ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন, ২০১৮ ১১:৩১:৩৯

আজ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী

আজ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী

ভালো আছি ভালো থেকো/ আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো, দিও তোমার মালাখানি বাউলের এই মনটারে.... এই অত্যন্ত জনপ্রিয় গানের স্রষ্ঠা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ২৭তম মৃত্যুবার্ষিক আজ। রুদ্র মুহম্মদ আজ আমাদের মধ্যে নেই। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে কবিতার খাতা ফেলে চলে গেছেন মৃত্যুলোকের ওপারে। তাই আকাশের ঠিকানায় আজ তার ভক্তরা রুদ্রকে লক্ষ্য করে হাজার চিঠি লিখবে। কবিতার ছন্দে গাঁথবে হাজারো মালা। সেই মালায় আজীবন চিরভাস্মর হয়ে থাকবে রুদ্রের স্মৃতি। মৃত্যুদিনে এই অকাল প্রয়াত কবির জন্য অফুরন্ত প্রার্থনা। আমার ভিতর-বাহিরে অন্তরে-অন্তরে, আছো তুমি হৃদয় জুড়ে। হ্যা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্তর দশকের অন্যতম জনপ্রিয় কবি আমাদের হৃদয়ের মণিকোটায় সমস্ত জায়গাজুড়ে বিস্তারমাণ আছেন। প্রতিশ্রুতিশীল এই কবির প্রতিভা পূর্ণ বিকশিত হওয়ার আগেই মাত্র ৩৪ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান শক্তিমাণ এই লেখক। ১৯৯১ সালের ২১ জুন তারিখে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসভবনে আকস্মিক হ্নদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মূলত কবি হলেও কাব্য চর্চার পাশাপাশি সঙ্গীত, নাটক, ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও ছিলেন সমান উৎসাহী। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশাল শহরের রেডক্রস হাসপাতালে। রুদ্রের বাবার নাম শেখ ওয়ালীউল্লাহ এবং মায়ের নাম শিরিয়া বেগম। তাদের স্থায়ী নিবাস বাগেরহাট জেলার মংলা থানার অন্তর্গত সাহেবের মেঠ গ্রামে, তবে পিতার কর্মস্থল ছিল বরিশাল। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। দশ ভাই বোনের মাঝে তিনিই ছিলেন সবার বড়। ঢাকা ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৫ সালে এইচএসসি পাস করেন রুদ্র মোহম্মদ। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাতটি। এরমধ্যে রয়েছে উপদ্রুত উপকূল, ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম, মানুষের মানচিত্র, মৌলিক মুখোশ, ছোবল ইত্যাদি। রুদ্র কিছু গল্প আর গানও লিখেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিখ্যাত ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বিয়ে করেন ১৯৮১ সালে। কিন্তু তাঁদের এই দাম্পত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮৬ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এর কয়েক বছর পরই ১৯৯১ সালের এই দিনে পরপারে পাড়ি দেন রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এমজে/
রূপান্তরের গল্প

আমাদের বসবাস ওইখানে, ওইখানে শুয়ে থাকি মহাকাল মহারণে। এখানে আনন্দ-কোলাহল পরিপূর্ণ এখানে নবতর প্রত্যাশা আন্দোলিত এখানে হৃদয় প্রসারিত হয় বেলুনের মতো।        আত্মা মুক্ত, বাঁধাহীন থাকে অহরহ        হাফ ছেড়ে বাঁচা যায় নিশ্চিন্তে        হৃদয় উজার হয় নব আকাক্সক্ষায়        নির্বোধ লজ্জা পালিয়ে যায়        নিজ অন্তর প্রকাশিত হয় উদারচিত্তে        প্রত্যাবর্তন করি আনন্দঘন দিনে। এখানে রোগযুক্ত সবাই, রোগের কবলে পড়ে        আকস্মিক কান সজাগ হয়ে উঠল,        নেমে এল মৃত্যুর মতো স্তদ্ধতা। এখানে সুমিষ্ট ধূপকাঠির গন্ধ ছড়ানো এখানে দেবদারু নির্যাস পোড়ানো গন্ধ চারিদিকে।        মানুষ কী যেন ভাবে,        এক অব্যক্ত ভাষায় বিড়বিড় করে        পৃথিবীতে মানুষের বেদনা অনেক। এখানে ধূসর রঙে লুকিয়ে থাকে বিশ্বাস গোপনে        গোপন রহস্যে ঈশ্বর থাকে        ঈশ্বরের ক্ষমতা অমর        ঈশ্বরের ক্ষমতা অশেষ। আমরা চলি বক্র ও সরল পথে        আত্মতৃপ্তি !        ঘৃনিত আত্মতৃপ্তি !! ওইখানে আত্মার উত্তরণ অনিবার্য ওইখানে আত্মার নিকৃষ্টতম অশুচি পথপ্রদর্শক আলোকশিখা জ্বলে ওইখানে এখানে মানুষের বসবাস স্বর্গসুখে। একে//

‘গ্রেট টিম লিডার’দের যে পাঁচ প্রলোভনে পা ফেললেই বিপদ...!

জীবনে সাফল্য পেতে চায় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য। তবে ‘সাফল্য ছেলের হাতের মোয়া নয়, যে চাইলেই পাওয়া যাবে। সাফল্যের জন্য চাই অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর অধ্যবসায়। যাঁরা জীবনে সাফল্য পেয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের সাফল্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক একটি গল্প। যে জীবনযুদ্ধের গল্পগুলো মোটেই সুখকর নয়। অনেক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছতে হয় সত্যিকারের সাফল্যের বন্দরে। জীবনসাফল্যের অভিযানে প্রতি পদক্ষেপেই ওঁৎ পেতে থাকে একের পর এক প্রলোভনের ফাঁদ। জীবনের কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে যে প্রলোভনসমূহের কোনো একটি ফাঁদে পা ফেললেই আর রক্ষে নেই। তখন তাকে নিশ্চিতভাবে নিমজ্জিত হতে হয় চোরাবালির চরে। গড়পড়তা মানুষের জন্য যেমন, তেমনি একজন টিম লিডারের ক্ষেত্রেও কথাগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন টিম লিডারকে সাধারণত যে প্রলোভনগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে, যে প্রলোভনগুলোর ফাঁদে পা দিয়ে নিজের অজান্তেই একজন টিম লিডার তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়, সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করে একটি চমৎকার বই লিখেছেন (২০০২) বিশিষ্ট আমেরিকান লেখক প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি (জন্ম : ১৯৬৫)। বইটির শিরোনাম দিয়েছেন- `The Five Temptations of a CEO`| প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্বনামধন্য ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম ‘দ্য টেবিল গ্রুপে’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তিনি বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানিতে সহস্র সিনিয়র এক্সিকিউটিভের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি গত পনের বছর ধরে একজন পরামর্শদাতা ও বক্তা হিসেবে পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়েছেন, এবং দিয়েই চলছেন। মূলত সেই অভিজ্ঞতার সারাৎসার বাণীবদ্ধ করেই লিখেছেন ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশনস অব এ সিইও’ বইটি। বইটিতে ‘সিইও’ (CEO or Chief Executive Officer) বলতে তিনি বুঝিয়েছেন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী তথা দলপ্রধানকে; এবং ‘টেম্পটেশনস’ বলতে বুঝিয়েছেন এমন সব প্রলোভনকে, যেগুলো একজন শ্রেষ্ঠ দলপ্রধান হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে যে বা প্রলোভনগুলো প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে, যেসব প্রলোভনসমূহ একজন দলপ্রধানকে তার অজান্তেই আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে, যেগুলো থেকে প্রতিমুহূর্তে সতর্ক না-থাকলে বিপদ অবিসম্ভাবী, সেগুলোকেই রূপক গল্পের মোড়কে ‘দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও’ বইটিতে তুলে ধরেছেন লেখক। লিঞ্চিওনি ‘সিইও’ তথা ‘টিম লিডার’ বা দলপ্রধানদের কথা মাথায় রেখে বইটি লিখলেও এই প্রলোভনগুলো যেকোনো মানুষের সাফল্যযাত্রার পেছনেই অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন (২০১৭) বাংলাদেশের স্বনামধন্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘রকমারি ডট কম’-এর হিউম্যান রিসোর্স টিমের কো-অর্ডিনেটর জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর (জন্ম : ১৯৮৭)। স্মরণীয় যে, বইটির অনুবাদক জনাব মারুফ সাহেবও একজন টিম লিডার। তিনি যে লিঞ্চিওনি’র বক্তব্যগুলো স্বয়ং আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পাদন করেছেন, তা অনূদিত বইটির প্রাঞ্জল ঝরঝরে গদ্য আর প্রকাশভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়। বইটি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে : লেখক এই বইটির নাম দিয়েছেন ‘The Five Temptations of A CEO’। তিনি এই ‘সিইও’ শব্দটি দিয়ে আসলে একজন ‘লিডার’ কে বুঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। একজন লিডার যখন তার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়ে যান, তখন তিনি নিজেকে একটু আলাদা ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় এই আলাদা ভাবাই তাকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। যে লিডার তার ফলোয়ারদের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভাবতে পারেন না, সে খুব দ্রুতই ফলোয়ারদের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা হারান। গ্রেট লিডার হতে হলে পাঁচটা টেম্পটেশনের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হয়। ...লেখক একটি রূপক গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ঐ টেম্পটেশনগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ...কিশোর বয়স থেকেই এই টেম্পটেশনগুলো জেনে নিয়ে সেগুলো ওভারকাম করার ক্রমাগত প্রাকটিস করতে থাকলে গ্রেট লিডার হওয়ার পথ কেউ রুখতে পারবে না। (‘অনুবাদকের কথা’ অংশ : দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও) লেখক মোট চারটি প্রধান খণ্ডে ভাগ করে তাঁর বক্তব্যগুলোকে গ্রন্থবন্ধ করেছেন। প্রথম খণ্ডে স্থান দিয়েছেন এগারোটি অধ্যায়ের। প্রথম অধ্যায়ে পাঠকের সাথে সাক্ষাৎ মিলবে “এন্ড্রু ও’ব্রেইন”, সংক্ষেপে “এন্ড্রু” নামধারী এই গল্পের নায়কের। সে ‘ট্রিনিটি সিস্টেম’ নামক একটি টেকনোলজি কোম্পানির সিইও। ‘গত এক বছরের কাজের রিপোর্ট আর জবাবদিহি নিয়ে আগামীকাল তার প্রথম বোর্ড মিটিং’। এ-নিয়ে সে খুবই চিন্তিত। সাধারণত সে অফিস থেকে দেরি করে না বের হলেও সে আজ অফিস থেকে সবার শেষে বেরিয়েছে; অফিসের হলরুমে হাঁটার সময়ও আজ তার খুব অস্বস্তি বোধ করছিল; বিচলিত মনে সে ভাবছে, কাল সদস্যদের কাছ থেকে তার কতই না নেতিবাচক কথা শুনতে হবে, কেউ হয়তো তার কাঁধ চাপড়ে বাহবাও দেবে না; এক কথায় বলা চলে সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে তার তত্ত্বাবধানে কোম্পানি যে খারাপ ফলাফল করেছে তা নিয়ে সে খুবই উদ্বিগ্ন। তার তখন মনে পড়ে একটি প্রবাদ— ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’। এভাবেই এগিয়ে চলে গল্পের গতি। পাঠকরাও এন্ড্রু’র সাথে সাথে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে দেখা যাবে, যে পথ দিয়ে এন্ড্রু গাড়ি নিয়ে যাত্রা করেছে, সে পথ দিয়ে আর কোনো গাড়ি-ই যাচ্ছে না। যদিও ‘মেরামতের জন্য সেই রাস্তাটি বন্ধ থাকবে’ এমন নোটিশ এন্ড্রু গত দু’সপ্তাহে বহুবার দেখেছে, তা-সত্ত্বেও আগামীকালের বোর্ড-মিটিংয়ের দুশ্চিন্তায় ভুল করে সেই পথেই সে চলে এসেছে। এন্ড্রু যেন আজ এক উদ্ভ্রান্ত পথিক। সে আজ কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না! তার এই উদ্ভ্রান্তদশাকে লেখক উপস্থাপন করেছন এভাবে— একবার ভাবল, অফিসের কাছে ভালো একটা হোটেলে থাকবে। রাতে জামা কাপড় লন্ড্রি সার্ভিসে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেবে। হোটেলে বসেই মিটিংয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু নাহ্! পরক্ষণেই তার মনে হলো নিজের বাড়িতে গিয়ে অন্তত দু’ঘণ্টা শান্তিতে ঘুমানো দরকার। যদিও এন্ড্রু নিজের বউ বাচ্চাদের সামনে খুব ভাব নিয়ে থাকে, তবুও তার মনে হল- নৈতিক ও মানসিক সাপোর্টের জন্য বউ-বাচ্চাদের সঙ্গ তার একান্ত প্রয়োজন। (পৃ. ২৫) অতঃপর এন্ড্রু দরকারি কাগজপত্র ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে, কোট হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। উঠে গিয়ে একটি লোকাল ট্রেনে। সেখানে বিধ্বস্ত এন্ড্রু’র সাথে দেখা হয় ধূসর শার্ট পরিহিত এক বয়স্ক ভদ্রলোকের। যার নাম— “চার্লি”। চার্লি গল্পের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। চার্লি একরকম গায়ে পড়েই এন্ড্রুর সাথে গল্প করতে চায়। চার্লিকে প্রথমে বিশ্বাস করতে না পারলেও পরবর্তীতে চার্লির ইচ্ছাতেই এন্ড্রু তার সাথে কথোপকথন শুরু করে। চার্লি নিজেকে পরিচয় দেয় একজন রেইলরোড কোম্পানির প্রেসিডেন্টের ছেলে হিসেবে। চার্লির সাথে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে তৃতীয় অধ্যায়ে। চতুর্থ অধ্যায়ে এসে দু’জনের মধ্যে গল্পটা জমে ওঠে। চার্লি ও এন্ড্রুর মধ্যকার কথোপকথনের শুরুর অংশটি চমৎকার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন লেখক। বইটি না-পড়ে সে নাটকীয়তার নাট্যরস আস্বাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যা-ই হোক, শুরুর দিকে চার্লিকে এন্ড্রু বিশ্বাস করতেই পারছিলো না। তবুও একটা অবজ্ঞামিশ্রিত সংশয়াচ্ছন্নতার মধ্য দিয়েই চার্লিকে সে তার সমস্যাগুলো বলতে শুরু করে। লেখক এন্ড্রুর মানসিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে— ...অবশ্য এন্ড্রুর মনের মধ্যে সংশয় কাজ করছিল। সে ভাবল, ‘আমি একটা কোম্পানির সিইও। আর আমি আমার সমস্যার কথা এক পাগল বুড়োর কাছে বলতে যাচ্ছি। আমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? মনে তো হয় কিছুটা হলেও খারাপ হয়েছে। এ কারণেই তো তাঁকে এসব কথা বলতে যাচ্ছি।’ (পৃ. ৩৫) আলোচনার প্রারম্ভেই চার্লি বুঝে ফেলে এন্ড্রুর বিপর্যস্ত মানসিক পরিস্থিতির কথা : চার্লির জবাব, “ও! তাই নাকি! তুমি কি জান, তুমি যে টেম্পটেশনের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছো। ভাবছ, কী করে বুঝলাম? আর তা বুঝা একেবারেই সহজ কাজ। ঐ যে তুমি জানো যে, তোমার কোম্পানির দুর্দিন যাচ্ছে, কিন্তু তুমি নাকি তার জন্য দায়ী না। সিইও’দের সাধারণত পাঁচটা টেম্পটেশন থাকে। তুমি কিন্তু ইতোমধ্যে এক বা একাধিক টেম্পটেশনের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছ।” (পৃ. ৩৮) এরপর চার্লি এক এক করে সিইও’দের পাঁচটি টেম্পটেশন নিয়ে এন্ড্রুর সাথে আলোচনা করে। পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করে প্রথম টেম্পটেশন নিয়ে। চার্লি এন্ড্রুর কাছে জানতে চায়, এন্ড্রুর ক্যারিয়ারের সেরা দিন কোনটি, সে-সম্পর্কে। এন্ড্রু দু’সেকেন্ড ভেবেই জানিয়ে দেয়— সে যেদিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটাই ছিল ক্যারিয়ারের সেরা দিন। কিন্তু এখানেই আপত্তি চার্লির। সে এন্ড্রুর বক্তব্যকে ‘হাউ ফানি’ বলে উড়িয়ে দেয়। সে একের পর এক যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট কখনোই নির্বাচিত হওয়ার দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন বলবে না, বলবে— যেদিন সে দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে সেই দিনকে; একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান কখনো সরকারি অনুদান পাওয়ার দিনকে তার ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যেদিন সে অনুদানের টাকাগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে সে-দিনকে; একজন বাস্কেটবল কোচ কখনো যেদিন কোনো দলের সাথে বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে— যে-দিন দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারবে, সে-দিনকে; ঠিক একইভাবে, একজন সিইও’রও উচিত যে-দিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন না-ভেবে যে-দিন কোম্পানির জন্য ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে, সে-দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাবা এবং সব সময় নিজের ক্যারিয়ারের চেয়ে কোম্পানির সাফল্যের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চার্লির ভাষায় : ...মূলত যাঁরা গ্রেট সিইও তাঁরা এসব ব্যাপার নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। তাঁরা শুধু তাঁদের কাজের মাধ্যমে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তাঁরা চান কোম্পানির আরো উন্নতি হোক, নিজের ইগো নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। (পৃ. ৪৪) এমনিভাবে কীভাবে একজন সিইও নিজের ক্যারিয়ার, পদমর্যাদা, ভাবমূর্তি ও ইগোর কবলে পড়ে প্রথম টেম্পটেশনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন, তা চার্লি ও এন্ড্রুর সুবিস্তৃত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নাট্যিক আবহে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বইটির ঘটনাপ্রবাহ পড়তে গিয়ে পাঠকদের জন্য সবচেয়ে পরিতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে— বর্ণনাগুলোকে কখনো একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর মনে হবে না লেখক মোটেই নিরস তত্ত্বকথা উপস্থাপন করেননি, অত্যন্ত সরসভাবে একেবারে গল্পের ভঙ্গিতে দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্ণনাটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাষারূপ দিয়েছেন চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির। হঠাৎ করেই ট্রেনের বগিতে আলো চলে যাওয়া, আলো চলে যাওয়ার পরের ভূতুরে পরিবেশ, আবার আলো জ্বলে ওঠার রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা প্রভৃতি বিষয়গুলো খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইয়ে। বইটির প্রথম খন্ডের ‘ছয়’সংখ্যক অধ্যায়ে চার্লি আলোকপাত করে দ্বিতীয় টেম্পটেশন সম্পর্কে। চার্লির মতে, সিইও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াটা কঠিন হলেও সিইও’র কাজগুলো পরিচালনা করা মোটেই জটিল নয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এন্ড্রু তা মেনে নিতে পারে না। এন্ড্রুর যুক্তি : কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন টেকনোলজি, বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক পরিবর্তন, ব্যবসার নিয়ম কানুনের অদল-বদল, সস্তা শ্রমবাজার, ট্যাক্স, ভ্যাট, ঘুষ ইত্যাদি কত ধরনের ব্যাপার স্যাপারের কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক জটিল হয়ে গিয়েছে। চার্লিও নাছোড়বান্দা! এন্ড্রুর এসব যুক্তি মানতে সে পুরোপুরি নারাজ। এভাবেই জমে ওঠে গল্প। এন্ড্রু তার জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অফিসের অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি, সে টেরিকে (টেরি ছিল এন্ড্রুর কোম্পানির ‘মার্কেটিং বিভাগে’র প্রধান, তাকে এন্ড্রু কোনো রকমের পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে) সঠিক উপায়ে চাকরিচ্যুত করেনি, যদি তাকে পূর্ব-সতর্কতা ব্যতীত চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয় তাহলে এন্ড্রুর কেমন লাগবে- এমনি নানা প্রশ্নে এন্ড্রুকে জর্জরিত করে চার্লি। যুক্তির পর যুক্তি উপস্থাপন করে চার্লি এন্ড্রুকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে আসলে নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের সঠিক জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি; আর এটিই হচ্ছে একজন সিইও’র দ্বিতীয় টেম্পটেশন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর ভাবনাগুলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন সিইও কী করে থাকে, অথচ তার কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় প্রভৃতি নানা বিষয় এন্ড্রু ও চার্লির কথোপকথনের মধ্যে ফুটে উঠে। তাদের আলোচনায় পাঠকের সামনে বেরিয়ে আসে মজার মজার সব তথ্য। নাট্যরসে ভরপুর সেসব তথ্যাবলি সত্যি-ই খুব উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়। পরবর্তী অধ্যায়ে তৃতীয় টেম্পটেশন ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা’সম্পর্কে আলোকপাত করে চার্লি। কেন একজন সিইও স্বল্প তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক সময়ে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, তার দুর্বলতাগুলো কী কী, এন্ড্রু-ই বা কী কী ভুল করেছিল, একজন সিইও হিসেবে এন্ড্রুর কী করা উচিত হয়নি বা কী করা উচিত সে-সব সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করে চার্লি। গল্পের শুরুতে চার্লির প্রতি এন্ড্রুর যে বিরক্তি ও সংশয় ছিল, এ-পর্যায়ে এসে তা আর অবশিষ্ট থাকে না। এখন সে নিজের আগ্রহ থেকেই চার্লির কাছে তার সমস্যা তুলে ধরতে শুরু করে, এবং সমাধানের পথ জানতে চায়।  আর চার্লিও দিয়ে চলে একের পর এক উপদেশ। একটি দৃষ্টান্ত : ...একজন সিইও’র ‘I was wrong’ এ তিনটি শব্দের বাক্যটি বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যাবার জন্য বললে হবে না বরং এমনভাবে বলতে হবে, যেন অন্য টিম মেম্বাররা বুঝতে পারে, সিইও সাহেব সত্যিই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ...একজন সিইও তাঁর সিদ্ধান্ত হতে ভুল প্রমাণিত হলে কখনোই অস্বস্তিতে পড়বেন না। তিনিই ‘গ্রেট সিইও’ যিনি ওই ধরনের অবস্থায়ও খুবই স্বাভাবিক থাকতে পারেন। তাহলে পরবর্তীতে কোম্পানির মারাত্মক দুর্দিনেও অল্প তথ্যের সাহায্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সৎ সাহস পাবেন। (পৃ. ৭০) অষ্টম অধ্যায়ে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে আরও তিনজন বৃদ্ধ লোকের সাথে- একজন লম্বু লোক, একজন টেকো লোক ও অপরজন ফিটফাট বাবু। লোকগুলোর নামের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, তাদের সাথে এন্ড্রু ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কতোটা হাস্যরসাত্মক ও উপভোগ্য হতে পারে। তাদের মধ্যে আলোচনা হয় চতুর্থ টেম্পটেশন নিয়ে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এন্ড্রু জানতে পারে তারা সকলেই এক একজন সিইও ছিলেন; এবং সকলেই কোনো না কোনো টেম্পটেশনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গল্পের এই অংশটিও বেশ চমৎকার। এন্ড্রু কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই তার সামনে ঘটনাগুলো ঘটে যায়। এন্ড্রু যেন একটি গোলকধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে যায়। তবুও সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নেয়। কারণ আলোচনায় বেরিয়ে আসছে এক একজন সিইও’র এক একটি দুর্বলতার কথা। যেমন­— ...তখনই লম্বুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ঠিক এই কাজটি না করার কারণেই আমার অধপতন হয়েছে। টিম মেম্বাররা একজন আরেক জনকে চ্যালেঞ্জ করবে, এটা আমি মোটেও মেনে নিতে পারতাম না। আমি তাদের মাঝে তীব্র বা কড়া ভাষার যুক্তিতর্ক হতে দিতে ভয় পেতাম। আমার ভয় করত তারা যদি একে অপরকে খুবই ঘোরতর আক্রমণ করে বসে তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।” (পৃ. ৮০) এই যে নিজে সমালোচিত হওয়ার ভয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে ‘প্রোডাক্টিভ আইডিওলজিক্যাল কনফ্লিক্ট’ হতে না-দেয়া, এটাই চতুর্থ টেম্পটেশন। কোম্পানির উন্নয়নের জন্য এবং অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মিটিংয়ে টিম মেম্বারদের মধ্যে গঠনমূলক তর্কবিতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তাহলে সকলের মতামত যেমন জানা যাবে, তেমনি কোম্পানির জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা যাবে। সময় গড়িয়ে যায়। ট্রেন চলতে থাকে তার আপন গতিতে। চতুর্থ টেম্পটেশন সম্পর্কে কথোপকথন শেষ হতে-না-হতেই ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যে। এন্ড্রুকে রেখে চার্লিসহ অন্যান্যরা ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এন্ড্রু অনেক চেষ্টা করেও চার্লিদের নেমে যাওয়া থেকে বিরত করতে পারে না। এ-পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খুবই চমকপ্রদ ও রহস্যাবৃত। চার্লিদের অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়ে এন্ড্রু হন্তদন্তভাবে চার্লিদের পিছু পিছু ট্রেন থেকে নেমে যায়। সে তখন পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে জানার জন্য এতোটা উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল যে ট্রেন থেকে নামার সময় নিজের মূল্যবান ব্রিফকেসটি নিতেও ভুলে যায়, যে ব্রিফকেসে ছিল তার পরবর্তীদিনের বোর্ড-মিটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসমূহ। যা-ই হোক, এভাবে ট্রেন থেকে নেমে অনেক অনুনয়-বিনয় করে চার্লির কাছ থেকে এন্ড্রু জেনে নেয় পঞ্চম টেম্পটেশন সম্পর্কে। পঞ্চম টেম্পটেশনের মূলকথা হচ্ছে : সিইও’রাও যেহেতু মানুষ, তাই তাদেরও ভুল হতে পারে; সিইও’র কোনো কাজে যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে সিইও’র উচিত বিন্দুমাত্র লজ্জা অনুভব না-করে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল করার প্রত্যাশায় নিজের ভুলগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরা এবং সবার কাছ থেকে গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া। নিজের দুর্বলতাগুলোকে লুকিয়ে না-রেখে টিম মেম্বারদের ওপর বিশ্বাস রেখে তাদেরকে গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ করে দেয়া উচিত, যা অনেক সিইও’-ই নিজের মর্যাদার কথা ভেবে টিম মেম্বারদের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে এবং গঠনমূলক তর্ক করা সুযোগ দিতে ভয় পায়। এভাবেই উদ্ভ্রান্ত এন্ড্রু চরিত্রের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে শত-সহস্র যুক্তি-তথ্য উপস্থাপন ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন সিইও’দের পাঁচটি ‘টেম্পটেশন’ তথা ‘প্রলোভন’ সম্পর্কে, যে পাঁচ প্রলোভনের ফাঁদে নিজের অজান্তেই পা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন একজন সিইও। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে- এন্ড্রুর এ-ট্রেনভ্রমণ তথা মানসভ্রমণ এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া উপর্যুক্ত ঘটনাবৃত্ত ঘটে যায় মাত্র ২০ মিনিটে। এমনকি চার্লিদের সাথে তাড়াহুড়ো করে ট্রেন থেকে নামার সময় এন্ড্রু তার যে ব্রিফকেস ফেলে এসেছিল, পরে দেখা গেল সেটাও আগের যায়গাতেই আছে। তবে কী তার সাথে কিছুই ঘটেনি! সত্যি-ই লেখক এক অদ্ভুত চমৎকারিত্বপূর্ণ রহস্যজাল তৈরি করে সাজিয়েছে ঘটনাবৃত্ত, যে রহস্যজাল উন্মোচনের জন্য গ্রন্থপাঠের কোনো বিকল্প নেই। গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে শেষ হতে বইয়ের আরও দুটি অধ্যায় বাকি থেকে যায়। দশম অধ্যায়ে লেখক পরবর্তী দিনের বোর্ড-মিটিংয়ের ঘটনাবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। কীভাবে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির বাৎসরিক বোর্ড-মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হয়, কর্মী নিয়োগে সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, কোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, অন্য কোম্পানির সাথে কোনো চুক্তি কীভাবে সম্পন্ন করা হয়, কীভাবে একজন সিইও’র কাছ থেকে তার কাজের জবাবদিহিতা গ্রহণ করা হয়, কীভাবে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ড ও কর্মপরিকল্পনাকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, কীভাবে কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় প্রভৃতি মিটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তের অতিসূক্ষ্ম বর্ণনা তুলে ধরেছেন লেখক। এমনকি চরিত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মানসিক পরিস্থিতি এবং চিন্তাভাবনাগুলোও বাণীবদ্ধ করতে ভুল করেননি। শুধু সিইও’দের জন্যেই নয়, যেকোনো পাঠকের জন্যেই এসব ঘটনাক্রম নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি অনুষঙ্গ। একাদশ অধ্যায়ে তিন বছর পরের আর একটি বোর্ড-মিটিংয়ের বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে দেখানো হয় গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সাফল্যের যাত্রায় অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।ইটির দ্বিতীয় খন্ডে লেখক এন্ড্রুর মতো বহু লিডার কীভাবে নিজেদের সামান্য ভুলের কারণে, কখনও বা নিজের অজান্তে এক বা একাধিক প্রলোভনে পা দিয়ে ব্যর্থতার আস্তাকুঁড়ে নিমজ্জিত হন, তার ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। পাশাপাশি কীভাবে সে-সব কাটিয়ে ওঠা যায় সে-সম্পর্কে পরামর্শ দেন। তৃতীয় খন্ডে উপস্থাপন করেন একটি রোল মডেল, যেখানে ব্যাখ্যা করে দেখান ‘কেন এক্সিকিউটিভরা বিফল হয়’তার ইতিবৃত্ত। এ-পর্যায়ে প্রতিটি টেম্পটেশনের মূল বক্তব্যগুলো পুনরায় তুলে ধরেন লেখক, এবং এক একটি টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একজন সিইও’র কী করা উচিত, সে-সম্পর্কে একটি একটি করে ‘সিইও’দের জন্য সহজ-সরল দিকনির্দেশনা’ উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি একটি চার্ট তৈরি করে ‘পাঁচটি টেম্পটেশন দূরীকরণের উপায়’ও লিপিবদ্ধ করেছেন। একজন সিইও কোনো টেম্পটেশনে আক্রান্ত হচ্ছেন কিনা, কীভাবে তা নিজে নিজে মূল্যায়ন করবেন, সিইও’দের আত্মমূল্যায়নের এমনি একটি মডেল উপস্থাপন করে লেখক সাজিয়েছেন বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টি। নিজেকে প্রশ্নকরণের মাধ্যমে কীভাবে একজন সিইও তার মধ্যে কোনো টেম্পটেশন ভর করেছে কিনা তা মূল্যায়ন করতে পারবে, এমন উপযোগী কিছু কার্যকরী টুলসের উল্লেখ করা হয়েছে বইয়ের এই শেষ অংশে। সর্বোপরি, প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি যদিও দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও বইটি কেবল সিইও’দের কথা বিবেচনা করে লিখেছেন, তা-সত্ত্বেও বইয়ের বক্তব্যসমূহ যেকোনো মানুষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। জীবনসাফল্যের পথযাত্রায় যেকোনো মানুষেরই জীবনপথে ওঁৎ পেতে থাকা নানা প্রলোভনের ফাঁদ, যে-সব থেকে বাঁচাতে এই বইয়ের বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে সকলের উপকারে আসবে। প্যাট্রিক লিঞ্চিওনি’র ইংরেজি ভাষায় রচিত এই মহামূল্যবান বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য খুবই উপকার সাধন করেছেন জনাব মোঃ মারুফ হাসান মনবীর। তাঁর অনুবাদের ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল, ঝরঝরে ও সহজবোধ্য। ছোট ছোট বাক্যে বক্তব্যগুলোকে তিনি এতোটা সরলভাবে বাণীবদ্ধ করেছেন যে কোথাও গদ্যের স্বাভাবিক গতিময়তা বিঘ্নিত হয়নি। যেহেতু তিনি নিজেও একজন টিম লিডার, একজন টিম লিডার হিসেবে তিনি যে মূল লেখকের বক্তব্যগুলো গভীরভাবে আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেছেন, তা গ্রন্থটি পাঠ করলে সহজেই অনুধাবন করা যায়। এতো সুন্দর একটি অনুবাদকর্মের জন্য বাংলাভাষী পাঠকদের পক্ষ থেকে অনুবাদককে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ‘অন্যরকম প্রকাশনী’ কর্তৃপক্ষকে, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। লেখক : এমএসএস শিক্ষার্থী, প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়           e-mail : arif.du.bd11@gmail.com

কবি সিকদার আমিনুল হক’র ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আধুনিক বাংলা কবিতার ষাট দশকের অন্যতম র্শীর্ষ কবি সিদকার আমিনুল হক-এর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৭ মে।২০০৩ সালের এই দিনে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট সিকদার আমিনুল হক ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।কবি সিকদার আমিনুল হক ১৯৪২ সালের ৬ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে ঢাকায় চলে আসেন। স্কুল জীবনেই তার লেখালেখি শুরু হয়। কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ ও পশ্চিবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্য ম্যাগজিনে তার লেখা প্রকাশ পেতে থাকে। কবিতার পাশাপাশি সাহিত্য বিষয়ে প্রবন্ধ, কলাম লিখেন তিনি। ষাট দশকে পরাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিয়য়েও তিনি অসংখ্য কবিতা লেখেন। তার কবিতায় স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সাধারন মানুষের জীবনযাপন, তাদের সুখ-দুঃখ এবং মানবিকবোধের নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।ষাট দশকের খ্যাতিমান কবিদের অন্যতম সিকদার আমিনুল হক সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। দৈনিক দেশ গ্রুপের‘ বিপ্লব’ নামে একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। নিজের সম্পদনায় ‘স্বাক্ষর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা দীর্ঘদিন প্রকাশ করেন।কবি সিকদার আমিনুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দূরের কার্নিশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্য ও অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে -তিন পাঁপড়ির ফুল (১৯৮২), আমি সেই ইলেকট্রা (১৯৮৫), বহুদিন অপেক্ষা বহুদিন অন্ধকার (১৯৪২), পত্রে তুমি, প্রতিদিন জলে (১৯৮৭), এক রাত্রি এক ঋতু (১৯৮৬), সুপ্রভাত এই বারান্দা (১৯৯৩), কাফরার জামা, রুমালের আলো ও অন্যান্য কবিতা, কবিতা সমগ্র, গদ্য সমগ্র, নির্বাচিত কবিতা।কবি ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়াও বেশকিছু পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।কবির লেখালেখি, জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় বৈচিত্র রয়েছে। নিজম্ব একটা ধারা সৃষ্টি করেন বয়ানে এবং কবিতার নির্মাণে। এটাই হচ্ছে একজন কবির বড় পরিচয়। আমরা একই সময় থেকে লিখতে শুরু করি। সে ছিল নিভৃতের বাসিন্দা। অত্যন্ত খোলামেলা বলতেন সব কথা ও চিন্তার বিষয়গুলো। স্পষ্টভাষী ছিলেন। সূত্র : বাসস এসএ/

সক্রেটিসের ভাবনা

দর্শনের ইতিহাসে তিনজন মহাজ্ঞানী রয়েছেন। তারা হলেন সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল। যুগ যুগ ধরে তারা দর্শনের মহাকাশে নক্ষত্রের ন্যায় জ্বলছেন। যদিও প্লেটো ও এরিস্টটলের লিখিত বই রয়েছে, কিন্তু সক্রেটিসের লেখা কোনও বই নেই। তবুও এই মানুষটি কেমন করে বিশ্বে দর্শন আকাশের নক্ষত্র? অনেক কৌতূহল তাকে ঘিরে! সক্রেটিস কোনও বই লিখেননি, তাতে কি? তিনি তার ভাবশিষ্য প্লেটোকে তো রেখে গিয়েছিলেন। প্লেটোর লিখা বইগুলোতেই তার সম্পর্কে জানা যায়। তার জীবনের বিস্তৃত সূত্র হিসেবে বর্তমানে রয়েছে তিনটি উৎস। প্লেটোর ডায়ালগসমূহ, এরিস্টোফেনিসের নাটক সমূহ ও জেনোফেনোর ডায়ালগসমূহ। সক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে গ্রীসের এথেন্স এ জন্ম গ্রহন করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে রাষ্ট্রদ্রোহীতার কারণে হেমলক বিষ পানের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার পিতা একজন ভাস্কর ছিলেন ও মা ছিলেন ধাত্রী। শোনা যায়, তিনি প্রথমে পিতার পেশাকে বেছে নেন। পরে অজানাকে জানার নেশায় এই পেশা ছেড়ে দিয়ে দর্শনে মনোযোগী হন। এনাক্সাগোরাস ছিলেন তার ভাবগুরু। ‘নৌ দাইসেল্ফ’ এই উক্তির জন্য অমর হয়ে আছেন সক্রেটিস, যার অর্থ- ‘নিজেকে জানো।’ সত্যিই নিজেকে জানলেই তবে অন্য কিছু সম্পর্কে জানা সম্ভব। এই সত্যটিই তিনি আকরে ধরেছিলেন। এথেন্সের পথে পথে তিনি ঘুরতেন, আর সুযোগ পেলেই লোকজনকে নানা রকম অদ্ভুদ প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি নিজে থেকেই উন্মোচন করতেন। আর জানতে চাইতেন অন্য লোকজন তার প্রশ্নের উত্তর কী দেয়। নিজের সঙ্গে অন্যের উত্তরের তুলনা করতেন। অর্থাৎ, তিনি জ্ঞান অন্বেষণ করতেন। লোকজন যদি তাকে জ্ঞানী বলতেন, তিনি বলতেন, ‘তোমরা আমাকে জ্ঞানী বলো না। কারন, আমি জ্ঞানী নই। আমি জ্ঞান অনুরাগী।’ পশ্চিমা দর্শনের এ জনকের চোখে মানুষের আসল সৌন্দর্য হলো তার জ্ঞান। আর সবচেয়ে খারাপ হলো অজ্ঞান। জ্ঞানী সর্বদাই জানে যে, সে কিছুই জানে না। সক্রেটিস বলতেন,` আই নৌ দ্যাট আই নৌ নাথিং`। অর্থাৎ আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না। যদি কেউ মনে করে যে সে কিছুই জানে না, তাহলে সে জানতে আগ্রহী হবে। ফলে জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। এটাই হয়ত এই উক্তির মূলমন্ত্র ছিলো। তার মতে বিস্ময় হলো জ্ঞানের শুরু। অর্থাৎ কোনকিছুর প্রতি বিস্ময় জন্মালে তবেই তা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন শুরু হয়। তার মতে জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশ্ন-উত্তর অতি প্রয়োজনীয়। আর সেজন্যই হয়ত সবাইকে প্রশ্ন করত। প্রশ্নের মাধ্যমেই দর্শনগত আলোচনা চালিয়ে যেতেন। প্রথমে যুক্তির ফাঁদ পাততেন। তারপর যতক্ষন প্রতিপক্ষ পরাজিত হয়ে ভুল স্বীকার না করত, ততক্ষন প্রশ্ন করতেই থাকতেন। এই পদ্ধতিটিকে ` সক্রেটিসের শ্লেষ` বা ` সক্রেটিক আইরোনি` বলা হয়। এর মাধ্যমে উত্তরদাতা তার চেষ্টার সর্বোচ্চ স্তরে পৌছে যান। ব্যক্তির থেকে উত্তর বের করে তাকে দেখিয়ে দিতেন যে, জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিলো। এভাবেই তিনি মানুষের মাঝে জ্ঞান চর্চা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সক্রেটিস দেখতে সুন্দর ছিলেন না। প্রসস্ত টাক বিশিষ্ট মাথা, বৃহদাকার শরীর, চ্যাপ্টা নাক, ছোট চোখ। এরকমই ছিলো তার দৈহিক কাঠামো। কিন্তু দৈহিক সৌন্দর্যই কি সব? মনটা ছিলো তার রসে ভরপুর। রসিকতা করেই শিক্ষা দিতেন। পথ-ঘাটকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছিলেন। উদাসীন হয়েছিলেন সংসারের প্রতি। আর তাই স্ত্রী জানথপির রোষানলে বারবার পুড়েছেন। কিন্তু যার মন রসে পরিপূর্ণ, সে কি দগ্ধ হতে পারে? কথিত আছে যে, একদিন জানথপি অনেক বেশি রেগে যায়। কিন্তু সক্রেটিস সেদিকে কর্ণপাত না করে আপন মনে বই পড়ে যায়। তা দেখে জানথপি আরও রেগে যায়। সে এক বালতি পানি নিয়ে যায় ও সক্রেটিসের মাথায় ঢেলে দেয়। এতেও তিনি রেগে যাননি। বরং কৌতুক করে বলেছিলেন, `মেঘ গর্জন করার পর এক পশলা হওয়াটাই স্বাভাবিক।` এই বলে তিনি বাইরে চলে যান। এই সহজ সরল মানুষটির পেছনে এক সময় শত্রু লেগে যায়। তারা হলো তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী ও জ্ঞানী বলে যারা পরিচিত ছিলো। তারা সক্রেটিসকে দেখলে তাদের মুখ শুকিয়ে যেতো। কারণ তারাও তার প্রশ্নে বিদ্ধ হয়ে হার মানত। তাই তার পেছনে শত্রুতা শুরু হয়। প্রচলিত দেব-দেবীর মূর্তির বিরোধিতা করার অভিযোগ যা রাষ্ট্রদ্রোহীতার সঙ্গে তুলনা হতো। আর তিনি যুব সমাজকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যুব সমাজের মধ্যে দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতা প্রবেশ করানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়। তার শাস্তি স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড স্থির করা হয়। প্লেটোর `ফিডো` গ্রন্থে সক্রেটিসের মৃত্যুর কথা বলা আছে। তার মৃত্যুর জন্য হেমলক বিষ আনা হয়। কারাগার থেকে পালানোর জন্য তিনি ক্রিটোর অজুহাত প্রত্যাখান করেন। বিষ পান করানোর পর কর্তৃপক্ষের আদেশে তাকে হাটতে বলা হয়।শরীর অবশ হয়ে আসা পর্যন্ত হাটতে থাকেন। তারপর শুয়ে পরেন। মৃত্যুর সময় ক্রিটোকে বলেছিলেন, " অ্যাসক্লেপিয়াস ( প্রচীন গ্রীসের আরোগ্যলাভের দেবতা) একটি মোরগ পায়, ওইটা পরিশোধ করে দিও।" এর থেকে কি বুঝা যায়? তিনি মৃত্যুকেই `আরোগ্যলাভ` বলে ইঙ্গিত করেছেন। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে যায় তার। দর্শন আকাশের জ্বলন্ত একটি তারকা খসে যায়। কিন্তু তার জ্যোতি আজও আমাদেরকে আলোকিত করে। সূত্র: উইকিপিডিয়া, প্লেটোর ‘ফিডো’ ও ডায়ালগ সমূহ লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। / এআর /

শওকত ওসমান’র ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কথাশিল্পী ও শক্তিশালী লেখক শওকত ওসমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৪ মে। সাহিত্যের বিভিন্ন ঘরানায় প্রায় ছয় দশক অত্যন্ত সাবলিলভাবে লেখালেখি করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।তিনি মূলত কথাশিল্পী। কিন্তু লিখেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, রম্য, স্মৃতিকথা এবং শিশুদের জন্য লিখেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন একটি কাব্যগ্রন্থ ‘শেখের সম্ভরা’।বাংলা কথসাহিত্যে শওকত ওসমান বিশ শতকের শ্রেষ্ঠতম বাঙালিদের একজন। লেখালেখির মধ্যদিয়ে তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। প্রবাদ পুরুষ কথাশিল্পী শওকত ওসমান আজন্ম শোষকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর রচিত ‘ক্রীতদাসের হাসি’ সর্বকালে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণজাগরণের দিশারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।শওকত ওসমান ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। পিতার নাম শেখ মোহাম্দ ইয়াহিয়া। শওকত ওসমান ১৯৯৮ সালের ১৪ মে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।ছাত্রজীবন থেকেই কথাশিল্পী শওকত ওসমান বৃটিশ শাসনবিরোধী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন ঘরানায় সািহত্য চর্চা ও লেখালেখি করেন। অধ্যয়ন করেন মক্তব, মাদ্রাসা ও কলেজে এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪১ সালে বাংলা সাহিত্যে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন কলকাতা কর্পোরেশনে চাকরির মধ্যদিয়ে। পরে পশ্চিবঙ্গ সরকারের তথ্য বিভাগেও কিছুদিন চাকরি করেন। এমএ পাস করার পর কলকাতা সরকারি কমার্স কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে প্রভাষক এবং পরবর্তীতে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেন । ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর লেখালেখিই ছিলো তাঁর পেশা। ছাত্রাবস্থায় তিনি কলকতায় ‘কৃষক’ নামে একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শওকত ওসমান ঢাকায় চলে আসেন। শুরু থেকেই তার গল্প ও উপন্যাসে সকল ধরণের অন্যায়, অবিচার, শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের কথামালা এবং তাদের আশা-আকাংখা ওঠে আসে। ক্রমে পশ্চিমা শোষনের সমালোচনামূলক কথাসাহিত্যে তিনি বিপুল সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রাখেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী জান্তার অত্যাচার নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেন ‘জননী ’ এবং ‘জাহান্নাম থেকে বিদায়’ দুটি উপন্যাস। তিনি জীবিত থাকাকালেই ‘জননী’ উপন্যাস বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রকাশনা সংস্থা প্যাংগুইন ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করে।তার প্রকাশিত উপন্যাস ১৬, গল্পগ্রন্থ ৩, প্রবন্ধগন্থ ৩, নাটক ৪টি, রম্য ১, স্মৃতিকথা ১৫, অনুবাদ ১১, বিভিন্ন বিষয়ে সমগ্র ৭ এবং অন্যান্য বিষয়ে ৯টি গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ গল্পগ্রন্থ হচ্ছে, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্ধি, মনিব ও তার কুৃকুর, জন্ম যদি তব বঙ্গে, সাবেক কাহিনী, জুনু আপা ও অন্যান গল্প, উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে-জননী, ক্রীতদাসের হাসি, বনী আদম, রাজ উপাখ্যান, জাহান্নাম হতে বিদায়, পুরাতন খঞ্জর, জলাঙ্গী, দুই সৈনিক, নেকড়ে অরণ্যে, চোর সন্ধি, রাজা উপাখ্যান।সাহিত্যে অবাদনের জন্য শওকত ওসমান আদমজী সাহিত্য পুরস্কার(১৯৬২), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার(১৯৬৬), প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পাফরমেন্স পদক (১৯৭৬), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭), ফিলিপস সাহিত্য সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৮৬)সহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি সংসদ আজ ১৪ মে বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এক স্মরণসভার আয়োজন করেছে। এতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, ড. আতিউর রহমান, ড. বেগম আকতার কামাল, ড. সৈয়দ আজিজুল ইসলাম অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। সূত্র : বাসস এসএ/  

আজ কবি সুকান্তের ৭১তম মৃত্যুবার্ষিকী    

আজ রোববার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ৭১তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতার যাদবপুর, ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এন্ড কিওর হোমে যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও কবির পিতৃপুরুষের নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের উনশিয়া গ্রামে। সুকান্তের পিতা নিবারণ কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার সুবাদে কবির পরিবারকে কলিকাতাই থাকতে হতো। দীর্ঘদিন কবির পরিবার কলকাতায় অবস্থান করার কারণে তার পূর্ব পুরুষের ভিটে-মাটি বেদখল হয়ে যায়। দখলমুক্ত হওয়ার পরে কবির পৈত্রিক ভিটে দীর্ঘদিন শূণ্য অবস্থায় পড়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে জেলা পরিষদ কবির পৈত্রিক ভিটায় একটি অডিটোরিয়াম ও লাইব্রেরী স্থাপন করেছেন। এখানে কবির স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য প্রতি বছর মার্চ মাসে একটি মেলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু কোন বছরই বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয় না। এ ব্যাপারে অনেকই হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।  স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মিজানুর রহমান বুলু বলেন, আগামি প্রজন্মের কাছে কবি সুকান্তকে তুলে ধরতে হলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে জাঁক-জমক পূর্ণভাবে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা উচিৎ। শুধু বাৎসরিক একটি মেলা করে বাঙালি জাতির কাছে কবি সুকান্তকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কবি সুকান্তকে জাতির কাছে তুলে ধরতে হলে সরকারিভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ।’ উল্লেখ্য, ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কালীঘাটের মহিমা হালদার স্ট্রিটে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নিবারন ভট্টাচার্য। মাতা সুনীতি দেবী। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস, অভিযান, হরতাল। কেআই/এসি     

‘পেছন ফিরে তাকাই যখন’

আজ থেকে চুয়ান্ন বছর আগের কথা। কেমন করে যে এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, তা ভাবতেও অবাক লাগছে।আব্বার রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই সময়টাই ছিল এমন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে যমুনা নদীর তীর ঘেঁষা শহর সরিষাবাড়ী গার্লস হাইস্কুলে পড়তাম। তখনও দেখেছি মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের অনীহা ছিল। আর এ কারণেই স্কুলের চারজন আয়া সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের নিয়ে স্কুলে আসত; আবার স্কুলছুটির পর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত। ১৯৬৩ সালে আব্বা শায়েস্তাগঞ্জে বদলি হলেন। বদলির কারণে আব্বার আর আমাদের মন ভীষণ খারাপ ছিল। বিশেষ করে আমার। কারণ শায়েস্তাগঞ্জে তখন মাধ্যমিক স্তরের কোনো গার্লস স্কুল ছিল না। ইচ্ছে না থাকা সত্তে¡ও আমাদের নিয়ে ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসে আব্বা চলে এলেন শায়েস্তাগঞ্জে। এখানে এসেই আব্বার সঙ্গে গিয়ে আমি আর আমার দুই ভাই শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আমি অষ্টম শ্রেণিতে এবং দুই ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। প্রথম প্রথম ছেলেদের স্কুলে পড়তে বেশ অস্বস্তিতে ভুগছিলাম। নতুন জায়গায় কিছুটা নতুনত্ব ছিল বৈকি! কিন্তু নিজেকে যেন সহজে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। তবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হতে লাগল। স্কুলটি কিন্তু আমার প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল। ছায়া সুনিবিড়। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। শান্ত পরিবেশ। স্কুলের পূর্বদিকে বহমান খোয়াই নদী, উত্তরে শায়েস্তাগঞ্জ-সিলেট রেললাইন সমান্তরাল চলার অনুপম চিত্র ও পশ্চিম পাশেই বিশাল খেলার মাঠ। তাছাড়া রেল স্টেশন ও বাজার থেকে প্রায় এক মাইল দূরত্বে সুন্দর শান্ত পরিবেশ। বৃহদাকারের হৃষ্টপুষ্ট অসংখ্য ডালপালাসমৃদ্ধ শিরিষ গাছগুলোর ছায়া যেন আরো শীতল ও শান্ত করে রেখেছিল স্কুলের পরিবেশ। প্রায় এক হাজার ছাত্রের মধ্যে মাত্র দশ-বারো জন ছাত্রী ছিলাম আমরা। আমাদের জন্য আলাদা বসার কোনো রুম ছিল না। টিচার্স কমনরুমেই তিন-চারটি বেঞ্চে আমরা বসতাম। তাই বলে আমাদের জন্য শিক্ষকদের কোনো অসুবিধা হতো বলে আজো মনে করি না। ক্লাসে যাওয়ার সময় আমরা স্যারদের পেছনে পেছনে যেতাম। ক্লাস শেষে আমরা আবার আমাদের জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকতাম। অষ্টম শ্রেণিতে একশ’র মতো ছাত্র ছিল আর আমরা ছাত্রী ছিলাম মাত্র আটজন। বার্ষিক পরীক্ষার পর মাত্র দুজন ছাত্রী আমি আর হেনা প্রমোশন পেয়ে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। বাকি ছয়জন ঝরে পড়ল। তখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তো আর এখনকার মতো ছিল না। মেয়েদের শিক্ষার হার ছিল খুবই নগণ্য। তাছাড়া ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বাধানিষেধ। লেখাপড়া করার ইচ্ছা সবার; কিন্তু সামাজিক বাধানিষেধের কারণে তা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। মুসলিম পরিবারের মেয়েদের স্কুলে লেখাপড়া করাটাকে মেনে নেওয়ার মনমানসিকতা ছিল না তখনকার সমাজে। কিছু কিছু অভিভাবক মনে করতেন প্রাইমারি পাস করে চিঠিপত্র পড়তে ও লিখতে পারলেই যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ সেটাও মেনে নিতেন না। মেয়েরাও যে উচ্চশিক্ষিত হয়ে চাকরি করে ছেলেদের সমপর্যায়ে বা পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে সেই চিন্তা কোনো কোনো অভিভাবকের মনেও হয়নি। এছাড়া ছিল বাল্যবিয়ের প্রকোপ। বারো-তেরো বছর হলেই বিয়ের কাজটা শেষ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন অভিভাবকরা। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েদের বেশি পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে আমার তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু দেখেছি, তখনকার ছেলেরা অত্যন্ত সভ্য, ভদ্র ও মার্জিত ছিল। সবার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল লেখাপড়া শিখে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। যতদিন এ স্কুলে পড়াশোনা করেছি, এ সময়ের মধ্যে আমরা কোনোদিন কোনো ছাত্রের সঙ্গে কথা বলিনি। এখন কি এটা সম্ভব? অথচ আমরা অনেকেই একই পথে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। আমাদের শিক্ষকরাও তাদের পেশাকে নেশা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাদের যোগ্যতা দিয়েই ছাত্রছাত্রীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। তাঁরা আমাদের স্নেহ, ভালোবাসা, শাসন, আদেশ, উপদেশ দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দু-তিনজন স্যার ছাড়া বাকি সবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। আমরাও মরণসমুদ্রের বেলাভ‚মিতে দাঁড়িয়ে আছি। যতদিন বেঁচে থাকব, আদর্শ মানুষ হিসেবে যেন বেঁচে থাকি। সবার ভালোবাসা ও দোয়া প্রত্যাশা করি। লেখক: ১৯৬৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী

আজ রবি ঠাকুরের ১৫৭তম জয়ন্তী

আজ পঁচিশে বৈশাখ, মঙ্গলবার। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জয়ন্তী আজ। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন কবি। কিন্তু জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যকে অতিক্রম করে জীবন ও কর্মের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় তিনি পত্তন ঘটান নতুন এক বসতি শান্তিনিকেতনের। মা সারদাসুন্দরী দেবী ও জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোল আলো করে পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসেন ১২৬৮ বঙ্গাব্দে। সারা জীবনই তার কামনা ছিল- `যা পেয়েছি প্রথম দিনে, তাই যেন পাই শেষে/দু`হাত দিয়ে বিশ্বরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে।` বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে দিয়েছেন বিকাশের ঊর্ধ্ব সোপানে। `গীতাঞ্জলি` রচনা করে ১৯১৩ সালে তিনি নিয়ে আসেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। ভারতীয় চিত্রকলাকে আধুনিকতার ধারণায় উর্বর করেন তিনি। নোবেল পুরস্কারের অর্থে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দরিদ্র কৃষকদের ঋণ দিতে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক, গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন। রাজপথে নেমে আসেন তিনি বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ছুড়ে ফেলেন ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া `নাইটহুড` উপাধি। এভাবে বার বার সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতার ঘোষণা দিয়েছেন সমাজসচেতন রবীন্দ্রনাথ। তিনি পৃথিবীর একমাত্র গীতিকবি- যার রচিত ভিন্ন তিনটি সঙ্গীত ভিন্ন তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হয়। তার রচিত `আমার সোনার বাংলা` বাংলাদেশে, `জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে` ভারতে এবং `নমো নমো মাতা` শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। কর্মসূচি :রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণডিহি-পিঠাভোগে উদযাপিত হচ্ছে সরকারি আয়োজনে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানীতেও সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করবে। রবীন্দ্রজয়ন্তীর সরকারি মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল আবদুল মুহিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। শিল্পকলা একাডেমি পূর্ববঙ্গে অবস্থানের সময় যেসব সাহিত্য রচনা করেছেন সেসব নিয়ে আয়োজন করেছে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে থাকছে রবীন্দ্র মেলা। ছায়ানটে রয়েছে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। বাংলা একাডেমি ইতিমধ্যে প্রদান করছে রবীন্দ্রপদক। এছাড়া আয়োজন করছে আলোচনা সভার। এ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে স্মরণ করবে কবি রবীন্দ্রনাথকে। এসএইচ/

‘আড়াল’ থেকে আলোয় আসার গল্প

  অফলাইন-অনলাইন বিশেষত ফেসবুকে প্রতিদিন তো কত শত সহস্র, অযুত গল্প-কবিতা লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেসবের ঠিক কতসংখ্যক লেখা হয়ে উঠছে-এ প্রশ্নটা থেকেই যায়। যে লেখার মিষ্টত্ব চুইংগাম চিবোনোর মতো লেখা পাঠ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে যায় সেগুলোর স্বাদ মনে-মুখে কতটুকুই বা লেগে রয়। তবুও তো দলেবলে অনেকেই ক্রমশ লেখক হয়ে উঠছি। তবে মন্দের ভালো এই যে, আজকাল ফেসবুকে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে রঙিন সব ইমো আছে, নতুবা পাঠকের মতো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি হালে আর কেউ থাকতো না। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, ফেসবুককেন্দ্রিক সাহিত্য গ্রুপগুলো সৃজনশীল মানুষদের জন্য বিশাল এক উন্মুক্ত প্রান্তর তৈরি করেছে। তেমনই এক প্লাটফরম ‘পেন্সিল’ সাহিত্য গ্রুপ যার পেন্সিল-জাগৃতি প্রতিভা-অন্বেষণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলাতে আড়াল থেকে আলোয় এসেছেন নবীন গল্পকার ‘দেবদ্যুতি রায়।’ দেবদ্যুতি রায়ের গল্প বলার ধরনটি বেশ সাবলীল আর আড়ম্বরহীন। এই বইয়ের গল্পগুলোতে তিনি তুখোড় সন্ধানীর মতো আড়াল থেকে সামনে নিয়ে এসেছেন নরনারীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নানান সামাজিক অসঙ্গতি। সেই সঙ্গে শহর আর গ্রামের পথেঘাটে, দোকানে, রেঁস্তোরায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুখগুলোর কষ্ট, আনন্দ, ভালবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সহজ সরল গল্পগুলোই দেবদ্যুতি রায়ের গল্পগ্রন্থ ‘আড়াল’ এ স্থান পেয়েছে। জীবনের যেই গল্পগুলো কখনো পুরনো হয় না, বার বার সত্যি হয়ে বাস্তবতার অনুষঙ্গ হয়ে থাকে সেসব গল্পই সংকলিত হয়েছে এই গল্পগ্রন্থে। যেহেতু প্রতিযোগিতামূলকভাবে পাণ্ডুলিপি নির্বাচিত মাধ্যমে এই লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে সেহেতু নিশ্চিতভাবে বলা যায় গল্পকার তার লেখা সেরা গল্পগুলোই এই বইয়ের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এবার বইটির কিছু গল্পের পাঠ অনুভূতি পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবো। এই বইয়ে সংকলিত ‘নূপুর’ গল্পটির আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ আমার খুব ভালো লেগেছে যদিও গল্পটি পাঠের শেষে নাহারের আপাত সুখী জীবনের তোরঙ্গ খুলে বেরিয়ে আসা নির্মমতা আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আসন্ন শীতের হালকা হিম হিম সন্ধ্যায় অনাগত সন্তানের জন্য সুখস্বপ্নে বিভোর থাকার বদলে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কেন আনমনা হয় তপা? `মাকড়সা` গল্পের তপার বুক হু হু করে উঠে শৈশবের কোন স্মৃতি মনে পড়ে? দুঃসহ স্মৃতিকাতরতার গল্প `মাকড়সা` পড়ে আত্মজার ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাতর হয়েছি। ‘ভেংচি’ গল্পটির বর্ণনাভঙ্গি বেশ সাবলীল ও মায়াময়। যেই মুহুনি বুড়ির বিড়বিড় করে বলা খোনা কথা আর কাশির খুকখুক শব্দ ছাড়া জগতসংসারের কারো কাছে বুড়ির উপস্থিতি টের পাবার অন্য কোনো উপায় ছিল না সেই বুড়ির মৃত্যুর পর তার লাশটিই যেন স্বজনদের কান্নায় নতুন জীবন পায়। `দাম` ও ` সম্বল` গল্পদুটো অচেনা ছকের না হলেও বর্ণনাশৈলীর দক্ষতায় মনে আঁচড় কেটেছে। জীবনের কত সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় একজন লেখকের চোখে ধরা পড়ে যায়, ভাবতে অবাক লাগে। এই বইয়ের তেমনই একটি গল্প ‘আড়াল।’ মাঝে মাঝে কিছু আড়াল খুব প্রয়োজন। জীবনের কঠিনতম কিছু সত্য থেকে নিজেকে আড়াল করে না রাখতে পারলে নিজের তুচ্ছতা অন্যের কাছে ধরা পড়ে যাবার ভয়টা গভীর থেকে গভীর হয়। সেই নিগুঢ় সত্যিটা পিউ জানে বলেই হয়তো ‘আড়াল’ গল্পে বান্ধবী কেয়ার চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি বসে থাকার পরও একবাটি স্যুপের ধোঁয়াওঠা বাষ্পে নিজের অনুভূতিটুকু গোপন করতে চায়। ‘আড়াল’ গ্রন্থের ‘চোর-পুলিশ খেলা গল্পটির আসল মজা গল্পের একেবারে শেষের টুইস্টে। পাঠক যখন ভাবছেন চেইনটি কে নিলো, কে নিলো.. তখন পাঠকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে গল্পকার এমন একটি আবহ তৈরি করেন যে গল্প শেষ হবার মিনিটখানেক পর পাঠক টের পান একজনের দিকে চোখ রাখতে রাখতে আরেকজন এসে চেইনটি নিয়ে গেছে। `একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং` গল্পটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে লেখা মজার একটি গল্প। `নিশুতি’ গল্পটি পড়ে মন ভরেনি। গল্পটি এই বইয়ের দারুণ একটি শক্তিশালী গল্প হয়ে ওঠার আভাস দিয়ে ঠিক যেই মুহূর্তে ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে তখনই লেখক গল্পটির সমাপ্তি টেনে দিয়েছেন। `আড়াল` গ্রন্থের ক্ষত, দা, তত্ত্ব এবং একটি কাল্পনিক ঘটনা এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে বুঝেছি লেখকের হাতে গল্প আছে প্রচুর। শ্বাসরুদ্ধকর টুইস্ট দিয়ে গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটানো, শব্দের কোমলতার নিপুণ ব্যবহার আর নির্লিপ্তভাবে গল্প বলে যাবার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে লেখক পাঠকদের আরও সমৃদ্ধ সব লেখা উপহার দিবেন সেই প্রত্যাশা রইল। এসএইচ/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি