ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৮ ৭:০১:১০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: অদম্য ১৩    

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: অদম্য ১৩    

প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। চারপাশে শরতের সেই চিরচেনা রূপ দৃষ্টিগ্রাহ্য না হলেও কেটে যাচ্ছে সময়। বছর ঘুরে ফের উপস্থিত ২০ অক্টোবর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শুভ জন্মদিন। ১৪তম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় ২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে। ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ১১ দিন আগে ৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুখবর বয়ে আনে। এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেকের ১৪৬তম সভায় এক হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এর আগে গত ৩ অক্টোবর ভূমিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির ১১৭তম সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমদি মৌজায় প্রায় ২০০ একর ভূমি বরাদ্দ করা হয়। এ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ সংশ্নিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ সব সদস্যকে। যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাফল্যের সূচক এই বার্তাই দেয় যে, আগামীতে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশ-বিদেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সব শর্ত বাস্তবায়নের দিকে ধাবমান। ১৩ বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তারপরও স্বল্প সময়ে নানা সংকট এবং সমস্যা পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সব ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে চলছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে প্রকৃত অর্থে যা বোঝানো হয়, তার সবকিছুই পরিপূর্ণ করবে প্রতিষ্ঠানটি। একটি কলেজ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিতে আনয়নের মতো কঠিন কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সত্যিকার অর্থেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি, অনুসন্ধান, বিতরণ করছে। এগিয়ে চলছে এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এমফিল, পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধানের বাইরেও ইউজিসি ও সরকারি অর্থায়নে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা। আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কাজে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থের অভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না- এমনটি বলার সুযোগ নেই। গবেষণা প্রকল্প থেকে বিশ্বমানের প্রকাশনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি অনুষদের জার্নাল নিয়মিত বের হচ্ছে। কয়েকটি বিভাগও নিজস্ব জার্নাল বের করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির যাবতীয় প্রকাশনা নিয়ে এবারই প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নেয়। এর মাধ্যমে প্রকাশনা অঙ্গনে সবার নজরে আসে প্রতিষ্ঠানটি। আর অধিকতর গবেষণাধর্মী বই প্রকাশের লক্ষ্যে কাজ চলছে। এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় মাইলফলক। অবকাঠামোগত এবং আবাসিক সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কেরানীগঞ্জে ইতিমধ্যে নতুন ক্যাম্পাস তৈরির সব পদক্ষেপ এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্যাম্পাসের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ নেই; তবু নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে অবকাঠামোগত সমস্যা কিছুটা সমাধান হবে। বাংলাবাজারে মেয়েদের আবাসিক হলের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমানে পরিবহন খাতে নতুন নতুন গাড়ি সংযুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন রুটে গাড়ি যাতায়াত করছে। এ মাসেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনে ছাত্রদের জন্য তিনটি ও শিক্ষকদের জন্য একটি বাস যুক্ত হবে। আরও নতুন গাড়ি সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণে নানা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। ই-লাইব্রেরিতে ২০টি নতুন কম্পিউটার (ই-বুক) যুক্ত হয়েছে, আরও ৪০টির অর্ডার প্রক্রিয়াধীন। ওয়াইফাইসহ সবাইকে বিশ্বপরিমণ্ডলে যুক্ত করতে আরও অধিকতর ইন্টারনেট যুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দ্রুত ফলাফল তৈরির জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনও ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেকটি বড় অর্জন মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তির লক্ষ্যে এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিল করে বর্ণনামূলক লিখিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ; যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিরল দৃষ্টান্ত। কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই লিখিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ডিজিটাল জালিয়াতি শতভাগ ঠেকানো গেছে বলে আমরা মনে করি। বর্তমানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা কঠিন কাজ। নানা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করছে। একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, সবচেয়ে মেধাবী এবং যোগ্যতাসম্পন্নরাই এখানে শিক্ষক হিসেবে আছেন। শিক্ষকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করছেন। অর্থাৎ মেধাবী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে, কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোয় দেশের অনেক পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। মানসম্মত লেখাপড়া, পরীক্ষা ও ফল নিয়মিতকরণ এবং শিক্ষকদের জ্ঞান অন্বেষী মনোভাব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে গৌরবময় স্থানে উপনীত করছে। পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে কোনো না কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েই থাকে। সুকুমার বৃত্তি চর্চার জন্য খোলা হয়েছে চারুকলা, নাট্যকলা, সঙ্গীতের মতো বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধিও প্রসারিত হচ্ছে। আরও অধিকতর মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য যেসব শর্তের প্রয়োজন, আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই মিলে তা পূরণ করছি। এ ক্ষেত্রে সরকার আমাদের যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করছে, আগামীতেও সবার সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি। লেখক: উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। একে//
মুস্তাফিজুর রহমান আমার প্রথম সম্পাদক: কানাই চক্রবর্তী

আমি যাদের সম্পাদক হিসাবে পেয়েছি, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রদ্ধাভাজন এ বি এম মূসা (প্রয়াত), গোলাম সারোয়ার, আবেদ খান, হারুন হাবিব, ইহসানুল করিম হেলাল (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব), আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং আবুল কালাম আজাদ (প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সচিব)। কিন্তু আমার সাংবাদিক পেশার জীবনের প্রথম সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান।    সম্পাদক হিসেবে আমি অন্য যাদের নাম উল্লেখ করেছি, তারা সবাই সংবাদ জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। একেকজন একেকটি ধ্রুবতারা। সবাই সাংবাদিক হিসেবে পেশায় যোগ দিয়েছিলেন| নিজ যোগ্যতা ও অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষার পর সম্পাদক হয়েছিলেন। আমার উপরের তালিকায় আরেকজন সম্পাদকের নাম যোগ করা যায়। তিনি আমানউল্ল্যা কবির। যদিও উনার স্বাক্ষরে আমাকে এবং অনেককে একসময় (২০০২) ‘বাসস’ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তারপরেও বলবো তিনিও প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং সম্পাদক ছিলেন। আমার প্রথম সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান তাদের মতো সাংবাদিক থেকে সম্পাদক ছিলেন না । দৈনিক রুপালী নামের পত্রিকার তিনি ছিলেন প্রকাশক ও মালিক। পত্রিকার ভাষায় আমরা যাকে বলি মালিক সম্পাদক। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক সম্পাদকরা তার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন- এটাই সত্য এবং বাস্তব। কিন্তু তাই বলে সম্পাদকের কোন গুণাবলী তার মধ্যে ছিলো না এমনটি কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। সাংবাদিক, গণমাধ্যম এবং সংবাদ- এসব বিষয়ে তিনি যে যথেষ্ট ধারণা নিয়ে প্রত্রিকা প্রকাশনায় নিয়োজিত ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তার কর্মকান্ডে এবং চিন্তা-ভাবনায় প্রকাশ পেয়েছিলো অনেকবার। ব্যক্তিগত জীবনে মুস্তাফিজুর রহমান শুধু সম্পাদক ছিলেন না| তার বহুমাত্রিক স্বত্তাও ছিল। তার কর্মযজ্ঞ ছিলো বিশাল। তিনি ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক, সমাজসেবক, দানবীর, রাজনীতিবিদ এবং সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (সাংসদ লিখলাম না। এ শব্দটি তিনি পছন্দ করতেন না)। সারাদেশে বিশেষ করে সন্দ্বীপে আকাশসম জনপ্রিয়তা ছিলো তার। আমি সেদিকে যাবো না। শুধু সম্পাদক হিসেবেই আলোচনা সীমিত রাখবো এ লেখায়। পরম মমত্ব এবং ভালোবাসা দিয়ে দৈনিক রুপালী প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এর আগে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ, স্বদেশ খবর এবং মাসিক ব্যাংকার প্রকাশ করেন। পরে সিনে এবং ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকাও বের করেন। রাজনীতি এবং মিডিয়া দুটোই ছিলো তার প্রধান স্বত্ত্বা। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে রাজনীতি থেকেও মিডিয়াই ছিলো তার ধ্যান-প্রাণ। এর মাধ্যমে অমরত্বও পেতে চেয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন মৃত্যুর পরও তার সৃষ্ট পত্রিকার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। যদিও তার সেই স্বপ্ন বাস্তবতা পায়নি- সে অন্য কথা। আমি দৈনিক রুপালীতে যোগ দিই ১৯৯১ সালের অক্টোবরে। এর তিন মাস আগে পত্রিকাটি বাজারে আসে। আমার যোগদান পর্বটিও ছিলো একটু অন্য ধরনের। এ সময় আমি ঢাকায় আমার বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসি। সে সময় ফিরোজ ভাইও ঢাকায় ছিলেন। ফিরোজ ভাই (দিদারুল ইসলাম ফিরোজ) তখন মুস্তাফিজুর রহমানের খুবই কাছের মানুষ। তিনি আমাকে একদিন ফকিরাপুলের রুপালী অফিসে নিয়ে যান। সেখানে রাজিব হুমায়ুন স্যারও ছিলেন। ফিরোজ ভাই আমাকে মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার নাম বলার আগেই উনি আমাকে চিনেন বলে জানান। অনুযোগ করলেন সেই যে একবার উনার কাছে এসেছিলাম আর কোন যোগাযোগ রাখিনি। আমার নাটকের খোঁজ-খবরও নিলেন তিনি। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে রাজিব স্যারকে বলেন, উনার কাছে যারা আসেন বেশির ভাগ পিওন অথবা অন্যান্য পদের চাকরির জন্য। কিন্তু লেখালেখি কিংবা সাংবাদিক হওয়ার জন্য কেউ আসে না। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সন্দ্বীপের ছেলে-মেয়েদেরও দেখতে চান বলে জানান। রাজিব স্যার সাথে সাথে আমাকে দেখিয়ে বলেন, ‘ওকে নিয়ে নিন।’ মুস্তাফিজুর রহমান আমার দিকে তাকালেন এবং সন্দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘হেতে আঁর ইয়ানে চাকরি কইরতো ন।’ পাল্টা রাজিব স্যার বলেন, কেনো করবে না? অবশ্যই করবে। তাহলে এখনই জয়েন করতে হবে মুস্তাফিজুর রহমানের ঘোষণা। পাল্টা রাজিব স্যার বললেন, এখনই করবে? আমি একদম দর্শক হিসেবে বসা। কিছুটা অপ্রস্তুতও। এর মধ্যে দরখাস্তের কাগজও আমার সামনে এসে গেলো। আমি অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে জানালাম, আমাকে সন্দ্বীপ যেতে হবে। সামনে আমার পারিবারিক (দাদুর বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান) অনুষ্ঠান আছে। আমি এখনই জয়েন করতে পারবো না। অনুষ্ঠান শেষ করে এসে যোগ দিতে বললেন তিনি। সাথে এটিও বললেন নিয়োগপত্র নিয়ে যাতে কেটে না পড়ি। এর মধ্যে নিয়োগপত্রেও স্বাক্ষর করে ফেলেন তিনি। বেতন ২ হাজার ৫শ টাকা। শিক্ষানবীশ প্রতিবেদকের জন্য তখন বরাদ্ধ ছিলো ১৮শ টাকা। আমার জন্য ৭শ টাকা বেশি। ছয় মাস পর ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী আমাকে তৃতীয় গ্রেডে বেতন দেয়া হবে। তখন তৃতীয় ওয়েজ বোর্ডের থার্ড গ্রেডে বেতন ছিলো তিন হাজার আটশ টাকার মতো। অষ্টম ওয়েজ বোর্ডে যা এখন ৩৯ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। যাহোক, নিয়োগপত্র নিয়ে আমি সন্দ্বীপ চলে আসি এবং বাবার অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে আমি দৈনিক রুপালীতে পেশাগত জীবন শুরু করি। তবে শুরুর দিনেই আমার জন্য যে আরো চমক অপেক্ষা করছিল তাকি আমি জানতাম? দুই গত লেখায় রুপালীতে যোগদানের দিন চমকের কথা বলেছিলাম। আসলে এটাকে চমক না বলে প্রথম অভিজ্ঞতা বলাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল বেশি। দৈনিক রুপালীর সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি সন্দ্বীপের নির্বাচিত সংসদ সদস্যও । স্বভাবতো কারনে পত্রিকার সাংবাদিক এবং অন্যান্যরা আমাকে বেশ সাদরেই বরন করে নিচ্ছিলেন। সবাইর সাথে পরিচিত হচ্ছি। হাত মিলাচ্ছি। টুক টাক কথা বলছি। হঠাৎ করে চোখ গেলো চার দিক থেকে বসা বড় টেবিলটায় । পত্রিকার ভাষায় এটাকে বলে সেন্ট্রাল ডেস্ক। এই সেন্ট্রাল ডেস্কে কাজ করেন সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা। পদবি সাব এডিটর , সিনিয়র সাব এডিটর , শিপট ইন চার্জ ইত্যাদি। স্বভাবতই তারা রিপোর্টারদের রিপোর্ট এডিট করেন , ভুলভ্রান্তি ধরেন। তো আমার চোখ সিনিয়র দের কাটিয়ে যার উপর স্থির হলো তিনি কোন সিনিয়র নন। তারুন্যে ভরপুর সদাহাস্য-উজ্জ্বল এবং প্রানবন্ত এক তরুণ। আমাকে দেখে তার দেয়া হাসির মধ্যেই যেন আমি বার্তাটা পেয়ে গেলাম। আমার কোন সমস্যা হবেনা। তার উপর নির্ভর করতে পারি। এতদিন পরে স্বীকার করছি আমি তার অভিব্যাক্তিতে ভরসা করার মত কিছু পেয়েছিলাম। সাংবাদিক হিসেবে আমার অভিষেকের দিনেই উপলব্দি করলাম এই অফিসে আপাতত সেই আমার সবচেয়ে শুভকাঙ্খি আপনজন-আত্নীয়ও বটে । তার বাড়ি সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নে । নাম সোহেল মাহমুদ । যাহোক আমার অভিষেকের এ দিনেই রাতে সন্দ্বীপ নিয়ে একটি রিপোর্ট করি। রিপোর্ট করার আগে সন্দ্বীপে আমি যথেষ্ট হোমওর্য়াক করে আসি। আমার রিপোর্টের বিষয়বস্তু ছিলো সন্দ্বীপ শহর নদী ভাঙ্গন রোধে পদক্ষেপ নেয়া হলে তার জন্য যা ব্যয় হবে তার কয়েক গুণ টাকার সম্পদ রক্ষা হবে। টাকার অঙ্কে আমি তা বিশ্লেষণ করি। রাতে রিপোর্টটি জমা দিয়ে আমি বোনের বাসায় চলে যাই। সারারাত উত্তেজনায় ঘুম আসে না, কখন ছাপার অক্ষরে দেখতে পাবো জীবনের প্রথম রিপোর্টটি। পরের দিন দুপুরের পর অফিসে ঢুকেই পরিবেশ অন্যরকম আবিষ্কার করি। কেমন একটা থমথমে ভাব। সবাই চিন্তিত। শাহজাহান ভাই (শাজাহান সর্দার) অথবা ফজলু ভাই আমাকে আস্তে করে ডেকে নিয়ে জানতে চান আমি রিপোর্টটি সম্পাদক সাহেবকে দেখিয়েছিলাম কি-না? আমি ‘না’ বলার পর সবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কারণ, সন্দ্বীপের কোন নিউজ রুপালীতে প্রকাশের আগে মুস্তাফিজুর রহমানকে দেখানোর একটা কৌশলগত নির্দেশনা ছিলো, আমার তো তা জানার কথা নয়। আর উনারা ভেবেছিলেন আমি সম্পাদক সাহেবকে দেখিয়েই জমা দিয়েছি। সেদিন মুস্তাফিজুর রহমান অফিসে আসার আগ পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা সবার মধ্যে দেখতে পাই। যাহোক, বিকেলে মুস্তাফিজুর রহমান অফিসে এসেই প্রথমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমিতো ভয়ে অস্থির। তবে সেটা আমার জন্য যতটুকু নয় যারা আমার রিপোর্টটি ছেড়েছে তাদের জন্য বেশি। ভেতরে যাওয়ার পর আমার রিপোর্টটি নিয়ে তিনি (মুস্তাফিজুর রহমান) যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, তা আমি ভাবতেও পারিনি। আমার জন্য রুপালীতে সাময়িক জমে থাকা মেঘ কেটে যাওয়ায় পুরো অফিস জুড়েই স্বস্তির ভাবটা ফিরে এলো। সুধাময় করদা (প্রয়াত, উনার অধীনেই আমি কাজ শুরু করি ) খুশীতে এবং বিপদমুক্ত হওয়ায় বলেন, বিয়ের রাতেই আমি বিড়াল মারতে পেরেছি । মুস্তাফিজুর রহমান কয়েকবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে রিপোর্টটির উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করলেন। তিনি বলেন, সন্দ্বীপ নিয়ে তিনি এ ধরনের রিপোর্ট চান। শুধু তাই নয়, সবাইকে ডেকে নিয়ে রিপোর্টটির প্রশংসা করলেন এবং এখন থেকে সন্দ্বীপ সম্পর্কিত কোন নিউজ যাবে কি যাবে না তা বিবেচনার দায়িত্ব তিনি আমাকে অর্পণ করেন। এটি ছিলো একটা কঠিন দায়িত্ব। একদিন আমাকে ডেকে সন্দ্বীপ থেকে আসা কয়েকটি নিউজ আমাকে ধরিয়ে দেন। তখন উনার কক্ষে অনেক লোক বসা। নিউজগুলো দেখে আমি খুবই বিরক্ত। এগুলো কোনো জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হতে পারে না। উনি মনে হয় আমার মনোভাবটা বুঝতে পেরেছিলেন। সন্দ্বীপের লোকজন চলে যাওয়ার পর আবার আমাকে ডাকলেন। সবার সামনে বিশেষ করে সন্দ্বীপের লোকজনের সামনে আমাকে তিনি ‘আপনি’ করে সম্বোধন করতেন। একা যখন-তখন ‘তুমি’ বলেন। আমাকে বলেন, উনি সন্দ্বীপের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাই অনেককে খুশি রাখতে হয়। সন্দ্বীপের নিউজ আসলেই দিতে হবে এমন কথা নয়। যেটি যাওয়ার মতো হবে, সেটি যেন দিই। এতে করে আমার বিপদ কিন্তু আরে বাড়ে । যাদের বা যে প্রতিষ্ঠানের নিউজ ছাপা হতোনা তাদের একটা ক্ষোভ আমার উপর জন্মাতো । তবে বলতে কি, আমি যতদিন রুপালীতে ছিলাম এ স্বাধীনতাটুকু আমি পুরোপুরি ভোগ করতে পেরেছিলাম। আর তা পেরেছিলাম বলেই তিনি যে সন্দ্বীপকে কতটা ভালোবাসতেন তা অনুভব করতে পেরেছি। অবশ্য সন্দ্বীপের প্রতি তার আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা আমি এর আগেও একবার টের পেয়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম। ১৯৮৯ সালে সন্দ্বীপে সন্দ্বীপ থিয়েটার থেকে নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছিলাম। উৎসবের আগে আমি এবং সন্দ্বীপ থিয়েটারের সচিব সিরাজ (সিরাজুল মাওলা, বর্তমানে মুস্তাফিজুর রহমান কলেজের বাংলার শিক্ষক) ঢাকায় আসি রাজিব স্যারের পরামর্শ নেয়া ও উপস্থিতি নিশ্চিত করাসহ মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেয়ার জন্য। আমরা নাট্যোৎসবটি মুস্তাফিজুর রহমানকে দিয়েই উদ্বোধন করাতে চেয়েছিলাম। নাট্যোৎসবের কথা শুনে স্যার তৎক্ষণাৎ মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাছে ফোন দিয়ে আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানান। তিনি আরো বলেন, উনার কাছে অনেকেই যে কারণে দেখা করতে যান আমরা তা নই। টেলিফোনে স্যারের ভাষা ছিলো উনি সন্দ্বীপের দুÕজন ক্রিমকে পাঠাচ্ছেন। মুস্তাফিজুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবেই আমাদের পাঠিয়ে দিতে বললেন। স্যারের আহ্বানে তিনি যে এভাবে সাড়া দিবেন তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলো না। আমরা মতিঝিলে মুস্তাফিজুর রহমানের বিসিআই কর্মস্থলে হাজির হওয়ার পরেই তা যেনো টের পাই। গেটে আমাদের পরিচয় দেয়ার সাথে সাথেই আমাদের দ্বীপবন্ধুর কক্ষে পৌঁছে দেয়া হয়। মনে হয় যেন সবাই আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন। যাহোক, মুস্তাফিজুর রহমানকে আমাদের আসার উদ্দেশ্য জানাতেই তিনি অবাক বিস্ময়ে আমাদের মুখপানে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ পরে পাশে বসা একজনকে (পরে জেনেছি মন্ত্রী) খুবই আবেগতাড়িত কন্ঠে সন্দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ওঠেন, দেখেন দেখেন, ওরা আমার সন্দ্বীপের ছেলে। সন্দ্বীপের মতো জায়গায় নাট্যোৎসব করছে। মন্ত্রীও খুব অবাক হলেন সন্দ্বীপের সংস্কৃতির উর্বরতা দেখে। মুস্তাফিজুর রহমানের সেদিনের উচ্ছ্বসিত মুখায়ব এখনো ভোলার নয়। প্রকৃতপক্ষে এ উচ্ছ্বাস দিয়ে তিনি মন্ত্রীকে সন্দ্বীপের মর্যাদাই তুলে ধরেছিলেন। মুস্তাফিজুর রহমানও বুঝাতে চেয়েছিলেন সন্দ্বীপ কোন অবস্থাতেই চরাঞ্চল নয়। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের পাঠানোর জন্য রাজীব স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন দেন। একই সাথে উৎসবে উপস্থিত থাকার কথাও বলেন। যদিও পরে উৎসবের তারিখ পরিবর্তন হওয়ার কারণে উনার আসা সম্ভব হয়নি। তিন আমি দৈনিক রুপালীতে যত বছর ছিলাম (১৯৯১-৯৭) সন্দ্বীপ সংশ্লিষ্ট সংবাদ ছাড়া কোন সংবাদেই মুস্তাফিজুর রহমানকে হস্তক্ষেপ করতে দেখিনি। সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তিনি সবকিছু বিবেচনা করতেন। রিপোর্টারদের রিপোর্টে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে কোন বিতর্ক হলে তিনি সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের পক্ষ অবলম্বন করতেন। আমি একবার একটা রিপোর্ট নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। আমি সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যাক্তি দুর্নীতির নিউজ করতাম না। পক্ষে অনেক ডকুমেন্ট থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে একবার (’৯৪-এর মার্চ হতে পারে) একটি নিউজ করে ফেলি। এতে সে সময়ের অনেক রাঘব বোয়াল সংশ্লিষ্ট হয়ে যান। এদের মধ্যে অনেকেই সে সময়ের ক্ষমতাসীন দলের হোমরা-চোমড়া ব্যবসায়ী ছিলেন। খুব সম্ভবত তারা চিনি আমদানিকারক ছিলেন। রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর তারা সরাসরি মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে চলে আসেন এবং প্রকাশিত সংবাদটির প্রতিবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানান। এদের মধ্যে দু’একজন মুস্তাফিজুর রহমানের পরিচিতও ছিলেন। এদের অনেক আবেদন-নিবেদনের পরও মুস্তাফিজুর রহমান তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। উনার বক্তব্য হচ্ছে, যিনি রিপোর্টটি করেছেন এটা তার ব্যাপার। তিনি এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। তবে তিনি তাদের বলেন, যদি তারা আমাকে রাজি করাতে পারে তাহলে উনার আপত্তি নেই। উনি কোনভাবেই আমাকে আদেশ বা অনুরোধ জানাতে পারবেন না। ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এবার সরাসরি আমার কাছে আসে। এর আগে মুস্তাফিজুর রহমান আমারে কাছে সাপোর্টিং পেপার যথেষ্ট রয়েছে কি-না জানতে চান। যদিও উনার বিশ্বাস ছিলো কোন কাগজপত্র ছাড়া এবং ব্যক্তিগত লাভে এ নিউজ করেনি। আমি উনাকে বলি, আমার কাছে আরো যা ডকুমেন্ট রয়েছে তা দিয়ে দু’তিনটা নিউজ করতে পারবো। ব্যাস! এ পর্যন্তই। তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদকদের একটি সংগঠন ছিলো। মুস্তাফিজুর রহমান সেই সংগঠনের সভাপতিও ছিলেন। একদিন সবাই দলবেধে আবার উনাকে প্রতিবাদপত্র ছাপার অনুরোধ জানাতে থাকেন। মুস্তাফিজুর রহমানের একই কথা সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেন। এদের মধ্যে একজন খুবই সিরিয়াস ছিলেন। নানাভাবে আমাকে প্রলুব্ধ করতে থাকেন। যাতে আমি রাজি হই। আমার কেনো জানি মনে হলো, উনি ওই পক্ষ থেকে কোন সুবিধা নিয়েছেন, এখন আমাকেও তা দিতে চাইছেন। আমি উনাকেও একই কথা বলি। প্রতিবাদ ছাপাবো এবং সাথে প্রতিবেদকের বক্তব্যও যাবে। কিন্তু উনাদের আবদার প্রতিবেদকের বক্তব্য ছাড়াই প্রতিবাদ ছাপাতে হবে। আমার সম্পাদক যখন আমার পাশেই আছেন, তখন তাদের হুমকি-ধামকি কোন কাজেই লাগবে না আমি জানি। এর মধ্যে অনেক দিন চলে গেছে। তাদের চেষ্টা-তদবির আপতত নেই। কিন্তু আমি কি জানতাম, তারা অন্য পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে? এপ্রিলের প্রথম দিকে সম্পাদক এবং আমার বরাবরে হঠাৎ একটি উকিল নোটিস আসে । প্রকাশিত মিথ্যা (তাদের ভাষায়) সংবাদের প্রতিবাদ প্রথম পৃষ্ঠায় না ছাপালে তারা সম্পাদক এবং আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে। সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান আমাকে ডেকে উকিল নোটিসটি ধরিয়ে দিলেন। কিন্তু কোন কিছুই বললেন না। কেনো জানি না, এ উকিল নোটিস দেখে আমার কোনো ভয়ই অনুভূত হলো না। সময় এবং বয়স বলেই কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা উনি (সম্পাদক) নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে পারতেন। আমার মতো নবীন সাংবাদিকের সিদ্ধান্তে তিনি আমল না দিলেও পারতেন। এতোদিন পরে বুঝতে পারি উনি মালিক সম্পাদক হলেও উনার ভেতরে ছিলো পেশাধারী সম্পাদকের মন। যাহোক, মুস্তাফিজুর রহমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সেটি মালিক সম্পাদক বা পেশাধারী সম্পাদক, কোনটি থেকেই নয়। তার সেই প্রস্তাবে আমি উনার মধ্যে পিতৃত্বের একটা ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। সন্তানের প্রতি পিতাদের যে অনুভূতি থাকে অনেকটা সে রকম। এরই মধ্যে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়ে করতে চট্রগ্রামে যাবো। যাওয়ার আগে উনার কাছ থেকে আশির্বাদ চাইতে গেলাম। উনি খুব খুশি। শুভ কামনা জানানো শেষে আমাকে হঠাৎ করে বলেন, ‘প্রতিবাদপত্রটি ছাপিয়ে গেলে ভালো হতো না?’ আমিতো হতচকিত। কিন্তু আরো আবেগাপ্লুত হওয়ার পালা পরের সংলাপে। উনার বক্তব্য হচ্ছে মাথার ওপর মামলার হুমকি নিয়ে আমি একটা শুভ কাজে কেন যাচ্ছি। এতে উনার ভালো লাগছে না। যদি এর ভেতর মামলা-টামলা হয়ে যায়? আমাকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন, মামলা হলেতো উনার বিরুদ্ধেও হবে কিন্তু তিনি মামলা-টামলাকে ভয় করেন না। কিছুদিন আগেইতো জেল খেটে এসেছেন। উনার ভাবনা আমাকে নিয়ে। আমি যেনো কোন ঝামেলাতে না পড়ি। আপনারাই বলুন, এটা কি পিতৃমন থেকে উৎসরিত নয়? যাহোক, আমি উনাকে দৃঢতার সাথে জানালাম, মামলা করার সাহস ওরা পাবে না। ওরা জানে আমার কাছে কি আছে। এতে তাদের আরো ক্ষতি হয়ে যাবে। বললাম, ওরা জাস্ট ভয় দেখানোর জন্য নোটিস পাঠিয়েছে। আসলে পরে আর মামলা হয়নি বা সাহস করেনি। আসলে তিনি শুধু রুপালীতে আমার সম্পাদক ছিলেন না, অভিভাবকও ছিলেন। পরবর্তি কিস্তি সেই সময়ের (’৯৬) তথ্যমন্ত্রীকে নিয়ে আমার একটি লেখার প্রতিক্রিয়া এবং সম্পাদকের অবস্থান। চার ১৯৯৭ সালের ঘটনা। তখন মুস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য। তার দলও ক্ষমতায়। কিন্তু দৈনিক রুপালীর অবস্থা তখনও প্রায় নাজুক। মাত্র দল সরকারে এসেছে। ডিএফপির বিজ্ঞাপনই একমাত্র সম্বল। এদিয়েই সাংবাদিকদের বেতন। কিন্তু আমার এক লেখায় সেটিও হারাবার উপক্রম। এবারের সংকটের সাথে রুপালীর সবার স্বার্থ জড়িত। তখন তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদ ভাই। আমার খুব প্রিয় লোক। বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক ছিলেন । বাকশালের তরুন গভর্নর ছিলেন। লেখালেখিতেও ভালো । উনি একটা বক্তৃতায় বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রদের হাতে অতীতের সরকারগুলোর মতো অস্ত্র তুলে দেবে না। সবার হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেবে। আমি এর জবাবে, ‘প্রিয় তথ্যমন্ত্রী আপনি কতজনকে নিয়োগপত্র তুলে দিবেন?’ শিরোনামে একটি কলাম লিখি। এটি প্রকাশের পর তথ্যমন্ত্রী কেনো জানি ভয়ংকরভাবে ক্ষেপে যান। তিনি সকাল থেকেই টেলিফোনের পর টেলিফোন করতে থাকেন মুস্তাফিজুর রহমানকে। অন্যদের কাছেও তিনি এ লেখা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করতে থাকেন। রুপালী সম্পাদক মন্ত্রীর ফোন না ধরে আমার অপেক্ষা করতে থাকেন। আগে উনি আমার সাথে কথা বলবেন, তারপর মন্ত্রীর সঙ্গে। যাহোক, যথারীতি দুপুরে আমি অফিসে এসেতো হতভম্ব। সবার দৃষ্টিতে মনে হয় আমি একজন আসামী এবং সে সময়ে তথ্যমন্ত্রী খ্যাপা মানে ভাগ্য-লক্ষ্মী বিমুখ হওয়া। আর সেটা আমার কারণেই হলো। আমার নিজেকেও খুব অপরাধী মনে হলো। নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই মুস্তাফিজুর রহমান দ্রুত অফিসে আসলেন এবং যথারীতি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যেতেই উনি জানালেন, আজকের লেখাটি উনার পড়া হয়নি। মন্ত্রীকে কিছু বলতে পারবেন না, তাই উনার ফোন ধরেও নিজেকে রুপালীর সার্কুলেশন ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পড়ার আগে আমার কাছে জানতে চাইলেন এ লেখাতে আমি কি বুঝাতে চেয়েছি? আমি জানালাম, লেখাটি উনার বিরুদ্ধে নয়। বরঞ্চ আগের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে। লেখাতে আমি বলতে চেয়েছি, আগের সরকারগুলো নিয়োগ বন্ধ রেখে দেশে প্রচুর শিক্ষিত বেকার রেখে গেছে। তাদের ব্যর্থতা এবং ভুলের কারনে সবাইকে নিয়োগপত্র দেয়া যাবে না। এরমধ্যে অনেকেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সও হারিয়ে ফেলেছে। আমি সেই সময়ে দেশে শিক্ষিত বেকারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছিলাম, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না করে এতো বেকারদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেয়া সম্ভব হবে না। এতক্ষণে উনারও লেখাটি পড়া শেষ হয়ে গেছে। উনি লাফ দিয়ে উঠলেন এবং বললেন, এ লেখায় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছুই নেই। বর্তমান বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের লেখাই উনি চান। আমাকে বার বার ভয় না পাওয়ার কথা বললেন এবং আরো লিখে যেতে বললেন। জানালেন, এখনই তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। আমি যতটুকু জানি মন্ত্রীর মন গলানো যায়নি। এটি উনার বিরুদ্ধে লেখা এ ধারণা মন্ত্রী অনেক দিন পর্যন্ত পোষণ করেছেন। তবে বিজ্ঞাপনে হাত দেননি। এখানেই একজন মুস্তাফিজুর রহমান । যিনি আর্থিক ক্ষতির কথা না ভেবে মন্ত্রীর সঙ্গে জি হুজুর করেননি। বলেননি, ভুল হয়ে গেছে। এখনই ওই সাংবাদিককে আমি চাকরিচ্যুত করছি। তা না করে তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এ ধরনের আরো লেখার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এখন কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় অনেক সাংবাদিকের চাকুরীও যায় । লেখক পরিচিতি : কানাই চক্রবর্তী, উপপ্রধান প্রতিবেদক, বাসস। এসি   

শক্তিরূপেন, মাতৃরূপেন

দুর্গতিনাশিনী যে দেবী, তিনিই দুর্গা। দুর্গা মূলত শক্তির দেবী। শাস্ত্রমতে সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবী। তন্ত্র ও পুরাণে দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈষ্ণবমতে তিনি ভগবান বিষ্ণুর অনন্ত মায়া। শৈবমতে দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী পার্বতী হিসেবে পূজিত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে বিপদে পড়ে শিব তৃতীয়বার দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে  লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র চতুর্থবার দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন, বলছে এই পুরাণ। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনি-ঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষ নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি নির্বাচিত অংশ শ্রীশ্রী চণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যম। এতে তেরোটি অধ্যায়ে মোট সাতশোটি শ্লোকে দুর্গাকে নিয়ে প্রচলিত তিনটি গল্প- মধু-কৈটভের কাহিনী, মহিষাসুরের কাহিনী ও শুম্ভ-নিশুম্ভের কাহিনী রয়েছে। আর আছে মর্ত্যে বা পৃথিবীতে প্রথম দুর্গাপূজা প্রচলনের কাহিনী। এই কাহিনী রাজা সুরথ ও সমাধি নামের এক বণিকের। সুরথ ছিলেন পৃথিবীর রাজা। সুশাসক ও যোদ্ধা হিসেবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। কিন্তু একবার এক যুদ্ধে তার পরাজয় ঘটে। সেই সুযোগে তার মন্ত্রী ও সভাসদেরা তার ধনসম্পদ ও সেনাবাহিনীর দখল নেন। মনের দুঃখে বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে রাজা মেধা নামে এক ঋষির আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। মেধা মুনি রাজাকে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দেন। একদিন বনের মধ্যে তিনি সমাধি নামে এক বণিকের দেখা পেলেন। সমাধির স্ত্রী ও ছেলেরা তার সব টাকা পয়সা ও বিষয়সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মেধা ঋষির উপদেশে তারা দুজন দুর্গাপূজা করলেন। দেবীর বরে তাদের মনস্কামনা পূর্ণ হলো। পুরাণে বর্ণিত এই মেধা ঋষির আশ্রমটি অবস্থিত চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা পাহাড়ে, বর্তমানে এটি মেধষ মুনির আশ্রম নামে পরিচিত। ১৯০০ সালে স্বামী বেদানন্দ নামে এক সাধক দৈবাদেশ পান কড়লডেঙ্গার বেতসা নদীর তীরে যাওয়ার জন্য। আদেশানুসারে সেখানে এসে মেধষ মুনির  আশ্রমকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচান স্বামী বেদানন্দ। ১৯৭১ সালের ১৬ জুন পাকিস্তানী সেনারা এই আশ্রমে লুণ্ঠন চালায় এবং গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্দিরে পাথরের প্রতিমা প্রতিস্থাপন করে আবার পূজা শুরু হয়। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন হয়েছিল বসন্ত ঋতুতে রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধির হাতে। দেবী ভাগবত ও কালিকাপুরাণে উল্লেখ আছে, শরৎকালে শ্রীরামচন্দ্র দুর্গাপূজা করেছিলেন রাবণ বধের নিমিত্তে; এজন্য একে, ‘অকালবোধন’  বলা হয়ে থাকে। তবে, মজার বিষয় হলো, বাল্মীকির রামায়ণে রামের দুর্গাপ‚জার কোনও বিবরণ নেই। এমনকি রামায়ণের অন্যান্য ভাষার অনুবাদসমূহ, যেমন, তুলসীদাস রচিত হিন্দি রামচরিতমানস, তামিলভাষায় কাম্ব রামায়ণ, কন্নড় ভাষার কুমুদেন্দু রামায়ণ, অসমিয়া ভাষার কথা রামায়ণ, ওড়িয়া ভাষায় জগমোহন রামায়ণ, মারাঠি ভাষার ভাবার্থ রামায়ণ, উর্দু ভাষার পুথি রামায়ণ প্রভৃতিতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। বাংলায় রামায়ণের পদ্যানুবাদের সময় কৃত্তিবাস ওঝা রামের দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ করেন। বলা হয়ে থাকে, অবিভক্ত বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) রাজত্বকালে, ষোড়শ শতকে। বর্তমানে যে পারিবারিক কাঠামো সমেত পূজিত হন দেবী, তার সূচনা হয় তখন থেকেই। মতান্তরে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-১৭৮৩) বাংলায় দুর্গাপূজার সূচনা করেন। তবে দশম শতকের বিভিন্ন গ্রন্থে দুর্গাপূজার বিস্তারিত বিবরণ দেখে মনে হয় তখন থেকেই হয়তো বাংলায় দুর্গাপূজার প্রচলন ছিলো। হয়তো কংসনারায়ণ বা কৃষ্ণগচন্দ্রের সময় থেকে তা আরো জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। উনিশ শতকে কলকাতায় মহাসমারোহে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক পর্যন্ত ইউরোপীয়ানরাও দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করত। ধনীদের গৃহে বাইজি নাচ, কোথাও কোথাও যাত্রাগান,  পাঁচালি ও কবিগানের আসর বসত। এসময় ধনীরা পারিবারিক ভাবে পূজার আয়োজন করতো। ১৭৯০ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়াতে বারো জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে প্রথম সার্বজনীনভাবে আয়োজন করে বড় আকারে দুর্গাপূজা, যা বারোইয়ার বা বারবন্ধুর পূজা নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। দেবী দুর্গা সাধারণত দশভূজা, তবে শাস্ত্রানুসারে তার বাহুর সংখ্যা হতে পারে চার, আট, দশ, ষোলো, আঠারো বা কুড়ি। প্রতিমার রং হতে পারে অতসীপুষ্পবর্ণ বা তপ্তকাঞ্চনবর্ণ, কখনও বা রক্তবর্ণ। প্রতিমা ছাড়াও পূজা হতে পারে দর্পণে, অনাবৃত ভূমিতে, পুস্তকে, চিত্রে, ত্রিশূলে, শরে, খড়গে বা জলে। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে উপমহাদেশের একমাত্র রক্তবর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই পূজা। আয়োজকরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষ সর্বানন্দ দাস আসামের শিবসাগরে মুন্সিপদে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন সাধক পুরুষ। একবার কামরূপ-কামাক্ষ্যায় পূজার জন্য পাঁচ বছরের একটি মেয়ে চাইলে স্থানীয়রা তাকে একটি মেয়ে দেন। মহাষ্টমীর দিনে কুমারী পূজা শেষে সর্বানন্দ দাস দেখেন, কুমারীর গায়ের রং পরিবর্তন হয়ে লালবর্ণ ধারণ করেছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি কুমারীরূপী দেবীকে জিজ্ঞাসা করেন, মা আমার পূজা সুসম্পন্ন হয়েছে কি? উত্তরে ভগবতী বলেন, হ্যাঁ, তোর পূজা সিদ্ধ হয়েছে। এখন থেকে ভগবতীকে লাল বর্ণে পূজা করবি। পরবর্তী বছর সর্বানন্দ দাস তার নিজ বাড়ি পাঁচগাঁওয়ে রক্তবর্ণের প্রতিমায় শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। মহিষাসুর বধের কাহিনীর মাধ্যমে দেবী দুর্গার মহিমা বর্ণনা বাংলায় বেশি জনপ্রিয়। অসুরদের রাজা মহিষাসুর ছিলেন রম্ভাসুরের পুত্র। পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মা মহিষাসুরের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে বর দিতে চান। বর হিসেবে অমরত্ব চেয়ে বসেন মহিষাসুর। কিন্তু ব্রহ্মা জানান, অমরত্ব পাওয়ার অধিকার শুধু দেবতাদের। তখন মহিষাসুর যুদ্ধে অজেয় হওয়ার বর চান। নিজের দেওয়া বরে একটু ছলনা রেখে দিলেন ব্রহ্মা, বললেন, যুদ্ধে মহিষাসুর পুরুষের অবধ্য। আর সেই ছলনার ছিদ্রপথে নারীশক্তি দেবী দুর্গা যুদ্ধে বধ করলেন মহিষাসুরকে, লেখা হলো বিজয়ীর ইতিহাস। তবে সে গল্প আজ নয়। লেখক: সাংবাদিক একে//

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা জীবন শেষ হতে শুরু করেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ২৪টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি। ২৪ বছর হচ্ছে দুই যুগ অনেক বড় একটি সময়। এত দীর্ঘ একটা সময় এক জায়গায় থাকলে সেখানে শিকড় গজিয়ে যায়, সেই শিকড় টেনে উপড়াতে কষ্ট হয়, সময় নেয়। আমি সেই সময়সাপেক্ষ কষ্টের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। চিন্তা করলে মনে হয় এই তো মাত্র সেদিনের ঘটনা। প্রথম যখন এসেছি যোগাযোগ করার জন্য টেলিফোন পর্যন্ত নেই, ঢাকায় মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য কার্ডফোন ব্যবহার করার চেষ্টা করি, টেলিফোন কার্ডের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলে কিন্তু কথা শুনতে পারি না। বাচ্চাদের স্কুল নেই, যেটা আছে সেখানে নেওয়ার যানবাহন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বেতন যৎসামান্য ভাগ্যিস কয়েকটা বই লিখেছিলাম রয়েলটির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায়। এরকম ছোটখাটো যন্ত্রণার কোনো শেষ ছিল না কিন্তু যখন পেছনে ফিরে তাকাই তখন পুরো স্মৃতিটি মনে হয় একটা মধুর স্মৃতি। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ একদল ছাত্র এসে হাজির, তারা হাসি হাসি মুখে বলল, ‘স্যার টিলার ওপর পিকনিক হচ্ছে। সবাই মিলে মাছ রান্না করেছি, চলেন স্যার, আমাদের সঙ্গে খাবেন।’ আমি সরল বিশ্বাসে আরেকজন শিক্ষক নিয়ে সেই মাছ খেতে গিয়েছি। পরদিন সকালে শুনি ছাত্রদের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযোগ, তারা নাকি আগের দিন কোথা থেকে মাছ চুরি করে এনেছে। ভাইস চ্যান্সেলর রেগে আগুন কিন্তু ছাত্রদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিও বসাতে পারছেন না কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন (আমি) এবং প্রক্টর (আমার শিক্ষক বন্ধু) আগের রাতে ছাত্রদের সঙ্গে সেই চুরি করা মাছ খেয়ে এসেছি। সে অপরাধের তদন্ত হয় কেমন করে? আমি আমার ছাত্রদের বুদ্ধি দেখে চমৎকৃত হলাম! তবে কিছুদিনের ভিতরেই অবশ্য আমি নিজেই একটা তদন্ত করার দায়িত্ব পেলাম। তখন ছাত্র সংসদটি ছিল ছাত্রদলের হাতে, তারা সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করেছে। সেখানে উপস্থিত বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল রাজাকারদের অপকর্ম নিয়ে। ছাত্রশিবিরের সেটা পছন্দ হয়নি তাই তারা ছাত্রদলের এক নেতাকে ছুরি মেরে দিয়েছে। তদন্ত করে আমরা দোষী ছেলেটাকে বের করেছি, কিন্তু শাস্তি দেওয়ার আগেই সে আলীগড়ে চলে গেল! ছাত্রদলের ছেলেদের তখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক ধরনের ভালোবাসা ছিল তবে কিছুদিনের ভিতরেই জামায়াত এবং বিএনপি জোট করার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও ভালোবাসা উবে যেতে থাকে। আমার মনে আছে শিবিরের ছাত্রের হাতে ছুরি খাওয়া ছাত্রদলের সেই নেতাটিকে একদিন ক্যাম্পাসে দেখলাম। সে শিবিরের ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে গলা ফাটিয়ে আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে! ভাষা অত্যন্ত অশালীন, লজ্জায় কান লাল হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আমি নিশ্চয়ই তদন্তে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্পর্শকাতর তদন্ত আমাকে দেওয়া হতে থাকল। আমি হাবাগোবা মানুষ, তখনো জানি না যে কোনো কোনো তদন্ত করতে হয় এবং কোনো কোনো তদন্ত করতে গিয়ে কালক্ষেপণ করে এক সময়ে হিমাগারে পাঠিয়ে দিতে হয়। তাই আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের কিছু মাস্তানের তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়ে সবাইকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। একদিন আবিষ্কার করলাম ছাত্রলীগ আমাকে এবং আমাদের ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। ক্যাম্পাসে আসতে পারি না, খবর পেয়েছি তদন্তের আসামিরা গোলচত্বরে সোফা পেতে বন্দুক কোলে নিয়ে বসে আছে! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার এরকম ঘটনার কোনো শেষ নেই। একবার বাসায় বোমা পড়েছে, সেটা নিয়ে খুব হইচই। সেই হইচই দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কীভাবে কীভাবে আমেরিকায় বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চে আমার প্রাক্তন বস সেই খবর পেয়েছে। সে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ই-মেইল পাঠিয়েছে, ‘তুমি এই ই-মেইল পাওয়া মাত্র পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্লে­নে চেপে এখানে চলে এসো। এখানে পৌঁছানোর পর তোমার বেতন ঠিক করব।’ আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না। তাকে অভয় দিয়ে ই-মেইল পাঠালাম, বললাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই! এখানে এটা আমার জন্য এমন কোনো ব্যাপার নয়, এটি আমার দৈনন্দিন জীবনের খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা! কেউ যেন মনে না করে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন বুঝি কেটেছে এরকম ঝুঁকি ঝামেলার ভিতর দিয়ে, মোটেও সেরকম কিছু নয়। বেশিরভাগ সময় কেটেছে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে, সেই সময়টি হচ্ছে জীবনের পরম পাওয়া। তাদের সঙ্গে গেলেই মনে হতো আমি বুঝি আবার নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেছি, কোনো দায়-দায়িত্ব নেই সময়টি রঙিন চশমা চোখে পৃথিবীটাকে দেখার, নিরবচ্ছিন্নভাবে আনন্দ করার। তাই সেদিন সিলেটের ঝুম বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এসে পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে নেয় আর ছাত্রছাত্রীরা বলে, ‘স্যার চলেন বৃষ্টিতে ভিজি’ আমি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আমি নিশ্চিত আমার এই ছেলেমানুষী কাজকর্ম দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুরুগম্ভীর শিক্ষক কৌতুক অনুভব করেছেন, অনেকে হয়তো বিরক্তও হয়েছেন কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেননি। কেমন করে বলবেন, আমার ছাত্রছাত্রীরা তো লেখাপড়াও করেছে। বাংলাদেশের এক কোনায় পড়ে থাকা ছোট এবং অখ্যাত একটি ইউনিভার্সিটি হয়েও তারা দেশের বড় বড় ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছে। তাদের অনেকেই আমার কথা বিশ্বাস করে নিজেদের গড়ে তুলেছে, আমি সারাক্ষণ তাদের কানের কাছে বলে গিয়েছি, ক্লাসরুমে আমরা তোমাদের যেটা শেখাই সেটা হচ্ছে তোমার শিক্ষার পাঁচ পার্সেন্ট বাকি পঁচানব্বই পার্সেন্ট শিখতে হবে নিজে নিজে ক্লাসরুমের বাইরে থেকে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো সময়টুকু আমার জীবনের একটি অমূল্য সম্পদ। কিছুদিন আগে ছুরিকাহত হয়ে হাসপাতালে ছিলাম, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আমি বাসাতেও ফিরে যাইনি। সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে সিলেটে আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে চলে এসেছিলাম। আমি যখন ক্যাম্পাসে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক তাদের বেশির ভাগই এক সময়ে আমার ছাত্র ছিল আমার এক ধরনের আনন্দ হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় তারা ভীরু পদক্ষেপে সসংকোচে এসেছে এখন তারাই বড় বড় প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান, ডিন! কত বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক তার জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই যুগ কাটিয়ে দিতে গিয়ে অনেক কিছু খুব কাছে থেকে দেখতে পেয়েছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-বল্টু নিজ হাতে লাগিয়েছি, খুলেছি তার এর সমস্যাটা কোথায় আমি খুব ভালো করে জানি। আবার কেমন করে এর সমস্যাটা মেটানো হয় সেটাও আমি খুব ভালো করে জানি। কিছুদিন আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাংবাদিকরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সম্মেলন করেছে, তারা আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা করার জন্য। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা কী, আমি খোলাখুলি বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সমস্যা হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর। আমি নিজের কানে শুনেছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে বলেছেন, কোনো ভাইস চ্যান্সেলর যদি দাবি করে তিনি কোনো রকম লবি না করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন তাহলে তিনি হচ্ছেন ডাহা মিথ্যাবাদী (তার ব্যবহৃত শব্দটি ছিল ড্যাম লায়ার)। আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম এবং কল্পনা করছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার জন্য নানা ধরনের লবি করে বেড়াচ্ছেন, লবি করা সংক্রান্ত যে সব গল্প আমরা শুনে থাকি সেগুলো মোটেও সম্মানজনক না। আমার বক্তব্যটি সংবাদ মাধ্যমে চলে এসেছিল এবং ভাইস চ্যান্সেলররা আমার ওপরে রাগ হয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যদিও বক্তব্যটি আমার নিজের নয় আরেকজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের, তারপরও আমি তাদের বিবৃতি নিয়ে বাদ প্রতিবাদ করিনি। কারণ এই দেশে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যারা খাটি শিক্ষাবিদ, যাদের স্বপ্ন আছে এবং যারা দেশকে যেমন ভালোবাসেন বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও সেরকম ভালোবাসেন। আবার সবাইকে মেনে নিতে হবে এই দেশে অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যাদের এত বড় দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা নেই, শুধু ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা ধরনের বাণিজ্য করার জন্য ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন। আমার দুঃখটা এখানে, এই দেশে এখনো ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া যায়! আমরা কি দেখিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর যাওয়ার আগে শেষদিনে ৫০-৬০ জনকে একসঙ্গে মাস্টার রোলে নিয়োগ দিয়ে গিয়েছেন? সেই নিয়োগের সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ যদি সত্যি হয় তাহলে শুধুমাত্র একটা স্বাক্ষর দিয়ে তারা কত টাকা কামাই করেছেন সেটা কেউ হিসাব করে দেখেছে! আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে আমি নতুন এক ধরনের জীবনে ফিরে যাব। বহুদিন থেকে আমি আমার নতুন জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি! যাওয়ার আগে অনেক জোর দিয়ে একটি কথা বলে যেতে পারি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক করার জন্য সেখানে সত্যিকারের শিক্ষাবিদ স্বাপ্নিক ভাইস চ্যান্সেলরের নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে এখন অর্থের অভাব নেই, অর্থের অভাবে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাঁড়াতে পারছিল না এখন তারা খুব সহজেই দাঁড়াতে পারবে। শুধু দরকার একজন খাটি ভাইস চ্যান্সেলর। বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতির বাইরে থেকে সচ্ছল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়টি দেখার জন্য আমি আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকব। লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসএ/

এগিয়ে যাওয়ার গল্পে অনন্য বাংলাদেশ

সবুজে ঘেরা ছায়াসুনিবিড় গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তার চিত্র পাল্টেছে অনেকখানি। বর্ষায় গ্রামের মেঠোপথে কাদা, রাস্তায় গর্ত, কিংবা সড়ক ভেঙে পানির প্রবাহ, এসব বলতে গেলে অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা থেকে। কারণ, এখন দেশের বেশিরভাগ গ্রামেই মেঠো পথের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে পিচঢালা সরু পথ। সবুজ শস্য খেতের মধ্য দিয়ে কালো পিচঢালা রাস্তা গিয়ে ঠেকেছে মফস্বল শহরের কেন্দ্রে। যা গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। মাঠ থেকে করলা, আলু, বেগুন বা যে কোনো শাক-সবজিসহ ফসল সহজেই শহরে নিয়ে যেতে পারছেন কৃষক। বিক্রি করতে পারছেন বেশি দামে। নদীনালা বা নিজের পুকুরের মাছও ভ্যান বা ছোট পিকআপে করে নিয়ে সরাসরি পাইকারি বাজারে বিক্রি করছেন মাছ চাষী। এতে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্মও কমেছে খানিকটা। ফলে লাভের পুরোটাই যাচ্ছে চাষী বা কৃষকের পকেটে। আবার, বিদ্যুতের আলোয় সন্ধ্যার পর আলোকিত হয়ে উঠছে কৃষকের ঘর। বাচ্চারা পড়ালেখা করছে আনন্দের সাথে। কৃষকের কুঁড়ে ঘর পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কুঁড়ে ঘর, শনের ছাউনি বা টিন ঘেরা দেয়ালে জায়গা করে নিয়েছে ইট। গেল এক দশক ধরেই গ্রামের সাথে আমার নিবিড় যোগাযোগ। পেশাগত কাজে রাজধানী শহরে থাকলেও সুযোগ পেলেই ছুটে যাই গ্রামেগঞ্জে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, এখন বেশিরভাগ গ্রামেই বদলে যাওয়া এই দৃশ্য। যা মনে আনন্দের দোলা দেয় গ্রামবাসীর। গ্রামের নারীরা এখন সাজুগুজুর জন্য পার্লারের সন্ধ্যানে শহরে যায়। বেশ কিছু মফস্বল অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে নারীদের জন্য পার্লার বা শরীরচর্চার জন্য জিম। আর, প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীরাও আগের চেয়ে বেশ সমৃদ্ধ। তাদের চাষাবাদ বা কৃষিভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গেল কয়েক বছর পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার এমন তথ্যেরই দেখা মেলে। একটি সুখকর চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে বাংলাদেশকে নিয়ে একসময় কটাক্ষ করেছিলেন বিশ্বমোড়লরা, তারাই আজ বিস্ময়ের সাথে দেখছেন বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া। এক সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতির লালসবুজের দেশটি এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে। দরিদ্র কিংবা স্বল্পোন্নত পরিচয়ের ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে নতুন পরিচিতি উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রযাত্রা। যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান সূচকে এগিয়ে যাওয়ারই অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল বক্তৃতার বাগাড়ম্বরতাই নয়, দৃশ্যমান উন্নয়ন, সাথে পরিসংখ্যানের খতিয়ান। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি আয় কিংবা দেশের উন্নয়নে বিদেশি অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, ডলারের দাম বাড়ায় বেড়েছে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসা। গত একবছরেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। এ আয় গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, আর ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার আসে এর আগের বছরে। প্রবাসী আয় বাড়ায় বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। গেল সপ্তাহ পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১৭ কোটি ডলারে। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের প্রবাসী আয় বিতরণের অভিযোগে গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর বিকাশের ২ হাজার ৮৮৭টি এজেন্টের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮৬৩টি এজেন্ট হিসাব বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই বড় হতে থাকে দেশের আয়ের অন্যতম এই উৎস। ইতিবাচক ধারা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিদেশি অর্থায়নেও। গেল অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ পাওয়া গেছে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। এত বেশি অর্থছাড় আগে কখনই হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অর্থ ছাড় হয়েছিল ৩৫০ কোটি ডলার। এ হিসাবে আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে অর্থ ছাড় বেড়েছে ৭১ দশমিক ৪১ শতাংশ। গত অর্থবছর থেকে সরকারের বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে দ্রুত অর্থছাড় করছে দাতা সংস্থাগুলো। জাইকার অর্থায়নে মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। গুলশানে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর বেশ কয়েক মাস এ সংস্থার অর্থায়নের চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ ছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এগুলোর বাস্তবায়ন আবার শুরু হয়, বাড়তে থাকে অর্থ ছাড়ও। মেট্রোরেল প্রকল্পে ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণ দেবে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ায় রাশিয়ার অর্থছাড় বেড়েছে। এ কেন্দ্রের জন্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার অর্থছাড় হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে রাশিয়া ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। আবার, পোশাক খাতের ওপর ভর করেই অব্যাহত আছে দেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানি পরিস্থিতি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো বলছে, গেল অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ হাজার ৩৭২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার পণ্য রফতানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ হাজার ১৬২ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে পণ্য রপতানি হয়েছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ডলারের। সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া যায়নি। এই হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। গেল অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৩৭২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। পোশাক ছাড়াও পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রকৌশল পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়নি। সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনীতির সবসূচকেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত রাখতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারক সংস্থা মুডিস, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস এবং ফিচ রেটিংয়ের কাছ থেকেও। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শীর্ষ এই তিন রেটিং সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। যা ক্রমাগত উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত কর কাঠামোর সংস্কার এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য গৃহীত উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চপ্রবৃদ্ধির অর্জনের পথে রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সাম্প্রতিক পদক্ষেপসহ প্রবৃদ্ধির সহায়ক শর্তগুলো দৃশ্যমান। রেটিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসছে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে একটি ধাক্কা লাগতে পারে। তবে তা দক্ষ নেতৃত্বে উৎরে যাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান অবস্থান থেকে আরও সামনে এগোতে হলে বাংলাদেশকে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। বর্তমান এই রেটিং বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিকর। এই রেটিংয়ের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবেন। বাংলাদেশ বিদেশে বন্ড বিক্রি করে টাকা নিতে চাইলে সুদের হার কম হবে। আরও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। দরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রযাত্রায় পুরো কৃতিত্বই জননেত্রী ও দেশপ্রধান শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রীর সফল নেতৃত্বেই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে দেশ ও বিদেশ থেকে। লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, এফবিসিসিআই।এসএইচ/

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সন্ত্রাসের যথার্থ বিচার

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সংঘটিত গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনা নিয়ে তৎকালীন জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ এখন সম্যকভাবে পরিচিত। সেই বীভৎস হত্যাযজ্ঞের মামলার রায় গতকাল ঢাকার বিশেষ আদালত ঘোষণা করেছেন। রায়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের ফাঁসি হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বর্তমানে পলাতক তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডের তালিকায় আছেন বিএনপির আরো কয়েকজন প্রতাবশালী নেতাসহ সে সময়ের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আদালত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তাতে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়েছে, যারা শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের রক্ষকের আসনে বসেছিল তারাই রাষ্ট্রকে হত্যা করার জন্য ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি চালিয়েছিল। আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দুই সামরিক শাসক এবং তাদের নতুন প্রতিভূদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাংলাদেশের পরিবর্তে ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি স্টাইলের আরেকটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ নামের খোলসে এখানে প্রতিষ্ঠিত করা। জিয়াউর রহমান কর্তৃক জামায়াতসহ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির পুনরুত্থান, বাহাত্তরের সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সব শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাতিল, রাষ্ট্রীয় অঙ্গন থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা সব মুছে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ইতিহাস বিকৃতি, বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিচার করা যাবে না এই মর্মে আইন করাসহ এরশাদ কর্তৃক সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের সংযোজন এবং খালেদা জিয়া যখন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানান, তখন এঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ থাকে না।১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত এঁদের সবারই ধারণা ছিল, দেশের মানুষকে ধর্মান্ধতার বড়ি গিলিয়ে এবং ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে তাঁরা চিরদিন ক্ষমতার মধু পান করতে পারবেন। কিন্তু কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তাঁরা বুঝতে ভুল করেছেন ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতির একটা অদৃশ্য সহজাত শক্তি আছে, যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা অসম্ভব। এই অমোঘ সত্যকে তাঁরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা যেভাবে দেশে ফিরলেন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হলেন, এটা ছিল ওই ধর্মাশ্রয়ী মধু ভক্ষণকারীদের ধারণার বাইরে। তাঁরা ভেবেছিলেন জীবনের ভয়ে শেখ মুজিবের দুই এতিম মেয়ে আর কোনো দিন দেশে ফিরবেন না। ফাঁকা মাঠে চিরকাল মধু খাবেন। কিন্তু শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর যত দ্রুতগতিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী উদার প্রগতিশীল মানুষ এবং তরুণ প্রজন্ম যখন জেগে উঠতে শুরু করল, তখন ওই সম্মিলিত অপশক্তি প্রমাদ গুনতে নেমে পড়ল। তারা বুঝতে পারল শেখ হাসিনা বেঁচে থাকলে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়বে এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে নিঃশেষ করার অপকর্মে যারা দায়ী তাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তাই ওই অপশক্তির প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আবার কখনো সম্মিলিতভাবে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ কারণেই দেখা যায়, গত ৩৭ বছরে শেখ হাসিনার ওপর ১৯ বার হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু বিপরীতে অন্যান্য দলের টপ নেতৃত্বের কারো গায়ে একটি টোকাও পড়েনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় চলে এলে তাদের হিসাব-কিতাব আরো এলোমেলো হয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে তাঁকে সহজে হত্যা করা যাবে না। বহুবিধ পন্থা ও কৌশলের অংশ হিসেবে তারা ধর্মান্ধ উগ্রবাদী জঙ্গিদের উসকে দেয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পুনর্জাগরণ ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার ভেতর দিয়ে ওই অপশক্তি নিশ্চিত হয়ে যায়, শেখ হাসিনা জীবিত থাকলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পূর্ণ বাংলাদেশের পুনরুত্থান তারা কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, তারা আরো বুঝতে পারে, শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় এলে একাত্তরে যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তারা কেউ রেহাই পাবে না। প্রতিবেশী দেশের আরেকটি বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শেখ হাসিনার উত্থানে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এরা হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, যাদের পৃষ্ঠপোষক আবার বাংলাদেশের পুরনো শত্রু পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। আইএসআই ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কাশ্মীরি জঙ্গি ইউসুফ ওরফে মাজেদ ভাটের এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পঁচাত্তরের ঘটনার জের ধরে যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী হয়েছে এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ নয়, বরং ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানি স্টাইলের দেশ চায়, তারা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। শেখ হাসিনাকে চিরতরে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রসহ বহুবিধ পন্থার অংশ হিসেবে সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহারের পথ বেছে নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। এই গ্রেনেড হামলার মূল টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে কৌশল ও লক্ষ্য ছিল পঁচাত্তরের মতো। আওয়ামী লীগের সব সিনিয়র নেতাই ছিলেন এক মঞ্চে। সেদিন আক্রমণকারীদের মিশন সফল হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকতেন না।দীর্ঘ অনুসন্ধান ও শুনানির পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা ও আগ্রহের জন্য মিডিয়ায় অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়, যার দু-একটি এখানে উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাওয়া ভবনের পরিকল্পনায় ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, বাবর গ্রেনেড সরবরাহ করেন এবং ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে কাজ করে হরকাতুল জিহাদ। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গিদের আক্রমণের জন্য সহায়তা করে প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার একাংশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনের স্বীকারোক্তি, আর্জেস গ্রেনেড আসে পাকিস্তান থেকে। তৃতীয়ত, ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর বঙ্গবন্ধুর খুনি রশীদ-ডালিমের ফোন বাবরের কাছে—হাসিনা বাঁচল কী করে? বিএনপি এখন যা-ই বলুক না কেন, কিছু ভাইটাল প্রশ্নের উত্তর তো তাদের থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রথম প্রশ্ন—তারা প্রহসনের জজ মিয়া নাটক সাজালেন কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন—অবিস্ফোরিত গ্রেনেডসহ ঘটনার সব আলামত নষ্ট এবং ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলা হলো কেন? তৃতীয়ত, পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড বাংলাদেশে এলো কী করে? পিওএফ (পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) চিহ্নিত গ্রেনেড পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া অন্য কারো হাতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া গ্রেনেড নিক্ষেপ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থার চোখ এড়িয়ে আক্রমণকারীরা কোথায়, কিভাবে এই প্রশিক্ষণ নিল।বিএনপি যেহেতু তখন ক্ষমতায় ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর তো তাদেরই দিতে হবে। সে সময়ের জামায়াত-বিএনপি সরকার প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য কিভাবে জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল তার কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় ২০০৯ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রধান দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মিথ্যা অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার পর ওই পত্রিকায় প্রতিবেদকের কাছে সেই করুণ ও নির্মম কাহিনির বর্ণনা দেন আলোচিত নোয়াখালীর দিনমজুর জজ মিয়া। ২১ দিনের রিমান্ডসহ ২৭ দিন ঢাকার সিআইডির কার্যালয়ে বন্দি করে অমানুষিক নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের ভয়, আবার প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য প্রস্তুত করা হয় জজ মিয়াকে। জবানবন্দি দেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রতিবেদকের কাছে বর্ণনা করতে গিয়ে জজ মিয়া বলেন, হাত-মুখ ধুয়ে আবার ম্যাজিস্ট্রেটের কামরায় আসি। আসার পর ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, জজ মিয়া, তুমি এখানে সই করো। আমি বলি, স্যার, আমার কোনো অসুবিধা হবে না তো? ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, তুমি রাজসাক্ষী হবে। পরে তোমাকে ওনারা (সিআইডি কর্মকর্তাদের দেখিয়ে) ছাড়িয়ে নেবেন। যদি সই না দাও, তাহলে তুমি আসামি হবে, তোমার ফাঁসি হবে। আমি সই করে দিই। এরপর ওই রুমে বিরিয়ানির প্যাকেট আনা হয়। আমি, ম্যাজিস্ট্রেট, মুন্সি আতিক, আবদুর রশীদ একসঙ্গে বিরিয়ানি খাই। এত বড় একটা বীভৎস হত্যাকাণ্ড নিয়ে যাঁরা এ রকম মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর তামাশা করলেন, তাঁদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত অমোঘ নিয়মেই হয়। সেটাই আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সব সাজানো নাটক ও ষড়যন্ত্র তছনছ হয়ে যায়। অভিযুক্ত জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে তা মানুষের কাছে আরো পরিষ্কার হয়ে যায়।২১ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সব দুর্বৃত্তায়নকে ছাড়িয়ে গেছে। সব ধরনের মানবিক ক্ষমা ও অনুকম্পার অযোগ্য অপরাধ যাঁরা করেছেন তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রকে নিষ্ঠুর হতে হবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং এ রকম নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে। ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ নাটকের গুরু লুৎফুজ্জামান বাবর এখন নিজেই আসল শত্রু প্রমাণিত হয়ে বাংলাদেশের আইন ও আদালতের খাঁচায় আবদ্ধ হলেন ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার যথার্থ বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আরেকটি কলঙ্ক থেকে মুক্ত হলো।লেখক : কলাম লেখক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকsikder52@gmail.com

সিনহার স্বপ্নভঙ্গ এবং মিথ্যার বেসাতি

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বপ্নচারী এক মানুষ, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। আবার স্বপ্ন যে সত্য হতে হবে এমন কোনো কথাও কিন্তু নেই। স্বপ্নের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে বলুন? কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হলে সেটাকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শিখতে হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো এমন অবস্থায় ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ লিখেই ফেললেন। কিন্তু আমাদের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখলেন এক বই ‘ব্রোকেন ড্রিম’। এই বই নিয়েই যত হইচই! এখন কথা হলো ‘ব্রোকেন ড্রিম’-এ তিনি এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন যার বৃত্তান্ত নিছক সাংঘর্ষিকই নয় বরং ডাহা মিথ্যাচার। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার লেখা বই ‘ব্রোকেন ড্রিম’-এ উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করতে তিনি একবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। বিচারপতি সিনহা লেখেন I decided to approach the Prime Minister. Accordingly, I requested a meeting with the Prime Minister at a secret place. I got a favorable reply within fwe hours. ’অর্থাৎ বিচারপতি সিনহা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। তো সেই উদ্দেশ্যে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি ‘গোপন জায়গায়’ দেখা করার জন্য অনুরোধ জানালেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সম্মতি জানানো হয়। কী আশ্চর্য ব্যাপার! যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য বিচারপতি সিনহাকে একটি ‘গোপন জায়গায়’ যেতে হবে কেন? কোন আইনে লেখা আছে যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের প্রধান বিচারপতি দেখা করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? এটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে করতে হবে কেন? সরকারের তিনটি অঙ্গ: আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগ। তিনটি বিভাগের সমন্বিত প্রয়াসেই তো সরকার চলবে, তাই না? তো এতে এত ঢাক ঢাক গুড় গুড়ের কি আছে? এছাড়া সুপারিশগুলোর কথা তিনি নিজেই তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। এই যেমন, যুদ্ধাপরাধ-বিচারে গতি সঞ্চার করার জন্য দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ, একই উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত বিচারপতি এবং প্রসিকিউটর নিয়োগের সুপারিশ, ইত্যাদি। এর সবকিছুই নাকি তৎকালীন আইনমন্ত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সুপারিশ করেছিলেন কিন্তু ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাতে রাজি হননি বলে বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আর সে কারণেই নাকি তৎকালীন আইনমন্ত্রী বিচারপতি সিনহার শরণাপন্ন হন যেন বিচারপতি সিনহা নিজে একবার এই ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। সবই বুঝলাম, কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার বিষয়টি বোধগম্য হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যেই প্রটোকল মেনে চলতে হয় সেখানে তিনি আদৌ কোনো ‘গোপন জায়গাতে’ যেতে পারেন কি না সন্দেহ! তার উপরে একজন বিচারপতির সাথে দেখা করার জন্য তিনি প্রটোকল ভেঙে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করতে যাবেন সেটা আসলে কতখানি বিশ্বাসযোগ্য? এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তথাকথিত সেই ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার পর কি কি কথা হয়েছে। যেহেতু ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা হয়েছে, তাই বুঝে নিতে হবে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ এবং বিচারপতি সিনহার কথাবার্তার কোনো সাক্ষী কিন্তু নেই! সেই গোপন সাক্ষাৎকালে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যদি কিছু বলে থাকেন, তাহলে তার একমাত্র সাক্ষী হয়ে আছেন বিচারপতি সিনহা। তো সেই বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে এই ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন: ÔWhen we met I told the Prime Minister the purpose of my meeting. The moment I raised the point, I felt she reacted sharply.Õ অর্থাৎ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো তখন বিচারপতি সিনহা তার দেখা করার উদ্দেশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন। আর শোনামাত্রই ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ ভীষণ প্রতিক্রিয়া দেখালেন বলে বিচারপতি সিনহার মনে হলো। খেয়াল করুন, এটা কিন্তু নিতান্তই বিচারপতি সিনহার মনে হওয়া ব্যাপার। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ভীষণ প্রতিক্রিয়া’ দেখার তো আর কোনো সাক্ষী নেই! এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছেন: ÒThen she became emotional and explained to me the suffering she had undergone in getting justice for the trial of those who had murdered her parents and younger brothers. She told me how much money she spent for collecting and safeguarding witnesses and said the mental pressure she withstood was beyond comprehension. She was intensely interested in putting the offenders to justice, but she had to cross a lot of hurdles. Given that backdrop she straightaway rejected the proposal of the Ministers.Ó অর্থাৎ বিচারপতি সিনহার মতে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাঁর এই ‘ভীষণ প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়ে পরক্ষণেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ বিচারপতি সিনহাকে বোঝানো শুরু করলেন যে, তাঁর নিজের (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) বাবা-মা এবং ছোট ভাইদের বিচার করতে তাঁকে কত অর্থকষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা, বাধা-বিপত্তি সইতে হয়েছে। আর এই কারণেই নাকি ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে কোনো সুপারিশ শুনতে রাজি নন। আচ্ছা, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ যে বিচারের কথা বলছেন সেটা কি শুধুই তাঁর পারিবারিক বিষয়? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর পরিবার কি আমাদের কেউ নন? এটা ঠিক যে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাঁর ঔরসজাত কন্যা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির জনক আর তাই তাঁর হত্যার বিচার আমরা সবাই চেয়েছি। এই রাষ্ট্র চেয়েছে। আর সেই বিচার হয়েছে এই বাংলার মাটিতে। কিন্তু বিচারপতি সিনহা যেভাবে ঘটনা বর্ণনা করলেন তাতে তো মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ ছাড়া আর কেউই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচার চায়নি। কত বড় মিথ্যাচার! এরপর বিচারপতি সিনহা তার লেখা বই-এ উল্লেখ করেছেন: ÒShe frankly conceded that corruption was rampant, and since the offenders were powerful persons having money and muscle, and they could influence any official or witness and this could not be tackled by the administration all the time. Moreover, forty years had elapsed in the meantime, and it was extremely difficult to collect witnesses as most of them are not alive now. She had set up the tribunal chiefly to meet her election pledge and there was nothing more than that she was prepared to do.Ó অর্থাৎ বিচারপতি সিনহার মতে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ তাকে জানালেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করার বিষয়টি অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার, এর সফলতা নিয়ে তাই ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ সন্দিহান বিভিন্ন কারণে। প্রথম কারণ বাংলাদেশে সবাই দুর্নীতিবাজ, ন্যায়বিচার তাই করা যাবে না। এর মধ্যে ৪০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং জীবিত সাক্ষী খুঁজে পাওয়া ভার। তাই তিনি এই বিচার নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। আর এছাড়া বিচারপতি সিনহার কাছে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ নাকি অকপটে বললেন যে, তিনি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছেন মূলত তাঁর নির্বাচনি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে, সুতরাং ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আর কিছু করার জন্য তিনি প্রস্তুত নন। বিচারপতি সিনহা তার লেখা বইয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার এই সাক্ষাতের কথাবার্তা থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করার বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেন কোনো গুরুত্বই রাখে না। এটা শুধু একটা লোক দেখানো পদক্ষেপ সরকারের। সত্যি কি তাই? যদি সত্যি হয়েই থাকে তাহলে আমরা ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এত কাঠখড় পোড়ালাম কেন? এতগুলো মামলার রায় হলো কী করে? এরই মধ্যে ৬টি ফাঁসির দ- কার্যকর হলো কী করে? সরকার এত বৈরী-সহিংস পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই বিচারকে এগিয়ে নিয়ে গেল কেন? আন্তর্জাতিক বিশ্বে সরকারকে এত প্রতিকূলতা আর ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হলো কেন? যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিচারপতি সিনহা যে জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। আর সেজন্যই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ‘গোপন জায়গাতে’ দেখা করার বিষয়টির অবতারণা করেছেন। এই আলাপচারিতার কোনো সাক্ষী নেই। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ আদৌ এ ধরনের কথা বলেননি বা বলতে পারেন না। আমরা যারা যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছি তাহলে কাজ না করে বসে থাকলেও তো পারতাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, নানা সমালোচনার মোকাবেলা করেছি, নানা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর সরাসরি সম্পৃক্ত আছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়ে অটল থাকতে, আপসহীন থাকতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি ন্যায় বিচারের পক্ষে সোচ্চার থাকতে। তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে কখনো খাটো হতে দেননি আন্তর্জাতিক মোড়লদের হাতে অথবা দেশের ভেতরে চেতনা ব্যবসায়ীদের কাছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে কখনই তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। জন কেরি, বান কি মুন, হিলারি লবি গ্রুপের চিঠি, ফোনকল বা চাপের মুখে হার মানেননি। যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যেতে পারলে তাঁর সরকার আরও স্বস্তিতে দিনাতিপাত করতে পারতো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ অন্যরকমও হতে পারতো। কিন্তু না, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ সেটা হতে দেননি। উল্টো আমি দেখেছি বিচারপতি সিনহা প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধ বিচার বন্ধ করতে চেয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করতে চেয়েছেন। বিচার নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। প্রকাশ্য আদালতে নিজেকে শান্তি কমিটির সদস্য বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে পারেননি। আর তাই তার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এ কারণে এখন তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ নানাজনকে নিয়ে নানা উদ্ভট ও অবিশ্বাসযোগ্য কথা রটিয়ে ভগ্ন-স্বপ্নের অলিগলিতে মিথ্যাচারের বেসাতি করে বেড়াচ্ছেন। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক / এআর /

অনুরোধ সত্ত্বেও আইভি আপা সেদিন ট্রাকে উঠেননি : ড. মাহফুজা

২০০৪ সালের ২১আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ ছিল। আমরা জানি, এদেশে মাঝখানে ( ২০০১-০৬) সন্ত্রাসের রাজনীতির উত্থান ঘটেছিল। সন্ত্রাস বিরোধী জনসমাবেশ করার জন্যই আওয়ামী লীগ সভা ডেকেছিল। সেই সমাবেশে আমি নিজেও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে নিজের কোন কাজে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সমাবেশে যাওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অনেকেই ট্রাকের উপর ছিলেন। যে ট্রাকটিকে মঞ্চ বানানো হয়েছিল। অনেক নেতা আইভি আপাকে (মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ‍যিনি মাহফুজা খানমের বোন) বলেছিলেন ট্রাকে উঠে আসার জন্য। কিন্তু আইভি আপা ট্রাকে উঠেননি। না বললেই নয়, আপার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি সব সময় সাধারণ নেতাকর্মীদের পাশে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি সব সময় তার কর্মীদের সঙ্গে থাকতেন। এটা তার একটা আদর্শিক বোধ ছিল। আপনারা জানেন, সমাবেশটি ছিল সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশ। আর সেই সমাবেশেই বোমা ফেলা হয়। যে বোমা ফেলা হয়েছিল তা ছিল সেনাবাহিনী ব্যবহৃত বোমা। যে দল এদেশে স্বাধীনতা এনেছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছিল সেই দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশুন্য করার জন্য এ হামলা চালানো হয়েছিল। ওই দিন আমি সন্ধ্যায় টেলিভিশন দেখছিলাম। তখন এ ঘটনা জানতে পারি। আইভি আপা খুব স্মার্ট ছিলেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও টিপটাপ চলতেন। টিভির খবরে যখন আপাকে দেখানো হচ্ছিল তখন দেখলাম আপার চেহারায়, শাড়িতে প্রচুর রক্ত লেগে রয়েছে। তাঁর পা দুটি উড়ে গিয়েছিল। আপাকে পরে সিএমএইচে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সিএমএইচে দেখা করতে পারিনি। এখানে বলা হয়নি, আমরা ২০০০ সালে পেশাজীবী নারী সংগঠন করেছিলাম। আমি ছিলাম সেই সংগঠনের সভানেত্রী। ডা. দীপু মনি, শিরীন শারমীন সবাই সেই সংগঠনে জড়িত ছিল। এ প্রজন্ম হয়তো জানে না, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নয়মাস আইভি আপা মনপ্রাণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বীরাঙ্গনাদের ডেলিভারি করানো, যুদ্ধ শিশুদের বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া নারীদের কাউন্সেলিং করা সহ নানা কাজে তিনি তখন সক্রিয় ছিলেন। আমরা কয়েকজন মিলে জাহাঙ্গীর গেইট পর্যন্ত গিয়েছিলাম। এরপর আমাদেরকে আর যেতে দেওয়া হয়নি। এর কয়েকদিন পর তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। দেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে আইভি রহমান ছিলেন পরিচিত মুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীকার আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, নারী আন্দোলনে আইভি আপা ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশের মানুষের জন্য আইভি আপা ছিলেন উদাহরণ। আইভি অাপার হত্যা মামলার রায়ের জন্য আমাদেরকে চৌদ্দ বছর অপেক্ষা করতে হলো। আইভি অাপার দুই মেয়ে ও এক ছেলে চৌদ্দ বছর কেঁদেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লু ভাই (জিল্লুর রহমান) ও অাইভি অাপার সংসারও অনুকরণীয়। তাদের স্বামী-স্ত্রীর বুঝাপড়া ছিল বেশ ভালো। দু`জনেই রাজনীতি করতেন। নিজ নিজ অবস্থা থেকে দু`জনেই বেশ অবদান রেখে গেছেন। ১৪ বছর পর মামলাটির রায় হলো। আমি মনে করি, বিচারক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেছেন। এই রায় কার্যকর হোক সেই প্রত্যাশা আমি রাখছি। আমরা দীর্ঘদিন বিচারহীণতার সংস্কৃতিতে ছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক বিচার কার্য সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে আমিদেরকে সেই কলংক মুছিয়ে দিচ্ছে। লেখক : ড. মাহফুজা খানম গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানের ছোট বোন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অা অা// এআর

২১ আগস্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন উদাহরণ : তুরিন

মরণঘাতি রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য নিষ্ঠুর হামলা, তা যেখানেই ঘটুক না কেন, বিনা শাস্তিতে পাড় পেয়ে যেতে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ আগেও এ ধরণের হামলার শিকার হয়েছে যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার ও আত্মীয়দের হত্যা করা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এই হত্যাযজ্ঞের মাত্র ৪১ দিনের মাথায় হত্যাকারীদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে অর্ডিন্যান্স পাস করা হয় যেন হত্যাকারীদেরকে কোন আইনী প্রক্রিয়া বা অন্য কোন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা না যায়। যাইহোক, পরে এই অধ্যাদেশটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং বিখ্যাত "বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা" দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটায় এবং দেশের আইন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে।  

উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশে

শুক্রবার ছুটির দিন। এ দিন সাধারণত মানুষ একটু ঘোরাঘুরি করে থাকেন। তবে, যদি কোনো মেলা বা উৎসব হয় তাহলে সেখানেই মজাটা অন্যরকম। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার এই তিনদিন ছিল জাতীয় উন্নয়ন মেলা। এ মেলাকে ঘিরে রাজধানীতে দেখা গেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটা অন্য রকমভাব। শুক্রবার মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতার অভাব নেই বিন্দুমাত্র। স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্টলে গিয়ে মিললো অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। এখানে যেতেই তরুণ চিকিৎসকরা জানতে চাচ্ছেন কি সেবা চান। তারা খুব আনন্দের সঙ্গে ওজন মাপেন ও পেসার পরীক্ষা করে দিচ্ছেন। খুব উৎসাহ নিয়ে এ সেবা দিচ্ছেন দর্শকদের। কৌতুহলী হয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো-আপনারা কি এ সেবা আপনাদের মেডিক্যালে দেন। তাদের একজনের সহজ স্বীকারোক্তি না। এটা এ সেবা মেলায় দেওয়া হচ্ছে। আর মেডিক্যালে এ সেবা নিতে হলে টাকা দিয়ে টোকেন নিয়ে এ সেবা নিতে হবে। উল্লেখ্য, মেলায় বিনা পয়সায় খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অন্য সময় এমনটা হয় না তাদের কথা থেকেই প্রতীয়মান মনে হলো। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- রাজধানীর এই উন্নয়ন মেলায় প্রায় সব স্টলেই খুব সহজেই মানুষকে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রমের বর্ণনা সম্মেলিত লিফলেট। এতে তাদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই বলেই মনে হলো। এ রকম হয়তো সারাদেশের উন্নয়ন মেলায় লক্ষ্য করা গেছে নিশ্চয় হয়তো এমনটা। এটা নিশ্চয়ই ভালো কাজ। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়ন তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। এটা মন্দ কিসের। ঢাকা জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. ফেরদৌস জানান, এবারের উন্নয়ন মেলায় মোট ৩৩০টি স্টল ছিল। এসব স্টলের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০টি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ১৯টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৬টি, কৃষি মন্ত্রণালয় ১৬টি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০টি এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ৯টি স্টলে কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করে। সারা দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের কথা বারবার জাতিকে স্মরণ করে দিয়ে যাচ্ছেন। এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই। দেশের উন্নয়নের কথা সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও প্রচার করে যাচ্ছেন। দেশের সার্বিক উন্নয়ন হচ্ছে তাদের মতে। আরও উন্নয়ন হয়তো হবে ভবিষ্যতে এতে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নয়ন মেলায় সরকারের নানা উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে জাতির সামনে। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। এটা সরকারের বড় সাফল্য। সরকার সাধারণ জনগণের কাছে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। এখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজেই যোগাযোগ করা যায়। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য কোন খাত নেই সেই খাতে সরকার উন্নয়ন করে নাই। সরকার দেশের যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে বলে তাদের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে। তাদের দাবির পক্ষে যথেষ্ট কারণও রয়েছে বটে। বিশেষ করে সরকার পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করছে। পদ্মা সেতু এখন জাতির কাছে দৃশ্যমান। এটা আর এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। এছাড়াও রাজধানী ঢাকায় যানজট কমানোর লক্ষ্যে সরকার একের পর এক উড়াল সেতু নির্মাণ করে যাচ্ছে। এতে অনেকটা যানজটও কমেছে বলে অনেকেই মনে করেন। এছাড়াও রাজধানীবাসীর যানজটের হাত থেকে রক্ষা করতে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এ প্রকল্প শেষ হলে রাজধানীতে যানজট অনেকটাই কমে যাবে বলেই মনে হয়।এক অর্থে বলা যায়, সরকার রাজধানীর উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর ফলে রাজধানীতে মানুষ সুফল ভোগ করবে। উন্নয়ন মেলাতে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় বড় উন্নয়নের বড় বড় চিত্র চোখে পড়লো। এটা মন্দ কিছু নয় মনে হয়। প্রশ্ন হলো- উন্নয়ন মেলায় সরকারের উন্নয়নের চিত্র যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের এসব ব্যক্তি যেভাবে সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়েছে এই তিন দিন। সেভাবে কি সারা বছর তারা সেবা দিবে? উন্নয়ন মেলায় সব চেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্যাভেলিয়নে। এর কারণ ছিল মুহূর্তের মধ্যেই পাসপোর্ট নবায়ন করে দেওয়া হতো এ মেলায়। এ তিন দিন সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল এ স্টলে। আগ্রহীরা লাইন ধরে এ সেবা নিয়েছেন। মেলায় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো তারা খুব সহজেই এ সেবা নিতে পেরেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ মেলা শেষ হয়েছে। এর পর কি এ সুবিধা পাবেন। মেলায় এ ধরনের সেবা দিতে পারলে অন্য সময় কেনো নয়। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে প্রায় অভিযোগ উঠে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় না। শুধু এ বিভাগ নয় সরকারি অন্যান্য বিভাগেরও একই অবস্থা এমন অভিযোগ অনেকেই করে থাকেন। তাহলে শুধু কি বছরে শুধু তিন দিনই ভালো সেবা পাওয়া যাবে আর বছরের বাকি দিনগেুলোতে নয়। সরকার দাবি করছে, সারাদেশে সব খাতে উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ কথার যৌক্তিকতা কতটুকু রয়েছে? উত্তরের জেলা, কুড়িগ্রাম বা গাইবান্ধার প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে কি উন্নয়ন সমানভাবে হচ্ছে। এমন কিছু গ্রাম রয়েছে যেখানে বিদ্যুতের আলোই ঠিক মতো এখনও যায়নি। তাদের কি ধরনের উন্নয়ন করা হচ্ছে। তারা তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারে না এমন কথা প্রায় শোনা যায়। তারা কি উন্নয়নের ভাগিদার হলো? যোগাযোগ খাতে অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে। রেল যোগাযোগেও অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন সমানভাবে হচ্ছে। উত্তর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়,গাইবান্ধা, রংপুর, বগুড়া জেলার জন্য দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু রয়েছে। একটি লালমনি এক্সপ্রেস ও আরেকটি রংপুর এক্সপ্রেস। এ দুটি ট্রেনের ওপরই ভরসা করতে হয় এসব জেলা ও আশে পাশের জেলার মানুষদের। আর এসব জেলার মানুষকে সেই নাটোর-ঈশ্বরদী হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে যেতে হয়। কিন্তু বগুড়া থেকে যদি সরাসরি বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত একটা লাইন তৈরি করা হয়, তাহলে উত্তর অঞ্চলের সঙ্গে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার দূরত্ব কমে যাবে। কমে যাবে যাত্রাপথ। এই পথের জন্য কাজ চলছে এমনটা শোনা যায় অনেক আগে থেকেই কিন্তু এব বাস্তবায়ন চোখে পড়ার মতো কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। তাহলে উন্নয়ন হচ্ছে সেটা কি সুষম উন্নয়ন। শুধু এই এলাকায় নয়, সারাদেশেই সুষম উন্নয়ন করা দরকার। শুধু ঢাকা শহর বা চট্টগ্রাম নয়। এমনি কি শুধু মহানগরগুলোর উন্নয়ন করলেই হবে না। সারা দেশের উন্নয়নের চিন্তা করা দরকার। অবশ্যই সেটা সুষম টেকসই উন্নয়ন হওয়া উচিৎ। দেশের সার্বিক খাতে টেকসই উন্নয়ন দরকার। শুধু মেলায় যেন উন্নয়ন সীমাবদ্ধ না থাকে। বছরের শুধু তিন দিন নয়, ৩৬৫ দিনেই সরকারি কর্মকর্তারা সেবা দিবেন হাসিমুখে সাধারণ মানুষ এমনটাই চায়। পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়। শুধু শহর নয় কিংবা জেলা শহর নয়, প্রত্যন্ত চর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ুক উন্নয়ন। সেটা দেশের যে প্রান্তেই হোক। হোক না উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম। সব মানুষ উন্নয়নের সমান অংশীদার হোক এটাই সাধারণ মানুষ আশা করে মনে হয়। দেশের সব মানুষের উন্নয়নের জন্য যা করণীয় সংশ্লিষ্টরা এমনটাই ভাববেন। শহরের একটা শিক্ষার্থী যে সুবিধা পান গ্রামের সেই শিক্ষার্থীও যেন সেই সুবিধা পায়, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। লেখক: সাংবাদিক। এসএইচ/

‘অ্যা ব্রোকেন ড্রীম’, বিচারপতি সিনহার বক্তব্য ও একটি বিশ্লেষণ

বিচারপতি এস কে সিনহা সাহেব সম্প্রতি তার লেখা ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রীম` বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘তার বইতে প্রচুর বানান ভুল, এমনকি বইয়ের ইনডেক্স লেখারও সুযোগ পাননি তিনি সময় স্বল্পতার কারণে’। এ বিষয়ে আমি বলি, নির্বাচনের আগে বইটি বের করে বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নির্বাচন বানচালের অনেক তাড়াহুড়ো ছিল সিনহা সাহেবদের। সিনহা সাহেব একই অনুষ্ঠানে আরো বলেছেন- `বই প্রকাশের জন্য তিনি কোনো ইনভেস্টর খুঁজে পাননি। যারা পরবর্তীতে ইনভেস্ট করেছে তারা নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।` প্রকৃত সত্য হচ্ছে, যারা ইনভেস্ট করেছে তারা বিএনপি-জামায়াত পরিবারের সদস্য। নাম প্রকাশ করলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অ্যাম্বাসেডর ` দ্য ব্রোকেন ড্রিম` সম্পর্কে বলেছেন- `আমি তার বইয়ের প্রথম দুই-তিন পৃষ্ঠা পড়েছি। সেখানে দেখলাম সিনহা সাহেব লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু হওয়ার কারণে পালিয়ে বেড়াতেন`। কিন্তু সিনহা সাহেব যেটি লিখেননি সেটা হলো তিনি (সিনহা সাহেব) স্বঘোষিত শান্তি কমিটির সদস্য। নিশ্চয়ই তিনি ওই সময় মুক্তি বাহিনীর ভয়েই পালিয়ে বেড়াতেন। এসকে সিনহা সাহেব আরো বলেছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের একটি অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক তাকে বলেছেন, `আপনার জজ সাহেবরা মন্ত্রাণালয়ের ফোনে প্রভাবিত হন।` তখন সিনহা সাহেব সরাসরি প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমার প্রশ্ন, বিচার বিভাগ যদি তখন স্বাধীন হয় তাহলে এখন কেন বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার জন্য এই দ্বিমুখিতা? এসকে সিনহা সাহেব দাবি করছেন, `২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবৈধ। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতাই নির্বাচিত।` তিনি কী জানেন না, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়! সবচেয়ে বড় কথা, আর সংসদ যদি অবৈধ হয় তাহলে তিনিও তো অবৈধ। তিনি তখন কেন প্রতিবাদ করেননি? সিনহা সাহেব বলেছেন- আই হেট পলিটিক্স। অথচ তার দেশ ত্যাগের মুহূর্তে হাজার খানেক সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তাদের তিনি আরো জানিয়েছেন, তিনি ( সিনহা) দেশে ফিরে আসবেন। এইরকম আরো কিছু কথা দিয়ে তার যে ইউনুসের মত রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ রয়েছে তা প্রমাণ করেছেন। এসকে সিনহা সাহেব পরিশেষে বাংলাদেশের বিষয়ে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এসকে সিনহা সাহেবকে বলি, একটি স্বাধীন দেশের উপর আরেকটি দেশ হস্তক্ষেপ করলে সে দেশের স্বাধীনতা যে খর্ব হয় সে বিষয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দেওয়া আপনি কী জানেন না? লেখক: সাবেক সহ সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় কমিটি। আ আ/ এআর

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি