ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ৯:৩৩:৫১

Ekushey Television Ltd.

ধর্মের ধরনধারণ

পূর্ণেন্দু বিকাশ দাস

প্রকাশিত : ০৮:৪০ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১০:৪৯ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার

সংস্কৃত `ধৃ` ধাতু থেকে ধর্ম শব্দের উৎপত্তি অর্থাৎ মানুষ যা ধারণ করে তাই ধর্ম। প্রতিটি মানব শিশু একটি নির্দিষ্ট ধর্ম পরিচয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং বেড়ে উঠে। যদি সে জন্মসূত্রে প্রান্ত ধর্ম পরিবর্তন না করে থাকে তবে সমস্ত জীবন সে উক্ত ধর্মই ধারণ করে এবং পরিবর্তন করলে পরিবর্তিত ধর্ম ধারণ করেই অতিক্রম করে পরবর্তী জীবন।`ধারণ` বিষয়টির কোনো শারীরিক কাঠামো না থাকলেও এটি প্রকাশ পায় স্ব স্ব ধর্মের কৃষ্টি, লোকাচার এবং প্রার্থনার ধরনের মধ্য দিয়ে। হাজার হাজার বছরের সামাজিক লোকাচার, মানবতাবাদ এবং সর্বপরী স্রষ্টার সাথে লীন হওয়ার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে ধারণকৃত এই বিশ্বাস প্রবহমান। যে কোনো ধর্মই শুধু আধ্যাত্নবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক আচার ও ক্রিয়া পরিচালনায় এর একটি বিরাট ভূমিকা দৃশ্যমান, আমাদের জন্ম মৃত্যু বিয়েসহ জীবনের প্রতিটি পদে এর ভূমিকা অলঙ্ঘনীয়।

আমাদের সম্মুখে এর সমকক্ষ কিংবা এর থেকে উৎকৃষ্ট কোনো রীতি এখন পর্যন্ত বর্তমান না থাকায় আমরা ধারণ করে চলছি এই রীতি এবং জীবন প্রণালী। অতি উচ্চ মার্গীয় তর্কের সূক্ষ্ম চুলচেরা বিশ্লেষণের বাহিরে মোটা দাগে যে ফলাফল আমরা দেখতে পাই তা হচ্ছে আমাদের সমাজ সম্মুখভাগে অগ্রসরমান একে যদি আমরা প্রগতি বলি, তবে সেই প্রকৃষ্টরূপ গতিতে ধারণকৃত ধর্মের একটি প্রবল ভূমিকা অনস্বীকার্য। যদিও প্রগতি আর ধর্ম দুইটি ভিন্ন মেরুচারী বলেই প্রচলিত ধারণা। সাধারণ্যে এরুপ একটি ধারণা, সাধারণ মানুষের মনে এরূপ ধারণা তখন থেকে জন্মাতে শুরু করে যখন ধর্ম মানুষকে ধারণ করে।

ধর্ম মানুষের ধারণ করার অভিজ্ঞতা মানব সভ্যতার ইতিহাসে কতটা ভয়াবহ নিষ্ঠুর হতে পারেরে তা এই গ্রহের প্রতিটি প্রান্তের ধূলিকণা অবগত। মানুষ ধর্ম ধারণ করে বিনির্মান করছে সভ্যতা। সেই সভ্যতাই বার বার রক্তাক্ত হয়েছে ধর্ম মানুষকে ধারণ করার কারণে মজার বিষয় এই ধর্ম আপনা আপনি মানুষকে ধারন করে না। কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কখন রাজনৈতিক আবার কখন ব্যবসায়ীক কারণে এই নিমম কাজটি করে থাকে। উন্নত বিশ্ব প্রচুর রক্তক্ষয় করে এই পরিহাসের অসারতা সম্পর্কে অনেকটাই সচেতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীও ধর্ম মানুষকে ধারণ করিয়ে ইহুদি বিরোধী অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ জয়ের অপকৌশল অবলম্বন করে সফল হতে পারেনি।

কারণ, ততদিন ইউরোপবাসী ধর্মকে শক্ত ও সুন্দরভাবে ধারণ করতে শিখে গিয়েছিল। আমাদের এই উপমহাদেশ বার বার শিকার হয়েছে এই নিষ্ঠুর খেলায়। কংগ্রেসের মত একটি অহিংস এবং অসাম্প্রদায়িক প্ল্যাটফর্ম থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের সুক্ষ সুতার টানে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণের মাঝে ধর্মকে অন্যায্যভাবে ধারণ করিয়ে রক্তাক্ত করেছে অসংখ্যবার এই উপমহাদেশের মাটি। এ ক্ষেত্রে বার বার নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মিথ্যা অহংবোধ এবং কিছু মুসলমান নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ।

এ উপমহাদেশে এই যে মিথ্যা মিথ্যা খেলা শুরু হল এর পোড়ে বহুবার রঞ্জিত হয়েছে উপমহাদেশের মাটি। কখনো মন্দির, কখনো মসজিদ, কখনো সীমানা আবার কখনো ট্রেন। এই আমরাই ঘটিয়েছি `৭১, `৬৯,`৫২ যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ত চেষ্টা করেও পারেনি ধর্ম আমাদেরকে ধারণ করাতে বরং আমরা ধারণ করেছি আমাদের নিজ নিজ ধর্ম এবং স্লোগান তুলেছি বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলমান, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, আমরা সবাই বাঙালি আর এই শ্লোগানের তোড়ে খড়কুটার মত ভেসে গিয়েছিল সামরিক উর্দি।

ধর্ম রক্ষার নামে হত্যা করা হল ৩০ লাখ মানুষ জন্ম নিল রক্তস্নাত একটি নতুন দেশ। হায়রে পরিহাস! সেই দেশেই কিনা সরকার পরিবর্তনের মতো একটি সামান্য নৈমত্তিক ঘটনায় উদ্বাস্তু হতে হয় এই দেশেরই বিশেষ সম্প্রদায়ভূক্ত মানুষদের, সীমান্তের ওপারের রাজনৈতিক চালচিত্রের উপরে দোলাচালে থাকতে হয় একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের শাসনতন্ত্র তৈরি হয় তাদের নিজস্ব ভু- রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকে। আমরাও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিক্রমায় ধর্মের ছদ্মাবরণে নির্মম নিষ্ঠুরতা দেখে ‘৭২’ এর সংবিধানে স্থান দিয়েছিলাম ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং নিষিদ্ধ করেছিলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। কিন্তু সেই চন্দন টিকা আমাদের কপালে খুব বেশিদিন চকচক করল না শুরু হল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং একইসাথে শুরু হল ধর্মকে ধারণ করানোর চর্চা।

দীর্ঘ ৩৫ বছর এই চর্চা যে কতো গভীরে শিখর গেড়েছে তা বোঝা যায় ধর্মের অজুহাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত নিয়ে কাউকে কাউকে প্রকাশ্যে বিরুদ্ধ অবস্থান নিতে দেখে। রাষ্ট্রকেই বাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ করতে দেখি কিছু কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে। নিষিদ্ধ করে কিংবা চাপ প্রয়োগ করে নয়, যেখানে ওই ধর্ম বাবসায়ীরা শিখর গেড়েছে অথবা গাড়তে চাইছে সেই সাধারণ মানুষকে বলছি দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন নিজ নিজ ধর্ম আর বিশ্বাস রাখুন নিজ ধর্মের প্রতি। হাজার বছর ধরে যে ধর্ম আমাদের সমাজ সংস্কৃতি, বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে আসছে তা কোনো দুষ্কৃতিকারীর ঘটানো কোনো অপকীর্তি, কোনো ব্যঙ্গবিদ্রূপ কিংবা কোনো বিরূপ মন্তব্য ভেঙ্গে পড়ার নয়।

ধর্ম টিকে থাকবে তার অন্তর্গত শক্তি এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের জোরে। ধর্ম রক্ষার নামে নরহত্যা কিংবা নৈরাজ্য সৃষ্টি করা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। সহস্র যোজন পথ পরিক্রমায় মানুষ ধারণ করে টিকিয়ে রেখেছে ধর্ম, কোনো ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উসকানিতে ঘটানো নরহত্যা এবং সন্ত্রাস ধর্মকে টিকিয়ে রাখেনি। বরং ধর্মের ললাটে যেটুকু কালো ছায়া তা ঐ সকল ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সৃষ্টি। সুতরাং প্রকৃত অর্থে ধারণ করতে হবে ধর্ম, বিশ্বাস করতে হবে এই অমিত শক্তির প্রতি, তবেই মুখ থুবড়ে পরবে ধর্ম ব্যবসায়ীদের ধর্ম গেল ধর্ম গেল রব আর একাকার হয়ে যাবে ধর্ম এবং প্রগতি।

কেআই/ডব্লিউএন



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি