ঢাকা, সোমবার   ২১ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৬ ১৪২৮

মেলেনি ভাতা, ডিউটি পেতে দিতে হয়েছে ১৩ লাখ টাকা 

নওগাঁ প্রতিনিধি 

প্রকাশিত : ০৩:১০ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

নওগাঁয় সদ্য অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় সংসদ ও ১টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচনে প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা ২ হাজার ৫৪৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য এখন পর্যন্ত ভাতার টাকা পাননি। এদিকে অভিযোগ উঠেছে এই দায়িত্ব পেতে গিয়ে তাদের ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গুণতে হয়েছে। এতে করে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি অফিসে প্রায় ১৩ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। 

আবার ধার-দেনা করে উৎকোচ দিয়ে দায়িত্ব পালনের পরেও ভাতা না পাওয়ায় প্রান্তিক এসব নিরাপত্তা কর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। 

জেলার রানীনগর ও আত্রাই উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের নওগাঁ-৬ আসনের উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ১৭ অক্টোবর। এর তিনদিন পর ২০ অক্টোবর মান্দা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচন হয়। এই দুটি নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোট কেন্দ্র ছিল ২১২টি। 

জেলা আনসার ও ভিডিপি অফিস সূত্র জানায়, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খখলা রক্ষায় ভোটের আগে ও পরে মিলে ৫ দিন দায়িত্ব পালন করতে হয় আনসার সদস্যদের। প্রতি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন ১২ জন সদস্য। এর মধ্যে একজন প্লাটুন কমান্ডার (পিসি), একজন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি), ৪ জন নারী ও  ৬ জন পুরুষ। 

প্রত্যেক পিসি ও এপিসি প্রতিদিন দায়িত্ব পালনের জন্য ভাতা পাবেন ৫২৫ টাকা। সেই হিসাবে পিসি ও এপিসিরা ৫ দিনের প্রত্যেকে ভাতা পাবেন ২ হাজার ৬২৫ টাকা। আর সাধারণ সদস্যরা প্রতিদিন ৪৭৫ টাকা করে পাবেন ২ হাজার ৩৭৫ টাকা। ওই দুই উপ-নির্বাচনে ৩ উপজেলার ২১২টি কেন্দ্রে মোট ২ হাজার ৫৪৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে অনেক আগে থেকেই বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়। স্ব স্ব উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তারা ইউনিয়ন দল নেতার মাধ্যমে এই বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এ সময় যারা টাকা দিতে পারে তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর যারা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে তাদের বয়স্ক ও দুর্বল উল্লেখ করে বাদ দেওয়া হয়। 

বাধ্য হয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পেতে প্রত্যেক আনসার সদস্যদের কাছ থেকে (যার কাছে যেমন পাওয়া গেছে) নিম্নে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত প্রত্যেক ইউনিয়ন দল নেতার মাধ্যমে অগ্রীম অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

সে হিসেবে গড়ে ৫০০ টাকা করে মোট ২ হাজার ৫৪৪ জনের নিকট থেকে ১২ লাখ ৭২ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। সম্মানী ভাতার আশায় নির্বাচনী দায়িত্ব পেতে প্রান্তিক এসব নিরাপত্তা কর্মীরা অন্যের নিকট থেকে সুদে ঋণ করে উৎকোচের অর্থ দিলেও এখন পর্যন্ত তারা সম্মানী ভাতার টাকা পাইনি বলে জানিয়েছেন।

রানীনগর উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা আনসার সদস্য বলেন, ‘আমার প্রশিক্ষণের সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বয়স্কর কথা বলে আমাকে দাযিত্ব দেওয়া হবে না বলে ইউনিয়ন দলনেতা জানান। ওই দলনেতা ডিউটি পেতে হলে অফিসে টাকা দিতে হবে। পরে আমার নিকট থেকে ৬৫০ টাকা নেয়ার পর আমাকে ডিউটি দেওয়া হয়েছে।’

ওই সদস্য আরও বলেন, ‘আমার মতো যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের প্রত্যেকের নিকট থেকে উৎকোচ নেওয়া হয়েছে।’

এদিকে আত্রাই উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আনসার সদস্য বলেন, ‘নির্বাচনে ডিউটি দিতে তাদের প্রত্যেকের নিকট থেকে ৪শ’ টাকা করে নেয়া হয়েছে। দলনেতারা বলেছেন- বড় অফিসারদের এ টাকাগুলো দিতে হয়। আর টাকা না দিলে ডিউটিতে নেয়া হবে না। এজন্য বাধ্য হয়ে আমাদের টাকা দিতে হয়েছে। অভাবের মধ্যে আমরা ধার-দেনা করে টাকাগুলো দিয়েছি। ভোট শেষ হয়ে অনেক দিন হয়েছে কিন্তু এখনো ভাতার টাকা পাইনি।’

আত্রাই উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলনেত্রী বলেন, ‘আমাকে উপর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, যারা ৪শ’ টাকা করে দিতে পারবে তাদের নির্বাচনে ডিউটি দেয়া হবে। তারা-তো অসহায়, অনেকেই সুদের উপর ঋণ করে টাকা দিয়েছে।’

টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘৮ জন আনসার সদস্যের কাছ থেকে ৩ হাজার ২শ’ টাকা উঠিয়ে অফিসে দিয়েছি।’

মান্দা উপজেলার ঘাটকৈর গ্রামের আনসার সদস্য ভুক্তভোগী নওসাদ আলী বলেন, ‘ভোটের মধ্যে আমাদের ডিউটি দেয়ার জন্য কমপক্ষে ১ মাস আগে থেকে টাকা উঠানো শুরু হয়। বয়স হয়ে গেছেসহ বিভিন্ন কথা বলে প্রথমে আমাকে ডিউটি দেয়া হবে না বলে জানানো হয়। পরে ডিউটি দেয়া হবে বলে টাকা দাবি করা হয়। অফিসের টিআই আজমকে ৮০০ টাকা দেওয়ার পর আমাকে ভোটের ডিউটি দেওয়া হয়। ’

তবে ওই অফিসের টিআই আজম টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

এই অভিযোগ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা আনসার ও ভিডিপি  কর্মকর্তা আমিনুল হক, মান্দা উপজেলার কর্মকর্তা শরীফ হোসেন ও রাণীনগর উপজেলা কর্মকর্তা রুস্তম আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা একই সুরে কথা বলেন। 

উত্থাপিত অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তারা বলেন, ‘উৎকোচ নিয়ে ডিউটি দেওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। রীতিমত স্বচ্ছতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের ডিউটি দেওয়া হয়েছে।’

এ ব্যাপারে নওগাঁ জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এরপরেও বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। এ ধরনের কাজে কারো সম্পৃক্ততা পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে ভাতার বরাদ্দ না আসায় তাদের ভাতা প্রদান করা হয়নি।’
এআই/এসএ/