ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৩:১৫:৩০

দাউদ হায়দারের চারটি কবিতা

দাউদ হায়দারের চারটি কবিতা

দাউদ হায়দার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে নির্বাসিত হন তিনি। বর্তমানে জার্মানিতে বসবাস করছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে জন্মই আমার আজন্ম পাপ, সম্পন্ন মানুষ নই, যে দেশে সবাই অন্ধ প্রভৃতি।   মিছিলে তোমার মুখ মিছিলে তোমার মুখ ছিলো সেদিনের রক্তগঙ্গা রাজপথে গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে অবশেষে এইখানে এসে কোন মতে বাঁধলে কঠিন বুক পরম সাহসে; হৃদয়ে আশা দোলে; যেন সব সম্রাজ্ঞী স্বপন অথবা বিধাতার স্বর্গীয় শান্তি খোঁজো রাত্রিদিন এই দারুণ মিছিলে। কখন যে পাপময় বাতাস বয়ে গেল গাছের ডালে; একটু চোখ তুলে দেখলেও না তুমি– বরং বললে; “এখানে নিবিড় ভালবাসা আছে অথচ কি যেন নেই— হায় আমার বাংলা আমার জন্মভুমি!” —বলে সেই যে হারিয়ে গেলে ফিরে তাকালেও না আর– জানিনা একি অপার মমতা যে হৃদয়ে তোমার!   একদিন কেউ কাউকে চিনবে না সবই চলে যায় সবই চলে যাবে একদিন তবু কেউ কারও মুখ দেখবো না সঠিক অস্পষ্ট ভালবাসা বরং থেকে যাবে ইতস্ততঃ আজীবন ইচ্ছেগুলো ভেসে যাবে বাতাসে নীলিমায় চোখে চোখে চোখ রাখলে কেউ কাউকে চিনবো না ভুল করে পাশাপাশি হেঁটে গেলে কেউ কাউকে দেখবো না – একদিন শরীরে শরীরে মিশে যাবো একদিন জীবন সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো একদিন মিছিল থেকে চলে যাবো মরণ ভবনে একদিন ডেকে ডেকে চলে যাবে অলীক ঠিকানায় একদিন নির্ভুল নিয়মে দাঁড়াবো মুখোমুখী একদিন আমি তুমি চলে যাবো কালের আঙিনায় একদিন তবু কেউ কাউকে চিনবো না!      আমার পিতাকে মুমূর্ষু পিতার সংসারে আমি এক নির্বোধ বালক যেন। আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না কোনো কালেই; জানেন তিনিই শুধু। যার কোলে-পিঠে মানুষ আজীবন; তিনি এই পৃথিবী-লোক ছেড়ে এখন কোথায় যে ছিটকে পড়ে আছেন তা বলতেও পারিনা সহসা ৷ অথচ বাড়িতে তাকে নিয়ে আমাদের ভাবনার অন্ত নেই। এদিকে গতায়ু হবেন যিনি আজকাল কিংবা মাসাধিকাল পরে; আপাতত তাকে নিয়ে কেউ-ই ঘামায় না মাথা। বুড়োটে শরীর তার ভীষণ উত্তেজিত হাতের তুড়িতে একদা নিমেষে উধাও হতো সব। তিনি আজ বিছানায় একা একা শুয়ে ভাবেন আল্লার আরশ। মুমূর্ষু পিতার সংসারে আমিই বড় ছেলে। সব দায়িত্ব আমাকে কাঁধে তুলে দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে পালাতে চান যিনি তাকেই বাঁচাতে চাই আপ্রাণ চেষ্টায়; আমার পিতাকে।          তুমিই আমার প্রেমিকা তুমিই আমার প্রেমিকা। যেহেতু তুমিই আমাকে প্রথম ভালবাসা শেখালে কি করে ভালবাসতে হয়। একদিন দেখলাম; একজন বিদেশী যুবা তোমাকে ক্যামোন জোর করে টেনে নিচ্ছে— তুমি নিরুপায়! হয়তো তোমার বিশ্বাস ছিল তোমার ভালবাসার প্রতিদানে আমি তোমাকে উদ্ধার করবো। আমি তাই করেছি আমি তোমার জন্যে মুক্তিযুদ্ধে গেছি মর্টার ধরেছি, দাঁত দিয়ে গ্রেনেডের ক্লিপ ছিঁড়েছি— দ্যাখো, তার সঠিক ফলাফল পাওয়া গেছে একটি চরম যুদ্ধে। অতএব এসো, এখন জ্বলজ্বলে দিনের আলোয় পুনর্মিলন হোক আমাদের– যেহেতু আমি তোমার আশৈশব প্রেমিক— তোমার ভালবাসা আমার শরীরে!
মহাদেব সাহার ত্রয়ী ভলোবাসা

১. ভালোবাসা ভালোবাসা তুমি এমনি সুদূর স্বপ্নের চে’ও দূরে, সুনীল সাগরে তোমাকে পাবে না আকাশে ক্লান্ত উড়ে! ভালোবাসা তুমি এমনি উধাও এমনি কি অগোচর তোমার ঠিকানা মানচিত্রের উড়ন্ত ডাকঘর সেও কি জানে না? এমনি নিখোঁজ এমনি নিরুদ্দেশ পাবে না তোমাকে মেধা ও মনন কিংবা অভিনিবেশ? তুমি কি তাহলে অদৃশ্য এতো এতোই লোকোত্তর, সব প্রশ্নের সম্মুখে তুমি স্থবির এবং জড়? ভালোবাসা তবে এমনি সুদূর এমনি অলীক তুমি এমনি স্বপ্ন? ছোওনি কি কভু বাস্তবতার ভূমি? তাই বা কীভাবে ভালোবাসা আমি দেখেছি পরস্পর ধুলো ও মাটিতে বেঁধেছো তোমার নশ্বরতার ঘর! ভালোবাসা, বলো, দেখিনি তোমাকে সলজ্জ চঞ্চল, মুগ্ধ মেঘের মতোই কখনো কারো তৃষ্ণার জল।   ২. ভালোবাসা মরে গেছে গত গ্রীষ্মকালে ভালোবাসা মরে গেছে গত গ্রীষ্মকালে উদ্যত বাহুর চাপে, ধুলোমাটি কাদা লেগে গায়ে শীতেতাপে ঝরে গেছে তার বর্ণ, মেধা স্পর্শ করে আশি এই প্রেমহীন নারীর শরীর মৃত চুল, উত্তাপবিহীন কিছু বয়সের ধুলো, নীলাঞ্জনশোভিত নারীর মুখ ফিকে থির পলকবিহীন দুই চোখ খেয়ে গেছে পৌষের দুই বুড়ো কাক তাহাকেই ধরে আছি, বেঁধে আছি অসহায় স্তব্ধ আলিঙ্গনে; বহু বছরের এই রোদবৃষ্টিজলে, ঝড়ে, কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে প্রেম, মুখের গড়ন তার, দেহের বাঁধন অজন্তা মূর্তি লাস্য, শিল্পের মতন সেই গূঢ় সম্ভাষণ তার কতোখানি বাকি আছে? অবশিষ্ট আছে? তাহারা কি থাকে কেউ অনাদরে উপেক্ষায় সারাদিনে একবেলা জলঢালা মৌন কেয়ারিতে অজ্ঞাত নফর, তাহারা কি থাকে? স্পর্শহীন, পরিচর্যহীন একাকী নিঃসঙ্গ আর কতোকাল দগ্ধ হবে প্রেম।   ৩. ভালোবাসা, আমি তোমার জন্য ভালোবাসা আমি তোমাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিব্রত আজ তেমাকে নিয়েই এমন আহত এতো অপরাধী, এতো অসহায়! তোমাকে নিয়েই পালিয়ে বেড়াই তোমাকে নিয়েই ব্যাকুল ফেরারী। ভালোবাসা তুমি ফুল হলে তার ফুলদানি পেতে অভাব ছিলো না, মেঘ হলে তুমি সুদূর নীলিমা তোমাকে দিতাম উড়ে বেড়াবার; জল হলে তুমি সমুদ্র ছিলো তোমারই জন্য অসীম পাত্র- প্রসাধনী হলে তোমাকে রাখার ছিলো উজ্জ্বল অশেষ শো-কেস, এমনকি তুমি শিশির হলেও বক্ষে রাখার তৃণ ছিলো, আর সবুজ পাতাও তোমার জন্য হয়তোবা হতো স্মৃতির রুমাল। ভালোবাসা তুমি পাখি হতে যদি তোমাকে রাখার ভাবনা কি ছিলো এই নীলকাশ তোমারই জন্য অনায়াসে হতো অনুপম খাঁচা! কিন্তু তুমি তো ফুল নও কোনো মেঘ নও কোনো দূর আকাশের, ভালোবাসা তুমি টিপ নও কোনো তোমাকে কারো বা কপালে পরাবো; ঘর সাজাবার মেহগনি হলে ভালোবাসা তুমি কথা তো ছিলো না তুমি তো জানোই ভালোবাসা তুমি চেয়েছো মাত্র উষ্ণ হৃদয়! খোঁপায় তোমাকে পরালেই যদি ভালোবাসা তুমি ফুটতে বকুল, কারো চোখে যদি রাখলেই তুমি হতে ভালোবাসা স্নিগ্ধ গোধূলি- তাহলে আমার তোমাকে নিয়ে কি বলো ভালোবাসা এমন দৈন্য, আমি তো জানিই তোমার জন্য পাইনি যা সে তো একটি হৃদয় সামান্যতম সিক্ত কোমল, স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল!   [মহাদেব সাহা ১৯৪৪ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম গদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার কারণে তিনি ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন।]   /ডিডি/টিকে

জন্মদিনে রেজাউদ্দিন স্টালিনের তিনটি কবিতা

কবি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রেজাউদ্দিন স্টালিনের আজ (২২ নভেম্বর) ৫৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ম্যাজিক লণ্ঠন, বাংলাদেশ সাহিত্য পরিষদ ও পারফর্মিং আর্ট সেন্টার রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র পরিবাগে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪১টি। কবিতার অ্যালবাম পাঁচটি। তার কবিতা বিশ্বের বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, মধুসূদন পুরস্কার, দার্জিলিং নাট্যচক্র পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এক. বিচ্ছেদের বর্ণমালা আমাদের দেখা আর কখনো হবে না কোনোদিন এমনকি কণ্ঠস্বর টেলিফোনে হবে না মুদ্রিত স্মৃতির পাখিরা এসে বলে যাবে সুরঞ্জনা শোনো : কাল সারারাত জেগে বিচ্ছেদের বেদনা লিখেছি ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ পরস্পর ক্ষোভে ও ঘৃণায়, কে জানতো মুহূর্তের মরীচিকা কেড়ে নেবে আলো বুকের ভেতর থেকে জেগে ওঠা একখণ্ড ভূমি দখল করবে এসে নগরের নিকৃষ্ট মাতাল পৃথিবীর দীর্ঘতম সেতুর উপরে উভয়ের দেখা হবে, কথা ছিলো নক্ষত্রের বিশাল টাওয়ারে শিশিরের শিহরণে, স্বপ্নগর্ভ আকাশের নিচে জোছনার টার্মিনালে অন্তহীন অপেক্ষা করবো   মাইক্রোওয়েভ থেকে আমাদের ধ্বনিপুঞ্জগুলি শুনবে পৃথিবীবাসী, আমরা থাকবো বহুদূরে আরণ্যক স্তব্ধতায়, ফরেস্ট বাঙলোর কোনো রুমে কথা ছিলো বাঙলোর সংলগ্ন সড়কে যদি হর্ন দেয় মার্সিডিজ বেঞ্জ, আমরা ছুটবো ভিন্নগ্রহে আমাদের সব ইচ্ছা স্বপ্নসাধ মুহূর্তের ভুলে ভেঙে গেছে, যার ফলে মর্মন্তুদ বিচ্ছেদের নদী সৃষ্টি হলো আজ দেখো জীবনের প্রতিপার্শ্বব্যেপে এখন কী করে বলো সহ্য করি এতোটা নির্মম   আমাদের দেখা আর কখনো হবে না কোনোদিন এমনকি কবিতারা টেলিফোনে হবে না মুদ্রিত নীরব নায়িকা এসে বলে যাবে, শোনাও তো দেখি নিদ্রাহীন লাল চোখে লিখেছো যে, কষ্টের কবিতা   দুই. সহমরণ সহমরণের তৃষ্ণা ও রাত্রি অপরিসীম সমুদ্রের চিতায় স্বেচ্ছায় উঠেছে আকাশ ঢেউঅগ্নি ঝলসে দিচ্ছে তার দেহ আগুন আর অনন্তের এমন অলৌকিক ভূবিজ্ঞানে নেই কলম্বাসের পরে এই দৃশ্য আর কেউ দেখেছিলো কি না সেই কথা রহস্যজনিত ও হাওয়া সৈকতের স্নিগ্ধ চোখে ঘুম কে তাকে তুলবে সাম্পানে মৎস্যযাত্রায় লবণের লোভ থেকে মুক্ত হওয়া ভার ঝিনুক-নুড়ির গান অনেক প্রাচীন সেই কবে বিগল জাহাজে ডারউইন এসেছিলো পূর্বপুরুষ অন্ত্যজ শামুকের খোঁজে আর কেউ এসেছিল নাকি ভাস্কোদাগামার সাথে রক্ত পুঁজ সিফিলিস আরো কতো মারি এসে জোয়ার জরিপ করে গেছে   ও চাঁদ রাত্রির একান্ত প্রজাতি সাগরকন্যার পাণিপ্রার্থী হও না হলে শুনতে হবে ভ্যাম্পায়ার ভাটার ভর্ৎসনা নীল ও অলড্রিন ভেঙে দেবে তোমার পৌরুষ আকাশের সাথে উঠে এসো সমুদ্রচিতায় আত্মদানের এ সুযোগ অভূতপূর্ব এর চেয়ে চিরন্তন মৃত্যু আর হতেই পারে না   তিন. জানাতেই হবে প্রার্থনা মঙ্গলের প্রভু এ জীবন মুক্ত করো মরীচিকা থেকে সুন্দরের আরাধনা ক্লান্তি থেকে ত্রাণ করো মানব রচিত বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে হৃদয়কে বিচ্ছিন্ন করো জাগতিক থেকে স্বনির্বাচিত করো সংমুদ্ধ সময়ে //ডিডি//

বাংলাদেশ তো আমারই দেশ : জহর সেনমজুমদার

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পাঠকপ্রিয় কবি জহর সেনমজুমদার। দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় তিনি। এ পর্যন্ত তার ১৬টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম’, ‘বিপজ্জনক ব্রহ্মবালিকাবিদ্যালয়’, ‘ভবচক্র : ভাঙা সন্ধ্যাকালে’ শীর্ষক গ্রন্থগুলো ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ বছরের একুশে বইমেলায় কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্য সংকলন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। সদ্য সমাপ্ত আন্তর্জাতিক সাহিত্যের আসর ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’ অংশগ্রহণ করেন তিনি। উৎসবের সমাপনী দিন ১৮ নভেম্বর একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য এ কবি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সিনিয়র সহ-সম্পাদক দীপংকর দীপক একুশে টেলিভিশন অনলাইন : ৭ম ঢাকা লিট ফেস্টে’ আপনাকে স্বাগতম। আন্তর্জাতিক এ সাহিত্য আসরে এসে কেমন লাগছে? জহর সেনমজুমদার :‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ ইতিমধ্যেই বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ উৎসবে বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করছেন। বিশ্ব সাহিত্যের এ আসরে আমাকে একজন কবি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় নিজেকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে। গত বছরও আমি ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’ অংশগ্রহণ করেছি। তবে এবারের আসরটিকে আমার আরো প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। এখানে এসে বিভিন্ন দেশের অনেক গুণি ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পেরেছি। সব মিলিয়ে চমৎকার একটি সময় পার করেছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অভিযোগ আছে, এখানে ইংরেজি সাহিত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন? জহর সেনমজুমদার : ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই এ ভাষাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তবে আমি মনে করি, ‘লিট ফেস্ট’ বাংলাদেশে আয়োজিত হওয়ায় এখানে বাংলা ভাষাকেই সর্বোচ্চ প্রধান্য দেয়া উচিত। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরো ভাবতে হবে। তবে গত বছরের চেয়ে এবারের উৎসবে বাংলা সাহিত্যের চর্চা বেশি হয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : এ বছর মোট ৪ জন জেমকন সাহিত্য পুরুস্কার পেয়েছে। আপনি এ পুরস্কার আসরের একজন বিচারক ছিলেন। পুরস্কৃত ব্যক্তিদের সাহিত্যের মান কতটা উন্নত মনে হয়েছে? জহর সেনমজুমদার : এবারের পুরস্কৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন- মোহাম্মদ রফিক, আশরাফ জুয়েল, মামুন অর রশিদ ও নুসরাত নুসিন। তিন বিভাগে মোট চারজনকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ রফিক তার “দু’টি গাথাকাব্য” গ্রন্থের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি ৮ লাখ টাকা পেয়েছেন। তরুণ কথাসাহিত্যিক হিসেবে আশরাফ জুয়েল এবং মামুন অর রশিদ যৌথভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তাছাড়া জেমকন তরুণ কবি হিসেবে ‘দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস’ পাণ্ডুলিপির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন নুসরাত নুসিন। তিনি পেয়েছেন এক লাখ টাকা। তাদের প্রত্যেকের লেখার ধরন আমার কাছে মানসম্পন্ন বলে মনে হয়েছে। অর্থের দিক থেকেও এটি একটি মানসম্পন্ন পুরস্কার। সবমিলিয়ে এ পুরস্কার তরুণ সমাজকে লেখায় আরো উদ্বুদ্ধ করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : বাংলাদেশের আতিথিয়তা কতটা পছন্দ হয়েছে? জহর সেনমজুমদার : আতিথিয়তায় বাংলাদেশের বেশ সুনাম রয়েছে। এখানকার মানুষের মধ্যে মমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ অনেক বেশি। আমাদের সবাই খুব খাতির-যত্ন করেছেন। এখানকার খবার-দাবারও অনেক রুচি সমৃদ্ধ। তাছাড়া বাংলাদেশ তো আমারই দেশ। কারণ, আমার পূর্বপুরুষের ভিটা বরিশালে। তাই এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।  একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আপনার কোনো বই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কী? জহর সেনমজুমদার : এপার বাংলা থেকে আমার নতুন কোনো মৌলিক বই প্রকাশিত হয়নি। তবে এ বছরের একুশে গ্রন্থমেলায় কাগজ প্রকাশন আমার কাব্য সংকলন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করেছে। এখানে আমার অধিক জনপ্রিয় কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন পরিবেশক রকমারি ডট কমেও আমার কয়েকটি কাব্য সমগ্র পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘মধ্যযুগের কাব্য স্বর ও সংকট’, ‘অপরূপ সমগ্র’, ‘প্রসবসমগ্র’, ‘সূর্যাস্তসমগ্র’ ও ‘অগ্নিসমগ্র’। বইগুলো কলকাতা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। শুনেছি এ বইগুলো বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। একুশে টিভি অনলাইন : আপনার ‘জীবনানন্দ ও অন্ধকারের চিত্রনাট্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। অনুভূতি কেমন? জহর সেনমজুমদার : আমার গ্রন্থ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিখছে, এটা ভাবতেই গর্ব হচ্ছে। একজন লেখক কিংবা কবি চান, তার জ্ঞানাদর্শ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়–ক। তরুণ সমাজ সম্মুখে পথ চলার সঠিক নির্দেশনা পাক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছাড়াও বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনের সদস্যরা আমার কবিতা নিয়মিত পাঠ করছেন। সত্যিকারার্থে সবার এমন ভালোবাসায় আমার লেখক জীবন সার্থক বলে মনে হচ্ছে। একুশে টেলিভিমন অনলাইন : আপনার বেশ কিছু কবিতা আমি পড়েছি। এসব কবিতা পড়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, আপনি সীমাবদ্ধ কালের গণ্ডিকে পেরিয়ে গেছেন। আপনার লেখায় অতিত-বর্তমান ও ভবিষ্যত- সময়ের এ তিন চক্রই প্রাধান্য পেয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলুন। জহর সেনমজুমদার : কবিতার মাধ্যমে আমি পুরো সময়চক্রকে আয়ত্ত্ব করতে চেষ্টা করেছি। অক্ষর বিন্যাস ও শব্দ চয়নেও অতিতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছি। অনেকেই আমার লেখার এ ধরনকে পছন্দ করছেন। তবে কেউ কেউ সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না। প্রকৃতপক্ষে একজন কবিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই এ নিয়ে আক্ষেপ করার কিছু নেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে দুই বাংলার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন কী? জহর সেনমজুমদার : স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। এপার বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রতিরোধী ধারা খুবই সক্রিয়। অন্যদিকে ওপার বাংলায় বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চাটা বেশি হচ্ছে। তবে দুই বাংলার লেখকরাই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তুলে ধরছেন। তাদের লেখনীতে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনচিত্র পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠছে।  

নির্মলেন্দু গুণের ৩টি প্রেমের কবিতা

শুধু তোমার জন্য   কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন। তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও কতবার যে আমি সে কথা বলিনি সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন। তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবে- `এই ওঠো, আমি, আ…মি…।` আর অমি এ-কী শুনলাম এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন। আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য, আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য। তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে, আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।       তোমার চোখ এতো লাল কেন?   আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক, শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না। আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে। আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক- আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা, পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা। এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক। কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করুক- তোমার চোখ এতো লাল কেন?       পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু   একদি চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে; একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয় বন্ধু হবে, একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।   একদি চুল কাটতে যাব না সেলুনে একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো। একদিন কালো চুলগুলো খ’সে যাবে, কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।   একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে, ট্রেনের টিকিট কেটে একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না। একদিন পরাজিত হবো।   একদিন কোথাও যাব না, শূন্যস্থানে তুমি কিম্বা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স। একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে পূর্ণিমার রাত্রে মরে যাব।     [কবি পরিচিতি : পুরো নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। ১৯৪৫ সালের ২১ জুন তিনি নেত্রকোনার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক কবি হিসাবে খ্যাতিমান হলেও কবিতার পাশাপাশি চিত্রশিল্প, গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনীতেও তিনি স্বকীয় অবদান রেখেছেন। ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ "প্রেমাংশুর রক্ত চাই" প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার কবিতায় প্রেম ও নারীর পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধিতা ও শ্রেণীসংগ্রামের বার্তা ওঠে এসেছে। তার জনপ্রিয় কবিতাসমূহের মধ্যে রয়েছে- হুলিয়া, মানুষ, আফ্রিকার প্রেমের কবিতা, একটি অসমাপ্ত কবিতা ইত্যাদি।]   /ডিডি/

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মদিন আজ

আজ ১৬ অক্টোবর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ৬১তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একুশে টেলিভিশন অনলাইন’র পক্ষ থেকে গভীর ভালোবাসা। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর পিতার কর্মস্থল বরিশালের আমানতগঞ্জ রেডক্রস হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডাঃ শেখ ওয়ালীউল্লাহ এবং মাতা শিরিয়া বেগম। তাঁর মূল বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার অন্তর্গত সাহেবের মেঠ গ্রামে। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রুদ্রের শৈশবের অধিকাংশ সময় তাঁর কেটেছে নানাবাড়ি মিঠেখালি গ্রামে (বাগেরহাট জেলার মংলা থানার অন্তর্গত)। এখানকার পাঠশালাতেই তাঁর পড়াশুনা শুরু। ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসে ওয়েস্ট এ্যান্ড হাইস্কুল ভর্তি হয়ে ১৯৭৪ সালে চার বিষয়ে লেটার মার্কসসহ এসএসসিতে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। এর পর ১৯৭৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। অতঃপর ১৯৮০ সালে সম্মানসহ বিএ এবং ১৯৮৩ সালে এমএ পাস করেন তিনি। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ময়দানে তিনি ছিলেন অন্যতম। জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে প্রধান উদ্যোগীদের তিনি ছিলেন একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বিষ্ফোরক দিনগুলোতে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বিপ্লবের সহগামী এক মানুষ। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার স্বল্পসময়ের জীবনে রচনা করেছেন সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ গল্প, কাব্যনাট্য ও অর্ধ শতাধিক গান। তাঁরই কবিতার লাইন “জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন” আজও অবিস্মরণীয়। এরকম অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন রুদ্র। রাজনীতির ভন্ডামী আর সমাজের বৈশাদৃশ্যের ছবি তিনি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন নিপুন তুলির টানে। “সোনালি শিশির” তাঁর একমাত্র গল্পের বই। তাঁর ‘বিষ বিরিক্ষির বীজ’ নামক একটি নাট্যকাব্য রয়েছে। এছাড়া উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯), ফিরে পাই স্বর্ণগ্রাম ১৯৮২, মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪), ছোবল (১৯৮৬), গল্প (১৯৮৭), দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮), মৌলিক মুখোশ (১৯৯০) কাব্যগ্রন্থগুলোও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তাঁর বিখ্যাত ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরনোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন। রুদ্র আলোচিত নারীবাদী কবি-লেখিকা তসলিমা নাসরীনকে বিয়ে করেন ১৯৮১ সালে। ১৯৮৮-তে তাদের সাত বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। এর কিছুকাল পরে ঢাকার বাসভবনে কবির অকালপ্রয়ান ঘটে।   এসএ/এআর

যেখানে সেখানে

সেখানে আলো ছিল না বটে তবে অন্ধকারও ছিল না, ঘুঁটঘুটে ভাব ছিল চারিদিকে পোকা মাকড়ের শব্দ ছিল গাছ-গাছালির সবুজাভ রং অক্সিজেনে ভরা, নিঃশ্বাসের আকর্ষণে ঘেরা- অপেক্ষা শুধু কখন আলো কিম্বা উল্টো অভিপ্রায় নিয়ে সেখানে আসা।   শুদ্ধতার প্রতীক ছিল না সেখানে তবে অশুদ্ধ আচরণও রয়ে যায়নি। যে রংটা যার পছন্দ তার নির্লিপ্ত ছোঁয়া থেকে রং বদলে যায়। এ যেন নেশার মতো- দৃষ্টি প্রতিবন্ধী যেভাবে রঙের গন্ধ বোঝে সেভাবেই রং কথা বলে, মানুষ চেনে, প্রকৃতি নির্ভর সবুজ তাইতো পাতা বাহার হয়ে কখনো নিত্য ধারায়। হারানোর ভয় ছিল না সেখানে তবে সুরক্ষার দুর্গওতো ছিল না। যে পারে তার উদয়-অস্ত একাকার করে নিয়ে পথ খুঁজে নিত। আমার পথ তেমন ছিল না জানা। আমি অবশ্য জানতাম পথে নামলেই পথ বলে দেবে, কোন পথে এগোতে হবে। তাই সে পথের নাগাল খোঁজাই ছিল আমার সবিশেষ অভিপ্রায়।   সেখানে আমার অদেয় কিছু ছিল না না পাওয়াও কিছু ছিল না তারপর।   ১৭/০২/২০১৭        

বত্রিশ নম্বর থেকে বঙ্গোপসাগরে

কলের শ্রমিক, ক্ষেতের মজুর আর নিরন্ন মানুষের জীবন ছবিশব্দে ছন্দে রঙের তুলিতে আঁকিছ বারে বারে হে কবি,অরপিয়াসের সুরে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষেরঘুম ভাঙ্গানিয়া পাখি।সকালের সুমিষ্ট আযানে আত্মনিবেদনেরপ্রত্যয়ে জেগে উঠা মুসলমান, শুনে তোমার জয় বাংলা ডাক-পদ্মা মেঘনা যমুনার কুলের সংগ্রামী জেলে, শুনে তোমার জয় বাংলা ডাক-রেলের শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, ষোড়শি কুমারী, নববধূযুবক, কিশোর, ছাত্র-জনতা শুনে তোমার জয় বাংলা ডাক-যেন মৃত্যু আলিঙ্গনে জেগে উঠা বীর, খালি হাতে সম্মুখ সমরে।সেই পরন্ত বিকেলে,ডালিমের ডালে বসে দোয়েল গেয়েছিল গান,বাগানে ফোটে ছিল শত ফুল চৈত্রের খা খা দুপুর শেষে, সোনালি বিকেলে লক্ষ জনতারসমাবেশে তুমি দিলে ডাক, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’অতঃপর ... ...সোনার তরী নয়, বলাকা নয়, নয় কোনো মহাশ্মশানজন্ম নিল এক মহাকাব্য স্বাধীনতা যার নাম।তারপর যা বলব ... ...নাই মোর ভাষা,পুত্রের লাশের পাশে নিহত পিতা।হে পিতা,তোমার ভাষা ছিল, গর্জে উঠা লোরকার শব্দের হাতিয়ারঅথচ জীবন দিতে হল তোমাকে শৃগালের হাতে।তোমার রক্তের ধারা গড়াতে গড়াতেবত্রিশ নম্বর থেকে গেল বঙ্গোপসাগরে।//এআর

অণুকাব্য

এক স্রোতস্বিনী বহেদিনক্ষণ কি বা রাত ভোর বাতাসেএকটা গান ভেসে ভেসে আসেঅদেখা ছবি, নীরবে সহেআর দণ্ডিত দ্বিধায়ফসলের বীজকোষ বেড়ে ওঠে একাযাচে সহজ সখ্যতা, অথবা মাগে আকাশএ তার কোন দায়? দুই আমি আছি আকাশেমেঘের মতো, কখনো সাদা কখনো কালোরং বদলায তবে আজন্ম ভাসমানআমি আছি সমুদ্রেবালুচর ছুঁয়ে যাই,তৃষ্ণার্ত চাতক আর মাটির তৃষ্ণা মিটাইস্থিরতা নেই, চিরকাল আবহমানতিন শ্রাবণের পূর্ণিমা রাতজোৎস্না আর বৃষ্টির প্রেম ডাকে বারবারচলো সবুজে রাখি একে অন্যের হাতডেকেছে রূপালী আলোর বাণনদী আর পাহাড়ে পাতালো মিতালীকী করে ফেরাবো এ আহ্বান? চার যাইযাচ্ছি কিন্তু..আর বলবো না, এবার কিন্তু যাবোইএভাবে বলতে বলতেই একদিন ঠিক চলে যাবোকখনো কাঁটাতার যদি প্রেমিকার সাদা ওড়না হয়অথবা জেলখানা হয় পদ্মফুলের আসনতবে ফিরবো একদিন অতিথি হয়েতোমাদের এ নগরীতে।এখনো সীমান্ত খোলা আছে আমারদু’চোখ সতেজ, সদ্য ঘাসে ঝরা শিশিরের মতোতাই যাচ্ছিযাই কিন্তুযেতে যেতে পিছু ফিরবো না আর। পাঁচচৈত্রের শেষ বিকেলআলো ছায়ার খেলার মাঝে বিন্দু বিন্দু অভিমান জমে অন্ধকারেই মৃত্যু হলো একটা গল্পেরপ্রতিদিন দ্বন্দ্ব কিংবা প্রেম আজ দ্রোহের রুপে মুরতি একতবু নি:শ্বাস যা বাকি আছে, নাম নিয়ে টানে এফোঁড় ওফোঁড়কি বেহায়া নি:শ্বাস!যে কেউ অনায়াসে গলা টিপে হত্যা করতে চাইবে সে বেহায়া নি:শ্বাস। ছয় তোমার আকাশ ঝুলছে হাওয়ায়শহরে অতিথি কাকডাকে ভোরে, সঙ্গীদেরআর ডালে ডালে ডানা ঝাপটায়.. সাত ঝড়ের সাথে বৃষ্টি নাকি বৃষ্টির সাথে ঝড়?বৈশাখী এলোকেশ, দ্বন্দ্ব;নাকি অসম অণুস্বর..? 

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।        তারি রথ নিত্যই উধাও    জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন, চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।  ওগো বন্ধু,        সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল–         তুলে নিল দ্রুতরথে দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে    তোমা হতে বহু দূরে।    মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে    পার হয়ে আসিলাম আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়–    রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়    আমার পুরানো নাম।     ফিরিবার পথ নাহি;    দূর হতে যদি দেখ চাহি     পারিবে না চিনিতে আমায়।        হে বন্ধু, বিদায়। কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে           বসন্তবাতাসে অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,       ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ, সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো– কিছু মোর পিছে রহিল সে       তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে            হয়তো দিবে সে জ্যোতি, হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।           তবু সে তো স্বপ্ন নয়,    সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,              সে আমার প্রেম।           তারে আমি রাখিয়া এলেম অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।    পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে          কালের যাত্রায়।           হে বন্ধু, বিদায়।        তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি। মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি         যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি       হোক তব সন্ধ্যাবেলা,            পূজার সে খেলা ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;          তৃষার্ত আবেগ-বেগে ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।          তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,          তার সাথে দিব না মিশায়ে যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।          আজো তুমি নিজে          হয়তো-বা করিবে রচন মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন। ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।          হে বন্ধু, বিদায়। ‍          মোর লাগি করিয়ো না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।          মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই– শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে          সেই ধন্য করিবে আমাকে।          শুক্লপক্ষ হতে আনি          রজনীগন্ধার বৃন্তখানি              যে পারে সাজাতে          অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে, যে আমারে দেখিবারে পায়              অসীম ক্ষমায়          ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি, এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।          তোমারে যা দিয়েছিনু তার          পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।          হেথা মোর তিলে তিলে দান, করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান          হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।          ওগো তুমি নিরুপম,              হে ঐশ্বর্যবান, তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান–          গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।             হে বন্ধু, বিদায়।

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি