ঢাকা, রবিবার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

করোনায় সুস্থ্য থাকতে নিজেকে ভালোবাসুন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:১৯ এএম, ৪ অক্টোবর ২০২০ রবিবার

করোনা পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বের মানুষ এখনও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে এবং সমস্যার অংশ না হয়ে হতে হবে সমাধানের অংশ। দুশ্চিন্তা, মৃত্যুভয়, নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্তচিত্তে করে যেতে হবে নিজের যা যা করণীয় তা।

ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুসংহত করতে প্রয়োজন নিয়মিত ব্যায়ামচর্চা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সবোর্পরি ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।

এ জন্য জীবনযাপনে শুদ্ধাচার, খাওয়া দাওয়ায় শুদ্ধাচার, শিক্ষা ব্যবস্থায় শুদ্ধাচার আনতে হবে। কিন্তু কিভাবে এই শুদ্ধাচার আয়ত্ব করবেন- তা জানা জরুরী। এক কথায় যদি বলি- ‘সুস্থ্য থাকতে নিজেকে ভালোবাসুন’।

- প্রতিদিন দমের চর্চা করুন। অন্তত দশ মিনিট। 
- প্রতিদিন বিশ মিনিট খালি হাতে যোগ ব্যায়াম করুন। বিশ মিনিট হাঁটুন। দশ-বিশ মিনিট রুটিন করে মৌন থাকুন।  
- বৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। প্যাকেট বা মোড়ক জাত খাবার, কোমল পানিয়, এনার্জি ড্রিংক, চিনিযুক্ত খাবার বাদ দিন। উদ্ভিত জাতীয় খবার খাদ্য তলিকায় রাখুন। 
- নিয়মিত নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করুন।
- প্রতিদিন অন্যের উপকারে কিছু সময় দিন এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী দান করুন। শারীরিক সমস্যা না থাকলে চারমাস পর পর রক্ত দিন। 
- অহেতুক সোশ্যাল মিডিয়ায় বা টেলিভিশন দেখে সময় নষ্ট না করে ভালো বই পড়ুন। 
- নেতিবাচক খবরে আতঙ্কিত না হয়ে নিজেকে আনন্দে বা প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন।
- পরিবারকে কোয়ালিটি সময় দিন। অন্তত পক্ষে দুই বেলা পরিবারের সাথে খাওয়া দাওয়া করুন।

উদ্বেগ দূর করতে যোগব্যায়াম
শরীর ও মন সুস্থ রাখতে প্রাচীনকাল থেকেই যোগব্যায়াম বা ইয়োগা বেশ জনপ্রিয়। যোগব্যায়াম শুধু শরীর ও মন সুস্থ রাখে না নিয়মিত যোগব্যায়াম করলে ওজন কমে, শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি যোগব্যায়ামের দারুণ প্রভাব আছে মনের ওপর। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে যোগব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকর। তাই প্রতিদিনের কর্মতালিকায় যোগব্যায়াম রাখার মাধ্যমে মন এবং শরীরকে শক্তিশালী করে আপনি করানো ভাইরাসের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারেন।

যেভাবে করবেন যোগব্যায়াম
প্রাণায়াম
সোজা হয়ে বসে ধীরে ধীরে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নিন। একইভাবে ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। এভাবে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ বার প্রাণায়াম করতে পারেন। এই ব্যায়াম মানসিক অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। তাছাড়া করোনা সংক্রমিত হলে ফুসফুসের সমস্যা প্রকট হয়। এ কারণে চিকিৎসকরা এই সময় ফুসফুসের ব্যায়াম করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

উত্তরাসন
উত্তরাসন পদ্ধতিতে ব্যায়ামের জন্য প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এবার শরীরের ওপর দিকটি নীচে ঝুঁকে হাত দিয়ে পায়ের পেছনে স্পর্শ করতে হবে। ৫ সেকেন্ড এভাবে 
থেকে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এভাবে প্রতিদিন ৫ বার উত্তরাসন পদ্ধতিতে ব্যায়াম করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে ব্যায়াম করলে শরীরে রক্ত চলাচল ঠিক থাকে। এছাড়া মস্তিষ্কের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।

মেডিটেশন
মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। মেডিটেশনে মন অনেক বেশি ইতিবাচক হয়। আত্মবিশ্বাস ও স্থিরতা ফিরে আসে। নিয়মিত মেডিটেশন করা এই সময়ের জন্য খুবই জরুরি। কেননা শরীরের মতো মনের যত্ন নেওয়াও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকেই বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই মন শান্ত রেখে স্বাভাবিকভাবেই পাড়ি দিতে হবে এই কঠিন পরিস্থিতি।

অফিসের কাজ বা পড়াশোনার জন্য যাদের দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকতে হয় তারা প্রায়শই চোখ, ঘাড়, কাঁধ, পিঠ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কথা বলে থাকেন। বিভিন্ন ওষুধ সাময়িকভাবে এসব ব্যথা দূর করলেও তা আবারও ফিরে আসতে পারে। এসব ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে আপনি যোগব্যায়াম করতে পারেন।

খাওয়া দাওয়ায় শুদ্ধাচার
করোনা ভাইরাস শরীর কাবু করে দুর্বল করে ফেলা। তাই এরকম অবস্থায় শুধু স্বাদের কথা না ভেবে খেতে হবে পুষ্টিকর খাবার। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, বৃক্ক, মস্তিস্ক, যকৃৎ- প্রতিটি অঙ্গেরই খেয়াল রাখতে হবে। সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল, ওজন, সবই রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণে। তাই এই সময়ে সবচেয়ে দৃষ্টি দিন পুষ্টির উপর।

• দিন শুরু করুন দুই গ্লাস হালকা গরম পানি পান করে। পানিতে মধু দিতে পারেন। সাথে একটু আদা, কাঁচা হলুদ থাকলে আরো ভালো। সকালে খালিপেটে হলুদ দুধ খেতে পারেন। গরুর দুধে এক চামচ কাঁচা হলুদ বাটা, আধ চামচ দারচিনির গুঁড়া, সিকি চামচ গোলমরিচের গুঁড়া মিশিয়ে নিন। চিনি না খেয়ে মধু মেশাতে পারেন। এর আধঘণ্টা পর খাবার খাবার খাবেন।  

• সকালে চায়ের বদলে আয়ুর্বেদিক ক্বাথ খেতে পারেন। তুলসি, পিপলি, আদা ও মধু দিয়ে অথবা তুলসি, আদার সঙ্গে গোলমরিচ, দারচিনি, কিশমিশ, মধু ও লেবুর রস দিয়ে বানাতে পারেন এই ক্বাথ। আধা চামচ গুড়ুচি এককাপ পানিতে ফুটিয়ে মধু মিশিয়েও বানানো যায়। নিয়মিত খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বাড়বে, বাড়বে হজমশক্তি। গলাতেও আরাম হবে। 

• সকালে এমন খাবার খান, যাতে কোনও অস্বাস্থ্যকর উপাদান নেই। অর্থাৎ মোড়কজাত, প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে ঘরে বানানো লাল আটার রুটি খান। এছাড়া গম ও ছোলা শুকনা খোলায় ভেজে তাতে ওটস ও বার্লি মিশিয়েও খেতে পারেন। দুধে কাঁচা হলুদ, ওটস ও মধু মিশিয়েও খেতে পারেন।

• দুপুরে ভাতের সঙ্গে কাঁচা হলুদ ও গোলমরিচ বাটা খান। ডাল-সব্জির সঙ্গে খান লেবু। বা খাওয়ার পর কোনও টক ফল খেতে পারেন।

• লেবু দিয়ে ধনেপাতা বা পুদিনার চাটনি বা ১৫ মিলি আমলকির রসও খেতে পারেন। কালোজিরার ভর্তা খেতে পারেন।

• রান্নায় সব ধরনের মশলা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করুন। যেমন ধনে, জিরা, হলুদ, গোলমরিচ, আদা, রসুন, মেথি, কালোজিরা।

• রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এমন একটি মশলা বানিয়ে রাখুন। যেমন- ৩ চামচ করে জিরা, ধনে, ৬ চামচ মেথি ও এক চামচ গোলমরিচ শুকনা খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে নিতে পারেন। তাতে মেশান এক চামচ আদার গুঁড়া, ৬ চামচ হলুদ গুঁড়া ও সিকি চামচ দারচিনির গুঁড়া। 

• যে কোনও রান্নায় মেশানোর আগে এক চামচ ঘি অল্প গরম করে তাতে এক চামচ এই মশলা দিয়ে নেড়ে নিন। এছাড়া ভাত, সেদ্ধ সবজি, ডাল, স্যুপে এই মশলা মিশিয়ে খাতে পারেন।

• যত খিদে পাক, পেট খানিকটা খালি রেখে খাবেন। পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। মাঝেমধ্যে চুমুক দিন। সুযোগ থাকলে সারাদিন হালকা গরম পানি খাবেন। 

• রাতের খাবার যত হালকা হয় ততো ভাল। ঘুমাতে যাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক আগে খাবেন। খাওয়ার পর একটু পায়চারি করুন।

• রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন পুষ্টিকর খাবার বা ভেষজ খেতে পারেন। নিয়মিত খাবার তালিকায় দেশীয় মৌসুমি ফল অবশ্যই রাখবেন। বিদেশি প্রক্রিয়াজাত ফলের চেয়েও টাটকা দেশীয় ফলে অনেক বেশি প্রোটিন থাকে। টক জাতীয় ফলে আছে ভিটামিন-সি, যা ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধ করে। সবুজ সবজি, ডাল খেতে হবে বেশি। পেঁপে, পুঁই শাক, ব্রোকলি, বরবটি, পালং শাক, লাউ, ক্যাপসিকাম বেশি বেশি খাবেন। এছাড়াও খাদ্য তালিকায় রাখবেন ডিম, খেজুর, বাদাম, আদা, রসুন ও কালোজিরা। এড়িয়ে চলবেন- চিনি ও চিনিজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড। কারণ, এগুলো দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 
এসএ/