ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১১ ১৪২৮

বাংলার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ

অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশিত : ১১:৪৯ এএম, ১১ মার্চ ২০২১ বৃহস্পতিবার

১৯১১ সাল। ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লি এলেন বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করতে। ভারতীয় নেতা গোখলে-কে তিনি প্রশ্ন করলেন— আমরা তোমাদের রেলপথ-রাস্তাঘাট বানিয়ে দিচ্ছি, তোমরা শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত হচ্ছো, তবু স্বাধীনতা চাও কেন? কালবিলম্ব না করে গোখলে উত্তর দিয়েছিলেন— আমাদের আত্মমর্যাদা আছে বলেই স্বাধীন হতে চাই।

বাঙালিরাও বার বার স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে, আত্মমর্যাদা আছে বলে। আসলে স্বাধীনতা মানে সমৃদ্ধি। স্বাধীন না হলে মানব-অস্তিত্বের বিকাশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যত প্রতিরোধ হয়েছে, তার সিংহভাগই ঘটে বাংলা অঞ্চলে। সুপ্রকাশ রায় রচিত ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বই-এ আছে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা ২০০টিরও বেশি প্রতিরোধ আন্দোলন করেছে। তাই স্বাধীনতার অন্বেষাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্য নাম।

পশ্চিমারা দাবি করে, গণতন্ত্রের সূচনা প্রাচীন গ্রিসে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। অথচ ইতিহাস বলে, তারও একশ বছর আগে বাংলায় গণতন্ত্রের শেকড় ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এই অঞ্চলে ছোট ছোট গণরাজ্য ছিল। প্রতিটি রাজ্যে একটি পরিষদ থাকত, যারা রাজা নির্বাচন করতেন। যতদিন রাজার প্রতি ঐ পরিষদ আস্থা রাখত রাজা ততদিনই ক্ষমতায় থাকতেন। পরিষদ আস্থা হারালে রাজা বিদায়।

গণতন্ত্রের এই চর্চা দেখা যায় রাজা গোপালের সময়েও। বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক লোকান্তরিত হওয়ার পর এদেশে শুরু হয় মাৎস্যন্যায় যুগ। এ অরাজক সময়ে আইনশৃঙ্খলা কিছুই ছিল না। সংশয়-শঙ্কার মধ্য দিয়েই কাটছিল সাধারণ মানুষের জীবন। তারপর ৭৫০ সালের দিকে নেতৃস্থানীয় কিছু মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হলেন। তাদের বলা হতো প্রকৃতিপুঞ্জ। এখনকার ভাষায় সুশীল সমাজ। এই প্রকৃতিপুঞ্জ ক্ষত্রিয় গোপালকে বাংলার রাজা মনোনীত করলেন। তবে তারা শর্ত দিলেন— সুশাসন দিতে না পারলে তোমার রাজত্ব থাকবে না।

বিদেশি পণ্ডিত অধ্যাপকরা ইদানীং এসে ওয়াজ-নসিহত করে যায় তোমাদের দেশে সুশাসন নেই। অথচ পশ্চিমা দুনিয়াতে সিভিল সোসাইটি বা সুশাসনের ধারণা যখন জন্মই নেয় নি, তখন মুক্ত গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বাংলাদেশে! গোপালের সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলা ঘুরে দাঁড়াল। সারা ভারতবর্ষে বাংলা রাজ্যটি হয়ে উঠল সম্মানিত ও শক্তিশালী। ১১৬১ সাল পর্যন্ত বংশপরম্পরায় পালদের শাসন চলল জনগণের সম্মতি সাপেক্ষেই। এটা বাংলার স্বর্ণযুগ।

পালরা ছিল এ মাটিরই সন্তান। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও সিংহভাগ হিন্দু প্রজার ওপর তারা রাজধর্ম চাপিয়ে দেয় নি। বরং প্রজাদের জন্যে মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, যা ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ সময়েই রচিত হয় বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ। একসময় পালরা দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলা দখল করে নিল দক্ষিণ ভারত থেকে আসা কট্টর ব্রাহ্মণ সেন রাজারা। তারা দেখল, এদেশের হিন্দুরা অনেকটা শিথিল, অতএব এদের ভালো হিন্দু বানাতে হবে। ১৯৭১-এ পাকিস্তানিরা যেমন আমাদের ভালো মুসলমান বানাতে চেয়েছিল, তেমনি এক অপচেষ্টা!

শূদ্রদের ওপর শুরু হলো দারুণ সামাজিক পীড়ন। সেন রাজারা বাংলার ইতিহাসে প্রথম ফতোয়া দিল— নমশূদ্ররা পরকালে রৌরব নরকে যাবে। আর ব্রাহ্মণদের ভগ্বদগীতা পাঠ ওরা শুনে ফেললে ওদের কানে ঢেলে দেয়া হবে গরম সীসা। এভাবে সেন রাজারাই বাংলায় জাতিভেদ প্রথার প্রচলন করে। ফলে শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো। এ সুযোগে মুসলমানরা বাইরে থেকে এসে সহজেই রাজ্য দখল করে নেয়।

শুরু হলো সুলতানি আমল। টানা দুশো বছর বাংলা দিল্লির কোনো অধীনতা মানেনি এবং বাংলার সম্পদ বাইরে যায়নি। এ এক বিরাট অর্জন! ১৩৪২ সালে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ দুই বাংলাকে একত্রিত করে উপাধি নেন শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান। ‘বাংলা’ ও ‘বাঙালি’ শব্দ দুটিকে সম্মানজনক করে তোলার জন্যে আমরা তার কাছে ঋণী। 

তবে আরো বড় কাজ করেছেন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ। তিনি দেখলেন, দিল্লির তুলনায় বাংলা অনেক ছোট রাজ্য। দিল্লির প্রভাব ঠেকাতে নতুন কৌশল অবলম্বন করলেন তিনি, যার জন্যে তাকে বলা যেতে পারে আধুনিক যুগে স্মল স্টেট ডিপ্লোমেসির জনক। তিনি চীন ও পারস্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করলেন। চীনের সঙ্গে করলেন রাজনৈতিক কূটনীতি। আমাদের রাজদূতরা চীনে যেত, চীনের দূতরা বাংলাদেশে আসত। অথচ ইউরোপে তখনো রাষ্ট্রদূত বিনিময় প্রথার প্রচলনই হয়নি।

চীনা দূতরা দেশে ফিরে গিয়ে অনেকেই আত্মকথা লিখেছেন। এর কিছু ইংরেজি অনুবাদ আমি লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে পেয়েছিলাম। সেখানে দেখেছি, চীনারা বাঙালিদের দুটো সার্টিফিকেট দিয়েছে বাঙালিরা মিথ্যা বলে না এবং কারো সাথে প্রতারণা করে না।

সুলতান গিয়াস উদ্দিন বিখ্যাত কবি হাফিজকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানান। এর মধ্য দিয়ে পারস্যের সঙ্গে তিনি সূত্রপাত করলেন সাংস্কৃতিক কূটনীতির। মক্কা-মদিনায় সূত্রপাত করলেন ধর্মীয় কূটনীতির। বাংলার অর্থে তৎকালীন আরবের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্যে নির্মাণ করে দিলেন অসংখ্য মাদ্রাসা, যেগুলো পরিচিত ছিল গিয়াসিয়া মাদ্রাসা নামে। পাশাপাশি ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রাও আরবে পাঠিয়ে দিলেন দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্যে। আর সংস্কার করে দিলেন মজে যাওয়া জলাধার ‘নহরে জুবাইদা’। এখন সৌদিদের সাথে দেখা হলে আমি বলি, তোমরা আমাদের মিসকিন বলো। তোমরাই একসময় মিসকিন ছিলে। আমাদের টাকায় তোমাদের দেশে মাদ্রাসা তৈরি হয়েছে।

বাংলার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু এটা যেভাবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন ছিল, তা আজও হয়নি। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ সত্য ইতিহাস জানার একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্যে। কোয়ান্টাম যে ইতিবাচকতার কথা বলে তা অনুসরণ করলে আমাদের জীবন ও সমাজ অনেক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে। এর পাশাপাশি সত্যের জ্ঞান ও উপলব্ধি আমাদেরকে পরিণত করবে এক মহান জাতিতে।
(অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মুক্ত আলোচনা থেকে নেয়া)