ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮ ১:৪৯:৫০

ফাঁস

পর্ব-৩

ফাঁস

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। উপন্যাসটি ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করছে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় পর্ব- সবুজের বাবা ছিল সামান্য একজন সরকারে চাকুরে।উদার প্রকৃতি, নীতিবান আর্দশবাদি, সৎ চরিত্রের মানুষ ।কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা সম্ভব হয় নি । তবু বই পড়ার প্রতি আছে একটা তীব্র নেশা।সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেশি বিদেশী লেখকদের নানা বই ।বেতনের এক চতুর্থাংশ টাকা ব্যয় করেছে এই বই কেনার পেছনে । অর্থ বিত্তের অভাব আছে, কিন্তু মনের দীনতা বলতে কিছু নেই । এখন অবসরে আছে । তবু দীর্ঘবছর ধরে মেনে চলা রুটিনের কোন ব্যতিক্রম করে না ।ভোরের আযান হলে মসজিদে যায় । নামাজ শেষ করে মিনিট বিশেক, এদিক ওদিক ঘুরে, ভোরের আলো বাতাসে নিজেকে সতেজ করে নেয় ।ঘরে ফিরে একমুঠো মুড়ি, কখনো আবার একটুকরো বিস্কিট দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নেয় । আবারো অজু করে কোরান শরীফটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে । ‘ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ । আটটায় তিনটে রুটি, সবজী ও এক কাপ চা খেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের তলায় এসে বসে । হাতে থাকে একটি বই । বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে আসে ।গোসল নামাজ খাওয়া শেষ করে আধঘন্টা সময় বিছানায় গড়াগড়ি । সবুজের মা ঘর সংসারের নানা অভিযোগ নিয়ে কোন কথা বলতে আসলে, মুখ চিবিয়ে হাসে ।বলে, ঘর গৃহস্তালী থাকলে অভাব থাকবে । এজন্য তো এর নাম সংসার ।কখনো আবার অপন মনে বলে ওঠে,হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান । সংসারে তিন ছেলে দুই মেয়ে । বড় ছেলে বিএ পাশ করে, একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে । মেজটা আই এ পাশ । বছর তিনেক একটা পোশাক কোম্পানিতে চাকরি করেছে ।এখন কোন কাজ কর্ম করে না । রাস্তার মোড়ে, দোকানে বসে দেশ উদ্ধারের প্রয়োজনে, দিনরাত রাজা উজির মারে । দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, ভাল পরিবারে ।মেয়ে দুটি সুখে আছে । ছোট ছেলে সবুজ । ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবী ।পরিবারের নানা অভাব অনটন থাকা সত্বেও নিজ সাধনা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটা হাতে নিয়ে এসেছে । সবুজের বাবা তার ছেলে মেয়েদেরকে সব সময় শেখাতে চেষ্টা করেছে জীবনের উদ্দেশ্য কি, সৌর্ন্দয, মাহাত্ম্য কোথায় । স্কুল কলেজ জীবনে সবুজ তার বাবার এই দর্শনকে সম্মানের সাথে সমীহ করে চলেছে ।বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলার সময় বাবার উদাহরণ টেনেছে ।বাবার ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসকে নিয়ে সবুজ সেই সময়ে অহংকারও করেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সবুজকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় । বড়লোক বাবার ছেলে মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে একটা নিরেট সত্যি সবুজের উপলদ্ধিতে এসেছে, জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হলে নীতিবাক্যের ফুলঝুড়ি দিয়ে জীবন সাজানো চলবে না ।জীবন চলে টাকার স্রোতে, টাকায় জীবনে গতি আনে, সুখ আনে, সৌর্ন্দয আনে, জীবনকে করে অর্থবহ, সার্থক । টাকাহীন জীবন বদ্ধ জলাশয়, জঙ্গম স্থবির । সবুজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয় ।তার চোখে স্বপ্ন ভাসে, একদিন সে অনেক অনেক বড়লোক হবে । শহরে বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, সুন্দরী বউ হবে ।তবে তার জীবন চলবে সহজ সরল রেখায় । আধুনিকতার ছল করে কোন অশ্লীল উগ্রতায় জড়িয়ে নিজের অতীতকে বিসর্জন দেবে না ।হাজার বছর ধরে তার রক্তে বহমান পুর্ব পুরুষের ঐতিহ্য-সংস্কার বা বিশ্বাসকে ও সে কখনো অবহেলা অসম্মান করবে না ।  সবুজ গ্রামের ছেলে, জীবন হবে তার সবুজ প্রকৃতির মতো পেলব সুন্দর, মসৃণ । তবে তার বাবার মতো টানটান জীবন নয় । তার অর্থ থাকবে ।দুই হাতে মুঠোভরে সে টাকা খরচ করবে । তার ভবিষ্যত বংশধরদেরকে অভাব শব্দটার সাথে কখনো পরিচয় করিয়ে দেবে না । গ্রামের বাড়িতেও সে একটা সুন্দর ঘর করবে । এই স্বপ্ন তার সেই শিশু-শৈশবকাল থেকে তার মনের ভেতর সুপ্ত হয়ে আছে । গ্রামের বাড়িতে শহরের মতো করে সুন্দর ঘর করবে । মা বাবাও তার সাথে থাকবে । মা বাবার জন্য দক্ষিণ দিকে থাকবে একটি বড়সড় ঘর । দক্ষিনের খোলা হাওয়ায়, সুখে আনন্দে কেটে যাবে, তাদের শেষ দিনগুলো । ইট সিমেন্টের পাকা ঘর হলেও সবুজ গ্রামীন সৌর্ন্দযকে হণন করবে না । সবুজের বাড়ি হবে সবুজে সবুজে সবুজময় । বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকবে সুপারি গাছ । গাছগুলো বড় হয়ে ছাদ পযন্ত ওঠে যাবে ।ছাদের ওপর বসে সবুজ চারপাশের সবুজকে তার বুকের গভীরে টেনে নেবে । আকাশের ভাসমান মেঘমালা দেখবে, দেখবে নীল সামিয়ানায় তলে তারাকা রাজির মিটিমিটি লুকোচুরি খেলা ।জোছনায় নিজেকে ভাসিয়ে নেবে দুর দেশের অজানা সৌন্দযে । রবি ঠাকুরের গান শুনবে । নজরুলের কবিতা পড়বে । “ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না ।” এসব সে জেগে জেগে ভাবে ।রাতের ঘুমেও সেইসব ভাবনা স্বপ্ন হয়ে তার মনে ভাসে । সবুজ তার শিক্ষকদের মুখে শুনেছে, মনীষিদের জীবনীপাঠে জেনেছে, জীবনের সুখস্বপ্ন সত্যি হয়, মেধা শ্রম আর সাধনার বলে । সবুজ মেধাবী, প্রতিটি সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সে তার মেধার যোগ্যতা দিয়েছে ।সবুজ পরিশ্রম আর সাধনা ছিল বলেই তো সে আজ তার চারপাশের লোকজনের কাছে সবুজ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু সবুজ কর্মজীবন, কি করবে, কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবে । ভাবনার শেষ থাকে না, কিন্তু কোন সিদ্বান্তেই সবুজ স্থির হতে পারে না ।সবচেয়ে বড় সম্যসা-সংকট অর্থের । বহু দিন মাস নানা ভাবনায়, হেলাফেলায় সে শেষ করে । তার পর মধ্যবিত্তের শেষ ভরষার স্থল চাকরি বাজারে যাতায়াত শুরু করে । একটা চাকরির জন্য সে নানা জায়গায় তার পরিচয় ও যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা করে । সবুজ চাকরির জন্য এদিক ওদিক হন্য হয়ে চরকী ঘোরা ঘুরে । চাকরি হয় না, কিন্তু, কেন চাকরি হয় না, তার উত্তরও সবুজের জানা হয় না । বছর খানেক পরে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটমাপের একটি চাকরি পাওয়া যায়, তাও নিজের যোগ্যতায় নয়, প্রতিষ্ঠানের বড় সাহেব তার এক নিকটতম বন্ধুর কাকা । বন্ধুর অনুরোধে সবুজকে চাকরিটা পাইয়ে দেয় । সবুজের জীবনের সব সুন্দর ইতিবাচক ভাবনাগুলো নেতিয়ে পড়ে । ভাঁটার স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার জীবনের জোরালো নীতি-আর্দশগুলোতে গুণেপোকা বাসা বাঁধতে শুরু করে । সবুজ নব বিশ্বাসে স্থিত হয়, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে, মেধা শ্রম সাধনা কিছুই নয়, দরকার ক্ষমতাবান আত্মীয়ের । সামনে এবং পেছনে ডাল তলোয়ার হাতে নিয়ে যারা তার জীবন চলার পথকে করে দেবে মসৃণ, ঝেড়ে মুছে লক্ষ্যে পৌঁছার সিঁড়িগুলোকে করে দেবে ঝকঝকে তকতকে । কেউ একজন হাত ধরে সামনে টেনে নিয়ে যাবে, অন্য একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিয়ে যাবে ।সবুজ অস্থির হয়ে ভাবে, কেউ একজন, যে আমার সামনে শক্ত হাতে মই ধরে রাখবে, আমি তার ওপর বিশ্বাস করে, নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সপে দিয়ে তরতর করে ওপরে ওঠে যাব । কিন্তু, কে সেই, কে । অস্থির সব নানা ভাবনায় সবুজ সারাক্ষণ কাটা ঘুড়ির মতো শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকে ।  আলো আঁধারীর ভাবনাকাশে হঠাৎ করে উঁকি দেয়, যদি কোন বড়লোক বাবার অর্থব মেয়ের গলায় ঝুলে যেতে পারা যায়, তাহলে ও হয়তো জীবনের স্বপ্নগুলো সত্যি হয়ে জ্বলে ওঠবে । সবুজ তার বন্ধুসম খালাতো ভাইয়ের্ সহযোগিতায় পেয়ে যায় সেই স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি । চিত্রাই সেই চাবি, যে তাকে পেছন থেকে ঠেলবে, আর তার ব্যবসায়ী শ্বশুর বাবা তাকে সামনে থেকে টেনে নিয়ে যাবে । চিত্রার সাথে সবুজের বিয়ে হয় । বিয়ের অনুষ্ঠানে সবুজ বুঝতে পারে, কত বড় ঘরের মেয়েকে সে তার জীবন সঙ্গীনি করে নিয়েছে ।বিয়েতে আগত অতিথিদের পোশাক, বেশভূষা, পরিচয়, জীবন বৃত্তান্ত শুনে দেখে সবুজ বুঝতে পারে, তার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব ।একই অনুষ্ঠানে দুই দুইটি বিয়ে । চিত্রার আর চিত্রার ছোটবোন চয়নার । চিত্রার মা বাবা পুলিশ জামাইকে স্বীকার করে নিয়ে নব সাজে বরণ করে নিয়েছে । (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ফাঁস পর্ব ১ পর্ব-২ ফাঁস / এআর/
ফাঁস

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। আজ থেকে নিয়মিতভাবে উপন্যাসটি প্রকাশ করবে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এর প্রথম পর্ব।  # এক #   সবুজের চোখে চিত্রা ছিল সুন্দরী, রুপকথার রাজকন্যা, মোনালিসা, ক্লিওপ্রেট্টা। চিত্রা সবুজের একক সিদ্ধান্তের, একক পছন্দের বউ। সবুজের বাবা মা চেয়েছে, মধ্যবিত্ত ঘরের কোন শিক্ষিত সুন্দরির সাথে সবুজের বিয়ে দিতে । পাত্রীও নির্বাচন করা হয়ে গেছে । বিএ পড়ুয়া মেয়ে, গায়ের রং হলুদ বাটা ফর্সা নয়, তবে চোখ নাক ঠোঁট চুল সব মিলিয়ে মেয়েটাকে এক কথায় সুন্দরীই বলা যায় । সবুজ মেয়েটাকে দেখে, মেয়ের বাবা মা সবাই শহরে থাকে । নিজের বাসায় নয়, সরকারী বাসায় ।মেয়ের বাবা একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রধান হিসের রক্ষক হিসেবে কাজ করে । মেয়ের মা পড়ালেখা  জানা শিক্ষিত মহিলা ।মেয়ের ভাইবোনেরা সবাই স্কুল কলেজে পড়ে । সব মিলিয়ে পরিবারটি মার্জিত রুচিশীল মধ্যবিত্ত ঘর ।সবুজ সব শুনে, মেয়েটির একটি ছবিও সে নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখে । ছবির মেয়েটি সবুজের পছন্দ হয় ।  দিন ক্ষন ঠিক করে, বেশ কিছু সময়, সবুজ আলাদা ঘরে মেয়েটার সাখে কথা বলে ।শহরে থাকলেও মেয়েটা একটু ভিন্ন আদলে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে । শিক্ষা সংস্কৃতিতে, সংযত ও শালনিতায় সে বিশ্বাসী । সাধারণ একটা স্যালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় কাপড় টেনে মেয়েটা সবুজের সামনা সামনি চেয়ারে বসে । মুখে ঠোঁটে সামান্য রংয়ের প্রলেপ, চুল গুলো ঝুটিতে বদ্ধ হয়ে ওড়নার চাপে স্থিত ।মেয়েটার চেহেরাটাও কেমন লাজুক লাজুক ।সবুজের সামনে একাএকা বসে থাকতে তার একটু অস্বস্থিই লাগে । তবু মাথাটা হালকা একটু নিচু করে মেয়েটা চুপচাপ বসে থাকে । সবুজ মেয়েটার সাথে কথা বলে । মেয়েটা কথার উত্তর দেয়, মেপে মেপে ধীর শান্ত গলায় ।কথা বলার সময় মেয়েটার ঠোঁটের কোন, চোখের তারায়ও কোন ধরনের ঝিলিক খেলা করে না ।  সবুজ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মেয়ে দেখেছে । বন্ধু হিসেবে, প্রেমিক হিসেবে অনেকের কাছাকাছি ও এসেছে ।গল্প হয়েছে, হাসি তামশা হয়েছে ।বলা যায় প্রতিটি মেয়ে ছিল রুপে রংয়ে নকঁশায় জীবন্ত প্রজাপতি । সারাক্ষণ উড়ুউড়ু মন, দেহ বল্লরীর ভাঁজে পোশাকের বাহারিত্ব, কথার ছলাকলা, চোখের চঞ্চলতা, ঠোঁটের কোনে  বিটকেলে হাসি, ক্ষনে ক্ষনে মুখাবয়বের পরিবর্তন, এই মেঘের ছায়া,এই আবার নবর্সূযের সতেজ রাঙা আলো । মেঘ জড়ানো খোলাচুল, পদ্ম কুসুম খোঁপা, সর্পদোলা লম্বা বেনী । কারো আবার কালো চুলের ফাঁকে ফাঁকে কত রং, বাহাদুরি সব কিসব কাট । সবুজ বইতে পড়ে, নিজ চোখে দেখে, মেয়েরা হচ্ছে বহতা নদী, পাহাড়িয়া ঝর্ণা, ওড়ন্ত প্রজাপতি,  ভোরের আকাশে স্নিগ্ধ বৃষ্টি ফোটা । কিন্তু, সবুজ হিসেবটা মেলাতে পারে না । এই মেয়ে তো ওর মা চাচীদের মতো অনেকটা গেঁয়ো প্রকৃতির, বদ্ধ ডোবা, গতিহীন ঢেউহীন. বড় বেশি ঘোলাটে ।   সবুজের অভিজ্ঞতায় বিবেচিত হয়, মেয়েটা বোকা, ক্ষেতমার্কা ।শিক্ষা থাকলেও আধুনিক স্যের্ন্দযবোধ,উন্মুক্ত সংস্কৃতি এসব বিষয়ে তার ছিটে ফোটা জ্ঞানও নেই ।তার চোখে চাহনিতে নেই একবিংশ শতকের উন্মুক্ত প্রেম, কথার ভেতর আহ্লাদি ঢেউ নেই, স্রোত নেই ।মেয়েটাকে তার খুব একটা পছন্দ হয় না । সবুজের মা গ্রামের মেয়ে ।ভদ্র আচরণ, লাজুক স্বভাব, চলনে বলনে ধীর স্থির স্বভাবের মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলে আনতে তার ইচ্ছেটা বেশি । সবুজ নিজেও বড়বেশি মাতৃভক্ত । মা বাবার সাথে নিজের বিয়ে নিয়ে বেশি কথা বলতে সবুজের একটু আধটু লজ্জা করছে । তার বড় দুইভাই তো চোখ মুখ বন্ধ করে পিতৃআজ্ঞা পালন করে গেছে । মেয়ে নয়, ছবি দেখেই নিজেদের ভবিষ্যত বেছে নিয়েছে, মা বাবার ইচ্ছেয় সম্মতি জানিয়েছে । তবুও তার ভাগ্য হাজার গুণ ভালো । তার সাথে বিয়ের মতো একটা লজ্জাকর বিষয় নিয়ে বাবা মা তার সাথে কথা বলছে ।  তাই মাতৃ- আজ্ঞায় আদিষ্ট হয়ে সবুজ মেয়েটাকে অপছন্দ করতে পারে না । আংটি বদলের মধ্যে দিয়ে সবুজের মা-বাবা বিয়ের সব পাকা কথা বলে আসে ।মাকে হ্যাঁ বলার পরেও সবুজের মনের ভেতর কিছু একটা সুঁইযের মত সারাক্ষন বিঁধতে থাকে। কাছের বন্ধুদের সাথে মেয়েটার রুপ গুন নিয়ে আলোচনা করে । এক বন্ধুর পরামর্শে সবুজ মেয়েটার পেছনের বাড়ির খোঁজ খবরে মেতে ওঠে । খবর যা পাওয়া যায়, তাতে সবুজের মন বিগড়ে যায় । সবুজ তার মাকে বলে, ওই মেয়েকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সবুজের বাবা বলে, কেন, কি অপরাধ মেয়েটার? সবুজ তার বাবাকে কিছু বলে না । সবুজ জানে, বাবা মেয়ের বংশ লতিকার গল্প শুনতে চাইবে না ।শুনলেও তা বিবেচনার গুরুত্বে আনবে না । উল্টো, মানুষের জন্ম, মনুষ্যত্ব, তার শ্রেষ্টত্ব এসব বিষয়ে একগাদা নীতিকথা সবুজকে শুনিয়ে সবুজের মুখ বন্ধ করে দেবে । সবুজ ফিসফিসিয়ে তার মাকে গোয়েন্দা রিপোর্ট শুনায় । মেয়েটার জাত পরিচয় খুব একটা ভাল নয়, যদিও মেয়ের বাবা একটা সরকারী অফিসে ভালো চাকুরি করে ।মেয়ের দুই ভাই আছে, বড়টা ডাক্তারী পড়ে, ছোট টা এখনো স্কুলে পড়ছে । মেয়েটার আরো একটা বোন প্রাইমারিতে পড়ে । এই টুকুতে সবুজের আপত্তি ছিল না । সম্যসাটা হয়, মেয়ের চাচা জেঠাদের নিয়ে । তারা সবাই গ্রামেই থাকে, পড়ালেখাও বিশেস জানে না । জমি চাষ করে, একজন নাকি গ্রামে রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকান চালায় । আড্ডা, গালগল্পে তাদের দিন পার হয় । গর্বকরে বলার মতো কোন বংশ পরিচয়ও তাদের নেই ।গ্রামের বাড়িতে তাদের কোন ভালোমানের একটা ঘরও নেই, এমনকি মেয়ের বাবার একটা ঝুপড়িও নেই ।মেয়েটার বাবাকে গ্রামের লোকেরা কেউ ভালো করে চেনেও না । সবুজ ইচ্ছে করে একটা ভয়ঙ্কর মিথ্যাও তার মাকে বলে ।মা. আমি মেয়েটার এক নিকট আত্মীয়ের কাছে শুনেছি, মেয়েটা শারীরিক ভাবে অসুস্থ । সারা বছর নানা রোগে ভুগে । সবুজের বাবা সবুজকে বলে, মেয়ের পুর্ব পুরুষের এতো ইতিহাস আর মেয়ের বাবার ধন সম্পদ আমাদের জানার দরকার নেই ।আমাদের দরকার একটি সুন্দর মনের মেয়ে, । মেয়েটিকে আমি দেখেছি, কথাও বলেছি, বড়বেশি সহজ সরল । বাবা, কিন্তু, মেয়েটা যে অসুস্থ । একটা অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আমি, মেয়েটা অসুস্থ নয়, যে তোমাকে এই কথা বলেছে, সেই লোকটাই মানষিকভাবে অসুস্থ ।অসুস্থ মানষিকতার লোকদের কথায় কান দিও না, মেয়েটাকে বিয়ে করলে তোমার ভাল হবে, আমি বলছি, জীবনে তুমি সুখি হবে । সবুজের মা গ্রামের সহজ সরল মহিলা । নানা সংস্কার-কুসংস্কারে তার মন নানা সুতোয় শক্ত করে বাঁধা । ছেলের অমঙ্গলের কথা ভেবে সে বলে, বাবা, আমরা ওদেরকে পাকা কথা দিয়ে এসেছি ।বিয়ের একটা তারিখও হয়ে আছে । এই সময়ে যদি, ওরা এই দুঃসংবাদ পায়, তাহলে যে, মেয়েটার অভিশাপ লাগবে, মেয়ের মেয়ের মায়ের বুকফাটা শাপ আর চোখের জলে তোকে সারা জীবন হাবুডুবু খেতে হবে । সবুজ গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে । কোন কথা সে বলে না । সবুজের বড়ভাবী বলে, তুমি তো আমাকে বলেছিলে, কোন একটা মেয়ের সাথে তোমার কি একটা সম্পর্ক আছে, এই মেয়ে যদি তোমার পছন্দ না হয়, তাহলে তোমার সেই পছন্দের মেয়েটাকে বিয়ে করে নাও । সবুজ হঠাৎ থমকে যায় । বাবা মায়ের সামনে এই ধরনের কথা বলতে সবুজ অভ্যস্ত নয় । গম্ভীর স্বরে বলে, ভাবী, তুমি যে কি বলো না ।আমি আবার, সবুজের বাবা নিজ বিবেচনায় স্থান ত্যাগ করে । মা চুপটি করে বসে থাকে । মুখ লুকাতে হবে না । ডুবে ডুবে তো বহু জল খেলে । এবার প্রকাশ করো, তোমার ঐ মুক্তা না ফুক্তা, যাকে তুমি নিজের চেয়ে বেশি ভালবাস বলে আমাকে বার কয়েক বলেছিলে । সবুজ ভাবীকে চোখ ইশারায় কিছু একটা বলতে চায় । ভাবী তার ইশারা বুঝেও বুঝতে চায় না । মুক্তা সবুজের কততম প্রেম, সবুজ নিজেও তা জানে না। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে সে বহু মেয়ের প্রেম নদে একা একা হাবুডুবু খেয়েছে ।কত মেয়েকে প্রেমপত্র দিয়েছে । কিন্তু একটা চিঠির উত্তরও আজ পযর্ন্ত সে পায় নি সবুজ । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে হঠাৎ করে মুক্তা আসে। রুপে রংয়ে অতি সাধারণ একটা মেয়ে ।সবুজের সাথে একই বিভাগে পড়ে । সবুজের দুই বছরের জুনিয়র ।পরিচয়, আলাপ, তারপর বোধহয় একটু কাছাকাছি আসা, গল্প আড্ডা, রিক্সায় চড়ে বিকেলের হাওয়া খাওয়া,টং দোকানে দাঁড়িয়ে বসে চটপটি ফুসকা খাওয়া । ভালই চলছিল দিনের সাক্ষাৎ আর রাতের নির্ঘুম স্বপ্ন কল্পনা গুলো ।কিন্তু হঠাৎ করে কি যে হয়, সবুজ তার ভেতরের কষ্টটাকে কোন রকমে চাপা দেয় । সবুজ হাসে, বলে, ভাবী, সম্পর্ক টম্পর্ক আসলে ঐগুলো কিছু না, সময় পার করার জন্য এই বয়সের ছেলে মেয়েরা সবাই কম বেশি এক আধটু এসব করে থাকে । ওখানে প্রেম বা ভালবাসা খুব একটা বেশি থাকে না ।মেয়েটা আমার জুনিয়র । আসলে আমার নোট ফোট নিয়ে একটু আধটু নাড়াচাড়া করতে ভালবাসত, সেই সুবাদে আমরা দুইজন একটু কাছাকাছি ছিলাম ।  বড় ভাবী সবুজের কথায় আহত হয়, বলে, তুমি বড় বেশি দেমাগী, অত দেমাগ কিন্তু ভাল নয়, নিজের দেমাগের আগুনে একদিন নিজেই জ্বলে পুড়ে মরবে, এই আমি বলে রাখলাম ।  সবুজ মায়ের, ভাবীর এইসব কথা মানে না, বিশ্বাস করে না । সবুজ তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, সবুজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক ছেলে । সে ভাল করে জানে, মা বাবার কথা মেনে নিলে তার জীবন গরুর গাড়ির চাকা হয়ে ধূলো কাদায় ঘুরপাক খাবে । জীবনের ভোগ বিলাস, সুখ আহ্লাদ, কিছুই হবে না ।সুখের আশায়, বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্নে বিভোর থেকে, সবুজ তার মা বাবার কোন আদেশ উপদেশ কানে তুলে না । সবুজ এই যুগের ছেলে । আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত,শিক্ষার ধাক্কায়  গ্রাম্য আচারে সংস্কার বিশ্বাসের প্রতিও তার বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অনক কমে গেছে ।মায়ের মুখে অন্যের অভিশাপের কথা শুনে, সে মনে মনে হাসে ।সবুজ ভাল করেই জানে মা বাবার জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে চলতে গেলে, জীবন চাকা সবুজের ইচ্ছেয় চলবে না ।বর্হিবিশ্বের রুপসৌর্ন্দয, জাগতিক জীবনের বিত্ত বৈভব, সুখ আহ্লাদ, কিছুই  আর তার ইহজনমে হয়ে ওঠবে না । আর মনে মনে বলে, দেমাগ, ভাবী, দেমাগ তো থাকতে হবে। দেমাগ দেখানোর জন্য যোগ্যতা থাকতে হয়। সে যোগ্যতা সবুজ অর্জণ করেছে ।তোমাদের মতো গ্রামীন সংস্কার বিশ্বাসকে বেদবাক্য মানলে, জীবন আমার গরুর গাড়ি চাকা হয়ে এই মাটির কাঁদা ধুলায় গড়াগড়ি খাবে । সবুজ গরুর গাড়ির চাকা হয়ে বেঁচে থাকার চন্য এত কষ্টকরে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ করে নাই ।সবুজের জীবন লক্ষ্য, সুখের আশায়, ভোগবাদি জীবনের লালসায় সবুজ মা বাবার পছন্দের মেয়েকে স্পষ্ট ভাষায় না বলে দেয়। সবুজের এই না ধ্বনিতে তার মা বাবা আহত হয় । মেয়ে বাড়ির লোকজন ছুটাছুটি করে। কেন, কি দোষে, কোন অপরাধে, একটা মেয়ের জীবনে এতবড় কলঙ্ককালিমা টিপ সবুজের পরিবার পরিয়ে দেয়। উত্তরহীর মুখে সবুজের পরিবার মাথা নিচু করে, মেয়ে বাড়ির লোকজনদের নানা কূটকাটব্য শুনে যায়।  (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ।

‘পরকীয়ায় ভড়কে যাওয়ার কিছু নেই’

তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক ফারজানা মিতু। সুন্দর গল্প ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা যার উপন্যাসের প্রধান অনুসঙ্গ। লেখার প্রতি রয়েছে তার নিরন্তর ভালোবাসা। গ্রন্থভুক্ত তার পঙক্তির পরতে পরতে পাওয়া যায় ভিন্নমাত্রা। সম্পর্কের বিশ্লেষণ এবং অভিজ্ঞতার বিচিত্র প্রভাব পাওয়া যায় তার লেখায়। বিষয় বৈচিত্র্যেও তা হয়ে উঠে অনন্য। লেখনির মাধ্যমে তার বিস্তার ও দিক অন্বেষণ যথার্থই সাড়া জাগিয়েছে। প্রথম জীবনে ফারজানা মিতু কবিতা দিয়েই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। এরপর গল্প ও উপন্যাস। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮-এ প্রকাশিত হয়েছে তার চারটি বই। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত উপন্যাস ‘পরকীয়া’। এটি পাঠক হৃদয় ছুঁয়েছে। এতে পাওয়া যাবে ভিন্ন জীবনের চিত্র, বৈচিত্রতা। জীবনের নানাচিত্রে নান্দনিক উপন্যাসে রূপান্তর করেছেন ‘পরকীয়া’। সাম্প্রতিক সময়ের সাহিত্য, লেখালেখি, একুশে বইমেলার নানাদিক নিয়ে মিতুর সঙ্গে কথা হয় একুশে টেলিভিশন অনলাইনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ সাহিত্যে কেন এলেন, কিভাবে  এলেন? ফারজানা মিতুঃ সাহিত্যের ধারায় কীভাবে চলে এলাম সেটা নিজেও সেভাবে বলতে পারবো না। নানা সময়ে ছোট করে ২-৩ লাইনের কথা লিখতাম, কখনও বন্ধুদের কার্ডে কিংবা চিঠিতে। আমার আম্মা যেহেতু লেখালেখি করতেন তাই সেগুলো পড়া হতো। আর ওই বয়সেই মনে হতো, এই লাইনটা না হয়ে অন্যটা হলে ভালো হতো। সাহিত্য তখন থেকেই বুঝা শুরু। ক্লাস নাইন টেনে থাকতেই পড়া শুরু হয়েছিলো কঠিন সব বই। সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুনীল সবই একে একে পড়া শুরু। তারপর হুমায়ূন আহমেদ। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ মেলায় এবার আপনার কি বই এসেছে? ফারজানা মিতুঃ মেলায় এবার ৪টি বই এসেছে। দিব্যপ্রকাশ থেকে এসেছে ‘প্রযত্নে সে’ এবং ‘তোমার মুঠোয় বন্দী আমার আকাশ’। দেশ পাবলিকেশন্স থেকে ‘পরকীয়া’ আর অন্বয় প্রকাশ থেকে ‘ফেরা না ফেরার গল্প’। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ নতুন বই সম্পর্কে বলুন? ফারজানা মিতুঃ আমি বরাবরই রোমান্টিক ঘরানার কাহিনী লিখি। তাতে কষ্ট, প্রেম, বিরহ আর না পাওয়াগুলোই উঠে আসে। এবারও তাই। তবে কাহিনীর বৈচিত্র্য অবশ্যই আছে। একেকটি বইয়ে একেক রকম স্বাদ দিতে চেয়েছি আর পাঠক সেই স্বাধটুকু পুরোটাই পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ পরকীয়ার পাঠক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? ফারজানা মিতুঃ পরকীয়া বইটি ইতোমধ্যে অনেক পাঠকের হাতে পৌঁছেছে। রিভিউ যা পেয়েছি পাঠকের কাছে সেটা খুবই পজিটিভ। আমি বরাবরই বলেছি বই নিয়ে সমালোচনা করার আগে বইটি পড়ুন। পরকীয়া নাম দেখে ভড়কে যাবার কিছু নেই। বইটি না পড়লে কখনই জানতে পারবে না আমি বইটিতে কী বলতে চেয়েছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন বই প্রকাশ করেন? ফারজানা মিতুঃ আমি ২০১৫-২০১৬ সালে অনেকগুলো বই মেলার বাইরের সময়ে এনেছি; কিন্তু মেলায় যেভাবে পাঠকের আগ্রহ আর উদ্দীপনা দেখতে পাই সেটা অন্য সময়ে দেখা ভার। লেখক হিসেবে আমাদের কাছে পাঠকই প্রধান। তাই এখন চেষ্টা করি মেলাতেই বই নিয়ে আসার। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কীভাবে? ফারজানা মিতুঃ আমি সবসময়ই বলে থাকি কারও প্রেরণা কিংবা প্রভাবে আমি লেখালেখিতে আসিনি। আমাকে সেভাবে প্রেরণা প্রথম অবস্থায় কেউ দেয়নি। এখন অনেকেই দিয়ে থাকে কাছের মানুষেরা ছাড়াও দূরের মানুষেরাও। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ একুশে বইমেলার প্রাপ্তি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন… ফারজানা মিতুঃ একটা জাতি কখনোই শিক্ষা ছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না। আর বই প্রতিটা মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসে মতোই অপরিহার্য। একটা ভালো বই একজন মানুষের জীবনে নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। আর আমাদের দেশে যেহেতু বই কেনার প্রচলনটা বইমেলাতেই বেশি। তাই বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই সময়েই লেখক আর পাঠক এভাবে কাছাকাছি আসতে পারে। লেখক আর পাঠকের এমন সেতুবন্ধন বইমেলা ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? ফারজানা মিতুঃ লেখালেখি আমার সবটুকু জুড়েই, তাই লিখে যাবো যতোদিন পারি। এবার পরকীয়া নিয়ে বড় পরিসরে যেমন লিখেছি তেমনি সামনেও এমনকিছু আরও লেখার আশা রাখছি। প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটি লেখায় আমি নিজেকে ভাঙি আর গড়ি। আগামীতেও আরও সমৃদ্ধশালী লেখা দিতে পারবো বলেই আশা করছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনার জন্য শুভ কামনা রইল। ফারজানা মিতু : আপনার জন্যও শুভকামনা। / এআর /

একা এবং অদৃশ্য

থেমসের পাড়ে দাঁড়ানো অট্টালিকাগুলো ভেঙে ভেঙে পরছে। এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ, ক্রেডিট সুইজ সব, সেঁধিয়ে যাচ্ছে থেমসের পেটে। নানান রঙে ভাসছে জল। মৃত এবং আহত মানুষের রক্ত, শ্বাসের নীলাভ অংশ, কারো কারো বুকে জমিয়ে রাখা ক্ষোভ, ঘৃণা ও ভালোবাসা সব, সব ভাসছে। মাছেরা তৃপ্তি পাচ্ছে,  এতো সুগন্ধি রক্ত আর কখনো পাওয়া যায়নি। এতো এলকোহল কোথা থেকে এলো! থেমসের সাথে মিশে সব পানি নেশা নেশা হয়ে ভাসছে। মাছেরা নেশায় বুদ হয়ে যাচ্ছে। রমনীর বুক থেকে শুঁকে নিচ্ছে আফিমের ঘ্রাণ। ছুঁয়ে দিচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে নদীর নাভী বেয়ে তপ্ত উনুন। এভাবে আহত রমনীরা মাছের মা হয়ে উঠছে আর আহত পুরুষেরা নিজেদের জনক ভাবতে শুরু করেছে। মাছেরা ঠোঁট কেলিয়ে হাসে আর ভাবে,’যাক বাবা দূর্নামের হাত থেকে বাঁচা গেলো।’ মৃতদের দেখে আহতরা হাসছে আর বলছে, ’কি বোকা ওরা বাঁচতে পারলো না, মরে গেলো, হাঃ হাঃ হাঃ, আমরা বাঁচলাম কি করে। বাঁচলাম বলেই এতো এতো গিনি সোনা আর এতো রমনের রঙমহলে ভাসছি। রক্ত কোথায়? সব দেখি মৌতাতের নেশাজল। আরে কত কত পাউন্ড ভাসে জলে! প্রতিদিন এক একটি দেশ কিনে নেবো। বসাবো তান্ডব বাজার। হি: হি: হি:। ঘুম ভেঙে গেলো সিহানের। জানালার পাশে বৃক্ষরা পাতাবাহার পাতাবাহার খেলছে। কোথাও মেঘ নেই। ওয়াপিং থেকে দেখা যায় দাঁড়িয়ে আছে এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ, ক্রেডিট সুইজ। তাহলে কি দেখেছে সে! ভাবতেই অবাক লাগে। কি বাজে স্বপ্ন! হায়! হায়! কি অমঙ্গল। গত পাঁচ বছরে একবারও দেখেনি এমন স্বপ্ন। এর মানে কি? আহা! কত কত রমনীরা ভেসে যাচ্ছিলো। এলসেসেসিয়ান কুকুরের মত জিহ্Ÿাও দেখা গেলো ভেসে যাওয়া পুরুষদের। তাদের মধ্যে সিহানও কি ছিলো! ভেবেই জিব কাটে সিহান। থাকলেও মন্দ হতো না! বড়লোকদের সাথে কিছু সময় ভেসে থাকতে পারলে মোটাতাজা হবার কিছু কড়ি জুটেও যেতে পারতো। একটু আফিমের ঘ্রাণ, একেবারে মন্দ হতো না। সিহান আবার ভেবে হতাশ হয়। আহা, সেতো ছিলো স্বপ্ন। কিন্তু ওই যে ভেঙে যাবার দৃশ্য! কোন মতেই ভুলা যাচ্ছে না। সত্যিই যদি ভেঙে যায় কি হবে? ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে ওই এলাকার একটা ছবি আছে। ওই ছবি ১৮০৮ সালে তোলা। কিছুই ছিলো না সেখানে। ছিলো বাঁক নেয়া নদী আর ভাসমান কিছু ইঞ্জিনবোট। স্বপ্নের মত সব ভেঙে গেলে কি দুই’শ বছর পিছনে ফিরে যাবে কেনারি ওয়ার্ফ বা ইস্ট ইন্ডিয়া ডক? তাতে কি ভালো হতো? না । কারণ তখন তো ব্রিটিশরা দস্যুবৃত্তি করে বেড়াতো। ওই ডাকাতরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের দাবি করে। অথচ তাদের ডাকাতির ধরনটা পোশাক বদলেছে মাত্র। আমি যা আয় করি তা যে কিভাবে শালারা আমার পকেট থেকে নিয়ে নেয় টেরই পাই না। আমাদের দেশে পকেট থেকে টাকা নেয়ার সময় ঝগড়া করা যায়। কিন্ত এখানে বুঝা যায় যে পকেট থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছু বলা যায় না। কারণ পদ্ধতি। ইংরেজীতে যাকে বলে ’সিস্টেম’। ইচ্ছে করে পুঁদের ওপর কষে একটা লাথি মারি। আহা! দিয়া’র পাশে বসলেই সব কষ্ট বাতাসের মত ফুৎকারিয়া যায়। বুক পকেটে জমে যায় আধুলি আধুলি সুখ। ওই সিস্টেমের কথা আর মনে পড়ে না। দিয়া বড় পয়োমন্তর। চোখ দিয়ে চেকে নিয়ে যায় সব চিন্তা আর টন টন ব্যাথা। ওই সুখের জন্য একটা রাজ্য দিতেও আমি রাজি। কিন্তু সমস্যাতো অন্য। ধ্যাৎ সমস্যার কথা আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। আজ দিনটাই শুরু হলো এভাবে। বাসা থেকে বেরিয়ে ওয়াপিং ডকের রাস্তা ধরে হাটতে শুরু করেছে সিহান। কাজে যেতে ভালো লাগছে না। প্রায় দুইশ’(১৮০৫) বছরের পুরনো ওয়াপিং ডক এখনো কতো সাজানো গোছানো। এখানে নাকি বাংলাদেশ থেকে একবার একটি শীপ এসেছিলো। যে জলপথে ব্রিটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষে লুটপাটে গিয়েছিলো, ওই পথেই এসেছিলো কি সে জাহাজ! যেভাবেই আসুক, অবাক করা ব্যাপার হলো,এ জলই পুরো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠকে অখন্ড করে রেখেছে। কী দীর্ঘ জলের শরীর! শঙ্খ, কর্ণফুলীর জল কি থেমসে এসে মিশে? সিহান ভাবে, এই ডকের পাশে যদি তার ঘর হতো। তাহলে প্রতিদিন জলের শব্দ শুনতে পেতো। যে জল ভেসে এসেছে তার দেশের প্রিয় নদী কিংবা সমুদ্র থেকে। ঠিক জলের ওপর একটি ঘর। ওখানে দিয়া আর সিহান কান পেতে থাকতো। জলের শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহের মত ইথারে ভেসে আসতো ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী। কিন্তু এ মুহূর্তে ভাবেতও আর ভালো লাগছে না। রাতের স্বপ্ন আর দিয়া, দু`টোই কেমন যেনো ভেজা মেঘের মত ধোঁয়াশা হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন তো স্বপ্নই, কিন্তু দিয়া? তাকে স্বপ্ন ভাববে কেনো! তার ঘ্রানতো সারাক্ষণ লেগে থাকে শরীর আর মনে। আন্ধারমানিক কানিচরার জল যখন সাপের মত ভাটির দিকে যায়, তখন তো ঘুমায় না বইন্যাকোরা কিংবা চালতা আঁটির ঝাড়। থেমসের জল ভাটিতে গেলে কেনো মরে যাবে দিয়া দিয়া সুখ? এ এক অবাক করা ব্যাপার। বিলেতের বাতাসে আফিম কিংবা এলকোহলের ঘ্রাণ থাকতেই পারে। সাদা গোলাপ বাগানে উর্কাবগা সাপ কিছু সময় বিলি কাটলে কি করার থাকে? দিয়া তো আর মেঘ হয়ে যায়নি। বরং আকাশের পশ্চিম রেখা থেমসের নাভিতে ডুব দিলে জেগে ওঠে দিয়ার মোলায়েম ঘ্রাণ। সিহানের মনে পড়ে প্রথম বিলেতে প্রবেশের কথা। সেদিন থার্টিফাস্ট নাইট। ভারী মেটালের সাথে দুলে দুলে উঠছিলো বিলেতি কইন্যারা। কিন্তু শরীর কিংবা মনের কোন অঙ্গে কাঁপন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মনে মনে ওই দিয়ার মত কাউকেই খুঁজেছিলো সিহান। এখনতো সে আছে। আজ গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছে সিহানের। তাদের বাড়ির পুকুর ঘাটে বসলেই সামনে দাঁড়িয়ে যায় কালো পাহাড়। পেছন থেকে ভোরের সূর্য রশ্নি ছড়াতে থাকলে ওই পাহাড়ও হেসে ওঠে। কিন্তু কানিচরা থেকে আন্ধার মানিক-দোচাইল­া-একপাইয়া হয়ে মাটির শরীর বেয়ে বাঁকা পথটি কোথায় চলে গেছে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি কখনো। সেই কৈশোর থেকে ওই পথের শেষ খুঁজছে সে। ওই পথে তো আর সমুদ্র নেই যে পৃথিবীতে ব্যপ্ত হয়ে গেছে। সত্যিই এই রহস্য নারীর মতই! দিয়াকে কত কাছে ধরে রাখে সারাক্ষণ, কিন্তু প্রায়ই তাকে অচেনা মনে হয়। বিলেতের আবহাওয়ার মত মুহুর্তেই সে মেঘ, রোদ কিংবা বৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু কোন রঙেই তাকে দূরের মনে হয় না। তবে থাকে মাঝ সমুদ্রে জেগে ওঠা একটা চর। ওখানে সব প্রশ্ন নির্বাসনে থেকে যায়। কোন প্রশ্নেরই আর উত্তর মেলে না। ও হেনরি’র ’প্রাইজ’ গল্পের প্রধান চরিত্রটির মতই প্রশ্নরা বিনা অপরাধে নির্বাসন প্রাপ্ত হয়। হাটতে হাটতে রাতের স্বপ্নের সাথে দিয়া’র অন্তমিল খোঁজে সিহান। কোথাও একটা সূতো বান্ধা না থাকলে স্বপ্নের সাথে দিয়া কেনো আসবে? কিন্তু পরক্ষনেই এ চিন্তা ঠাঁই পায় না। স্বপ্ন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না সিহানের। তবুও কখনো কখনো কিছু স্বপ্ন নোঙর ফেলে বসে থাকে বুকের মাঝখানে। ভাগ্যিস দিয়াকে মাছের মা হতে দেখেনি সিহান। তাহলে বিলেত যাপন ভারী হয়ে যেতো। অজান্তে বা অদেখায় যা কিছুই হয় তা ’না দেখে বলবো কিভাবে’র মত প্রশ্নই থেকে যায়। চতুর না হলে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না আর। ঠিক ওই ইংরেজী ’সিস্টেম’ এর মত একটা ব্যাপার। সিহান ভাবে, তাহলে কি দিয়া ব্রিটিশ কায়দা রপ্ত করে ফেলেছে? ভারতবর্ষের যে মানুষগুলো উড়ে চলে এসেছে এদেশে, সবাই কি একই কায়দা রপ্ত করছে? তাহলেতো একটা কাজ হবে। ওই যে ভারতবর্ষে বেনিয়াদের শাষন-শোষনের কাল, তার পূণঃ প্রবর্তন হবে ব্রিটেনে। এটাকে প্রাকৃতিক নিয়মও বলা যেতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষগুলো ওই শোষনের জন্য মানষিকভাবে সামর্থবান কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে। ওই এলাকার মানুষেরা কেনো যেনো দুঃখ বিলাসী হয়। দুঃখের গান কিংবা কবিতা তাদের ভালো লাগে। মুখে সহজে হাসি লাগে না। এর প্রধান কারণ কি দারিদ্র? হতেও পারে। দিয়া’র তো অর্থ-কড়ির টান নেই। বাবার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদ। তবুও কখনো কখনো তার মুষড়ে যাওয়া পরিদৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিলেতের নদীগুলো ভাঙ্গে না পদ্মা-মেঘনার মত। নিরন্তর বহমান যৌবন। দিয়ার বাল্য বন্ধু রূপনের কথা মনে হয় সিহানের। যে কিনা ঢাকায় বসে প্রতিনিয়ত মনে করতো  তার গ্রাম সাভারচালায় শীতলক্ষ্যা ভাঙছে আর বুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভুল ভাঙে পাঁচ বছর পর যখন শীতলক্ষ্যার জলে পা রাখে। টের পায় শীতলক্ষ্যা নয়, রূপনই বুড়িয়েছে। ইদানিং এ গল্প বলে দিয়া। কেনো বলে?  আজ আর কাজে যাওয়া হবে না। ওয়াপিং পার্কে ওক গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে সিহান। ওকের চ্যাপ্টা পাতার ফাঁক গলে গড়িয়ে পরছে কখনো রোদ, কখনো মেঘ। এ এক অদ্ভুদ আবহাওয়া। সামার যাই যাই করছে। গাছের পাতারা হলুদ হচ্ছে। তাপমাত্রা এখন চৌদ্দ ডিগ্রী তো কতক্ষণ পর আঠারো ডিগ্রী। তবে বৃষ্টির আশংকা নেই মনে হচ্ছে। অদূরে ম্যাপেল গাছে বসে আছে ব্লু টিট পাখি। বুকের হলুদ রঙ আর নীল পাখনায় এ পাখিটির আঁকার বাংলাদেশের দোয়েলের কথা মনে করিয়ে দেয়। কখনো কখনো দিয়া পাখি হয়ে যায়। উড়তে থাকে লন্ডন শহরের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। পাখি হিসেবে কি নাম দেয়া যায় তার? ব্লু টিট নাকি দোয়েল? ওকে জিজ্ঞেস করলে নির্ঘাত বলবে দোয়েল। বাংলাদেশের অনেক পাখির নাম তার মুখস্ত। দেশের প্রতি তার ভালোবাসা যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। এক সময় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তার দেশ নিয়ে বক্তব্য শুনার জন্য অনেক শিক্ষকও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো কখনো ভাড়াটে বক্তা হিসেবে কাজ করার গল্পও সে করেছে। মুখে বাক্য থাকলে যে কোনো দেশে গিয়ে খাপ খাওয়ানো সহজ। দিয়া কে দেখলে তা বুঝা যায় অনায়াসে। ব্রিটিশদের নানা অকর্ম নিয়ে তার তিরস্কারের সীমা নেই। অথচ সেই পথেই পা রেখে সব ভুলে যায় দিয়া। কাজ করে যায়। হাতের মুঠো পুরে ফিরে আসে। এসে বলে ’বুঝলে এ হলো ক‚টনীতি’। বাংলাদেশের কোনো একটি মিশনে যদি সরকার তাকে নিয়োগ দিতো তাহলে নিশ্চয় একটি ঐতিহাসিক দৃশ্য তৈরী করতে পারতো। আজকাল বাংলাদেশের রাজনীতিক বা ক‚টনীতিক-আমলারা ছিচকে চোর। তাদের দিয়ে আর যাই হোক দিয়া’র মত ক‚টনীতি হবে না। প্রায়ই দেশে ফেরার কথা বলে সে। বেশ কয়েক বছর যাওয়া হয়না। লাল পাসপোর্টটা যতেœ রাখে। যাদের নাই তারা ওটা পর্দাফাই করে দিতে পারে সে ভয় তাকে তটস্থ রাখে। সবুজ পাসপোর্টটিও রিনিউ করে রাখে। তবে ওটার প্রতি তার তেমন মায়া দেখা যায় না। কাছে থাকলে তাকে রাতের স্বপ্নের কথা বলা যেতো। ও আবার এলকোহল খুব পছন্দ করে। নিমিষেই ভোতকা সাফাই করে দেয়। আহা, তখন দিয়ার চোখে ঘোড়া ছুটতে থাকে। লিপিস্টিক ছাড়াই অধর লাল হয়। কাঁপতে থাকে আর টান টান করে কথা বলে। একবার তো এ অবস্থায় পুরো ওয়েস্টমিনিস্টার নিজের দাবি করে বসেছিলো। আর বলেছিলো একবার যদি ছোট প্রিন্সের সাথে দেখা হতো! সিহানের তখন বলতে ইচ্ছে করেছিলো, ইস একবার যদি মিডলটনের সাথে দেখা হতো! এ কথা মনে হবার সাথে সাথে রাতে দেখা স্বপ্নের সাথে দিয়া এবং নিজের কোথায় যেনো একটা মিল পাওয়া যায়। কোথায়? দু’জনের মধ্যেই ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন কাজ করছে। কাজ করছে স্থান দখলের ইচ্ছা। ব্রিটিশ আর মার্কিনীরা তো পুরো বিশ্বে থাবা ফেলে বসে আছে।  আর এলকোহল না হলে দু’জনেরই এখন আর চলে না। পুরো সপ্তাহের অন্তত একদিন দু’জনে বসে পান করতে করতে মাতাল হবে আর ঢলে পরবে এটা তো রুটিন হয়ে গেছে। কি অবলীলায় মৌজ করার দেশ ব্রিটেন। দিয়া অন্য দিনগুলো পাখির মত উড়তে থাকে। সিহানের কাছে এসময়  বিলেতের আকাশকে দিয়াময় মনে হয়। খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোট বেলায় মেঘের ঘোড়া কিংবা হাতি দেখার মত পেয়ে যায় দিয়াকে। কিন্তু কখনো কখনো ওই মেঘের দেশে দিয়ার সাথে অন্য একজনকে দেখা যায়। তখন সিহানের মুখ খিচে খিস্তি আওড়াতে ইচ্ছে করে। আবার দমে যায়। এদেশে এসব নিয়ে কথা বলা যায় না। যার যা ইচ্ছে করবে। বাঁধা দিলে বিপদ। অধিকার খুন্নের অভিযোগে আইনের ফাঁস গলায় বিঁধে যাবে। সিহান ওকের গুঁড়ি থেকে টান টান করে উঠে দাঁড়ায়। থেমসের দিকে হাটে। পাশের অফ লাইসেন্স থেকে একটি স্ট্রংবো’র ক্যান টেনে নেয়। রাতের একটি স্বপ্ন পরো দিনটিকে চমৎকার কিংবা দুরূহ ভাবনার আধার করে দিলো। বিয়ারের ক্যানে কয়েক টান দিয়ে বিরক্তিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মাত্র ৫ ভাগ এলকোহল! শালা এতেতো নেশাই হবে না। মাঝে মাঝে সিহানের এমন নেশা করতে ইচ্ছে করে যে, চোখে যেনো শুধু সবুজ দেখা যায়। ওই বাংলাদেশের মত সবুজ মানচিত্র। ওই মানচিত্রের শিরায় শিরায় মিশে যাবে দিয়া আর তার দেহগত সুখ। এরকম চিন্তা মাথায় কুন্ডুলী পাকাতে থাকলে থেমসের পাড়ে দাঁড়িয়ে একটু স্থির হয় সিহান। পাশের বেঞ্চিতে বসে খালি পা রাখে বেঞ্চের ওপর। মেজাজ আবার সিঁটিয়ে ওঠে। মনে পড়ে বাড়ির পাশে দূর্বাঘাসের ওপর পা রাখলে কেমন শিউরে উঠতো পুরো শরীর। আর এখানে পা রেখে মনে হচ্ছে মরা কার্পেটের ওপর পা রেখেছে। কেনারি ওয়ার্ফের দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করে না। থেমসের বুকে জেগে ওঠা ওই বাণিজ্যিক শহরটি তাবৎ বিশ্বের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এখান থেকে কত অন্নের যোগ-বিয়োগ হয় তা কে জানে। ওখানে নাকি বিশাল বাজেটের ছবিরও শ্যূটিং হয়। একবার নাকি আমাদের নায়িকা ববিতা শ্যূটিং করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একদিনে নব্বই হাজার পাউন্ড দিতে হবে শুনে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও ওই এলাকাটি স্বপ্নের মত ভেঙে যাক তা সিহান চায় না। ধরা যাক ওখানে যা কিছু মঙ্গলের জন্য হয় তা-ই মানুষের জন্য। আর অমঙ্গল তো সব সময়ই অস্পৃশ্য। সিহান তাকায় সম্মুখে। থেমসের বুক দ্বিখন্ডিত করে চলে যাচ্ছে রিভার ক্রুইজ। ওখানে লাফাচ্ছে সাফ কিংবা অক্টোপাস। ওরা ছোবল দেয় ওরা ঘিরে রাখে। ওদের বিষ অনেক সুস্বাদু হবার কথা নয়। মাঝে মাঝে দিয়া’র চোখে মুখে ওই বিষের সন্তরণ দেখা যায়। তবুও যে কেনো দিয়াকে এতো ভালো লাগে! কাছে পেতে ইচ্ছে করে। বুক থেকে এক গুচ্ছ বেলিফুলের ঘ্রান নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইদানিং প্রায়ই ওর ফোন বন্ধ থাকে। বেশ ক’দিন দেখা হয় না। মাঝে মাঝে ও সময় পাল্টাতে চায়। রিফিল করতে চায় নতুন সময়। সিহান ঠিক করে এবার পেলে দিয়াকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। এ অঞ্চল ছেড়ে অন্য অঞ্চলে। সেখানে থেমস নয়, লী’র মত ছোট্ট একটি নদী থাকবে। থাকবে ছোট্ট ডিঙ্গী নৌকো। ওখানেই জলের ওপর হবে বসত। চারদিকে থাকবে জলপদ্মের বজরা। মাঝে মাঝে শাপলা থাকলেও মন্দ নয়। প্রতিদিন দিয়ার পুঁজো দিতে সংগ্রহে থাকবে এক লক্ষ গোলাপ। ভাবতে ভাবতে দিয়ার নাম্বারে ফোন করে সিহান। আগে ভাগেই বলে নেয়া যাক ভাবনার কথা। দিয়া নিশ্চয় এসব শুনার পর মেঘের ঘোড়ায় চাপবে না। কিন্তু মোবাইল যথারীতি বন্ধ। মাথা নীচু করে বসে থাকে সিহান। দেখে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল কামড়ে ধরেছে একটি বিলেতি পোকা। ওটাকে হাতে তুলে ছুঁড়ে দেয় থেমসের স্রোতে। থেমস ভেসে যাচ্ছে। দিয়া ভেসে যাচ্ছে। থেমস বহুগামী হয়ে আছে এ লন্ডন শহরে। অত গমণ পথে দিয়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে, যাত্রা ভঙ্গ এড়াতে কিংবা নিজের ভেঙ্গে যাওয়া গোপনে লালন করতে। সিহান আর দাঁড়ায় না। নিজের ছায়া সাথে করে কর্ণের দুল খোঁজে নদী কর্ণফুলীতে।     / এআর /

মার্কিন লেখক উরসুলা আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সায়েন্স ফিকশান ও ফ্যান্টাসি’ বিষয়ক লেখক উরসুলা কে লি গুয়িন আর নেই। গত সোমবার রাতে পোর্টেল্যান্ডের নিজ বাড়িতে তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।  গত মঙ্গলবার তার টুইটার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তার পরিবারের সদস্যরা জানান, উরসুলাকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। বিশ্বব্যপী লিঙ্গ বিষম্য, শ্রেণী বৈষম্য ও অসম প্রতিযোগিতার সমস্যা মোকাবেলায় তিনি নানান বই লিখেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি ২০টি উপন্যাস ও ১০০টি ছোট গল্প লিখেছেন। এই বইগুলোর বিশ্বব্যপী কয়েক লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে `আর্থসি` সিরিজের জন্য উরসুলা বিখ্যাত হয়ে ওঠেছিলেন। তরুণদের জন্য লেখা বইটি ১ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ১৯৬৯ সালে লেখা সায়েন্স ফিকশান- ‘দ্য লেফট হ্যান্ড অব ডার্কনেস’বিশ্বব্যপী সমাদৃত হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে উরসুলা বলেছিলেন, আমি শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের জন্য লিখি না। অর্ধ শতক ধরে সায়েন্স ফিকশান লেখা গুণী এই লেখিকা যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিশুসাহিত্যে সর্বোচ্চ পুরস্কার নেউবেরি মেডেল পদকও তিনি অর্জন করেন। জানা যায়, উরসুলা ১৯২৯ সালের ২১ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া শহরের বার্কেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানের উপর ফেলোশিপ অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে তার প্রথম নোবেল রোকানন’স ওয়ার্ল্ড প্রকাশিত হয়। সুত্র:বিবিসি এমজে/  

ছেলেবেলায় কবিতা লেখা শিখতে চাননি হুমায়ূন আহমেদ!

সাধারণ মানুষের জানার আগ্রহ থাকে তাদের প্রিয় কবি সাহিত্যিকরা ছেলেবেলায় কি হতে চাইতেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা আরও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। তেমনি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ ছেলেবেলায় কি হতে চেয়েছিলেন এ নিয়ে অনেকের আগ্রহের কমতি নেই। ওই সময়ের একজন কবি তাকে কবিতা লিখা শিখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। অর্থাৎ তার কবিতা লিখার ইচ্ছে ছিল না ওই সময়ে এমনটিই জানা যায় তার ‘আমার ছেলেবেলা’ নামক বইয়ের সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে। সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন - বাবার অসংখ্য বাতিকের একটি হল-সাহিত্য-বাতিক। মাসে অন্তত দু’বার বাসায় ‘সাহিত্য বাসর’ নামে কী যেন হত। কী যেন হত বলছি এই কারণে যে, আমরা ছোটরা জানতাম না কী হত। আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সাহিত্য চলাকালীন আমরা হৈ চৈ করতে পারতাম না, উঁচু গলায় কথা বলতে পারতাম না, শব্দ করে হাসতেও পারতাম না। এর থেকে ধারণা হত, বসার ঘরে তাঁরা যা করছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে একদিন খানিকটা শুনলাম। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হল। একজন খুব গম্ভীর মুখে একটা কবিতা পড়ল। অন্যরা তার চেয়েও গম্ভীর মুখে শুনল। তারপর কেউ বলল, ভালো হয়েছে, কেউ বলল মন্দ এই নিয়ে তর্ক বেধে গেল। নিতান্তই ছেলেমানুষী ব্যাপার। একদিন একজনকে দেখলাম রাগ করে তার লেখা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অম্নি দু’জন ছুটে গেল তাকে ধরে আনতে। ধরে আনা হল। বয়স্ক একজন মানুষ অথচ হাউমাউ করে কাঁদছে। কী অদ্ভুদ কাণ্ড! কাণ্ড এখানে শেষ হয় না। ছিঁড়ে কুচিকুচি করা কাগজ এরপর আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হতে লাগল। সেই লেখা পড়া হল, সবাই বলল, অসাধারণ এই হচ্ছে বাবার প্রাণপ্রিয় সাহিত্য বাসর। সারাটা জীবন তিনি সাহিত্য সাহিত্য করে গেলেন। কতবার যে তিনি ঘোষণা করেছেন, এবার চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করবেন! চাকরি এবং সাহিত্য দুটো একসঙ্গে হয় না। ট্রাংকে বোঝাই ছিল তাঁর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গল্প কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ। থরেথরে সাজানো। বাবার সাহিত্যপ্রেমের স্বীকৃতি হিসেবে আমাদের বসার ঘরে বড় একটা বাঁধানো সার্টিফিকেট ঝোলানো, যাতে লেখা- ‘ফয়জুর রহমান আহমেদকে সাহিত্য সুধাকর উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।’ এই উপাধি তাঁকে কারা দিয়েছে, কেন দিয়েছে কিছুই এখন মনে করতে পারছি না। শুধু মনে আছে বাঁধানো সার্টিফিকেটটির প্রতি বাবার মমতার অন্ত ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিফলকে আমি এই উপাধি এবং শোকগাথায় রবীন্দ্রনাথের দু’লাইন কবিতা ব্যবহার করি। দূরদূরান্ত থেকে কবি-সাহিত্যকদের হঠাৎ আমাদের বাসায় উপস্থিত হওয়া ছিল আরেক ধরনের ঘটনা। বাবা এঁদের কাউকে নিমন্ত্রণ করে আনতেন না। তাঁর সামর্থ্য ছিল না, তিনি যা করতেন তা হচ্ছে মনিঅর্ডার করে তাঁদের নামে পাঁচ টাকা বা দশ টাকা পাঠিয়ে কুপনে লিখতেন- জনাব, আপনার…কবিতাটি…পত্রিকার…সংখ্যায় পড়িয়া মনে বড় তৃপ্তি পাইয়াছি। উপহার হিসেবে আপনাকে সামান্য কিছু অর্থ পাঠাইলাম। উক্ত অর্থ গ্রহণ করিলে চির কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকিব। ইতি প্রতিভামুগ্ধ- ফয়জুর রহমান আহমেদ (সাহিত্য সুধাকর) ঐ কবি নিশ্চয়ই তাঁর কাব্যের জন্য নানান প্রশংসাবাক্য শুনেছেন, কিন্তু মনি অর্ডারে টাকা পাওয়ার ব্যাপারটা না ঘটারই কথা। প্রায় সময়ই দেখা যেত, আবেগে অভিভূত হয়ে যশোর বা ফরিদপুরের কোনো কবি বাসায় উপস্থিত হয়েছেন। এমনিভাবে উপস্থিত হলেন কবি রওশন ইজদানী। পরবর্তীকালে তিনি খাতেমুন নবীউন গ্রন্থ লিখে আদমজী পুরস্কার পান। যখনকার কথা বলছি তখন তাঁর কবিখ্যাতি তেমন ছিল না। আমার পরিষ্কার মনে আছে, লুঙ্গি-পরা ছাতা-হাতে এক লোক রিকশা থেকে নেমে ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। জানলাম, ইনি বিখ্যাত কবি রওশন ইজদানী। আমাদের বল দেওয়া হল যেন হৈ চৈ না করি, চিৎকার না করি। ঘরে একজন কবি বাস করছেন। কবিতা লেখার মুডে থাকলে ক্ষতি হবে। দেখা গেল, কবি সারা গায়ে সরিষার তেল মেখে রোদে গা মেলে পড়ে রইলেন। আমাকে ডেকে বললেন- এই মাথা থেকে পাকা চুল তুলে দে। কবি-সাহিত্যিকরা আলাদা জগতে বাস করেন, মানুষ হিসেবে তাঁরা অন্যরকম বলে যে প্রচলিত ধারণা আছে কবি রওশন ইজদানীকে দেখে আমার মনে হল ঐ ধারণা ঠিক না। তাঁরা আর দশটা মানুষের মতোই, আলাদা কিছু না। আমার আদর-যত্নে, খুব সম্ভব পাকা চুল তোলার দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি আমাকে একদিন ডেকে বললেন, খাতা-কলম নিয়ে আয়, তোকে কবিতা লেখা শিখিয়ে দিই। আমি কঠিন গলায় বললাম, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, তাহলে কি শিখতে চাস? কিছুই শিখতে চাই না। আসলেই তা-ই। শৈশবে কারওর কাছ থেকে আমি কিছুই শিখতে চাইনি। এখনও চাই না। অথচ আশ্চর্য, আমার চারপাশে যাঁরা আছেন তাঁরা ক্রমাগত আমাকে শেখাতে চান।‘জানবার কথা’ নামের একটি বই শৈশবেই ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলেছিলাম এই কারণেই। এসএইচ/ডব্লিউএন

যদি মন কাঁদে...

কথার জাদুকর। বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, কিংবদন্তি। যার লেখায় মোহিত হননি এমন বাঙালি পাঠক পাওয়া দুষ্কর। তিনি সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। যিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। আজ পালিত হবে তার ৭০তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা তেমন পছন্দ ছিল না হুমায়ূন আহমেদের। তবুও রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রিয়জনদের নিয়ে কাটতেন জন্মদিনের কেক। সকাল হলে ভক্তরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন প্রিয় লেখককে। এছাড়া দিনব্যাপী নানা আয়োজন তো থাকতই। আর আজ সকালে নুহাশ পল্লীতেও থাকছে বিশেষ অনুষ্ঠান। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে আজ চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে ‘হুমায়ূন মেলা’। বিকাল ৩টা ৫ মিনিটে তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই চত্বরে হুমায়ূন মেলার উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত থাকবেন- নাট্যব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিকসহ দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজন, চ্যানেল আই পরিচালক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও হুমায়ূন আহমেদ পরিবারের সদস্যরা। মেলায় থাকবে হুমায়ূন আহমেদের বই, চলচ্চিত্র, নাটকসহ তার কর্মজীবনের নানা সামগ্রীর স্টল। মেলা চলবে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। মেলা প্রাঙ্গণ মঞ্চে পরিবেশিত হবে হুমায়ূন আহমেদের লেখা গান, নাচ, আবৃত্তি, স্মৃতিচারণ পর্ব ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রকাশকদের আয়োজনে বিকাল সাড়ে ৩টায় পাবলিক লাইব্রেরিতে শুরু হবে হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে সাত দিনব্যাপী একক বইমেলা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও লেখকের অনুজ কার্টুনিস্ট লেখক আহসান হাবীব। এছাড়া বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলেও অনুষ্ঠিত হবে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনের নানা আয়োজন। হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালিতে অবস্থিত স্বপ্নের নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেক কাটা, পুরো নুহাশ পল্লীকে আলোকসজ্জায় সজ্জিতকরণ ও মরহুমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ। নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে নুহাশ পল্লীর পক্ষ থেকে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। আজ সকালে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে নুহাশ পল্লীতে মরহুমের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের সংগঠন হিমু পরিবহনের উদ্যোগে গাজীপুরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে ক্যান্সার সচেতনতামূলক ৩০ জনের একটি সাইকেল শোভাযাত্রা জেলা শহর থেকে নুহাশ পল্লীতে যাবে। পথে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হবে। সংগঠনের ১৫ সদস্যের অপর একটি দল ঢাকা থেকে খালি পায়ে হেঁটে নুহাশ পল্লীতে যাবে। হুমায়ূন আহমেদ এর বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। বাবা লেখালিখি ও পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশ করতেন। বগুড়া থাকাকালীন তিনি একটি গ্রন্হও প্রকাশ করেছিলেন। নাম ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। হুমায়ুন আহমেদের ছোট তিন বোন শিকু, শিফু ও মনি। ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। ডাকনাম কাজল। তার বাবা নিজের নাম ফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন। বাবার চাকরি সূত্রে নেত্রকোনা, দিনাজপুর, বগুড়া, সিলেট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, বরিশালে শৈশব কেটেছে তার। সেই সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। জনপ্রিয় কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তার রুমমেট ছিলেন। এমএসসি শেষে হুমায়ূন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তবে প্রচারবিমুখ এই বিস্ময় পুরুষ সাধারণত নামের শেষে কখনও ‘ড.’ উপাধি ব্যবহার করতেন না। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মে প্রবেশ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ লিখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এক সময় অধ্যাপনা ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৩ সালে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রথমা স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ভালোবেসে তিনি গুলতেকিনকে বিয়ে করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের উত্থান ও তার প্রথম জীবনের সংগ্রামে নেপথ্যের নায়িকা হয়ে ছিলেন তার স্ত্রী। নিজের লেখা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ বইতে সেই সাক্ষ্য নিজেই দিয়ে গেছেন তিনি। হুমায়ূন-গুলতেকিন দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। তারা হলেন- মেয়ে বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলার বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ওই বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যা মারা যায়। সেই কন্যার নাম রেখেছিলেন লীলাবতী। তাকে একটি বইও উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ূন। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র জীবনে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে, ১৯৭২ সালে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার দ্বিতীয় গ্রন্হ। তারপর থেকে যেখানেই হাত দিয়েছেন হুমায়ূন, সেখানেই সোনা ফলেছে। সময়ের অববাহিকায় দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্হ। যা বিশ্ব সাহিত্যে একজন লেখক হিসেবে তাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। তার রচনাসমগ্রের মধ্যে এইসব দিনরাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, নি, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জাংশান, বহুব্রীহি, আশাবরি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, আমার আছে জল, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, বাদশাহ নামদার, এপিটাফ, রূপা, আমরা কেউ বাসায় নেই, মেঘের ওপারে বাড়ি, আজ চিত্রার বিয়ে, এই মেঘ, রৌদ্রছায়া, তিথির নীল তোয়ালে, জলপদ্ম, আয়নাঘর, হুমায়ূন আহমেদের হাতে ৫টি নীলপদ্ম ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়া লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প। তার ছোট গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভৌতিক গল্পেও জুড়ি নেই হুমায়ূনের। এর বাইরে কবিতা ও গান লেখাতেও হাত চালিয়েছেন। বিশেষ করে একজন গীতিকবি হিসেবে হুমায়ূন ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো’, ‘চাঁদনি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে’ ইত্যাদি গানে নিজেকে কালজয়ী করে রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যের নতুন যুগের স্রষ্টা ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যকে সার্বজনীন করে তুলতে এই কিংবদন্তি কথাশিল্পীর অবদান ইতিহাস হয়ে থাকবে। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’ জনপ্রিয়তায় বিশ্ব সাহিত্যেও বিস্ময়। এর বাইরে ‘মিসির আলী’, ‘রুপা’, ‘শুভ্র’, ‘মাজেদা খালা’, ‘বাকের ভাই’, ‘মোনা’, ‘ছোট মামা’ ইত্যাদি চরিত্রগুলোও দারুণ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে। এই চরিত্রগুলো নাটক ও চলচ্চিত্রের হাত ধরে চিরদিনের মতো থেকে গেল আশ্চর্য রকম জীবন্ত। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা বিচিত্র সব চরিত্র মানুষকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, স্বপ্নে ভাসিয়েছে। এক একটি চরিত্র পাঠক-দর্শকদের কাছে একেকটি নতুন আবিষ্কার। সাহিত্যের চরিত্রগুলোই বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে তার নাটক-সিনেমায়। হুমায়ূনের গড়া এসব চরিত্রে কখনও কখনও তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজেরই প্রতিরূপ। হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে আমরা তাই খুঁজে পাই কখনও হিমু, কখনও বা মিসির আলী, আবার কখনও শুভ্রকে। তার তৈরি করা চরিত্রের জনপ্রিয়তা ব্যক্তি হুমায়ূনকেও কখনও কখনও যেন ছাড়িয়ে গেছে। একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। হুমায়ূন আহমেদে মৃত্যতে শোক প্রকাশ করে স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সব গুণী মানুষ একে একে চলে যাচ্ছে। হুমায়ূনকে হারিয়ে অনুভব করছি, আপনজন হারানোর বেদনা। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের জন্য আমরা যারা কাজ করে আসছি, হুমায়ূন আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মানুষকে হলমুখী করেছিলেন।’ মূলত তার চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ তৈরি হয় নব্বই দশকের প্রথম দিকে। এই আগ্রহ আর সীমাহীন স্বপ্ন ছিল জীবনের শেষভাগেও। মোট ৮টি ছবি নির্মাণ করে গেছেন তিনি। ছবিগুলো হলো ‘আগুনের পরশমনি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে একজন লেখক হিসেবে প্রায় সবই তিনি অর্জন কিংবা জয় করে নিয়েছিলেন। পাঠক, ভক্ত, সম্মান, টাকা-সব কিছুই তিনি পেয়েছিলেন দু’হাত ভরে। আর স্বীকৃতিস্বরুপ নানা সময়ে ঘরে উঠেছে নানা পুরস্কার। তার মধ্যে রয়েছে- সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসুদন পদক, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক এবং চলচ্চিত্রে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদ চিরদিন সম্মানিত হয়ে থাকবেন আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, ডলি জহুর, সুবর্ণা মুস্তাফা, আলী জাকের, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, স্বাধীন খসরু, ডা. এজাজ, মাহফুজ আহমেদ, কুদ্দুস বয়াতি, বারী সিদ্দিকী, ফারুক আহমেদ, বিপাশা হায়াত, শমী কায়সার, প্রাণ রায়, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শামীমা নাজনীনের মতো অসংখ্য নন্দিত শিল্পীদের কারও কারও উত্থান ও কারও বা অনিন্দ্য বিকাশের কারিগর হিসেবে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন কোলন ক্যান্সারে ভুগছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আরোগ্যের আশায় দীর্ঘ ৯ মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হসপিটালে স্থানীয় সময় ১১টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ। সাহিত্যের আড়ালে হুমায়ূন আহমেদ খুব হালকা ভাষায় বলে যেতেন মানবজীবনের চরম বাস্তবতার কথা। তেমনি এক লেখায় বলেছিলেন- ‘তুমি হাসলে সবাই তোমার সাথে হাসবে, কিন্তু তুমি কাঁদলে কেউ তোমার সাথে কাঁদবে না। মানুষকে কাঁদতে হয় একা একা।’ খুব জানতে ইচ্ছে করে, কত মানুষ তার বিরহে আজ একা একা কাঁদে সে কথা কি প্রিয় হুমায়ূন জানেন? কিংবা দেখতে পান? আরকে// এআর

বুকার পেলেন মার্কিন লেখক জর্জ স্যান্ডার্স

এ বছর ম্যান অব বুকার পুরস্কার জিতেছেন মার্কিন লেখক ৫৮ বছর বয়সী জর্জ স্যান্ডার্স৷ প্রথম উপন্যাস ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ লিখেই এ পুরস্কার পান তিনি । লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ডাচেস অফ কেমব্রিজ কেট উইলিয়াম ৷ সেইসঙ্গে ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থমূল্য পান তিনি৷ দ্বিতীয় আমেরিকান হিসাবে এই পুরস্কার পেলেন জর্জ স্যান্ডার্স৷ যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ঠিক এক বছর আগের সময়কাল অর্থাৎ ১৮৬২ সালকে জর্জ স্যান্ডার্স তার ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ উপন্যাসের জন্য বেছে নিয়েছেন৷ নাম থেকে স্পষ্ট আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে কেন্দ্র করে সাজিয়েছেন গল্পটি৷ ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলে ধরার পাশাপাশি আশ্রয় দিয়েছেন নিজের কল্পনাকেও৷ উপন্যাসে উঠে এসেছে লিঙ্কনের ছোট ছেলের কথা৷ গতবছর আমেরিকান লেখক পল বেট্টির লেখা ‘দ্য সেলআউট’ উপন্যাসটি বুকার পায়৷ এই বছর ফের মার্কিন ঝুলিতেই গেল সাহিত্যের অন্যতম এ পুরস্কার৷ এর আগে বুকার পুরস্কার ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সাহিত্যিকদের দেওয়া হত৷ ২০১৪ সালের পর সেই প্রথা তুলে দেয় বুকার কমিটি৷ সূত্র:দ্যা গর্ডিয়ান এম     

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি