ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭

জীবন ছোঁয়া মেয়েটি 

সেলিম জাহান

প্রকাশিত : ০৩:৫৪ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার | আপডেট: ০৩:৫৬ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার

ঘোরানো দরজা দিয়ে আমি বেরিয়ে আসছিলাম, সে ঢুকছিল। সঙ্গে সঙ্গে চোখে চোখ পড়ল। ফলশ্রুতি? আমি বাইরে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম - আর সে ঘোরানো দরজায় আর এক পাক ঘুরে বাইরে বেরিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ‘কেমন আছ তুমি?’, তার গলার আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ল যেন। আমি স্মিতহাস্যে বললাম, ‘ভালো, তুমি?’ ‘ভালোই, তা এখানে কি করছ’? জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তার। ‘আমার এক সহকর্মী এখানে থাকেন। একটা বই নিতে এসেছিলাম। তা, তুমি? তুমি এখানে কেন’? 

পাল্টা প্রশ্ন আমার। ‘আমার এক সহকর্মী এক হপ্তার জন্য বাইরে বেড়াতে গেছে। তাই আমি সাময়িকভাবে এখানেই থাকছি ওর বেড়াল দু’টোর দেখাশোনার জন্য’, খোলাস করে সে। আমার তখন মনে পড়ে যায় যে আমাদের দ্বীপের পাশাপাশি এ দুটো আবাসিক ভবন স্লোন-কেটারিং ক্যান্সার হাসপাতালের কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ।

‘তুমি কি ব্যস্ত এখন? সময় হবে একটু?’ জানতে চায় সে। ‘না, ব্যস্ত নয়, বাড়ীতেই ফিরছিলাম। কিন্তু, কেন বল তো?, প্রশ্ন আমার। ‘না, ভাবছিলাম, তোমার সময় যদি ফাঁকা থাকে, তা’হলে কোথাও বসে একটু কফি খেতাম’, তার ইচ্ছেটা প্রকাশ করে সে। ‘নিশ্চয়ই’, সায় দেই আমি। তার সারা মুখের খুশীর ঝিলিক টের পাই আমি।’পাঁচ মিনিট সময় দাও আমাকে। আমি এই নার্সের ধরাচূড়ো ছেড়ে আসি’, প্রস্তাব তার। মাথা হেলাই আমি আর দ্রুত অন্তর্হিত হয় সে।

কতদিন আগে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার? তা’ বছর পাঁচেক তো হবেই। বেনুর অসুস্হতা তখন বেড়েছে - প্রায়ই রাত-দিন কাটাতে হত স্লোন-কেটারিংএর দশ তলায়। ওর শয্যার পাশে বসে হাত ধরে থাকতাম, নানান বিষয়ের গল্প করতাম, ওকে সাহায্য করতাম নানান বিষয়ে। রাতে শুয়ে পড়তাম একটা টানা চেয়ারে। মাঝে মধ্যেই ঘুম আসতো না। তখন ঘরের বাইরে বেরুতাম। টানা বারান্দার উল্টো দিকেই ছিল রোগীদের আত্মীয়-স্বজনদের বিশ্রামাগার। সেখানেই ছিল কফি, চা আর অন্য খাবারের ব্যবস্থা।

গভীর রাতে চারদিকে কেমন এক অদ্ভুত সুনসান নিস্তবদ্ধা। দেখতাম রোগীদের স্বজনদের বিশ্রামাগারে অনেকেই কম্বল মুড়ি দিয়ে সোফার ওপরে গভীর ঘুমে অচেতন। কৌনিকভাবে একটু দূরে নার্সদের কর্মবেষ্টনী- দেখতে পাই তারা ডুবে আছে কাজে, মাঝে মাঝে মৃদুস্বরে পরস্পর গল্প করছে, কখনো কোন ঘর থেকে ডাক আসলে হাল্কা কিন্তু দ্রুতপায়ে সেদিকে যাচ্ছে।

ঘুম না আসলে প্রায়ই অনেক গভীর রাতেই আমি এককাপ কফি হাতে নিয়ে ঘরের বাইরের দেয়ালে হেলান দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিতাম, উপভোগ করতাম রাত্রির নিস্তবদ্ধতা,  চেয়ে দেখতাম নার্সদের কাজ-কর্ম। ঠিক এমনি এক রাতে হঠাৎ করে চেয়ে দেখি একজন তরুনী নার্স আমাকে হাত ইশারায় ডাকছে। চেনা মুখ - মাঝে মধ্যেই ভদ্রজনোচিত সম্ভাষন বিনিময় হয়েছে, টুকটাক কথাও হয়েছে বেনুর শুশ্রুষা প্রসঙ্গেও।এ্যানা ওর নাম। কাছে যেতেই হেসে বলল, ‘একা একা চুপ করে কফি খাচ্ছ কেন? আমিও তো কফি খাচ্ছি। এসো গল্প করতে করতে কফি খাই’। 

বেনুর ঘরের দিকে এক পলক তাকিয়ে বললাম, ‘কিন্তু, ঘরে ও একা আছে।’ একটু হেসে এ্যানা বলে, ‘ওকে ঘুমের অষুধ দেয়া হয়েছে, ও শিগগীরই উঠবে না। চিন্তা কোর না। কফিটা খাও আরাম করে।’ তারপর আমার দিকে পূর্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘আসলে তোমাদের যুগে সত্যিকারের প্রেম বলে একটা জিনিষ ছিল। আমাদের প্রজন্মে তা নেই’। একটি ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস শুনি যেন। 

‘জানো আমাদের সময়ে প্রেমটা বড় যান্ত্রিক, বড় বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে’। দূরের দিকে উদাস দৃষ্টি মেলে সে বলে ওঠে। ‘প্রেমটা আমাদের কাছে যেন একটা খেলনা - একজনকে আর ভালো লাগে না, তাকে ফেলে দিয়ে আরেকজনকে তুলে নিলাম। কিংবা বাজারে গিয়ে জিনিস কেনার মতো -অনুরাগে নয়, অনেকটা যেমন যাচাই করে একটা জিনিষ বেছে নিলাম’, দম নেয় সে।’অথচ তোমাদের প্রজন্মের প্রেমের দিকে তাকিয়ে দেখো’। আবার শুরু করে সে। ‘সেখানে পরতে পরতের ভালেবাসা অনুভব করা যায়, কেমন যেন বিছিয়ে দেয়া অনুরাগের আবেশটুকু বোঝা যায়, পরস্পরের ওপর নির্ভরতাটুকু ভালো লাগে’।

বেনু চলে যাওয়ার দিন এ্যানা ছিল না হাসপাতালে - সে দিন ওর সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। কিন্ত প্রায়শই মনে হত ওর কথা। পেশার প্রতি ওর নিষ্ঠা, ওর কর্মকুশলতা, রোগীদের প্রতি ওর গভীর মমত্ববোধ, প্রতিটি অসুস্হ মানুষের প্রতি ওর এক ধরনের আবেগ, অন্যকে বোঝার এর অসীম ক্ষমতা আমার কাছে ঈর্ষনীয় পর্যায়ের বলে মনে হত।

এই সব সাত-পাঁচ যখন ভাবছিলাম, তখনই ওর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সুন্দর করে সেজে এসেছে এ্যানা। ‘দেরী করে ফেললাম কি’? একটু উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চায় সে। আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে ঠিক আছে। তারপর আমাদের দ্বীপের একবোদ্বিতীয়ম কফির দোকানটিতে গিয়ে দু’কাপ কফি নিয়ে মুখোমুখি বসি আমরা।

এবার আমার দিকে ভালো করে চায় সে। ‘তিন বছর পরে দেখা। ভালো লাগছে তোমাকে দেখতে। তা বন্ধুত্ব হল কারো সঙ্গে?’ কন্যাসম মেয়েটির কথায় আমি হেসে ফেলি। পাল্টা জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার কি খবর, তা বলো’। কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে সে জানায়, গত তিন বছরে তার দুটো ছেলেবন্ধু হয়েছিল - একটাও টেঁকেনি। 

এ্যানা অনেকক্ষন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। তারপর প্রায় অস্ফুটকন্ঠে বলে, ‘জানো, আমি জর্জিয়ায় ফিরে যাচ্ছি। ওখানকারইতো মেয়ে আমি। ‘বাহ্,’ খুশী হয়ে উঠি আমি, ‘মা-বাবার কাছে থাকতে পারবে। নিজের শহরে নার্সিং করতে পারবে’। আমার দিকে তাকায় সে - দেখি সেখানে জল টলটল করেছে। জলভরা চোখেই সে বলে, ‘না, নার্সিং আমি ছেড়ে দিচ্ছি’। ‘সে কি! এত ভালো নার্স তুমি’! চোখের জল মুছে সে হাসে - একটি পরিতৃপ্তির হাসি। 

‘সে তোমরা বলো। কিন্তু আমার  সব মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে খুব দক্ষ নার্স হলেও আমি বড় বেশী আবেগপ্রবন, রোগী বা তার স্বজনদের সঙ্গে আমি যেন একটা আবেগের সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলি, যা আমার বস্তুনিষ্ঠ কাজের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে নার্সিং ছেড়ে দেবার। নার্সিংএ অনুভূতির দরকার আছে, আবেগের স্হান নেই।’ বড় ব্যথিত গলা এ্যানার।‘কিন্তু কি করব বলে। গত দুবছর ক্যান্সারগ্রস্হ বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করেছি। ওদের সঙ্গে কাজ করলে কেমন করে মানুষ আবেগ্রবন না হয়ে পারে?’, এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে এ্যানা।

আমি ওর হাত ধরি। তারপর নরম গলায় বলি, ‘মানুষের প্রতি তোমার মমতা এতো বেশী যে তুমি যাই কর না কেন, মানুষের জীবন তুমি ছুঁয়ে যাবে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি আছে বল জীবনে?’ যাওয়ার সময় হয়ে আসছিল। আমরা টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ি। বাইরে বেরিয়ে এ্যানা বলে, ‘আগামী সপ্তাহেই আমি চলে যাচ্ছি। তোমাদেরকে আমি কখনো ভুলব না।’ ‘তোমার জন্যও আমার সব শুভকামনা থাকল’, বলি আমি গাঢ় স্বরে। তারপর দু’জন দুদিকে পা বাড়াই। দশ পা এগুতেই এ্যানার চেঁচানো গলার আওয়াজ শুনি, ‘তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দাও নি।’ আমি আবারও হেসে ফেলি।

এমবি//