ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ২:৪৫:২৮

টেনশন ও স্ট্রেস হৃদরোগের অন্যতম কারণ

পর্ব -১০

টেনশন ও স্ট্রেস হৃদরোগের অন্যতম কারণ

গত কয়েক দশকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অসংখ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, হৃদরোগের অন্যতম কারণ মানসিক। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো ক্রমাগত টেনশন ও স্ট্রেস। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য কিংবা ধূমপানের অভ্যাস না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র স্ট্রেসের কারণেই একজন মানুষ করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। দেখা গেছে, ধমনীতে ৮৫% ব্লকেজ নিয়ে একজন মানুষ ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন। আবার এমনও হয়েছে, ধমনীতে কোনো ব্লকেজ নেই কিন্তু হঠাৎ করেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। এর কারণ কি? হৃদরোগীদের কেউ কেউ বলেন, সারাজীবন নিয়ম মেনে চলেছি, স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েছি, কোলেস্টেরলের পরিমাণও ছিল স্বাভাবিক, আমার কেন হার্ট অ্যাটাক হলো? কিন্তু যদি তার পুরো কেস-হিস্ট্রি অর্থাৎ পারিবারিক সামাজিক পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয় তবে হয়তো দেখা যাবে, আজীবন তিনি স্ট্রেস নিয়েই বেঁচে ছিলেন। কিংবা দৈনন্দিন ছোটখাটো সব ব্যাপারেই তিনি ভীষণ টেনশনে ভুগতেন। আসলে সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ক্রমাগত স্ট্রেস আমাদের জীবনের স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত করে। হৃদয়ের পাশাপাশি তখন আক্রান্ত হয় হৃদযন্ত্রও, যার অন্যতম পরিণতি করোনারি হৃদরোগ এবং অন্যান্য মানোদৈহিক রোগব্যাধি। মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন যে, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। অনেকে মনে করেন,এনজিওগ্রাম ব্লক ধরা পড়েছে, এখন স্টেন্ট বা রিং লগিয়ে নিলে কিংবা বাইপাস অপারেশন করে নিলেই হবে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আর নেই। কিন্তু সত্য হলো, স্ট্রেস বা টেনশনের বৃত্ত থেকে যদি একজন মানুষ বেরিয়ে আসতে না পারেন, তবে হৃদরোগের ঝুঁকিমুক্ত থাকা তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা তার শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়, আর্টারিতে যে কয়টাই স্টেন্ট লাগানো হোক। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. মেয়র ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোনেম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুল জীবনাচরণের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জীবন সম্পর্কে আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি। ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স (Fight or flight response) হচ্ছে আমাদের অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন গুহা বা জঙ্গলে ছিলো তখন হিংস্র বন্যপ্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে তাদের একটাই পথ ছিলো-হয় প্রাণিটার সাথে লড়তে হবে অথবা এত জোরে দৌড়াতে হবে যাতে সেই প্রাণিটা তাকে ধরতে না পারে। এখন বন্যপাণীর সাথে লড়াই করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু এই ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্সটা আমাদের নার্ভাস সিস্টেম থেকে গেছে। ক্রমাগত দুঃশ্চিন্তা ও স্ট্রেস যে করোনারি ধমনীতে ব্লকেজের কারণ, তা বোঝা যায় ডা.আলবা সাবাই পরিচালিত একটি গবেষণায়। তিনি বৈরুতে কিছু মানুষের উপর একটি গবেষণা চালান, একযুগেরও বেশি সময় ধরে যারা বিভিন্ন কারণে স্ট্রেস-আক্রান্ত ছিলেন। তাদের এনজিওগ্রাম করে ডা.সাবাই, প্রত্যেকের করোনারি ধমনীতে ব্লকেজ শনাক্ত করেন। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নেতিচিন্তা, আবেগের আগ্রাসন আর ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টির কারণে চাওয়া এবং পাওয়ার ফারাক অর্থাৎ জীবনের অংক মেলাতে না পারার হাহাকার ও পণ্যদাসত্ব আমাদের মধ্যে সারাক্ষণই এক দুঃসহ স্ট্রেস তৈরি করে চলেছে। সবমিলিয়ে ভেতরে চলছে এক অবিশ্রান্ত ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স। ফলে প্রায় সারাক্ষণই সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টিম উদ্দীপ্ত থাকছে এবং নিঃসৃত হচ্ছে বিভিন্ন স্ট্রেস-হরমোন: এড্রিনালিন, নর-এড্রিনালিন, কর্টিসল। দিনের পর দিন এ অবস্থা চলতে তাকলে শরীরের স্নায়ু ও পেশিগুলো যে পরিমাণে সংকুচিত হয় সে অনুপাতে শিথিল হতে পারে না। যার ফলাফল নানারকম সাইকোসোমাটিক বা মনোদৈহিক রোগব্যধি। এ অযাচিত সংকোচন হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনীকেও ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত করে (Coronary artery spasm), যা ধমনী-পথে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলকে ব্যাহত করে। শুধু তাই নয়, সারাক্ষণই মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস-হরমোনের প্রভাবে শরীরে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা,অনিদ্রা এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা। ফলে বেড়ে যায় করোনারি ধমনীতে ব্লকেজ তৈরির সম্ভাবনা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেস-এ থাকাকালে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধি পায়,খাদ্যাভ্যাস যেমনই হোক না কেন। যুক্তরাষ্ট্রে একটি কার রেসিং-এর পূর্বে ৫০০ প্রতিযোগীর রক্ত পরীক্ষা করা হয় এবং প্রতিযোগিতা শেষ হবার পর আরেকবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেছে, রেসের পূর্বে তাদের প্রত্যেকের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি ছিল। এছাড়াও আমেরিকায় ট্যাক্স-একাউন্টেন্টদের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ট্যাক্স জমা দেয়ার আগে-পরের সময়টাতে তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এ গবেষণায় মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন আমেরিকার হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রফেসর ও প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.হার্বার্ট বেনসন। বোস্টনের ম্যাসাচুসেট্স জেনারেল হাসপাতালে তিনি ‘মাইন্ড বডি ইনস্টিটিউট’প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে টেনশনের মনোদৈহিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর গবেষণা করে। তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণভাবে যে রোগগুলোর সাথে আমরা বেশি পরিচিত তার একটা বড় অংশের সাথেই রয়েছে টেনশনের নিবিড় যোগাযোগ। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস,বিভিন্ন রকম পেটের পীড়া, কোষ্ঠকঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক আলসার, আইবিএস, ঘাড় ও মাথাব্যথা, অবসাদ, অনিদ্রা, হাত-পয়ের তালু ঘামা ইত্যাদি। শারীরিক উপসর্গ হিসেবে প্রকাশ পেলেও এসব রোগের আসল উৎস কিন্তু মন। মনে দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে জমতে থাকা কষ্ট, টেনশন, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ। ‍চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাই এ রোগগুলোকে বলা হয় সাইকোসোমাটিক ডিজিজ বা মনোদৈহিক রোগ। আমরা যদি দেখি, টেনশন সৃষ্টি হলে শরীরে কী হয়? টেনশনের ফলে স্নায়ু এবং পেশি সংকুচিত (Tense) হয়। বিশ্রাম বা ঘুম পেশির এই অযাচিত সংকোচন দূর করতে পারে। কিন্তু স্নায়ুর টেনশন বিশ্রাম বা ঘুমে দূর হয় না। এটি থেকেই যায় এবং ক্রমাগত এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় এই রোগগুলোর সূত্রপাত ঘটে। তাই স্নায়ুর টেনশন দূর করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অভাবনীয় অগ্রগতির যুগেও টেনশনমুক্তির জন্যে কোনো কার্যকরী ওষুধ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলো সম্পর্কে যারা সচেতন তারা জানেন যে, কার্যকরীভাবে টেনশন দূর করার বিজ্ঞানসম্মত উপায় হচ্ছে শিথিলায়ন (Relaxation)। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এ বিষয়টি আজ প্রমাণিত সত্য। শিথিলায়নকালে একজন মানুষ তার মনের গভীর প্রবেশ করে। মন প্রশান্ত হয়। তখন ব্রেন থাকে সবচেয়ে কার্যকরী অবস্থায় অর্থাৎ আলফা লেভেল। শিথিলায়নে ধ্যানাবস্থা সৃষ্টি হয়। নিয়মিত শিথিলায়নে মনে একটা স্থায়ী প্রশান্তি আসে, ফলে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো তখন মনকে খুব সামান্যই প্রভাবিত করে। আর দুঃশ্চিন্তা ও শিথিলায়ন একসাথে সম্ভব নয়। কারণ, শরীর শিথিল হলে দেহ-মনে কখনো টেনশন বা দুঃশ্চিন্তা থাকে না। প্রফেসর ডা.হার্বার্ট বেনসন দীর্ঘ গবেষণার পর প্রমাণ করেছেন যে, গভীর শিথিলায়নে হার্টবিট কমে, দেহে ব্যথা বা আঘাতের অনুভূতি হ্রাস পায়, উচ্চ রক্তচাপ কমে, দমের গতি ধীর হয়ে আসে, রক্তে ল্যাকটেট ও এড্রিনালিন-এর পরিমাণ হ্রাস পায়, প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের তৎপরতা বাড়ে, দেহকোষে অক্সিজেন গ্রহণের চাহিদা কমে। সেইসাথে বাড়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীর আপনা থেকেই রোগমুক্তির প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলে। সূত্র: কোয়ান্টাম হার্টক্লাব এর হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধ গ্রন্থ থেকে সংকলিত (সংক্ষেপিত)।   ডব্লিউএন
হৃদরোগের কারণ

আমাদের দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হচ্ছে হৃৎপিণ্ড । বুকের মাঝখানে দুই ফুসফুসের মাঝে এটি অবস্থিত। এর রয়েছে চারটি প্রকোষ্ঠ। ওপরের দুটিকে বলা হয় অ্যাট্রিয়াম বা অলিন্দ এবং নিচের দুটিকে বলা হয় ভেন্ট্রিকল বা নিলয়। আর হৃৎপিণ্ড তার চারপাশে পেরিকার্ডিয়াম নামক একটি আবরণী দ্বারা পরিবেষ্টিত। হৃৎপিণ্ডকে আমরা বলতে পারি, এটি একটি পাম্প যা একজন মানুষের জীবদ্দশায় প্রায় সাড়ে চার কোটি গ্যালনের চেয়ে বেশি রক্ত পাম্প করে থাকে। প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষবার হৃৎস্পন্দনের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড দেহের প্রতিটি কোষে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছে । আর এটি সম্ভব হচ্ছে ধমনী শিরা উপশিরা ও ছোট ছোট রক্তনালী মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মাইল পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে । কেউ কেউ মনে করেন,হৃদয় আর হৃৎপিণ্ড একই জিনিস;কিন্তু আসলে তা নয় । হৃৎপিণ্ড সম্পর্কে বলা যায়,এটি একটি মাংসপিণ্ড আর হৃদয় হচ্ছে একটি চেতনাগিত অস্তিত্ব-যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না; তবে এটি আমাদের অনুভূতিতে সাড়া দেয় ও প্রভাবিত হয় । আমরা জেনেছি,পাম্প করে সারা শরীরে রক্ত পাঠানোই হৃৎপিণ্ডের অন্যতম প্রধান কাজ । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,হৃৎপিণ্ডের নিজের কোষ ও পেশিগুলোর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং কর্মক্ষম থাকার জন্যেও দরকার পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি । এ পুষ্টি পৌঁছে দেয়ার কাজটি সাধিত হয় রক্তের মাধ্যমে । হৃৎপিণ্ডের রক্ত সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে করোনারি ধমনী । হৃৎপিণ্ডের প্রধান দুটি করোনারি ধমনী হলো,যথাক্রামে বাম ও ডান করোনারি ধমনী বা লেফট করোনারি আর্টারি ও রাইট করোনারি আর্টারি ।লেফট করোনারি আর্টারি আবার একটিু নিচের দিকে এসে দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে-লেফট অ্যান্টেরিয়র ডিসেন্ডিং আর্টারি (েএলএডি)ও লেফট সারকামফ্লেক্স আর্টারি (এলসিএক্স)। করোনারি হৃদরোগ হৃৎপিণ্ডের অনেক ধরনের রোগ হয়ে থাকে । এর মধ্যে বর্তমানে সারা পৃথিবীতে যে রোগটি সবচেয়ে ভাবনার কারণ হযে দাঁয়িয়েছে সেটি হলো,করোনারি আর্টারি ডিজিজ (Coronary artery disease)। ভুল জীবনযাপনের ফলে করোনারি ধমনীর ভেতরের দেয়ালে কোলেস্টেরল প্লাক বা হলুদ চর্বির স্তর জমে । এতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় । যার করণে হৃৎপিণ্ডের কোষগুলোতে রক্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে পারে না । ফলে রোগী একসময় বুকে ব্যাথা অনুভব করে । রক্ত চলাচল কমে গিয়ে এ সমস্যাটি দেখ দেয় বলে একে ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজও বলা হয়ে থাকে । করোনারি হৃদরোগজনিত এ ব্যথটি চিকিৎসাশাস্ত্রে এনজাইনা (Angina)নামে পরিচিত। অধিকাংশ রোগীই এ সময় বুকের মধ্যে ভার ভার বা এক ধরনের চাপ অনুভব করেন ।মূলত বুকের বাম দিকে বা বুকের মাধ্যখানে এই ব্যাথা অনুভূত হয় । কখনো কখনো শ্বাসকষ্টও অনুভব হতে পারে । বুকের এই ব্যথা সাধারণত ঘাড়,থুতনি,ওপরের পিঠ,বাহু ,বিশেষ করে বাম হাত বা কব্জিতেও ছড়িয়ে যেতে পারে । কখনো কখনো ওপরের পেটেও এ ব্যথা হতে পারে,যা সবচেয়ে বিপজ্জনক । মনে হবে এসিডিটি ।রেনিটিডিন বা ওমিপ্রাজল জাতীয় ওষুধও হয়তো একটি খেয়ে নিলেন ।  তবু কমছে না , বরং কিছুটা যেন বাড়ছে । একমসয় দেখা গেল,আপনার হার্ট অ্যাটাক এবং ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে । কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের অন্যম চিত্র এটি । অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক হতে যাচ্ছে আপনি মনে করছেন এসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা । আবার এমনও নয় যে,অরোনারি হৃদরোগ হলে সবসময় আপনার ব্যথা হবে। অনেক রোগী আছেন,যাদের করোনরি ধমনীতে হয়তো ৭০/৮০/৯০শতাংশ ব্লকেজ,কিন্তু কখনোই ব্যথা অনুভব করেন নি । তিনি হয়তো প্রথমবারের মতো ব্যথা অনুভব করেন,যেদিন তার হার্ট অ্যাটাক হয় । করোনারি হৃদরোগ মূলত এনজাইনা পেকেটোরিস(Angina Pectoris)ও মায়োকর্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial Infarction)এ দু’ধরণের । করোনারি ধমনীতে চর্বি জমে ব্লকেজ সৃষ্টি হতে শুরু করলে এর মধ্য দিয়ে রক্ত চলাচল কমে আসে । যার ফলে হৎপিণ্ডের সে নির্দিষ্ট অংশে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ হতে পারে না এবং হৃৎপিণ্ডের কোষগুলো বঞ্চিত হয় প্রয়োজনীয় আক্সিজেন ও পুষ্টি থেকে । তখন বুকে ব্যথা হতে শুরু করে । এটাই এনজাইনা পেকটোরিস । আর এই ব্লকেজের পরিমাণ যদি বাড়তে বাড়তে শতভাগ হয়ে যায় এবং ধমনী-পথে রক্ত চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসে ,তখনই হার্ট অ্যাটাক । চিকিৎসা পরিভাষায় যা মায়োকর্ডিয়াল ইনফার্কশন নামে পরিচিত । রোগী এ সময় বুকে তীব্র ও অসহনীয় ব্যথা অনুভব করেন । এ ব্যথা কখনো কখনো বুক,গলা,ঘাড়,ওপরের পেট,দুই হাত এবং পিঠেও চলে যেতে পারে । সাথে শ্বাসকষ্ট,বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে । রোগী ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং জরুরি চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হলে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে । চিকিৎসাবিজ্ঞানী,মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা করোনারি হৃদরোগের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি কারণকে বিশেষভাবে চিহিৃত করেছেন । বয়স বিজ্ঞানীরা বলছেন,বয়স যত বাড়তে থাকে হৃদরোগের আশঙ্কাও তত বাড়তে থাকে । আমরা যদি দেখি,হৃদরোগ সাধারণত কোন বয়সে হয় ? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি হয় চল্লিশ বছর বয়সে এসে বা তার পরে। লিঙ্গভেদে হৃদরোগ হওয়ার প্রবণতা পুরুষদের তুলনামূরক বেশি । তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজ অর্থাৎ ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়তে থাকে । এছাড়াও মহিলাদের মধ্যে যারা নিয়মিত জন্মবিরতিকরণ ওষুধ সেবন করেন,তাদের করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জেনেটিক বা বংশগত বাবা-মায়ের হৃদরোগ থাকলে তাদের সন্তানদেরও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে । গবেষকদের মতে,এর মূল কারণ হচ্ছে পারিবারিক ভুল খাদ্যাভ্যাস ও ধূমপানের ইতিহাস । এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,কারণ একজন মানুষ শৈশব থেকে প্রায় সব ব্যাপারই পারিবারিক রীতি ও আচার-ঐতিহ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠে । খাদ্যাভ্যাসও চালু থাকে জীবনের শুরু থেকেই মানুষ সাধারণত সেই খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে । তাই মূলত পারিবারিক ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং ধূমপানই বংশগত হৃদরোগের অন্যতম কারণ । ধূমপান যুক্তরাষ্ট্রের নিনেসোটা ইউনিভর্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেল্থ ও সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভর্সিটির এক যৌথ গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে,অল্প বয়সেই হার্টের রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যাওয়া এবং হার্টে অ্যাটাকের জন্যে যেসব কারণকে দায়ী করা হয় তার মধ্যে ধূমপান আবস্থান শীর্ষে । উচ্চ রক্তচাপ করোনারি হৃদরোগের একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ । ধমনীর ভেতর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় এটি ধমনীর গায়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় চাপ দেয় । আর এই চাপটা যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়,সেটিই উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন । অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে করোনারি ধমনীর ভেতরের অংশে ক্ষতের সৃষ্টি হয় । রক্তের মধ্যে থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সেই ক্ষতের জায়গাটিতে আটকে যায় । এভাবে রক্ত চলাচলের পথে পরবর্তীতে আরো কোলেস্টরল একটু একটু করে সেই একই জায়গায় জমতে থাকে । যার ফলাফল করোনারি ব্লকেজ । রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য হদরোগের আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য,যার অন্যতম কারণ ভুল খাদ্যাভ্যাস,ধূমপান ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব । ডায়াবেটিস ডায়াবেটিস একটি নীরক ঘাতক । শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরই এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে । হৃৎপিণ্ডও এর ব্যতিক্রম নয় । তাই ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেশি । ডায়াবেটিস একাই হৃদরোগের ঝুঁকিস বাড়ায় প্রায় ৩৩ শতাংশ । আর এর সাথে উচ্চ রক্তচাপ যোগ হলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশে । অতিরিক্ত ওজন এবং মেদস্থুলতা অতিরিক্ত ওজন যাদের,তাদরে শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে হৃৎপিণ্ডকে তুলনামূলক বেশি কাজ করতে হয়।এটিও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় । মূলত খাবার থেকে পাওয়া ক্যালরির পরিমাণ ও এই ক্যালরি ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতাই অতিরিক্ত ওজনের কারণ । এটিও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় । মাত্রাতিরিক্ত ওজনের ফলে উচ্চ রক্তচাপ,কোলেস্টরলের আধিক্য ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যায় অনেকগুণ । শারীরিক পরিশ্রমের অভাব আধুনিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ জীবনে সবাই আমরা কমবেশি গা ভাসিয়ে দিয়েছি । অথচ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ও পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত যারা,তাদের অকালমৃত্যু ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্তদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি । তাই হয়তো বলা হয়ে থাকে‘যত আরাম তত ব্যারাম’। অবশ্য করোনারি হৃদরোগের কারণ আলোচনায় এটাই শেষ কথা নয়;চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও তা-ই বলছে । কারণ,কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়,অতিরিক্ত ওজন,উচ্চ রক্তচাপ,ডায়াবেটিস কিংবা মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল –এসব কোন সমস্যাই নেই ,অথচ তিনি করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন । আবার দেখা গেল,৮০ বছর বয়সেও বাবার হৃদযন্ত্র দিব্যি সুস্থ,কিন্তু ছেলের ৪০ না পেরোতেই হার্ট অ্যাটাক । এছাড়াও জীবন সম্পর্কে আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি এবং এ থেকে সৃষ্টি স্ট্রেস বা মানসিকি চাপ,যাকে আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি টেনশন । পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এ বিষয়টি আমাদের কাছে ধীরে ধীরে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সূত্র: কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধ গ্রন্থ থেকে সংকলিত (সংক্ষেপিত)। //এআর  

হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস

সাধকদের হাজার বছরের সাধনালব্ধ জ্ঞান এবং আধুনিক পুষ্টি বিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়াসই হচ্ছে কোয়ান্টাম খাদ্যাভ্যাস। অনেক Anthropologist বা নৃ-বিজ্ঞানী মনে করেন যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষরা ছিলেন মূলত: Vegetarian বা নিরামিষভোজী। এর পক্ষে তারা প্রমান হাজির করেছেন যে, মানুষের দাঁতের গঠন মূলত: শাক-সবজী, তরি-তরকারি-শস্যদানা খাওয়ার উপযোগী। এছাড়া মানুষের দীর্ঘ পরিপাকতন্ত্র আঁশ সম্বলিত উদ্ভিদজাত খাবারের ধীরে ধীরে হজম প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। খাদ্যাভ্যাস  পরিবর্তন ১৯০০ সালের দিকেও আমেরিকানরা মূলত নিরামিষভোজী ছিলেন, তাদের খাদ্য তালিকার দুই-তৃতীয়াংশ প্রোটিন বা আমিষ আসতো উদ্ভিদজাত খাবার থেকে। আর বর্তমানে আমেরিকানদের খাদ্য তালিকার দুই-তৃতীয়াংশ প্রোটিন আসে মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ থেকে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রেফ্রিজারেটরের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে প্রাণিজ প্রোটিনের ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যাভ্যাসে এই পরিবর্তনের ফলে আমেরিকানদের মধ্যে মেদ-স্থূলতা, করোনারি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যান্সারসহ অন্যান্য অসুখ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের ফলে আমাদের খ্যাদ্যাভাসেও পরিবর্তন এসেছে। অতিরিক্ত ফাস্টফুড, মাংস ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার গ্রহণের ফলে আমাদের দেশেও  করোনারি হৃদরোগ,  উচ্চ রক্তচাপ ও  ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। ফ্যাটের ধরন/প্রকারভেদ করোনারি ধমনীতে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল জমে জমে ব্লকেজ তৈরির পেছনে চর্বি জাতীয় ও তৈলাক্ত খাবারের ভূমিকা এখন বিভিন্নভাবে প্রমানিত। প্রত্যেক চর্বিজাতীয় খাবারে ৩ ধরনের চর্বি বা ফ্যাট থাকে - স্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। স্যাচুরেটেড ফ্যাট অত্যন্ত ক্ষতিকর কারণ এই ফ্যাট রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল বাড়ায়। পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট উপকারি কেননা এগুলো রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল বাড়ায় না বরং কখনো কখনো কমায়। কোলেস্টেরল প্রধানত ২ ধরনের - এইচডিএল কোলেস্টেরল ও  এলডিএল কোলেস্টেরল। এইচডিএল কোলেস্টেরলকে বলা হয় ভালো কোলেস্টেরল আর এলডিএল কোলেস্টেরলকে বলা হয় খারাপ কোলেস্টেরল । এই এলডিএল কোলেস্টেরলই করোনারি ধমনীতে জমে জমে ব্লকেজ তৈরি করে। কোন কোন খাবার বর্জন করবেন যে সকল খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে সেগুলো বর্জন করতে হবে যেমন, গরুর মাংস, খাসির মাংস, হাঁসের মাংস, ডিমের কুসুম, কলিজা, মগজ (ব্রেন), হাঁস ও মুরগির চামড়া, হাড়ের মজ্জা, মাখন, ঘি, ডালডা, মার্জারিন, চিংড়ি, নারিকেল, দুধের সর, বড় মাছের মাথা। হৃদরোগীরা এই সকল খাবার অবশ্যই বর্জন করবেন। আর যারা হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে চান তারা যত কম খাবেন তত ভালো। কোন কোন খাবার খাবেন সব ধরণের ডাল, সব ধরণের শাক ও সবজি, ফল, সালাদ বেশি বেশি খাবেন। এছাড়া প্রতিদিন এক কাপ টকদই, ৫০ গ্রাম যেকোনো ধরণের বাদাম, ১ গ্লাস সয়াদুধ, রসুনের ১টি কোষ, স্পিরুলিনা ও লেবু খাবেন। ভাত বা রুটি খাবেন পরিমিত। কতটুকু খাবেন সবসময় পরিমিত খাবার খাবেন। এ ব্যাপারে নবীজীর (স.) একটি হাদিস আমরা অনুসরণ করতে পারি। তিনি বলেছেন, তুমি তোমার পাকস্থলির এক-তৃতীয়াংশ খাবার ও এক-তৃতীয়াংশ পানীয় দ্বারা পূণর্ করো। আর বাকী এক-তৃতীয়াংশ ফাঁকা রাখো। দীর্ঘ নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে, এভাবে খাবার গ্রহণ করলে শরীরের ওজন সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কখন খাবেন সকাল বেলা তুলনামূলক বেশি নাশতা করুন, দুপুরে তৃপ্তির সাথে খান এবং রাতে খুব হালকা খাবার গ্রহণ করুন। কীভাবে খাবেন ♦        সপ্তাহে ২ দিন : ভাত/ রুটি, ডাল, শাক, সবজি, সালাদ, ফল, ছোট মাছ। ♦        সপ্তাহে ২ দিন : ভাত/ রুটি, ডাল, শাক, সবজি, সালাদ,  ফল, বড় মাছ বা সামুদ্রিক মাছ। ♦        সপ্তাহে ১ দিন : ভাত/ রুটি, ডাল, শাক, সবজি, সালাদ,ফল, সালাদ, মুরগীর মাংস। ♦        সপ্তাহে ২ দিন : ভাত/ রুটি, ডাল, শাক, সবজি, সালাদ, ফল, ভর্তা।       প্রতিদিন ২/৩ ধরনের মৌসুমি ফল খাওয়া উচিত। লেখক : কোঅর্ডিনেটর, কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব। ডব্লিউএন  

হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে পদযাত্রা

হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য রাজধানীতে বর্ণাঢ্য পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। বুধবার জয়নুল হক শিকদার ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটাল এবং জয়নুল হক শিকদার কার্ডিয়াক কেয়ার এন্ড রিসার্চ সেন্টার এ পদযাত্রার আয়োজন করে। পদযাত্রাটি সকাল ৮টায় গুলশানের ১০৪ নং সড়কের শিকদার কার্ডিয়াক কেয়ারের সামনে থেকে শুরু করে। পদযাত্রায় শিকদার ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী, ডাক্তার ও কর্মী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। তারা বিভিন্ন সড়ক ও গুলশান এভিনিউ প্রদক্ষিণ করে। পদযাত্রার শুরুতে কার্ডিয়াক সার্জন ডা. লোকেশ বিএম বলেন, প্রতিবছর হৃদরোগে বিশ্বের এক কোটি ৭৩ লাখ মানুষ মারা যান। মানুষকে সচেতন করে ধূমপান ও ‘জাঙ্ক ফুড’ পরিহার এবং ব্যায়াম, বিশেষ করে নিয়মিত হাটার মাধ্যমে ৮০ শতাংশ হৃদরোগের মৃত্যুরোধ করা সম্ভব। ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ফাউন্ডেশন’ মানুষকে হৃদরোগের বিষয়ে সচেতন করতে প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ডে’ পালন করে থাকে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল: ‘পাওয়ার দ্যা হার্ট’ বা হার্টের শক্তি বাড়াও। জয়নুল হক শিকদার ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন করিম বলেন, হার্ট হচ্ছে শরীরের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ন অঙ্গ। ফলে সুস্থ হার্ট স্বাস্থ্যবান মানুষ তৈরি করতে পারে। এজন্য ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ এবং শাক-সব্জি খেতে হবে ও ‘জাঙ্ক ফুড’ পরিহার করতে হবে। ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ডে’ পালনের অংশ হিসেবে অক্টোবর মাসে গুলশানের জয়নুল হক শিকদার কার্ডিয়াক কেয়ার এন্ড রিসার্চ সেন্টারে কার্ডিয়াক সার্জন ডা. লোকেশ বিএম হৃদরোগীদেরকে বিনামূল্যে পরামর্শ দেবেন। এছাড়া হৃদরোগীদেরকে আকর্ষনীয় হ্রাসকৃতমূল্যে চিকিৎসা সেবাও দেয়া হচ্ছে। আরকে/টিকে

এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস হৃদরোগ নিরাময়ে স্থায়ী সমাধান নয়

একজন হৃদরোগ-চিকিৎসক হিসেবে আমাকে প্রতিদিন কিছু রুটিন কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন, রোগী দেখা, প্রয়োজনে তাদের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, কখনো-বা এনজিওগ্রাম করা এবং রোগীর ব্লকেজের পরিমাণ অনুসারে স্টেন্ট বা রিং লাগানো। আর ব্লকেজের পরিমাণ অনেক বেশি হলে তাকে বাইপাস অপারেশনের পরামর্শ দেয়া। একটা গান আছে,‘বলতে হলে নতুন কথা, চেনা পথের বাইরে চল’। আজ আমি আমার প্রতিদিনকার এই চেনা পথের বাইরের কিছু কথাই আপনাদের বলবো। তার আগে আমার চেনা পথের দুটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শোনাই। ২০০৮ সালের কথা সেটা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। আনুষঙ্গিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তাকে বললাম, মনে হচ্ছে আপনার হার্টে ব্লকেজ থাকতে পারে। এনজিওগ্রাম করে নিলে ব্যাপারটা নিশ্চিত করে বলা যাবে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এমনিতে বেশ হাসিখুশি মানুষ। এবং খুব সাহসী। বললেন,কুচ পরোয়া নেহি। এনজিওগ্রাম করে ফেলুন। আমরা এনজিওগ্রাম করলাম। দেখা গেল, ব্লকেজের পরিমাণ এমন যে, তাতে স্টেন্ট লাগিয়ে কাজ হবে না। বাইপাস অপারেশন করাতে হবে। বিষয়টা শুনে তিনি প্রথমে কিছুটা দমে গেলেও, পরে বাইপাস করাতে রাজি হলেন। বাইপাস করা হলো। এক মাসের মাথায় মোটামুটি সুস্থ হয়ে তিনি তার ব্যস্ত জীবনে ফিরে গেলেন। ছয় মাস পর একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ আবার তার ফোন। বললেন, খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, এখন কী করণীয়? একটা এম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চলে আসতে বললাম। স্যার এলেন। ভর্তি করা হলো তাকে। প্রথমবার অসুস্থ হয়ে যখন এসেছিলেন, তখন বাইপাস করানোসহ সবমিলিয়ে হাসপাতালে ছিলেন একমাস। এবার তাকে থাকতে হলো বেশ অনেকদিন। অস্বাভাবিক রকমের একটা লম্বা সময় তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাটালেন। প্রায় চার মাস লাগলো তার সেরে উঠতে। এ ঘটনার প্রায় বছর তিনেক পর এই কিছুদিন আগে একটা ব্যক্তিগত কাজে তাকে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম, স্যার কেমন আছেন? তার খুব সহজ স্বীকারোক্তি –‘আমি ভালো নেই্’। কেন স্যার, কী হলো? তিনি বললেন, ‘আবার সমস্যা দেখা দিয়েছে, মাত্র গতকালই হাসপাতাল থেকে ফিরেছি। এবার একমাস হাসপাতালে ছিলাম। আবার এনজিওগ্রাম করা হয়েছে। বাইপাস আর্টারিতে নতুন ব্লক। এখন যে কী করবে বুঝে উঠতে পারছি না।’ আমার দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা যাকে নিয়ে, তিনি আমার এক ডাক্তার বড় ভাই। বহুদিন দেশের বাইরে ছিলেন। দেশে ফিরলেন ১৯৯০ সালে। রাজশাহীতে প্র্যাকটিস শুরু করলেন। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করতেন, খুব ভালো বক্তা ছিলেন। দেশে ফিরেও প্র্যাকটিসের পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন আবার। হঠাৎ একদিন তার ফোন। তিনি ঢাকায় আসবেন, ডাক্তার দেখাতে হবে। দিন কয়েক আগে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে। বক্তৃতা শুরুর আগে হঠৎ তার ভীষণ বুকব্যথা। সাথে দরদর করে ঘাম। বক্তৃতা আর দেয়া হয়নি। তিনি ঢাকায় এলেন। এনজিওগ্রাম করা হলো। হার্টের বামদিকের রক্তনালী পুরোপুরি বন্ধ। হান্ড্রেড পার্সেন্ট ব্লক। রিং পরানো হলো। তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। আবার শুরু করলেন রাজনীতি। সাথে নিয়মিত প্র্যাকটিস। দু’বছরের মাথায় হঠাৎ একদিন তার ফোন। আবার সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঢাকায় এলেন। এবার করা হলো সিটি এনজিওগ্রাম। তাতে দেখা গেল, আগে যেখানটায় রিং পরানো হয়েছিল তার পাশে আরেকটি ব্লকেজ। সব শুনে তার মন খুব খারাপ। বললেন, দেশে আর নয়। চলে গেলেন দিল্লি। ওখানে আবার এজিওগ্রাম করা হলো। তাতেও একই রিপোর্ট। অগত্যা আরেকটি রিং পরিয়ে তিনি দেশে ফিরে এলেন। এখানেই শেষ নয়, এক বছরের মাথায় আবার বুকব্যাথা। আবার দিল্লি। আবার এনজিওগ্রাম। এবার আরো দু:সংবাদ। দ্বিতীয়বার যে রিংটি লাগানো হয়েছিল সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। সাথে অন্যান্য রক্তনালীতেও নতুন ব্লকেজ। ফুসফুসেও কিছু সমস্যা দেখা গেছে। তাকে বলা হলো, বিশেষ ধরনের একটা বাইপাস অপারেশন আছে, আপনি সেটা করাতে পারেন। সেটি হলো, রোবটিক সার্জারি। রোবটিক সার্জারি করেন যিনি, সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হলো। ১৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। যা-ই হোক সেবার কিছু না করে তিনি দেশে চলে এলেন। কিছুদিন আগেও যে মানুষটি নিয়মিত প্র্যাকটিস করতেন, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এবার তিনি হয়ে গেলেন পুরোপুরি গৃহবন্দী। প্র্যাকটিস, রাজনীতি বন্ধ। এখন সারাদিন ইন্টারনেটের সামনে বসে সার্চ করতে থাকেন রোবটিক সার্জারি কোথায় হয়, কেমন করে হয়, কত টাকা খরচ ইত্যাদি। এই যে দু’টি অভিজ্ঞতা আমার, এমন ঘটনার সংখ্যা কিন্তু খুব একটা কম নয়। এ দু’জন হৃদরোগী আধুনিকতম চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সেটা কোনো স্থায়ী সমাধান ছিলো না। তাদের দু’জনেরই অর্থ আছে, সামর্থ্য আছে, কিন্তু এখন কোনো উপায় নেই। হৃদরোগীদের অনেকেই আছেন, যাদের কাছে এসব অভিজ্ঞতা নতুন নয়। করোনারি আর্টারিতে হৃদরোগ সম্পর্কে এখন আমরা কমবেশি জানি। হার্টের করোনারি আর্টারিতে কোলেস্টেরল জমে জমে রক্ত চলাচলে ব্যাঘত ঘটে। ফলে হার্ট বঞ্চিত হয় তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং পুষ্টি থেকে। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয় বুকে ব্যথা ও চাপ, শ্বাসকষ্টসহ আরো নানা উপসর্গ। আমরা যদি দেখি, এ রোগ কেন হয়? ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস, বিজ্ঞাপন-নির্ভর ভুল খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম না করা, মানসিক চাপ এবং টেনশন করোনারি হৃদরোগের প্রধান কারণ। কেউ একজন যখন আমাদের কাছে এসে বলেন, একটু হাঁটলে বা পরিশ্রম করলে কিংবা সিঁড়ি বেয়ে উঠলে তার বুক ব্যথা হচ্ছে, তিনি বুকে চাপ অনুভব করছেন, এই ব্যথা আবার ছড়িয়ে যাচ্ছে দাঁতের গোড়া অবধি বা পিঠে, বাম হাতে যাচ্ছে, তখন প্রাথমিকভাবে আমরা এগুলোকে করোনারি হৃদরোগের উপসর্গ বলেই ধরে নিই। করোনারি হৃদরোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য রোগীকে আমরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকি। এর মধ্যে প্রথমেই আসে ইসিজি’র কথা। অনেকেরই ধারণা, ইসিজি রিপোর্ট স্বাভাবিক তো সবই ঠিক, হৃদরোগ নেই। আমিও একসময় তা-ই মনে করতাম। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আমার নিজের এই ভুল ভাঙলো একজন রোগীর এটেনডেন্ট। আমরা ডাক্তাররা বই পড়ে যা শিখি, কখনো কখনো তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখি রোগী এবং রোগীর এটেনডেন্টের কথা শুনে।   ২০০০ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। আমি তখন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে কার্ডিওলজিতে এমডি করছি। একদিন সিসিইউতে ডিউটি করছি। এক রোগীর এটেনডেন্ট এসে বললেন, ডাক্তার সাহেব, আমার রোগীটা জরুরি বিভাগে আছে, এই তার ইসিজি, একটু দেখে নিন। দেখলাম। বললাম, আপনার রোগীর ইসিজি তো নরমাল, রোগী ভালো আছে। তখন তিনি বললেন, এটাই তো আমার রোগীর সমস্যা। রোগীর ইসিজি সবসময় স্বাভাবিকই থাকে, কিন্তু বুকের ব্যথা কমছে না এবং ডাক্তাররা বলেছেন, এটা হার্টের অসুখ, হার্টে ব্লক আছে। সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম; পরে অবশ্য আমার শিক্ষকদের কাছে জেনেছি, ভালো কার্ডিওলজিস্ট হতে হলে ইসিজিকে অবিশ্বাস করতে হবে। কারণ, শুধুমাত্র ৪৮ ভাগ হার্ট অ্যাটাক বোঝা যায় ইসিজি দেখে, বাকি ৫২ ভাগ বুঝতে হয় রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে এবং মমতা দিয়ে শুনে। তাই চিকিৎসকের কাছে গেলে আগে আপনার শারীরিক অসুবিধাগুলো তাকে বলুন, রোগের উপসর্গগুলো বিস্তারিত বলুন। কেউ বলতে পারেন যে, ডাক্তার সাহেব কথা শোনেন না, শুনতে চান না। অভিযোগটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সত্যি। কিন্তু রোগীদের আমি বলি, এর সমাধান খুব সহজ। আপনার কথা যিনি শুনবেন সেই ডাক্তারের কছে যান। খুঁজে বের করুন। উপসর্গ বিবেচনার পাশাপাশি ইসিজি ছাড়াও করোনারি হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য আছে আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যেমন- ইটিটি, ইকোকার্ডিওগ্রাম এবং করোনারি এনজিওগ্রাম। এগুলোর ফলাফল অনুসারে কার্ডিওলজিস্টরা ‍রোগীকে এনজিওপ্লাস্টি কিংবা বাইপাস অপারেশনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সাথে সারাজীবন ওষুধ সেবনের নির্দেশনা তো আছেই। বাইপাস অপারেশন নিয়েও আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেটিও আমি যখন হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে কাজ করছিলাম, সেই সময়কার ঘটনা। একজন রোগী এলেন। তার সব কাগজপত্র আর রিপোর্ট দেখে জানলাম, এনজিওগ্রাম করা হয়েছে এবং হার্টের তিনটা আর্টারিতে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ব্লক। তিনটা রক্তনালী পুরোপুরি বন্ধ। লোকটা তাহলে  বেঁচে আছে কীভাবে? রোগীর এটেনডেন্ট বললেন, ডাক্তার তাদের বলেছেন যে, রোগীর তিনটা আর্টারিতে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ব্লক আছে সত্যি কিন্তু রিং লাগানো বা বাইপাস কিছুই প্রয়োজন নেই; আল্লাহর রহমতে তার আটো-বাইপাস হয়ে গেছে (চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ন্যাচারাল বাইপাস)। আমার সত্যিকারের শেখা শুরু হলো। পরে জেনেছি, এই ন্যাচারাল বাইপাস ঘটে মূলত কোলেটারাল সারকুলেশনের মাধম্যে। আমাদের হার্টের চারাপাশে বেশকিছু সংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালী রয়েছে। নিয়মিত হাঁটা এবং ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে এই পরিপূরক রক্তনালীগুলো তখন প্রয়োজনীয় কাজটুকু চালিয়ে নেয়। মূলত এটাই ন্যাচারাল বাইপাস। আসলে হৃদরোগ থেকে নিরাময় ও সুস্থ জীবযাপনের জন্যে নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, স্বাস্থকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বর্জন আর টেনশনমুক্ত থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, করোনারি হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসাগুলো রোগীদের জীবনে কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। রোগী যে চিকিৎসাই নিচ্ছেন, কিছুদিন পরই ঘুরে-ফিরে আবার সেই একই সমস্যা। আমার পরিচিত এরকম দু’জন রোগীর কথা আমি প্রথমেই বলেছি। আবার অন্যদিকে যারা জীবনের ভুল অভ্যাসগুলো পাল্টে ফেলেছেন তারা সত্যিই ভালো আছেন, তিনি এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস করুন আর না-ই করুন। সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটেই এ কথাটি সত্যি। সন্দেহ নেই, আমেরিকার চিকিৎসা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ। বাইপাস অপারেশনের শুরুও ওখানেই। ১৯৬৭ সালে আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকে প্রথম সফল বাইপাস সার্জারি করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। বাইপাস তো হরদম হচ্ছে দেশে বিদেশে, কিন্তু তারপর কী অবস্থা? সবাই কি ভালো আছেন? আমেরিকার একজন রোগীর কথাই বলি। রোগী আর কেউ নন, খোদ আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। বুকে ব্যথা হলো। হাসপাতালে ভর্তি হলেন। এনজিওগ্রাম করা হলো। আমেরিকার সেরা সেরা কার্ডিওলজিস্টদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড করা হলো। সিদ্ধান্ত হলো বাইপাস করতে হবে। করা হলো বাইপাস। ক্লিনটন সুস্থ হয়ে আবার কাজকর্ম শুরু করলেন। কিছুদিন পর ব্যক্তিগত জীবনে কিছু ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লেন। প্রেসিডেন্টশিপ চলে যাওয়ার মতো গুরুতর অবস্থা তৈরি হলো। সবমিলিয়ে ভীষণ এক স্ট্রেসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঝামেলা একসময় মিটলো ঠিকই, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। বাইপাসের ছয় বছরের মাথায় আবার বুকে ব্যথা। যথারীতি আবার এনজিওগ্রাম, আবার মেডিকেল বোর্ড। সিদ্ধান্ত হলো রিং পরানোর। রিং পরালেন। এবার জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন করার ব্যাপারে তিনি সচেতন হয়ে উঠলেন। তার চুরুট খাওয়ার অভ্যাস ছিলো, ত্যাগ করলেন দীর্ঘদিনের সে অভ্যাস। চর্বিযুক্ত খাবার আর ফাস্টফুড ছেড়ে দিলেন পুরোপুরি। শুরু করলেন শাক-সব্জি আর ফলমূল খাওয়া। এখন তিনি ভালো আছেন। শুধু তা-ই নয়, বিল ক্লিনটন দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে হোয়াইট হাউজে তার ব্যক্তিগত চিকিৎকসকদের একজন ছিলেন ডা.ডিন অরনিশ। ক্যালিফোর্নিয়ার এই চিকিৎসাবিজ্ঞানী মেডিটেশন এবং সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে করোনারি হৃদরোগ নিরাময়ের পথিকৃৎ। এ থেকেই বোঝা যায়, হৃদরোগ নিরাময়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সুস্থ জীবনাচার অনুশীলনের ব্যাপারে ক্লিনটন নিজে কতটা সচেতন উঠেছিলেন। সুস্থতার জন্য আসলে এই জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি এদিকে দৃষ্টি দেবেন, পৃথিবীর যে দেশেই যত উন্নততর চিকিৎসা আপনি নেন, সমস্যা সমস্যার জায়গাতেই থেকে যাবে। তাই হৃদরোগ থেকে নিরাময় ও সুস্থ জীবনের জন্যে স্থায়ী সমাধান যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তার চাবিকাঠি একমাত্র আপনার হাতেই, ডাক্তার আর ওষুধ আপনার সহযোগী মাত্র। বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর চীফ কনসালটেন্ট ডা.হাসনাইন নান্না। কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব আয়োজিত হৃদরোগ ও নিরাময় বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে তার দেওয়া বক্তব্য থেকে এ তথ্য নেওয়া।   ডব্লিউএন

হৃদরোগ নিরাময় করে প্রশান্তি ও সুস্থ জীবনাচার

হৃৎপিণ্ডের যত ধরনের অসুখ রয়েছে, তার মধ্যে করোনারি হৃদরোগ অন্যতম। ধূমপান, চর্বিযুক্ত খাবার, শাররিক পরিশ্রমের অভাব ইত্যাদি এ রোগের অন্যতম কারণ। প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু ও ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস অপারেশনের মাধ্যমে রোগীর ব্লকেজের চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু চিকিৎসক-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি , অত্যধিক মানসিক চাপ ও ‍দুশ্চিন্তা হৃদরোগের একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক,যার কোনো সমাধান প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় নেই। এছাড়া অপারেশনের পর রোগী যখন আবার ধূমপান ,ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবারসহ পুরনো জীবনযাত্রায় ফিরে যায়, সে আবারও আক্রান্ত হয় হৃদযন্ত্রের নানা জাটিলতায়। তাই হৃদরোগ থেকে পরিপূর্ণ নিরাময়ের জন্যে প্রয়োজন ধূমপান বর্জন, জীবনধারায় পরিবর্তন এবং টেনশনমুক্ত জীবন। আমিও আমার রোগীদেরকে এসব ব্যাপারে সচেতন হওয়ার পরামর্শ ‍দিই । টেনশনমুক্ত প্রশান্ত জীবনের জন্যে মেডিটেশনের ভূমিকা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত । মেডিটেশন ও জীবনাচার পরিবর্তনের মাধ্যমে যারা হৃদরোগ মুক্ত হয়েছেন,আমি তাদের অভিনন্দন জানাই । এদের মধ্যে অনেকেই অপারেশন-পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারতেন । কিন্তু তা হন নি;বরং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাটি তারা নিতে পেরেছেন  অপারেশনকে ভয় করেন না এমন মানুষ নেই,তাই অপারেশনের চেয়ে ঝঁকিহীন এমন একটি পদ্ধতির মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার । হৃদরোগ থেকে মুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের নিজেদের বক্তব্যেই আমি শুনেছি। সৎ সাহস না থাকলে এ কথাগুলো তারা এত সহজে বলতে পাতেন না । সত্য বলেই সৎ সাহস ও সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তারা এ কথাগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন। আর সত্য বলতে কোনো ভয় থাকা উচিত নয়। কারণ সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে শেষপযর্ন্ত সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থ জীবনধারা হৃদরোগ নিরাময় করে-এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। নানা গবেষণা আর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতামতের ভিত্তিতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলেই মেডিকেল সায়েন্সের প্রধান প্রধান বই ও জার্নালগুলোতে এ কথাগুলো ছাপা হয়েছে । এ পদ্ধতি অনুসরণ করে আপনি যদি ভালো থাকতে পারেন তবে কেন অনর্থক কাটাছেঁড়ে করবেন ? প্রযুক্তির ক্রমউৎকর্ষের ফলে শহরে কিংবা গ্রামে কোথাও আমরা এখন আর হাঁটি না,সবত্রই গাড়িতে চলাচল করি। অর্থাৎ আমাদের জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে শারীরিক পরিশ্রমহীন। আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শাক-সব্জির বদলে এখন আমরা ফাস্টফুড,ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এসব খাবার যতই সুস্বাদু হোক,এগুলো কিন্তু শরীরের জন্যে বিপজ্জনক। আর ধূমপানের কথা তো বলাই বাহুল্য। সিগারেটের নিকোটিন হৃৎপিন্ডের ধমনীকে সংকুচিত করে । ফলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্থ হয়,যা করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে আধুনিক জীবনের নানা দুশ্চিন্তা ও টেনশন। তাই আপনার হৃৎপিন্ডের সুস্থতার জন্যে ধূমপান বর্জন করুন, জীবন-অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন এবং মনে প্রশান্তি সৃষ্টি করুন। আপনি ভালো থাকবেন। এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমেরিকায় ডা.ডিন অরনিশ শত শত হৃদরোগীকে এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস ছাড়াই সুস্থ করে তুলেছেন। হৃদরোগের এ অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাপদ্ধিতি আবিস্কারের জন্যে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা উচিত বলে আমি মনে করি। সমস্ত মেডিকের জার্নাল, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, এর ভিত্তি আছে,এত মিথ্যা কিছু নেই। চিকিৎসক-জীবনে আমি নিজেও এর বহু প্রমাণ পেয়েছি। নজরুলের একটি কবিতায় আছে,‘বিশ্বাস আর আশা যার নাই, যেও না তাহার কাছে’। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশ্বাস এবং আশাকে সঙ্গী করে রাখবেন। এই আশা এবং বিশ্বাসই আপনাকে সুস্থ করে তুলবে,সাফল্য এনে দেবে। এর পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তা যা দিয়েছেন তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন অর্থাৎ সবসময় কৃতজ্ঞচিত্ত থাকুন। মেডিটেশন ও সুস্থ জীবনাচার চর্চা করে যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের সুস্থতার মূলেও রয়েছে এই বিশ্বাস। বিশ্বাস করে এগিয়ে গেছেন বলেই তারা আজ সুস্থ,হৃদরোগমুক্ত। নি:সন্দেহে তারা ভাগ্যবান। তাদেরকে বলি-আপনারা এ অভিজ্ঞতা সবাইকে জানান,পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করুন। আপনাদের জন্যে কিংবা পত্রিকার জেন্যে নয়,মানুষের জন্যে। যারা হৃদরোগ থেকে মুক্তি চান,পরিত্রাণ চান, অপারেশনের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে চান, বাঁচতে চান তাদের জন্যে প্রচার করুন। সমাজের জন্যে, জাতির জন্যে সর্বোপরি মানুষের কল্যাণার্থে এ সুসংবাদ সবার কাছে পৌঁছে দেয়া একটি নৈতিক কর্তব্য বলে আমি মনে করি । আমি বিশ্বাসের সাথে যে কথাগুলো বললাম, তাতে আমরা পেশার কোনো ক্ষতি হবে না। আমার পেশা তার যোগ্য সম্মান নিয়েই বেঁচে থাকবে। প্রায় ২০ বছর আগে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের শিথিলায়ন ক্যাসেটের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। সেদিনও ‘প্রশান্তিতে মুক্তি’ শীর্ষক ভাষণে একজন চিকিৎসক হিসেবেই আমি বলেছিলাম-‘শুধু ট্যাবলেট,মিকশ্চার বা প্রেসক্রিপশন দিয়ে সব রোগমিক্তি সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক চিকিৎসককেই তার পেশাগত জীবনে এমন কিছু রোগীর সংস্পর্শে আসতে হয়,যাদের রোগের সাথে কোন না কোনভাবে টেনশন জড়িত। দেখা গেছে,হাসপাতালের বহির্বিবাগে যে রোগীরা যান, তাদের মধ্যে শতকারা ৪০ ভাগেরই কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয় না। কাউন্সিলিং বা সৎ পরামর্শ, আত্মবিশ্বাস এবং প্রশান্তিতে এ সমস্ত রোগের মুক্তি হয়। আর অস্থির-অশান্ত আধুনিক মানুষের জীবনে প্রশান্তির সুবাতাস আনতে পারে মেডিটেশন। কোয়ান্টাম মেডিটেশন মানুষের মনে প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে রোগ নিরাময়কে ফলপ্রসূ করে, যা এখন পাশ্চাতে বিজ্ঞিান হিসেবে স্বীকৃত। তাই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিপূরক হিসেবে কোয়ান্টাম মেথড চমৎকার কাজ করতে পারে। যেসব রোগ ওষুধের প্রয়োজন নেই,তার নিরাময়ে কোয়ান্টামই হতে পারে সার্থক বিকল্প। আসল শরীরের চেয়ে মন অনেক বেশি শক্তিশালী। মনের গতি, শক্তি, পরিধি সবই ব্যাপক। মনের এই দুর্দমনীয় শক্তির প্রভাবে শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে,এমনকি রোগ নির্মূলেও সাহায্য করে। যুগে যুগে মহামানবরা,নবী-রাসুলরা বিভিন্ন রোগ নিরাময় ক্ষেত্রে ধ্যানের এ শক্তিকে  কাজে লাগিয়েছেন। এটি তাই নতুন কিছু নয়। এটি হাজার বছরের শাশ্বত চেতনারই একটি আধুনিক ও সমন্বিত রূপ,যার উৎস এই প্রাচ্য। বর্তমানে হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের এ প্রক্রিয়া সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনস্বীকৃত। তাই আমি আশা করবো, হৃদরোগ নিরাময়ের এ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। পরিশেষে এটাই বলি, আপনার সুস্থতা ও নিরাময়ের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। তাই সুস্থ হৃদযন্ত্র সর্বোপরি সুস্থ জীবনের জন্যে সঠিক দৃষ্ঠিভঙ্গি অনুসরণ করুন। অর্থাৎ ইতিবাচক ও কৃতজ্ঞচিত্ত হোন। প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত হাঁটুন, ব্যায়াম করুন এবং টেনশনমুক্ত জীবনযাপনে করুন। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বাস এবং আশা নাই যার, তার কছে থেকে দূরে থাকুন। সবসময় আশাবাদী, বিশ্বাসী ও ভালো মানুষদের সংস্পর্শে থাকুন। আপনি ভালো থাকবেন। **অধ্যাপক ডা. ‍নুরুল ইসলাম প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বাংলাদেশে ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ। জাতীয় এ অধ্যাপক কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব প্রকাশিত হৃদরোগ নিরাময়ে বিশেষ মেডিটেশন সিডির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ বক্তব্য দেন ।    

জীবনযাপনে সচেতন হোন, হৃৎপিণ্ড সুস্থ থাকবে

আমরা সবাই সুস্থ থাকতে চাই । সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে চাই। আর সুস্থতার জন্যে যেটি সবচেয়ে বেশি দরকার, সেটি হলো নিজের উদ্যোগ। অর্থাৎ আমকে চাইতে হবে যে, আমি সুস্থ থাকবো এবং সুস্থতার জন্যে প্রয়োজনীয় অভ্যাসগুলো আমি মেনে চলবো, যথাযথভাবে অনুসরণ করবো। সেইসঙ্গে যা যা বর্জন করা উচিত তা-ও আমি অবশ্যই বর্জন করবো । একটি আনন্দময় সুস্থ জীবন উপভোগের জন্যেই আমাকে তা পারতে হবে। অনেকে বলেন, ধূমপান ছাড়বো কীভাবে? আমি বলি, ধূমপান যদি ছাড়তে চান তবে আপনার নিজের ইচ্ছাটাই যথেষ্ট যে,আমি আর কখনো ধূমপান করবো না। এভাবে সব ক্ষেত্রেই শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে মানুষ নিরাময় ও সুস্থতার পথে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা অধিকাংশ মানুষ আজ ভুল খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝঁকে পড়ছি। স্বাস্থ্যঘাতি নানারকম খাবার এখন একটু একটু করে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এখন বিভিন্ন ধরনের বোতলজাত জুস,সফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস-এর প্রতি মাত্রারিক্তভাবে আসক্ত। অথচ আপনার শরীরের জন্যে, বিশেষ করে কিডনির সুস্থতার জন্যে দরকার হলো পানি । অন্যদিকে এসব ড্রিংকস ও জুস শিশুসহ যেকোনো বয়সের মানুষের কিডনির ক্ষতির কারণ । সুস্থ থাকতে সবারই এ বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে । মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে নিরাময় ও সুস্থতার এক সহজাত শক্তি । ডা. হার্বার্ট বেনসন বলেছেন, ‘একজন মানুষ রিলাক্সেশন,মেডিটেশন,ব্যায়াম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।’ এর প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্তই আমরা দেখছি কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে এখানে সুস্থতার জন্যে সঠিক জীবনাচারে মানুষকে ভালোভাবে সচেতন করে তোলা হচ্ছে । নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে । নিজেদের জীবনে যারা এসব আন্তরিকভাবে অনুসরণ করছেন তারা উপকৃত হচ্ছেন,সুস্থ আছেন,ভালো আছেন। অনেক হৃদরোগী আছেন,যাদের হয়তো একবার এনজিওপ্লাস্টি কিংবা বাইপাস অপারেশন করা হয়েছে; কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল,আবার বুকে ব্যথা,নতুন ব্লকেজ ইত্যাদি । তিনি আবারও অসুস্থ হতে শুরু করলেন । অর্থাৎ চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে ঠিকই,কিন্তু বারবার একই ঘটনা ঘটে চলছে। এ দুর্ভোগ তেকে মুক্তি পাওয়ার পথ একটাই-আপনার জীবনযাপনের প্রতি মনোযোগী হন । স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন । ব্যায়াম করুন । এবং অবশ্যই মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে যতটা সম্ভব দূর থাকুন । করোনরি হৃদরোগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এই টেনশন । টেনশন যে শুধু হৃৎপিন্ডেরই ক্ষতি করে তা নয়;বরং আমাদের সার্বিক সুস্থতার পথেও এটি একটি প্রধান বাধা । তাই সুস্থ থাকতে হলে প্রথম কথা হলো, আপনাকে টেনশনমুক্ত হতে হবে। মানসিক চাপ কমাতে হবে। টেনশনমুক্ত থাকার কথা উঠলেই কেউ কেউ বলেন,শিশু এবং পাগল ছাড়া বাকি সবাই নাকি টেনশনে ভোগে । আমি তখন তাদেরকে রাসুলুল্লাহর (স.) জীবনের কথা বলি। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং এর প্রেক্ষিতে তাঁর প্রশান্তচিত্ততা,স্রষ্টায় বিশ্বাস ও ধৈর্যের দিকে তাকাতে বলি। টেনশনের মতো আপনার হৃৎপিন্ডের আরেক শত্রু হলো আপনার রাগ। রাগ-ক্রোধ আপনাকে নানাভাবে অশান্ত করে তোলে, আপনার মধ্যে স্ট্রেস তৈরি করে,আপনাকে কুরে কুরে খায় । তাই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া অর্থাৎ রাগ বর্জন খুব জরুরি। ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’-কোয়ান্টামের এই কথাটি ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব পছন্দ করি এবং সবাইকে বলি । একেকজন একেকভাবে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল খুঁজে নিতে পারেন । যেমন,রাশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রনায়ক স্ট্যালিন । ভীষণ কঠিন প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি ।লৌহমানব বলা হতো তাকে । কিন্তু রেগে গেলে তিনি চুপ করে যেতেন,কোন কথা বলতেন না । আমরাও এ বিষয়গুলো নিজেদের মতো করে অনুসরণ করতে পরি । এক্ষেত্রে আমি নিজে কিছু টেকনিক অবলম্বন করি । যেমন,রাগ আসতে শুরু করলে ভাষা বদলে ফেলি,হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করি । যে মানুষটির কথায় বা আচরণে আমার রাগ হতে চাচ্ছিল,তিনি তখন একটিু বিস্মিত হন এবং সে বিষয়ে আর কথা বাড়ান না,থেমে যান । আমিও তখন নিজেকে সহজেই সামলে নিতে পারি । কেউ কেউ বলেন,এডমিনিস্ট্রেশন পরিচালনা করতে গেলে এক-আধটু রেগে যেতে হয় । কিন্তু সত্য হলো, এডমিনিস্ট্রেশন পরিচালনার জন্যে দরকার ঠান্ডা মাথয় সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া ও কাজ করা । কিন্তু রেগে গেলে তো আপনি সেটি কখনোই করবেন না । কারণ রেগে গেলে সে মুহূর্তে মানুষের বোধ আর হিতাহিত জ্ঞান কাজ করে না । তখন ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে আরো বেশি । জীবনে চলার পথে আরো এক;টি বিষয় আমাদের অসুস্থ করে তোলে; সেটি হলো নেতিবাচকতা-নেতিবাচক কথা,চিন্তা ও কাজ । কাজ শুরু করার আগে শুধু নেতিবাচক চিন্তা করে আর অকারণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগে আমরা অনেক সময় ব্যয় করে ফেলি-এটা করলে কী হবে, কে কী বরবে ইত্যাদি । কিন্তু আসল কথা হলো ম আপনি যদি মনে করেন কাজটা ভালো ও সৎ নিয়তে কাজ করুন,আল্লাহ সাহয্য করবেন। আর কাজ করতে গিয়ে আমরা যেন নাম যশ খ্যাতি প্রশংসার আসক্তিতে আক্রান্ত না হই । কারণ এ আসক্তিও আমাদের অনেক অশান্তি আর অসুস্থতার জন্যে দায়ী । প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় নিত্যনতুন অনেক ওষুধ আবিষ্কিৃত হচ্ছে সত্যি,কিন্তু জীবনের এ দিকগুলেঅর প্রতি কোনোরকম মনোযোগ দেয়ার সুযোগ সেখানে নেই । আমার খুব ভালো লাগে যে,কোয়ান্টাম এ বিষয়গুলো মানুষের সমনে তুলে ধরছে। কোয়ান্টাম মেথধ কোর্সে অংশ নিয়ে আমি দেখেছি,অসংখ্য মানুষ এখানে এসে নিজেদের চিন্তা-ভাবনা,দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপনের প্রতি সচেতন হয়ে উঠেছেন । সমস্ত নেতিবাচকতার বৃত্ত ভেঙে তারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন ।যিনি এসেছিলেন রোগ শোক জরা ব্যাধি অস্থিরতা দু:খ নিয়ে-মনের ও বিশ্বাসের শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে তিনি সুস্থতার পথে এগিয়ে যেতে পারছেন । কারণ যেকোনো রোগমুক্তি এবং সর্বোপরি পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্যে মানসিক চাপমুক্তি ও প্রশান্তিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ । সে অর্থে,কোয়ান্টাম সত্যিই মানুষকে সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন ও কর্মব্যস্ত সুখী জীবনের আলোকিত পথে পরিচালিত করছে । ** অধ্যাপক ডা. এম আর খান বাংলাদেশে শিশু চিকিৎসার পথিকৃৎ ও জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব আয়োজিত হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এ বক্তব্য দেন। //এআর

হৃদরোগ নিরাময়ের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি

চলতি বছর বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর । দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পাওয়ার ইওর হার্ট, শেয়ার ইওর হার্ট’। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ৭৭ লাখ বা মোট মৃত্যুর ৩১ শতাংশ ঘটে হৃদরোগের কারণে। হৃদরোগের  কারণ: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ প্রভৃতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। জীবনে ক্রমাগত আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া, কাজ-কর্মে তাড়াহুড়ো, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্য দিনের দুর্ভাবনা এককথায় স্ট্রেস সরাসরি আমাদের শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ও হৃৎপিণ্ডের উপর প্রভাব ফেলে। হৃদযন্ত্রের নানারকম প্রাণঘাতী অসুখের মধ্যে করোনারি হৃদরোগ অন্যতম। এতে হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে কোলেস্টেরল বা চর্বি জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় এবং বুকে ব্যথাসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, মেদস্থুলতা এবং টেনশন বা স্ট্রেস ইত্যাদিকে হৃদরোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করা হয়। হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসা : প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় ধমনীতে জমে থাকা এ চর্বির স্তর পরিষ্কার করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার জন্যে ব্লকেজের পরিমাণ অনুসারে ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি কিংবা বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এর কোনোটি দিয়েই পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধ করা যায় না। কারণ মূল সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাকে ধামাচাপা দিতে গেলে যা হয়, এখানেও তা-ই ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লকেজ-এর চিকিৎসা করা হলেও ব্লকেজ -এর কারণ ও পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধের ব্যাপারে রোগীকে খুব ভালোভাবে সচেতন করা হয় না। ফলে চিকিৎসা গ্রহণের পরও অনেক রোগী পুনরায় নতুন ব্লক নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস ও ধূমপানের পাশাপাশি হৃদরোগের ক্ষেত্রে অত্যধিক মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক, যার কোনো চিকিৎসা হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। অপারেশনের পর রোগী যখন পুরনো জীবন অভ্যাসে ফিরে যায়,  সে আবারও আক্রান্ত হয় ব্লকেজসহ হৃদযন্ত্রের নানা জটিলতায়। নতুন আশা নতুন বিশ্বাস : খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এর চেয়ে অনেক ভালো ফল পাওয়া গেছে বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতায়। এতদিন চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন, ধমনী একবার ব্লক হওয়া শুরু করলে বাইপাস সার্জারি কিংবা এনজিওপ্লাস্টি ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই। চিকিৎসকদের এই রক্ষণশীল চিন্তার মর্মমূলে প্রথম আঘাত হানেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ডিন অরনিশ। হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সময় তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন, এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস করার ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি রোগী পুনরায় ধমনীর ব্লকেজ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পরবর্তীতে হৃদরোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে যোগ ব্যায়াম, কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার ও মেডিটেশনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ১৯৯০ সালে আমেরিকার মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয় তার একটি গবেষণা রিপোর্ট। ১৯৮৭ সালে ৪৮ জন হৃদরোগীকে ২ ভাগে ভাগ করে ডা. অরনিশ এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এক গ্রুপের ২৮ জনকে এক বছর ধরে কম চর্বিযুক্ত খাবার দেয়ার পাশাপাশি মেডিটেশন ও যোগ ব্যায়ামের অনুশীলন করানো হয়। সেইসাথে ধূমপান বর্জন এবং রোগীদেরকে মমতা ও সহানুভূতিপূর্ণ মানসিক অবস্থায় রাখার চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে বাকি ২০ জনকে আমেরিকান হার্ট এ্যাসোসিয়েশন নির্দেশিত হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসা এবং পথ্যবিধির অধীনে রাখা হয়। এক বছর পর দেখা যায়, ১ম গ্রুপের রোগীদের ধমনীতে ব্লকেজের পরিমাণ তো বাড়েইনি, বরং কমেছে এবং হার্টে রক্ত চলাচলের পরিমাণ সন্তোষজনকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে প্রচলিত চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও দ্বিতীয় গ্রুপের প্রায় সবারই ব্লকেজের পরিমাণ বেড়েছে। ১৯৯৮ সালে জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন-এ গবেষণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। শুধু আমেরিকা বা পাশ্চাত্যেই নয়, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের এ আধুনিকতম পদ্ধতি। ডা. ডিন অরনিশ ভারতে এসেছিলেন এবং অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স-এ  চিকিৎসকদের সম্মেলনে তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। ভারতে এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবং চমৎকার ফলাফল পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশÑ এর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) ডা. আব্দুল মালিক ২০০৮ সালের নভেম্বরে কোয়ান্টাম মুক্ত আলোচনায় দেয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘মনের প্রভাব শরীরের উপর অপরিসীম। তাই দেহের পাশাপাশি মনের যতœ নেয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন বা আত্মা ভালো না থাকলে শরীরও ভালো থাকে না। কাজেই আমাদের দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্যে নিয়মিত নামাজ, প্রার্থনা ও মেডিটেশন করা উচিত। চাপমুক্ত জীবনযাপন, মানসিক সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ হৃদযন্ত্রের জন্যে রিলাক্সেশন বা শিথিলায়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে তাই এটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে’। নিজের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই : ইংরেজিতে একটি কথা আছে- patient cure themselves, doctors show the way.  নব্য চিকিৎসা ধারার প্রবর্তক ডা. ডিন অরনিশ, ডা. দীপক চোপড়া, ডা. কার্ল সিমনটন, ডা. বার্নি সীজেল, ডা. হার্বার্ট বেনসন প্রমুখ ‘বডি, মাইন্ড, স্পিরিট’সাময়িকীর ১৯৯৭ সালের বিশেষ সংখ্যায়  ‘একবিংশ শতকের স্বাস্থ্য’ প্রচ্ছদ কাহিনীতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মত প্রকাশ করেছেন যে, সুস্থ থাকতে হলে নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকেই গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে নিরাময় করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের সহজাত ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। কারণ বাইপাস সার্জারি, এনজিওপ্লাস্টি বা সারাজীবন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রক ওষুধ সেবনের চাইতে সঠিক জীবনদৃষ্টি গ্রহণ করে জীবনধারা পরিবর্তনের খরচ অনেক কম। ডা. হার্বার্ট বেনসন বলেন, একজন মানুষ নিজেই রিলাক্সেশন বা  শিথিলায়ন, মেডিটেশন, ব্যায়াম ও পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করে তা অনুসরণ এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে। লেখক : কোঅর্ডিনেটর, কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব।                                                                                             

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন কায়িক পরিশ্রম

এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পাওয়ার ইওর হার্ট, শেয়ার ইওর হার্ট’। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ৭৭ লাখ বা মোট মৃত্যুর ৩১ শতাংশ ঘটে হৃদরোগের কারণে। এ প্রেক্ষাপটে হার্ট সুস্থ রাখতে কায়িক পরিশ্রমকে বেশি জরুরি।   হার্ট সুস্থ রাখার ব্যাপারে তিনি একুশে টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার আহম্মদ বাবুকে বলেন, হার্ট সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন প্রতিদিন কায়িক পরিশ্রম করা। এরমধ্যে হাঁটা একটি ব্যায়াম, যা হার্ট সুস্থ রাখে। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে হাঁটেন তাহলে তার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ১৭ শতাংশ কমে যায়। তিনি যদি সপ্তাহে ৩ ঘন্টা হাঁটেন তাহলে ৩৫ শতাংশ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে যায়। এতে রক্তে যে খারাপ চর্বি, যেটাকে আমরা এলডিএল বলি সেটা কমে যায় এবং যেটাকে ভালো চর্বি বলি এসডিএল সেটা বেড়ে যায়। এতে হার্ট এর্টাকের ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়া হাঁটার আরো অনেক উপকারিতা আছে। যেমন-অক্সিজেন বেড়ে যায়, লাংসের ক্যাপাসিটি বেড়ে যায়। যদি ডায়াবেটিস থাকে সেটা কনট্রোল হয়। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সেটা কন্ট্রোল হয়। দুঃচিন্তা থাকলে সেটাও কমে যায়। এছাড়াও যদি কারো ডায়াবেটিস থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তামাক জাতীয় পণ্য পরিহার করতে হবে এবং সর্বোপরী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। সুষম খাদ্য যেমন- প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট প্রয়োজন মতো যেন থাকে সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। তাহলে হার্ট এটাকের ঝুঁকি কমে আসবে। হ্রদরোগ আমাদের দেশে দিনদিন বেড়েই চলছে। হ্রদরোগের ভিতরে করোনারি হার্টের ডিজিজ আমরা যেটাকে বলি হার্ট অ্যাটাক। হার্ট অ্যাটাকের ইনসিডেন্স দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে। আমরা প্রচুর হার্ট অ্যাটাকের রোগী পাই। তাদের চিকিৎসা করতে হয়। অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাকের দিন দিন বেড়েই চলেছে। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা ব্যয় বহুল। আমরা জেনেই গেলাম হার্ট অ্যাটাক কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়। তারপরও হার্টের অসুখ হয়েই যায়, হার্ট অ্যাটাক হয়েই যায়। আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভালো এবং উন্নত মানের চিকিৎসা হচ্ছে। প্রথমত: যদি করো  হার্ট অ্যাটাক হয়, বুকে তীব্র ব্যাথা হয়, অস্থির লাগে তাহলে তার ব্যাগে থাকুক নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে কেনা ৪টি এসপিরিন ট্যাবলেট। যার দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। সাথে সাথে খেয়ে নিয়ে যদি নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে ইমেডিয়েটলি চিকিৎসা শুরু করা যায় তবে ভালো হয়। সরকারি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছে। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি যাতে কমানো যায়। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা যাতে ভালো হয় উন্নত মানের হয়, প্রাইভেট চিকিৎসা যাতে আরো ভালো হয় সেদিকে সরকার নজর রাখছে। লেখক : জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের পরিচালক। ডব্লিউএন  

হার্ট সুস্থ রাখবে তিলের তেল

পুষ্টিগত গুণাগুণের কারণে ভোজ্য তেল হিসেবে তিলের তেল ব্যবহার হয়ে আসছে আদি কাল থেকেই। রান্না ছাড়াও শরীরে মাখার জন্যও এই তেলের রয়েছে আলাদা কদর। এ তেল চুল পড়া কমায়, চুল পাকা রোধ করে, ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায় এবং প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে। জেনে নিন তিলের তেলে আরও কী কী গুণাগুণ আছে- হাড়ের সুস্বাস্থ্য: তিলের তেলে রয়েছে জিংক, ক্যালসিয়াম এবং কপার। নিয়মিত এই তেল ব্যবহার করলে বা রান্না করলে হাড়ের সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। হাড়ের ক্ষয়রোধের পাশাপাশি অস্টিওপোরোসিস রোধ করে। তিলের তেল হাড়ের জোড়ে সমস্যাজনীত বিভিন্ন ধরনের ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করতেও কাজ করে। হার্ট সুস্থ রাখে: এ তেলে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম থাকায় রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রক্তরসে শর্করার পরিমাণও কমায় তিলের তেল।  ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও এতে আছে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, সেসামোল যা জ্বালাপোড়া নিরোধক উপাদান। দাঁতের ওষুধ: তিলের তেল দাঁতের পরিচর্যার `অয়েল পুলিং`-বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই পদ্ধতিতে মুখে পরিমাণ মতো তেল নিয়ে ১০ মিনিট ধরে কুলিকুচি করতে হয়। কুলি ফেলার সময় এই তেল মুখের সকল বিষাক্ত উপাদান ও ব্যাকটেরিয়া বের করে আনবে। পাশাপাশি দাঁত ঝকঝকে করতেও তিলের তেল অত্যন্ত উপাকারী। স্নায়ু সচল করে: তিলের তেল শরীরের ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি ইন্দ্রিয়ের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে । এ তেল মানুষের আয়ূ বৃদ্ধি করে। শরীরের রং উজ্জ্বল করে: তিলের তেল শরীরে উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে। শরীরের ছোট ছোট জীবাণূ দূর করে দেয়। মানসিক সুস্বাস্থ্য: এতে রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড ‘টাইরোসিন’যা মানসিক অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করে। তিলের তেল প্রয়োজনীয় এনজাইম ও হরমোন সরবরাহ করার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে মন-মেজাজ ভালো রাখে। মানসিক চাপ দূর করার একটি আদর্শ উপাদান। এ তেলে কোনোরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।  সূত্র: বোল্ড স্কাই।   /আর/এআর

আজ বিশ্ব হার্ট দিবস

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মধ্য দিয়ে। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটি ৭৫ লাখ মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পৃথিবীর মোট মৃত্যুর ৩১ ভাগই হয় হৃদরোগে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে দুই কোটি ৩০ লাখে। দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‌্যালী বের হয়। র‌্যালীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জিসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বুধবার সকালে র‌্যালীর আয়োজন করে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমানের নেতৃত্বে র‌্যালীতে হাসপাতালের সব চিকিৎসক অংশ নেন। /আর/এআর

হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কি খাবেন

হৃৎপিণ্ড দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। তাই হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ্য রাখতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় খাদ্যাভ্যাস। আর হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে বাচঁতে হলে আপনাকে কয়েকটি খাবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে ব্রাইট সাইড। আসুন জেনে নিই হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে কতিপয় প্রয়োজনীয় খাবার সম্পর্কে। ১. বাদাম বাদামে রয়েছে প্রোটিন ফাইবার, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এতে রয়েছে ভিটামিন ই, যা বাজে কোলস্টেরল কমাতে সহায়ক হবে। ২. এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল প্রতিদিন অতিরিক্ত নয়, মাত্র দুই চামচ করে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলই আপনার রক্তের বাজে কোলস্টেরল কমাতে সহায়ক হবে। ৩.গ্রিন টি গ্রিন টি হৃদরোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে এবং দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। ৪. ফুলকপি ও পালং শাক ফুলকপি ও পালং শাকে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো হৃৎস্পন্দন ঠিক রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৫. চর্বিযুক্ত মাছ হৃদরোগ থেকে রক্ষার জন্য মাছ খুবই ভালো খাবার। চর্বিযুক্ত মাছ এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে মাছ খেতে হবে। ৬. ওটমিল ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া হৃদরোগ থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়। এক্ষেত্রে ওটমিল হতে পারে একটি আদর্শ খাবার। এটি রক্তের বাজে কোলস্টেরল কমবে এবং হজমশক্তি বাড়বে। ৭.  বেরি বিভিন্ন ধরনের বেরি হৃদরোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনে সহায়ক। এক্ষেত্রে স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি ইত্যাদি খুবই উপযুক্ত। ৮.  ডার্ক চকলেট ডার্ক চকলেটে রয়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কোকোয়া। আর এটি রক্তচাপ ও সংক্রমণ কমাতে সহায়ক। ৯. ডালিম ডালিম ও বেদানাতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো রক্তচাপ কমায় এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে। ১০. দারুচিনি দারুচিনি দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এছাড়া হৃদরোগ প্রতিরোধেও কার্যকর। ১১. তরমুজ তরমুজ কোলস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে খুবই কার্যকর। এছাড়া এর আরও বহুগুণ রয়েছে, যা আদতে হৃদরোগ থেকে রক্ষা পেতে সহায়ক। ১২. রসুন রসুনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের দারুণ গুণ রয়েছে। এটি নিয়মিত খেলে উপকার পাওয়া যায়। ১৩. আপেল আপেলে রয়েছে প্রচুর ফাইবার ও অন্যান্য উপকারী উপাদান। এটি রক্তচলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক। হৃদরোগের জন্য এটি খুবই কার্যকর। সূত্র: ব্রাইট সাইড এম/ডব্লিউএন  

ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি ও দুঃশ্চিন্তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়

মানবদেহ স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি। মহাবিশ্বে এত চমৎকার, এত বুদ্ধিমান, এত সৃজনশীল, এত সংবেদনশীল আর কোনো সৃষ্টির অস্তিত্ব এখনও পাওয়া যায়নি। এই মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে হার্ট বা হৃৎপিন্ড। বুকের মধ্যখানে দুই ফুসফুসের মাঝে হৃৎপিন্ড অবস্থিত। হৃৎপিন্ডের ৪টি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। উপরের দুইটিকে অ্যাট্রিয়াম এবং নীচের দুইটিকে ভেন্ট্রিকুল বলে। হৃৎপিন্ড চারিদিকে পেরিকার্ডিয়াম নামক আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে। হৃৎপিন্ডকে আমরা বলতে পারি একটি শক্তিশালী পাম্প, যা জীবদ্দশায় সাড়ে ৪ কোটি গ্যালনের চেয়ে বেশি রক্ত পাম্প করে থাকে। প্রতিদিন ১ লাখ হার্টবিটের মাধ্যমে ৬০ হাজার মাইল পাইপলাইনের মধ্যদিয়ে হৃৎপিন্ড দেহের প্রতিটি কোষে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছে। হৃৎপিন্ড যে ধমনীর মাধ্যমে নিজের জন্য রক্ত পাঠায় তার নাম করোনারি ধমনী। ডান ও বাম এই প্রধান ২টি করোনারি ধমনীর মাধ্যমে হ্ৎৃপিন্ডে রক্ত সঞ্চালিত হয়। হৃদপিন্ড বা হার্টের অনেক ধরনের রোগ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এবং সবচেয়ে বেশি যে রোগটি হয় তা হলো করোনারি আর্টারী ডিজিজ বা ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ বা করোনারি হৃদরোগ। করোনারি ধমনীর দেয়ালে হলুদ চর্বি জমে রক্ত চলাচল কমে গেলে রোগী বুকে ব্যথা অনুভব করেন, বিশেষ করে কিছুদূর হাঁটলে বা সিঁড়ি দিয়ে উঠলে বুকে ব্যথা হয়। সাধারণত: বুকের বাম দিকে বা বুকের মধ্যখানে এই ব্যথা অনুভূত হয়। অধিকাংশ রোগী বুকের মধ্যে ভার ভার বা চাপ অনুভব করেন-অনেকটা বুকের চারপাশে ব্যান্ডের মত। কখনও কখনও রোগী এক ধরনের শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। বুকের এই ব্যথা ঘাড়, থুতনি, বাহু বিশেষ করে বাম হাত বা রিস্ট-এ চলে যেতে পারে। কখনও বা এই ব্যথা উপরের পেটে বা পিঠের উপরের দিকে দুই হাড়ের মধ্যে অনুভূত হতে পারে। সাধারণত: বিশ্রাম নিলে বা জিহ্বার নিচে নাইট্রেট  জাতীয় ওষুধ নিলে এই ব্যথা কমে আসে। করোনারি হৃদরোগ প্রধানত দু’ধরনের  ১.       এনজাইনা পেকটরিস ২.      মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এনজাইনা পেকটরিস করোনারি ধমনীতে হলুদ চর্বি জমার কারণে করোনারি ধমনী দিয়ে রক্ত চলাচল কমে আসে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ থেকে হৃদপিন্ড বঞ্চিত হয়। ফলে রোগী বুকে ব্যথা অনুভব করেন। মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন যদি কোনো কারণে করোনারি ধমনী দিয়ে পুরোপুরি রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আসে তখন রোগী বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। এই ব্যথা বুক, গলা, ঘাড়, ওপরের পেট, হাত বা পিঠেও চলে যায়। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা বমি হয়ে থাকে। আস্তে আস্তে রোগী নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হলে রোগী মৃত্যুর মুখে পতিত হন। বিশ্বে প্রতিবছর দেড় কোটিরও বেশি মানুষ করোনারি হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে। আর পাশ্চাত্যে মোট মৃত্যুর শতকরা ৪৫ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় প্রতি ৫ জনে ১ জনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। পাশ্চাত্যের অন্ধ-অনুকরণ আর ভ্রান্ত জীবনাচরণের কারণে বাংলাদেশসহ প্রাচ্যের দেশগুলোতেও এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হৃদরোগ মহামারি আকারে দেখা দেবে। আর এই রোগ একদিনে হুট করে হয় না। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে ধমনীতে কোলেস্টেরল জমে মূলত: এ রোগের সূত্রপাত ঘটে। বিজ্ঞানীরা যে সকল কারণকে হৃদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে থাকেন তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ১. বয়স : বয়স বাড়ার সাথে সাথে হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ২.লিঙ্গ : মহিলাদের চেয়ে পুরুষেরা হৃদরোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তবে মেনোপজের পরে মহিলাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। ৩. বংশগত : বাবা-মায়ের হৃদরোগ থাকলে তাদের সন্তানদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অধিক থাকে। এর মূল কারণ পরিবারের একই খাদ্যাভ্যাস ও ধূমপানের অভ্যাস। ৪. ধূমপান : হৃদরোগ হবার পেছনে ধূমপানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল ব্যক্তি নিয়মিত ধূমপান করে থাকেন তাদের হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার ঝুঁকি থাকে। ৫. উচ্চ রক্তচাপ : উচ্চ রক্তচাপ করোনারি হৃদরোগের একটি মারাত্মক রিস্ক ফ্যাক্টর। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিন্ডের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ৬. রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রার আধিক্য : রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রার আধিক্য হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর। ৭. ডায়াবেটিস : হৃদরোগ হবার পেছনে ডায়াবেটিসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ৮. অতিরিক্ত ওজন এবং মেদস্থুলতা : অধিক ওজন হলে শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে হৃদপিন্ডের অধিক কাজ করতে হয়। যার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ৯. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব : শারীরিকভবে নিস্ক্রিয় লোকদের হৃদরোগ হবার প্রবণতা দেখা যায়। অলস জীবন-যাপন করোনারি হৃদরোগের জন্য আরেকটি রিস্ক ফ্যাক্টর। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এ কারণগুলো ছাড়াও যে বিষয়টির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মনোযোগ দিচ্ছেন তা হলো স্ট্রেস বা টেনশন। এমনকি বিজ্ঞানীরা উপরোক্ত সবগুলো কারণের মধ্যে একক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে স্ট্রেসকে চিন্থিত করছেন। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তির রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল লেভেল, উচ্চ রক্তচাপ বা ধূমপানের অভ্যস থাকা সত্ত্বেও স্ট্রেস- ফ্রি থাকার কারণে তিনি হৃদরোগ থেকে মুক্ত রয়েছেন। আবার উপরোক্ত কারণগুলো না থাকা সত্ত্বেও শুধু স্ট্রেসের কারণে কোনো ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন যে, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। তিনি বলেছেন, কোলেস্টেরল বা চর্বি জাতীয় পদার্থ জমে করোনারি ধমনী প্রায় ব্লক করে ফেললেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে এমন কোনো কথা নেই।  ■       কোরিয়া যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রে নিহত সৈনিকদের নিয়মিত অটোপসি করা হতো। ডাক্তাররা তখন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন যে, নিহত তরুণ সৈনিকদের শতকরা ৭০ জনেরই ধমনী চর্বি জমে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে (Advance Stage of Atherosclerosis) এবং দ্রুত হার্ট অ্যাটাকের পথে এগুচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯ বছর বয়স্ক তরুণ সৈনিকও ছিল। ডা. ক্রিচটন প্রশ্ন তোলেন, তরুণ ধমনীগুলো এভাবে চর্বি জমে বন্ধ হওয়ার পরও সাধারণভাবে মধ্য বয়সে এসে কেন হৃদরোগের আক্রমন ঘটে? যদি শুধু করোনারি ধমনীতে চর্বি জমাটাই হৃদরোগের কারণ হতো তা হলে এই তরুণ সৈনিকদের মৃত্যু গুলির আঘাতে নয়, হার্ট অ্যাটাকেই হতো। ■       আবার দেখা গেছে, করোনারি ধমনীর ৮৫% বন্ধ অবস্থা নিয়েও একজন ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছে; আবার একেবারে পরিস্কার ধমনী নিয়েও অপর একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিস্কোর ডা. মেয়ার ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোজেনম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ এবং প্রতিদ্বন্দিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনাচরণের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ■       এই প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে রয়েছে ভ্রান্ত-জীবনদৃষ্টি। ভ্রান্ত-জীবনদৃষ্টির কারণে যে জিনিসটি প্রথম তৈরি হয় তা হলো টেনশন বা স্ট্রেস। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ প্রভৃতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। জীবনে ক্রমাগত আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া, কাজ-কর্মে তাড়াহুড়ো, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্য দিনের দুর্ভাবনা এককথায় স্ট্রেস সরাসরি আমাদের শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ও হৃৎপিন্ডের উপর প্রভাব ফেলে। ক্রমাগত টেনশন বা স্ট্রেসের ফলে শরীর থেকে এড্রেনালিন, নর-এড্রেনালিন ও কর্টিসোল নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে দেহের অধিকাংশ পেশী যে পরিমাণ সংকুচিত হয় সেই পরিমাণ শিথিল হতে পারে না। এর মধ্যে যেমন বড় বড় পেশী রয়েছে তেমনি  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পেশীও রয়েছে। ফলে তৈরি হচ্ছে ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, পিঠে ব্যথা। আবার করোনারি ধমনীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাংসপেশীর সংকোচনের ফলে তৈরি হচ্ছে  Coronary artery spasm.  ■       সম্প্রতি ডা. আলবা সাবাই বৈরুতে কিছু মানুষের উপর নিরীক্ষা চালান যারা গত ১৪ বছর যাবৎ যুদ্ধের কারণে ক্রমাগত টেনশন বা স্ট্রেসে থেকেছেন। তিনি এনজিওগ্রাম করে প্রত্যেকের করোনারি ধমনীতে ব্লকেজ পান। ■       আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপে রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল বৃদ্ধি পায় এবং এর সাথে খাদ্য গ্রহণের কোনো সম্পর্ক নাই। কার রেসিং এর পূর্বে ৫০০ ইন্ডিয়ানাপোলিস কার রেস ড্রাইভারের রক্ত পরীক্ষা করা হয় এবং রেস শেষ হবার পরও রক্ত পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেছে, রেসের পূর্বে তাদের প্রত্যেকের রক্তের কোলস্টেরল লেভেল বেশি ছিল। এছাড়া আমেরিকায় ট্যাক্স একাউন্ট্যান্টদের রক্তের কোলস্টেরল লেভেল বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় ১৫ এপ্রিল এর আগে-পরে বেশি থাকে। আবার দেখা গেছে, মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা চলাকালীন রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল অন্য সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। লেখক : কোঅর্ডিনেটর, কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব।    

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি