ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, || আশ্বিন ৯ ১৪২৮

বিস্ময় বালকের সামরিক রোবট উদ্ভাবন

প্রকাশিত : ১৭:৫৮, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আজমাঈন আকমাল। বয়স সবেমাত্র ১৪ বছর। পড়ালেখা করছেন বগুড়া জিলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে। এরইমধ্যে বিদ্যালয়ের আঙ্গিনা পেরিয়ে কিশোর আকমাল পরিচিত হয়ে উঠেছে দেশজুড়ে। এমনকি তার খ্যাতি ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সামরিক রোবট উদ্ভাবনসহ বহুমুখী প্রতিভার ঝলক দেখানোয় তাকে অনেকেই বিস্ময় বালক আখ্যা দিয়েছেন।

২০১৪ সালের কথা। রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে পরিত্যক্ত পানির পাইপের মধ্যে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের মাতম ওঠে। টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচারও করা হয় শিশু জিহাদের উদ্ধার তৎপরতার দৃশ্য। এ ঘটনায় আজমাঈন আকমালের হৃদয়েও রেখাপাত তৈরি হয়।

ঘটনার পরই আকমাল নেমে পড়েন গবেষণায়। খুঁজতে থাকেন, জিহাদের উদ্ধারে কি পদক্ষেপ নেওয়া যায়। অবশেষে পেয়েও যান। আর তা নিয়েই চলছে আকমালের বর্তমান গবেষণা। তৈরি করছেন দেশের প্রথম সামরিক রোবট।

সে ঘটনার কথা স্মরণ করে আকমাল বলেন, ‘ঘটনাটির পর আমার মাথায় আসে একটি রোবটের কথা। জটিল যেসব উদ্ধার কাজগুলোতে সাধারণ মানুষের পৌঁছানো সম্ভব না, সেসব উদ্ধার কাজে কিভাবে রোবটকে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে থাকি। এরপর ২০১৫ সালের শুরুতেই একটি ‘মাল্টিপারপাস রোবট’ তৈরি করি, যেটিকে দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শুধু তাই নয়, যে কোনো উদ্ধার কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য রোবটটিকে ডিজাইন করি। এর নাম দিই দুর্বার।’

দুর্বার উদ্ধার কাজের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত না হলেও বর্তমানে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। দুর্বারের প্রোটোটাইপ ভার্সনটি আর্ডোইনো মাইক্রোকন্ট্রোলার ও সি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে একটি ব্লুটুথ ডিভাইস, যার মাধ্যমে এটিকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এছাড়া এটিতে একটি গ্রিপার ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে কোনো কিছু ধরে উদ্ধার করা হয়। সেই গ্রিপারটি আবার বিশেষ যন্ত্রে তৈরি করা, যার মাধ্যমে বোমা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। তবে এখনো রোবটটি পুরোপুরিভাবে ফিট নয়।

রোবটটিকে পুরোপুরি কর্মক্ষম করে তুলতে ইতোমধ্যে একটি অনুদান পেয়েছেন ক্ষুদে এই বিজ্ঞানী। তাই উদ্ধার কার্যক্রম ছাড়াও এলাকা পরিদর্শন ও নজরদারির কাজেও কিভাবে দুর্বার রোবটকে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

দুর্বার রোবটের প্রোটোটাইপ নিয়েই আকমাল অংশ নিয়েছিলেন দেশের প্রথম উদ্ভাবনমূলক টিভি রিয়েলিটি শো “উদ্ভাবকের খোঁজে” অনুষ্ঠানে। দেশের এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতামূলক রিয়েলিটি শোতে আকমাল বর্তমানে ‘টপ টেনে’ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’(অ্যা টু আই) আয়োজিত ‘সলভ অ্যা থন’ অনুষ্ঠান চলছে। সেখানেই রোবটটির মূল ভার্সন বানানোর জন্য পেয়ে যান ফান্ড। ‘অ্যা টু আই’ দেশের প্রথম সামরিক রোবট তৈরির জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করেন।

রোবটিক্স ছাড়াও শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের যোগাযোগ সমস্যা লাঘবে আকমাল তৈরি করেছেন দেশের প্রথম ‘ডিজিটাল সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টাপ্রেটার’। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের যোগাযোগ সমস্যার কথা বলতে গিয়ে আকমাল বলেন, একজন বাক বা শ্রবণ প্রতিবন্ধী কথা বলতে বা শুনতে পারেনা। তাই তারা বিভিন্ন অবাচনিক ভাষা ব্যবহার করে, ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলে। কিন্তু তাদের ওই ইশারা ভাষা আরেকজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছাড়া অন্য কেউ সহজে বুঝতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানকল্পে উদ্ভাবন করি একটি ডিজিটাল ইন্টারপ্রেটার।

ইন্টারপ্রেটারের বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি ইশারা ভাষাকে (অবাচনিক যোগাযোগ) টেক্সট ও ভয়েচে (বাচ্যে) রূপান্তর করে। আবার ‘টেক্সট’ ও ‘ভয়েচ’কে ইশারা ভাষায় রূপান্তর করতে পারে। একটি গ্রাফিক্স জেনারেট করে এটি আউটপট হিসেবে দেখাবে। যার মাধ্যমে একজন ইশারা ভাষা না জানা স্বাভাবিক ব্যক্তি তার মনের ভাব একজন বাক বা শ্রবণ প্রতিবন্ধীর কাছে প্রকাশ করতে পারবে। ‘অ্যা টু আই’ প্রকল্পে এটিও তার অন্যতম আবিষ্কার হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে।

এদিকে কেবল রোবটিক্স আর ইন্টারপ্রেটারেই হারিয়ে যাননি এই বিস্ময় বালক। বর্তমানে আরও একটি ইনোভেশন নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এর নাম দিয়েছেন স্মার্ট কস্টিউম। স্মার্ট ওয়াচের ব্যবহার নানা ক্ষেত্রে বাচাচ্ছে আমাদের সময়। স্মার্ট কস্টিউম নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, স্মার্ট কস্টিউম আমাদের প্রত্যাহিক জীবনের ব্যবহৃত জামাকাপড় বা কস্টিউমগুলোর একটি স্মার্ট সংস্করণ, যাতে রয়েছে অসংখ্য স্মার্ট ফিচার। যেমনঃ বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে আমার কস্টিউমটি আমার গতিবিধি লক্ষ করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর মাধ্যমে এটি বুঝতে পারে যে আমি আমার পকেটে হাত দিচ্ছি কোন বস্তুকে নেয়ার জন্য নাকি এটা কোন পকেটমার করছে। অর্থাৎ আমি ছাড়া কোন পকেটমার যদি আমার পকেটে পকেটমারের উদ্দেশ্যে হাত দেয় তবে পকেটে থাকা একটি টিজার থেকে তাকে একটি শক দেওয়া হবে। এভাবে স্মার্ট কস্টিউম আপনাকে বাঁচাবে পকেটমারের হাত থেকে। শুধু পকেটমারের হাত থেকে বাঁচানো ছাড়াও এটির রয়েছে আরও অনেক ফিচার।

এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ইনোভেশন নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ইনোভেশন নিয়ে বলতে গিয়ে বিস্ময়বালক বলেন, মূলত ইনোভেশন নিয়েই আমার স্বপ্ন। আমার ইচ্ছা, উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা এবং সবার জীবনযাপনকে আরও সহজ করে তোলা।

ইটিভি অনলাইনকে আকমাল জানান, ছোটবেলা থেকেই ভালবাসতেন প্রযুক্তি। প্রথম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বাবা শহীদুল ইসলাম বাসায় নিয়ে আসেন কম্পিউটার। এক বছরের মাথায় পেয়ে যান ইন্টারনেট। ততদিনে তৃতীয় শ্রেণীতে পা রাখেন আকমাল। তবে পড়ালেখার ক্ষতি হতে পারে, এই আশঙ্কায় ছেলে আকমালকে কম্পিউটারের কাছেও যেতে দেননি শহীদুল। এমনকি আজমাঈনের মা আখতার জাহানও তাকে প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন।

তবে তৃতীয় শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বেসিসের বর্তমান সভাপতি মোস্তফা জব্বারের সহযোগিতায় ছোট্ট আকমাল শিখে ফেলেন সি ল্যাঙ্গুয়েজসহ আর কয়েকটি প্রোগ্রামিং। এরপরই আকমালের প্রতিভার ঝলক দেখতে থাকে তার পরিবার। একে একে আকমাল অর্জন করতে থাকে বিভিন্ন পুরষ্কার। এদিকে চারদিকে আকমালের প্রশংসায় আজ চারদিকে পরিচিত হয়ে উঠেছেন বাবা শহীদুল ইসলাম ও মা আখতার জাহান। এখন ছেলেকে আর বকা দেন না, বরং উৎসাহ দেন।

আকমাল এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি পুরষ্কারর পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- সলভ-থন-২০১৭ অ্যাওয়ার্ড, চিলড্রেন সাইন কংগ্রেস-২০১৫, ২০১৬ অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া ২০১৭ সালে নেপালে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তা হিসেবে গিয়েছিলেন।

২০১৭ সালের প্রথম দিকে গড়ে তুলেই একটি আইটি ফার্ম। নাম দিয়েছেন ‘অপটিমাম টেকনোলজি’। এছাড়া চিফ টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে যুক্ত আছেন প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান রিফ্লেকটিভ টিনসে।  

আকমাল স্বপ্ন দেখেন দেশের জন্য। স্বপ্নের বিষয়ে বলতে গিয়ে আকমাল বলেন, স্বপ্ন দেখি একটি ডিজিটাল বাংলাদেশের। ভবিষ্যতে একজন সফল উদ্ভাবক হতে চাই। চাই আমার উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের সমস্যার সমাধান করে সবাইকে একটা ভালো জীবনযাপন করার সুযোগ করে দিতে। সবটুকু করতে চাই দেশের জন্য। বড় হয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা আমার। স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশও একদিন সোফিয়ার চেয়ে ভালো রোবট বানাবে।

/ এআর /


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি