ঢাকা, শুক্রবার   ১৫ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ২ ১৪২৭

প্রকৃতির কাজ সারার কথা বলে স্ত্রীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা

নাটোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ০২:৩০ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২০ মঙ্গলবার | আপডেট: ০২:৩২ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২০ মঙ্গলবার

নাটোরের নারায়ণপুরে পারিবারিক বিরোধের জেরে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম শিল্পিকে (৩০) কুপিয়ে হত্যা করেছে স্বামী মঈনুল হোসেন মনির (৩৫)। প্রকৃতির কাজ সারার কথা বলে স্ত্রী শিল্পিকে ঘরের বাহিরে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করে পালিয়ে যায় স্বামী। 

ঘটনা জানাজানি হলে এলাকার মসজিদের মাইকে ঘাতক মনিরকে ধরার ঘোষণা দেয়া হলেও তাকে ধরতে পারেনি এলাকাবাসী। সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দিন মজুরি করলেও মনির অধিংকাংশ সময় বেকার জীবনযাপন করতো। এ নিয়ে তাদের মাঝে বিরোধ লেগেই থাকতো। মনির কাজের কথা বলে ঢাকায় থাকতো। গত এক সপ্তাহ আগে তিনি স্ত্রীর কাছে আসেন। সোমবার রাত ২টার দিকে প্রকৃতির কাজ সারার কথা বলে স্ত্রী শিল্পিকে ঘরের বাহিরে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এতে শিল্পির একটি হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। অপর হাত শরীরের সাথে ঝুলছিল এবং ওই হাতের কয়েকটি আঙ্গুল কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এছাড়া ঘাড়ের পিছনসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপানো হয়। পরে শিল্পির চিৎকার শুনে এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে আসলে রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

নিহতের চাচাতো ভাই মান্নান ও প্রতিবেশী আবুল হোসেন বলেন, ‘দিন মজুরি করলেও মনির সংসারের কোন খরচ দিতো না। উপরুন্তু মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে স্ত্রী শিল্পির কাছ থেকে জোর জবরদস্তি করে টাকা হাতিয়ে নিতো। না দিলেই স্ত্রীকে নির্যাতন করতো। শিল্পি নিজে মৌসুমে ইটভাটায় এবং অন্য সময়ে মানুষের বাড়িতে ঝিগিরি ও দিন মজুরি করে সংসার খরচ ও  দুই মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছিলেন। ওই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় বিরোধ লাগতো।’ 

তারা বলেন, ‘গতরাতে শিল্পিকে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া মনিরকে ধরার জন্য এলাকার মসজিদের মাইকে প্রচার করা হলে তারা শিল্পির কাছে ছুটে আসেন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান শিল্পি। মায়ের মৃত্যুতে এতিম হয়েছেন দুই শিশু ৮ম শ্রেণিতে পড়া মৌমিতা ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির মহিমা। তাদের একমাত্র অবলম্বন এখন বৃদ্ধ নানা। তাদের সহায়তার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাই।’

শিশু মহিমা জানায়, ‘ঘটনার রাতে মা-বাবার কাছেই ছিলাম। বাবা মাকে বাহিরে ডেকে নিয়ে মারধর করছিল। ভয়ে আমি বাহিরে বের হয়নি। পরে শুনেছি আব্বা মাকে মেরে ফেলেছে।’

নিহত শিল্পির বাবা রিকশাচালক বাহার আলী জানান, ‘প্রায় ১৭ বছর আগে সদর উপজেলার পার্শ্ববর্তী  সুলতানপুর গ্রামের মৃত জাফরের ছেলে মইনুল হোসেন মনিরের সাথে শিল্পির বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাদের দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তার দেয়া এক চিলতে জমিতে ছনের ঘর করে স্বামী সন্তান নিয়ে সেখানেই বাস করতো শিল্পি। কিন্তু মেয়ের কপালে সুখ ছিল না। মনির কাজ-কাম করতো না। কাজ করতে বললেই সে আমার মেয়ের ওপর নির্যাতন চালাতো। বাড়িতে কম থাকতো সে। কদিন আগে সে মেয়ের কাছে আসে। সোমবার রাতে আমার মেয়েকে পশুর মতো নির্যাতন করে হত্যা করে। আমি তার ফাঁসি চাই।’ 

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ওমর আলী পাঠান বলেন, ‘রাতেই খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। শিল্পির স্বামী একজন বেকার মানুষ। এছাড়া এলাকাবাসীর মাধ্যমে জেনেছি সে মাদকাসক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, মাদকের টাকার জন্যই হয়তো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে  বিরোধের জেরে এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে হয়তো। তাদের শিশু সন্তানদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন।’

নাটোর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘লাশ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। নিহতের স্বামী মনিরকে ধরতে অভিযান চলছে।’

এআই//এমবি