ঢাকা, বুধবার   ২৭ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১১ ১৪২৮

‘থাইরয়েড’ কেন হয়? প্রতিকারের উপায়

মাহতাব মিনহাজ

প্রকাশিত : ০৫:১৪ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার | আপডেট: ০৭:২৭ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার

ডা. একেএম ফজলুল বারী।

ডা. একেএম ফজলুল বারী।

থাইরয়েড একটি গ্রন্থির নাম, যেটা গলার নিচের দিকে থাকে। বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি চল্লিশ লক্ষ। দেশে অন্য যে কোন রোগের চেয়ে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা বেশি। থাইরয়েডের কাজ হল হরমোন সিক্রেট করা যা শরীরের কাজকে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে থাইরয়েড গ্রন্থির নানা সমস্যা বিশ্বে অন্যতম হরমোনজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। হরমোনজনিত রোগের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের পরই এর অবস্থান। মূলত নারীরাই এই সমস্যায় বেশি ভুগে থাকেন।

এ বিষয়ে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. একেএম ফজলুল বারী। থাইরয়েড সমস্যা কেন হয়, এর চিকিৎসা পদ্ধতি কী, এ রোগে আক্রান্ত রোগীর খাবার কী হতে পারে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন। 

থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ ডা. একেএম ফজলুল বারী থাইরয়েডের সমস্যা কেন হয় এ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে মূলত থাইরয়েড রোগ হওয়ার কারণ চারটি।

প্রথম কারণ হলো, বাংলাদেশে আয়োডিনের অভাব রয়েছে। আয়োডিনের অভাবের জন্য সাধারণত থাইরয়েডের সমস্যাগুলো হয়। তার ভিতর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গয়টার। গলার নিচের দিকে ফুলে যাওয়াকে গয়টার বলে। এই গয়টার একটি বড় সমস্যা আমাদের দেশে, সেই সাথে বাচ্চারা আয়োডিনের অভাবে ত্রুটিপূর্ণভাবে জন্মগ্রহণ করে থাকে এবং বামনত্ব রোগ বরণ করে, মানসিক শারিরীক বিকাশ ঘটেনা।

দ্বিতীয় কারণ হলো জেনেটিক অর্থাৎ যদি মা, বাবা, দাদার থাকে অথবা পূর্বপুরুষের থাকে সেই ক্ষেত্রে জেনেটিক লিংকে থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে।

তৃতীয়ত থাইরয়েডের চিকিৎসার জন্য যদি কেউ রেডিও আয়োডিন খেয়ে থাকে তাহলে থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে।

চতুর্থত যদি গলার চার্জারী হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই চারটিই মূলত আমাদের দেশে থাইরয়েডের সমস্যার জন্য মূল কারণ'।

থাইরয়েডের কারণে যেসব সমস্যা হতে পারে

থাইরয়েডের চার ধরনের সমস্যা হয়।

  • প্রথম কারণ প্রদাহ,অর্থাৎ থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে যদি কোন ইনফেকশন হয়।
  • দ্বিতীয় হলো, থাইরয়েড হরমনের স্বল্পতা।
  • তৃতীয়ত হলো থাইরয়েড হরমন যদি অতিরিক্ত নিঃসরণ হয়। 
  • চতুর্থত থাইরয়েড টিউমার বা ক্যান্সার।

এই চারটি সমস্যার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে ডা. একেএম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড হরমনের যে প্রদাহ এটা সাধারণত কোন ইনফেকশনের জন্য হতে পারে অথবা কোন ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস দিয়েও হতে পারে। থাইরয়েড প্রদাহ হলে হঠাৎ করেই থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে অনেক ব্যথা হবে, গলার ভিতর ব্যথা হবে হঠাৎ করে শরীরে কাঁপুনি দেখা দিবে, চিমর দেখা দিবে এবং হঠাৎ প্রচুর ঘেমে যাবে। সে ব্যপারটা বুঝতে পারবেনা যে তার সাথে কি হচ্ছে, মনে হবে যে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এটা হচ্ছে থাইরয়েড প্রদাহের মূল উপসর্গ।

আর যখন থাইরয়েড হরমন কমে যায় তখন এটাকে হাইপো থাইরয়েড বলে। এই রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। প্রতি সাত জনের মধ্যে পাঁচ জন নারী এই সমস্যায় ভোগে। এই সমস্যাকে ক্রনিক অটো ইমিউন থাইরোডাইটিস বলে।

হাইপো থাইরোয়েড হলে রোগী হঠাৎ করে মুটিয়ে যাবে, গলার স্বর পরিবর্তন হবে, মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হবে, সেই সাথে মাসিকে পরিবর্তন আসবে অর্থাৎ তার মাসিক বেশি হতে পারে আবার কমও হতে পারে এবং সে খুব বেশি দুর্বল হয়ে যাবে, সাথে সাথে তার কর্মক্ষমতা ধীর হয়ে যাবে। ঘুম প্রচুর হবে কিন্তু তার ঘুমের পরিপূর্ণতা হবেনা। তার চুল পড়ে যেতে থাকবে এবং চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যেতে থাকবে আর সঙ্গে সঙ্গে এ্যালার্জির সমস্যা বেড়ে যাবে। যৌন চাহিদা কমে যাবে। আর শিশুদের যদি হাইপোথাইরয়েডিজম হয়ে থাকে, বিশেষ করে জন্মগতভাবে যদি শিশুর এই সমস্যা হয় তাহলে ঐ শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে কম নড়াচড়া করবে, তার চামড়া ফ্যাকাশে হবে এবং ঐ শিশু মুটিয়ে যাবে সাথে তার কোষ্ঠকাঠিন্যও হবে। এই ব্যপার গুলো দেখা গেলে ঐ শিশুর রক্ত পরিক্ষা করা জরুরি।

এ ছাড়া থাইরয়েড হরমন যদি বেড়ে যায় সেই ক্ষেত্রে যদি হাইপার থাইরয়েডিজম দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে তার হার্টবিট বেড়ে যাবে, সে খাবে অনেক কিন্তু শুকিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত তার পতলা পায়খানা হবে। তৃতীয়ত তার চিমরের সাথে সাথে হার্টবিট বেশি থাকার কারণে দৈনন্দিন কাজে তার সমস্যা হবে, তার শারিরীক দূর্বলতা দেখা দিবে এবং মানসিক দূর্বলতা দেখা দিবে। সে সাথে তার কর্মক্ষমতা কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে সে যদি চিকিৎসার আওতায় না আসে তাহলে তার চোখ বড় হয়ে যাবে। আর চোখ যদি বড় হয়ে যায় চোখগুলো বের হয়ে যেতে থাকবে ফলে সে আর চোখ বন্ধ করতে পরবেনা এবং বাতাশ যাওয়ার কারণে সেখানে ইনফেকশন হওয়ার সাথে সাথে আলসার হবে এবং একসময় সে অন্ধত্ববরণ করবে।

আর থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী সংখ্যায় একেবারে কম নয়। যত রকমের ক্যান্সার হয় তার দুই থেকে তিন শতাংশ হয় থাইরয়েড ক্যান্সার। ক্যন্সারের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হচ্ছে থাইরয়েড ক্যন্সার। এটা হচ্ছে একমাত্র ক্যন্সার যা ঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহন করলে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।'

থাইরয়েড ক্যন্সারের চিকিৎসা

থাইরয়েড ক্যন্সারের চিকিৎসা সম্পর্কে ডা. একেএম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড ক্যান্সারের কিছু চ্যালেন্জ রয়েছে। প্রথমত ডায়াগনোসিস। ডায়াগনোসিসে এখন অনেক উন্নত প্রযুক্তি এসেছে বিশেষ করে আল্ট্রাসাউন্ড যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এই আল্ট্রাসাউন্ডে নডিউল দেখে বলতে পারি থাইরয়েড ক্যন্সার হয়েছে কিনা বা কোন পর্যায়ে রয়েছে। এবং থাইরয়েড নির্ণয়ের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে এলাস্টোস্ক্যান। অর্থাৎ ক্যান্সার নির্ণয়ে আল্ট্রাসাউন্ড। এটার মাধ্যমে রং দেখে টিস্যু এ্যালাস্টিসিটি আলাদা করে আমরা বলতে পারি এতে ক্যান্সার আছে না নেই। আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে এফএনএসি। এফএনএসি করার আগে অবশ্যই এলাস্টোস্ক্যান করা উচিত কারণ এফএনএসি একটা নডিওল থেকেই করা যায়, কিন্তু এলাস্টোস্ক্যান যদি পাঁচটা নডিওলে থাকে কোনটা ভালো আছে কোনটা মন্দ আছে সেটা আলাদা করা যায়। এবং এতে কোন সুঁই ফোটানো হয় না, এতে কোন রক্তপাত নেই।

থাইরয়েড ক্যান্সারে কখনোই কোন ক্যামোথেরাপিতে কাজ হবে না। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের যে টিস্যুটিতে ক্যান্সার হয়েছে শুধু সেটা ফেলে দিতে হবে কারণ পুরো গ্ল্যান্ড ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য অপারেশনের পর রোগীদের নিওক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারে আসতে হবে পোস্টঅপারেটিভ রেডিও অ্যাব্লেশান করার জন্য। আর পোস্টঅপারেটিভ রেডিও অ্যাব্লেশান শুধু নিওক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারেই হয়ে থাকে। 

থাইরয়েড ক্যান্সারের আরেকটি চিকিৎসা হচ্ছে সুই দিয়ে টিউমার অ্যাবলেট করা, সুই দিয়ে আমরা টিউমার কেটে ফেলি এবং এই টিউমার বার্ণ করে দেই। এটা ক্যান্সার হতে পারে আবার সাধারণ টিউমারও হতে পারে। এটাকে বলা হয় মাইক্রোওয়েব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এব্লেসন।

হাইপোথাইরয়েড রোগী কী খাবে কী খাবে না

হাইপোথাইরয়েড রোগীর খাবারের বিধিনিষেধ নিয়ে ডা. একেএম ফজলুল বারী একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে জানান, হাইপোথাইরয়েড রোগীদের আমরা কিছু খাবার খেতে নিষেধ করি আবার কিছু খাবার বেশি খেতে বলি কারণ অয়োডিনের অভাবে রোগটা বেশি হয়ে থাকে। যদি রোগির আয়োডিনের অভাবে রোগ হয় তাহলে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে কিছু খাবার খেতে বলি। যেমন: সল্ট সাপ্লিমেন্ট অর্থাৎ আয়োডিনযুক্ত খাবার খেতে বলি। টমেটো অবশ্যই খোশা সহ বেশি বেশি খেতে হবে, দুধ খাবে সেই সাথে চিংড়ি মাছ এবং শাক সব্জি খেতে হবে এবং অবশ্যই বেশি বেশি সামুদ্রিক মাাছ খেতে হবে কারণ এগুলোতে প্রচুর পরিমাণ আয়োডিন থাকে।

দ্বিতীয়ত কিছু খাবার বর্জন করতে বলি কারণ এগুলো শরীরের আয়োডিনকে নষ্ট করে। এগুলো হলো বাঁধা কপি, ফুলকপি, ব্রোকলি, সয়াবিন ও পালং শাক।

থাইরয়েডের চিকিৎসা পদ্ধতি 

থাইরয়েডের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ডা. একেএম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েডের চিকিৎসা যেকোন চিকিৎসার চেয়ে অনেক সহজ। যদিও হাইপো থাইরয়েডে সারা জীবন ওষধ খেতে হয় অথবা হাইপার থাইরয়েডে টিউমার অ্যাবলেশান করলে আবার তা হাইপো হয়ে যায় সে জন্য দেখা যায় দুই ক্ষেত্রে লম্বা সময় চিকিৎসা নিতে হয়। তবুও এর খরচ খুব কম। প্রতিদিন মাত্র একটা বা দু’টা ওষধ খেলেই সুস্থ থাকা যায়, যার মূল্য এক থেকে দুই টাকা মাত্র। সেইসাথে ফুড সাপ্লিমেন্ট তো নেয়াই যায়। 

থাইরয়েড রোগীদের ক্যালসিয়ামের অভাব হয়, ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়া সহ কিছু ভিটামিন্স মিনারেলের অভাব হয়, বিশেষ করে রক্ত কমে যেতে পারে এজন্য কিছু শাক সবজি যদি খাবারের সাথে রাখা যায় এটাও একটা চিকিৎসার অংশ। আর থাইরয়েড রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি অবশ্যই খুবই সস্তা এবং সারা জীবন নেওয়ার মত। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে আপনার প্রয়োজন মত ওষুধ খেয়ে নিবেন। আর প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে টেবলেটের পরিমাণ একটু বেশি প্রয়োজন হয়। এটা সবসময় খেয়াল রাখতে হবে। এই টেবলেটগুলো খুবই সহজলব্য গ্রাম থেকে শুরু করে সব জায়গায় সহজেই পাওয়া যায়। কারণ এই টেবলেটগুলো আমাদের দেশেই তৈরি হয়।

এসি