ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

সেই ইয়াসমিন এখন হাসতে পারছেন

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:১৯ পিএম, ১ ডিসেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৯:০৮ পিএম, ১ ডিসেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ইয়াসমিন এখন সেরে উঠছেন, এমনকি হাসতেও পারছেন।

শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ইয়াসমিন এখন সেরে উঠছেন, এমনকি হাসতেও পারছেন।

বিদেশ বিভূঁইয়ে কিংবা দেশের আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বহু ঘটনা। এসব লোমহর্ষক ঘটনার মাঝেও চট্টগ্রামের দগ্ধ গৃহবধূ ইয়াসমিনের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ইয়াসমিন এখন সেরে উঠছেন। এমনকি হাসতেও পারছেন। 

গত ১৯ নভেম্বর গভীর রাতের ঘটনা। 'তোর বিষ কমাচ্ছি' বলেই ইয়াসমিনের যোনি ও পায়ুপথসহ পুরো নিন্মাঙ্গে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন পাষণ্ড স্বামী। শরীর ভর্তি দাউদাউ করে জ্বলন্ত লেলিহান শিখা। ৭ বছরের সংসার এবং ৪ বছরের সন্তানের দোহাই দিয়ে অসহায় ইয়াসমিন প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও স্বামী রাফেলের তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। উপায়ান্তর না দেখে নিজেকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে ঘর থেকে বের হবার চেষ্টা করেন ইয়াসমিন। কিন্তু হায়! এখানেও স্বামীর বাঁধার মুখে পড়েন তিনি। পুড়ে মরতে হবে, বের হওয়া চলবে না।

পুড়তে পুড়তে এক পর্যায়ে শরীরে লেপ্টে থাকা পেট্রল ফুরিয়ে গেলে ইয়াসমিনের শরীরের আগুনও নিভে যায়। কিন্তু নেভেনি রাফেলের নিষ্ঠুরতার আগুন। এবার নতুন খেলায় মাতে সে। স্ত্রীর পোড়া শরীর থেকে কাবাব করা মুরগির মতো করে চামড়া তুলে নিতে থাকেন দুই হাতের ঘষায়। একেক ঘর্ষণের সাথে খসে পড়তে থাকে পুড়ে যাওয়া চামড়া, সঙ্গে ইয়াসমিনের মরণ আর্তচিৎকার। কিন্তু তাতেও রাফেলের নিষ্ঠুরতায় কোনও হেরফের ঘটে না। উল্টো মেয়ের যন্ত্রণার খানিকটা ভাগ বাবা-মাকেও দিতে ফোন করেন ইয়াসমিনের বাসায়।

এতো গভীর রাতে জামাইয়ের ফোন পেয়ে উৎকন্ঠিত শাশুড়ী ফোন রিসিভ করতেই রাফেল তাকে সোজা জানিয়ে দেন, 'তোর মেয়েকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি। এসে নিয়ে যা'। 

এদিকে, আজ মঙ্গলবার ইয়াসমিনের সর্বশেষ আপডেট জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি আনোয়ার হোসেন। শামীম আনোয়ার নামে তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ইয়াসমিনের কিছু ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, 'পুরো নিন্মাঙ্গ সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া এবং মলিন মুখভর্তি অসহনীয় যন্ত্রণার ছাপ। কিন্তু আমাকে ওয়ার্ডে ঢুকতে দেখেই অনেক কষ্ট করে চেহারায় হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললেন ইয়াসমিন। আগুনে দগ্ধ হবার পর প্রথম দুই দিন চট্টগ্রামে তার চিকিৎসার যৎসামান্য দেখভাল করেছিলাম। আর এখন চট্টগ্রাম থেকে এতদূরে ঢাকায় তাকে দেখতে এসেছি।' 

ঢাকাস্থ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকৎসাধীন ইয়াসমিনের পাশে এএসপি আনোয়ার।

তিনি আরও লিখেন, 'সেই আমাকে দেখে যদি তিনি মুখ মলিন করে রাখেন, তাহলে আমি হয়তো মনে কষ্ট পেতে পারি- এই ভেবেই কি যন্ত্রণা লুকিয়ে তার এই হাসির চেষ্টা? ঢাকাস্থ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে গিয়ে ইয়াসমিনকে দেখে এলাম। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি আগের চেয়ে ভাল আছেন। যারা ইনবক্সে বারবার আমার কাছে ইয়াসমিনের বিষয়ে আপডেট জানতে চাচ্ছিলেন, ছবিগুলো দেখে আশা করি তাদের কৌতূহল নিবারণ হবে।'

এদিকে, নির্যাতিতা ইয়াসমিনের স্বামী রাফেলের পাশবিকতা-হিংস্রতার বর্ননা করতে গিয়ে এএসপি আনোয়ার হোসেন ফেসবুকে লেখেন- পৈশাচিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করে আর্তচিৎকার করতে থাকা স্ত্রীকে রেখেই পাশের কক্ষে গিয়ে দিব্যি ঘুমিয়েও পড়েন তিনি। 

তিনি আরও লেখেন- উপরের ঘটনাবলীর বর্ণনা শুনে যদি অবাক হয়ে থাকেন, গ্রেপ্তারের পর রাফেলের আচরণের বিষয়ে জানলে হতবাক হবেন নিশ্চিত। আজ (২০ নভেম্বর) বিকেলে পালানোর চেষ্টারত অবস্থায় আসামি রাফেলকে গ্রেপ্তার করি আমরা। প্রেপ্তারের বিষয়ে তার কোনও বিকার নেই। নেই নিজের কৃতকর্মের জন্য ন্যূনতম অনুতাপ বোধও। উল্টো খোশমেজাজের সঙ্গে জানালেন, তিনি গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে চান। থানার হাজতে বসে কাউকে এত নির্বিকারভাবে কথা বলতে আমি কোনওদিন শুনিনি।

এদিকে, গুরুতর আহত ইয়াসমিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলেও পরে গত ২২ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক থেকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। ঢাকায় নেয়ার উদ্দেশ্যে এম্বুলেন্সে তুলে দেয়ার সময় ৪ বছরের শিশু সন্তান রাফির সঙ্গে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

এ বিষয়ে একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে এএসপি আনোয়ার লেখেন- অগ্নিদগ্ধ ইয়াসমিনকে যখন আমরা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেয়ার উদ্দেশ্যে এম্বুলেন্সে তুলে দিতে নিয়ে যাচ্ছি, তখন মায়ের সঙ্গে এভাবেই কথা বলে ৪ বছরের শিশু রাফি। আমরা যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম, মনে হয় না কেউই চোখের পানি আটকাতে পেরেছিলেন।

এদিকে, গ্রেপ্তারকৃত রাফেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিতে গত ২৩ নভেম্বর আদালতে পেস করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। সে আবেদনের প্রেক্ষিতে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। 

এ প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেন লেখেন- ইয়াসমিনের ওপর আগুন হামলাকারী স্বামী রাফেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ডে পেয়েছি। এ সংক্রান্তে বিজ্ঞ আদালতের নিকট আমরা ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলাম। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ২৪ নভেম্বর থেকে সে রিমান্ড কার্যকর হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা ঘটনার পূর্বাপর বিষয়াদি উদঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করবো ইনশাআল্লাহ। আস্থা রাখুন পুলিশে।

এনএস/