ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭

করোনা নিয়ে ড. বিজন কুমার শীলের একগুচ্ছ পরামর্শ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৮:৪২ এএম, ২৩ জুন ২০২০ মঙ্গলবার | আপডেট: ০১:২৭ এএম, ২৪ জুন ২০২০ বুধবার

করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রকোপে থমকে গেছে সারা পৃথিবী। ধারণা করা হচ্ছে, অজানা এই প্রাণ বিধ্বংসী ভাইরাসে আক্রান্তের চেয়েও সংক্রমিতের সংখ্যা অনেক বেশি। কার্যকরী কোনো প্রতিষেধক না থাকায় ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন সংখ্যা। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে প্রতিষেধক না থাকায় প্রতিরোধের উপরই এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে মিলতে পারে উত্তরণের পথ। কবে নাগাদ এই অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে তা বলতে পারছে না কেউ।

তবে করোনাকালীন এই সময়েও আমরা নিজেদের কিভাবে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখতে পারবো। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, প্রোটিন ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে আমরা করোনাকে জয় করতে পারবো- এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। এ বিষয়ে কথা বলেছেন বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের আলোচিত বিজ্ঞানী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত করোনা সনাক্তকরণ কিট ‘জি র‍্যাপিড ডট ব্লট’ গবেষক টিমের প্রধান ড. বিজন কুমার শীল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইনের গণ বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা মো. রোকনুজ্জামান।

একুশে টেলিভিশন: করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে ‘জি র‍্যাপিড ডট ব্লট কিট’ উদ্ভাবন নিয়ে বেশ ব্যস্ততম সময় অতিক্রম করছেন আপনি, সব মিলিয়ে কেমন আছেন?

ড.বিজন কুমার শীল: ব্যস্ততা আমার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন ব্যস্ত থাকতে হবে। আমার অন্যান্য কাজের তুলনায় এটা বেশ ব্যতিক্রম। কারণ বিরাট চ্যালেঞ্জে কাজ করতে হচ্ছে। এখানে কাজ করার জন্য যে কাঁচামাল বা সরঞ্জাম প্রয়োজন সেগুলো একেবারেই নেই। আসলে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে আমরা বেশ পিছিয়ে পড়লেও সব মিলিয়ে ভালোই আছি।

একুশে টেলিভিশন: দেশে করোনার প্রভাব আরো কতদিন থাকতে পারে?

ড. বিজন কুমার শীল: দেখুন এটি বলা দুষ্কর। কিন্তু আমার যেটি ব্যক্তিগত মতামত বা পর্যবেক্ষণ আছে তাতে আমার মনে হয় না করোনা ভাইরাস বেশিদিন থাকবে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে তখনই যখন আপনি একটা গণ পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেখবেন যে, সমাজে কতগুলো মানুষ এই রোগের সংস্পর্শে এসেছে। একটা কথা পরিস্কার করতে চাই, আক্রান্ত হওয়া এবং সংস্পর্শে আসা কিন্তু ভিন্ন বিষয়। আক্রান্ত হওয়া তাকেই বলে যাদের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করার পরে রোগ তৈরী করে উপসর্গ বা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া। আর সংস্পর্শে আসা হচ্ছে- আপনার শরীরে ভাইরাস ঢুকেছে তা আপনি জানেনই না। এই সংস্পর্শের আসার সংখ্যাটা প্রতিদিনই বাড়ছে।

একুশে টেলিভিশন: বাংলাদেশে কত শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ড. বিজন কুমার শীল: যেটা সরকার বলছে, সেটাই সঠিক কিন্তু সংস্পর্শ হয়তো বেশি আসছে। আমি একটা পরিবারের কথা বলি, যেখানে দুইজন ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত রোগী ছিলেন (এন্টিজেন পজেটিভ)। কিন্তু সেই পরিবারে আরো ১২ জন ব্যক্তি এন্টিবডি তৈরি করেছে, তাদের কোনো রকম কোনো লক্ষণ দেখা দেয়নি, সামান্য একটু হাঁচি বা জ্বর হয়েছিলো। এই যে গ্রুপটা, এদের সংখ্যা কিন্তু অনেক। এই সংখ্যাটাকে আমরা জানতে পারছি না বিধায় কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ভয়ের ভেতরে আছি। আমার এই সকল পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়, আমাদের অনেক মানুষ এন্টিবডি তৈরি করেছে এবং করোনা ভাইরাসের বিপক্ষে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করেছে। যা করোনা ভাইরাসকে আর বেশিদিন টিকতে দিবে না।

একুশে টেলিভিশন: এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে করোনা নিয়ে তাহলে আমাদের এখনো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে, এই অবস্থায় আমরা কি ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবো?

ড. বিজন কুমার শীল: স্বাস্থ্যবিধি যেটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে বা ইন্টারনেটে পেয়েছেন সেটাই, ওটা তো অবশ্যই মানতে হবে। পাশাপাশি ভিটামিন ‘সি’ ও ‘জিংক’ নিয়মিত খাওয়া যায়। তারপরে এমন অভ্যাস যদি করা যায় যে, আপনি বাইরে গেলেন সেখান থেকে ফিরে হালকা গরম চা দিয়ে গড়গড়া বা গারগোল করে নিলেন। তাহলে ভাইরাস যেহেতু নাক মুখ দিয়ে প্রবেশ করে, সেহেতু তা কিন্তু ছড়াতে পারলো না। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, আপনি অনেকাংশে ভাইরাস থেকে মুক্তি পাবেন এবং এক্ষেত্রে তা ভ্যাকসিনের মতো কাজ করবে। এছাড়াও, দৈনদিন খাদ্য তালিকায় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাবেন।

একুশে টেলিভিশন: দিনের মধ্যে কতবার গারগোল করতে হবে, গারগোলের সময় পানিতে বিশেষ কিছু মেশাতে হবে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: এটা নিয়মিত অবশ্যই তিন-চারবার করবেন। সকালে, দুপুরে ও রাতে। বাহিরে থেকে আসলে তো অবশ্যই করবেন এবং হাত মুখ অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবেন। আপনি যদি গারগোল করেন তাহলে নাক মুখ দিয়ে যে ভাইরাসই ঢুকুক না কেন, তা কিন্তু স্থায়ী হতে পারবে না। হালকা চা, লিকার চা- যেটায় মানুষের চেহারা দেখা যাবে কিন্তু গরম, এমনটা দিয়ে গারগোল করবেন। এটা ভাইরাসকে বাড়তে দিবে না এবং মুখের ভেতরের পেশী বা ত্বকগুলোকে টেনে আনে। আর যদি মুখের ভেতরে ঘা হয়ে থাকে, তাহলে সামান্য পরিমাণে ফিটকিরি গরম পানিতে মিশিয়ে গারগোল করেন। এতে ঘা-ও শুকাবে, আবার ভাইরাসটা প্রতিহত হবে।

একুশে টেলিভিশন: এই ভাইরাসগুলো কি তাহলে মুখেই বেশি থাকে?

ড. বিজন কুমার শীল: একটা কথা মনে রাখবেন, এই ভাইরাসগুলো কিন্তু গ্রো করে আপনার জিহ্বার উপরে যে সেলগুলো আছে সেখানে। এবং জিহ্বার যে টেস্ট বার, দেখবেন প্রায় রোগীরা কমপ্লেইন করে যে, আমি মুখে কোনো স্বাদ পাচ্ছি না। এই স্বাদ না পাওয়া কিন্তু একটা খুবই মারাত্মক লক্ষণ যে, আপনার শরীরে এবং জিহ্বার ভেতরে ভাইরাসটি প্রবেশ করেছে। এক্ষেত্রে যদি আপনি গারগোলটা বেশি করেন তাহলে ভাইরাসটি বাহিরে কম বের হবে এবং আপনি মুক্ত হবেন।

একুশে টেলিভিশন: সাধারণ মানুষ কি ধরণের মাস্ক ব্যবহার করে সুরক্ষিত থাকতে পারবে?

ড. বিজন কুমার শীল: (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তৈরি কাপড়ের মাস্ক দেখিয়ে) এই মাস্কটার ভেতরে তিনটা লেয়ার থাকে। সাধারণত দেখা যায়, এ ধরণের তিনটা লেয়ার থাকলে ভাইরাসটা বেশি আসতে পারে না। একটা লেয়ার আছে মার্কিন কাপড়ের। এটা যদি নব্বই শতাংশ ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে, তাহলে বাকি দশ শতাংশ আপনার শরীরে এসে সুবিধা করতে পারবে না। কারণ আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সদা সর্বদা সজাগ আছে যেকোনো শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য ও প্রতিরোধ করার জন্য। এই মাস্কের আরেকটি সুবিধা হলো- এটা কাপড়ের, আপনি যদি প্রতিদিন ব্যবহার করে সাবান দিয়ে ধুয়ে আয়রন করে রাখেন, তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়। প্রতিদিন মনে হবে আপনি নতুন মাস্ক ব্যবহার করছেন। আপনি যদি প্রতিদিন ঠিকমতো পরিষ্কার করেন, তাহলে আপনি এটা দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারবেন। আমরা তো এসব মাস্ক প্রতিদিন ব্যবহার করছি, পরিষ্কার করছি এবং আয়রন করছি।

একুশে টেলিভিশন: গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র এই মাস্ক বাজারজাত করছে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: বাজারজাত ঠিক করছে না। এটা আমাদের নিজেদের জন্য। যদি আপনারা কেউ প্রয়োজন মনে করেন তাহলে হয়তো বা দিতে পারে।  

একুশে টেলিভিশন: করোনায় আক্রান্ত হলে প্রাথমিক চিকিৎসা কেমন হবে?

ড. বিজন কুমার শীল: (মৃদু হেসে) দেখুন আমি কিন্তু ডাক্তার নই। আসলে ডাক্তার সাহেবরা জানেন কী চিকিৎসা দিতে হয়। দেখুন, ডাক্তারদের কাছে আমরা কখন যাই, যখন আর পারা যায় না। জ্বর, সর্দি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট হয়, মুখের স্বাদ চলে যায় তখন। এই অবস্থা হওয়ার আগে আমি বলবো যে, কাশির জন্য একটা জিনিস ব্যবহার করতে পারেন, সেটা হলো- সামান্য একটু গোল মরিচ, আদা, লবঙ্গ যদি বেটে পানি দিয়ে খান তাহলে কিন্তু কাশি থাকবে না। এক্ষেত্রে তুলসি পাতাও কাজ করে। আপনি যত কম কাশবেন ভাইরাসটা তত কম ছড়াবে। আর চা কিন্তু এন্টিসেপ্টিকের মতো কাজ করে। সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিটামিন-সি ও জিংক খাওয়া। এগুলো আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। আপনি যদি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ঠিক রাখেন, তাহলেই কার্যকরভাবে এই ভাইরাসের মোকাবেলা করতে পারবেন।

একুশে টেলিভিশন: এই সময়ে আমাদের খাদ্যাভাসে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: আমার মনে হয় শাক-সবজি এগুলো বেশি খেলে ভালো হয়। এখন তো আমরা সবাই ফাস্ট ফুড খাই, প্রক্রিয়াজাত, মোড়কজাত খাবার খাই। এখন এগুলো খাওয়া সুবিধাজনক নয় বা বাদ দেয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন যদি শাক-সবজি, ডাল বা নরম খাবার খাওয়া যায় তাহলে ভালো। তবে কিছু কিছু মাছে এলার্জি আছে, সেগুলো না খাওয়াই ভালো।

একুশে টেলিভিশন: এই মুহূর্তে শিশুদের বিশেষ কোনো খাবার খাওয়ানো উচিৎ কিনা বা কোনো খাবার এড়িয়ে যাওয়া দরকার কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: শিশুদের জন্য মায়ের দুধ অবশ্যই অনেক বড় জিনিস, এটা অবশ্যই দিতে হবে। তরল খাবার দিতে হবে। সেই সাথে যেসব ফলমূলে ভিটামিন আছে সেগুলো বেশি দিতে হবে। বিশেষ করে, ভিটামিন-সি যুক্ত ফল দিতে হবে। এছাড়া দেশীয় মৌসুমী ফল অনেক বেশি উপকারী। পরিবারের সবাই মিলে এখন এসব ফল বেশি খাবেন।

একুশে টেলিভিশন: বৃদ্ধদের নিয়মিত খাদ্যাভাসে কোনো পরিবর্তন করতে হবে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: দেখেন, আমাদের যখন বয়স বেশি হয় তখন আমরা ফলমূল কম খায়। আমরা ভাবি, এগুলো বাচ্চাদের খাবার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো- বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে ভিটামিনের অভাব দেখা দেয়। বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে ভিটামিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানগুলো পূরণ করা উচিত। তাই ভিটামিন-সি, বি-কমপ্লেক্স- এগুলো বিভিন্ন ফল ও দুধে বিদ্যমান। এগুলো যদি এখন খাওয়া যায় তাহলে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং আমার মনে হয়, এগুলো করোনার মোকাবেলা করতে কাজে লাগবে।

একুশে টেলিভিশন: যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তারা এ সময়ে বাহিরে হাটাচলা করতে পারছে না, তারা কিভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখবে?

ড. বিজন কুমার শীল: এটা অনেক বড় প্রশ্ন। কারণ যাদের ডায়াবেটিস তারা হাঁটাচলা করতে পারছে না এই মুহূর্তে। আমি ঢাকায় দেখলাম অনেকে মাস্ক পরে হাঁটাচলা করছে। আসলে লকডাউন থাকলে তো সব জায়গায় সমস্যা থাকে। আবার আমাদের দেশে সবাই ব্যায়াম করে না, যারা বয়স্ক তাদের তো শারীরিক ব্যায়াম করার কোনো সুযোগই নাই। সেক্ষেত্রে আপনারা বাসাতেই কিছু কিছু ব্যায়াম করতে পারেন, ভালো থাকবেন। আবার বাড়ির পাশে যদি হাঁটাচলা করার জায়গা থাকে তাহলে সেখানে হাঁটাচলা করা উচিৎ, যাতে ডায়াবেটিস লেভেলটা ভালো থাকে।

একুশে টেলিভিশন: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু? ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কেউ যদি করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে তাকে কিভাবে সুস্থ করে করে তোলা যাবে?

ড. বিজন কুমার শীল: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবার ক্ষেত্রেই সমান। করোনা তো দেখবে না কে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বা কে অন্য কোন রোগে আক্রান্ত! সবার কাছেই সে সমানভাবেই যাবে। তবে সে যেখানে নিজের মতো করে বাসা বাঁধতে পারবে সেখানেই সে তার বিধ্বংসী কার্যক্রম চালাবে। ডায়াবেটিস তো সেখানে একটা ইস্যু মাত্র। মূলত যেটা হয়ে থাকে, করোনা হওয়ার কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ ঘটে। বিশেষ করে, ফুসফুসে কিন্তু বিভিন্ন ইনফেকশন হয়, মুখের ভেতরে যখন ক্ষতের সৃষ্টি করে তখন সেখানেও দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ ঘটে। এক্ষেত্রে একটু জটিলতা দেখা দেয়। আমার মনে হয়, ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা যদি এন্টিসেপ্টিক দিয়ে, চা বা ফিটকিরি দিয়ে নিয়মিত গারগোল করেন তাহলে কিন্তু এই সংক্রমণগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা যায়।

তাছাড়া অভিজ্ঞ ডাক্তার আছেন যারা এ সকল বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ, উনারা এটা দেখতে পারেন। আপনারা সবাই জানেন যে, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্যার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আপনাদের সবার দোয়ায় উনি এখন সুস্থ। উনি নিজের চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থাপত্র মেনে চলেছেন- আমি মনে করি, এটা একটা মডেল। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্য। স্যারের সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস নিতে হয়, উনার নিউমোনিয়াও ছিলো। উনি যদি করোনা ভাইরাসকে জয় করতে পারেন, তাহলে আমার মনে হয়, সবার পক্ষেই করোনা ভাইরাসকে জয় করা সম্ভব।

একুশে টেলিভিশন: এই অবস্থায় একজন সাধারণ মানুষের কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?

ড. বিজন কুমার শীল: (হেসে) সাধারণত একজন সুস্থ মানুষের আট ঘণ্টা ঘুমানো উচিৎ। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- লকডাউন হওয়ায় অনেকটা সময় মানুষকে ঘরে থাকতে হচ্ছে, এসময় মানুষ বিরক্তও হচ্ছে।
এই সময় যদি মেডিটেশন বা ধ্যান করা যায়, তাহলে অনেকটা মানসিক স্বস্তি লাভ করা সম্ভব। বিশেষ করে যারা বয়স্ক তারা এটা করতে পারেন। মেডিটেশন বা ধ্যান করলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং দুশ্চিন্তা কমে যায়। এর ফলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এটা একটা অনুশীলনের বিষয়। আমাদের দেশে অনেকে মেডিটেশন বা ধ্যান করেন, এটা ধর্মীয় কোনো চর্চা নয়, এটা মন ও দেহকে সুস্থ রাখার জন্য। আমি আমার দেহকে সুস্থ রাখার জন্য যদি দশ-বিশ মিনিট চোখ বুজে বসে থাকি এবং আমার মানসিক চাপকে কমাতে পারি- তাহলে তো এটা নিঃসন্দেহে খুবই উপকারী। এটা ধর্মীয় কোনো অনুশাসন নয়, এটা দৈহিক চাহিদা বলতে পারেন।

একুশে টেলিভিশন:  প্রসাধনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়েদের এখন কোনো সতর্কতা অবলম্বন দরকার কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: (হেঁসে) এলার্জিক কোনো কিছু ব্যবহার না করাই ভালো। মেয়েরা অবশ্যই এ ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন, কোনটা ব্যবহার করা ভালো কোনটা খারাপ। যেহেতু এখন বাহিরে যেতে হচ্ছে না, তাই প্রসাধনী কম ব্যবহার করাই শ্রেয়।

একুশে টেলিভিশন: পোশাকে বা কাপড়ে করোনা ভাইরাসের জীবাণু কত সময় সক্রিয় থাকতে পারে?

ড. বিজন কুমার শীল: পরিবেশে ভাইরাস সাধারণত চার থেকে পাঁচ বা সর্বোচ্চ সাত ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। আর পোশাকে বা কাপড়ে কার্যকর থাকতে পারে আরও বেশী সময়। আক্রান্ত ব্যক্তির থুথু যদি পোশাকে লেগে যায়, আর সেই থুথু যদি শুকিয়ে যায় এবং ব্যবহারকারী যদি সেটা পরিষ্কার করে ধুয়ে না ফেলে, তাহলে এটা কিন্তু দীর্ঘদিন থাকতে পারে। কারণ ঐ সময়ে ভাইরাসের প্রোটিন ক্ষমতা বেড়ে যায়। যা ভাইরাসকে সব ধরনের পরিবেশ থেকে রক্ষা করে। এবং সে দীর্ঘ সময় থাকে, এমনকি কয়েক মাসও থাকতে পারে। একইসঙ্গে ভাইরাসটি ডাস্টের সাথে উড়ে গিয়ে নাকে-মুখে বাসা বাঁধতে পারে। তাই এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিৎ, যেন যেখানে সেখানে থুথু ফেলা না হয়। কারণ কার মুখে যে ভাইরাস বেড়ে উঠছে, আর কার মুখে বাড়ছে না- এটা বুঝা কিন্তু খুবই কঠিন। আমরা তো কিছু বিষয় দেখে অবাক হয়ে গেছি, অনেকের কোনো ধরণের লক্ষণ নাই একেবারে সুস্থ ব্যক্তি কিন্তু তার দেহেও ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে।

একুশে টেলিভিশন: এখন তো বর্ষাকাল, রাস্তায় জমে থাকা পানিতে যদি কোনো করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি হেঁটে যায় এবং সেই একই পানিতে যদি সাধারণ কেউ হেঁটে যায়, তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি আছে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: হ্যাঁ, এটা একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি যদি থুথু ফেলে এবং সেটা পানির মাধ্যমে আরো দ্রুত ভাইরাস ছড়াতে পারে। আমাদের দেশে পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এক্ষেত্রে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে।

একুশে টেলিভিশন: মশার প্রাদুর্ভাব বর্তমান সময়ে বেড়েছে, এর মাধ্যমে করোনা ছড়ানোর আশঙ্কা কতটুকু?

ড. বিজন কুমার শীল: না, এ যাবৎ পর্যন্ত গবেষণায় এমন কিছু পাওয়া যায়নি। মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ানোর আশঙ্কা নেই। তবে এই ভাইরাসটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে- যে কোনো জিনের ভেতর খুব দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। এই ভাইরাসটি প্রথম সুযোগেই বাড়তে শুরু করে। তবে আমার ধারণা, এর অবস্থা এখনো ঐ পর্যায়ে আসেনি।

একুশে টেলিভিশন: যাদের জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাহিরে যেতে হচ্ছে, তাদের সুরক্ষিত রাখতে আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে কিনা?

ড. বিজন কুমার শীল: জীবন-জীবিকার তাগিদে আমাদের তো বাহিরে যেতেই হবে। এক্ষেত্রে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন। বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহার করুন। যেহেতু বাহিরে যেতে হচ্ছে, তাই ফিরে এসে চেষ্টা করুন হাত-মুখ পরিষ্কার করার এবং যে মাস্কটা আপনি নিয়ে যাচ্ছেন সেটা আপনি সাবান দিয়ে পরিষ্কার করুন, শুকিয়ে আয়রণ করুন। তাহলে মাস্কটা একদম ফ্রেশ হয়ে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হবে। যে মাস্কটি আপনি ব্যবহার করছেন, কোনো না কোনোভাবে আপনার হাত সেটায় স্পর্শ করছে এবং আপনি সেই হাত চোখে মুখে দিচ্ছেন। সুতরাং সেখান থেকে কিন্তু ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই সুতির মাস্ক ব্যবহার করাই সবসময় উত্তম।

একুশে টেলিভিশন: এই সংকটময় সময়ে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আপনি কিছু বলুন..

ড. বিজন কুমার শীল: এটি একটি সাইক্লোনের মত। এসেছে আবার চলে যাবে। আমি দেখেছি, বহু মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে গেছে। সুতরাং আমাদের ভয় না করে জয় করার প্রক্রিয়া নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। এটা আমার হলেই যে আমি মারা যাবো, এমন কোনো বিষয় না। বর্তমানে অনেকের শরীরে এন্টিবড়ি এসেছে, অনেকে প্লাজমা দিচ্ছেন, সুতরাং ঘাবড়ানোর কিছুই নেই, তাদের শরীরে যদি প্লাজমা থেরাপী দেয়া যায় তাহলে তাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভবনা অনেকাংশেই বেড়ে যাবে।

মিডিয়াগুলোও যেন পজেটিভভাবে সংবাদ প্রচার করে। এছাড়া পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সবাই একসাথে যদি ভাইরাসটিকে মোকাবেলার চেষ্টা করি, যেমনটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। আমি উনার সাথে একমত হয়েই বলতে চাই, আসলেই এই করোনা ভাইরাস ইউরোপে যতো মারাত্মক আকারে প্রভাব বিস্তার করেছে, আমাদের এখানে কিন্তু এতটা নয়। খুব তাড়াতাড়ি কিন্তু এর তীব্রতা কমে আসছে এবং কমে যাবে। একদিন অবশ্যই আমরা করোনামুক্ত হবো। আমরা যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, খুব শিগগিরই এই রোগ থেকে মুক্তি পাবো, আমি এটাই আশা করি। এবং আমাদের সবারই এই আশাটা মনের মধ্যে রাখা উচিৎ যে, করোনা ভাইরাস আমাদেরকে জয় করতে পারবে না বরং আমরাই করোনাকে জয় করবো।

এমবি/এনএস/