ঢাকা, রবিবার   ০৭ মার্চ ২০২১, || ফাল্গুন ২২ ১৪২৭

সুস্থতার জন্যে বেছে নিন বঙ্গাসন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:২২, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ১১:১৭, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আধুনিক জীবনে অধিকাংশ মানুষের দিন কাটে এক চেয়ার থেকে আরেক চেয়ারে পাড়ি দিয়ে। দিনের শুরুটা হয় কমোড নামক চেয়ারে বসে। এরপর নাশতা খেতে বসে আবার চেয়ার। ঘর থেকে বেরিয়ে যানবাহনে ওঠা- এখানেও চেয়ার। অধিকাংশ অফিসেই কাজের পরিবেশ চেয়ার পরিবেষ্টিত। ফলে সারাদিন চেয়ারে কাটিয়ে আবার একদফা যানবাহন এবং বাসায় ফিরে চেয়ার বা সোফায় গা এলিয়ে টিভি দেখা।

চিকিৎসকদের মতে চেয়ারবন্দি এ জীবন থেকে মুক্ত না হলে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়াটাও সম্ভব নয়। কারণ মানুষের দেহ-কাঠামোই এমন যে, সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহারের ওপর। মানুষই একমাত্র প্রাণী- যে মেরুদণ্ডের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে, হাঁটতে পারে। দাঁড়ানো, হাঁটা এবং দেহকে চালনা করার প্রয়োজন কমিয়ে ফেলে মানুষ ভাবছে- খাটুনি কমানো গেছে, জীবন সহজ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্রমাগত যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ার কারণে অঙ্গগুলো কমিয়ে দিচ্ছে তার স্বাভাবিক তৎপরতা। মানুষ হারাচ্ছে তার সহজাত সুস্থতা।

শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে থাকে এক ধরনের তরল পদার্থ, যাকে বলে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড। এর মূল কাজ হলো অস্থিগুলোকে সচল করা এবং পুষ্টি জোগানো। শরীরের অত্যাবশ্যক এই উপাদানটি উৎপন্ন হয় দুটো প্রক্রিয়ায়- এক. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহার। দুই. চাপ প্রয়োগ। যদি শরীরের কোনো অঙ্গ নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকে তাহলে একসময় সে ধরেই নেয় যে, তার কোনো কাজ নেই। তাই সাইনোভিয়াল ফ্লুইড উৎপাদনের কোনো প্রয়োজনও নেই। ব্যস, এখান থেকেই শুরু হয় গিঁটে গিঁটে ব্যথা এবং হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।

দীর্ঘসময় চেয়ারে/ সোফায় বসে থাকলে শরীরে অনেক সমস্যা, এমনকি নানা জটিলতা তৈরি হয়। যেমন- * রক্তচাপ বাড়ে, রক্তে সুগারের পরিমাণ বাড়ে। কোমরে চর্বি জমে। * হৃদরোগ, কোলন বা ফুসফুসে ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে। * গলায়, ঘাড়ে, কাঁধে ব্যথা হয়। শরীরের হাড়গুলো দুর্বল হয়ে যায়। * ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস (ডিভিটি) বা পায়ে রক্ত জমাট বাঁধাজনিত রোগ হয়। এই জমাট রক্ত দেহে ছড়িয়ে গিয়ে ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। * ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রষ্টতার ঝুঁকি বাড়ে। * মেদস্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। * আলস্য ও দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়। রাগ-ক্ষোভের পরিমাণ বাড়ে।(তথ্যসূত্র : ওয়েবএমডি, ১২ আগস্ট ২০১৯)

অথচ সকালবেলা দিনের শুরুতে যদি কমোডে না বসে সাধারণ প্যানে বসে মলত্যাগ করি অর্থাৎ বঙ্গাসনে বসি তাহলেই শুরু হয়ে গেলো সুস্থ্যতার পথে যাত্রা। বঙ্গাসনে হাঁটু প্রসারিত হয় ১৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত এবং গোড়ালির অস্থিতে চাপ পড়ে দেহের ওজনের চার গুণ বেশি। কানাডার অন্টারিওতে এডভান্সড ফিজিক্যাল থেরাপি এডুকেশন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট ডা. বাহরাম জ্যাম এ-ক্ষেত্রে সহজ একটি সূত্রের উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো-  ব্যবহার করো, নয়তো হারাবে। কাজে লাগাও, নইলে অকেজো হয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরেক্টাল সার্জন ডা. কারেন জাগিয়ান বলেন, দীর্ঘসময় কমোডে বসে থাকার অভ্যাস হেমোরয়েড রোগকে ত্বরান্বিত করে। অপরদিকে বাংলা প্যান ব্যবহারে মলত্যাগ সহজ হয়। মলাশয়ে মল জমে থাকে না। ফলে কোলন ক্যান্সার, এপেন্ডিসাইটিস ইত্যাদি রোগের সম্ভাবনা কমে যায়। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য ও হেমোরয়েড (পাইলস) থেকে মুক্ত থাকতে কমোড পরিত্যাগ করে বাংলা প্যান ব্যবহার শুরু করুন। শুরু থেকেই শিশুদের বাংলা প্যান ব্যবহারে অভ্যস্ত করান। বাতব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি রোগ থেকে মুক্ত থাকতে প্রবীণদের জন্যে বঙ্গাসন চর্চা হতে পারে খুবই কার্যকরী। শারীরিক সামর্থ্য বুঝে তারা একটু একটু করে বঙ্গাসন চর্চা শুরু করতে পারেন।

২০১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগতত্ত্ববিদ আই-মিন লির গবেষণার বরাতে প্রভাবশালী ব্রিটিশ চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট জানায়, নিষ্ক্রিয়তা বা অলসতার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যায় মূলত হৃদরোগ, স্তন ও কোলন ক্যান্সার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে।

ল্যানসেট জানাল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি বা কম্পিউটারের সামনে কাটানোর ক্ষতি আপনি কোনোভাবেই সামলে উঠতে পারবেন না, সে আপনি যতই জিমে গিয়ে বুক ডন আর রানিং মেশিনে ম্যারাথন দিন না কেন! তাহলে উপায়? শুরু হলো নানারকম গবেষণা।

একটানা বসে থাকা- দেহের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব সম্পর্কে প্রথম সতর্ক করেন স্কটিশ রোগতত্ত্ববিদ জেরি মরিস। তিনি ১৯৫০-এর দশকে লন্ডনের ৩১ হাজার বাসচালক ও কন্ডাক্টরের ওপর গবেষণা করেন। বাসচালকেরা সারাদিন তার সিটে বসে থাকে আর কন্ডাক্টররা দাঁড়িয়ে থাকে। দেখা গেল, কন্ডাক্টরদের তুলনায় বাসচালকদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩১% বেশি। ডাকপিয়নদের ওপর পরীক্ষা করেও একই ফল পাওয়া গেল। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠি বিলি করেন, তারা অফিসের কর্মীদের চেয়ে হৃদরোগে কম আক্রান্ত হন।

১৯৫০-এর দশকে নাসার গবেষণায় বেরিয়ে আসে, একটানা দীর্ঘসময় শুয়ে থাকলে হাড় ক্ষয়ে যায় ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড নামক চর্বি জমে যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বলে সারাদিন কাজ করতে হবে, একটু বসতে পারবেন না - ব্যাপারটি এমন নয়।

একটানা চেয়ারে বসে কাজ করা কিংবা টিভি/ কম্পিউটার ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে তা ছাড়ুন। নির্দিষ্ট বিরতিতে হাঁটাচলা করুন, হালকা স্ট্রেচিং করুন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। আর আপনার হৃৎপিণ্ড আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে হৃদয় থেকে।

দীর্ঘায়ুর পথ : কষ্টসহিষ্ণুতা পরিশ্রম

যারা দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাচ্ছন্দে নাড়াচাড়া করতে পারেন, তারা শারীরিকভাবে শুধু হালকাই বোধ করেন না; বরং তাদের আয়ুও অন্যদের চেয়ে বেশি। ২০১৪ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব কার্ডিওলজি পরিচালিত একটি জরিপ অনুসারে, মেঝেতে বসে আছেন, এ অবস্থায় উঠে দাঁড়াতে হলে যাদের সাপোর্ট প্রয়োজন হয় বা কারো সাহায্য নিতে হয়, তাদের চেয়ে সেই মানুষগুলোর আয়ু কমপক্ষে তিন বছর বেশি, যারা কোনো সাপোর্ট ছাড়াই মেঝে থেকে সহজে উঠে দাঁড়াতে পারেন।

চিরায়ত সত্যের নতুন উপলব্ধি : বঙ্গাসন

বিশ্বের অত্যাধুনিক কোনো দেশ হোক বা অনুন্নত দেশ- সর্বত্রই শিশুরা কত অনায়াসে বঙ্গাসনে বসছে! এ থেকেই বোঝা যায় দেহের অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ভঙ্গি এই বঙ্গাসন। অথচ আধুনিক মানুষকে আজ নতুন করে শিখতে হচ্ছে এ আসন। কারণ ভ্রান্ত জীবন-অভ্যাসের স্রোতে গা ভাসিয়ে মানুষ ভাবছে যে, সভ্য মানুষ এভাবে মাটিতে হাঁটু মুড়ে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে বসে না।

অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও অর্থোপেডিক সার্জন ডা. ফিলিপ বিচের মতে,‘মেঝেতে আমরা স্বচ্ছন্দে যে ভঙ্গিগুলোতে বসতে পারি, সেগুলো আমাদের জন্মগত অধিকার। আর আধুনিক সভ্যতা এর প্রতি তাচ্ছিল্য দেখিয়ে আমাদের অভ্যস্ত করেছে চেয়ারে, সোফায়। কিন্তু বিস্ময়কর এ মানবদেহের সামর্থ্য কতটা তা একজন মানুষের কাছে অজানাই থেকে যাবে, যদি সে দেহের সহজাত ভঙ্গিগুলোর গুরুত্ব না বোঝে।’  ফিলিপ বিচ বছরের পর বছর ধরে তার রোগীদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন চেয়ার ত্যাগ করতে এবং মেঝেতে বসে (বঙ্গাসনে) বিশ্রাম নেয়ার ব্যাপারে। তার মতে, সুস্থতার রহস্য লুকিয়ে আছে বঙ্গাসনের মধ্যেই।

বঙ্গাসনের কিছু উপকারিতা

* পায়ের পেশি পাঁচ গুণ বেশি তৎপর থাকে ও মজবুত হয়। দাঁড়িয়ে থাকার সমান ক্যালরি খরচ হয়। * বাড়তি মেদ ঝরে যায়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল কমে। * হাঁটু, কোমর, গোড়ালির অস্থিসন্ধির জড়তা দূর করে। দেহের হাড় ও পেশি দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকে। * পুরুষদের প্রোস্টেট ও ব্লাডার এবং মহিলাদের জরায়ু নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুসমূহের ক্ষয় রোধ করে। * হার্নিয়া, ডাইভার্টিকুলোসিস ও পেলভিক অর্গানগুলোর স্থানচ্যুতির সম্ভাবনা কমে। * শরীরের নিচের অংশে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। সংশ্লিষ্ট অংশে রক্তনালি ও পেশির রোগ প্রতিরোধ হয়। * নিয়মিত বঙ্গাসন চর্চায় মহিলাদের স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা বাড়ে।

কিভাবে করবেন বঙ্গাসন

* দেহের ভর সমানভাবে দুই পায়ের গোড়ালির ওপর রেখে বসতে হবে। * পায়ের পেশি ঊরু স্পর্শ করবে। নিতম্ব মাটি স্পর্শ করবে না। * দৃষ্টি সামনে ও মেরুদণ্ড সহজ স্বাভাবিক থাকবে। * দুই হাত থাকবে দুই হাঁটুর দু্ই পাশে বা হাঁটুর ওপরে। * দুই পায়ের মাঝে একহাত বা আরামদায়ক পরিমাণ ফাঁকা থাকবে।

তথ্যসূত্র : নিউ সায়েন্টিস্ট, ১৫ জুলাই ২০২০; হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং, এপ্রিল ২০১৯; জন্স হপকিন্স স্কুল অব মেডিসিন অফিসিয়াল ওয়েবসাইট; স্ট্যাট ১৭ আগস্ট ২০১৭; কোয়ার্টজ, ৯ নভেম্বর ২০১৭।


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি