ঢাকা, মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

আতঙ্কিত কাশ্মীরের জনগণ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:১২ ১৪ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ১৭:০৫ ১৪ আগস্ট ২০১৯

অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাশ্মীর। পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ বলা হয় এই কাশ্মীরকে। মনোরম আর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই কাশ্মীর। সেই কাম্মীরে চলছে এখন অশান্তি আর ভয়। আতঙ্কিত কাশ্মীরের জনগণ।

ভারত, পাকিস্তান আর চীনের আগ্রাসী মনোভাবে নিজেদের ঐতিহ্য হারাতে বসেছে সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি। এর ফলে কাশ্মীরিরা পড়েছে মহাসঙ্কটে।

কাশ্মীরের মানুষ শান্তি প্রিয়। তারা শান্তি চায়। কিন্তু এই তিন দেশের বলি হচ্ছেন তারা। বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না, কোনো কাজ করতে পারছেন না, কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এমনকি মুসলমানদের দ্বিতীয় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার নামাজটাও তারা ভাল করে পড়তে পারেনি। 

গত ৫ আগস্ট ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর থেকেই সেখানে আবারও অশান্তি শুরু হয়।

এ বিষয়ে অধিকাংশ কাশ্মীরিই মনে করেন যে, রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন ও ৩৭০ ধারার মাধ্যমে অর্জিত বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বিষয়টি তাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যহত হচ্ছে। তারা অনেকেই মনে করেন, বিশেষ সুবিধা আমাদের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। এটা বাদ দেওয়ার অর্থ হলো রাজ্যটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চরিত্র হারাবে।

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিবিসির এক সাংবাদিক বলেন-ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী জটিলতা এড়াতে রাস্তাঘাটে ১০০ গজ পরপরই সেনা চৌকি আর কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়েছে। রাস্তায় যত না সাধারণ মানুষ, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সেনা আর আধা সেনা দেখা গেছে।

৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রাতারাতি বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা কতটা বিক্ষুব্ধ, সেটা তাদের চেহারাতেই স্পষ্ট।

কেউ কেউ তো বলছেন, দশ মিনিটের জন্য কাশ্মীরে জারি করা কারফিউ তুলে নেওয়ার হিম্মত দেখাক সরকার, তারপরই তারা দেখবে দলে দলে কত মানুষ রাস্তায় নেমে এর প্রতিবাদ করে।

সরকারও সেটা নিশ্চয়ই জানে, তাই তো গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে।

ঝিলমের তীরে এখন যে স্তব্ধতা, সেটা যে ঝড়ের আগের, সেটা স্পষ্ট। কাশ্মীর এখন যেন এক মৃত্যুপুরী। রাস্তাঘাটে কোন লোকজন নেই।

পুরো রাজ্য জুড়ে আছে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় সেনা। টানা কারফিউ জারি রয়েছে। দোকানপাট বন্ধ।

অনেকের বাড়িতেই খাবার ফুরিয়ে গেছে, রেশন ফুরিয়ে গেছে। কেনাকাটার জন্য তারা সাহস করে কেউ কেউ বেরুচ্ছেন, কিন্তু কিছু কেনার মতো কোন দোকান খোলা নেই।

শ্রীনগরের পুরো শহর জুড়ে একটা থমথমে পরিবেশ। চারিদিকে আতঙ্ক, ক্ষোভ। রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাই কারাগারে কিংবা গৃহবন্দী।

গুপকার রোড, যেখানে থাকেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বা মেহবুবা মুফতির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকরা, সেখানে কাউকে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না।

৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘটনায় কাশ্মীরিরা বলেন, পার্লামেন্টে অমিত শাহ দাবি করেছেন যে কাশ্মীরের আশি শতাংশ মানুষ নাকি এটি সমর্থন করে।

যদি তাই হবে, সরকার কেন মাত্র আট মিনিটের জন্য কারফিউ তুলে দিচ্ছে না। কারফিউ তুলে নিক, তারপর তারা দেখতে পাবে কীভাবে মানুষ রাস্তায় নামে প্রতিবাদ জানাতে। মানুষ এখানে ভীষণ ক্ষুব্ধ, ভীষণ হতাশ।

তারা হাসপাতালে যেতে পারছে না। অন্তসত্ত্বা মায়েরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কিনতে পারছে না। সব জায়গায় গিজ গিজ করছে সেনা।

একটা বিষয় পরিস্কার। যে রকম বিপুল সংখ্যায় কাশ্মীর জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, তার কারণে কেউ এখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে পারছে না। কিন্তু পরে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে, সেটা বলা মুশকিল।

কাশ্মীরে এখন কার্যত একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। এখানকার কোন নিউজ পোর্টাল রোববারের পর আর আপডেট করা হয়নি, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ।

কয়েকটি সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কেউ নেই। কোন পত্রিকা বেরুতে পারছে না। বলা যেতে পারে কাশ্মীরে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠ একরকম রোধ করেই রাখা হয়েছে।

মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব, ঈদুল আজহা। কাশ্মীরিদের ঈদ ভালোভাবে কাটেনি। তবে ঈদের দিন কারফিউ অনেকটা শিথিল করা হয়। কিন্তু ঈদের নামাজের পর পরই সেখানের অবস্থা আরোও কঠিন হয়ে পরে।

কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তান কী চায়?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ওই অনুচ্ছেদের বিলোপ ছিল ২০১৯ সালে দলের একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ওই অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

এখন এটা পরিষ্কার যে এপ্রিল-মে মাসে হওয়া সাধারণ নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর মোদী সরকার তাদের ঐ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেরি করেনি।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর প্রশ্নে এমনিতেই মতানৈক্য রয়েছে। ভারতে সরকারের এই সিদ্ধান্তে পাকিস্তান সরকার রীতিমত ক্ষুব্ধ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইতোমধ্যেই কড়া ভাষায় এর বিরোধিতা করেছেন।

এর ফলে দুদেশের সম্পর্কে আরও কতটা অবনতি ঘটবে তা দেখার বিষয়। পাকিস্তান তার দেশ থেকে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে এবং ভারত থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এদিকে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী দফায় দফায় সরকারী মন্ত্রী এবং সেনা কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলছেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সোমবারই এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কাশ্মীরের মানুষের প্রতি দায়বোধ পালনে তারা যে কোনো পথ নিতে প্রস্তুত।

কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সাথে আরেকটি যুদ্ধের মতো চরম কোনো পথে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটা পাকিস্তানের? এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মহল থেকে কার্যত সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে।

সামরিক পথে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন জাতিসংঘে পাকিস্তানের দূত মালিহা লোধী।

শুক্রবার সিএনএন সংবাদ সংস্থাকে তিনি বলেন, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক পথে এগুনোর বহু রাস্তা পাকিস্তানের সামনে খোলা, এবং সেই পথেই তারা এগুবে।

দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা বিষয়ের বিশ্লেষক ড সৈয়দ মাহমুদ আলী বিবিসিকে বলেন, কাশ্মীরের সর্ব-সাম্প্রতিক এই ইস্যুটিকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়া ছাড়া পাকিস্তানের সামনে এখন তেমন কোনো বিকল্প নেই।

ড. আলী বলেন, ইমরান খান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া ভালো - যেটা হয়তো পাকিস্তান কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। ‘ট্রাম্প ও ইমরানের সম্পর্ক বহুদিনের, ২৫ বছর ধরে তারা পরস্পরকে চেনেন, যোগাযোগ আছে।’

এদিকে চীনের ওপরও চাপ তৈরির কথা লিখেছে ডেইলি টাইমস – ‘চীন যদি চায় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি নিরবিচ্ছিনভাবে চলুক, তাহলে চীনকে পাকিস্তানের সাথে কাঁধ মেলাতে হবে।’

ভারত কাশ্মীরকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে দু'টি অঞ্চলে বিভক্ত করার কথা ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে একটি  জম্মু ও কাশ্মীর এবং আরেকটি লাদাখ।

এই বিভক্তির ফলে সেখানকার প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের ঠিকানা হবে জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে, যেটি দুইটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত - মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর উপত্যকা এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু।

আর বাকি মানুষের বসবাস হবে নতুন তৈরি হওয়া কেন্দ্রশাসিত পাহাড়ি অঞ্চল লাদাখে, যেখানকার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মুসলিম এবং অর্ধেক বৌদ্ধ।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর উপত্যকার জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ এবং জম্মুর জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। আর লাদাখের জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের এই দাবিটি ১৯৫০'এর দশক থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের অন্যতম প্রধান একটি দাবি ছিল।

এদিকে সর্ব ভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তিহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেছেন, ভারত সরকার কাশ্মীরকে ভালোবাসে, কিন্তু কাশ্মীরিদের না।

তিনি বলেন, কাশ্মীরের ভূমির জন্য ভারত সরকারের ভালোবাস আছে, কিন্তু সেখানে যারা বসবাস করেন, তাদের জন্য না। সরকার ক্ষমতাকে ভালোবাসে, কিন্তু ন্যায়বিচারকে না।

এত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পরও কাশ্মীরিরা চায় তাদের স্বাধীনতা। তারা ভারত কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে যেতে চায় না। তারা চায় সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে। তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়।

এমএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি