ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

আত্মার সন্ধানে

আউয়াল চৌধুরী

প্রকাশিত : ১৮:৩৭ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাসা থেকে বের হয়ে চৌরাস্তার মোড়ে আসতেই দেখা হয়ে গেলো অমিত সাহেবের সঙ্গে! রুক্ষ চেহারা, ঘুমহীন লাল চোখ, চুলে জট, দাঁড়ি-গোঁফে একাকার! তাকে কেউ বলে পাগল, কেউ বলে গোয়েন্দা।
সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন- দশ টাকা দে।
নাবিল বলে, কি করবেন টাকা দিয়ে?
- দে টাকা দে।
- চলেন ওই দোকানে গিয়ে বসি। বললো নাবিল।
দোকানদার চা-বিস্কুট দিলে মধ্যবয়সী অমিত সাহেব গোগ্রাসে তা খেতে লাগলেন।
নাবিল জিজ্ঞেস করলো, ঝড়-বৃষ্টি-রোদে সব সময় আপনাকে দেখি কি যেনো খুঁজছেন? আমাকে বলবেন, কি খুঁজছেন? আমি সহযোগিতা করবো!
অমিত বললো, ‘তাদের খুঁজছি’!
- তারা কারা?
অমিত উদাস হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ উঠে সোজা হাঁটা দিলো। নাবিলও তার পিছু পিছু চললো। অনেক মানুষের ভীড়ে অমিত সাহেব কোথায় যেনো মিলিয়ে গেলেন। নাবিল আর খুঁজে পেলো না। এরপর থেকে নাবিল প্রতিদিনই তাকে খোঁজে। তার ভেতরের অপ্রকাশিত কাহিনী জানার জন্য ছটফট করতে থাকে। কিন্তু তার আর কোন হদিস পায় না। কেউ তার সঠিক ঠিকানাও দিতে পারে না।

একদিন ইউনিভার্সিটি যাবার পথে নাবিল বাসে ওঠার পর দেখে অমিত সাহেব ফুটপাত দিয়ে হেঁটে কোথায় যেনো যাচ্ছেন। সে তাড়াতাড়ি বাস থেকে নেমে পেছন পেছন তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। অমিত একটা সরু গলি দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। নাবিলও তার পিছু ঢুকলো। কিছু দূর গিয়ে অমিত সাহেব একটা কুঁড়েঘরের পাশে গাছের গুঁড়ির ওপর হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। এ সময় হঠাৎ নাবিলকে দেখতে পেয়ে তার চোখ লাল হয়ে গেলো। ক্রুদ্ধভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। নাবিল একটু এগিয়ে গিয়ে দশ টাকার একটি নোট তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। হাতের মুঠোতে টাকাটা নিয়ে অমিত সাহেব কচলাতে লাগলেন।

নাবিল হাঁটু গেঁড়ে তার সামনে গিয়ে বসে বললো, আপনার ভেতরের কষ্টটা আমার সঙ্গে শেয়ার করুন। আমি আপনাকে সহযোগিতা করবো। আপনি কাকে খুঁজছেন? সম্ভব হলে আমি খুঁজে বের করে দেবো। আমার এক আঙ্কেল আছেন, পুলিশের বড় কর্মকর্তা। তাকে বললে তিনিও সহযোগিতা করবেন।

অমিত সাহেব উদাস হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আকাশে সাদা মেঘগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হলো তিনি যেনো সেই মেঘের সমুদ্রে সাঁতার কাটছেন! তারপর বলা শুরু করলেন। দীর্ঘদিন কথা না বলতে বলতে কথার মধ্যে অনেক জড়তা।

- মাস্টার্স শেষ করার পর চাকরি খোঁজা শুরু করলাম। বাড়িতে মা-বোন, তাদের জন্যে টাকা পাঠানো দরকার। কিন্তু কোনোভাবেই একটি চাকরি জোগাড় করতে পারছি না। কতো জায়গায়, কতোজনের কাছে গেলাম, সবাই শুধু আশ্বাসই দেয়। সকাল থেকে রাত অব্দি চাকরির জন্য এই শহরের অফিসে-অফিসে ঘুরি। কোথাও আমার ভাগ্য খোলে না। এক সময় খুব হতাশ হয়ে যাই। মনে হলো এই শহরে বোধহয় আর থাকা হবে না। যে খরচ, তা বহন করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ সময় আমার এক বন্ধু তার এক আত্মীয়ের কাছে পাঠালো। সিভি দেখে আশফাক সাহেব জানালেন, তিনি প্রয়োজন হলে পরে কল দেবেন। এরপর অনেক দিন চলে গেলো। আশফাক সাহেবের সঙ্গেও কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। আমি হতাশার সাগরে ডুবে আছি। হঠাৎ একদিন আশফাক সাহেব ফোন দিয়ে দেখা করতে বললেন। আমি দেরি না করে তার অফিসে চলে আসলাম। তিনি আমার অপেক্ষায়ই ছিলেন। কফি খেলাম। তিনি টুকটাক খোঁজখবর নিলেন। তারপর বললেন, আমি তোমার যা প্রয়োজন, সবকিছু করতে চাই। তোমারও এখন সহযোগিতার প্রয়োজন। তবে একটি শর্ত আছে।
- কি শর্ত?
- আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।
আশফাক সাহেব বলতে লাগলেন, তুমি যদি আমার মেয়ে আফসানাকে বিয়ে করো, আমি তোমাকে একটি ফ্ল্যাট এবং ব্যবসার জন্য পর্যাপ্ত টাকা দিয়ে দেবো। তবে একটি ছোট সমস্যা আছে, তুমি যদি সেটি মেনে নাও।
- কি সমস্যা!
একটু থেমে আশফাক সাহেব বললেন, একদিন একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যা আমার মেয়ের জীবনকে লন্ডভন্ড করে দেয়। আমার ফুলের মতো মেয়েকে এক হায়েনা রেপ করে এবং সে এখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
দু’জন অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
আশফাক সাহেব বললেন, আমার মেয়ে সুন্দরী। তুমি চাইলে দেখতে পারো, যদি পছন্দ না হয়, তাহলে বিয়ে করার দরকার নেই।
অমিতের মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ভাবনার অতলে ডুবে গেলো। অনেক ভেবে-চিন্তে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো। কারণ তার পরিবার ও বর্তমান পরিস্থিতিতে এরচেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। পরিশেষে তাদের বিয়ে হয়ে গেলো। ভেতরের ঘটনাটি আর কেউ জানলো না!

বিয়ের প্রথম দিনগুলো তাদের বেশ ভালোভাবেই কাটছিলো। ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। এতো সুন্দর একটি পুতুল তাদের ঘরে আসলো, যেনো তার থেকে চোখ ফেরানো যায় না! তারা নতুন এই পুতুলের নাম দিলো ‘আত্মা’। আফসানার পুরোটা সময় কাটে এখন আত্মাকে ঘিরে। অমিত ব্যবসায়িক কাজে বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকলেও আফসানাই সংসারের সবকিছু গুছিয়ে রাখে। অমিতের খাবার-দাবার সবকিছুই নিজ হাতে তৈরি করে রাখে। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও তাদের মধ্যে কোথায় যেনো সম্পর্কের একটা অদৃশ্য ফাঁক থেকে যায়।

প্রথমদিকে অমিত যেমনটি ছিলো, পরবর্তীতে তার মধ্যেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়ে সংসারে অশান্তি শুরু হতে থাকে। দু’জনের মধ্যে কথা বলা এখন খুব একটা হয় না বললেই চলে। দেখতে দেখতে আত্মার বয়সও দু’বছর পার হয়ে গেলো। সারা ঘরময় তার হাসির ছটা উপছে পড়ছিলো। অমিত অফিস থেকে ফিরলে আত্মা তার গলা ধরে, কাঁধে-পিঠে চড়ে খেলতে থাকে। কিন্তু অমিতের মধ্যে অর্থলিপ্সা অনেক বেশি বেড়ে যায়। এ সময় ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো অমিত মেজাজ হারিয়ে ফেলে। ধমক দিয়ে আফসানাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
দু’জনের তিক্ততা এতোটাই বেড়ে যায় যে, একদিন অমিত আফসানার গায়ে হাতও তোলে। এতে আফসানা খুবই কষ্ট পায়। সারাদিন না খেয়ে বিছানায় পড়ে শুধু কেঁদেছে। মেয়েটির দিকেও কোনো নজর দেয়নি। আত্মা ক্ষুধার জ্বালায় কেঁদেছে। সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো। আফসানা ভাবলো, মেয়েটির তো কোনো দোষ নেই, সবই তার কপাল। তাকেতো ফেলে দিতে পারি না!
তাই স্বাভাবিক হাওয়ার চেষ্টা করলো সে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো। বারান্দায় খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আফসানা ভাবতে লাগলো, এতো কষ্ট, এতো যন্ত্রণা কেনো তার কপালে! কিন্তু সে জানে না তার এ কষ্ট কোনোদিন শেষ হবে কি না।

কালের নিয়মে সময় বয়ে যাচ্ছিলো। আফসানা মেয়েকে নিয়েই নিজের পৃথিবী তৈরি করে নিলো। সে সবকিছু ভুলে থাকতে চায়।

অমিত বাইরে থেকে রাতে বাসায় ফিরলে আফসানা টেবিলে খাবার রেডি করে বসে থাকে। আফসানা নিজেই রান্না করে, কারণ বুয়ার হাতের রান্না অমিত খুব একটা পছন্দ করে না। দু’জন একসঙ্গে বসে খায়, তবে তাদের মধ্যে তেমন কোন কথা হয় না।
একদিন আফসানার শরীর খারাপ হওয়ায় বুয়াকে দিয়ে রান্না করিয়েছিলো। সেদিন অমিত টেবিলে বসে খাবার মুখে না দিয়েই উঠে চলে যায়। সেদিন আর ভাত খায়নি।

এভাবে তাদের সংসার জীবনের পাঁচ বছর পার হয়ে যায়। আত্মা এখন সারা ঘরময় দৌঁড়ে বেড়ায়। সে যখন হাসে, তখন যেনো পুরো ঘর আলোয় ভরে যায়! অমিত মাঝে মাঝে মেয়েটিকে কাছে টানলেও খুব একটা সময় দেয় না। মেয়েটির হাসি কখনো কখনো অমিতের অন্তরে রেখাপাত করলেও কেমন যেনো একটা জড়তা তার মধ্যে কাজ করে। আত্মা তার গলা ধরে ঝুলে থাকে।

একদিন অমিত মাত্র বাইরে থেকে বাসায় ফিরেছে। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আফসানা জানায় মেয়েটির খুব জ্বর।
অমিত ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে, আমি কি করবো? তুমি ডাক্তার দেখাতে পারো না। আর তার সঙ্গে আমার এমন কি সম্পর্ক যে আমাকেই সব করতে হবে? কোত্থেকে পেটে করে কি নিয়ে আসছে...!
এ কথায় আফসানা ভীষণ রকম কষ্ট পায়। তার বুক চিরে ব্যথার স্রোত বইতে থাকে। সারারাত ঘুমাতে পারে না। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে।
সকালবেলা অমিত ঘুম থেকে উঠে দেখে বাসা খালি! সবগুলো রুম চেক করে। কিন্তু কোথাও তারা নেই! আফসানা বাচ্চাকে নিয়ে বের হয়ে যায়, কিন্তু কোথায় গেলো সেটা কাউকে বলে যায়নি।

আফসানা চলে গেলেও প্রথম প্রথম অমিতের কাছে খুব একটা খারাপ লাগেনি। কিন্তু একটা সময় সে অনুভব করে, তার অগোছালো জীবনে অনেক কিছু সামাল দিয়েছে আফসানা। রাতভর বাসায় ইয়ার-বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিলেও অমিত নিজের মধ্যে কেমন যেনো একটা শূন্যতা অনুভব করে। ছোট্ট মেয়েটির মায়াবী মুখ, ডাগর চাহনী তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এমন মোহময় হাসি কোন মানুষই এড়াতে পারে না! তুলতুলে নরম হাতগুলো যখন তার গলা জড়িয়ে ধরতো, লাশকাটা ঘরের পাষাণ লোকটিও হয়তো তখন তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারতো না!

অমিত প্রথমে ভেবেছিলো, অভিমান ভাঙলেই আফসানা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু অনেকদিন হয়ে গেলেও তাদের কোনোই খোঁজ নেই। এক সময় অমিত সিদ্ধান্ত নেয়, যা হবার হয়ে গেছে। অনেক ভুল সে করে ফেলেছে। যেভাবে হোক তাদের এখন ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।
প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু-স্বজন- সব জায়গায় খুঁজতে লাগলো, কিন্তু না কোথাও তাদের হদিস পেলো না। কোথায় যেনো তারা হারিয়ে গেলো। অমিত এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লো। সে তাদেরকে কোনোভাবেই যেনো ভুলতে পারছে না।

এরপর প্রতিনিয়ত রাস্তঘাট, যেখানে সেখানে তাদেরকে খুঁজতে লাগলো। অযত্নে অবহেলায় এক সময় মাথার চুল, দাঁড়ি অনেক লম্বা হয়ে যায়, সেসব কাঁটার খেয়ালও থাকে না। এখন মাথা যেনো আর কাজ করে না! চোখগুলো ঝাপসা ঝাপসা লাগে। কে কি বলছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই।

এভাবে দিন যেতে যেতে একসময় অমিত পাগলের মতো হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া কোন কিছুতেই আর হিসেব মেলে না। কোথায় যায়, কোথায় থাকে, কি খায় এসবেও তার খেয়াল নেই। সে মা-মেয়েকে ঝড়-বৃষ্টি-রোদে খুঁজেই চলেছে। যে নিষ্পাপ আত্মাকে সে দূরে ঠেলে দিয়েছে, সেই আত্মা এখন তার দেহ থেকেও চলে গেছে। আছে শুধু একটা শরীর। অমিত প্রতিটা অলিতে-গলিতে তাদেরকে খুঁজে চলেছে। প্রতিদিন অগণিত অসংখ্য মানুষের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে। লাখো কোটি মানুষের ভেতর আফসানা আর তার আত্মাকে খুঁজে পেতে চায়।

লেখক : সাংবাদিক

এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি