ঢাকা, সোমবার   ২১ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৬ ১৪২৮

কাব্য বিকিরণের কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু 

মিলটন রহমান

প্রকাশিত : ০৯:৫৫ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার | আপডেট: ১০:০১ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে লেখক।

কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে লেখক।

কবি দার্শনিক নন কিংবা দার্শনিক নন কবি। দু’জনই বিপরীত মেরুর। দর্শন মানুষের আদর্শ বা নীতি নির্দেশ করে আর কাব্য নিয়ে আসে জীবনের জারক রস। তবে কাব্যের মেজাজে দর্শনের যে নির্যাস মৌলের মধ্যে স্থাপিত হয়ে যায় তা কিন্তু কাব্য। অতএব এখানে কাব্য এবং দর্শনের মধ্যকার একটি তীক্ষ্ম এবং অ-আদর্শিক সম্পর্ক আছে। 

অ-আদার্শিক বলছি এজন্য যে, দর্শনের যে আদর্শ (নীতি চালান করা) তা কিন্তু কাব্যের আদর্শ নয়। আবার কাব্যের যে আদর্শ তা দর্শনের মেজাজে স্থাপিত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তাহলে দার্শনিক বক্তাকে সাধারণ মানুষ নাও বুঝতে পারে। আবার প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, ‘কাব্যদর্শন’ বলে একটি বিষয় তো আছে? তাতো আছেই। এই কাব্যদর্শনের কারণেই একটি কবিতা পাঠকের কাছে অনুসরনীয় এবং ধ্যানের আরক হয়ে ওঠে। ওই যে বললাম- দর্শন কাব্যে প্রবেশ করার আগে পরিপূর্ণ পিউরিফাইড হয়ে, নিজের চরিত্র বদলে কাব্যের রূপ ধারণ করে। 

সমালোচনা সাহিত্যে দর্শনের রূপও উপস্থাপিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে মতান্তরও রয়েছে। ধরুণ, প্লেটো বলছে- যারা গল্প তৈরী করেন তাদের ওপর নজর রাখতে। তারা ভালো গল্প তৈরী করছে নাকি যা তৈরী করছে তা তরুণ প্রজন্মকে ভিন্ন পথে ঠেলে দেবে। তাই ভালো গল্পগুলো রেখে খারাপ গল্পগুলো বাদ দিতে বলেছেন তিনি। দেখুন, আবার ফ্রয়েড কি বলেন? তাঁর মনঃসমীক্ষণ কিংবা মনবিকলন তত্ত্ব মানুষের যৌনতা, লিপ্সা এবং মনোগত অভিলাসসমূহ প্রকাশ করেছে। 

এখানে প্লেটোর আদর্শ গল্পের সাথে বিরোধ হয়ে যায় ফ্রয়েডের। তারপরও দুই দর্শনের গল্পই পাঠকের কাছে প্রিয়। বৃহত্তর পাঠকের সম্মুখে এসে প্লেটো আর টিকছেন না। এই যে সব থিউরি পাল্টে দিয়ে নতুন থিউরি দাঁড় করানো, এই প্রবণতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু’র মধ্যে। তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক লেখালেখি ছাড়িয়ে ব্যক্তি হিসেবেও একটি জায়গায় দাঁড়িয়েছিলো। তাঁর সাথে আমার আলাপের সময়ও থাকতো বেশ দীর্ঘ। 

সেসব আলোচনায় ভিন্ন নদীতে প্রবাহিত স্রোতের নাম দেয়া হতো ‘নিয়ম’। ২০০৭ সাল থেকে দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু’র সাথে আমার কাব্যআড্ডার শুরু। তিনি নগর বার্মিংহামে থাকতেন আর আমি লন্ডনে। আড্ডা হতো ফোনে, ব্লগে এবং শেষ দিকে ফেসবুকে। রাত গভীর হলেই আমাদের আড্ডা জমে উঠতো। প্রথম দিকে তাঁকে আমার একটু অন্য মানুষ মনে হতো। তাঁর কথাগুলো আমার কিছুটা বাঁকা পথের যাত্রী বলে মনে হতো। 

একটা সময় সামহয়্যার ইন ব্লগে আমাদের তুমুল তর্ক জমে যেতো। বিভিন্ন দেশ থেকে এই তর্কে অংশ নিতেন নতুন-পুরাতন লেখক-চিন্তকগণ। আমরা যুক্তরাজ্যে তো কেউ কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কিংবা ইউরোপের কোনও দেশ থেকে বিতর্কে অংশ নিতেন। বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কবি-সাহিত্যিক ছিলেন এ যজ্ঞের নিয়মিত কর্মকার। বিশেষ করে- কবিতা এবং প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে জমাট হতো বিতর্ক। সে সময় দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং আমি নতুন অনেক ভাষ্য তৈরী করেছি, যা আগে কখনও ছিলো না। 

অনেক ‘কাব্যদর্শন’ রচিত হয়েছে আমাদের মাঝে। যেগুলো আমরা কবিতায় চালান করার পরে ধনাত্মক গুহা তৈরী হয়েছে। মধ্যরাতে সূর্য উঠিয়ে আনার সাহসও আমরা দেখিয়েছি। মানে- আমরা দেখিয়েছি অন্ধকার বিনষ্ট করতে প্রয়োজনে মধ্যরাতে ঝুলে থাকবে একথালা সূর্য। এমন মেটাফোরিক্যাল বহু বিষয় আমাদের মধ্যে বিরাজ করতো। 

আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চূর্ণকাল’ এর অধিকাংশ কবিতা সে সময়ে রচিত। এসব কবিতা সম্পর্কিত বিবিধ আলোচনা হতো আমাদের মাঝে। যেমন- দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু যখন বলছেন, রৌদ্রোজ্জ্বল গোমট বাতাসে স্থির হয়ে আছে অর্জুনের আযান/দূর বিদ্যুতের চূড়া হতে/শঙ্খের আওয়াজ ফেটে পড়ে গমক্ষেতে, নাভীর উর্বরে.../কাম ও মৃত্যু আরো সংকুচিত হলে/বায়ুপন্থে পাখি হেঁটে যায়/জীন ও পরীরা চিবোয় আকৃতির আপেল (অর্জুনের আযান, বিদ্যুতের বাগান)। আমি তখন বলে উঠি, পূর্ণেন্দুরাতে ভাসে জঙ্গ পরাণ/ছেঁড়ামেঘ নৌহ তারায় বাজে পাখোয়াজ/এমন বউড়ি নিশায় পটুলিভরে বান্ধি লও যদি বারমাসি গীত/মোর ছায়াদেহে পাবে তোমার ঢেলে দেয়া/রতি-লতি নীল ধানুকী মীড় (পান্থ, চূর্ণকাল)। 

একই সময়ের স্বর। এই চিন্তার সাযুজ্যতা এবং মনোসমীক্ষণ তা বিচ্ছিন্নভাবে তৈরী করা কোনমতেই সম্ভব নয়। তাঁর সাথে আমাদের দীর্ঘ কাব্য সম্পর্কের কারণে দু’জনের চিন্তা একটি মার্গে স্থান করে নেয়।  

সাহিত্যশিল্পের কাব্যের স্বতন্ত্র বৈভবের বিষয়ে তিলমাত্র ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি মনে করতেন- বাংলা কবিতা প্রতিদিন স্থান পরিবর্তন করছে। এগুচ্ছে সম্মুখে। যেতে যেতে বদলে যাচ্ছে তার পোশাক, বদলে যাচ্ছে তার অলংকার। এই বদলে যাওয়ার আগে সেই খবর যে জানতে পারে তিনিই কবি। ফলে কবিতার পাঠকও সবাই নয়। কবিতার পাঠককেও প্রস্তুতি নিতে হয় কবিতা পানের জন্য। 

কবিতা আবৃত্তি করার বিষয়েও তাঁর আপত্তি ছিলো। তিনি মনে করতেন- কবিতা আবৃত্তি করার বিষয় নয়। এর যে ধ্যান রয়েছে তা বাকশিল্পে উপস্থাপন করা যায় না। একে একমাত্র হৃদয় দিয়েই পাঠ করা যায়, ছোঁয়া যায় হৃদপিন্ড। সমসাময়িক বেশিরভাগ কবিতাকেই তিনি কাব্যপদবাচ্য মনে করতেন না। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে- নাব্যতা সংকট। ধ্যানের গভীরতা না থাকলে সেই কবিতা জলের স্রোতের মতো ভেসে চলে যায়। আর যদি ওই কবিতায় গভীর অভিনিবেশ থাকে তাহলে তা সজ্জিত পাহাড় কিংবা গুহায় রূপ নেয় বলে মনে করতেন তিনি। 

পঠনপাঠনেও ছিলো তার পান্ডিত্য। পাঠেরও যে একটি প্রক্রিয়া আছে- তা তিনি জানতেন। আবার সেই পাঠ কিভাবে একজন কবি-সাহিত্যিককে পথ নির্দেশ করবে তাও ছিলো তাঁর জানা। ফলে তাঁর রচনায় যে ঈশ্বর জেগে ওঠে তার রয়েছে বহুত্ববাদী উপাসনা। যেমন তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ রজনীতে প্রাণশূন্য পালক কুড়িয়েছি.../মোমগাছে নিরলে জ্বলে/পূবালী বাতাস/জড়-পাখি কতো আর উড়াল শিখিবে বলো!/সিথানে জেগেছে ক্রন্দন, জিওলের ঝাঁক/অলিক অনলে ভীনদেশে যায় সোনাদেহী মাছ রূপালী মাগুর।/ চিরকাল ঝড় এলো.../ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায় কাক ও কোকিল।/আমার কোনও নাম নেই/ আকৃতি পরষ্পর/ শিশুর ফুসফুসে ঝরে নিঃশর্ত ঈশ্বর...’(ঈশ্বর, মৌলিক ময়ূর)। 

ওই যে বলেছিলাম কাব্যদর্শনের কথা, তার বিপুল সম্ভার এই কবিতায় উছলে উঠেছে। কবি প্রকৃতি ও নিয়তির সাথে এক অলীক পথের দিশা এখানে চালান করে দিয়েছেন। এমন সন্তকথা না থাকলে তাকে কবিতা বলি কি করে? 

আমার এবং কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু’র চিন্তা এই এক জায়গায় এসে একই কণ্ঠসঙ্গীতে পরিণত হতো। আমরা যে মদিরা পান করতাম তাতে করে এই ভূমন্ডলের কোনও আসক্তির প্রয়োজন হতো না। সব আসক্তিই আমাদের সঙ্গীতে নেশাতুর হয়ে থাকতো। 

বিলেতে বিপুল শক্তিমত্তায় বাংলাসাহিত্য চর্চা করেন হাতে গোনা কয়েকজন। সাহিত্য ভূমি কর্ষকের কমতি নেই। এ নিয়ে কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু’র কিছু বক্তব্য ছিলো। বিশেষ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে প্রগতিবাদী শিল্প-সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধকদের বিষয়ে ছিলো তাঁর আত্মিক টান। এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিলো বজ্রকঠিন। তাঁর এই অবস্থানের কারণে স্পষ্টতই ভিন্ন শ্রেণীর চেহারা আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিলো। 

আমি মনে করি, তাঁর চলে যাওয়া সে অবস্থানটাকে নড়বড়ে করে গেছে। এখন অত্যন্ত বিবস্ত্র একটি ভূমি বিলেতে গড়াগড়ি দিতে দেখা যাচ্ছে। দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর সেই আদর্শিক ভূস্পন্দন কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। সর্বত্র অবক্ষয়। সর্বত্র অন্ধকারে বিলিন হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কোনও বোধিসত্ত্বা নেই। সবই মাছের বাজার। চলছে দর কষাকষি। তাঁর প্রয়াণে বিলেতে বাংলাসাহিত্য চর্চার একটি অধ্যায়ের শেষ হয়ে গেলো। সে অধ্যায় অন্য কেউ এগিয়ে নিয়ে যাবে না। 

তবে তিনি যেখানেই থেমে গেছেন সেখান থেকে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন বলে আমি মনে করি। তাঁর যে কাব্যসৃষ্টি তা কথা বলবে অনন্তকাল ধরে। তাঁর কাব্যেও যে শক্তি তাতে যে কোনও কবিতাপাঠক শ্লাঘা অনুভব করবেই। দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন একজন পুরোশরীরের কবি। জীবন যাপন, সে সম্পর্কে অবলোকন এবং জাগতিক নিয়ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব কিছু দর্শন ছিলো। তিনি বিভিন্ন কবিতায় তার প্রকাশ করে গেছেন। আমি মনে করি একজন কবি হিসেবে তিনি যে চিহ্ন তৈরী করে গেছেন তা অক্ষয় হয়ে রইবে। 

নোট: ছোট কাগজ ‘বুনন’ এর দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু সংখ্যায় প্রকাশিত এ গদ্য।

লেখক- প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক।

এনএস/