ঢাকা, শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০, || আষাঢ় ২৬ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

নবীজির (স.) বিজয় ও যুগে যুগে বিজয়ীর নৃশংসতা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৮:২৪ ২৭ মে ২০২০ | আপডেট: ১৮:২৫ ২৭ মে ২০২০

[পবিত্র কোরআন-এ আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা আহজাব-এর ২১ নং আয়াতে বলেন, ‘(হে মানুষ!) নিশ্চয়ই তোমাদের জন্যে নবীজীবন সর্বোত্তম আদর্শ।’ নবীজীবন কোরআনের ফলিত রূপ। কোরআন বুঝতে হলে, কোরআনের গভীরে ডুব দিতে হলে নবীজীবনকে জানতে হবে। নবীজীবনকে যত গভীরভাবে অধ্যয়ন করা যায়, নবীপ্রেমে নিজের অন্তরকে যত প্লাবিত করা যায়, ততোই কোরআনের বাস্তব ও পরাবাস্তব জ্ঞানের ছটায় উপকৃত হওয়া যায়। কোরআনে ব্যক্ত ও সুপ্ত সব কথারই মর্মমূলে প্রবেশ করার ফলে; বিশ্বাসের স্তর থেকে উত্তরণ ঘটবে জানার স্তরে। 

প্রথম পর্বে আপনারা জেনেছেন নবী আগমনের পটভূমি। আইয়ামে জাহেলিয়াত। মক্কার বিবর্তন। কাবার নিয়ন্ত্রক বেনিয়া পুরোহিত চক্রের শোষণ ও ভোগবাদী সমাজে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয়ের বিবরণ। দ্বিতীয় পর্বে জেনেছেন শূন্য থেকে জীবন শুরু। অনিশ্চয়তার পর অনিশ্চয়তা। নিজ শ্রম ও মেধায় ৩৫ বছর বয়সে আসীন হলেন মক্কার সমাজে উচ্চ মর্যাদায়। তৃতীয় পর্বে আপনারা জেনেছেন জীবনের বাঁকবদল। জাহেলিয়াত থেকে উত্তরণের সূত্র লাভ। আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। সকল মানুষ সমান। শুরু করলেন সত্যের প্রচার। প্রথমে গোপনে। তারপর প্রকাশ্যে। চতুর্থ পর্বে আপনারা জেনেছেন নির্মম নির্যাতন ও উৎপীড়নের মুখে স্বল্পসংখ্যক সঙ্ঘবদ্ধ মানুষের বিশ্বাস ও অহিংসায় অটল থেকে আত্মিক তূরীয় আনন্দে অবগাহনের বিবরণ। পঞ্চম পর্বে জেনেছেন হিজরত- চরম অনিশ্চয়তার মুখে সোনালি সকালের পথে যাত্রার বিবরণ। ষষ্ঠ পর্বে জেনেছেন মদিনায় আগমনের পর সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে ধাপে ধাপে তার ঘর গোছানোর কাহিনী। সপ্তম পর্বে জেনেছেন- সীমিত শক্তি ও উপকরণ নিয়ে বড় বিজয়ের উপাখ্যান। অষ্টম পর্বে জেনেছেন ঘর গোছানোর সাথে সাথে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যাকাতের বিধানাবলির বিবরণ। 

নবম পর্বে জেনেছেন নিশ্চিত বিজয় বিপর্যয়ে রূপান্তরের উপাখ্যান। দশম পর্বে আপনারা জেনেছেন বিপর্যয় থেকে বিজয়ে উত্তরণের কাহিনী। একাদশ পর্বে আপনারা জেনেছেন- হাজার বছরের শোষণের অবসান ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপনের বিবরণ। দ্বাদশ পর্বে আপনারা জেনেছেন সাহস ও সমঝোতায় বিজয়ের বিবরণ ও মুনাফেকদের অপপ্রচারের ব্যর্থতার কাহিনী। ত্রয়োদশ পর্বে আপনারা জেনেছেন নবীজীর (স) কৌশলের কাছে কোরাইশদের পরাজয়ের বিবরণ। চতুর্দশ পর্বে আপনারা জেনেছেন হুদায়বিয়া- নবীজীর (স) অহিংস নীতির ঐতিহাসিক সাফল্যের বিবরণ। পঞ্চদশ পর্বে জেনেছেন নবীজীর বাণী নিয়ে দিকে দিকে দূতদের অকুতোভয় অভিযাত্রার বিবরণ। ষোড়শ পর্বে আপনারা জেনেছেন- দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় খায়বর জয়ের কাহিনী। এবার সপ্তদশ পর্বে আপনারা জানবেন যুগে যুগে বিজয়ীর নৃশংসতার পরিসংখ্যান।]

খায়বর বিজয় সম্পন্ন হলো। বিজয়ী হিসেবে বিজিতের প্রতি নবীজীর আচরণ কতটা মানবিক ছিল তা বুঝতে হলে যুগে যুগে বিজয়ীরা বিজিত দেশগুলোর মানুষের সাথে কী আচরণ করেছে, সে সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া প্রয়োজন। তাহলেই আমরা অনুধাবন করতে পারব তাঁর ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ নামের তাৎপর্য, তাঁর মহানুভবতা।

যুগে যুগে বিজয়ীর ধ্বংসলীলা। আমরা আরব থেকে শুরু করি। জাহেলিয়াতের যুগে আরবে খুন, খুনের বদলা খুন, জীবিকার জন্যে খুন ও লুণ্ঠন বিবেচিত হতো অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে। আরবরা লুণ্ঠনের মালকে বলত গনিমতের মাল। লুণ্ঠিত মাল অর্থাৎ গনিমতের মালকে তারা সবচেয়ে হালাল ও পবিত্র উপার্জন মনে করত। তাই তারা রাতে প্রতিপক্ষ ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় হামলা, নির্বিচারে খুন ও লুট করত। নারী-শিশু নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করা হতো। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সবধরনের নিষ্ঠুরতা বিবেচিত হতো বীর ধর্মরূপে। নিহত ব্যক্তির নাক কান কেটে মালা বানানো হতো। শিশু-কিশোরদের বানানো হতো তীরের নিশানা। শত্রুর ওপর বিজয়ী হলে বিজিতের মাথার খুলিতে মদ্যপান করা ছিল দম্ভের আরেক প্রকাশ।

বন্দিকে হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গচ্ছেদন করে ছেড়ে দেয়া হতো মৃত্যু পর্যন্ত তার কাতরানি ও আর্তচিৎকার উপভোগ করার জন্যে। নারীদের দাসী হিসেবে ব্যবহার ও বিক্রি করাটা ছিল সাধারণ প্রচলিত রীতি। চারটি মাস ছাড়া বছরব্যাপীই চলত এই গোত্রীয় হানাহানি ও লুটপাট। এবার আমরা আসা যাক যুদ্ধ ও বিজয়। যুগে যুগে দেশে দেশে।

অশোকের বিজয়
মৌর্য সম্রাট অশোক খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০ সালে কলিঙ্গ (বর্তমান উড়িষ্যা) আক্রমণ করেন। এই অভিযানে তিনি লক্ষাধিক পুরুষকে হত্যা করেন। যখন তিনি কলিঙ্গের রাজধানীতে পৌঁছলেন, তখন সেখানে হত্যা করার মতো কোনো পুরুষকে পাওয়া গেল না। যারা বেঁচে ছিল তারা জঙ্গলে-পাহাড়ে পালিয়ে গেল। যেখানে যাকে জীবিত পাওয়া গেছে তাকে ধরে দাস হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। নিজের নিষ্ঠুরতায় নিজেই অনুতপ্ত হয়ে পরে অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।

রোমানদের কার্থেজ জয়
রোমান বাহিনী কার্থেজ নগরী অবরোধ করে খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯ সালে। তিন বছর অবরোধের পর রোমান বাহিনী কার্থেজে প্রবেশ করে। তারা পুরো শহরে আগুন লাগিয়ে দেয়। ১৭ দিন ধরে আগুনে পুড়ে শহর ভস্মীভূত হওয়ার পর মই দিয়ে ছাইভস্মও মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এরপর লবণের আস্তর ছিটিয়ে দেয় যাতে ভবিষ্যতে কেউ এটাকে বাসযোগ্য করতে না পারে। কার্থেজের ২ লক্ষ ৫০ হাজার অধিবাসীর মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার জন প্রাণে বেঁচে যায়। তাদেরকে ক্রীতদাস হিসেবে দাস-বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়।

রোমানদের জেরুজালেম বিজয়
রোমান সৈন্যরা প্রথমবার জেরুজালেমে প্রবেশ করে খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ সালে। তারা ইহুদি সিনাগগ প্রাঙ্গণে ১২ হাজার ইহুদিকে হত্যা করে। তারা নতুন রাজা নিয়োগ করে কঠোর করারোপ ও বিধিব্যবস্থা প্রয়োগ করে। ৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ইহুদিরা বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ দমনে আগত রোমান বাহিনীর মোকাবেলা করতে না পেরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সশস্ত্র ইহুদিরা জেরুজালেমে অবস্থান গ্রহণ করে। রোমান বাহিনী ৭০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে জেরুজালেম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। নিরস্ত্র ক্ষুধার্ত নাগরিকেরা যারা খাদ্যের সন্ধানে শহরের বাইরে উপত্যকায় আসার চেষ্টা করত, তাদেরকে ধরে ধরে ক্রুশবিদ্ধ করা হতো। 

বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ইহুদিদের ক্রুশবিদ্ধ করে রোমান সৈন্যরা মজা করত। গড়ে দৈনিক এভাবে ৫০০ জনকে ক্রুশে বিদ্ধ করে মারা হতো। চার মাস অবরোধের পর জেরুজালেমের পতন ঘটে। রোমানরা সিনাগগগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে। ইহুদিদের সকল ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে দেয়। হত্যা ও লুট চলতে থাকে। প্রথম শতাব্দীর ঐতিহাসিক ফ্লেভিয়াস জোসেফাসের বর্ণনায় বলা হয়, এই অভিযানে অবরোধ ও বিজয়কালে ১১ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়, যার অধিকাংশই ছিল ইহুদি। শুধু একটা দেয়ালের অংশ ছাড়া শহরের সকল স্থাপনা গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়।

শুধু দেয়ালের অংশটুকু তারা রেখে দেয় রোমান সৈন্যরা যে কত বিশাল স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম তার নজির হিসেবে। ৯৭ হাজার জীবিত ব্যক্তিকে বন্দি করা হয়। এদের একটা বড় অংশকে বাধ্য করা হয় গ্লাডিয়েটর হতে। যাতে তারা প্রতিদ্বন্দ্বি গ্লাডিয়েটর বা হিংস্র জন্তুকে বধ করা বা বধ হয়ে রোমবাসীদের মনোরঞ্জন করতে পারে।

ক্রুসেডারদের জেরুজালেম বিজয়
১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপিয়ান ক্রুসেডাররা জেরুজালেম অবরোধ করে। প্রস্তর-নিক্ষেপক যন্ত্রে তারা পাথরের পরিবর্তে জীবন্ত মুসলমানদের গোলা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। একজন ক্রুসেডার পিটার টুডেবোড একটি নিক্ষেপের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন- একজন মুসলমানকে হাত-পা বেঁধে একটা প্রস্তর-নিক্ষেপক যন্ত্রে স্থাপন করা হলো। “তারা মনে করেছিল যন্ত্রের যে শক্তি তাতে তাকে দেয়ালে নিক্ষেপ করা যাবে। কিন্তু তারা দেখল অসম্ভব। কারণ সে এত প্রচণ্ড গতিতে যন্ত্র থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, তার হাড় ভেঙে যায় এবং তার দেহ দেয়ালে লাগার অনেক আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যায়।” 

ক্রুসেডাররা ১৫ জুলাই ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেমে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। মুসলমান শাসনাধীন ৪৬০ বছর পর্যন্ত ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা একসাথে শান্তিতে বসবাস করে এলেও জেরুজালেমে প্রবেশ করে প্রথম দুই দিনেই ক্রুসেডাররা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ৪০ হাজার ইহুদি ও মুসলমানকে হত্যা করে। রাস্তায় রক্তের স্রোত বয়ে যেতে থাকে। সিনাগগে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রতিটি ইহুদিকে হত্যা করা হয়। বায়তুল মুকাদ্দাসে আশ্রয় গ্রহণকারী ১০ হাজার মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। সেই যুগের প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা আল-রুমাইলীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। এবং বিজয়কে পূর্ণতা দানের জন্যে শুকরের পাল ও এর বর্জ্যে পরিপূর্ণ করা হয় আল আকসা মসজিদের মেহরাব।

আগুইলার্সের রেমন্ড তার প্রত্যক্ষদর্শীর উল্লসিত বর্ণনায় এভাবেই বলেন, ‘চমৎকার সব দৃশ্য। আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ শত্রুদের গলা কাটছে। অন্যেরা শত্রুদের তীর মারছে যাতে তারা মিনার থেকে, দেয়াল থেকে নিচে পড়ে যায়। কেউ আবার শত্রুদের জীবন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে তাদের উৎপীড়নকে দীর্ঘায়িত করছে। শহরের রাস্তায় রাস্তায় কাটা মাথা, হাত, পা স্তুপাকারে পড়ে আছে। চলতে গেলে একজনকে মৃতদেহের মাঝখান দিয়ে পথ করে নিতে হয়। তবে এগুলো খুবই মামুলি বিষয় টেম্পল অব সুলেমানের (বায়তুল মুকাদ্দাস) ঘটনার তুলনায়। সেখানে সাধারণত ধর্মবাণী অর্চনা হয়। সেখানে কী ঘটেছিল? আমি যদি সত্য বলি, তবে তুমি তা বিশ্বাস করতে সক্ষম হবে না। শুধু এটুকুই বলি, ওখানে হাঁটু সমান রক্তের ওপর দিয়ে চলতে হয়েছে।’

সাত দিন ধরে চলে ধ্বংসলীলা। ক্রুসেডাররা যে নারীকেই পেয়েছে তাকে ধর্ষণ করেছে হত্যার আগে। সকল ধর্মীয় স্থানে তারা অগ্নিসংযোগ করে। হত্যা করে প্রায় ৭০ হাজার ইহুদি ও মুসলমানকে।

চেঙ্গিসের ধ্বংসলীলা
মোঙ্গল যুদ্ধবাজ চেঙ্গিস খানের ঘোড়সওয়ার বাহিনী চীন জয়ের পর সিল্করুট ধরে ১২১৯ থেকে ১২২১ খ্রিষ্টাব্দে- মাত্র তিন বছরে তখনকার ধর্ম-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বোখারা, সমরখন্দ, তিরমিজ, গুরগঞ্জ, বলখ, হামাদান, মারভ্, হেরাত, নিশাপুরের মসজিদ মাজার লাইব্রেরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু ধুলোর সাথে মিশিয়ে দেয়। নিশাপুরে নারী, শিশু, বয়স্ক থেকে শুরু করে প্রতিটি গৃহপালিত প্রাণীকে হত্যা করা হয়। সৈন্যদের প্রতি চেঙ্গিস খানের নির্দেশ ছিল কোনো কুকুর-বেড়ালও যেন জীবিত না থাকে।

লাশগুলো স্তুপীকৃত করে সারিবদ্ধভাবে একের পর এক পিরামিড তৈরি করা হয়। যাতে ভবিষ্যতে কোনো এলাকাই মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস না করে। মোঙ্গলরা নিশাপুরে ৭ লক্ষ, মার্ভে ১৩ লক্ষ এবং হেরাতে ১৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। ‘গণহত্যা’ বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ তারা জনসংখ্যার নব্বই শতাংশের বেশি মানুষকে হত্যা করে। কয়েক লক্ষ কারিগর, নারী ও শিশুকে দাস বানিয়ে মঙ্গোলিয়ায় নির্বাসিত করে।

চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি হালাকু খান ১২৫৮ সালে বাগদাদ অবরোধ করে। মাত্র তিন দিনের মাথায় খলিফা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠালেন। হালাকু এরপর খলিফার পুরো বাহিনীকে শহর রক্ষা প্রাচীরের বাইরে এসে সমতল ভূমিতে সমবেত হতে নির্দেশ দিলেন। পুরো বাহিনী ভেড়ার পালের মতো সমবেত হওয়ার পর প্রত্যেককে হত্যা করে তাদের লাশ স্তুপীকৃত করা হলো। এরপর মোঙ্গল বাহিনী শহরে প্রবেশ করল। বাগদাদের আট লক্ষ অধিবাসীকে পুতুলের মতো টেনেহিঁচড়ে তাড়িয়ে ব্যাচে ব্যাচে বাইরে এনে হত্যা করা হলো।

ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গীবনের ভাষায়: ‘ধর্ষণ, হত্যা, মানবতার লাঞ্ছনার বিভীষিকা অব্যাহত ছিল ছয় সপ্তাহ। সকল প্রাসাদ, মসজিদ, মাজার আগুন দিয়ে ভস্মীভূত বা ধুলোর সাথে মিলিয়ে দেয়া হলো। হাসপাতালের রোগী, কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রদের কচুকাটা করা হলো। মাজারের ভিতর থেকে দরবেশ ও ধর্মপরায়ণ ইমামদের দেহাবশেষ তুলে এনে ভস্মীভূত করা হলো। একাডেমি ও গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত জ্ঞানের সকল নিদর্শন পুড়িয়ে ছাই করা হলো। সকল বই হয় আগুনে বা টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করা হলো।’

১২৬০ সালে তারা আলেপ্পো (বর্তমান সিরিয়া) আক্রমণ করে। একলক্ষ তরুণী ও কিশোরকে দাস হিসেবে বেছে নিয়ে শহরের বাকি অধিবাসীকে হত্যা করে। দামেস্ক দখলের পর একই ধরনের গণহত্যা চলে পাঁচ দিন।

স্পেনে মুসলিম গণহত্যা
স্পেনে মুসলমানরা প্রবেশ করে উমাইয়া আমলে। পরবর্তী ৭০০ বছরে তারা স্পেনকে পরিণত করে ইউরোপের জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে। কর্ডোভা ও গ্রানাডা হয়ে ওঠে জ্ঞানচর্চায় তখনকার বিশ্বে বাগদাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। খলিফার অধীন মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মায়মোনাইডের মতো ইহুদি দার্শনিকও জ্ঞানগরিমায় বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। মধ্যযুগের ধর্মান্ধতার অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপের জ্ঞানবিজ্ঞানে রেঁনেসার সূচনা হয় এই মুসলিম স্পেন থেকে, কর্ডোভা-গ্রানাডা থেকে।

খ্রিষ্টানদের স্পেন অভিযানের সোজাসাপ্টা বর্ণনা রয়েছে ‘ক্রনিকলস অব আলফানসো সেভেন’-এ ‘খ্রিষ্টান বাহিনী দেশের সবকিছু লুট করে .... সামনে যে গ্রামই পড়েছে তাতে অগ্নিসংযোগ করেছে, মসজিদগুলোকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে, ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী সবাইকে হত্যা করেছে। আঙ্গুর জলপাই ও ডুমুর গাছগুলোকে কেটে ফেলেছে। যেখানেই তাদের পা পড়েছে তারা তা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে।.....’

১৪৯২ সালে খ্রিষ্টান রাজারা যখন মুসলিম স্পেন বিজয় সম্পন্ন করলেন তখন সেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৫ থেকে ৬ লক্ষ। ১৫০১ সালে সেখানে একজন মুসলমানও জীবিত ছিল না। হয় তাদের হত্যা করা হয়েছে, না হয় তাদের জোর করে খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ধ্বংসলীলা: কলম্বাসের নিষ্ঠুরতা
ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল মরিসনের ভাষায়, ‘১৪৯২ সালে হিস্পানিওয়ালা নামে পরিচিত স্বর্ণভূমি এক কলম্বাসের কর্মকাণ্ডে জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৪৯৪ থেকে ১৪৯৬ সালের মধ্যে ঐ অঞ্চলের ৩০ লক্ষ আদিবাসীর এক-তৃতীয়াংশকে হত্যা করা হয় নানাবিধ নির্যাতনের মাধ্যমে। ১৫০৪ সালে বেঁচে থাকা অধিবাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ হাজার। আর ১৫৪৮ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে ৫০০ জনে। স্প্যানিশ বর্বররা নেহায়েত মজা করার জন্যে আদিবাসীদের পেটে ছুরি বসিয়ে দিত। পাথরে গুঁড়িয়ে দিত শিশুদের মাথা। ১৫১৯ সালে মেক্সিকোর আদিবাসী জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি ৫০ লক্ষ। ১৬০৫ সালে তা দাঁড়ায় ১০ লাখে। একই প্রক্রিয়ায় ইংরেজরা আমেরিকা থেকে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের নিশ্চিহ্ন করে। ইংরেজরা অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদেরও নিশ্চিহ্ন করে একই পন্থায়।

ইংরেজদের বাংলা দখল: কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে মারা যায় ১ কোটি মানুষ
ইংরেজরা ১৭৫৭ সালে বিশ্বের ষষ্ঠ সমৃদ্ধশালী অঞ্চল বাংলা দখল করার পর একই প্রক্রিয়ায় হত্যালীলা চালায়। অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজে বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, যা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ হিসেবে কুখ্যাত। তাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। বাংলার জনসংখ্যা তিন কোটি থেকে দুই কোটিতে নেমে আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যুদ্ধ প্রধানত হয়েছে একতরফা। সাধারণভাবে সঙ্ঘবদ্ধ সাহসী প্রতিপক্ষ মূলত আক্রমণ চালিয়েছে সামরিক দিক থেকে দুর্বল বা সংখ্যায় বেশি হলেও ভোগবিলাসে মত্ত প্রতিপক্ষের ওপর। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল প্রধানত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রায় সমানে সমানে লড়াই-বাঘে-মহিষের লড়াই। ব্রিটিশ-ফ্রান্স ও রুশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নব্য জার্মান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন শোষণভূমি বিস্তারের লড়াই। লড়াই কত ভয়াবহ ছিল তা বোঝা যায় ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ এই পাঁচ বছরব্যাপী লড়াইয়ের বিভিন্ন খণ্ডযুদ্ধের হত্যালীলা থেকে।

ব্রিটিশপক্ষ পরিচিত হয় মিত্রশক্তি নামে। জার্মানপক্ষ পরিচিত হয় অক্ষশক্তি নামে। মূল রণাঙ্গন ছিল দুটি। ফ্রান্স-জার্মান রণাঙ্গন পরিচিত হয় পশ্চিম রণাঙ্গন নামে। আর জার্মান-রুশ রণাঙ্গন পরিচিত হয় পূর্ব রণাঙ্গন নামে। যুদ্ধের সরাসরি পরিণতিতে রাশিয়ার জারের পতন ঘটে। তুরস্ক কেন্দ্রিক ওসমানীয় সালতানাতের অবসান ঘটে। পাঁচ বছর মেয়াদি যুদ্ধে অনেকগুলো খণ্ডযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বোঝা যায় প্রতিহিংসার ভয়াবহতা। পূর্ব রণাঙ্গনে ব্রুসিলভ অভিযানে দুই পক্ষে ২৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৮০০ সৈন্য হতাহত হয়। গরলিস-টারনো অভিযানে দুই পক্ষে হতাহত হয় ১০ লক্ষ ৮৭ হাজার সৈন্য আর গালিসিয়ার যুদ্ধে দুই পক্ষে ৬ লক্ষ ৫৫ হাজার সৈন্য হতাহত হয়।

পশ্চিম রণাঙ্গনে ‘শত দিনব্যাপী’ অভিযানে দুই পক্ষে হতাহত হয় ১৮ লক্ষ ৫৫ হাজার ৩৬৯ সৈনিক, বসন্তকালীন অভিযানে দুই পক্ষে ১৫ লক্ষ ৩৯ হাজার ৭১৫ সৈনিক হতাহত হয়। সোম-এর প্রথম যুদ্ধে দুই পক্ষে ১১ লক্ষ ১৩ হাজার সৈনিক হতাহত হয় আর সোম-এর দ্বিতীয় যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত সৈনিকের সংখ্যা ছিল ৮ লক্ষ ৪ হাজার ১০০। ইপসের তৃতীয় যুদ্ধে দুই পক্ষে ৮ লক্ষ ৫৭ হাজার ১০০। ভার্দুনের যুদ্ধে দুই পক্ষে ৬ লক্ষ ৯৮ হাজার সৈন্য হতাহত হয়। মার্নের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত হয় ৫ লক্ষ ১৯ হাজার সৈন্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাজ্যের ৯ লক্ষ, ফ্রান্সের ১৪ লক্ষ, ইতালির ৬ লক্ষ ৫০ হাজার, রাশিয়ার ১৮ লক্ষ সৈন্যসহ মিত্রবাহিনীর নিহত সৈন্যের সংখ্যা ৫৭ লক্ষ ১১ হাজার ৬৯৬। অপরপক্ষে অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ১১ লক্ষ, জার্মানির ২০ লক্ষ ৫০ হাজার, ওসমানীয়-তুরস্কের সাত লক্ষ ৫০ হাজার সৈন্যসহ অক্ষশক্তির নিহত সৈন্যসংখ্যা ৪০ লক্ষ ১০ হাজার ২৪১। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উভয়পক্ষে এককোটি সৈন্য নিহত এবং দুই কোটি সৈন্য আহত হয়। এর সাথে প্রাণ হারায় আরো এককোটি বেসামরিক নাগরিক। এই ঘাতক যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের মর্মস্পর্শী বিবরণ উঠে এসেছে জার্মান ঔপন্যাসিক এরিক মারিয়া রেমার্কের লেখা ‘অল কোয়াইট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এ।

জাপানিদের ধ্বংসলীলা
১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে জাপানি আগ্রাসন ও চীনের নানজিং শহরের ধ্বংসলীলা ও গণহত্যার কথা সবারই জানা। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, এ হত্যাযজ্ঞকে জাপানি সৈন্যরা খেলায় রূপান্তরিত করেছিল। ৭ ডিসেম্বর ‘টোকিও নিচি নিচি শিম্বুন’ পত্রিকা সাধারণ মানুষের হত্যার প্রতিযোগিতাকে একটি ক্রীড়া সংবাদের মতো করেই প্রকাশ করে: ‘সাব-লেফটেন্যান্ট মুকাই এবং সাব-লেফটেন্যান্ট নোডা তরবারি যুদ্ধে সবচেয়ে কম সময়ে ১০০ চীনাকে হত্যা করে কে প্রথম হতে পারে সে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে দুজনই হাড্ডাহাড্ডি লড়ে যাচ্ছেন।’

এক সপ্তাহ পরে পত্রিকাটি আবার রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, শত জনকে হত্যা করার পরে কে প্রথম হয়েছেন এ ব্যাপারে একমত হতে না পারায় তারা নতুন করে তাদের টার্গেট ঠিক করেছেন ১৫০ জন। হত্যা করার ক্ষেত্রে জাপানি সৈন্যরা নিত্যনতুন পদ্ধতি অবলম্বন করত। একদিন তারা ১৩ শত চীনা সৈন্য ও নাগরিককে প্রথমে মাঠে নিয়ে গিয়ে ভূমি মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছিন্নভিন্ন করল। তারপর পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করল। তারপরও যারা বেঁচে ছিল, তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করল।

একজন জাপানি সাংবাদিক এ নির্মমতার ব্যাখ্যা চাইলে কর্নেল তানাকা বলেন, দেখ, তুমি ওদের মানুষ মনে করতে পারো। কিন্তু আমি ওদের ‘শুয়োর’ মনে করি। আর শুয়োরের সাথে যে-কোনো আচরণই করা যায়। জাপানি সৈন্যদের হাতে লক্ষ লক্ষ নারী ভয়াবহভাবে নির্যাতিতা হয়েছে। ধর্ষণের পর নির্মম নির্যাতন করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। একজন জাপানি সেনা তাদোকোরো কোজো, তার নিজের স্বীকারোক্তি--নারী, তার বয়স কম হোক বা বেশি, ধর্ষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। আমরা শহরের রাস্তায় বা গ্রামে ট্রাক পাঠাতাম পর্যাপ্তসংখ্যক নারীকে ধরে আনার জন্যে। তারপর প্রত্যেককে দিয়ে দিতাম ১৫ থেকে ২০ জন সৈন্যের হাতে যা খুশি করার জন্যে।

আরেকজন জাপানি সৈন্য আজুমা শিরোর স্বীকারোক্তি: ‘আমরা যদি শুধু ধর্ষণ করতাম তা-হলে ঠিক ছিল। যদিও ঠিক ছিল বলা উচিত নয়। কিন্তু আমরা সবসময় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করতাম। কারণ লাশ কখনো কথা বলবে না।’ জাপানি সৈন্যরা ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত চীনে ৩৭ লক্ষ সৈন্যসহ দুই কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। কোরিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ৫ লক্ষ সৈন্যসহ ৫০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। অর্থাৎ জাপানিরা হত্যা করে তিন কোটিরও বেশি মানুষ।

জাপানে মার্কিনী ধ্বংসলীলা
পার্ল হারবার বিপর্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে ধ্বংস করার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। জেনারেল ম্যাকআর্থারের নেতৃত্বে মার্কিনীরা জাপানিদের মতোই নৃশংস হত্যা ও ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। নৃশংসতায় কোনো অংশেই তারা জাপানিদের চেয়ে কম ছিল না। নাগাসাকি ও হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমার বিভীষিকার কথা আমরা জানি। কিন্তু টোকিওতে বোমাবর্ষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে কম মানুষই জানে। ১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ দিবাগত রাতে এক হামলায় ৩৩৪টি বি-২৯ বোমারু বিমান ৪ লক্ষ ৯৬ হাজার পাউন্ড আগুনে-বোমা বর্ষণ করে টোকিওর ওপর। টোকিও শহরের ভবনগুলো ছিল প্রধানত কাঠনির্মিত।

তাই দাবানলের মতো আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে পুরো শহর পরিণত হয় জ্বলন্ত চিতায়। লক্ষাধিক মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আহত হয় দশ লক্ষাধিক। ধ্বংস হয় ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি। টোকিও, নাগয়া, ওসাকা, কোবে-সহ প্রতিটি শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করাই ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর লক্ষ্য। বিমান বাহিনী গর্বভরে তাদের অর্জনের ঘোষণা দেয়: ‘পাঁচ মাসের বোমা বর্ষণে নিহত হয়েছে ৩ লক্ষ ১০ হাজার জাপানি, আহত হয়েছে ৪ লক্ষ ১২ হাজারের বেশি, গৃহহারা হয়েছে ৯২ লক্ষ। .... যুদ্ধের ইতিহাসে কখনো বিজয়ীরা এত কম খরচে শত্রুর ওপর এমন ধ্বংসলীলা চালাতে পারে নি। .... পাঁচ মাসে ৬৫টি জাপানি শহরকে চিতাভস্মে পরিণত করা হয়েছে।’ যুদ্ধে নিহত জাপানি সৈন্যের সংখ্যা ২১ লক্ষ ২১ হাজার। নিহত নাগরিকের সংখ্যা ৮ লক্ষ। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: দুই দানবীয় শক্তির বিভীষিকা
দানবীয় যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে। জার্মানরা পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করার পর পরই রাশিয়া পূর্বদিক থেকে আক্রমণ করে। দেশটিকে নিজেদের মধ্যে দুভাগ করে নেয়। তারা ধ্বংসলীলার পাশাপাশি পোল্যান্ডের ১৫ শতাংশ অধিবাসীকে হত্যা করে। পোল্যান্ড দিয়ে শুরু। তারপর জার্মান নাজী বাহিনী ইউরোপের প্রায় সবটাই দখল করে ফেলে। ১৯৪৫ সালে বার্লিনের পতন না হওয়া পর্যন্ত দানবীয় ধ্বংসলীলা অব্যাহত রাখে।

যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ধ্বংসলীলার খলনায়ক ছিল জার্মানি। আর যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ধ্বংসলীলার খলনায়ক ছিল ইঙ্গ-মার্কিন ও সোভিয়েত কম্যুনিস্ট বাহিনী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এটিও মূলত বিভক্ত ছিল পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে। জার্মানরা প্রথমে হত্যা-ধর্ষণ ও ধ্বংস করতে করতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল পদানত করেছে। ইঙ্গ-মার্কিন ও সোভিয়েত শক্তিও একই প্রক্রিয়ায় বার্লিনের পতন ঘটিয়েছে।

হতাহতের চিত্র, ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা
পাঁচ বছরব্যাপী এই দানবীয় যুদ্ধের পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে অনেকগুলো খণ্ডযুদ্ধে হতাহতের চিত্র থেকেই বোঝা যেতে পারে ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা। পূর্ব রণাঙ্গনে মস্কোর যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত সৈনিকের সংখ্যা ১০ লক্ষ; স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ১৮ লক্ষ; নার্ভার যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ৫ লক্ষ ৫০ হাজার; খারকভের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ৩ লক্ষ; কার্স্ক-এর যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ২ লক্ষ ৫৭ হাজার। আর পশ্চিম রণাঙ্গনে ফ্রান্সের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ৪ লক্ষ ৬৯ হাজার; বালজের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ১ লক্ষ ৮৭ হাজার। আর বার্লিনের যুদ্ধে দুই পক্ষে হতাহত ১৩ লক্ষ। এই দানবীয় যুদ্ধে ইউরোপে ১ কোটি ৭৮ লক্ষ ৭৭ হাজার সৈন্য নিহত হয়। মিত্র বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ৭ লক্ষ ৭৪ হাজার। আর নাজী বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ৭১ লক্ষ ৩ হাজার। নিহতের মধ্যে ৫৩ শতাংশ রাশিয়ান লালফৌজের এবং ৩৫ শতাংশ জার্মান নাজী বাহিনী। জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধে হতাহত সৈন্যের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লক্ষ ৭৬ হাজার যা ইউরোপে হতাহত সৈন্যের ৭৮ শতাংশ। 

হিটলারের জার্মানি যুদ্ধে যে হিংসার আগুন জ্বালিয়েছিল, তার প্রতিহিংসার আগুনে জার্মানি পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। ৬০ লক্ষ ইহুদিসহ ইউরোপে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ২৫ লক্ষের ওপরে। সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা সাত কোটির ওপরে। মানবতার লাঞ্ছনার সবচেয়ে বীভৎসরূপ আমরা দেখি এই দানবীয় যুদ্ধে। রাশিয়ার স্ট্যালিনের লালফৌজের হাতে বার্লিনের পতনের পর কোনো জার্মান নারীই ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পায় নি, তার বয়স আট হোক বা আশি। সোভিয়েত যুদ্ধ-সংবাদদাতা নাটালিয়া গেসে পরবর্তী সময়ে বলেন, ‘এটা ছিল একটা ধর্ষক বাহিনী।’ ‘বাস্টার্ডস, দি চিলড্রেন অব অকুপেশন ইন জার্মানি আফটার নাইনটিন ফরটি ফাইভ’ গ্রন্থে জার্মান ঐতিহাসিকরা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকৃত জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী কমপক্ষে ৪ লক্ষ শিশুর পিতা হচ্ছে--সোভিয়েত রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফরাসি অজ্ঞাতনামা সৈনিকেরা।

যুদ্ধবন্দি: জার্মান নৃশংসতা
১৯৪১ সালের জুন মাসে ‘অপারেশন বারবারোসা’ নাম দিয়ে রাশিয়া আক্রমণের প্রথম আট মাসেই জার্মান নাজী বাহিনী ২০ লক্ষ সোভিয়েত বন্দিকে হত্যা করে। অগ্রাভিযান দ্রুততর করার জন্যে জার্মানরা প্রথম কয়েক সপ্তাহে কমপক্ষে ছয় লক্ষ আত্মসমর্পণকারী সোভিয়েত সৈনিককে হত্যা করে। তাদের বন্দি করার পর পরই লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। আত্মসমর্পণকারী আহত ও অসুস্থ সোভিয়েত সৈন্যদের জার্মানরা রণক্ষেত্রেই গুলি করে হত্যা করত। ১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বর, হেরমান গোয়েরিং সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন দুর্বল ও রুগ্ন বন্দিদের খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার। এতে ২০ লক্ষ বন্দি মারা যায়। বন্দিদের খাবার ও পানি ছাড়াই কখনো কখনো ২০ ঘণ্টা কাজ করানো হতো।

মৃত্যু ত্বরান্বিত করার জন্যে অনেককে বুশেনওয়াল্ড বা অশউইৎজের বন্দিশিবিরে প্রেরণ করা হতো। সেখানে তাদেরকে বিভিন্ন রাসায়নিক পরীক্ষায় গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে পরে হত্যা করা হতো। প্রচণ্ড শীতে অভুক্ত থেকে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাওয়ার চেয়ে এক বন্দিশিবিরের বন্দিরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করার লিখিত আবেদন জানায় জার্মান সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে। গুলি, গ্যাস চেম্বার বা শীতে অভুক্ত রেখে জার্মানরা ৩১ লক্ষ সোভিয়েত যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করে।

যুদ্ধবন্দি হত্যার ক্ষেত্রে স্ট্যালিনের লালফৌজও একই নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে। প্রতিশোধ নিতে তারা অধিকাংশ সময়ই জেরা করার পর পরই জার্মান বন্দিকে গুলি করে হত্যা করত। স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধে আত্মসমর্পণের পর পরই আহত জার্মান সৈন্যদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ১ লক্ষ ১০ হাজার সৈন্যকে বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়। যুদ্ধ শেষে মাত্র ৫ হাজার জার্মান সৈনিক দেশে ফেরে। জার্মানরা রুশ বন্দিদের সাথে যে আচরণ করেছে, আমেরিকানরা জাপানি বন্দিদের সাথে একই ধরনের আচরণ করেছে। জাপানিদের মার্কিন সৈন্যরা পশুর চেয়েও অধম মনে করত।

যুদ্ধ সংবাদদাতা এডগর জোনস পরবর্তীকালে বলেন, ‘আমরা ঠান্ডা মাথায় বন্দিদের হত্যা করেছি, হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়েছি, সমুদ্রে লাইফ বোটের ওপর বিমান থেকে মেশিনগানের গুলি ছুড়ে ঝাঁজরা করে দিয়েছি, আহত শত্রুদের শেষ করে দিয়েছি।’ মার্কিনী অগ্রাভিযান সবসময়ই একইরকম ছিল। সিসিলি অভিযানকালে জেনারেল জর্জ প্যাটন সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা শত্রুর প্রতি কোনো দয়া প্রদর্শন করব না। যখন তুমি শত্রুর দুই শত গজের মধ্যে চলে যাবে তখন যদি দেখ যে, সে আত্মসমর্পণ করতে চাচ্ছে, না! না! তুমি অবশ্যই জারজটাকে হত্যা করবে। বেয়নেট ঢুকিয়ে দেবে তার পাঁজরের মধ্য দিয়ে তার কলিজায়।’ রাইন নদী অতিক্রমকালেও নির্দেশ ছিল, ‘কাউকে বন্দি করবে না’ অর্থাৎ ‘হত্যা করবে’।

বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার জেনারেল আইজেনহাওয়ারের সরাসরি নির্দেশে জার্মান বন্দিদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছিল তার সারাংশ পাওয়া যায় জেমস বাকুর লেখা ‘আদার লসেস’ বই-এ কর্নেল আর্নেস্ট এফ. ফিশার-এর ভূমিকায়। কর্নেল আর্নেস্ট ফিশার ১৯৪৫ সালে জার্মানিতে মার্কিন সৈন্যদের অসদাচরণের তদন্ত টিমের সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে সিনিয়র ঐতিহাসিক হিসেবে কাজ করেন।

‘আদার লসেস’ বইয়ের ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘আত্মসমর্পণকারী ৫০ লক্ষাধিক জার্মান সৈন্যকে মার্কিন ও ফরাসি অধিকৃত এলাকায় তারকাঁটার বেড়ার খাঁচায় ঠাসাঠাসি করে জড়ো করা হয়। অধিকাংশই একজনের গায়ের সাথে আরেকজন লেগে থাকে। তাদের পায়ের নিচের মাটি দ্রুতই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। খোলা আকাশের নিচে, প্রাথমিক স্যানিটারি সুযোগ থেকে বঞ্চিত আর অর্ধাহার। বন্দিরা মারা যেতে শুরু করল ক্ষুধা আর রোগে। ১৯৪৫-এর এপ্রিল থেকে মার্কিন ও ফরাসি বাহিনী ১০ লক্ষাধিক জার্মান বন্দিকে এই প্রক্রিয়ায় হত্যা করে।’

জেমস বাকু তার বইয়ে বলেন, যুদ্ধাবসান পরবর্তী পাঁচ বছরে মিত্রবাহিনী ‘না খাইয়ে মারো’ এবং ‘বহিষ্কার করো’ নীতির মাধ্যমে ৮২ লক্ষাধিক জার্মান বেসামরিক নাগরিক ও অভ্যন্তরীণ শরণার্থীকে হত্যা করে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও মার্কিন বাহিনীর নির্মমতা কোনো অংশেই নাজী বাহিনীর চেয়ে কম ছিল না। জাপানি ঐতিহাসিক জুকি তানাকা বলেন, ‘নরমাংস ভোজন প্রায়শই ছিল কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশে পরিচালিত সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম।’

জাপানিদের হাতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের অনেকেই এসব ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। ‘ধৃত একজন মার্কিন পাইলটকে প্রথমে ধড় থেকে মাথা আলাদা করা হয়। তারপর অন্য জাপানিরা হাত পা নিতম্ব থেকে মাংস কেটে নিজ নিজ কোয়ার্টারে নিয়ে গেল ..... তারা সে মাংস ছোট ছোট টুকরো করে ভেজে খেলো। ..... জাপানিরা বন্দিশিবির থেকে প্রত্যেকদিনই স্বাস্থ্যবান দেখে বন্দি বাছাই করে নিয়ে যেত। হত্যা করত এবং খেতো। অনেক সময় জীবিত অবস্থায়ই তাদের শরীর থেকে যতটা ইচ্ছা মাংস কেটে নিয়ে তাকে গর্তে নিক্ষেপ করা হতো। সেখানে সে ছটফট করে মারা যেত। নরমাংস ভোজনের জন্যে ১৯৪৬ সালে দণ্ডিত সবচেয়ে সিনিয়র জাপানি অফিসার হচ্ছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইউশিয়ো তাচিবানা।

একজন বন্দি মার্কিন বৈমানিককে গলা কেটে হত্যা করে তার মাংস রান্না করে খাওয়ার জন্যে তাচিবানা ও তার ১১ জন সহযোগীকে দণ্ডিত করা হয়। তাচিবানাকে ফাঁসি দেয়া হয়, বৈমানিককে হত্যা করা এবং সম্মানজনকভাবে তাকে সমাধিস্থ করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করার অপরাধে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ তাচিবানাকে ফাঁসি দেয়। অবশ্য উচিত শাস্তি হয়েছে। মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অভিযানকালে প্রায়শই জাপানি সৈন্যদের মৃতদেহের অঙ্গচ্ছেদন করা হতো। মাথার খুলিকে স্মারক চিহ্ন হিসেবে নেয়া ছাড়াও দাঁত, কান, নাক এমনকি হাতও কেটে রেখে দেয়া হতো স্মারক চিহ্ন হিসেবে। শত্রুর মাথার মাংস-সহ খুলি সিদ্ধ করার ঘটনা প্রায়শই ঘটত। এই অঙ্গচ্ছেদন এত ব্যাপক ছিল যে, ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ বাধ্য হয়েছিল অঙ্গচ্ছেদন না করার নির্দেশনা জারি করতে।

নেভাদা ডেইলি মেইল ১৯৪৪ সালের ১৩ জুন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, ‘কংগ্রেস সদস্য ফ্রান্সিস ওয়াল্টার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে এক জাপানি সৈনিকের হাতের হাড় থেকে তৈরি ‘লেটার ওপেনার’ উপহার হিসেবে দিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য তখন ‘জাপানি কঙ্কালের এত ছোট (!) একটি অংশ’ উপহার দেয়ার জন্যে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘এ ধরনের উপহার পেতে আমি পছন্দ করি এবং এ ধরনের উপহার আরো প্রচুর আসবে।’ অবশ্য পরে এ নিয়ে বিবেকবান মানুষেরা দেশব্যাপী ক্ষোভ প্রকাশ করলে রুজভেল্ট কঙ্কালের অংশটি সমাধিস্থ করার নির্দেশ দেন। আধুনিককালেও একজন পরাশক্তি প্রধান প্রকাশ্যে কতটা মানবিকতাশূন্য হতে পারেন রুজভেল্টের ঘটনা তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা বিজিত দেশের মানুষের সাথে যে আচরণ করেছে, তা বোঝার জন্যে আরো উদাহরণ উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বিজিত অঞ্চলের মানুষের সাথে নবীজীর আচরণের তুলনা করলেই আমরা মানবিকতা ও বর্বরতা, সভ্যতা ও অসভ্যতা, সমমর্মিতা ও নৃশংসতার পার্থক্য বুঝতে পারব। খায়বরে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। নিহত ইহুদিদের কবরস্থ করার ব্যবস্থা হচ্ছে।

বেলাল বন্দি সাফিয়া বিনতে হুয়াই ও তার চাচাতো বোনকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। যাওয়ার পথে যাতে তারা ইহুদিদের মৃতদেহগুলো দেখতে পায় বেলাল পরিকল্পিতভাবেই সেপথেই নিয়ে গেলেন। মৃতদেহগুলো দেখামাত্রই সাফিয়ার চাচাতো বোন চিৎকার করে কান্না ও বিলাপ শুরু করে দিল। নবীজী বেলালের এই আচরণের কথা জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হলেন। বেলালকে খুব কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বললেন, ‘তুমি কি দয়ামায়া শূন্য? একজন তরুণীকে তুমি লাশের কাছে নিয়ে গিয়েছ?’ বেলাল নবীজীর কাছে ক্ষমা চাইলেন।

তিনি বললেন, আপনি যে এ-কাজটি অপছন্দ করবেন আমি তা ভাবতে পারি নি। বরং আমি মনে করেছি নিজ গোত্রের লোকদের মৃতদেহ দেখাটা তাদের জন্যে কল্যাণকর হতে পারে। নবীজীর কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন, ভবিষ্যতে কখনো তিনি এ ধরনের কাজ করবেন না। মানবীয় দিকগুলো বিবেচনায় না রাখার জন্যে নবীজী তাঁর একেবারে প্রথম দিককার সাহাবীকেও তিরস্কার করতে ছাড়েন নি। তিনি সুস্পষ্ট করে দিলেন যে, ‘ইহুদিরা ইসলামের কট্টর দুশমন’ এই বিষয়টি কখনোই তাদের সাথে নির্দয় ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি হতে পারে না।

কঠিন লড়াই শেষে শ্রান্ত মুসলমানরা যুদ্ধাবসানে খায়বরে কয়েকদিন অবস্থান করেন। ইহুদিদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সবধরনের সৌজন্য প্রদর্শন করা হয়। খায়বরের যুদ্ধে নিহত ইহুদি দলপতি সাল্লাম ইবনে মিশকাম-এর বিধবা স্ত্রী জয়নব বিনতে হারিস নবীজীকে আপ্যায়নের প্রস্তাব করেন। নবীজী পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো উন্নত করার জন্যে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। নবীজীর জন্যে ভেড়ার রোস্ট তৈরি করবেন। ভেড়ার কোন অংশ নবীজী পছন্দ করেন এটাও তিনি জেনে নেন। জয়নব ভেড়ার রোস্ট করার পর এতে ভালোভাবে বিষ মেশান। ঘাড়ের মাংসে মেশান অতিরিক্ত বিষ। এরপর নিজে রোস্ট নিয়ে হাজির হন।

ঘাড়ের মাংসের একটি টুকরোর এক কামড় মুখে নিয়ে চিবোতে গিয়ে নবীজীর কাছে বিস্বাদ লাগে। তিনি থুথু করে সবটুকু মাংস ফেলে দিলেন। সবাইকে সতর্ক করে বলেন, ‘মাংসের টুকরোটি আমাকে বলছে এতে বিষ দেয়া হয়েছে।’ সেখানে উপস্থিত থাকা সাহাবীদের মধ্যে বিশর ইবনে আল-বারা কিছু বোঝার আগেই এক টুকরো মাংস চিবিয়ে গিলে ফেলেন। সাথে সাথে তার শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়। মহিলাকে ডেকে পাঠানো হয়। ভেড়ার মাংস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিষ প্রয়োগের কথা স্বীকার করেন। তিনি নবীজীকে বলেন, ‘আপনি আমাদের পরাভূত করেছেন। আমি চিন্তা করলাম আপনি যদি রাজা হন, তবে আমি আমার প্রতিশোধ নিতে পারব এবং আপনার হাত থেকে মুক্তি পাব। আর আপনি যদি সত্যিকার নবী হন, তবে আপনি অবশ্যই বিষ সম্পর্কে গায়েবে খবর পাবেন।’

নবীজী তাকে ক্ষমা করে দিলেন। অবশ্য নবীজী কখনোই তাঁকে কষ্ট দেয়ার জন্যে কাউকে শাস্তি দেন নি। বিষক্রিয়ার দুই দিন পর বিশর ইবনে আল-বারার মৃত্যু হলে জয়নবকে এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। খায়বরের আত্মসমর্পণের পর শুধু দুই ব্যক্তিকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিনানা ইবনে রাবিকে স্ব-স্বাক্ষরিত চুক্তিভঙ্গের পরিণতিতে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি জয়নব বিনতে হারিসকে বিষ প্রয়োগে সাহাবী বিশর ইবনে আল বারাকে হত্যার দায়ে।

শান্তিচুক্তি অনুসারে খায়বরের ইহুদিরা তাদের খামার বাগান আবাদ করার অধিকার লাভ করেছিল। তাদের সাথে মুসলমানদের আচরণ কেমন ছিল! শর্ত ছিল আধাআধি ভাগ। ফসল তোলার মৌসুমে নবীজী তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহকে খায়বরে পাঠাতেন। তিনি ফসলকে দুভাগ করতেন। তারপর ইহুদিদের বলতেন, যে ভাগটা তোমাদের পছন্দ সেটা তোমরা নাও। ফলনের প্রথম বছরই এমন সুবিচার পেয়ে তারা বিস্মিত হয়। 

খায়বরের যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন দুর্গের পতনের পর অন্য সবকিছুর সাথে সেখানে রক্ষিত তাওরাতের কপিগুলো স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের দখলে চলে আসে। নবীজী তাওরাতের সকল কপি সসম্মানে ইহুদিদের কাছে প্রত্যর্পণ করেন। খায়বরের পতনের খবর আরবভূমির ইহুদি বসতিগুলোয় এক আতঙ্কানুরণন সৃষ্টি করে। তারা ভাবতে শুরু করে যে, মুসলমানদের সাথে লড়াই করে কোনো লাভ নেই। নিকটবর্তী ফাদাক এলাকার ইহুদিরা নবীজীর কাছে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। তারা প্রস্তাব করে যে, খায়বর যে শর্তে শান্তিচুক্তি করেছে আমরাও একই শর্তে শান্তিচুক্তি করতে চাই। নবীজী তাদেরকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দান করলেন।

ফলে কোনো লড়াই ছাড়াই ফাদাক বিজিত হলো। ফাদাকের পুরো সম্পদের মালিকানা বর্তাল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবীজীর ওপর। খায়বর থেকে নবীজী জনযোদ্ধাদের নিয়ে ইহুদিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ওয়াদি আল-কুরায় উপস্থিত হলেন। ইহুদিরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারা অবিশ্রান্ত তীর নিক্ষেপ করে এই বাহিনীকে স্বাগত জানাল। নবীজী ওয়াদি আল-কুরায় অবরোধ আরোপ করলেন। কয়েকদিন অবরোধের পর তারাও খায়বরের শর্তে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করল। এরপর অবশিষ্ট ইহুদি জনপদ তায়মা কোনো যুদ্ধ ছাড়াই স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করল।

তায়মার আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আরবে ইহুদিদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অবসান ঘটল। ইহুদিদের রাজনৈতিক সামরিক ক্ষমতার অবসানের ফলে মদিনা পরিণত হলো এক নিরাপদ অঞ্চলে। কারণ তাদের তিন শত্রুর দুই শত্রুই এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। দক্ষিণ ও উত্তর এখন নিরাপদ। বাকি রইল পূর্বদিকের গাতাফানরা।

খায়বর বিজয়ের সাথে সাথেই মুসলমানদের জন্যে অপেক্ষা করছিল আরেক আনন্দ বিস্ময়! নবীজীর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব হিজরতের ১৫ বছর পর আবিসিনিয়া থেকে এসে নবীজীর সাথে মিলিত হলেন। জাফরের সাথে ১৬ জন পুরুষ ও কয়েকজন নারী ছিলেন। সেইসাথে ছিলেন আবিসিনিয়া ও ইয়েমেনের কয়েকজন বিশ্বাসী। নবীজী তাদের প্রত্যাবর্তন করতে বলার পর তারা ফিরে আসেন। নবীজী জাফরকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন। বলেন, খায়বর বিজয়, না জাফরের আগমন কোনটা আমাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। নবীজী আনন্দে জাফরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং কপালে চুমু খান। আবিসিনিয়া থেকে ফিরে আসা হিজরতকারী প্রত্যেককেই খায়বরের বিজয়ী যোদ্ধাদের মতো যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সমান অংশ প্রদান করেন। 

খায়বর অভিযানকালে হারাম করা হয়:
১. পাঞ্জা-নখ দ্বারা যে সব পাখি শিকার ধরে সেগুলোর মাংস।

২. হিংস্র জীবজন্তুর মাংস।

৩. গাধা ও খচ্চরের মাংস।

৪. মোতা ব্যবস্থাও (অর্থাৎ সফরকালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে বিয়ে) এসময় নিষিদ্ধ করা হয়।

দশম স্ত্রী সাফিয়া: 
খায়বর বিজয়ের পর বিজিত ইহুদিদের সাথে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই বিধবা জয়নবের দাওয়াত নবীজী কবুল করেছিলেন। কিন্তু জয়নবের বিশ্বাসঘাতকতা-নবীজীকে বিষ প্রয়োগে হত্যাচেষ্টা এই উদ্যোগকে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইহুদিদের ব্যাপারে মুসলমানদের যতটুকু আশাবাদ ছিল, তা-ও নষ্ট হয়ে যায়। ইহুদিরা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত কখনোই মুসলমানদের শান্তিতে থাকতে দেবে না- এই ধারণা দূর করে সম্প্রীতি স্থাপনের লক্ষ্যেই তিনি সাফিয়া বিনতে হুয়াইকে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব করেন। 

সাফিয়া মদিনার বনু নাদির গোত্রপ্রধান হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা। নবীজী মদিনায় পৌঁছার পর থেকেই হুয়াই ইসলাম বিরোধিতায় সর্বাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত হন। নবীজীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের দায়ে বনু নাদিররা মদিনা থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর হুয়াই খায়বরে ঘাঁটি গাড়েন। ইসলাম বিরোধীদের একত্র করে মদিনা আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী তাকেই বলা যায়। বনু কোরাইজাকে নবীজীর সাথে মৈত্রীচুক্তি বাতিলেরও মূল উস্কানিদাতা তিনিই। বনু কোরাইজার যুদ্ধাপরাধীদের সাথে তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সাফিয়ার প্রথম স্বামী ছিলেন ইহুদি নেতা সাল্লাম ইবনে মিশকাম। তার সাথে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তার দ্বিতীয় স্বামী ইহুদি নেতা কিনানা ইবনে আল-রাবি। প্রথম স্বামী খায়বরের যুদ্ধে নিহত হন। দ্বিতীয় স্বামী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।

তখনকার আরব সমাজে গোত্রপ্রধানদের পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক আসলে গোত্রগত মৈত্রীর প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। নবীজী তাঁর অন্যান্য স্ত্রীর সমমর্যাদায় আসীন করার উদ্দেশ্য নিয়েই সাফিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি তাকে মুক্ত করে দিয়ে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন নিজ গোত্রে ফিরে যাওয়ার অথবা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করার। সাফিয়া আন্তরিকভাবেই বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দেন। বিয়ে সম্পন্ন হলো। এ বিয়ের মধ্য দিয়ে আবারও নবীজী ইহুদিদের সাথে মৈত্রীর বার্তাই প্রদান করলেন। আসলে একজন মানুষ কতটা মানবিক, সাহসী ও শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার কল্যাণকামী হলে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, তা আমরা সহজেই আঁচ করতে পারি। 

নিহত এক গোত্রপ্রধানের স্ত্রী কর্তৃক বিষ প্রয়োগে হত্যা প্রচেষ্টার কয়েকদিনের মাথায় অপর নিহত গোত্রপ্রধানের বিধবাকে বিয়ে করা নিয়ে মুসলিম শিবিরে শঙ্কার কোনো কমতি ছিল না। বিয়ের রাতে নবীজী যে তাঁবুতে ছিলেন, সে তাঁবুর কাছে আবু আইয়ুব আনসারী সারারাত নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে জেগে ছিলেন। নবীজী ভোরবেলায় আবু আইয়ুবকে এই অবস্থায় দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে তিনি বললেন, আমি আশঙ্কা করছিলাম, এই মহিলা স্বামী ও পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আপনার ওপর হামলা চালাতে পারে।

একদিন ঘরে ঢুকে নবীজী দেখেন, সাফিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তিনি কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সাফিয়া বললেন, আয়েশা এবং হাফসা দুজনই বলছে, স্ত্রী হিসেবে তারা মর্যাদায় তার চেয়ে অনেক উঁচুতে। কারণ তারা দুজনই আল্লাহর রসুলের দূরবর্তী চাচাতো বোন। রসুল অন্য কোনো কারণে নয়, তাদেরকে বিয়ে করেছেন তাদের ব্যক্তিত্বের কারণে। নবীজী তখন তাকে বললেন, তুমি কেন জবাবে বললে না যে, ‘তোমরা কীভাবে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হও? আমার বাবা হচ্ছেন হারুন, চাচা হচ্ছেন মুসা (বংশ পরম্পরায় শেষ সূত্র), আর স্বামী হচ্ছেন মুহাম্মদ (স)?’

সাফিয়া আমৃত্যু নবীজীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। নবীজীর শেষ অসুস্থতার সময় তাঁর চারপাশে সকল স্ত্রীরা সমবেত হয়েছেন। সাফিয়া তখন বেদনার্ত কণ্ঠে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! যে রোগে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন, তা আপনার না হয়ে আমার হলে আমি আন্তরিকভাবেই খুশি হতাম।’ নবীজীর অন্য বিবিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। তাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে নবীজী বললেন, ‘তোমরা এ কথায় একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালে! আল্লাহর শপথ! আমি জানি সাফিয়া সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত।’ 

সাহাবীদেরও সাফিয়া খুবই সম্মান করতেন। কারণ তিনি জানতেন নবীজী তাদের কত ভালবাসতেন। এ কারণে বিদ্রোহীরা যখন উসমান ইবনে আফফানের ঘর অবরোধ করে খাবার ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি তার ঘর থেকে পেছনের দরজা দিয়ে লুকিয়ে খাবার পানি নিয়ে উসমানের ঘরে দিয়ে আসতেন। সাফিয়া ৫২ হিজরি পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তাকে উম্মুল মোমেনিনদের পাশে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।

শান্তি বা সংঘর্ষ- নবীজীর রণকৌশল ছিল মূলত অহিংস ও মনস্তাত্ত্বিক। তাঁর কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের হৃদয়কে জয় করা, দেশ জয় বা মানুষকে পদানত করা নয়। হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরই মক্কা আক্রান্ত হয় ভয়াবহ খরায়। সৃষ্টি হয় খাদ্য সঙ্কট। মক্কার খাবারের একটা বড় অংশ আসত ইয়ামামা গোত্রের অঞ্চল থেকে। তারা মক্কার ওপর বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে। ফলে মক্কায় দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ সম্মুখীন হয় নিদারুণ কষ্টের। নবীজী ইয়ামামা গোত্রের সাথে মধ্যস্থতা করে অবরোধ তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করেন। সেইসাথে বিপুল ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর নির্দেশ দেন।

খায়বর থেকে মুহাম্মদ বায়তুল মালের জন্যে প্রাপ্ত সম্পদ থেকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা (যা সে সময়ের তুলনায় অনেক অর্থ), মদিনার সবচেয়ে সুস্বাদু খেজুরসহ কয়েকশত উট বোঝাই বিপুল ত্রাণসামগ্রী দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টন করার জন্যে মক্কার তখনকার নেতা আবু সুফিয়ান, সুহাইল ইবনে আমর এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নামে প্রেরণ করেন। মদিনা থেকে আমর ইবনে উমাইয়া ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এদের কাছে পেশ করলে সুহাইল ইবনে আমর ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তা গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকার করেন। আবু সুফিয়ান ত্রাণ গ্রহণে দ্বিধান্বিত ছিলেন। পরে নবীজী এর বিনিময়ে চামড়া প্রেরণের প্রস্তাব দিলে আবু সুফিয়ান ত্রাণ গ্রহণ করেন। মক্কার দরিদ্র সাধারণের মধ্যে তা বণ্টন করেন।

যে মক্কাবাসীরা ২০ বছর তার অনুসারীদের দৈহিকভাবে নির্যাতন করেছে, হত্যা করেছে, তাদের দেশ ছাড়া করে সকল সম্পত্তি নিজেরা আত্মসাৎ করেছে, তাদের এই দুর্দিনে তিনিই এগিয়ে গেছেন ত্রাণ নিয়ে। কতটা সমমর্মী ও শান্তিবাদী হলে এটা সম্ভব তা আমরা সহজেই আঁচ করতে পারি। 

হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তির একবছর পূর্তি হলো। আরবের রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। নবীজী এখন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ফেরারি বিদ্রোহী নন। তিনি তৃতীয় পক্ষ নন বরং রাজনৈতিক সমীকরণে এখন প্রথমপক্ষ। নতুন পরিস্থিতিতে তিনি ঘোষণা দিলেন ওমরাহ হজের। হুদায়বিয়ায় যারা তাঁর সাথে ছিলেন সবাই এবারও যাবেন তার সাথে। মৃতরা বাদে পুরাতন সবাই তাঁর সাথি হলেন। নতুন সাথি যুক্ত হলেন আরো কয়েকশ। নারী ও শিশু ছাড়াই সংখ্যা দাঁড়াল দু’হাজার। মদিনা থেকে যাত্রা করার সময় সাথে নিলেন ১০০ ঘোড়া। আর আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ঢাল শিরস্ত্রাণ বর্ম ও অস্ত্রসম্ভার।

কারণ শান্তিচুক্তি অনুসারে মুসলমানরা শুধু কোষবদ্ধ তরবারি নিয়েই মক্কায় প্রবেশ করার কথা। কিন্তু কোরাইশরা যদি চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণ করে বসে, তখন তার মোকাবেলার জন্যেই এই প্রস্তুতি। নবীজী মক্কার কাছাকাছি ইজাজ নামক স্থানে ১০০ ঘোড়া ও অস্ত্রসম্ভারসহ ২০০ সাথিকে প্রহরী হিসেবে রেখে অবশিষ্টদের নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন। শর্ত অনুসারে কোরাইশরা কাবার পুরো এলাকা ফাঁকা করে দিয়েছিল, যাতে মুসলমানরা নির্বিঘ্নে তাওয়াফ করতে পারে। অভিজাতরা চলে গিয়েছিল নিকটবর্তী পাহাড়ে। তবে অধিকাংশ সাধারণ মানুষই পুরো ঘটনার ব্যাপারে কৌতূহলী ছিল।

সাত বছর আগে যে মানুষটি রাতের অন্ধকারে মক্কা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই মানুষটিই আজ দিনের আলোয় মক্কায় প্রবেশ করছেন। আর তাঁর কট্টর বিরোধীরা নিজেদেরকে লুকিয়েছে পাহাড়ে। এই মানুষটি কাবায় কী করেন তা দেখার কৌতূহল তাদের পক্ষেও দমন করা সম্ভব হয় নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও তারা নবীজীর ব্যাপারে যতটা অপপ্রচার করা যায় করেছে। তারা রটিয়েছে মদিনায় মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা একেবারেই কাহিল-দুর্বল হয়ে গেছে। অসুস্থতার কারণে তাদের হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে।

মুসলমানরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে এমন ‘প্রীতিকর’ দৃশ্য দেখার জন্যেও বিরোধীদের কেউ কেউ থেকে গিয়েছিল কাছাকাছি। নবীজী আগাগোড়াই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কুশলী সেনানায়ক। গোয়েন্দা তথ্য আগেই পেয়েছিলেন তিনি। নির্দেশও দিলেন সেভাবে। মক্কাবাসীরা বিস্ময়ের সাথে দেখল মুসলমানরা শুধু হাঁটছে না, জগিং করে বুক দুলিয়ে তাওয়াফ করছে। এর আগে ইরহাম বাঁধা হতো দুই খণ্ড কাপড় দিয়ে। একখণ্ড কোমরে জড়ানো। আর দ্বিতীয় খণ্ড কাঁধের ওপর জড়ানো। এবার দ্বিতীয় খণ্ড ডান কাঁধের ওপর না দিয়ে ডান কাঁধ ও হাত খোলা রেখে বাম কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে দেয়া হলো, যাতে ডান কাঁধ ও ডান হাত পরিষ্কার দেখা যায়। প্রথম তিন তাওয়াফ জগিং করে। পরের তাওয়াফ স্বাভাবিক হেঁটে। তাওয়াফের সময় মুসলমানদের উচ্ছ্বাস ও গতিময়তা দেখে মক্কার মুশরিকদের অনেকেই মন্তব্য করল, এরা মহামারিতে দুর্বল হলো কোথায়? এতো দেখি হরিণের মতো লাফাচ্ছে!

নবীজী ও তাঁর সাথিরা তাওয়াফ ও সা’ঈ শেষ করে কাবা প্রাঙ্গণেই ৬০টি উট কোরবানি দিয়ে মস্তক মুণ্ডন করলেন। এরপর ২০০ সাহাবীকে পাঠিয়ে দিলেন মক্কার অদূরে সশস্ত্র পাহারায় নিয়োজিত সাথিদের ওমরাহ পালনের সুযোগ দেয়ার জন্যে। তারা গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তখন এই বাকি ২০০ সাহাবী এসে ওমরাহ সম্পন্ন করলেন। নবীজী জোহর পর্যন্ত কাবায় অবস্থান করলেন। জোহরের সময় হতেই বেলালকে নির্দেশ দিলেন কাবার শীর্ষে উঠে আজান দেয়ার জন্যে। বেলাল নবীজীর নির্দেশে কাবার শীর্ষে উঠে আজান দেয়া শুরু করলেন।

তার সুর যতই মধুর হোক না কেন কোরাইশ অভিজাতদের জন্যে তা ছিল অত্যন্ত আপত্তিকর। তারা অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশের জন্যে কানে আঙ্গুল দিল, মুখ ঢেকে ফেলল। এমনিতেই আজান তাদের কাছে আপত্তিকর বিষয়। তারপর আজান দিচ্ছে বেলাল, যে ছিল উমাইয়া ইবনে খালফ-এর দাস। সকল পৌত্তলিক সমাজের মতো মক্কার পৌত্তলিক সমাজও ছিল চূড়ান্ত বর্ণবাদী সমাজ। কাবাঘর, যেখানে তাদের দেবতাদের মূর্তি সযত্নে রক্ষিত রয়েছে তার শীর্ষদেশে কোনো কালো দাস কোনো হাবশী দাস আরোহণ করবে এটা কোরাইশ নেতাদের পক্ষে হজম করা অসম্ভব ব্যাপার।

ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহ আমার বাবার প্রতি অনেক মেহেরবান। তিনি এই দাসের কণ্ঠ থেকে এই আজান শোনার আগেই তাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে গেছেন।’ সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া মন্তব্য করেন যে, ‘আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত যে তিনি একই দৃশ্য দেখার আগে আমার বাবাকেও উঠিয়ে নিয়ে গেছেন।’

শান্তিচুক্তির শর্ত অনুসারে নবীজী ও তাঁর সাহাবীরা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করেন। নির্ভয়ে শহরে ঘুরে বেড়ান। মক্কার মানুষ এই প্রথমবার মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সরাসরি দেখতে পায়। কিছুকাল আগেও যে গোত্রগুলো পরস্পর যুদ্ধরত ছিল তাদের সদস্যরাও এখন একই ভ্রাতৃত্বের ছায়াতলে। উঁচুনিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। নবীর প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ এবং মান্যতা মক্কাবাসীর দৃষ্টি এড়ানোর কারণ নেই। মক্কার সমাজপতিরা প্রমাদ গুণলেন। মক্কার মানুষরা না আবার ইসলামের ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়ন করে। তা হলে সব শেষ।

তিন দিন পুরো হতেই তারা সুহাইল ইবনে আমরের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল পাঠাল। তাদের সাফ কথা, ‘সময় শেষ! এখন আপনাকে আমাদের জায়গা ছেড়ে যেতে হবে।’ নবীজী তখন অনুভব করছিলেন মক্কাবাসীকে ইসলামের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে তার এখানে অবস্থান করাটা অনেক ফলপ্রসূ হবে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, তোমাদের জায়গায় যদি আমাকে বিয়ে করার সুযোগ দাও, তবে এমন কী ক্ষতি হবে? আমরা তোমাদের জন্যে ভোজের আয়োজন করব।’

মক্কার প্রতিনিধিদল শঙ্কিত হয়ে উঠল যে, ভোজসভার হালকা পরিবেশে মানুষের মনের কত গভীরে না এই মানুষটি প্রবেশ করে ফেলে। তারা সাফ জানাল, ‘আমাদের খাবারের কোনো প্রয়োজন নেই। আপনাকে এখন শর্ত মেনে চলে যেতে হবে।’ মুহাম্মদ দলবল নিয়ে ফেরতযাত্রা শুরু করলেন। কিন্তু পরিষ্কার বুঝলেন কোরাইশ জনসাধারণ কোনোদিনই আর আগের উগ্র বিরোধিতায় ফিরে যাবে না। বরং ভাঙন শুরু হবে এখন ভেতর থেকেই। কট্টরপন্থীদের প্রভাব কমতে থাকবে। পৌত্তলিকতা ও ধর্মান্ধতা থেকে বেরিয়ে সত্যধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে চিন্তা শুরু করবে অনেকেই।

তিনি বুঝলেন, কোরাইশ মনে ওমরাহ কেন্দ্রিক জনসংযোগের ছাপ হবে সুদূরপ্রসারী।

এনএস/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি