ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২২:১৪:১৪

প্রাণের মেলায় বইপ্রেমীদের ঢল

প্রাণের মেলায় বইপ্রেমীদের ঢল

মাত্র একদিন আগে ‘অমর একুশে’র চেতনা উদ্বীপ্ত গণমানুষের বইমেলাই যে ঢেউ লেগেছিলো সেই আবহের জের যেতে না যেতেই  দিন ফুরিয়ে আসছে একুশে গ্রন্থমেলার । আজ ছিলো মেলার ২৩তম দিন, ৬ষ্ঠ শিশু প্রহর এবং শেষ শুক্রবার।  এমনিতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো বইমেলায় লোক সমাগম বেশি হয়, তার উপরে এবারের মেলার শেষ শুক্রবার হিসেবে আজ জনস্রোতের ঢল নেমেছে।  বিকিকিনিও  হচ্ছে আশানুরূপ। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব শ্রেণীর পাঠকের সমাগম দেখা মিলেছে মেলাতে। সরেজমিনে দেখা যায়, ছুটির দিন  ও সকালে শিশু প্রহর থাকায় বিকেল ৩টার আগে থেকেই প্রাণের মেলা বইমেলায় (দুই প্রাঙ্গণে) প্রবেশের জন্য উম্মুখ হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অনেক তরুণ-তরুণীকে। আর তিনটায় প্রবেশপথ খুলে দিলে মুহূর্তেই প্রবেশ করে মেলার ভেতরে। প্রবেশ মাত্রই যে যার পছন্দের বই কিনতে চলে যায় পছন্দের স্টলে স্টলে। বিকেল আসতে না আসতেই মেলার উভয় প্রাঙ্গণে ভীড় বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে বেচাকেনাও। এ সময় কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয়কর্মী জানালেন, বইয়ের বিক্রি অন্যান্য দিনের চেয়ে ভালো। বিশেষ দিনগুলোর মতো এখন মেলায় তেমন উপচেপড়া ভিড় না থাকলেও মেলায় ভিড় আছে যথেষ্ট। চলছে প্রকৃত বইপ্রেমীদের হরদম কেনাকাটা, বেড়েছে সব ধরনের বইয়ের বিক্রি। প্রায় সবকটি প্যাভিলিয়ন ও স্টলে বইয়ের ক্রেতার ভিড় ছিলো চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশের হাতেই নতুন বইয়ের প্যাকেট। বই বিক্রিও হয়েছে অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের চেয়ে বেশি। জনপ্রিয় কবি-লেখকদের গল্প-কবিতা-উপন্যাস যেমন বিক্রি হচ্ছে তেমনই ভালো বিক্রি হচ্ছে মননশীল বই, প্রবন্ধের বই। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীদের  এখন কি ধরনের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে তারা বলছেন, বিষয়ভিত্তিক বইয়ের কদর দিন দিন বাড়ছে। তেমনি প্রবন্ধ, গবেষণামূলক গ্রন্থের বিক্রিও বেশ ভালো। বিষয়টাকে প্রকাশকরা দেখছেন পাঠকের চিন্তার স্তরের উত্তরণ হিসেবে। তারা আরও বলছেন, প্রকৃত পাঠকরা দেখেশুনে বই কেনার জন্য এই দিনগুলোই বেছে নেয়। এই সময়ে তারা দুই হাতে বই কেনে। মেলাতে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী দ্বীন ইসলামের সাথে। তিনি একুশে  টিভি অনলাইনকে বলেন, চাকরি করার কারণে সব সময় মেলাতে আসতে পারি না। আজ শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় মেলাতে এসেছি। ইতোমধ্যে  দুইটি বই কিনেছি। পছন্দ হলে আরও কিছু বই নিয়ে যাবে। সরকারি বাংলা কলেজের শিক্ষার্থী করিব আহমেদ একুশে টিভি অনলাইনকে জানান,  লেখাপড়ার পাশাপাশি জব করার কারণে  ইচ্ছা থাকলেও  ছিুটির দিন ছাড়া মেলাতে আসতে পারি না। তাই আজ  ছুটির দিন থাকার কারণে তিন বন্ধু মিলে মেলাতে এসেছি। তিনি আরও জানান,  হুমায়ুন আহমেদের হিমু সিরিজের দশ বইটি নিয়েছি। এছাড়া শরৎচন্দ্র লেখা চরিত্রহীন, শ্রীকান্ত নিয়েছে।  নতুন কিছু লেখকের বই পেলে নিয়ে যাবে। প্রকাশনা সংস্থা ‘কথা’ প্রকাশের বিপণনের দায়িত্ব পালনকারী মো. ইউনুস বলেন একুশে টিভি অনলাইনকে বলেন, মাত্র দুই দিন আগে ’৫২’তে একঝাক তরুণের রক্তে লেখা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণ-স্বাক্ষর ‘অমর একুশে’ স্মরণে জাতি পালন করলো ‘শহীদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। একুশ মানে মাথানত না করা- এমনই শপথ নিয়েই যেন তারা এসেছিল মেলা প্রাঙ্গণে। মেলায় ঢুকেই তাদের কেউ বই কিনছে, কেউ বই দেখছে। দু’প্রাঙ্গণের এই মেলার চারদিকে ঘুরছে-নির্বিঘ্নে। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশের অধিকাংশ প্রকাশকরা বলছে তাদের বিক্রি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। আমরা আশা করছি মেলার বাকি ক’দিন বিক্রি আরও বাড়বে। তাছাড়া এখন মেলাতে যারা আসছে তারা বই কিনতেই আসছে। আজ মেলা শুরু  হয় সকাল ১১টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। এই সময়ের মধ্যে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকে শুধুই শিশু-কিশোরদের জন্য। এ আয়োজনের পরেই মেলার মূলমঞ্চে সন্ধ্যায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করেন আলম দেওয়ান, শফিউল আলম রাজা, আঁখি আলম এবং আমজাদ দেওয়ান। টিকে
শিশুদের কলরবে মুখরিত বইমেলা

শিশুদের কলরবে মুখরিত বইমেলার শেষ ছুটির দিনের শিশুপ্রহর। অমর একুশে গ্রন্থমেলার আজ ছিলো ২৩তম দিন এবং ৬ষ্ঠ শিশুপ্রহর। মাসব্যাপী মেলার প্রতি শুক্র ও শনিবার থাকে শিশু প্রহর। আজ শুক্রবার সকালে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, শিশুপ্রহরে বাংলা একাডেমির চত্বরজুড়ে ছোটাছুটি, মা-বাবার হাত ধরে স্টলে স্টলে বই দেখে, বই কিনে, নতুন বই বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছে তারা। মেলাই এই খুদে পাঠকরা খুঁজতে এসেছিল তাদের পছন্দের নতুন বই। বইমেলা পরিণত হয়েছিল শিশুদের আনন্দ মেলায়। সকাল ১১ টা থেকেই শিশুরা ভিড় করে নির্ধারিত শিশু কর্নারে। সকালেই মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোরদের চূড়ান্ত সঙ্গীত প্রতিযোগিতা। কোলের ছোট্ট শিশু আর স্কুল পড়ুয়া সন্তানসহ একুশের চেতনাদীপ্ত বাবা-মা সমবেত হয়েছিল এখানে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চলে শিশু প্রহর। সকালের স্নিগ্ধ রোদে নানা বয়সের ছেলে-মেয়ে এসে ভিড় করেছিল বটতলার নজরুল মঞ্চের সামনে। বই কেনার পাশাপাশি তারা ঘুরে বেড়িয়েছে পুরো চত্বর। দল বেঁধে এসেছিল সাদা টি শার্ট পরা বেশ কয়েকজন শিশু-কিশোর। সঙ্গে ছিলেন তাদের শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমি `স্পর্শ` নামে একটি বেসরকারি সংস্থার হয়ে কাজ করি। এখানে যাদের দেখছেন তারা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু। আমরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্রত্যেককে দু’শ টাকার করে বই কিনে দেব।“ ৮ থেকে ১২ বছরের এই ছেলে-মেয়েদের দলের কাছে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতির কথা জানতে চাইলে সবাইকে খুব উল্লসিত দেখা যায়। অনেক দিন থেকে ঠিক করে রাখা বইগুলো কিনতে পেরে ওদের আনন্দ চোখে-মুখে ঠিকরে পড়ছিল। ওরা এসেছে মিরপুর পল্লবীর কসমস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। তাদের শিক্ষক জানালেন, চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের মেলায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছেন তারা। বই কিনে এদের অনেকেই প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, ছুটাছুটি করছিল নির্ভাবনায়। আর ভিড় করছিল আইসক্রিমের দোকানে। মেলার প্রকৃত আকর্ষণই ছিল শিশু-কিশোরদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দের হিল্লোল। স্কুলের নানা বয়সী ছেলে-মেয়েরা নানা রঙের ইউনিফর্ম পরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, বই কিনছিল তাদের আপন খেয়ালে। স্টলেই ছিল বাংলা বইয়ের সমাহার। স্টলে স্টলে ছিল শিশুদের বই, কিশোরদের বই। সর্বোপরি চিরায়ত সুকুমার, শিবরাম। তবে দুই-একটি স্টলে বিক্রি হচ্ছিল শিশুদের জন্য ইংরেজি বইও। ওয়ার্ল্ড অব চিলড্রেন`স বুকস ও বেবি টিচার নামের স্টলে গ্রন্থমেলার নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিক্রি হচ্ছে ইংরেজি বই। শিশু কর্নারে শুধু বাংলাভাষার বই বিক্রেতা `আরো প্রকাশনী`র ম্যানেজার জাভেদ শেখ বলেন, “একুশে বই মেলা বাংলা ভাষার মেলা। অনেক বাবা-মা তাদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সন্তানদের চাহিদা অনুযায়ী যখন ওইসব বিদেশি ভাষা-সংস্কৃতির বই আমাদের কাছে চান, আমি তাদের বলি এই মেলা আপনার জন্য নয়। আমাদের এখানকার বইগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা প্রয়োজন। পশ্চিমা বিশ্বের বইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের বইয়ের আকার ও রঙ্গে নতুনত্ব আনতে হবে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই মেলায় নীতিমালা বাহির্ভূত বিদেশি ভাষা-সংস্কৃতির বইয়ের বিক্রি ভালো হলেও, বিষয়টি নিঃসন্দেহে একুশের চেতনাপরিপন্থী।” মেলাতে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার বলেন, ঢাকাতে শিশুর মানসিক বিকাশে তেমন জায়গা নেই। যে কারণে যতটুকু সু্যোগ পেয়েছি সেটি হাত ছাড়া করতে চাই না। সে কারণে সন্তানের আনন্দ দিতে মেলাতে নিয়ে আসছি। বিকাল ঠিক চারটায় মূল মঞ্চে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি` অমর একুশের গান বাজতে বাজতে শুরু হয় আলোচনা অনুষ্ঠান। টিকে  

বইমেলায় সুর্বণ আদিত্যের ‘দুধ পুকুরের সিঁড়ি’

ভিন্নচোখ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পেল কবি সুর্বণ আদিত্যের প্রথম কবিতার বই ‘দুধ পুকুরের সিঁড়ি’। বইটি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ভিন্নচোখের ৫৮৪ ও ২৬ নাম্বার স্টলে পাওয়া যাবে। এছাড়া বইটি অনলাইন বুকশপ রকমারীতেও পাওয়া যাবে। গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে কবিতা লিখেছেন কবি সুবর্ণ আদিত্য। তার বলার ঢং, নিজস্ব ভাবনা, প্রেস-ভালোবাসা, দেশমাতৃকা, যুদ্ধ ও আত্মদ্বন্ধগুলিই সুনিপুণভাবে তুলে এনেছেন পাঠকের জন্য। সুর্বণ আদিত্যে বলেন, আমি চেষ্টা করেছি কবিতার মাধ্যমে প্রেম ভালোবাসা, ‍যুদ্ধ, জীবনের নানা রুপকে তুলে ধরার। কবিতা পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে। তাই বই মেলায় এমন একটি কবিতার বই নিয়ে আসলাম। আশা করি সবার কাছে ভালো লাগবে। বইটি ভিন্নচোখের স্টলে পাওয়া যাবে।  এসি/

হাজারো বইয়ের ভীড়ে মান নিয়ে প্রশ্ন

একুশে বইমেলায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বই। ইতোমধ্যে তিন হাজার ৪শ’ ৬২টি নতুন বই এসেছে মেলায়। তবে এতো বইয়ের ভীড়ে মানসম্পন্ন বই নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পাঠকের মনে। এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি প্রকাশকরাও। তারা বলছেন, জনপ্রিয় লেখকদের বই প্রকাশেই আগ্রহ বেশি তাদের। শেষ সপ্তাহে গড়িয়েছে একুশে বইমেলা। তাই বিকেল থেকেই হাজারো মানুষের পদচারণা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সন্ধ্যায় তা রুপ নেয় মিলনমেলায়। লেখক, পাঠক আর প্রকাশকের এই মিলনমেলায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বই। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৪শ’ ৬২টি নতুন বই এসেছে মেলায়। এসব বইয়ের মান নিয়ে সবসময় প্রশ্ন থাকে পাঠকের মনে। বইয়ের মান যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায়, এই প্রশ্নের উত্তরও মেলে না কারো কাছে। তবে, লেখকরা বলছেন, পাঠকই নির্ধারণ করে বইয়ের মান। এদিকে, বই প্রকাশের আগে মান যাচাই করেন না বলে স্বীকার করলেন প্রকাশকরাও। সময় প্রকাশনীর ফরিদুর রহমান বলেন, লেখকের জনপ্রিয়তা-ব্যক্তিগত সম্পর্ক ধরে রাখা আর ব্যবসায়িক চিন্তা থেকেই বই প্রকাশ করা হয়। এমন মান যাচাইয়ের অপ্রতুলতায় সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি না করা না গেলে মানসম্পন্ন বই নির্বাচনের কি সুযোগ আছে তাই নিয়ে প্রশ্ন সবার। টিকে

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে ’৪৭ থেকে ’৫২

‘কোনো বিরোধী দল পাকিস্তানে না থাকায় সরকার গনতন্ত্রের পথ ছেড়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে চলছিল দেশ। সর্বময় ক্ষমতার মালিক লিয়াকত আলী কোনো সমালোচনাকেই পাত্তা দিচ্ছিলেন না। ওই সময় একুশজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বের করে দিল এবং রাজশাহী জেলা ত্যাগ করার জন্য সরকার হুকুম দিল। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রসংগঠনগুলো কোন সভা করলেই একদল গুন্ডা ভাড়া করে এনে লেলিয়ে দেওয়া হতো তাঁদের পেটানোর জন্য। ওইসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে যাই একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে লাখো মানুষের প্রিয় শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আমাকে বলেন, মুজিব বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হযে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাস এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরই দেশে শুরু হয় নিপীড়ন নির্যাতন। আর সেই নিপীড়ন নির্যাতনের রোষানলে পড়েন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। ৪৭’ থেকে ভাষা আন্দোলন, কেমন ছিল সেদিনের উত্তাল দিনগুলি। তা উঠে এসেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীমূলক বই ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তে। নিচে সে দিনগুলি চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো। অসমাপ্ত আত্নজীবনী আমি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সংগঠনের দিকে নজর দিলাম। প্রায় সকল কলেজ ও স্কুলে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল। বিভিন্ন জেলায়ও শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠতে লাগল। সরকারি ছাত্র সংগঠনটি শুধু খবরের কাগজের মধ্যে বেঁচে রইল। ছাত্রলীগই সরকারের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ ও সমালোচনা করেছিল। কোন বিরুদ্ধ দল পাকিস্তানে না থাকায় সরকার গনতন্ত্রের পথ ছেড়ে একনায়কত্বের দিকে চলছিল। প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খান সর্বময় ক্ষমতার মালিক হলেন। তিনি কোনো সমালোচনাই সহ্য করতে পারছিলেন না। দুই চারজন কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্র ছিল যারা সরকারকে পছন্দ করত না। কিন্তু তারা এমন সমস্ত আদর্শ প্রচার করতে চেষ্টা করত যা তখনকার সাধারণ ছাত্র ও জনসাধারণ শুনলে ক্ষেপে যেত। এদের আমি বলতাম, “জনসাধারণ চলেছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনসাধারন আপনাদের কথা বুঝতেও পারবে না, আর সাথেও চলবে না। যতটুকু হজম করতে পারে ততটুকু জনসাধারণের কাছে পেশ করা উচিত।” তারা তলে তলে আমার বিরুদ্ধাচারণও করত, কিন্তু ছাত্রসমাজকে দলে ভেড়াতে পারত না। এই সময় সরকারি কলেজে ছাত্রদের উপর খুব অত্যাচার হল। এরা প্রায় সকলেই ছাত্রলীগের সভ্য ছিল। একুশজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বের করে দিল এবং রাজশাহী জেলা ত্যাগ করার জন্য সরকার হুকুম দিল। অনেক জেলায় ছাত্রদের উপর অত্যাচার শুরু হয়েছিল এবং গ্রেফতার ও করা হয়েছিল । ১৯৪৯ সালে জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে দিনাজপুরেও ছাত্রদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। জেলের ভেতর দবিরুল ইসলামকে ভীষণভাবে মারপিট করেছিল- যার ফলে জীবনের তরে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়েছিল। ছাত্ররা আমাকে কনভেনর করে “জুলম প্রতিরোধ দিবস” পালন করার জন্য একটা কমিটি করেছিল। একটা দিবসও ঘোষণা করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলার সমস্ত জেলায় জেলায় এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে ছাত্রবন্দিদের ও অন্যান্য বন্দিদের মুক্তি দাবি করা হয় এবং ছাত্রদের উপর হতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করা হয়। এই প্রথম পাকিস্তানে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আন্দোলন এবং জুলুমের প্রতিবাদ। এর পূর্বে আর কেউ সাহস পায় নাই। তখনকার দিনে আমরা কোনো সভা বা শোভাযাত্রা করতে গেলে একদল গুন্ডা ভাড়া করে আমাদের মারপিট করা হয় এবং সভা ভাঙার চেষ্টা করা হয়। জুলুম প্রতিরোধ দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ও কিছু গুন্ডা আমাদানি করা হয়েছিল। আমি খবর পেয়ে রাতেই সভা করি এবং বলে দেই, গুন্ডামির প্রশ্রয় দেওয়া হলে এবার বাধা দিতে হবে। আমাদের বিখ্যাত আমতলায় সভা করার কথা ছিল, কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মাঠে মিটিং করলাম । একদল ভাল কর্মী প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয় গেটে রেখেছিলাম, যদি গুন্ডারা আক্রমন করে তারা বাধা দিবে এবং তিন দিক থেকে তাদের আক্রমন করা হবে যাতে জীবনে আর রমনা এলাকায় গুন্ডামি করতে না আসে এই শিক্ষা দিতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় সরকারি দল প্রকাশ্যে গুন্ডাদের সাহায্য করত ও প্রশ্রয় দিত। মাঝে মাঝে জগন্নাথ কলেজ, মিটফোর্ড ও মেডিকেল স্কুলের ছাত্ররা শোভাযাত্রা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা করলেই  হঠাৎ আক্রমন করে মারপিট করত। মুসলিম লীগ নেতারা একটা ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছিল যাতে কেউ সরকারের সমালোচনা করতে না পারে। সুসলিম লীগ নেতারা বুঝতে পারছিলেন না, যে পন্থা তারা অবলম্বন করেছিলেন সেই পন্থাই তাদের উপর একদিন ফিরে আসতে বাধ্য। ওনারা ভেবেছিলেন গুন্ডা দিয়ে মারপিট করেই জনমত দাবাতে পারবেন। এ পন্থা যে কোনোদিন সফল হয় নাই , আর হতে পারে না- এ শিক্ষা তারা ইতিহাস পড়ে শিখতে চেষ্টা করে নাই। এই সময় ব্রাক্ষণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানার কৃষঞনগরে জনাব রফিকুল হোসেন এক সভার আয়োজন করেন-কৃষ্ঞনগর হাইস্কুলের দ্বারোদঘাটন করার জন্য। আর্থিক সাহায্য পাওয়ার জন্য জনাব এন,এম,খান পিএসপি তখনকার ফুড ডিপার্টমেন্টের ডাইরেক্টার জেলারেল ছিলেন, তাকেই নিমন্ত্রন করা হয়েছিল, তিনি রাজিও হয়ে হয়েছিলেন। সেখানে বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দিন আহম্মদ, সোহরাব হোসসেন ও বেদারউদ্দিন আহম্মদ গান গাইবেন। আমাকেও নিমন্ত্রন করা হয়েছিল। জনার এন এম খান পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে এই মহকুমায় এসডি ও হিসাবে অনেক ভাল কাজ করার জন্য জনপ্রিয় ছিলেন। আমরা উপস্থিত হয়ে দেখলাম এন এম খান ও আব্বাস উদ্দিন সাহেবকে দেখবার জন্য হাজার হাজার লোক সমাগম হয়েছে। বাংলার গ্রামে গ্রামে আব্বাস উদ্দিন সাহেব জনপ্রিয় ছিলেন। জনসাধারন তার গান শুনবার জন্য পাগল হয়ে যেত। তার গান ছিল বাংলার জনগনের প্রানের গান। বাংলার মাটির সাথে ছিল তার নাড়ির সম্বন্ধ। দুঃখের বিষয় , সরকারের প্রচার দপ্তরে তার মত গুনী লোকের চাকরি করে জীবিকা অর্জন করতে হয়েছিল। সভা শুরু হল, রফিকুল হোসেন সাহেবের অনুরোধে আমাকেও বক্তৃতা করতে হল। আমি জনার এন এম খানকে সম্বোধন করে বক্তৃতায় বলেছিলাম, আপনি এদেশের অবস্থা জানেন। বহুদিন বাংলাদেশে কাজ করেছেন, আজ ফুড ডিপার্টমেন্টোর ডিরেক্টর জেনারেল আপনি, একবার বিবেচনা করে দেখেন এই দাওয়ালদের অবস্থা এবং কি করে এরা বাচবে ! সরকার তো খাবার দিতে পারবে না-যখন পারবে না, তখন এদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতেছে কেন? দাওয়ালদের নানা অসুবিধার কথা বললাম, জনসাধারণকে অনুরোধ করলাম, স্কুলকে সাহায্য করতে। জনাব খান আশ্বাস দিলেন তিনি দেখবেন, কিছু করতে চেষ্টা করবেন। তিনি সন্ধ্যায় চলে যাবার পর গানের আসর বসল। আব্বাস উদ্দিন সহেব, সোহরার হোসেন ও বেদারউদ্দিন সাহেব গান গাইলেন। অধিক রাত পর্যন্ত আসর চলল। আব্বাস উদ্দিন সাহেব ও আমরা রাতে রফিক সাহেবের বাড়িতে রইলাম । রফিক সাহেবের ভাইরাও সকলেই ভাল গায়ক। হাসনাত, বরকত ও ভাল গান গাইত। এরা আমার ছোট ভাইয়ের মত ছিল।  আমার সাথে জেল ও খেটেছে। পরে দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম, আশুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে। পথে পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাস উদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল , নদীর ঢেউগুলি যেন তার গান শুনছে। তারই শিষ্য সোহরার হোসেনও বেদার উদ্দিন তার নাম কিছুটা রেখেছিলেন, আমি আব্বাস উদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বললেন মুজিব বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিটার ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হযে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্ট করেছিলাম। আমরা রাতে ঢাকা এসে পৌছলাম। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে যেয়ে শুনলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করেছে এবং ছাত্ররা তার সমর্থনে ধর্মঘট করছে। নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীরা বহুদিন পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করেছে একথা আমার জানা ছিল। এরা আমার কাছেও এসেছিল। পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেসিডেন্সিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন এটাই পূর্ব বাংলার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্র অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়ে নাই। তাদের সারা দিন ডিউটি করতে হয়। পূর্বে বাসা ছিল, এখন তাদের বাসা প্রায়ই নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ নতুন রাজধানী হয়েছে, ঘড়বাড়ির অভাব। এরা পোশাক পেত , পাকিস্তান হওয়ার পরে কাউকেও পোশাক দেওয়া হয় নাই। চাউলের দাম ও অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। চাকরির কোনো নিশ্চয়তা ও ছিল না। ইচ্ছা মত তাড়িয়ে দিত, ইচ্ছামত চাকরি দিত। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রথমে সংঘবদ্ধ হোন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন, তা না হলে কর্তৃপক্ষ মানবে না। তারা একটা ইউনিয়ন করেছিল, একজন ছাত্র তাদের সভাপতি হয়েছিল। আমি আর কিছুই জানতাম না। জেলায় জেলায় ঘুরছিলাম। ঢাকা এসে যখন শুনলাম, এরা ধর্মঘট করেছে তখন বুঝতে বাকি থাকল না, কর্তৃপক্ষ এদের দাবি মানতে অস্বীকার করেছে। তবু এত তাড়াতড়ি ধর্মঘটে যাওয়া উচিত হয় নাই। কারণ, এদের কোন ফান্ড নাই। মাত্র কয়েকদিন হল প্রতিষ্ঠান করেছে। কিন্তু কি করব, এখন আর উপায় নাই। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, ছাত্ররা এদের প্রতি সহানুভূতিতে ধর্মঘট শুরু করেদিয়েছে। কর্মচারীরা শোভযাত্রা বের করেছিল। ছাত্ররাও করেছিল। আমি কয়েকজন ছাত্রনেতাকে নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের কাছে দেখা করতে যেয়ে তাকে সব বুঝিয়ে বললাম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সকল কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবেন ঠিক করেছেন।  বিকেলে আবার ফজলুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপিদের নিয়ে সাক্ষাৎ করলাম এবং অনুরোধ করলাম । এই কথা বলে যে, আপনি আশ্বাস দেন ওদের ন্যায্য দাবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করে দিতে চেষ্টা করবেন এবং কাউকে চাকড়ি থেকে বরখাস্ত করবেন না এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কারও বিরুদ্ধে গ্রহন করবেন না। অনেক আলোচনা হয়েছিল, পরের দিন তিনি রাজি হলেন,। আমাদের বললেন, আগামীকাল ধর্মঘট প্রত্যাহার করে চাকরিতে যোগদান করলে কাউকেও কিছু বলা হবে না এবং আমি কর্তৃপক্ষের কাছে ওদের ন্যায্য দাবি মানাতে চেষ্টা করব। আমরা তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলাম, তখন বিকাল তিনটা বেজে গিয়েছে। আমরা ওদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে ঘোষনা করলাম,কাল তিনটা থেকে ছাত্ররা ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে। কারন বহু কর্মচারী কর্মচারী ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে, ভাইসচ্যান্সেলরের আশ্বাস পেয়ে তারা রাজি হয়েছে। অনেক কর্মচারী দুরে দুরে থাকে সকলকে খবর দিতে হবে।  যতদুর সম্ভব, পরের দিন ছাত্ররাও ক্লাসে যোগদান করেছে। কর্মচারীরাও অনেকেই যোগদান করেছে। যারা বারটার মধ্যে এসে পৌছাতে পেরেছে, তাদের কর্তৃপক্ষ গ্রহন করেছে। আর যারা বারটার পরে এসেছে তাদের যোগদান করতে দেওয়া হয় নাই। অনেককে খবর পেয়ে নারায়নগঞ্জ থেকেও আসতে হয়েছিল। শতকরা পঞ্চাশজন কর্মচারী দেরি করে আসতে বাধ্য হয়েছিল,কারন বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর দিয়ে তাদের আনাতে হয়েছিল। আমাকে ও আমার সহকর্মীদের কাছে কর্মচারীরা এসে সব কথা বলল। একে একে আবার সকলে জড়ো হল। আমরা মিথ্যেবাদী হয়ে যাবার উপক্রম। সকলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে আবার আমরা ভাইস-চ্যান্সেলারের বাড়িতে উপস্থিত হলাম এবং বললাম , কি ব্যাপার? তিনি বললেন, আমি যখন আগামীকাল কাজে যোগদান করতে বলেছি তার অর্থ এগারটায় যোগদান করতে হবে, এক মিনিট দেরি হয়ে গেলে তাকে নেওয়া হবে না। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তিনি বুঝেও বুঝলেন না। এর কারণ ছিল সরকারের চাপ। আমরা বললাম সমান্য দু এক ঘন্টার জন্য কেন গোলমাল সৃষ্টি করলেন? তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না, আমরা তাকে আরও বললাম, আপনি পূবেই তো বলতে পারতেন, এগারটার মধ্যে যোগাদান করতে হবে। আপনি তো বলেছিলেন আগামীকালের মধ্যে যোগদান করলে চলবে। তিনি আর আলোচনা করতে চাইলেন না। আমরা বলে এলাম তাহরে ধর্মঘটও চলবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র-কর্মচারীদের যুক্ত সভা হল। সভায় আমি সমস্ত ঘটনা বললাম এবং আগামীকাল থেকে ছাত্র-কর্মচারীদের ধর্মঘট চলবে, যে পর্যন্ত না এদের ন্যায্য দাবি মানে। শোভাযাত্রা হল, আবার পরের দিন সকাল এগারটায় শোভাযাত্রা শুরু হবে বলে ঘোষনা করা হল। এবার আমাকে সক্রিয় অংশগ্রহন করতে হল। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার ও শিক্ষাবিদ সরকারের চাপে এই রকম একটা কথার মারপ্যাচ করতে পারে এটা আমার ভাবতেও কষ্ট হয়েছিল। রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সভার পরে ঘোষনা করল, বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হল। হল থেকে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চলে যেতে হবে। আর যে সমস্ত কর্মচারী ধর্মঘটে যোগদান করেছে তাদের বরখাস্ত করা হল। আমি সলিমুল্লাহ হলে ছিলাম। সেই মুহুর্তে সভা ডাকা হল এবং সভায় ঘোষনা করা হল, হল ত্যাগ করা হবে না, ফজলুল হক হলেও সন্ধায় এই ঘোষনা করা হল। একটা কমিটি করা হয়েছিল,কর্মচারীদের জন্য একটা ফান্ড করা হবে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা তুলে সাহায্য করা হবে। কারন এদের প্রায় সকলেরই বিশ ত্রিশ টাকার বেশি বেতন পেত না। সংসার চালাবে কি করে? এদের মধ্যে কয়েকজনকে টাকা তোলার ভার দেওয়া হয়েছিল। পরদিন দেখা গেল শতকরা পঞ্চাশজন ছাত্র রাতে হল ত্যাগ করে চলে গিয়েছে। তার পরদিন আরও অনেকে চলে গেল। তিন দিন পর দেখা গেল আমরা ত্রিশ-পয়ত্রিশজন সলিমুল্লাহ হলে আছি আর বিশ পচিঁশজন ফজলুল হক হলে আছে। পুলিশ হল ঘেরাও করে রেখেছে। এক কামরায় আলোচনা সভায় বসলাম। আমাদের পক্ষে আর পুলিশকে বাধা দেওয়া সম্ভব হবে না। সকলে একমত হয়ে ঠিক হল, হল ত্যাগ করার এবং নিম্ন কর্মচারীদের জন্য টাকা তুলে সাহায্য করা, তা না হলে তারও ধর্মঘট চালাতে পারবে না। চারদিন পরে আমরাও হল ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম এবং চাদা তুলে এদের সাহায্য করতে লাগলাম। দশ পনের দিন পর দেখা গেল এক একজন কর্মচারী বন্ড দিয়ে কাজে যোগদান করতে শুরু করেছে। এক মাসের মধ্যে প্রায় সকলেই যোগদান করল। ধর্মঘট শেষ হয়ে গেল। এই সময় আমি ও কয়েকজন কর্মী দিনাজপুর যাই। কারন কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেলে রেখেছে এবং দবিরুল ইসলামকে জেলের ভিতর মারপিট করেছে। ১৪৪ জারি ছিল। বাইরে সভা করতে পারলাম না। ঘরের ভিতর সভা করলাম। আমরা হোস্টেলেই ছিলাম। আবদুর রহমান চৌধুরী তখন ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিল। আমরা যখন ঢাকা ফিরে আসলাম বোধহয় আবদুল হামিদ চৌধুরী আমার সাথে ছিল। ট্রেনের মধ্যে খবরে কাগজে দেখলাম, আমাদেরসহ সাতাশজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করেছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের দবিরুল ইসলাম, অলি আহাদ,মোল্লা জালালউদ্দিন (এখন এডভোকেট) , আবদুল হামিদ চৌধুরীকে চার বৎসরের জন্য আর অন্য সকলকে বিভিন্ন মেয়াদে। তবে এই চারজন ছাড়া আর সকলে বন্ড ও জরিমানা দিলে লেখা পড়া করতে পারবে। মেয়েদের মধ্যে একমাত্র লুলু বিলকিস বানুকে বহিস্কার করা হয়েছিল। তিনি ছাত্র লীগের মহিলা শাখার কনভেনর ছিলেন। এক মাসের মধ্যে প্রায় সকল কর্মচারীই গোপনে গোপনে কাজে যোদগান করল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ , ছাত্ররা নাই। এই সুযোগে কর্তৃপক্ষ নিম্ন বিতনভোগী কর্মচারীদের মনোবল ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। এই সময় বাইরে পুরানা লীগ কর্মী ও নেতারা আলাপ আলোচনা  শুরু করেছে কি করা যাবে? একটা নতুন দল গঠন করা উচিৎ হবে কি না? আমার মত সকলকে বললাম, শুধুমাত্র ছাত্র প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে রাজনীতি করা যায় না। সরকারী মুসলিম লীগ ছাড়া কংগ্রেসেরও একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে গনপরিষদে ও পূর্ব বাংলা আইনসভায় এদের কয়েকজন সভ্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এদের সকলেই হিন্দু, এরা বেশি কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হত। ফলে এদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামারও ভয় ছিল। কংগ্রেসকে মুসলমান সমাজ সন্দেহের চোখে দেখত। একজন মুসলমান সভ্যও তাদের ছিল না। এদিকে মুসলিম লীগের পুরানা নামকরা নেতারা সকলেই সরকার সমর্থক হয়ে গিয়েছিল। মন্ত্রিত্ব,পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি কিছু না কিছু অনেকের কপালেই জুটেছিল। নামকরা কোনো নেতাই আর ছিল না যাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো যায়।   মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন সদ্য আসাম থেকে চলে এসেছেন। তাকে পূর্ব বাংলার জনসাধারন তেমন জানত না। শুধু ময়মনসিংহ , পাবনা ও রংপুরে কিছু কিছু লোক তার নাম জানত। কারণ তিনি আসামেই কটিয়েছেন। তবে শিক্ষিত সমাজের কাছে কিছুটা পরিচিতি ছিলেন। একজন মুললিম লীগের নেতা হিসাবে তিনি আসামের বাঙ্গাল খেদা আন্দোলনের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন এবং জেল ও খেটেছেন। টাঙ্গাইলের লোকেরা তাকে খুব ভালবাসত।  শামসুল হক সাহেব তাকে ভালভাবে জানতেন। কারণ, হক সাহেবের বাড়িও সেখানে। তিনিও মওলানা সাহেবের সাথে পাকাপাকি আলোচনা করবেন ঠিক হল। পূর্বেও তিনি পুরানা মুসলিমলীগ কর্মীদের সভায় যোগদান করেছিলেন। কিছুদিনের জন্য আসাম গিয়েছিলেন। ফিরে আসলেই আমরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করব ঠিক হল। সীমান্ত প্রদেশের পীর মানকী শরীফ একটা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। তার নাম দিয়েছেন আওয়ামী মুললিম লীগ। সীমান্ত প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী খান আবদুল কাইয়ুম খান মুসলীম লীগ থেকে পুরানা কর্মীদের বাদ দিয়েছেন এবং অত্যাচারের স্টীমরোলার চালিয়েছেন। অনেক লীগ কর্মীকে জেলে দিতেও দ্বীধাবোধ করেন নাই। গাফফার খান ও ডাক্তার খান সাহেবের মোকাবেলা করতে পারেন নাই। ফলে সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেস সরকার গঠন হয়। একমাত্র পীর মানকী শরীফই লাল কোর্তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমলীগ দাড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবু পীর সাহেবের জায়গাও মুসলিম লীগে হয় নাই। পীর মানকী শরীফ সভাপতি এবং খান গোলাম মোহাম্মদ খান লুন্দখোর সাধারন সম্পাদক হয়ে আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠন করা করেন। সূত্র : বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী / এআর /  

শহীদ দিবসে মেলায় বইপ্রেমীদের জনস্রোত [ভিডিও]

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বইপ্রেমীদের ঢল নেমেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। এর শিশু প্রহরেও ছিলো শিশুদের উচ্ছ্বাস। আর অন্যান্য দিনের তুলনায় কাটতি বেশি হওয়ায় খুশি বিক্রেতা ও প্রকাশকরা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকাল ৮টা থেকেই খুলে দেওয়া হয় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মেলায় আসেন বই প্রেমীরা। শিশুদের সঙ্গে নিয়ে বাবা-মায়েদের ভীড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা জানান, শহীদ দিবসের পাশাপাশি বাংলা ভাষার সঙ্গে সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দিতে এই দিনে মেলায় আসা। একজন অভিভাবক বলেন, বাচ্চাদের নিয়ে বই মেলায় আসলাম। খুবই ভালো লাগছে ওদের আজ নিয়ে আসতে পেরে। ছুটির দিন হওয়ায় বাড়তি আনন্দ নিয়ে সরব ছিল সিসিমপুর বাহিনী। কিছুক্ষণ পরপরই শো নিয়ে মঞ্চে হাজির হয় ইকরি, হালুম, শিখু আর টুকটুকি। প্রকাশকরা জানান, একুশে ফেব্রুয়ারি ও শিশু প্রহর একইসঙ্গে হওয়ায় বেচাকেনা অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি। এক বিক্রেতা জানান, প্রথম দিকে চাপ কম ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বই বিক্রির চাপ বাড়ছে। ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, সব মিলিয়ে একুশে গ্রন্থমেলা জুড়ে সারাদিনই ছিল উৎসবের আমেজ। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বইমেলায় নামে জনস্রোত। ভিডিও লিংক:

মানসিকতার কারণেই সর্বস্তরে চালু হয়নি বাংলা [ভিডিও]

মানসিকতার কারণেই বিজয়ের এত বছর পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি বলে মত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসেছিলেন তারা। কেবল বাংলা ভাষা নয় পৃথিবীর অন্য ভাষার প্রতি ভালবাসার মধ্যেও মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানো হয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে বিচারপতিগণ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এসময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলায় মামলার শুনানী এবং রায় দেয়া শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হক সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন না হওয়া দু:খজনক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মানসিকতার কারণেই বিজয়ের এত বছর পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। সুপ্রীম কোর্টে বাংলা চালু করতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকি। সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষার দাবি আ. লীগের

বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দলের নেতাকর্মীদের সাথে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের একথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জাতিসংঘের কাছে আজকে আমাদের একটাই দাবি বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি ভাষাভাষী বাঙালি জাতির ভাষা বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘ দাফতরিক মর্যাদা প্রদান করবে। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা আজকে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলা ভাষা বিশ্বস্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির মর্যাদা প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে শহীদদের আত্মবলিদান সার্থক হয়েছে। একুশ এবং একাত্তর একই চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত মন্তব্য করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ২১ এবং ৭১ এর চেতনায় আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তুলবো। এর আগে ভোর সাড়ে ৬টায় সংগঠনের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে সংগঠনের সব শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। আর

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি