ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১৩ ১৪২৮

আপনি কতটা সমমর্মী

নাজমুল হক রাইয়ান

প্রকাশিত : ০৬:১৮ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২০ সোমবার | আপডেট: ০৬:২৫ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২০ সোমবার

একটি গল্প। ধনবান এক নারী। বাবা ছিলেন স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। স্বামীও তাই। স্বামী মারা গেছেন আজ বছর কয়েক হলো। সন্তানরাও এখন আর তার সাথে থাকে না। সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। মায়ের কাছে থাকবার সময় তাদের নেই। স্বামী প্রচুর অর্থবিত্ত রেখে গিয়েছিলেন। আরাম-আয়েশ, বিলাস-ব্যসনের কোনো অভাব নেই। কিন্তু নারীর মনে সুখ নেই। মন খুলে কথা বলার কেউ নেই। মমতা নিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখার কেউ নেই। প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে একদিন তিনি গেলেন শহরের মনস্তত্ত্ববিদের কাছে। 

চিকিৎসক সব শুনে বললেন, আপনার প্রেসক্রিপশনটা একটু পরে লিখছি। তার আগে আপনি আমাদের হাসপাতালের একজন স্বেচ্ছাসেবীর গল্প শুনুন। বলে তিনি এক নারী স্বেচ্ছাসেবীকে ডেকে দিলেন পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও যিনি তার হাসপাতালের সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী। মহিলা এসে তার কাহিনী বলতে শুরু করলেন। একটাই ছেলে ছিল আমার। স্বামী মারা যাওয়ার পর এ ছেলেকে আঁকড়েই বাঁচতে চেয়েছিলাম। অনেক কষ্টে তাকে বড় করি। যুবক হলো। লেখাপড়া শিখে প্রাইভেট একটা অফিসে চাকরিও নিল। ছেলেকে বিয়ে করাবার জন্যে বৌ খুঁজছিলাম। এমনি সময় একদিন অফিসের কাজে শহরের বাইরে একটা সাইটে যেতে গিয়ে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় আমার ছেলে। শুনে সেই যে আমি জ্ঞান হারাই, জ্ঞান ফেরে সাতদিন পর। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর মনে হলো আমি কেন বেঁচে থাকলাম! স্বামী নেই, সন্তান নেই। এ বয়সে আমি আর কী জন্যে বেঁচে থাকব! 

এত বিষণ্নতা ভর করল আমার ওপর যে খেতে ভাল লাগত না। কোনো কাজ করতে ভাল লাগত না। সারাদিন শুধু একটা ঘরে শুয়েই থাকতাম আমি। একদিন বাজারে যেতে বাধ্য হলাম, কারণ বহুদিন ধরে ঘরে খাওয়ার তেমন কিছু ছিল না। বাজার করতে, রান্নাবান্না করতেও আমার ভাল লাগত না। তো বাজার থেকে ফেরার সময় হঠাৎ শুনি আবর্জনার স্তুপের ভেতর থেকে একটি বেড়াল ছানার মিউ মিউ ডাক। কাছে যেতে দেখি আবর্জনার মধ্যে রাখা একটা ভাঙা টিনের কৌটায় লেগে বেড়ালটার পা কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে দর দর করে। আহত পা নিয়ে ছানাটা কৌটাটাকে ছাড়াতেও পারছে না। সাথে সাথে আমি কাছে গিয়ে ছানাটাকে তুলে নিলাম। বাড়িতে নিয়ে এলাম। আমার প্রতিবেশী ছিলেন একজন পশু চিকিৎসক। তার কাছে বেড়ালটাকে নিয়ে গেলাম। তিনি কিছু ওষুধ দিলেন। বাড়িতে নিয়ে এসে ওষুধ-পথ্য খাওয়ালাম। গামছা দিয়ে বিড়া বানিয়ে ছানাটাকে ঘুমাতে দিলাম। এভাবে দিন পনেরোর মধ্যে সে পুরোপুরি সেরে উঠল। 

এরপর থেকে সারাক্ষণই আমার পায়ে পায়ে ঘোরে। আমি কী করি না করি সব দেখে। একদিন আমি একটা বই পড়ছিলাম। হঠাৎ দেখি বেড়ালছানাটা মিউ মিউ করতে করতে আমার কাছে এল। দুষ্টুমি করতে করতে আমার কানটুপিটাতে মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছিল সে। যখন আর বের করতে পারছে না, চোখে কিছু দেখছেও না, তখন আমার কাছে এলো। দেখে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো আজ ছ’মাস পর আমি প্রথম হাসলাম। তখন মনে হলো- একটা সামান্য বেড়াল ছানাকে সাহায্য করে যদি আমি এত সুখী হতে পারি তাহলে মানুষকে সেবা করার আনন্দ কত বাধভাঙা হতে পারে! সাথে সাথেই কিছু খাবার রান্না করে আমার অসুস্থ প্রতিবেশীকে দেখতে গেলাম। যে আমি ঘর থেকেই বেরুতাম না, তাকে তার ঘরে দেখে প্রতিবেশী যারপরনাই খুশি হলো। আমারও খুব ভালো লাগল। 

এরপর খুঁজে বের করলাম এই হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন এমন বহু রোগী আসে যাদের কেউ দেখার নেই। আমি তাদের সেবা করি। যখন যার যেটা লাগে। আমার নিজের ছেলে হয়তো আর নেই। কিন্তু এখানে অনেক ছেলেকে মেয়েকে আমি সেবা করেছি যারা পরম মমতায় আমাকে মা ডেকেছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। কিন্তু এখনো আমাকে চিঠি লেখে। আমার জন্যে উপহার পাঠায়। এতক্ষণ তন্ময় হয়ে শুনছিলেন সেই ধনাঢ্য নারী। শুনতে শুনতেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। 

বললেন, আমি তো সারাজীবন কারো জন্যে কিছু করি নি। এজন্যেই তো আমার জীবনে এত বিষণ্নতা এত অসুখ! আমি এখন থেকে মানুষের সেবায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু করব। করোনার এই কাল আমাদের সামনে সেবা ও স্বার্থপরতা- দুটোর ছবিই ফুটিয়ে তুলেছে। এক দল মানুষ জীবন বিপন্ন করে হলেও মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আরেক দল মানুষ আক্রান্ত মানুষকেই মনে করছে ‘ভাইরাস’ যেন রোগাক্রান্ত হয়ে সে অপরাধ করেছে। এবং সেই অপরাধে এমনকি নিজের মা, বাবা, স্ত্রী বা স্বামীকেও পরিত্যাগ করেছে এমন খবরও এসেছে। অথচ এই মানুষগুলো বুঝতে পারছে না যে, একজন করোনা আক্রান্তের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের মমতা- স্বজনের, প্রিয়জনের, প্রতিবেশীর, সমাজের। 

কারণ করোনা আক্রান্ত হয়ে যে মানুষগুলো মারা গেছে বা যাদের সংক্রমণ জটিল হয়েছে তারা এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার একটা বড় কারণই ছিল মানসিক। এক তো প্রচণ্ড আতঙ্ক যে করোনা মানেই বোধ হয় মৃত্যু। দ্বিতীয়ত, নিঃসঙ্গতা। যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। এখন তো আমাকে ঘরে বা হাসপাতালে একাকী একটা ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে হবে। সমবেদনা জানানোর জন্যে, সেবার হাত বুলিয়ে দেয়ার জন্যে কাউকে পাব না। এমনকি যাদেরকে পাওয়ার কথা- হাসপাতালের ডাক্তার বা নার্স তারাও তো কাছে আসবে না! এই বিষণ্নতা, হতাশা শারীরিকভাবেও তাদেরকে দুর্বল করেছে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ছিনিয়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার উদ্দীপনা। আসলে বেঁচে থাকার উদ্দীপনা মৃত্যুমুখে ধাবমান মানুষকেও কীভাবে জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে তার হাজার হাজার উদাহরণ আছে!

এসি