ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪,   ফাল্গুন ১০ ১৪৩০

সম্পর্কের স্বরূপ

সেলিম জাহান

প্রকাশিত : ০৪:১৮ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার

সময়ের সূতোয় আমাদের সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের দু’ধরনের সম্পর্ক ছিল - একটি ব্যবসায়িক, একটি আত্মিক। ব্যবসায়িক সম্পর্কটি কাজের, আত্মিক সম্পর্কটি আত্মীয়তার; ব্যবসায়িক সম্পর্কটি অর্থের ও স্বার্থের, আত্মিক সম্পর্কটি মমতার ও মানবিকতার। ব্যবসায়িক সম্পর্কে লাভ-অলাভের কথা উঠেছে, অংশ-ভগ্নাংশ নিয়ে বিতর্ক চলেছে, চুলচেরা হিসেব-নিকেশ কষা হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে এ সবকিছু ছাপিয়ে অখণ্ড সত্য হিসেবে সর্বদাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক।

এ আত্মিক সম্পর্কের কারণেই আমরা একে অন্যের স্বজন হয়ে উঠেছিলাম। নির্দ্বিধায় বয়োজ্যেষ্ঠদের ‘কাকা, খালা, পিসি, দাদা, আপা’ ইত্যাদি সম্বোধনে বরণ করেছি। এর মাধ্যমেই গড়ে তুলেছি এক আত্মীয়তার বন্ধন, যার কাছে হার মেনেছে কত রক্তের সম্পর্কও। একইভাবে বয়োকনিষ্ঠদেরও কাছে টেনে নিয়েছি কত নামে।

পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়, অঞ্চলে-অঞ্চলে মানুষের সঙ্গে মানুষের মূল ভিত্তিই তো ছিল এ আত্মিক বন্ধন। তাই ক্ষিদে পেলে পাড়ার যে কোন বাড়িতেই পাত পেতেছি, মহল্লায় অন্যায় দেখলে যে কোন বয়োজ্যেষ্ঠ যে কোন বয়োকনিষ্ঠকে শাসন করেছেন, অঞ্চলে বিপদ হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে এক সঙ্গে।

আমাদের মমতার উৎস ছড়ানো ছিল চারদিকে। স্কুল ছুটির পর টইটই করে দুপুর দুটোর জায়গায় বিকেল ৪টায় ঘরে ফিরলে মা ভাত বেড়ে দেন নি, দিয়েছেন রহিমন বুয়া। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে যখন হৈ হৈ করতে করতে বাড়ি ফিরছি, তখন তাঁর দোকান থেকে দেখতে পেয়ে মাথায় ছাতা ধরেছেন অশ্বিনী কাকা। বর্ষার জলধারার মতো তাঁর বকা-ঝকাও চলেছে স্রোতের মতো। যখন বাড়ি পৌঁছেছি, তখন আমার শরীরে এক ফোঁটা জলের স্পর্শ লাগেনি, কিন্তু হাঁপানীর রোগী অশ্বিনী মিস্ত্রীর সারা শরীর ভিজে জব জবে।

স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষা। পাড়ার নিতাই মাস্টার মশায় প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে পড়িয়ে যান অঙ্কে কাঁচা পলাশকে। কেউ তাঁকে এটা করতে বলেনি। নাজমা আপার মা'র শরীর খুব খারাপ- নিয়ম করে খাবার আসছে নানান বাড়ি থেকে। পালা করে রাত জাগছি আমরা, সব কাজ ফেলে মোড়ের ডাক্তার চাচা খালাম্মার শিয়রে গত তিন দিন ধরে। মহল্লায় শিশিরের বোন কণা'দির বিয়ে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই খাটছি তার পেছনে- বোঝার উপায় নেই, কে কণা'দির ভাই, কে কাকা, আর কেই বা মাসী।

ঢিল মেরে রাস্তার দু'টো বাতিস্তম্ভের বাতি ভাঙতে পেরেছি, আর একটা ভাঙতে পারলেই হ্যাট্রিক। তার আগেই কান চলে গেছে পিতৃবন্ধু করিম চাচার হাতে। রেগে গিয়ে খারাপ কথা বলেছি বন্ধুকে- তারপরই ফেটে পড়েছে দেড় টনী বোমার ধমক 'চোওপ' - কোনার মনোহারী দোকানের আশু'দা। দাঁতে নখ কাটছি - কয়েকবারই নিষেধ করেছেন পাশের বাড়ির আসমা ফুপু। চতুর্থবার মুখে হাত দিতেই ঠাস করে গালে চড় বসিয়েছেন একঘর লোকের সামনে এবং তারপর নিতান্ত স্বাভাবিকতায় ফিরে গেছেন মা-খালাদের গল্পে।

আত্মিক এই সব মমতার, সহমর্মিতার, অধিকারের সম্পর্ক ছিল শর্তবিহীন। সেখানে লাভ-ক্ষতির প্রশ্ন আসেনি, দেনা-পাওনার হিসেব ওঠেনি, স্বার্থ-বুদ্ধি মাথাচাড়া দেয়নি। এ সব সম্পর্কের ভিত্তি ছিল স্বত:স্ফুর্ত মানবিকতা, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং নিবিড় একাত্মতা।

তাই বলে সমাজে কি অসমতা ছিল না সম্পদের, বিভাজন ছিল না কৌলীন্যের, ভেদাভেদ ছিল না ধর্মের? নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু ছিল না সম্পদের এমন উলঙ্গ প্রদশর্নী, কৌলীন্যের এমন চোখ ধাঁধানো ভঙ্গি, ধর্মের এমন উন্মাদনা। আত্মিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষ আর মানবিকতাই বড় হয়ে উঠত।

আজ কেন জানি মনে হয়, সমাজে ভেতরে-বাইরে মানুষে-মানুষের ব্যবসায়িক সম্পর্কটাই মূখ্য হয়ে উঠেছে- গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক। আমরা আমাদের বড় নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিচ্ছি, বৃত্ত গড়ে তুলছি গুটিকয়েক মানুষকে নিয়ে যাদের আমাদের প্রয়োজন হবে স্বার্থের কারণে, ভাবছি এতেই আমাদের সমৃদ্ধি, এতেই আমাদের পুষ্টি, এতেই আমাদের নিরাপত্তা।

আমরা বিস্মৃত হচ্ছি যে, আমাদের বিকশিত হওয়া মানুষে-মানুষের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে নয়, আত্মিক সম্পর্কের মধ্যে; ব্যক্তিগত স্বার্থ সাধনের মধ্যে নয়, গোষ্ঠীগত মঙ্গল রক্ষার মধ্যে; গুটিয়ে নেয়ার কিংবা বিযুক্তির মধ্যে নয়, বরং 'যুক্ত করো হে সবারও সঙ্গে, মুক্ত করে হে বন্ধ' এর মধ্যে।

এনএস/