে তাদের বাচ্চা-কাচ্চা ছেলেমেয়েদের ধার নিয়ে এলো, বড় একটা হলঘরে বসিয়ে তাদের নিয়ে সত্যি সত্যি একদিন ছোট-খাটো গণিত অলিম্পিয়াড হয়ে গেলো। অলিম্পিয়াড শেষে মুনির হাসান আবার বাচ্চা-কাচ্চাদের তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এলো। সবাই মিলে তখন ঠিক করা হলো সারা দেশের সবাইকে নিয়ে একটা ন্যাশনাল গণিত অলিম্পিয়াড করা হবে। আয়োজন করা হবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটার নাম কী হবে সেটা নিয়ে নিজেদের ভেতর ছোট-খাটো বিতর্ক হয়ে গেলো। আমরা সবাই অঙ্ক বলে অভ্যস্ত, কথায় কথায় বলি অঙ্ক বই, অঙ্ক স্যার, অঙ্ক পরীক্ষা সেই হিসেবে আমরা কী অঙ্ক অলিম্পিয়াড বলব? নাকি এর নাম হবে গণিত অলিম্পিয়াড। প্রফেসর গৌরাঙ্গ দেব রায় আমাদের বুঝালেন বিষয়টির নাম হচ্ছে, ‘গণিত’সমস্যাগুলোকে বলি অঙ্ক। কাজেই এর সঠিক নাম হবে ‘গণিত অলিম্পিয়াড’। অঙ্কের মতো সহজ শব্দের বদল ভারিক্কী গণিত শব্দটি সবাই গ্রহণ করবে কি না, সেটা নিয়ে আমার নিজের ভেতর একটু সন্দেহ ছিল কিন্তু দেখা গেলো আমার সন্দেহ পুরোপুরি ভুল, গণিত অলিম্পিয়াড কথাটি সবাই খুব সহজেই মেনে নিয়েছে। আমার যতটুকু মনে পড়ে, ২০০২ সালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডের ঘোষণা দেওয়া হলো। এই অলিম্পিয়াডে আমাদের সঙ্গে থাকবে প্রথম আলো সেভাবেই আয়োজন চলছে। অলিম্পিয়াড যখন কাছাকাছি চলে এসেছে তখন হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত। মুনীর হাসান আমাকে জানাল প্রথম আলো বলেছিল অলিম্পিয়াডের জন্য দুই লাখ টাকা দেবে, কিন্তু এখন আর দিতে চাইছে না! আমি কী সম্পাদক মতিউর রহমানকে ফোন করে একটু চেষ্টা করে দেখতে পারি? কারো কাছে টাকা চাওয়ার মতো গ্লানির ব্যাপার আর কী হতে পারে? নিজের জন্য চাইছি না তার পরেও নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই, তাই লজ্জার মাথা খেয়ে ফোন করলাম। ফোনে কাজ হলো না এবং তখন আমি খুব একটা নাটকীয় কাজ করে ফেললাম। রেগে মেগে ফোন রেখে দেওয়ার আগে ঘোষণা করলাম যেহেতু গণিত অলিম্পিয়াড করব বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে আমরা সেটি করেই ছাড়ব। এর জন্য টাকা জোগাড় করার জন্য দরকার হলে আমি জমি বিক্রি করে ফেলব। আমার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলার সময় আমার স্ত্রী কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। সে অবাক হয়ে বলল, “তুমি জমিজমা বিক্রি করে ফেলবে মানে? তোমার তো কোনো জমিই নেই।” আমি গলার স্বর আরও উঁচু করে বললাম, “আমার জমি নেই তো কী হয়েছে? কায়কোবাদ সাহেবের জমি আছে সেই জমি বিক্রি করে ফেলব।” তবে শেষ পর্যন্ত প্রফেসর কায়কোবাদের জমি বিক্রি করতে হয়নি, প্রথম আলো তাদের দুই লাখ টাকা দিতে রাজি হলো এবং আবার প্রথম জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডের কাজ শুরু হলো। (আমার স্ত্রী ঠিক করে রেখেছিল যেদিন আমরা প্রথম স্বর্ণপদক পাব সেদিন সে সবাইকে আমার নির্বুদ্ধিতার এই গল্পটি শোনাবে। সে যেহেতু নিজের মুখে গল্পটি শোনানোর সুযোগ পায়নি তার পক্ষ থেকে আমিই গল্পটি শুনিয়ে দিলাম। নির্দিষ্ট দিনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উৎসাহ নিয়ে প্রথম গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হলো। সারা দেশ থেকে ছেলেমেয়েরা এসেছে ক্যাম্পাসে তাদের র‌্যালির আয়োজন করা হলো। বিকেলে আমাদের অডিটোরিয়ামে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সেখানে গণিত নিয়ে ছেলেমেয়েদের নানা ধরনের প্রশ্ন। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার তৈলাক্ত বাঁশের একটা অঙ্ক আছে যেখানে একটা বানর তিন ফুট ওপরে উঠে দুই ফুট পিছলে যায়। সেই বাঁশটাতে তেল মাখিয়েছে কে?’ (উত্তর : তোমার মতোই একজন দুষ্টু ছেলে!) সন্ধ্যাবেলা গণিত অলিম্পিয়াডের ছেলেমেয়েদের জন্য চমৎকার একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। অতিথিরা বুঝতে পারেনি কিন্তু আমরা খুবই দুশ্চিন্তার মাঝে ছিলাম। তখন জামায়াত-বিএনপি সরকার নাচ-গানকে ভালো চোখে দেখত না। এখন যে রকম ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যে সবার জীবন দুর্বিষহ তখন ছাত্রদল শিবিরের সেই রকম দৌরাত্ম্য। অনুষ্ঠানের মাঝখানে উদ্ধত ছাত্রনেতারা ঠেলেঠুলে ঢুকে সামনে গ্যাট হয়ে বসে গেলো। ভাইস চ্যান্সেলরকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, তার বিন্দুমাত্র সহযোগিতা নেই গণিতের ওপর বক্তৃতা দিতে হবে, মনে হয় সেই ভয়ে অনুষ্ঠানেও এলেন না। ভালোয় ভালোয় অনুষ্ঠান হয়ে গেলো, আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমরা যারা হাজির ছিলাম তখন তারা সবাই মিলে আমাদের জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে সভাপতি করে একটা কমিটি করে ফেললাম। যারা প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেছে তারা সবাই জানে তিনি কোন কমিটির সভাপতি থাকলে কাউকে আর কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হয় না! আমরাও আর চিন্তা করি না। কিছুদিনের ভেতরেই ডাচ্-বাংলা ব্যাংক আমাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে রাজি হলো। প্রফেসর কায়কোবাদের জমি বিক্রি করার আর প্রয়োজন নেই। সবাই মিলে তখন পুরো দেশ নিয়ে গণিত অলিম্পিয়াড করার পরিকল্পনা করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজন করা হলে ছাত্র মস্তানেরা উৎপাত করতে পারে বলে ভবিষ্যতে শুধু স্কুলগুলোতে আয়োজন করা হবে বলে ঠিক করা হলো। তবে আমি মনে করি, আমরা আরও একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলাম যেটি মনে হয় সারা পৃথিবীর আর কোথাও নেই! আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে পারে শুধু কলেজের কিংবা স্কুলের বড় ক্লাসের ছেলেমেয়েরা কিন্তু আমরা আমাদের এই অলিম্পিয়াডটি করব একেবারে ক্লাস থ্রির বাচ্চা থেকে শুরু করে। যখন কোথাও গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয় তখন এই ছোট ছোট বাচ্চারা যখন গম্ভীর মুখে হাতে একটা রুলার বা জ্যামিতি বক্স নিয়ে হাজির হয় সেই দৃশ্য থেকে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না। এই বিশাল দজ্ঞযজ্ঞ চালিয়ে নেওয়ার জন্য আরও মানুষ দরকার। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ছোট-খাটো কাজ মানুষকে বেতন দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু যদি অনেক বড় কোনো কাজ করতে হয় তাহলে দরকার ভলান্টিয়ার। যারা কাজ করবে নিজের আনন্দে, নিজের উৎসাহে, একজন তখন দশজনের কাজ করে ফেলবে। আমরা খুব সহজে ভলান্টিয়ার পেয়ে গেলাম, প্রথম আলোর বন্ধু সভায় ভলান্টিয়ার এবং গণিত অলিম্পিয়াডের ভলান্টিয়ার-প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী যাদের নাম দিয়েছেন সুভার্স। তখন সারা দেশব্যাপী গণিত অলিম্পিয়াড শুরু হয়ে গেলো। প্রথম প্রথম কেউ ব্যাপারটি জানে না তাই এটাকে পরিণত করার জন্য আমরা এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াই। আমাদের মাঝে প্রফেসর গৌরাঙ্গ দেব রায় সবচেয়ে ঘুম কাতুরে! যখন গভীর রাতে ফিরে আসছি তখন তিনি মাইক্রোবাসের পেছনের সিটে শুয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছেন। অল্প বয়সে ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন তার অভাবটি খুব অনুভব করি। তাকে অনেক বলেকয়ে গণিতের ওপর একটি বই লিখিয়েছিলাম। বইটার নাম ‘একটুখানি গণিত’ (সময় প্রকাশনী) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যদি কোনো ছাত্রছাত্রী দেখে তার জ্ঞানের ঘাটতি আছে তখন এই বইটা খুব কাজে লাগে। সারা দেশ ঘুরে ঘুরে গণিত অলিম্পিয়াড করে একসময় আবিষ্কার করেছি যে দেশের মানুষ মোটামুটিভাবে গণিত অলিম্পিয়াডের নাম জেনে গেছে। মুনীর হাসান সঞ্চালন করেছে এরকম একটি গণিত অলিম্পিয়াডে যে ছেলে বা মেয়েটি অংশ নিয়েছে আমার ধারণা সে সারা জীবন সেটি মনে রেখেছে। আমরা শুধু যে গণিতের কথা বলেছি তা নয় আমরা সেখানে দেশের কথা বলেছি, দেশের মানুষের কথা বলেছি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছি। সব সময় লক্ষ্য রেখেছি, এ অনুষ্ঠানে আসছে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা তাই তারা যে ধরনের অনুষ্ঠান দেখতে চায় সেটি উপহার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে গণ্যমান্য লোকজনদের দাওয়াত দেওয়া হতো, বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেলে তারা লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ছোট বাচ্চাদের জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলার আশঙ্কা ছিল কিন্তু সেটি কখনো হয়নি। একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যখন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়াত তখন মুনীর হাসান বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করত, ‘ইনি কতক্ষণ বক্তৃতা দেবেন?’ বাচ্চারা উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলত ‘এক মিনিট’। ‘আমি ঘড়ি ধরে দেখেছি বাচাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই সবাই বক্তৃতা শেষ করে ফেলবেন। কী মজা! আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড টিমে একসময় মাহবুব মজুমদার এসে যোগ দিয়েছে। অসাধারণ মেধাবী এই ছেলেটিকে আমি শিশু হিসেবে আমেরিকার সিয়াটল শহরে দেখেছি। বহুকাল পরে তার বাবা যখন আমাকে অনুরোধ করলেন দেশের কোথাও তাকে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিতে আমি তাকে গণিত অলিম্পিয়াড টিমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সেই থেকে সে আমাদের সঙ্গে আছে, সে গণিত অলিম্পিয়াড টিমের কোচ। এরকম অসাধারণ একজন কোচ আছে বলেই আমরা এত দ্রুত এতগুলো মেডেল পেয়ে যাচ্ছি। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি যে গণিত অলিম্পিয়াডের এই টিমটির কত বড় সৌভাগ্য ঠিক যখন যে মানুষটির প্রয়োজন কীভাবে কীভাবে জানি সেই মানুষটি চলে আসছে! কদিন থেকে খুব ফুরফুরে মেজাজে আছি। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ প্রথমবার সত্যিকারের একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ পুরস্কারটি ঘরে এনেছে। অন্য অনেক দেশের সঙ্গে প্রথমবার বাংলাদেশের পতাকাটি সর্বোচ্চ পুরস্কারের সম্মানটি নিয়ে এসেছে এবং সেটি এনেছে একটি কিশোর! আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরীকে অভিনন্দন আমাদের দেশটিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ আসনে অন্যদের পাশে বসিয়ে দেওয়ার জন্য। তার সঙ্গে অন্য যারা ছিল তাদেরও অভিনন্দন। এখন সবার বিশ্বাস হয়েছে তো যে আমরা যেটাই চাই সেটাই করতে পারি?   লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।   এমএইচ/ এসএইচ/

মধ্যবিত্তের যুব সমাজ ও অভিভাবকদের অদৃশ্য শিকল  

১.সন্তান যদি বিশ্বদ্যিালয়ের পাঠ চুকিয়ে অভিভাবকদের কাছে কিছু একটা কাজ শুরু করার জন্য মাত্র পাঁচ লাখ টাকাও চায়, অধিকাংশ অভিভাবক সন্দিহান হয়ে নিজের সন্তান কিংবা ভাই-ভাতিজাকে তা দিতে চায় না। কিন্তু কোনো স্বল্প পরিচিত দালাল এসে যদি বলে তার সেই সন্তান বা ভাই-ভাতিজাকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা পাঠাবে অথবা ভালো কোনো চাকরি পাইয়ে দেবে তখন অনায়াসেই সেই দালালের হাতে ১০/১৫ লাখ টাকা তুলে দিতে সমস্যা মনে করেন না!   ২.অভিভাবকের কাছ থেকে যদিও কালে-ভদ্রে কোনো সন্তান ব্যবসার জন্য কিছু টাকা পেয়েও থাকে, তারপর ব্যবসায় সে যদি লোকসানগুণে তাহলে তার কপালে ফেলট্টুসের মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়... ‘তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!’ মার্কা কথা শোনাতে-শোনাতে তার জীবনটাকেই নারকীয় করে তোলো!! ওরা একবারও ভাবে না যে, সে লোকসান দিয়েই ব্যবসার মর্মটা রপ্ত করে ফেলেছে, এখন সে জানে কিভাবে অর্থ বিনিয়োগ করলে লোকসান গুণতে হবে না। কিন্তু তাকে দ্বিতীয়বার বিশ্বাস না করেই হতাশার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। ‘তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!’-এর মধ্যেই তার অভিজ্ঞতা থমকে যায়! হতাশা তাকে ক্রমাগত টেনে নিয়ে যায় অচেনা জগতে... ৩.আমাদের সংখ্যা গরিষ্ঠ মধ্যবিত্তের যুব সমাজ ও অভিভাবকদের এই সমস্যা দীর্ঘ দিনের। মধ্যবিত্তের অদৃশ্য ভয়াতংক বৃত্তে- অভাব, সমস্যা আর নিরাপত্তাহীণতায় আমাদের মনের বাঘগুলো বনের বাঘের চেয়ে বেশি হালুম করে অন্তরে...!!বিশ্বায়নে পূঁজিবাদের আগ্রাসনে অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো চাহিদার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে যখন মধ্যবিত্তের গৃহে প্রবেশ করে তখন, ত্রাহি-ত্রাহি যাপিত জীবনে অভিভাবক নামক যন্ত্রটি নতুন করে সাহসী স্বপ্ন বুনতে ভয় পান।হায়রে অভাগার দেশ!! এমন যদি হয় তাহলে এই দেশে উদ্যোক্তা তৈরী হবে কিভাবে? আর দেশটাও এগুবে কী করে? আর কতকাল আমাদের মধ্যবিত্তের অভিভাকরা সার্কাসের হাতি’র শিকলের মতো নিজেদের ভীত-সন্ত্রস্ত অদৃশ্য শিকলে বন্ধি করে রাখবেন?   ধর্মের মর্ম বাণীতেইতো আছে- ‘কোনো জাতি তার ভাগ্য পরিবর্তনের প্রচেষ্টা না করলে, বিধাতাও তার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না।’ এসি      

অামার বাবা

আমার বাবা, গোলাম মওলা চৌধুরী। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। বাবা ২০০৮ থেকে ২০১৮ অনেকটা বছর তোমাকে ছাড়া। আমার বাবা অনেক বিনয়ী ও সুদর্শন ছিলেন। উচ্চপদস্থ সরকারি ককর্মচারী হিসেবে সুনামের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। বাবার সঙ্গে আমি বাংলাদেশের অনেক জেলায় গিয়েছি। আমি ছোটবেলাতে যখন উদয়ন স্কুলের ছাত্রী তখন বাবার পোষ্টিং হয় বরিশালের বানারিপাড়া উপজেলায়। যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না পুরোপুরি, সেই উপজেলায় বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম। যখন হারিকেনের আলোতে পড়তে বলতেন মা, বাবা বলতেন, ‘আরে মেয়েরা চিঠি লিখতে পারলেই হবে। অথচ বাবাই চাইতেন আমরা অনেক পড়ি। আমাদের একটু খুশী করতে এমনটা বলতেন বাবা। আমার বাবার মধ্যে অনেক ছেলেমানুষী ছিল। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা মায়ের বিয়েতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পুরো ক্যাবিনেট নিয়ে এসেছিলেন নাতনির (আমার মা) বিয়ে খেতে। আমার বাবা তাকে দেখে স্টেইজ থেকে নেমে পরেন। বঙ্গবন্ধুর আশির্বাদ পেয়েছেন আমার বাবা। সেই আশির্বাদ আমাদের পুরো পরিবারকে সম্মান এর সঙ্গে এখনও রেখেছে। কুমিল্লা ও রাজবাড়ী জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে তিনি সফলভাবে কাজ করেছেন। এখনও যদি কুমিল্লার কোন রোগী আমার কাছে আসে আর কথায় কথায় আমি তাকে যদি বলি যে আমি কুমিল্লা ছিলাম। আমার বাবা ডি.সি ছিলেন বেশীর ভাগ রোগীই আমাকে বলে, উনি বড় ভাল মানুষ ছিলেন। এটাই আমাদের প্রাপ্তি। অতি সাধারণভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতেন আমার বাবা। কুমিল্লাতে যখন ডিসি তখন আমার বাবার গাড়িতে সাইরেন ছিল, নিয়ম ছিল রাস্তায় চলার সময় বাজাবে যাতে রাস্তা ক্লিয়ার থাকে। বাবা কোনদিন বাজাতে দিতেন না ড্রাইভারকে। আমি মাঝে মধ্যে বলতাম কেন বাজাতে দাও না বাবা? উনি বলতেন, আমি সাধারণ মানুষের সেবার জন্য, তাদের কাছে তাদের মত থাকতে চাই। সাইরেন বাজিয়ে নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আলাদা করতে চাই না। এই ছিল আমার বাবা। ফেরি ঘাটের একটা সিদ্ধ ডিম, ২ টাকার বাদাম, এককাপ দুধ চা এই ছিল আমার বাবার পছন্দের। সামান্যতেই খুশী হওয়া মানুষটি অনেক তারাতারি চলে গেলো। ছোটবেলাতে আমি মাকে বন্ধু ভাবতাম। মা হলো আমার স্কুলের বন্ধুর মতো। আর একটু বড় হওয়ার পর বাবার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। বাবা আমার কলেজের বন্ধুর মতো। মনের কথা বলার একমাত্র জায়গা ছিল। সদা হাস্যোজ্জ্বল, আস্তে কথা বলার একজন মানুষ। আমরা তিন বোন ছিলাম আব্বার সবকিছু। আব্বা সবাইকে খুশি করার ভিষণ চেষ্টা করতো। আমি কই মাছ খুব ভালোবাসতাম। আমি একদিন মাছ খাচ্ছি, আব্বা আমাদের বাসার মেয়েটিকে বলে, "তামান্নার পিছে একটু দাড়িয়ে থাক আর খেয়াল রাখ যেন মুখে কোন কাটা না যায়"। এ হলো সেই বাবা। অনেক কষ্ট করছে শেষ সময়ে। মারা যাওয়ার তিন চার দিন আগে, আব্বার রক্ত লাগবে, আমি রক্ত দিয়েছিলাম। আব্বা কিছুতেই আমার রক্ত নিবে না। আমি জোড় করে রক্ত দেই। আব্বার রক্ত নেওয়া শেষ হলে, আব্বা ছল ছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে," মা আমি শেষপর্যন্ত তোর রক্ত নিলাম, জীবনে তুই অনেক বড় হবি। আজ আমি যা পেয়েছি আমার কিছুই আমার বাবা দেখেনি। বাবার কাছ থেকে আমি শিখেছি মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, মানুষের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়। আব্বার কাছ থেকে গ্রামকে ভালোবাসতে শিখেছি। খুব সাধারণভাবে থাকতেন আমার বাবা। জেমসের সেই গানটা মনে পরে" এযে রক্তের সাথে রক্তের টান সার্থের অনেক উর্ধ্বে, হঠাৎ ঝড়ে তোমায় হারালাম, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো, বাবা কতদিন কতদিন দেখিনা তোমায়"। আল্লাহর কাছে তুমিও ভালো থেকো বাবা। আআ/এসএইচ/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি