ঢাকা, রবিবার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

জীবনের গল্প

অর্নিতা দাস অর্নি

প্রকাশিত : ০৩:৩৮ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার | আপডেট: ০৩:৫০ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার

লেখক অর্নিতা দাস অর্নির প্রয়াত মা

লেখক অর্নিতা দাস অর্নির প্রয়াত মা

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭
আমি তখন ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামক যুদ্ধক্ষেত্রে ভর্তির হওয়ার জন্য একজন উদগ্রীব ভর্তিযোদ্ধা। আমার পিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ায় বোঝার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায়। আমি ক্লাস নাইন থেকে আর্টস নিয়ে পড়ি, কারণ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আমার স্বপ্ন ছিল না। ঢাবি নামক স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন আমার বাবা। আর প্রতিনিয়ত আমার স্বপ্নের বীজে জল ঢালতেন আমার লক্ষ্য মনে করিয়ে দিয়ে।

মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমি বাড়ির বাইরে কলেজে পড়া শুরু করি। পাগলের মতো পড়তাম একটা সময় হয়তো এই পরিশ্রমের সান্ত্বনা পুরষ্কার হিসেবে কলেজে মডেল টেস্টে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলাম। যেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। তারপর অকল্পনীয় একটা ঝড় বয়ে যায় জীবন, কিছুটা সময়ে থমকে ছিলাম তারপর আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করি।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে আমি বাড়িতে আসি। পরের দিন সকালে আমি আমার জীবনের  মূল্যবান ব্যক্তি (আমার মা) কে হারিয়ে ফেলি। তার দুই দিন পর আমার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আমার বাড়ি থেকে ঢাকা যেতে একদিন লাগে। বাবা-মা মৃত্যুর শোক কি জিনিস যার বাবা-মা মারা যায়নি তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। 

কথায় আছে, মায়ের সাথে নাড়ির সম্পর্ক থাকে। বাস্তবিক অর্থে তাই যখন মা মারা যায় ঠিক নাড়ি ছেঁড়া এক ব্যথা অনুভব হয় যা চোখের দু-ফোঁটা জলেও সামলায় না। 

জীবনে কঠিন সময়ের সিদ্ধান্ত তখন নিয়েছিলাম। আমার কোনো সেন্স ছিল না। আমি কাঁদতে পারছিলাম না চুপ হয়ে গেছিলাম। আমার মাথায় কোনো কাজ করছিল না, কোনো ভাবনাও আসছিল না।

২০ সেপ্টেম্বর সকাল বেলা
আমার দাদা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই কি ঢাকা ভার্সিটির পরীক্ষা দিবি, দিলে আজই তোর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।’ আমি কিছু বললাম না। মাথায় মধ্যে ভন ভন করতেছে। ওর সর্বশেষ কথা আমাকে সেদিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল, ‘তুই যদি পরীক্ষা না দিতে চাস কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু এই জন্য সবাই আমাদের মাকে দোষারোপ করে বলবে, নিজেও মরলো মেয়েটাকেও মেরে গেল। তুই পরীক্ষা দে, চান্স না পাস সে আলাদা কথা, কিন্তু শোক কেটে গেলে সারাজীবন যেন না পস্তাতে হয়।’

দাদার এই এ কথায় আমি মাথা নাড়লাম, মাতৃহীনা শোক নিয়ে ঢাকা রওনা হলাম। এক ঘোরের মধ্যে কাটাচ্ছিলাম সময়টা। পরীক্ষা দিলাম। সেই সময়ে কাটানো দিনগুলো দুঃস্বপ্নের মতো, এখনো মনে করলে শিউরে উঠি। 

বছর ঘুরে ৩ বছর হলো মা আজ নেই।
মা শুনছো! ‘আমি এখন আমার স্বপ্নের বিদ্যালয়ে ঠাঁই পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আমি। বাড়িতে ৬ মাস আছি। জীবনের শূন্যস্থান সাময়িক খুশি আর ব্যস্ততা দিয়ে হয়তো ভরাট করার চেষ্টা করা যায়, তবে মা-বাবার শূন্যস্থান হয়তো এক জীবনে পূরণ করা যায় না।’

অতীতের ঘটে যাওয়া সবটাই এখন গল্প, আমার জীবনের গল্প। ফেলে আসা দিনগুলো শুধুই স্মৃতি যা ক্ষণে ক্ষণে নাড়িছেড়া বেদনা অনুভব করায়।  

(চোখ বন্ধ করলে কল্পনায় মায়ের এই সময়কার রূপটাই আসে। বাঁধনো ছবিতে যেমন মাকে দেখা যায়, তেমন দেখি না। তাই এ্যালবাম ঘেঁটে এই ছবিটা বের করলাম)

লেখক: শিক্ষার্থী

এমবি//