ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

হতভাগ্য নেতা থেকে জননন্দিত একজন রাষ্ট্রপ্রধান ইব্রাহিম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৪:১৫, ২০ জানুয়ারি ২০২৩

মালয়েশিয়ার জননন্দিত রাজনীতিক আনোয়ার ইব্রাহিম। একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত নেতা। বারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার হাতছানি পেলেও শেষ পর্যন্ত তা অধরাই থেকে যাচ্ছিল তার কাছে। রাষ্ট্রীয় শীর্ষপদ তো দূরের কথা উল্টো মিথ্যা মামলায় জেল খাটাই যেন তার নিয়তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভ্যাগে যদি থাকে, ঠেকায় কে?

এ ক্ষেত্রে তার বক্তব্য ছিল এমন যে, ‘আপনি যদি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হন, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর হন, সম্পদের পাহাড় গড়া কিছু পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর হন- তাহলে শাসকগোষ্ঠীর কাছে আপনি জনপ্রিয় হতে পারবেনই না। তবে এ সম্পর্কে আমি ছিলাম পূর্ণ ওয়াকিবাল। আমি একথা জানতাম যে ধনকুবের ও রাজনৈতিক এলিটরা কখনওই চাইবেনা যে আনোয়ান ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হোক। যে কোনো মূল্যে তারা আমাকে ঠেকাতে চেয়েছে। কিন্তু কেন? আমি কি বর্ণবাদী? ধর্মান্ধ? নাকি দুর্নীতিবাজ? না এসব কিছুই না। তারা জানে যে আমি তাদের বাড়াবাড়ির লাগাম টেনে ধরব।’

সত্তরের কোঠা অতিক্রম করা এ উদার ইসলামপন্থী নেতা কোনোদিন রাষ্ট্রের শীর্ষপদে বসতে পারবেন তা এক প্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যেই ছিল। আনোয়ার ইব্রাহিম কবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? প্রবীণ রাজনীতিক এবং তার সমর্থকরা এই প্রশ্ন তুলছেন গত তিন দশক ধরেই। একজন তরুণ মুসলিম ছাত্রনেতা, সেখান থেকে সংস্থারপন্থী অর্থনীতিবিদ, মন্ত্রী থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়া, বারবার কারাবরণ এবং মালয়েশিয়ার কয়েক দশকের শাসনকারী দলকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের প্রতিটি পর্যায়ে যে মানুষটি কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন তাকে প্রতিবারই আটকে দেওয়া হয়েছে। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও তিনি পিছু হটেননি।

তাইতো আজ তিনি মালয়েশিয়ার দশম প্রধানমন্ত্রী। পাকাতান হারাপান জোটের চেয়ারম্যান আনোয়ার ইব্রাহিম ২০০৮ সাল থেকে দেশটির সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে ছিলেন। দীর্ঘদিন জেলে কাটানো, নানা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর তার কাছে ধরা দেয় স্বপ্নের সাফল্য। কিন্তু এ সাফল্যের পেছনের গল্পটা বেশ করুন ও বেদনাদায়ক।

আনোয়ার ইব্রাহিম পারিবারিকভাবেই রাজনৈতিক রক্ত বহন করছেন। তারা বাবা ছিলেন একজন এমপি। মাও সক্রিয় রাজনীতি করতেন। আনোয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যায়ে অধ্যয়নকালে। তখন তরুণ ছাত্র নেতা আনোয়ার ‘মুসলিম ইউথ মুভমেন্ট অফ মালয়েশিয়া’ বা আবিম গঠন করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় দুই বছর জেল খাটেন তিনি। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আনোয়ার। সেসময় তিনি সুদক্ষ বাগ্মিতায় গ্রামীণ জীবনের সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।

এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের নজরে পড়েন তিনি। এরপরই তার উত্থান ঘটে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সামলে ১৯৯৩ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন তিনি। দীর্ঘ এ যাত্রাপথে তিনি তার ইসলামকেন্দ্রিক রাজনীতিকে ত্যাগ করেননি। মনে করা হচ্ছিল মাহাথিরের উত্তরসূরি হতে যাচ্ছেন তিনি।

১৯৯৭ সাল এশিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে মাহাথিরের সঙ্গে আনোয়ারের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তিনি সরকারের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সমালোচনা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাকে সরিয়ে সমকামিতার মিথ্যা অভিযোগে জেলে দেন মাহাথির।

প্রায় ২২ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন শেষে ড. মাহাথির মোহাম্মদ ২০০৩ সালে অবসর নিলে এর পরের বছর কারাবাস থেকে মুক্তি পান আনোয়ার ইব্রাহিম। এরপর শুরু হয় তার নতুন রাজনৈতিক জীবন। মাহাথিরের ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাসিওনালের (বিএন) বিরুদ্ধে জনমত গড়তে নিজেকে নিয়োজিত করেন। পরবর্তীতে মাহাথির বিএন ছেড়ে দেওয়ায় দলটিতে নেতৃত্ব সংকট দেখা দেয়।

এ দিকে, আনোয়ারের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ছোট ছোট দল নিয়ে পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট গড়েন। জোটকে শক্তিশালী করে ২০০৮ সালে বিরোধীদলের নেতা হিসেবে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন তিনি।

উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত হওয়ার প্রায় ২৫ বছর পর পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির মতো ভস্মস্তূপ থেকে আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন আনোয়ার ইব্রাহিম। এই দীর্ঘ সময় তিনি বিরোধীদলীয় রাজনীতিক ও আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই পদ আনোয়ার ১৯৯০ এর দশকেই পেতে পারতেন।

আনোয়ার ইব্রাহীম ১৯৪৭ সালে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেনাং রাজ্যের চিরোক তক্কুন গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইব্রাহীম আব্দুল রহমান হাসপাতালের কর্মচারী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার মা চে ইয়েন হুসেন একজন ছিলেন গৃহিণী।

আনোয়ার ইব্রাহীম তার শিক্ষাজীবন তার নিজ গ্রামে শুরু করেন। তিনি মালয় কলেজ কুয়ালা কানজার থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ইউনিভার্সিটি অফ মালয় থেকে মালয় স্টাডিজ এ অনার্স এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে জেলে থাকা অবস্থায় মাস্টার্স সমাপ্ত করেন।

আনোয়ার ইব্রাহীম তার ছাত্রজীবনে ১৯৬৮-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মালয়েশিয়ান মুসলিম স্টুডেন্টস এর সভাপতি ছিলেন। একই সময়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মালয়া মালয় ল্যাংগুয়েজ সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়া সংগঠিত হলে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা ও প্রো কমিটির সদস্য ছিলেন এবং একই বছর তিনি মালয়েশিয়ান ইয়ুথ কাউন্সিল এর ২য় সভাপতি নির্বাচিত হন।

আনোয়ার ইব্রাহীম একজন ইসলামপন্থী নেতা (যিনি মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়ার সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা ও ২য় সভাপতি) হওয়ার পরেও ১৯৮২ সালে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের উদারপন্থী দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অরগনাইজেশন এ যোগ দেন এবং সাংস্কৃতি মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দ্রুত পরিবর্তন করতে থাকে। ১৯৮৩ সালে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী, ১৯৮৪ সালে কৃষি মন্ত্রী এবং ১৯৮৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রী হন। শিক্ষা মন্ত্রীর পদ তার মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ উপ -প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বার খুলে দেয়।

শিক্ষা মন্ত্রী হওয়ার পর আনোয়ার 'ন্যাশনাল স্কুল কারিকুলাম' প্রনয়ণ করেন। মালয়েশিয়ার জাতীয় ভাষার নাম 'বাহাসা মালয়েশিয়া' থেকে বাহাসা মেলায়ু এ পরিবর্তন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান এবং ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ইউনেস্কো সাধারণ অধিবেশন এর ২৫তম সভাপতি নির্বাচিত হন।

আনোয়ার ইব্রাহীম ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও এর সদস্য থাকাকালীন সময়ে ১৯৯৩-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯১-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ কর্তৃক বরখাস্ত এবং দুর্নীতি ও সমকামিতার দায়ে জেলহাজতে প্রেরিত হন।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মোহাম্মদ আনোয়ারকে উপ -প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করলে, আনোয়ার ও তার সমর্থকরা 'সংস্কার আন্দোলন’ শুরু করে। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বারিসন ন্যাশনাল সরকারের নীতি বহির্ভূত কর্মকাণ্ড বিলোপ করা। 

১৯৯৮ সালে কুয়ালালামপুরে এ্যাপেক সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ও অন্যান্য এ্যাপেক প্রতিনিধিদের সামনে আনোয়ার ও তার সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে ভাষণ দেন।

সংস্কার আন্দোলনের নেতা কর্মীদের নিয়ে ১৯৯৯ সালে আনোয়ার ন্যাশনাল জাস্টিস পার্টি গঠন করেন।২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে PKR, PAS এবং DAP মিলে পাকাতান রাকাত নামে জোট গঠন করেন। যা ২০০৮ সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং ৩১টি আসন জয়লাভ করে বিরোধী দলে পরিণত হয়। 

এরপর ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান জোট ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১১২ আসনে বিজয়ী হয়। এর মধ্যে আনোয়ারের পিকেআর পায় ৪৮ আসন।

নির্বাচনে আনোয়ারের জোট বিজয়ী পর মাহাথির মোহাম্মদ তাকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তির ঘোষণা দেন। মুক্তি পেয়েই আবারও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হন তিনি।

শুরুতে বিরাগভাজন হলেও পরে মাহাথিরের সঙ্গে চুক্তি করেই জেল থেকে ছাড়া পান আনোয়ার। তবে এরপর আবারও দুই জনের মধ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আবারও দুই জন দুই দিকে পা বাড়ান। এরপর মাহাথির নতুন দল নিয়ে নির্বাচন করে ভরাডুবির শিকার হন। জামানত হারায় তার দলের সব প্রার্থীরা। ক্রমে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে দেশটির রাজা রাজকীয় সুলতানদের সঙ্গে বৈঠক করে আনোয়ার ইব্রাহিমকে সরকার গঠন করতে বলেন।

 

এরপর আনোয়ার ইব্রাহিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে নিষ্ঠা ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে মানুষ যে কাঙ্ক্ষিত শীর্ষবিন্দু ছুঁতে পারে আনোয়ারের সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবন সেটাই প্রমাণ করেছে।

এসএ/

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৩ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি