ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০:২৮:১১

আর কতদিন এই ভাঙ্গা রেকর্ড

আর কতদিন এই ভাঙ্গা রেকর্ড

আজকে আমার একজন সহকর্মী তার স্মার্টফোনে আমাকে একটা ভিডিও দেখিয়েছে। আমি আমার জীবনে এর চাইতে হৃদয় বিদারক কোনো ভিডিও দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। ভিডিওটি একজন এস.এস.সি পরীক্ষার্থীর, ছেলেটি অত্যান্ত ক্ষুব্দ হয়ে বলছে সে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নের উত্তরও সে পেয়ে গেছে। কিন্তু সেই উত্তরে বেশ কয়েকটি ভুল ছিল। ক্ষুব্দ ছাত্রটি বলছে, কেন ভুল উত্তর সরবরাহ করে তাদের এভাবে উত্যক্ত করা হয়। যে কোনো হিসেবে এটাকে খুবই মজার একটা কৌতুক হিসেবে বিবেচনা করার কথা ছিল কিন্তু আমি এই ভিডিওটি দেখে বিন্দুমাত্র কৌতুক অনুভব করিনি। আমি এক ধরনের আতংক অনুভব করেছি। আমাদের দেশে আমরা নতুন একটি তরুণ প্রজন্ম তৈরি করছি যারা সাংবাদিকদের বলতে সংকোচ বোধ করে না যে তারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর সরবরাহকারীদের ওপর তারা ক্ষুব্দ হয়, যদি তারা উত্তরে ভুল করে। আমাদের এই নতুন প্রজন্ম ন্যায় এবং অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। এরকমটি আগে ছিল না, এরকমটি হয়ে যাওয়ার জন্য আমরা দায়ী। আমরা হাতে ধরে এরকম একটি প্রজন্ম তৈরি করেছি। যদি এই দেশে প্রশ্নফাঁস না হতো তাহলে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম এরকম হয়ে যেত না। কাজেই আমি খুবই অসহায় বোধ করি যখন দেখি এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা বিষয়টিকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তারা বলেন, প্রম্নফাঁস নতুন কিছু নয়, আগেও প্রশ্নফাঁস হতো। প্রশ্নফাঁস নিয়ে কথা বলা হচ্ছে সরকারের একটি দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা মাত্র। আমি এটাকে মোটেও ছোট একটা বিষয় হিসেবে দেখতে পারি না। আমার কাছে এটাকে রিক্টার স্কেলে মাত্রার ভূমিকম্পের মতো মনে হয়, মহামারী প্লেসার মতো মনে হয়। প্রশ্নফাঁস হওয়ার কারণে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে অর্থহীন করে দেওয়া হয়েছে। একটি ছেলে বা মেয়ের জিপিএ ফাইভ কথাটির অর্থ কী আমরা জানি না। আসলেই সে ভালো একজন ছাত্র বা ছাত্রী হতে পারে কিংবা সে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া একজন অসৎ অভিভাবকের অসৎ সন্তান, অসৎ শিক্ষকের অসৎ ছাত্র হতে পারে। তুলনামুলকভাবে খারাপ গ্রেডের একজন ছাত্র বা ছাত্রী হয়তো আসলে একজন সোনার টুকরো ছেলে বা মেয়ে। তার চার পাশে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখেও সে প্রলোভনে পা দেয়নি, সৎ থেকেছে, বাবা মায়ের বকুনী খেয়েছে বন্ধুদের হাসির পাত্র হয়েছে। কে এই প্রশ্নের জবাব দেবে? শুধু কী তাই? পরীক্ষার নম্বর দিয়ে ছেলে-মেয়েদের কলেজ ঠিক করে দেওযা হয়। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা দেওয়া ছেলে মেয়েরা ভালো ভা্লো কলেজের সিটগুলো দখল করে নেবে। আমাদের সোনার টুকরো ছেলে মেয়েরা হতাশ হযে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা তাদের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবে না, আমি শুনতে পাই। আগে প্রশ্নফাঁস হতো কি না আমরা জানি না, যদি হতো অবশ্যই সেটি খুব একটা খারাপ একটি ব্যাপার হতো। কিন্তু আগে প্রশ্নফাঁস হতো বলে এখন প্রশ্নফাঁস হওয়াটি মেনে নিতে হবে এটা নিশ্চয়ই একটা যুক্তি হতে পারে না। আগে এদেশে রাজাকারেরা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়াতো বলে এখনও তারা তারা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ঘুরবে সেই কথাটি তো আমরা এখনও বলি না। খুটি নাটি না জেনেও শুধু কমন সেসব দিয়ে অনেক কিছু বোঝা যায়। আগে প্রশ্নফাঁস করতে হলে কাউকে না কাউকে পুরো প্রশ্নটির একটি কপি জোগার করতে হতো, এখন তার দরকার হয় না। একটি প্রশ্ন মাত্র এক ঝলক দেখার সুযোগ পেলে হয়, চোখের পলকে প্রায় অদৃশ্য একটা ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুলে নিয়ে আসা যায়। আমি নিজের কৌতুহলে পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপানো এবং বিতরণ করার পুরো প্রক্রিয়াটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছি। আমি জানি অনেক মানুষ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তারা অকারণে এবং বিনা প্রয়োজনে এই প্রশ্নটিতে হাত বুলানোর সুযোগ পান। কাজেই প্রশ্নফাঁস হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা ছোয়ার বাইরের একটি বিষয় নয়। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত মাত্র একজন অসৎ মানুষের প্রয়োজন সে এক ঝলক প্রশ্ন দেখার সুযোগ পেলে সম্ভবত কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলতে পারে। এখানে একটা কৌতুহলের বিষয় বলা যায়, আমি জানতে পেরেছি বেশ কিছুদিন আগে একটা সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেখানে বিজি প্রেসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায় সম্পত্তির খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছিল। (বিজি প্রেস হলো সেই প্রেস যেখানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইত্যাদি গোপন কাগজপত্র ছাপানো হয়।) এই প্রেসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায় সম্পত্তি বা ব্যাংক ব্যালেন্সের খোঁজ খবর নেওয়ার উদ্দেশ্য খুবই সহজ, কেউ হঠৎ করে বাড়াবাড়ি বড় লোক হয়ে যাচ্ছে কী না, হঠাৎ করে কারো আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে কী না সেটি খুঁজে বের করা। যদি এরকম কিছু দেখা যায় তাহলে বুঝেতে হবে “ডাল মে কুছ কালা হায়”। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই অত্যন্ত সময়োপোযোগী প্রয়োজনীয় তদন্তটি হঠাৎ করে “ওপরের” আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাজেই বিজি প্রেসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অসৎ উপায়ে বড়লোক হতে শুরু করেছে কীনা সেটা জানতে পেরেছি তার মাঝে কতোটুকু সত্যতা আছে জানা দরকার কারণ এটি যদি সত্যি হয় তাহলে আমাদের ভয় পাওয়ার অনেক কারণ আছে। “ওপরের” আদেশটি কতো ওপর থেকে এসছে আমি সেটাও জানতে খুবই আগ্রহী। একটি সময় ছিল যখন কোনোভাবেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করতে রাজী হয়নি যে পরীক্ষায় প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়েছে। আমি তখন অসহায় বোধ করেছি কারণ আমি জানি একটি সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যাটি বুঝতে হবে। যদি সমস্যা আছে সেটি মেনেই নেওয়া না হয় তাহলে সমস্যার সমাধান করা হবে কেমন করে? শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, এখন সবাই জানে পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হয়। সেটি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা হাইকোর্ট নিজে থেকে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বন্ধ করার ব্যাপারে সুপারিশ দেওয়ার জন্যে দুইটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। সেই কমিটি দুটির একটির দায়িত্বে রয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ। ২০১৪ সালে প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য আমি যখন শহীদ মিনারে বৃষ্টির মাঝে বসেছিলাম তখন আমার সঙ্গে সারা বাংলাদেশের একজন মাত্র শিক্ষক ছিলেন, তিনি অধ্যাপক কায়কোবাদ। কাজেই আমি নিশ্চিতভাবে জানি প্রশ্নফাঁসের এই অভিশাপ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে আন্তরিক মানুষটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। আমি অনুমান করতে পারি এই কমিটি নিশ্চয়ই কোনো কিছু ধামাচাপা দেবে না, সমস্যাটির গভীরে প্রবেশ করবে এবং নিশ্চিতভাবে একটি সমাধান খুঁজে বের করবে। প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটি যখন আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি তখন সেটি বন্ধ করার এক ধরণের আয়োজন শুরু হয়েছে। তবে আয়োজনটি “প্রশ্নফাঁস বন্ধ” করার জন্য নয় আয়োজনটি ফাঁস হয়ে যাওয়া “প্রশ্ন বিতরণ” বন্ধ করার জন্যে। আমরা যদি ধরে নিই প্রশ্নফাঁস আমরা বন্ধ করতে পারব না, সেটি হবেই হবে, অথবা আমরা শুধু এর বিতরণটি বন্ধ করব তাহলে বুঝতে হবে আমরা প্রশ্নফাঁস বন্ধের যুদ্ধে আগেই পরাজয় স্বীকার করে বসে আছি। আমি বিশ্বাস করতে রাজী নই যে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা সম্ভব নয়, অবশ্যই সম্ভব, শুধু সেটি আন্তরিকভাবে চাইতে হবে। যদি প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা যায় তাহলে তার বিতরণ বন্ধ করার জন্যে আলাদা করে নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে হবে না। যে প্রশ্নফাঁস হয়নি সেটি বিতরণ করবে কেমন করে? যারা প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছে তারা মোটামুটিভাবে তার একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করে আসছে। মূল প্রশ্নটি অনেক আগেই ফাঁস হয়, সেটি ধাপে ধাপে বিতরণ করা হয়। যখন পরীক্ষা প্রায় শুরু হতে যাচ্ছে তখন বিনমূল্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। একেবারে শেষ ধাপে যখন এটা খুচরা হিসেবে বিতরণ করা হয় তখন তাদের কাউকে কাউকে ধরা হয়েছে কিন্তু তারা নেহাতেই চুনোপুটি । শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল প্রশ্ন ফাঁসকারী কাউকে গ্রেফতার করতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, এ পর্যন্ত অনেককেই ধরা হয়েছে (এর মাঝে এস.এস.সি পরীক্ষার্থীরাও আছে) তাদের কতোজনকে পাঁচ লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে কে জানে। প্রশ্নফাঁসকারী চুনোপুটিকে গ্রেফতার করেছেন এরকম একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন। সেটি হচ্ছে প্রশ্নফাঁসের এই রমরমা ব্যবসার মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে বিকাশ। বিকাশে টাকা পাঠানোর পুরো ব্যাপারটি যেহেতু পানির মতো সোজা তাই এটি অপরাধ চক্রের সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম এরকম একটি পদ্ধতিতে টাকা পাঠানো হলে কে পাঠাচ্ছে এবং কার কাছে পাঠাচ্ছে তার একটি হাদিস থাকবে। কিন্তু আমি সবিনয়ে এবং মহাআতংকে আবিষ্কার করেছি সেটি সত্যি নয়। কোনো রকম নিয়মনীতি না মেনে বিকাশে একটা একাউন্ট খুলে ফেলা সম্ভব এবং সেই একাউন্টে টাকা লেনদেন সম্ভব। যে বড় পুলিশ অফিসারটির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তিনি বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন এই বিকাশ প্রযুক্তির কারণে কিডন্যাপিং অনেক বেড়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয় তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছেন যে প্রযুক্তি অপরাধীদের টাকা লেনদেনে সাহায্য করে, আমাদের দেশ কী সেই প্রযুক্তির জন্যে প্রস্তুত হয়েছে? আমি কখনো বিকাশ ব্যবহার করে টাকা পাঠাইনি তাই এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না, কিন্তু সহজ প্রশ্নটি তো করতেই পারি। যদি এই প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা ধরা ছোয়ার বইরে থেকে টাকা লেনদেন করতে পারে তাহলে তার দায় দায়িত্ব কি বিকাশকে নিতে হবে না। আবার প্রশ্নফাঁসের মূল ব্যাপারটায় ফিরে আসি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে একটি প্রশ্ন পুরোপুরি এবং অন্যগুলো আংশিক ফাঁস হয়েছে। যেগুলো ফাঁস হয়েছে সেগুলোর পরীক্ষা কী আবার নেওয়া হবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যদি নতুন করে নেওয়া হয় তার প্রশ্ন আর ফাঁস হবে না? যদি হয় তখন কী হবে? আমি আমার ভাঙ্গা রেকর্ড বাজাতে বাজাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আর কতোদিন? লেখক : কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। এসএইচ/
জাবির র‌্যাগিং কালচার: বিকৃত রুচির আস্ফালন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের (র‌্যাগিং) বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে গা শিউরে উঠে। কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভাষ্য ছিল মোটামুটি একই রকম। একটি গণমাধ্যমের খবর হুবুহ তুলে ধরছি, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট’-এর ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান সোমবার ক্লাস করতে যান তার বিভাগে। এসময় জামার হাতা গুটানো ছিল তার। আর বন্ধুর চোখে ছিল সানগ্লাস। আল বেরুনি হলের ৪৬তম ব্যাচের কয়েকজন সিনিয়রের কাছে বেয়াদবি ঠেকে এটি। নিজেদের পরিচয় না দিয়ে আশিকুর এবং তার সাথে থাকা বন্ধুকে ডেকে নিয়ে আল বেরুনি হলের সামনে পরিচয় জানতে চান তারা। পরিচয় দেওয়ার পদ্ধতি পছন্দ না হওয়ায় শুরু করেন ধমকাধমকি। এরপর আশিকুরের কাছে জানতে চান শার্টের হাতা গুটানো কেন (ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থীদের জামার হাতা গুটিয়ে না রাখার সদ্যসিনিয়রদের নির্ধারণ করে দেওয়া এক অলিখিত নিয়ম)। জবাবে আশিকুর জানান, জামার হাতা গুটিয়ে রাখা যাবে না, তা হলের বড় ভাইরা বলেননি। জবাব শুনে শুরু হয় গালিগালাজ। গালিগালাজ না করতে আশিকুর রহমান অনুরোধ করলে শুরু হয় মারপিট। থাপড়াতে থাপড়াতে আশিকুরকে কাছে থাকা পুকুরে ফেলে রেখে যান তারা। পরে সেখান থেকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাভারের একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পাঠান আশিকুরকে।’ আমার মনে হয়, নবীন শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের (র‌্যাগিং) ঘটনা ঘটে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই। তবে তার মাত্রা বেশি জাহাঙ্গীরনগরে। প্রতিবছর যখন নতুন বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসে, তখনই শুরু হয় র‌্যাগিংয়ের নামে এক শ্রেণির কথিত সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বিকৃত রুচির উল্লোম্ফন। ছাত্র বা ছাত্রী, একক, যৌথ বা দল বেধে শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ দেওয়া হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। নতুন বর্ষের শিক্ষার্থীরা আসার পর দেখতাম, প্রতিরাতেই গণরুমে সবাইকে দাঁড় করিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কায়দায়, একেক দিন র‌্যাগ দেওয়া হতো। কোনো দিন সবার মুখে সিগারেট গুঁজে দেওয়া হতো। কোনো দিন সেনা সদস্যদের মতো কথিত শারিরীক কসরত দেখাতে হতো শিক্ষার্থীদের। আইয়ুব বাচ্চু বা জেমসের সুরে বিকট চিৎকারে গান গাওয়া, বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মতো মারামারি, কত কিছুই না করানো হয় নবীন শিক্ষার্থীদের দিয়ে। কথা না শুনলেই তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। একক নয়, দল বেঁধে নতুন শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। কথিত এইসব সিনিয়ররা সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। আলাপচারিতায় দেখেছি, ছাত্রসংগঠনের সেসব নেতা-কর্মীরা অনেকটা গর্ব সহকারে র‌্যাগ দেওয়ার কথা স্বীকার করতো। আশ্চর্য লাগতো তাদের রুচিবোধে। যারা র‌্যাগ দিয়ে মজা পায়, তাদের পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে বিভিন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েরা। দিনমজুর থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের সন্তানরা আসে উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠে। সেখানে কতিপয় বিপথগামী শিক্ষার্থীদের কাছে নির্যাতন সইতে হয় নতুন শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেই এ ধরণের অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। তারাও প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠে। সাংবাদিকতার কাজে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যাই দীর্ঘ দিন। বেশ জানাশোনাই আছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে। কথা হচ্ছিলো এক যুগ্ম-সচিবের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরনগর প্রসঙ্গ আসতে একদিন বলে ফেললাম, আমি তো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। ভদ্র নারীর মুখটা চুপসে গেলো। কোথাও কোনো সমস্যা- মনে হলো। বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি যেটা বললেন, অনেক দিন থেকে তোমার সঙ্গে জানা শোনা। তোমাকে ছেলের মতই দেখি। তাই রাগ করতে পারলাম না। কিন্তু আমি জাহাঙ্গীরনগরের কাউকে দেখলে অস্বাভাবিক হয়ে যাই। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, তার মেয়ে জাহাঙ্গীরনগরের বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের অনিচ্ছা সত্বেও তাকে হলে পাঠান। জাহানারা ইমাম হলের শিক্ষার্থী ছিলেন সেই মেয়ে। প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাকে র‌্যাগ দেওয়া হয়। প্রতিদিন একেক স্টাইলে। একদিনের র‌্যাগিং ছিল এমন, বাথরুমের ভেজানো (সম্ভবত তাতে প্রসাব লাগনো ছিল) কাপড় গায়ে জড়ানো। মেয়েটা অসুস্থ হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন সে মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারেনি। ভর্তি বাতিল করে তিনি পরে তাকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। পরে আর তার রুমে যেতে পারিনি, তার অস্বস্তির কারণ হতে চাইনি। জাহাঙ্গীরনগর, আমার বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমান বা সাবেক অনেক শিক্ষার্থীকে ইনিয়ে বিনিয়ে র‌্যাগিংয়ের পক্ষে কথা বলতে শুনি। এটা না কি আমাদের সংস্কৃতি! হায়, আমরা যারা র‌্যাগিংয়ের পক্ষে, তার ভাই বা বোনের মুখে যদি সিগারেট গুঁজে দেওয়া হয়, অর্ধনগ্ন করে এক পায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাড়া করে রাখা হয়, একই বাথরুমে রাতভর আটকে রাখা হয়, আমার অনুভূতি কি হবে তখন? র‌্যাগিং নিয়ে প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল বরাবরই। আমাদের সময় দেখেছি, র‌্যাগিং বন্ধে সচেতনতার জন্য ক্যাম্পাসে পোস্টারিং করা হয়েছিল। তাতে প্রক্টরসহ কয়েকজন সহকারী প্রক্টরের ফোন নম্বর দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, র‌্যাগিং বন্ধে অভিযোগদানকারীদের নাম গোপন রেখে বিচার করা হবে। হায়, সে তালিকার বেশিরভাগ শিক্ষকই ফোন ধরতেন না। কেউ বা রিসিভ করলে বলতেন দেখছি, পরে আর ব্যবস্থা নিতেন না। তবে, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরকে দেখেছি, ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিতে। তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতেন। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন বলে কাউকে ছাড় দিতেন না। র‌্যাগিং মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়া তার একটি উদ্যোগ ছিল। অনেকটা সফলও হয়েছিলেন বলা চলে। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সময় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেছেন, হলের প্রভোস্টসহ অন্য শিক্ষকরা তাকে সহযোগিতা করছেন না। তিনি কিভাবে ব্যবস্থা নিবেন, কারণ, প্রশাসন তো সবার সমন্বয়ে একটি বডি। তার এমন বক্তব্য শোনার পর, নবীন শিক্ষার্থীরা হয়তো র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহতায় আরেকটু ভীতই হবে। একটা ভাবনা আসে মাথায়। জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সৌজন্যতা, আচরণ শেখানোর দায়িত্ব সিনিয়র শিক্ষার্থীদের কে দিয়েছে? সময়টা পাল্টেছে, পরিবর্তন হয়েছে প্রতিযোগিতার ধরণ। বিসিএস বা করপোরেট চাকরি, সাংবাদিকতা বা উদ্যোক্তা হয়ে গড়ে উঠা... সবকিছুতেই এখন কত চ্যালেঞ্জ। অথচ, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতশ একরের মাঝে থেকে আমরা যেনো নিজেদেরও সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পার হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে উঠলেই দুনিয়াটা বড় হয়ে যায়। প্রতিযোগী মনে হয় সবকিছু। চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়, সবাইকে পেছনে ফেলে নিজের আসনকে পাকাপোক্ত করা। কাঠামাবদ্ধ হলের সীমানায় আটকে থেকে যেন বধির হয়ে যায় আমাদের চিন্তাধারাও। হায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বোধোদয় হবে কবে? লেখক# বিজনেস রিপোর্টার, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। ইমেইল :[email protected]  এসএইচ/

শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থার সংস্কার দরকার

বাংলাদেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অমূল সংস্কার দরকার। এর জন্য প্রথম পর্যায়ে দরকার সর্বজনীন কল্যাণে বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের দূরদর্শী চিন্তা ভাবনা, আলোচনা-সমালোচনা ও বিচার-বিবেচনা। শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে ধারণা যদি ঠিক হয়, তাহলে সেই লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে চেষ্টা চালালে সমাধানযোগ্য সব সমস্যারই সমাধান করা যাবে। লক্ষ্য ও যাত্রা পথ সম্পর্কে স্পস্ট ধারণা নিয়ে এগোতে হবে। উন্নত প্রযুক্তি ও শ্রমশক্তির কল্যাণে উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু নৈতিক চেতনা নিম্নগামী হওয়ার ফলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ মানবিক গুণাবলি হারিয়ে চলছে। এ অবস্থায় জাতীয় শিক্ষানীতি এ শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যবস্থারও সংস্কার দরকার। অভীষ্ট সংস্কারের জন্য দীর্ঘকালের প্রচেষ্টা লাগবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য আর কায়েমি স্বার্থবাদীদের দৃষ্টি ভঙ্গি ও লক্ষ্য এক নয়। আমরা পরিবর্তন চাই সর্বজনীন কল্যাণে। কায়েমি-স্বার্থবাদ যাদের চালিকা শক্তি, তাদের সঙ্গে সর্বজনীন কল্যাণবোধ যাদের চালিকা শক্তি, তাদের বিরোধ চিরকালের। সর্বজনীন কল্যাণে, অশুভ বুদ্বিকে দমন করে,শুভবুদ্বি অবলম্বন করে এগোতে হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ও শিক্ষাক্ষেত্রে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে সহজে এর উন্নতি সাধন সম্ভব হবে না। অভীষ্ট নির্ণয়ের অভীষ্ট অর্জনের জন্য যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের সঙ্ঘবদ্ধ দূরদর্শী ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অগ্রাধিকার ঠিক করে পর্যায়ক্রমে এগোতে হবে। প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে কর্মসূচিভুক্ত করা যেতে পারে: ১. প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত রেখে এর মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে পরবর্তী সকল শিক্ষার ভিত্তি। পঞ্চম শ্রেণির ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। স্কুল থেকে প্রাথমিক পিএসসি ও নিম্ন মাধ্যমিক জেএসসি শিক্ষা সমাপনের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে এবং এগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকবে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা প্রবর্তনের ফলে শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং কোচিং সেন্টার, গাইড বুক ইত্যাদির ব্যবসাতে স্বর্ণযুগ দেখা দিয়েছে। এগুলো বাতিল করা হলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এবং দেশি বিদেশি যেসব শক্তি এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে তারা পরিবর্তনে বাধা দেবে। জনমত প্রবল হলে পরিবর্তনে সরকার রাজি হবে। ২. কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্বতি পরিবর্তন করে এমন পদ্বতি প্রবর্তন করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের মনে পাঠানুরাগ, অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানস্পৃহা,স্বাজাত্যবোধ, সামাজিক সম্প্রতি দেশপ্রেম, সুনাগরিকত্ববোধ ও উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা জাগাবে। পরীক্ষার জনন্য মূলত বর্ণানামূলক উত্তরের পদ্ধতিকে নবায়িত ও বিকশিত করে কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আনন্দের যোগ ঘটাতে হবে। বর্তমানে শিশু কিশোররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে শিক্ষার্থী হিসেবে, কিন্তু তার পরেই তারা বইয়ের বোঝা পিঠে নিয়ে পরীক্ষার্থী হয়ে যায়, শিক্ষার্থী আর থাকতে পারে না। এই অবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। সারা দেশের পাবলিক পরীক্ষার ফল এক কেন্দ্র থেকে প্রকাশ করা এবং ফল প্রকাশের সময় শিক্ষার পরীক্ষা সর্বস্ব ধারণা প্রচার করা বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষা নীতির আওতায় শিক্ষা বোর্ডগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের অন্ধ অনুসারীরা পরীক্ষা পদ্ধতির অভিপ্রেত পরিবর্তন সাধনে বাধা দেব। সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের অনুসারীরা দুর্বল জাতিগুলোতে শিক্ষার উন্নতি চায় না- তারা কেবল ভালো সার্টিফিকেট দিয়ে শিক্ষার্থীদের ও অভিভাবকদের সন্তুষ্ট রাখার ব্যবস্থা চায়। জ্ঞানেই শক্তি, জ্ঞানেই কল্যাণ বৃহৎ শক্তিবর্গ এটা বোঝে, এবং জ্ঞানকে তারা কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। বাংলাদেশকে চলতে হবে জাতীয় ঐক্য অবলম্বন করে, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের চেতনা নিয়ে,সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার করে। ৩. ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে। যারা সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রে নাগরিক করার জন্য, কিংবা বড় চাকুরি পাওয়ার জন্য ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চান, তাঁদের জন্য ব্রিটিশ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে ও-লেভেল, এ-লেভেল চালাচ্ছে। তা ছাড়াও আছে বিদেশী সরকার দ্বারা পরিচালিত ইংরেজি মাধ্যমের আরো কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেসবের পাশে ইংলিশ ভার্সনের দরকার নেই। ইংলিশ ভার্সনের জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে তার দ্বারা রাষ্ট্র, জাতি ও জনগণের কোনো কল্যাণ হচ্ছে না। বাংলাদেশে যাঁরা আজকাল কেবল বিশ্বমান অর্জনের কথা বলেন তাঁরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের অবস্থার কথা একটুও ভাবেন না। যাঁরা দ্বৈত নাগরিক, যাঁদের স্ত্রী অথবা স্বামী অথবা সন্তান দ্বৈত নাগরিক কিংবা বিদেশী নাগরিক, তাঁরা যাতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপসচিব, থেকে সচিব, জর্জকোর্ট, থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে না পারেন, সংবিধানে তার বিধান রাখতে হবে। শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের ভূভাগে উন্নত জনজীবন, উন্নত জাতি ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা। জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের মূলনীতি হবে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও সর্বজনীন কল্যাণ। ৪.প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা শেখার ব্যবস্থাকে যথাসম্ভব উন্নত করতে হবে।সারা দেশে সকল শিশুকে বিদেশি ভাষা শেখানোর দরকার নেই।জাতীয় চাহিদা অনুযায়ী সংখ্যা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষা ভালো করে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া,পৃথিবীর উন্নত ও অনুন্নত কোনো রাষ্ট্রেই,সব শিশুকে বিদেশি ভাষা শেখানো হয় না। বর্তমানে মূলধারার (এনসিটিবি যে ধারার পাঠ্যপুস্তক জোগান দেয়) বাংলা মাধ্যমে ইংরেজি শেখানোর যে ব্যবস্থা আছে,তার পুনর্গঠন দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্তত একটি বিদেশি ভাষা সকল শিক্ষার্থীকে ভালো করে শিখতে হবে।বিদেশি ভাষার জ্ঞান দিয়ে বাংলা ভাষাকে ও বাংলা ভাষার জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ব করতে হবে। ৫. প্রাথমিক শিক্ষা সকলকেই গ্রহণ করতে হবে।বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী সারাদেশে ক) প্রাথমিক পর্যায়ের (পঞ্চম শ্রেণি) পরে একটি শাখায়,এবং খ) নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের (অষ্টম শ্রেণি) পরে অন্য একটি শাখায় পেশামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে।এটা করা গেলে ঝরে পড়ার সমস্যার সমাধান হবে।পেশাগত শিক্ষার এই দুই ধারার পাঠ্যসূচিতেই পেশামূলক বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষা, জাতীয় ইতিহাস,পৌরনীতি ও নীতিশিক্ষাকে আবশ্যিক বিষয় রুপে স্থান দিতে হবে। পেশামূলক শিক্ষার এই দুই ধারার বাইরে মূলধারার বাংলা মাধ্যমে নবম ও দশম শ্রণিতে বিজ্ঞান,বাণিজ্য ও মানবিক শাখাকে একীভূত করে এক ধারায় পরিণত করতে হবে।উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানববিদ্যা,বিজ্ঞান ও বাণিজ্য এই তিন শাখা থাকবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় ইতিহাস, পৌরনীতি ও নীতিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বিষয়রুপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মূলধারার বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক,মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। মানববিদ্যা,বিজ্ঞান,বাণিজ্য, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সকল ধারার উচ্চশিক্ষার ভিত্তি রুপে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার তিন শাখার পাঠ্যসূচিকে পুনর্গঠিত করতে হবে। সারা দেশে গরিবদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।পরীক্ষার ফল ও অন্যান্য দিক বিচারে মেধাবি শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে বাংলা মাধ্যমের মূলধারা খুব বেশি এুটিপূর্ণ ও অবহেলিত। মূলধারার বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে উন্নত করা হলে তার পাশে মাদ্রাসা ধারাও উন্নতিতে আগ্রহী হবে।মূলধারার বাংলা মাধ্যমকে উন্নত করা হচ্ছে না বলেই গোটা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ৬. মাদ্রাসার বেলায় মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল সমূহের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।যে অবস্থা চলছে তাতে বিরোধমূলক নীতি পরিহার করে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নতির নীতি গ্রহণ করতে হবে। সব কিছু করতে হবে রাষ্ট্রের সংবিধানের আওতায় থেকে। ৭.বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কলেজে সেমিস্টারের মেয়াদ চার মাস কিংবা ছয় মাসের পরিবর্তে এক বছর করতে হবে।পরীক্ষার ফল গ্রেড পয়েন্টে প্রকাশ করা অব্যাহত রাখতে হবে,এবং এই পদ্বতিকে উন্নত করতে হবে। গবেষণায় গবেষকের স্বাধীনতা যতটা সম্ভব বাড়াতে হবে। উচ্চ শিক্ষার বিশ বছর মেয়াদি কৌশলপএের স্থলে রাষ্ট্রীয় অর্থে, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ অবলম্বন করে, নতুন উচ্চশিক্ষানীতি প্রবর্তন করতে হবে। গোটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ৮.জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ ভিত্তিক কর্মনীতি নিয়ে গ্রেকো- রোমান -ইউরো-আমেরিকান সভ্যতার প্রগতিশীল মহান বিষয়াদিকে -দর্শন, বিজ্ঞান ,ইতিহাস,শিল্প-সাহিত্য,প্রযুক্তি,গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদিকে- আমাদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যথাসম্ভব গ্রহণ করতে হবে,আর তাদের উপনিবেশবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী বিষয়াদিককে যথাসম্ভব পরিহার করে চলতে হবে। বিশ্বায়নের কর্তৃপক্ষ ( যুক্তরাষ্টের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, বিশ্বব্যাংক,আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল,ন্যাটো,জি- সেভেন, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা,জাতিসংঘ) ও তার সাম্রাজ্যবাদী চরিএ সম্পর্কে সচেতন থেকে কাজ করতে হবে। বাইর থেকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে নিজেদের বিবেচনায়,নিজেদের সত্তায় থেকে - নিজেদের সত্তাকে সমৃদ্ব করার জন্য।শিক্ষাক্ষেএে এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। ৯. বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সম্ভবপর সকল পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষা রুপে প্রতিষ্ঠা করার, উচ্চশিক্ষা,গবেষণা, বিচারব্যবস্থা ও ব্যাংকিং এ বাংলা প্রচলনের, বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার এবং বাংলা ভাষার সর্বাঙ্গীণ উন্নিতির লক্ষ্যে দূরদর্শী জাতীয় পরিকল্পনা ঘোষণা করে কাজ করতে হবে।উচ্চশিক্ষায়,গবেষণায়,বিচারব্যবস্থায়,ব্যাংকিং ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাংলা ভাষা অবহেলিত বলেই বর্তমান পর্যায়ে বাংলা ভাষা গুরুত্ব বেশি দিতে হবে।বাংলা ভাষা, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের ভাষা, ধর্মীয় ভাষায় ও বিদেশি ভাষা ইত্যাদি বিবেচনা করে সুষ্ঠু জাতীয় ভাষানীতি অবলম্বন করতে হবে।জাতীয় পর্যায়ে জনজীবনের বৈচিত্র্য ও ঐক্য দুটোতেই যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ও সকলের উন্নতির নীতি অবলম্বন করতে হবে।এসব নিয়ে চিন্তায় ও মতপ্রকাশে বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ১০.শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে যাতে ক)  সারা দেশে বিভিন্ন ধারার পেশামূলক শিক্ষার মাধ্যমে বৃহত্তম- সংখ্যক যোগ্য,দক্ষ,উৎপাদনক্ষম,উন্নত- চরিএ বল সম্পন্ন কর্মী সৃষ্টি হয়, খ) শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিমান রাষ্ট্ররুপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার ও ভালোভাবে পরিচালনা করার উপযোগী শিক্ষিত লোক তৈরি হয়,অধিকন্তু, গ) দর্শন,বিজ্ঞান,ইতিহাস,শিল্প- সাহিত্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেএে প্রকৃত জ্ঞানী  ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের আত্নপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আরো অনেক গুরুতর বিষয় আছে যেগুলোকে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচিভুক্ত করে নিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে আছে অজস্র সমস্যার মধ্যেও মহান সব সম্ভাবনা।পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সম্ভাবনার বাস্তবায়ন সম্ভব। জনসাধারণকে জাগতে হবে,ঘুমিয়ে থাকলে কোনো সম্ভাবনাই বাস্তবায়িত হবে না।কর্মসূচি গ্রহণ করে তার বাস্তবায়নের জন্য পর্যায়ক্রমে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।আন্দোলন গড়ে ওঠার আগেই সরকার যদি সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তার বাস্তবায়ন আরম্ভ করে,তাহলে তা সরকার ও জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রুপে গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নতিশীল রাখতে হবে।গোটা শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ দরকার। যদি কোনো বিশ্বসরকার গঠিত হয় তাহলে তার রুপ ও প্রকৃতি হওয়া উচিত আন্তরাষ্টিক - ফেডারেল, এবং তাতে জাতিরাষ্ট্র, জাতি,জাতীয় সংস্কৃতি ও জাতীয় ভাষাকে বিকাশশীল রাখতে হবে। বিশ্বসরকারের কাছে খুব কম বিষয়েরই ক্ষমতা থাকবে,জাতীয় সরকারের কাছেই থাকবে অভ্যন্তরীণ সব ক্ষমতা। বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকার সমূহের ঊর্ধ্বতম  এক সরকার। বিশ্বসরকারের কাছে একটি সেনাবাহিনী রেখে সকল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা যাবে।এ অবস্থায় বাংলাদেশকে সর্বজনীন গণতন্ত্র অবলম্বন করে জনগণের স্বাধীন প্রগতিশীল গণরাষ্ট্র রুপে গড়ে তোলা আমাদের কেন্দ্রীয় কর্তব্য। জাতীয়তাবাদ ও তা সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ অবলম্বন করে বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে।সেই লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রে, জনজীবনের প্রগতিশীল সমৃদ্বিমান ভবিষ্যত সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা নিয়ে নতুন কার্যক্রম আরম্ভ করা দরকার।সকল রাষ্ট্রেই শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দরকার। লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। / এআর /

প্রশ্ন ফাঁসের সমাধান কোথায়

সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী প্রধান হচ্ছেন মন্ত্রী। তার নির্দেশ পালন করেন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। যদিও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেন মন্ত্রীরা, আমলারা নিজেদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে মন্ত্রীদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তারপরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে মন্ত্রীর তরফ থেকে, মন্ত্রীর স্বাক্ষরেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তাই যেকোন মন্ত্রণালয়ের সফলতা বা ব্যর্থতার দায়ভার চাপে মন্ত্রীর কাঁধে। সফলতার জন্য বাহবা না পেলেও ব্যর্থতার জন্য সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পান না কোনো মন্ত্রী। তবে উন্নত এবং অনুন্নত বিশ্বে এই চিত্র ভিন্ন হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে নানামহলে আলোচনা সমালোচনা চলছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষা, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে হরহামেশা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা এমনকি বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে বলে গণমাধ্যমে বারবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের মধ্যে বিভিন্ন চাকুরীর নিয়োগ পরীক্ষাসহ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নও রয়েছে।  এবছর এসএসসির সকল প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যা পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে হুবহু মিলে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম পদক্ষেপ নেওয়া হলেও রোধ করা যাচ্ছে না প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারী প্রেস, যেখানে প্রশ্নপত্র ছাপানো হয় সেখানাকার কর্মচারী, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, স্কুল এবং কলেজের শিক্ষকসহ বেশ কিছু সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক করেও ফল হচ্ছেনা। গত কয়েকদিনে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত সন্দেহে কয়েকজন শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটককৃতরা বিগত কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস করছিল বলে দাবী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এদিকে প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে সরকার গঠিত পরীক্ষা মূল্যায়ন কমিটি। তার মধ্যে কোনটির আংশিক ও একটির পুরোপুরি প্রশ্নফাঁস হয়েছে। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে কমিটি। কমিটির মতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে অনেক হাইপ্রোফাইল ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে, যাদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারেরও কথা ঘোষণা করেন তিনি। এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। দেওয়া হয় গ্রেফতারের নির্দেশ। পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে এগিয়ে  এসেছে মহামান্য হাইকোর্টও। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের খুঁজে বের করতে ও প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণে বিচার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক কমিটি গঠন করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এতকিছুর পর এখন পর্যন্ত ঠেকানো যায়নি প্রশ্ন ফাঁস। ২৫ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত হওয়া পর্যন্ত কতগুলো প্রশ্ন ফাঁস হয় আর সরকার নতুন কি কি পদক্ষেপ নেয় সেটা সময়েই বলে দেবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দেখভাল করা। যেহেতু একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে এবং সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে মন্ত্রণালয়, তাই স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের দাবী উঠেছে। রাজনৈতিক, শিক্ষাবিদসহ সুশীল সমাজে এ দাবী জোরালো হচ্ছে। এমনকি সরকারের শরীক জাতীয় পার্টির এক নেতা সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করেছেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদে সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁসের মহামারীর কারণে শিক্ষার্থীই শুধু নয় অভিভাবকদেরও সরকার সম্পর্কে বিরুপ ধারণা জন্মাচ্ছে। এর আগে গণ মাধ্যমে খবর এসেছিল, শিক্ষামন্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব পালন করে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এবার শিক্ষামন্ত্রী খোদ উড়িয়ে দিলেন পদত্যাগের কথা। একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, “আমার পদত্যাগ করা নিয়ে কিছু অনলাইনে নিউজ প্রকাশ করা হয়েছে। পদত্যাগের ফাইল নাকি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে জমা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালি সফর থেকে দেশে ফিরলেই আমি পদত্যাগ করতে যাব।” তিনি আরো বলেন, “এসব সংবাদের কোনো সত্যতা ও ভিত্তি নেই। আমার পদত্যাগ করার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। কোনো অন্যায়কারীকে আমরা প্রশ্রয় দেই না। শক্তহাতে তা প্রতিরোধ করা হচ্ছে। আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য কিছু গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।“ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অবশ্য একটি ব্যতিক্রম ছাড়া পদত্যাগের কোন নজির নেই। কোন এক অজানা কারণে পদত্যাগ করেছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ। এছাড়া আর কোন মন্ত্রী চেয়ারের মোহ ছাড়তে পারেন নি। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও কয়েক মন্ত্রী পদত্যাগ করেননি, এমন পরিস্থিতিও হয়েছে বাংলাদেশে। শুধু বাংলাদেশ নয়, তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশে একই চিত্র দেখা যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে সরকারের কর্তাব্যক্তির আশ্রয় প্রশ্রয়ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নত বিশ্বে দায় স্বীকার করে পদত্যাগের ভুরি ভুরি নজির দেখা যায়। অতি সাম্প্রতিক সময়ে আমার আপাত আবাস যুক্তরাজ্যে এক মন্ত্রী লর্ড বেটস পদত্যাগ করেছেন শুধু পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর পর্বে ৬০ সেকেন্ডেরও কম দেরীতে আসার কারণে। ব্যর্থতা বা কোনো ধরনের বিতর্কে জড়ালেতো কথাই নেই, কালবিলম্ব না করে পদ ছেড়ে দেন মন্ত্রীসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। ওয়াটারগেট কেলেংকারীতে জড়িয়ে পদত্যাগ করেছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। যদিও একই ধরনের কেলেংকারিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠার পরও ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী পদত্যাগ করেননি। যুক্তরাজ্যে ইউরোপিয় ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে হারার পদ প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। এছাড়া যৌন কেলেংকারীতে জড়িত থাকার অভিযোগে কাছের বন্ধু ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ডমিয়েন গ্রিনকে বরখাস্ত করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে। আবার বাংলাদেশের কথাই আসি। যে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে এত বির্তক যাতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবী উঠেছে, তার সমাধান কি? এক মন্ত্রী পদত্যাগ করলেই কি প্রশ্নপত্র ফাঁস হবেনা? এমন আশা করা মনে হয় বোকামি হবে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মতে দীর্ঘ দিন ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রথম ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপিসহ চার দলীয় জোট সরকারের শাসনামলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক সদস্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওই সময় দুটি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গোয়েন্দা সংস্থা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ জড়িতদের আটক করে। এ ঘটনা আর আলোর মুখ দেখেনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১০ সালে রংপুরে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলশিক্ষক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে গোয়েন্দা জানতে পারেন তিনস্তরে কাজ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী সিন্ডিকেট। বিজি প্রেস ও পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছে প্রথম স্তরে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে সারা দেশে শিক্ষা দপ্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের মালিকেরা । সর্বনিম্ম স্তরে কাজ করে মাঠ পর্যায়ের দালালরা। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে দেখতে হবে প্রশ্নপত্র তৈরি এবং পরীক্ষার হলে পৌঁছানো পর্যন্ত এতে কারা থাকেন। প্রশ্ন পত্র তৈরিতে নিয়োজিত কমিটি কতটুকু বিশ্বস্ত সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। তাদের শিক্ষাজীবন হতে শুরু করে আদর্শ, রাজনৈতিক কার্যকলাপ এমনকি পারিবারিক ইতিহাসও ঘেটে দেখা দরকার। তাদের মধ্যে কেউ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এমন করছে, এমন আশংকা অমূলক নয়। আবার এসব প্রশ্নপত্র যেখানে ছাপা হয়, সে প্রেসের কেউ এ কাজ করছে কিনা সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হবে। বিজি প্রেসের কয়েক কর্মচারীকে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে একজন জেলে মারা যান। তার মৃত্যু নিয়ে অনেক রহস্য রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত। প্রশ্নপত্র পরিবহনের সময়ও ফাঁস হতে পারে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে ফাঁস হচ্ছে প্রশ্নপত্র। তাহলে সেটা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে হতে পারে। এসব কিছু বিবেচনা করে সরকারকে সর্বশক্তি নিয়োগ করে সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে হবে। এতে যদি রাঘববোয়াল কেউ জড়িত থাকে তাতে পিছপা হওয়া যাবেনা। বিভিন্ন সময় আটককৃতরা জানিয়েছে, বর্তমানের এমসিকিউ পদ্ধতি যতদিন থাকবে ততদিন প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা যাবে। সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিলের চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়ে শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেছেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে পরীক্ষা পদ্ধতিই পাল্টে ফেলা হবে। আগামী বছর থেকে নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নাকি পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। ফলে আগামীতে আর কোনো পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হবেনা বলে আশান্বিত হয়ে গদির স্বাদ নিতে পারেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। লেখক: চীফ নিউজ এডিটর, চ্যানেল আই ইউরোপ

কোটায় বন্দী তারুণ্যের স্বপ্ন, মুক্ত করবে কে?

স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরে পা দিয়েছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ, প্রায় সব ইস্পাত কঠিন বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াচ্ছে, তখন দেশের তরুণ মেধাবীরা যেনো নিজের দেশের প্রচলিত কিছু নিয়মের দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে যে বিষয়টি এখন দেশব্যাপী আলোচিত হচ্ছে তা হলো ‘চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতি’।   সকল ধরনের বৈষম্য অবসানের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে জন্ম নেওয়া স্বাধীন দেশটি আজ তাদের সন্তানদেরকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যর নিয়মে আবদ্ধ করেছে। নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৬% কোটা দিয়ে মেধাবীদের সুযোগকে সীমিত করেছে, যা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও সংবিধান পরিপন্থী। কোটার প্রাধান্য দিয়ে মেধাবীদের কোণঠাসা করে দেয়ার এই উদ্ভট নিয়মের সংস্কার এখন সময়োচিত যৌক্তিক দাবী। যদি মেধার লালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কারের দ্বারা মেধাবী তরুণদের সুযোগ কে প্রসারিত করার বিকল্প পথ আর একটিও নেই। কারন আজকের মেধাবীরাই আগামীর স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার মূল কারিগর। অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদেরকে অবশ্যই চৌকস মেধাবী হতে হবে এবং সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে কোন বিশেষ সুবিধা ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেতে হবে। তাহলেই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেবে বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এমন স্বপ্ন সত্যি করতেই এগিয়ে যাচ্ছে সোনার বাংলাদেশ। তাই স্বপ্ন পূরণে দরকার শুধু সঠিক পদক্ষেপ ও বৈষম্যহীন নীতিমালার।  বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা চালুর ইতিহাস: ১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, বেসরকারি, প্রতিরক্ষা, আধা সরকারি এবং জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য কোটা প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে কোটায় সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি নিয়োগে কোটা যেমন, প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ কোটা। সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান। ফলে এর কোনো শ্রেণিতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য। সংস্কারের সুপারিশের কী হলো: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান এবং সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার ওপর ২০০৮ সালের মার্চে একটি গবেষণা করেছেন। ৬১ পৃষ্ঠার এই গবেষণা প্রতিবেদনটি পিএসসিতে আছে। এই প্রতিবেদনে কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে এক বৈঠকে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের প্রায় সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র এম এম জামান ছিলেন কোটার পক্ষে। তবে কোটার পক্ষে সেদিন জামানের অবস্থান থাকলেও তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থাটি চালু রাখার পক্ষে ছিলেন। তবে ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে কোটার হার ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকার কথা নয়। তবে ওই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। জনসংখ্যার হার অনুযায়ী কোটা ব্যবস্থার বণ্টনঃ পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে পাঁচ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ । বর্তমানে প্রায় ২৫৮ ধরনের কোটা প্রয়োগ হয় যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩০% মেধায় ও ৭০% কোটায় নিয়োগ হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে অফিসার নিয়োগে মেধাই আসল মানদণ্ড। কোটার কোন প্রয়োগ নেই। যা আমাদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সৈনিক পদের নিয়োগে কোটার প্রয়োগ হয়। বিসিএস পরীক্ষায় কোটা প্রয়োগের চিত্রঃ ২৮তম বিসিএসে ৮২১টি, ২৯তম বিসিএসে ৮১৬টি, ৩০তম বিসিএসে ৮০৩টি, ৩১তম বিসিএসে ৮১১টি পদে বিভিন্ন কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার ফলে শূন্য ছিল। কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী ও নারীদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। ওই বিসিএসেও এক হাজার ১৩০টি পদ শূন্য রাখতে হয়। শেষপর্যন্ত ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ ৩২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি। কারণ এক কোটা থেকে আরেক কোটায় নিয়োগ দেয়া যায় না। এছাড়া ৩৩তম বিসিএসে ৫০২টি, ৩৪তম বিসিএসে ৭২৩টি শূন্য রয়েছে। ৩৫ তম বিসিএস এ ৩৩৮ টি, ৩৬ তম বিসিএস এ ৩৬৬ টি কোটার পদ পূরণ হয়নি। প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন দুই থেকে সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি না-ও পেতে পারেন। কারণ, ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন। এই হলো কোটার ম্যাজিক, তাদেরকে নিয়োগ না দিয়ে উপায় নেই। কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পেলে পদগুলো সংরক্ষণ করা হয়। মেধা তালিকায় থেকেও অনেকে চাকরি পায় না। কোটা ব্যবস্থা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থীঃ বাংলাদেশের প্রচলিত বর্তমান কোটা প্রথা সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। ওই বৈষম্য অনেকটা স্পার্টা, উমাইয়া খিলাফত, দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসন, বঙ্গের প্রাচীন সেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনের সঙ্গে তুলনীয়। পাকিস্তানি নব্য ঔপনিবেশিক যুগেও যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা ছিল সব ধরনের সরকারি চাকরিতে উপেক্ষিত। ড. মো. মাহবুবুর রহমানের মতে, `কেবল সিভিল সার্ভিসেই নয়, ফরেন সার্ভিস, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল` (বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯৪৭-৭১, পৃ. ৩৪১)। এই বৈষ্যম্যর বিরুদ্ধেই বাঙালিরা মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা-মেধার ভিত্তিতে সবার জন্যই সরকারি চাকরির দ্বার উন্মুক্ত করাও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যা স্পষ্ট হয়েছে : `...বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি...`। কোটা ব্যবস্থার ফলে এ দেশের মানুষের জন্য সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? বর্তমান প্রচলিত কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরুদ্ধ, কথাটি বিলকুল সত্য। সংবিধানের চেতনাবিরুদ্ধও বটে। সংবিধানের ১৯(১) ও ২৮(১) অনুচ্ছেদে যথাক্রমে বলা হয়েছে যে `সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন` ও ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ যদিও সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের `অনগ্রসর অংশের` জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রচলিত কোটাব্যবস্থায় অনগ্রসর ও অগ্রসর সবাই একটি বিশেষ শ্রেণিভুক্ত হলেই কোটা ভোগ করছে। ফলে এই সুযোগ কুক্ষিগত করতে প্রতিবছর বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। কোটা ব্যবস্থার সংস্কারে কিছু প্রস্তাবনাঃ- মুক্তিযোদ্ধা কোটাঃ বর্তমানে রয়েছে ৩০ শতাংশ। এটাকে কমিয়ে ৭% এ আনতে হবে। কারন গত কয়েকটি বিসিএস সহ সরকারী চাকরির পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৬% এর বেশি পাওয়া যায়নি। বাকি পদগুলো শূণ্য থেকেছে। তাই তাদের বর্তমান সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখে এটা ৭% করলে তারা শতভাগ সুযোগ পাবে। কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে তা সাধারন মেধাবীদের দ্বারা পূরণ করতে হবে। পদ শূণ্য রাখা যাবেনা। পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ভাতা বৃদ্ধি করাসহ সকল ধরনের সহযোগিতা করা হলে তা সব মহলে প্রশংসিত হবে। নাতি -নাতনী কোটাঃ এই ধরনের উদ্ভট কোটা বাতিল করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সুযোগ দেয়ার অন্যতম কারন হলো তারা যেনো বৃদ্ধ বয়সে তাদের পিতামাতার ভরণপোষণের সমস্ত দায়ভার বহন করতে সক্ষম হন। সন্তানেরা সেই সুবিধা পেলে নাতি নাতনী কেনো পাবে? তাদের কোন নৈতিক ও যৌক্তিক অধিকার নেই। মেধাবী প্রজন্মের জন্য নাতি নাতনী কোটা গোদের উপর বিষফোঁড়া। জেলা কোটাঃ বর্তমানের উন্নয়নের দিক দিয়ে কোন জোলা পিছিয়ে নেই। মেধাবীদের মূল্যায়ন হলে তা সারাদেশব্যপী সকল জেলার মানুষের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করবে। তাই জেলা কোটা তুলে দেয়া উচিত। প্রতিবন্ধী কোটাঃ প্রতিবন্ধী কোটা বর্তমানে আছে ১ শতাংশ। যা বৃদ্ধি করে ২ শতাংশ করা হোক। কারন তারা জন্মগতভাবে শারীরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে আছে। তাদের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ করা যায় না। উপজাতি কোটাঃ বর্তমানে আছে ৫ শতাংশ। যা কমিয়ে ১ শতাংশে আনা খুবই যুক্তিযুক্ত। রাষ্ট্রীয় কাজে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদের মেধার পরীক্ষায় অবশ্যই অন্যান্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। এখন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয় আছে। পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় সকল নিয়োগে তারা শতভাগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। নারী কোটাঃ নারীদের জন্য যে ১০% কোটা পদ্ধতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা তাদের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নারীরা আজ পুরুষের চেয়ে নানা দিকে এগিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ স্থানে। সংবিধান অনুযায়ী তারা কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুযোগ পাচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা পরীক্ষায় তাঁরা ছেলেদের টপকে শীর্ষস্থান অধিকার করছেন। নারী শিক্ষায় আমরা আর পিছিয়ে নেই। বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও তাঁদের রয়েছে। অন্যান্য কোটা কমিয়ে দিলে মেধার দ্বারাই নিয়োগের সমান সুযোগ পাবে নারীরা। তাই অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের জন্য বিশেষ কোটার যৌক্তিকতা এখন আর নেই। উত্তর-আধুনিক বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রচলিত কোটা প্রথার সংস্কার সময়ের দাবি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে কোটা প্রদানে আমাদের আপত্তি নেই। তবে, সকল নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি ও প্রতিবন্ধী মিলিয়ে মোট ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনভাবেই যৌক্তিক নয়। কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের বর্তমান মানসিক অবস্থাঃ সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি তারা নিজেদের কে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দেন। কিন্তু তাদের সন্তান বা নাতি নাতনীরা কোটা সুবিধার কারনে চাকরি পেয়ে তা স্বীকার পর্যন্ত করেনা। তাদের নিয়োগ পত্র ও গেজেট না দেখা পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই যে তারা কোটাধারী। এ কেমন আচরণ তাদের, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে তাদের গর্বিত পিতার পরিচয় সবার সামনে দিতে লুকোচুরি করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তাদের অনেকেই মেধায় পেয়েছে বলে দাবী করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তা স্বীকার করতে হীনমন্যতায় ভোগে। যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জা পায় জাতি তাদের দ্বারা কি উপকার লাভ করবে তা বোধগম্য নয়। এটাতো তাদের গর্বের সঙ্গে বলা উচিত, কারন মুক্তিযোদ্ধাদের অকৃত্রিম সাহস ও জীবনের বিনিময়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্যালুট জানাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। তবে তাদের সন্তানদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যাদের পিতামাতা যুদ্ধ করেছিলেন ও জীবন দিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ আবার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড গঠন করে ৩০% কোটা সংরক্ষণের জন্য মাঠে নেমেছে। পরিবার থেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়টা হয়তো তারা আয়ত্ত্ব করতে চায় না বা করেনি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার করে, তাদের নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করলে কেউ অখুশি হবেনা। কিন্তু আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সেই সন্তানদের অবদান টা কি?? এসব যৌক্তিক প্রশ্ন করলে সে আবার হয় জঙ্গি শিবির, দেশপ্রেমীক নয় বলে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু এটা তো বাস্তবসত্য যে দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী হতে গেলে কোন নির্দিষ্ট পরিবার লাগেনা। কারন অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে দেখেছি রাজাকারদের দল করতে। দেশের ৯৯.৮৭ শতাংশ জনগণের দাবী এটা, তাই কোটা সংস্কার চাইলেই দেশপ্রেম কমে না। এসব সস্তা দোষ দিয়ে এই যুগে আর টিকতে পারবেন না, মানুষ আর এসব সস্তা কথার মূল্য দেয় না। টিকতে হলে মেধা দিয়ে টিকে থাকতে হবে, কোন বিশেষ সুযোগের মাধ্যমে নয়। কোটায় কোণঠাসা মেধাবীদের মনের কষ্টঃ সাধারন প্রার্থী অনেকেই ৪/৫ বার বিসিএস ভাইভা দিয়েও ক্যাডার হতে পারেনি, কিন্তু একবার ভাইভা দিয়ে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও কোটায় ক্যাডার হয়ে যায়। তুলনামূলক কম নম্বর পেয়ে কোটার কারনে এমন সুযোগ পেয়ে নিয়োগ পাওয়ার নজীর স্থাপন হয় তাদের সামনে। বিষয়টা মেধাবীদের জন্য খুবই কষ্টের ও হতাশার। এভাবে নিয়মিত বঞ্চিত হয়ে যে চাকরি তারা পায় তাতে তার হয়তো জীবিকার চাহিদা মেটে কিন্তু সেই বৈষম্যের কারণে বাদ পরার বিষয়টা সারাজীবন ভুলতে পারেনা। ফলে চাকরি প্রাপ্তিতে পরিস্কার বৈষম্যর শিকার হয়ে তার বর্তমান দায়িত্ব পালনে অনেকটা অনীহা দেখায়। কিন্তু সুযোগের সমতা থাকার পর যদি তারা পছন্দমত চাকরি না পেতো তাহলে তারা রাষ্ট্রকে দোষারোপ করতে পারতোনা, নিজের মেধার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারতো। তখন চাকরি ও ব্যক্তি জীবনে সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে। সুযোগ না পাওয়ার চাপা ক্ষোভে সারাজীবন পুড়বে না। তাই প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য কোটার সংস্কার আবশ্যক।। এটা সকল মেধাবীর প্রাণের দাবী। প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগণের দাবীকে মূল্যায়ন করার এখনি সঠিক সময়। বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই হোক সকল বৈষম্যের বিলুপ্তিঃ জাতির জনক বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার ছেলে চাই’। এই লক্ষ কোটি মেধাবী সোনার ছেলের দ্বারা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রয়োজন সব সেক্টরে মেধাবীদের মূল্যায়ন। আগে মেধাবীদের বৈষম্যহীন সুযোগের পথকে প্রসারিত করতে হবে, তারপর আসবে সোনার বাংলা। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের বেশি সুযোগ দিয়ে সর্বোচ্চ মেধাবীদের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রাষ্ট্রীয় উন্নতিকে ত্বরান্বিত করা যায় না। এতে হতাশায় নিমগ্ন হয়ে তরুণরা বিভ্রান্ত হয়ে পরবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। এই ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে মেধাবী তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নাই। আশাকরি, জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই কোটা সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। কারন সকল বৈষম্য দূরীকরণই ছিল জাতির পিতার মূল লক্ষ্য। সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বগুণেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের মত জনবান্ধব পদক্ষেপ একমাত্র তিনিই নিতে পারেন। জনগণের মনের ভাষা বঙ্গবন্ধু কন্যাই বোঝেন। আর একটি সন্তানকেও যেনো কোটা পদ্ধতির শিকার না হতে হয় মানবতার মা হিসেবে এটা আপনার একান্ত দায়িত্ব। তাছাড়া ভোটের রাজনীতির হিসাবেও তরুণদের প্রাধান্য না দিয়ে উপায় নেই। কারন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর হবে দেশের তরুণ ভোটাররা। নবম সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি তরুণ ভোটারের হাতেই আগামী দিনের ক্ষমতার চাবি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। মোট জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ কোটার সংস্কার চায়। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে একটা কথাই স্পষ্ট যে, আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণরাই মূল ভূমিকা পালন করবে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব কোটা সংস্কার করে মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সকল ক্ষেত্রে মেধাবীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহন নিশ্চিত করাই হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আগামীর উন্নত বাংলাদেশে মেধাবীরাই থাকবে চালকের আসনে, মেধা দিয়েই জয় করবে বিশ্বসেরা স্বীকৃতি। কোটার সংস্কার হোক, মেধা মুক্তি পাক। এসি/

নিরন্তর কলম সাধনা বয়ে চলুক

ঢিলেঢালা সাদা পাজামা আর লম্বা পাঞ্জাবি পরে রোজ সকালে ক্যাম্পাসের সবুজ শ্যামল ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে চলা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। অসাধারণ হয়েও অতি সাধারণ জীবন যাপন মানুষটির। রাগ-গোস্বা-আভিজাত্য ছুঁতে পারে নি কখনোই। তার নেই কোনো অতৃপ্তিও। তার ধ্যানে–জ্ঞানে চিন্তায় শুধুই শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা। তার লেখা ছাড়া আজও বড় কোনো কাগজের বিশেষ সংখ্যা বের হয় না। কয়েক যুগ ধরে ধরে তিনি বিবেচিত হচ্ছেন সাহিত্য ও জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবেই। কারো কারো মতে জ্ঞানের সাগর তিনি, যেখানে যে কেউ ডুব দিয়ে মণি-মুক্তোর খোঁজ পেয়ে থাকেন। জ্ঞানের দ্যুতি বিলানোয় যেন তার আজন্ম ধ্যানজ্ঞান।হ্যাঁ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যাঁরের কথাই বলছি। নির্মোহ এই আলোকিত মানুষটির আজ ৮২ তম জন্মদিন। আজও তিনি নিজ কর্মে নিষ্ঠাবান, একান্ত ব্রতী; আজও তার কলম সাধনা থামেনি। শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিক্ষক। আপনার নিরন্তর কলম সাধনা বয়ে চলুক।সাধক, মনীষী, বাংলার অসাম্প্রদায়িক মুক্তচিন্তার অন্যতম অগ্রদূত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, আপনি অন্তত শতায়ু হোন। দেশ-জাতির জ্ঞান ও বিবেচনায় আরও কিছু পালক যোগ করে যান, জন্মদিনে এটাই আমাদের কামনা। আমাদের মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী পাঁচ দশকে এ দেশের মানুষের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম অধ্যাপক; একাধারে অতুলনীয় গবেষক, চিন্তক ও অসামান্য লেখক। তিনি শিক্ষাবিদ, কিন্তু তার শিক্ষার অহঙ্কার নেই। তিনি বিনয়ী, নিরহঙ্কারী। তার জীবনযাপন সাদাসিধে, অথচ প্রাণপ্রাচুর্যে টইটুম্বুর। অপরিসীম মানসিক ধৈর্যশক্তি এবং বয়স ও শ্রেণি-পেশার পার্থক্য ভুলে সবার সঙ্গে তার মিশে যাওয়ার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। তিনি লিখে চলেছেন অবিরাম। তার প্রচ্ছদ লেখা ছাড়া কাগজের বিশেষ কোনো সংখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন যেন খাপছাড়া মনে হয়। তিনি মুক্তবুদ্ধি, সুরুচি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে নিঃশঙ্কচিত্ত। কয়েক প্রজন্মের শিক্ষক হিসেবে জাতির অন্যতম অভিভাবকও তিনি। কয়েক যুগ ধরে যেকোনো সংকটে জাতিকে দিশা দিয়ে চলেছেন ক্ষুরধার লেখনিতে, বক্তৃতায়। তিনি বাচন অত্যন্ত সরল ও সাবলীল তবে গভীর চিন্তার খোরাক থাকে তাতে। থাকে দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি চিন্তা। নির্মোহ মানুষটি নিজের জন্য কিছুই করেননি। সারাজীবন জ্ঞান,বুদ্ধি, সাধনা বিলিয়েছেন অকাতরে। তাকে নিয়েই থিসিস হতে পারে। গবেষণা হতে পারে। আনিসুজ্জামান স্যারের সাধারণ জীবন যাপন ও চিন্তার গভীরতা নিয়ে তার বন্ধু কবি শামসুর রহমান লিখেছেন, `যখন পাঞ্জাবি আর পাজামা চাপিয়ে শরীরে, সকালে কিংবা বিকেলে একলা হেঁটে যান- প্রায় প্রতিদিন দীর্ঘকায় সবুজ গাছের তলা দিয়ে তাঁকে বাস্তবিক সাধারণ মনে হয়। ...এখনও সিদ্ধির পরে, খ্যাতির শিখরে পদার্পণ করেও সাধনা তাঁর থামেনি, বরং মাঝে মাঝে এখনও গভীর রাতে ঘুমন্ত জীবনসঙ্গিনীর পাশে শুয়ে অথবা টেবিলে ঝুঁকে থিসিসের ভাবনায় কাটান প্রহর।` এই লেখায় আনিসুজ্জামান স্যারের জীবন নিয়ে সঠিক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। ১৯৩৭ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা এটিএম মোয়াজ্জেম ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা ছিলেন গৃহিণী। দু`জনই ছিলেন সাহিত্যমনস্ক। পরিবারের অন্য সদস্যরাও  সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৫২ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে `রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?` শিরোনামের একটি পুস্তিকা রচনা করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওপর এটিই ছিল প্রথম পুস্তিকা। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এছাড়া ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তৃতা লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে জাতিকে বুদ্ধি পরামর্শ ও লেখনি দিয়ে দিশা দিয়েছেন। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারের গৌরব নিয়ে। ১৯৫৯ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এর মাঝে এবং ১৯৬৫ সালে `উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস :ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল` বিষয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর নেন। বর্তমানে তিনি প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে পাঠদান করাচ্ছেন। এখন মাঝে মধ্যেই মলচত্বরের সবুজ ঘাসে তার ধীর হেটে চলা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জন্মদিন উপলক্ষে এই প্রাজ্ঞজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে একইরকম কর্মব্যস্তই পাওয়া গেল। ৮১ বছরের জীবন পেরিয়েও তিনি যেন এখনও একইরকম প্রাণচঞ্চল। আপনার এই নির্মাহ জীবন ও প্রাণপ্রাচুর্যনতা থাকুক চিরকাল। শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংগঠনিক কাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।১৯৫৬ সালে নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ১৯৫৮ সালে স্ট্যানলি ম্যারন রচনা পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে দাউদ পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে অলক্ত পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, ১৯৯০ সালে বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট, ১৯৯৩ সালে দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক, ১৯৯৪ সালে অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার, ২০১১ সালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণপদক, ২০১২ সালে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ও ২০১৪ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কালজয়ী এই বিজ্ঞজন। এ ছাড়াও ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করে।অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এক জীবনের এত অর্জন আর কারো পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব হবে কি না বলা মুশকিল। স্যার আপনার নিরন্তর পথচলা অব্যাহত থাকুক। জ্ঞানের দ্যুতি বিলানোর সাধনা বহমান থাকুক অনন্তকাল। জন্মদিনের এই মুহূর্ত জীবনে আসুক আরও অন্তত কয়েক যুগ।   / এআর /

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমকালীন রাজনীতি

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বজনদের অভিযোগ সবাই (বিশেষত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ৩০ লক্ষ শহীদের সঙ্গে, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে এবং সর্বোপরি সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। শুধু ডিসেম্বর কিংবা মার্চ  এলেই স্মরণ করা হয় জাতির ওই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আবার কখনও কখনও গানের পঙ্কক্তি ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না’ এ গানের মধ্যেই আটকে ফেলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। সত্যি বলতে কি খুব কম লোকই তাঁদের মনে রেখেছেন। বাস্তবে তাঁরা বেঁছে আছেন কেবল তাঁদের স্বজনদের মধ্যে। লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনতে স্বাধীনতার জন্য যারা সেদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন-তাঁদের কেউ শহীদ হয়েছেন, যুদ্ধাহত হয়েছেন, কেউবা পঙ্গু হয়েছেন আবার অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন। শুধু তাই নয় রক্তেভেজা পতাকা সমুন্নত রাখতে গিয়ে অনেকে হয়েছেন সহায়হীন-সম্বলহীন। আবার এদের কেউ জীবিত আছেন এক বুক দুঃখ নিয়ে, কষ্ট নিয়ে। একে ছোট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে সেদিন দেশপাগল মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যখন লড়াই করছিল, তখন অনেকেই ঘরে বসে এয়ার কন্ডিশনের (এসি- রূপক অর্থে) বাতাসে আরামে ছিল। অথচ তাঁরাই আজ বহাল তবিয়তে রাজার হালে আছেন। বিপরীতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা এত বড় ভূমিকা রাখলো, তারা কি পেল? তাদের সম্মান চাওয়া কি অন্যায় ? দেশ ও দেশের মানুষ হতে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কি তাদের ন্যায্য অধিকার নয়? যদি অন্যায় না হয়ে থাকে, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেঅন্যদের মেলানো ঠিক হবে না। মুক্তিযোদ্ধারাতো বেশি কিছু চায়নি। তাঁরা কেবল চেয়েছে একটু সম্মান। কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে একটু সম্মান কি আমরা তাদের দিতে পারি না! কিন্তু আমরা কি দিতে পারছি? হয়তো পারছি না। তবে সুযোগ সুবিধা কি থেমে আছে। সেটা আজ ভোগ করছে ওইসব এসির বাতাস খাওয়া, সোফায় পা দোলানো আরামপ্রিয় ব্যক্তিরা। মুক্তিযোদ্ধাদের যদি যথাযথ সম্মান দিতে হয় তাহলে ওইসব ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। এদিকে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, অধিকাংশ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা (শহীদ ও যুদ্ধাহত সহ) সুযোগের চেয়ে বঞ্চনাই বেশি পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান- এ কথা আক্ষরিক অর্থেই কেবল সত্য; বাস্তবে নয়। এ কথা সকলকে মনে রাখতে হবে, কখনোই মুক্তি বিনামূল্যে মেলেনা- বিশেষত: বাংলাদেশের সেটাতো নয়-ই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কারো ইচ্ছায় সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগেও সৃষ্ট নয়। এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র মানুষের নিতান্ত প্রয়োজনেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। আর এর ফলশ্রæতিতে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, অনেক মা-বোন নির্যাতিত-ধর্ষিত হয়েছেন। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধা বা তাঁদের স্বজনদের আমরা কতটুকু মূল্যায়ণ করতে পেরেছি। কথায় আছে, ছেলে জন্মের পর বাবা-মার মুখখানা দেখেন। আর এর মাধ্যমে ছেলের কল্যাণ হয়। কিন্তু আমি-আমরা কি দেখেছি বাবার মুখ? দেখেনি। জন্মের আগেই এতিম হয়ে গেছি আমরা। শুধু আমি নয়, আমার মতো লাখ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছি, বাবার মুখ না দেখেই। বাবার মুখ দেখেনি তাতে কি? আমরাতো লাল সবুজে মোড়া একটি পতাকা দেখেছি। চেতনা হলো মানুষের মনের গভীরে লালিত সেই আদর্শ, যা কোন ব্যক্তিকে সকল কাজে অনুপ্রেরণা যোগায়। সঙ্গত কারণেই বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশিদের মধ্যে সবক্ষেত্রে (জাতীয়ভাবে) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা আমার বাবার মতো ৩০ লক্ষ শহীদের জীবন দিয়ে পাওয়া এই দেশে অনেকেই আজ আমাদের ওপর মাতব্বরি ফলান, জমিদারি মনোভাব দেখান- যা সত্যিই বড় কষ্টের, অবমাননার ও অমর্যাদার। এরই মধ্যে লক্ষ্য করছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের মধ্যে বৈরিতার ইতিহাস অতীতে না হলেও এখন তীব্র, দীর্ঘ এবং গভীর। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গোড়াটি নিহিত রয়েছে ১৯৭১-এর ঘটনায়। হতাশার কথা, বাংলাদেশ বিরোধী অনুভূতি এখনো দেশের একটি অংশের গভীরে প্রোত্থিত। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বিরোধীদের সম্পর্কে আধুনিক কালের বৈরীতা শুরু হয় ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর থেকে। সঙ্গত কারণে অনেক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রান্তিকাল দেখা গেছে। এর কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্র করে সকল কার্যক্রমে এক ধরণের নৈরাজ্য বিরাজ করে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের, সুবিধাভোগী অমুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে অনেক সময় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোনঠাসা হয়ে ছিলেন-আছেন। বস্তুত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা পর থেকেই স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্টিত হয়। এরপর গোটা একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শুনে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা তৈরি নিয়েও রাজনীতি কম হয়নি। অনেক মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হারিয়ে গেছেন। তাই, মুক্তিযুদ্ধের বীরদের তালিকা নিয়ে অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ হোক। লক্ষ-লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজও তাদের চাওয়া আমরা পুরোপুরি পূরণ করতে পারিনি। বরং স্বাধীনতার মূল্যবোধ এ দেশে ভূলুন্ঠিত হয়েছে। এ সুযোগে দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা (অধুনা বাংলাদেশ বিরোধীরা) যে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিবে, তা তারা নিশ্চিত করেছে। তাঁরা (স্বাধীনতাবিরোধীরা) অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে তাঁদের শেকড় সমাজের এক শ্রেনীর মানুষের হৃদয়ে একেবারে ঢুকে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের জন্য ভয়াল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে কত লোক আছে, তার হিসাব করতে গেলে দেখি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীর সংখ্যা এখনো নেয়াহেত কম নয়। এর অন্যতম কারণ, একাত্তরের জঘণ্যতম গণহত্যার কাহিনী হৃদয়ে ধারণ না করা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস প্রচার ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ বিরোধী অব্যাহত ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। তবে সব যুদ্ধাপরাধীর কি দণ্ড হয়েছে? হয়নি। তাই দেশের সব ইউনিয়ন- উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গোয়েন্দাদের দিয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের চিহিৃতকরণ, তাঁদের গণকবর শনাক্তকরণ, শহীদদের স্মৃতি ও নির্যাতনের স্মারকগুলো চিহিৃতকরণসহ প্রকৃত যোদ্ধাপরাধীদেরও শনাক্ত করতে হবে। তাঁদের বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। প্রকত মুক্তিযোদ্ধাসহ (শহীদ ও যুদ্ধাহতসহ) সাধারণ জনগণের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না ঘটাতে পারলে জনগণ শুধু রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের জিকিরে আর ভুলবে বলে মনে হয় না। কারণ বিগত ৪৬ বছরে দেশে সংগঠিত সেই মহানাটক আজও মঞ্চায়িত হচ্ছে। জনগণের চাই-অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য চাহিদা মেটানোর মত সক্ষমতা। দেশ উন্নত হচ্ছে, দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদা কি পূরণ করতে পারছে? এরই মধ্যে অনেকেই মনে করছেন, দেশে আবারও রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। তাদের সেই সক্ষমতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সাধারণ জনগনের জন্য নতুন সমাজ গঠনোপযোগী যে সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার ছিল-তা নেয়া হয়নি ( যদিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার কিছু-কিছু কাজ করেছে)।। অন্যদিকে দেশে অনেক আগে থেকে চলে আসছে- অব্যাহত সন্ত্রাস, লুটপাট ইত্যাদি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নতো এই লুটপাট ছিলনা। দেশ স্বাধীন হলে জনগণ শান্তিতে থাকবে, এই আশায়, কেবল এই আশায় অনেকে নিজের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে দেশে পরিপূর্ণ শান্তি আসেনি। এ দেশের জনগণের দাবি খুব বেশি নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ইস্যুতে লক্ষ্য বদলে ফেলেছে (সব রাজনীতিবিদ নয়)। সংবিধানে সকলের সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও-বাস্তবে তার বাস্তবায়ন পরিপূর্ণভাবে হচ্ছেনা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশই দুরবস্থার দিকে যাচ্ছে। তবে এত কিছুর পরেও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে আমাদের দেশে। আমার বিশ্বাষ জনগণ পরিবর্তন আনবে। সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতির আসল সমস্যা নিহিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণতা ও ক্ষমতালিপ্সার মধ্যে। এ কারণে যে আদর্শে বলীয়ান হয়ে আমরা চরম ক্ষমতাধর ঔপনিবেশিক শক্তিকে ভেঙ্গে খানখান করে দিয়েছিলাম, সে আদর্শ, ঐক্য তারা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। অনেকেই আজ বলে থাকে, বর্তমানে রাজনীতি এক জঘন্য কৌশল। তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গঠন করতে হলে, দরকার রাজনৈতিক ঐক্যের। তাই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং আলোচনার ভিত্তিতে করতে হবে। আগেকার দিনের মত গণ বা সেনা অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করা যাবে না। কিন্তু দেশের বড় দুই দলের মধ্যে ক্ষমতা দখলের যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা সুখকর নয়। তাই দেশের জনগণের স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এখনই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে সাবধান হতে হবে। তাহলেই সুখী- সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাব আমরা-নচেৎ নয়। ইতিহাস বলে, ভালো কাজ না করলে কোনো কূটচাল, প্ল্যান-পায়তারাই কাজে লাগেনা। এগুলো বাদ দিয়ে জনসেবা করুন সবাই। রাজনীতি করতে হলে-এটা লাগবেই। অন্য কোন কিছুই কাজে দিবে না। লেখকএ.টি.এম. মোফাজ্জেল হোসেন (স্বাধীন)লেখক-মানবাধিকার কর্মী ও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

ভালোবাসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই

আমরা ভালোবাসি আমাদের মা-বাবাকে। ভালোবাসি প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে। সমানহারে ভালোবাসি পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে। এর বাহিরেও আত্মীয়তা এবং নিবিড় সম্পর্কও রয়েছে। তাছাড়া কোনো না কোনোভাবে প্রতিনিয়ত ভালো লাগা, ভালোবাসার মানুষগুলোর সাথে ভাব বিনিময় এবং মান-অভিমান, ভুল বুঝাবুঝি, অবসান, সাথে পরম্পরা বন্ধন সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছি। বর্ষপঞ্জির নির্দিষ্ট একদিন ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে জানান দিতে হবে। পাশাপাশি উপঢৌকন, বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়ে বাহিরে ঘুরাফেরা এবং পকেট কেটে নামজাদা হোটেল রেস্টুরেন্টে বসে কষ্টার্জিত অর্থব্যয়ে দামী খাবার খেতে হবে। নইলে ভালোবাসা দিবস মূল্যহীন। এমন হতে হবে কেন? তার মানে ৩৬৪ দিন অবহেলা অনাদরে ছিল। নতুন পোশাক পরিচ্ছদ না দিয়ে নোংরা মলাট কাপড়চোপড় দিয়ে ঘরের ভেতর বন্দি রাখা হয়েছিল। ভালো খাবার খেতে না দিয়ে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ ঢলা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছে। এমন ঘটনা কি ঘটেছে? মোটেও না। অপ্রিয় হলেও সত্য এসব বড্ড বাড়াবাড়ি। হালের ফ্যাশন, নোংরা মানসিকতার পরিচায়ক। শহরবাসী উৎসব করে, বিভিন্ন দিবস উৎযাপন করে। পালনকারীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বরং দিনদিন মতাবলম্বীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে বয়সে তরুণ তরুণীর আধিক্য বেশি। বিবাহিত এবং জটিল সম্পর্কে যারা জড়িয়ে আছেন তাদের বেশিরভাগ অন্তরাল অথবা অন্দরমহলে নয় বরং সগৌরবে সমান তালে নিজেদের উজার করে দিচ্ছেন। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে প্রতিনিয়ত উদ্ভট দিবস পালনের নামে ব্যভিচার বেড়ে চলছে। যোগ আছে হিন্দি সিরিয়ালের নায়ক নায়িকাদের অনুকরণ। হরহামেশা দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি জীবন ও পারিবারিক জীবন বন্ধনের উপর প্রভাব ফেলছে হিন্দি ও বাংলা সিরিয়াল। সাথে বিকৃত হচ্ছে মায়ের ভাষা। হিন্দি শব্দ ব্যবহার করে প্রিয়জনকে সম্বোধন, ভিনদেশি ভাষা অবিরাম বলতে পারলে সবার সামনে বিশেষ গুণের-গুণী বনে যান। যারা শেকড় ভুলে ভিনদেশি ভাষা ব্যবহার, চলনবলন অনুকরণ ও পোশাক আশাক ধারণ করে অহংবোধ করেন তাঁরা কেমন মানুষ? ভাবতে অবাক হই। সামনে আর কি বাকি আছে। বাকিগুলো পূর্ণতা পেলে সেদিন গুলো কেমন যাবে। মাবুদ ভালো জানেন। ক্রমে ক্রমে ভুলতে বসছি নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা, সম্মান, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। বর্তমান দিনকাল, অভ্যাস সবকিছু কেমন জানি অস্থিরতায় ভরপুর। অস্থিরবুদ্ধি, উদ্ভট চিন্তাজগত, উগ্র চলাফেরা, উচ্চস্বরে বাক্য বিনিময়, বেপর্দা, সেলফি, চ্যাটিং, ভিডিও কথোপকথন, লাইভ আড্ডা, চ্যাটাংচ্যাটাং কথাবার্তা এসব কিছু গ্রাস করছে সোনালি অতীত ও বর্তমান প্রজন্মকে। ভালোবাসা দিবসের নামে বর্ণিল সাজ, রগচটা পোশাক, স্পর্শের নামে নগ্নতা, আড়ালে নয় সবার নজরে আসে এমন স্থানে জড়াজড়ি, চুম্বন, কুরুচিপূর্ণ আলিঙ্গন। চলার পথ, বেড়ানোর রাস্তা, উম্মুক্ত পরিবেশ সবি যেন নির্লজ্জদের দখলে। চোখ ন্যুয়ে আসে, মুহুর্তে বিবেক ধর্ষিত হয়। ভালোবাসার অপর নাম খুব করে জড়িয়ে ধরা নয়। ভালোবাসা মানে হৃদয়ের বন্ধন, আত্মার টান, সমান শ্রদ্ধা, অধিকার নিয়ে দায়িত্বপালন। আপনার সন্তানসহ নিকটতম স্বজনের দিকে নজর দিন। কোথায় যাচ্ছে, কি করছে। নচেৎ আপনার পরিবারের সম্মানহানি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আসুন সুস্থ চিন্তা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে সত্য সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করি। লেখক: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

ভালোবাসা শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকার নয়

ভালোবাসার সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। ভালোবাসার পরিসর মহাসাগরকে হার মানায়। ভালোবাসা সর্বএ বিরাজমান, ভালোবাসা অসীম,অন্তহীন, প্রবাহমান। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, বুড়োবুড়ির মধ্যেও গভীর ভালোবাসাবাসি থাকে। ভালোবাসা থাকে স্বামী- স্ত্রীতে, ভাইবোন ও সহপাঠীর মধ্যে।শিক্ষক শিক্ষার্থীও সহকর্মীদের মধ্যেও পারষ্পরিক ভালোবাসার বন্ধন গড়ে ওঠে। পশুপাখি,গাছপালা ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মায়। সন্তান-সন্ততির প্রতি মা বাবার অকৃএিম ভালোবাসাতো সর্বজনবিদিত। তেমনি সন্তানেরও মা বাবার প্রতি। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। পারষ্পরিক বোঝাপড়া ও অগাধ বিশ্বাসের মধ্যে ভালোবাসার জন্য।ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার উদ্ভব। এ ভালোবাসা শুধু মানুষ নয়, বিশ্বের যেকোন প্রাণির মধ্যে আছে।ভালোবাসা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।ভালোবাসা হচ্ছে ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশ।ভালোবাসাকে দিবসকেন্দ্রিক করা মেটেই উচিত নয়। ভালোবাসা একটি সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন বিষয়। ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। ভালোবাসা মানুষের পাশাপাশি জগতের সব প্রাণির মধ্যে প্রচন্ড আবেগ- অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভালোবাসা মানুষকে আত্নবিশ্বাসী ও আত্নত্যাগী হিসেবে গড়ে তোলে। ভালোবাসার মানুষের জন্যে মানুষ তাই যেকোন কিছু করতে পারে,জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।ভালোবাসার মানুষকে পেতে বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ববিগ্রহসহ বহু কামিনী আছে। ভালোবাসার মানুষ বিশেষ করে স্নেহময়ী স্ত্রী মমতাজ মহলের জন্যে মোঘল সম্রাট শাহজাহান পৃথিবীর সপ্তম আশ্চার্যের এক দৃষ্টিনন্দন ইমারত নির্মাণ করেছিলেন- যা আগ্রার তাজমহল হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত।তবে ভালোবাসা এক তরফা কোন বিষয় নয়,বিশেষ কারণেই দু`জনের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা তৈরি হতে পারে।মানব শিশুর প্রতি যেকোন মানুষের সহজাত স্নেহ - ভালোবাসা প্রকাশ পায়।এটি অবশ্য মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।মানুষ জন্মগত ভাবে স্বার্থপর। কোন না কোন স্বার্থের কারণে মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক বন্ধন তৈরি হয়। স্বার্থের রকমফের থাকতে পারে।আত্নমানবতার সেবার পেছনেও এক ধরণের স্বার্থ লুকায়িত থাকে। সমাজসেবার পেছনেও কাজ করে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য।যেকোন কাজের পেছনে কোন না কোন স্বার্থ থাকে।তা ব্যক্তিগত হোক কিংবা জনস্বার্থ। ভালোবাসার পেছনেও এক ধরণের স্বার্থ থাকে।অবস্থানগত কারণে ভালোবাসার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।মন্ত্রীপাড়ার ভালোবাসা আর বস্তির মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ একরকম নয়।কালের বিবর্তনে ভালোবাসার ধরনও পাল্টে যায়। সেকালের রাধিকারা কৃষ্ণের বাঁশির সুর শোনেই ঘর থেকে বের হয়ে আসতো।কিন্তু এ যুগের রাধিকারা দামি গাড়িরা হর্ণ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না।সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসায়ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে বৈষম্য দেখা যায়।যে সন্তান বেকার তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা একরকম অন্যদিকে যে সন্তান ভালো আয় উপার্জন করে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের প্রতি ভালোবাসা ভিন্ন রকম হয়।পারষ্পরিক চাহিদা পূরণের ওপর ভালোবাসার মাএা ওঠানামা করে। প্রেম ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও আন্তরিকতা সবই ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের ওপর নির্ভরশীল। চাহিদারও আবার ভিন্নতা আছে।দুবেলা দুমুটো খাওয়ার চাহিদা আবার দামী মোটরগাড়ির কেনার চাহিদা।চাহিদার একটু হেরফের হলেই ভালোবাসায় ছন্দপতন হয়।অভাবের সংসারে তো ভালোবাসার অস্তিত্ব অবশ্লিষ্ট থাকে না। আমার এক প্রিয় কলেজ শিক্ষক প্রয়াত হিরণায় চক্রবর্তীর ভালোবাসা সম্পর্কিত একটি কথা আমার আজও মনে আছে।তা হচ্ছে " অভাব যখন দুয়ারে এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।" পরিশেষে বলতে চাই,প্রেম ভালোবাসা প্রকাশ বিশেষ দিবস কেন্দ্রিক হওয়া কোনভাবেই বাঞ্চনীয় নয়। ভালোবাসা শুধু প্রমিক প্রেমিকা আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে নয় জগতের সকল প্রাণির মধ্যে পারষ্পরিক ভালোবাসা সঞ্চারিত হতে হবে। প্রতিটি জীবকে আমাদের আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে হবে।তাইতো বলা হয়, `জীবে দয়া করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর`।   লেখকঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক

হায়রে বচন!

মেয়েরা মেয়েদের শত্রু, মেয়েরা কুটনী, মেয়েরা স্বার্থপর, ছলনাময়ী, ঝগড়াটে, রহস্যময়ী, মেয়েদের পেটে কথা থাকে না, মাথা মোটা। মেয়েরা হিংসুটে, মেয়েদের মগজ হালকা, এরা ছিচকাঁদুনে, অন্যের ভালো দেখতে পারে না, এরা পরের বাড়ির জন্য, অংক পারে না, মেয়ে মানুষ বোঝা বড় দায়, ও’তো মেয়ে, পারবে না ইত্যাদি নানা মন্তব্য গল্পে আড্ডায়, আলোচনায় মুখরোচকভাবে বলা হয় মেয়েদের সর্ম্পকে। এসব কথা বলে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন অনেকেই। সেই ছোটবেলা থেকেই পুরুষ শাসিত সমাজে এসব মন্তব্য শুনতে শুনতে মেয়েরা বড় হয়। এসব কথা শোনে সে পুরুষের কাছ থেকে, এসব কথা শোনে সে মেয়েদের কাছ থেকেও। তার শিশু মনে  দাগ কাটে কথাগুলো। কষ্ট পায় সে। কখনো প্রতিবাদ করে। কখনো কিছু বলতে পারেনা।কাঁদলেই যে তাকে বলা হবে ছিচকাঁদুনে। তখন অবচেতন মনেই এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে সে। নিজেকে সরিয়ে নেয়, গুটিয়ে নেয় সবকিছু থেকে। বাড়ির ছেলেদের চাইতে মেয়েটা মেধাবী হলেও সে তখন ভাবতে থাকে আসলেও সে বুঝি কিছু পারেনা। তার দ্বারা কিছু হবে না । হীনমনতায় তার জগত ক্রমশ ছোট হয়ে যায়। ছোট বেলাতেই কথার ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় সে। যা চলতে থাকে সারাজীবন ভর।  যারা কথাগুলো বলেন তারা ভাবেন না কি বিষ ছড়াচ্ছেন তারা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তারা ভাবতেও পারেন না  তাদের ছুড়ে দেওয়া কথাগুলো কিভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ছে নেতিবাচক অর্থে।সেই আদিম যুগে পুরুষ নারী সমান তালে পা ফেলেছে। তারা বনে বাদারে এক সাথে শিকার করেছে। তখন বৈষম্য ছিলো না পুরুষ নারীতে।  এক সময় পুরুষ তার স্বার্থে পেশী শক্তির বড়াই করে নারীকে ঘরে বন্দী করে ফেলে। ছলনাময়ী, রহসময়ী মাথায় মগজ নাই ইতাদি নানা বিশেষনে ভুষিত করে তাকে দুর্বল করে রাখে। তার মানসিক শক্তিকে নষ্ট করে দেয়। ঘরই তার কাছে নিরাপদ আশয় বলে নির্ধারন করে দেয়া হয়। ফলে বাইরের আলো থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে শুরু করে মেয়েরা। ধীরে ধীরে তার জগত হয়ে পরে সংকুচিত। আর তখনই মেয়েদের হালকা করে দেখতে শুরু করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। হেয় করে বলতে শুরু করে তারা নানা কথা। মেয়েরা ছলনাময়ী, তাদের মাথা মোটা, তারা আবিস্কার করতে পারে না, বিজ্ঞান বোঝে না, অংক পারেনা নানা কথা বলা হয় তাদের সর্ম্পকে। ছেলেরা বংশের বাতি, মেয়েরা পরের বাড়ির জন্য। ছেলেবেলাতেই এসব কথা শোনে সে। তার মন ভেঙে যায়। তার কষ্ট দেখে শুধু রাতের আকাশ। পেটে গোপন কথা ছেলে মেয়ে অনেকেই হয়তো রাখতে পারেন না কিন্তু দোষ হয় শুধু মেয়েদের। তারা হালকা  পেটে কথা রাখতে পারেনা। এভাবে নানা ভাবে সমাজ তাকে হেয় করে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।সময় পাল্টায়। কিছু কিছু মেয়ে নিয়ম ভাঙে তারা আকাশে ওড়ে, ছুটে বেড়ায় দশ দিগন্ত। তবুও আজও পাল্টায় না মানসিকতা। যুগে যুগে হেয় করে বলা বচনগুলো চলতে থাকে মুখে মুখে। সিনেমা নাটক গল্পে হালকা সস্তা করে দেখানো হয় নারীদের। যেনবা মেয়ে মানেই কুটনী, স্বার্থপর, ঝগড়াটে, হিংসুটে। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের দেখানো হয় লোভনীয় ভাবে। পন্য হিসেবে। কিন্তু কেন এসব বলা ? এ কেমন মানসিকতা। যুগ যুগ ধরে একজন মেয়েকে শেখানো হয় অনের তৃপ্তিই তোমার  তৃপ্তি। ক্ষুধা লাগলেও তুমি না খেয়ে থাকবে । আগে খাবে বাড়ির ছেলেরা। বেহায়া মেয়েরা আগে খায়। বাসী খাবার নষ্ট করবে না। অকল্যাণ হয়। মায়ের বলে দেয়া কথাগুলো  শিখে নেয় মেয়ে। অথচ এই মা যদি পড়াশুনা করতেন তাহলে তার শেখানোটা হতো অনরকম ভাবে। তিনি বুঝাতে পারতেন পচা বাসী অস্বাস্থকর খাবার খাওয়া ঠিক না। ঠিক সময়ে খেতে হয় প্রতিটা মানুষকেই । এই মা কে শিখতে দেয়নি তার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। কখনো কি পুরষরা জানতে চেয়েছেন তার স্ত্রীর কি ভালো লাগে ? সে খেয়েছে কিনা? তার সখ কি? সংসারের কোনো কারণে যদি বউ আর শাশুরির ঝগড়া লাগে বলা হয় মেয়েরা মেয়েদের শত্রু। একবারও ভাবে না তারা যে কোনো কারও সঙ্গে মতের মিল অমিল হতেই পারে। যে মা সারাজীবন তার রান্নাঘরকে তার সামাজ্য ভেবে জীবন পার করেছেন । তাকে আকড়ে ধরে একটু ক্ষমতা পেতে চেয়েছেন । তিনি হয়তো তা হারানোর ভয়ে অন্য আচরন করেছেন। যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে থাকার ফলে হয়তোবা সে তখন আর জায়গা ছাড়তে চায়না। তখন তার ক্ষুদ্রতা, সংর্কীনতা চোখে পরে সবার। কিনতু তিনি যদি পড়াশোনা করতেন, চাকরী করতেন, বিশ^ ঘুরে দেখতেন তাহলে বুঝতেন এসব কত তুচছ বাপার কিনতু তাকে তো বুঝতে দেয়নি  সমাজ। রান্না ঘরেই কেটে যায় তার সারাজীবন। তথ্যের খোলা জানালা তাদের কাছে থাকে বন্ধ।  ফলে ভাবনার জায়গায় তারা হয়তো ছিলেন পিছিয়ে। সে বিষয়ে না যেয়ে সমাজ তাকে উপহাস করে ওতো মেয়ে মানুষ, ও পারবে না জ্ঞান বিজ্ঞান ওর জন্য নয়। যা শুনে মেয়েটি গুটিয়ে যায়। কারন তার পাশে তাকে সাহস দেবার তার আত্মবিশবাস বাড়িয়ে দেবার কেউ নেই। তার কান্না শোনে না বাড়ির কেউ। আমাদের দাদী নানী মায়েরা যদি জ্ঞানের আলোয় আরও হাটতে পারতেন পথ। আমাদের জন্য সে পথ তাহলে হয়তো আরও সহজ সরল হতো। ধর্মীয় কুসংস্কার, পড়াশোনা,অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবে হয়তো সব মেয়েরা তার মতামত সব জায়গায় দিতে পারে না। তবে সব সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেয়েও অনেক পুরুষ যখন (সবাই না) কর্মক্ষেত্রে, ঘরে, সামাজিকভাবে সংকীর্ণ আচরন করেন তখন তাকে কি বলবেন ? তিনি তো অনেক সুযোগ পেয়েছেন। তার তো আকাশের মতো উদার হওয়া উচিত ছিলো ? তিনি কেন তা নন ? অন্যায় সব সময়ই অন্যায়। তা ছেলে মেয়ে সবার জন্যই। তাই নিজের সুবিধার জন্য, স্বার্থের জন্য নানা বিরুপ মন্তব্য করে মেয়েদের আর পিছিয়ে রাখা ঠিক হবে না। মেয়েদের আরও সচেতন, বুদ্ধিমান, সাহসী হতে হবে । মেয়েরা যত বাইরে আসবে, পড়াশোনা করবে, তত বন্ধ দুয়ার খুলে যাবে। খনা, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম, ইলামিত্র, প্রীতিলতার দেশে বিরুপ মন্তব্য গুলোকে আবর্জনায় ফেলে আলো আনবেই মেয়েরা। তাই নারীদের পিছনে না রেখে রহস্যময়ী ছলনাময়ী, স্বার্থপর না বলে সবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে সবাইকে। / এআর /

মনোদৈহিক সমস্যা ও সামাজিক অস্তিরতার বড় কারণ ফেসবুক

আমাদের জীবন হয়ে পড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর। সবাই মিলে ঢুকে পড়েছি উৎকট হাস্যকর বাস্তবসারযুগে। ক্ষীয়মাণ হয়ে গেছে পারস্পরিক স্নেহ ভালবাসা মমতার সম্পর্ক। ইদানীং সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতার বড় কারণ ফেসবুক। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা ও টানাপোড়েনের জন্যেও এটি দায়ী। বুঝে না বুঝে আমরা প্রযুক্তির অপরিণামদর্শী ব্যবহার করছি দিনের পরদিন। সমাজে কমছে সমমর্মিতা। বাড়ছে প্রতারণা অবিশ্বাস প্রতিহিংসা। আমাদের স্বাধীনতা বেড়েছে, সচেতনতা বাড়ে নি। আমরা নতুন প্রযুত্তি ব্যবহার করব, কিন্তু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আগামী প্রজন্ম # ভার্চুয়াল ভাইরাসের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি তিন জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু ( ইউনিসেফ রিপোর্ট ২০১৭) # শিশুদের অটিজম, মনোযোগ হ্রাসের জন্যে দায়ী ভিডিও গেম আসক্তি। মার্কিন তরুণদের মাঝে স্কুল থেকে ঝরে পড়া, পরিবার ও সমাজ বিচ্ছিন্নতা, তীব্র বিষন্নতার মতো আত্নঘাতী সমস্যার নেপথ্য কারণও হলো ইন্টারনেট আসক্তি। (ওয়াশিংটন পোস্ট ২০ মে ৭ ডিসেম্বার ২০১৭) #পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড এর গবেষনা অনুযায়ী, যেসব শিশু কম্পিউটার টেলিভিশন ও ভিডিও গেম নিয়ে দিনের বিশিরভাগর সময় ব্যস্ত থাকে তারা হয়ে পড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হীনমন্যতার শিকার। ভাষ্যমতে, শিশুদের অনিদ্রা, মেদস্থুলতা, আগ্রাসী মনোভার, আত্নবিশ্বসহীনতার অন্যতম কারণ স্ক্রিন আসক্তি। (দ্য গার্ডিয়ান, ২৬জানুয়অরি ২০১৮) সচেতন হোন এখনই # বয়স ১৮ হওয়ার আগে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেবেন না। # রাত ১১ টার পর ভার্চুয়াল জগত থেকে দূরে থাকুক। লেখক : আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রথিতযশা মনোচিকিৎসক      

সাগর-রুনীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে আমাদের প্রিয় দুই সহকর্মী মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনী রাজধানীর রাজাবাজারে তাদের নিজ বাসায় নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। এই ঘটনার খবর পেয়ে সহকর্মী সাংবাদিকদের পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সাগর-রুনীর বাসায় ছুটে যান। যাদের মধ্যে ছিলেন সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। ভয়াবহ এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের আশ্বাস দেন। পেশাদার দুই সাংবাদিকের এই নৃশংস হত্যার খবর জেনে সারা দেশের মানুষ শিউরে উঠে। ঘটনার দু’দিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক সাংবাদিক সম্মেলন করে সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির’ কথা জানান।

‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক আসক্তি ও মাদকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই’

মস্তিস্ককে তোমরা কীভাবে ব্যবহার করবে, তার উপর নির্ভর করবে তোমার, তোমার দেশের এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তোমরা কি জানো এই মহামূল্যবান রহস্যময় মস্তিস্কটি নিয়ে এখন সারা পৃথিবীতে একটি অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্র চলছে? আমি নিশ্চিত তোমাদের অনেকেই নিজের অজান্তে সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছ। এই ষড়যন্ত্রের নাম সোশ্যাল নেটওয়ার্ক। শিক্ষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি ২০১৩-১৪ সাল থেকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একধরনের গুণগত অবক্ষয় শুরু হয়েছে। তাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা ও বিশ্লেষনী ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। আমার মনে হয়, এই ফেসবুক জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কে বাড়াবাড়ি আসক্তির ফল। মাদকাসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে মাদক না পেলে অস্থির হয়ে যায়, তার মস্তিস্কে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানিরা দেখিয়েছেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে তার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সময় অপচয় না করতে পারলে সে ও অস্থির হয়ে যায়। তার মস্তিস্কেও বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। সহজ ভাষায় বলা যায়, সত্যিকারের মাদকসক্তির সাথে সোশ্যাল নেটওয়াকে আসক্তির কোনো পর্থ্যক্য নেই। তোমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি যেন কখনো তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে, মনে রেখো এই সব আধুনিক প্রযুক্তি কিন্তু পরজীবী প্রানীর মতো সেগুলো তোমার পুষ্টি খেয়ে বছে থাকে। (২০১৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের দেওয়া ভাষণের নির্বাচিত অংশ)  / এআর /

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি