ঢাকা, সোমবার   ২০ মে ২০২৪,   জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪৩১

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কদর বাড়ছে বাংলার (ভিডিও)

মুহাম্মদ নূরন নবী

প্রকাশিত : ০১:৪২ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সোমবার | আপডেট: ০৩:৩৩ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সোমবার

চীন, জাপান, ইউরোপ কিংবা রাশিয়াসহ পৃথিবীর প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয় পড়ানো হয়। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যদিও সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ইতিহাস’ নামে দুটি কোর্স বাধ্যতামূলক পড়ানোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে উচ্চ আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পক্ষ থেকে।

চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গান লুটিং বর্ষা বলেন, “ আমার বাংলা ভাষা ভাললাগে। কারণ, বাংলা ভাষা একটি মিষ্টি ভাষা। আমি শান্তি নিকেতনে বাংলা ভাষা শিখেছি। ২০১৭ সাল থেকে আমি ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়াই।”

যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর বাংলাদেশ। অন্তত চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নবীন শিক্ষকের কন্ঠে যেন সেটাই জানান দিচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতই চীনে অন্তত ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। 

গান লুটিং বর্ষা আরও বলেন, “ভাষা শেখানোর মাধ্যমে শেখার ছিল অন্যান্য দেশ সম্পর্কেও জানার। আমার ছাত্রছাত্রীরা বাংলাকে খুব ভালবাসে।”

চার বছর মেয়াদী সম্মান কোর্স পড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো কমিউনিকেশন ইউনিভাসিটি অব চায়না, বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভারসিটি, গোয়াংডং ইউনিভারসিটি অব ফরেন স্টাডিজ ও উহান বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা শিখতে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ শিক্ষার্থী ভর্তি হন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বাংলা ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলাদেশ সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে জানবার-বুঝবার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। 

চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্তা মারিয়া বলেন, “ক্লাস রুমে তাদেরকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুনিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনিয়েছি, আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের নাম বলেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের ভাষা শহীদরা, ভাষা সৈনিকরা, মুক্তিযোদ্ধারা এবং জাতির জনক, ক্ষুদিরাম, প্রীতিরাম এরাও যেন ক্লাসরুমে অদৃশ্য হয়ে উপস্থিত আছেন এবং দেখছেন যে বিদেশীদের কাছে আমাদের দেশের কথা পৌঁছে দিচ্ছে।”

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলার কদর বাড়ছে। যেমন, জাপানের ফুচু শহরে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

লন্ডন ইউনিভাসিটি অব ওরিয়েন্টাল ও আফ্রিকান স্টাডিজ সোয়াস-এ আছে বাংলা পড়া ও উচ্চতর গবেষণার সুযোগ। 

বাংলার শেখানো ও চর্চার গণ্ডি ছড়িয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশেষ করে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভাসিটি এবং মস্কো স্টেট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস প্রতিষ্ঠানের কথা আসে সবার আগে। বাংলা এখনও পড়ানো হয় পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শেখ মো. রজিকুল ইসলাম বলেন, “চীনের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ডিপার্টমেন্ট আছে, বাংলা পড়ানো হয়। জাপানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হয়, তারপরে রাশিয়াতে পড়ানো হয়, লন্ডনে পড়ানো হয়। এরকম বিশ্বের অনেক জায়গায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য পড়ানো হয়। ফলে বাংলা সাহিত্য তার একটা ভালো জায়গা করে নিয়েছে।”

বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন বাংলা নিয়ে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দিপনা তখন বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে উদাসীন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১শ’ ৮টি। বাংলা বিভাগ এবং বাংলা বিষয়ে আবশ্যিক কোর্স পড়ানো হয় মাত্র ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

ইউনিভাসিটি অব লিবারেল আর্টসের উপাচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান বলেন, “এটা যদি স্কুল-কলেজে না পড়ে থাকে তো এই তো শেষ সুযোগ। তারা চাকরিতে ও ক্যারিয়ে চলে যাবে, এই শেষ সুযোগ জানার। একটা কোর্সে তো অনেক কিছু হয় না। তবে একটা কোর্স হলে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়, বই পড়ার চর্চাটা থাকে।”

উচ্চ খরচ আর চাকরির বাজার বিবেচনায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বাংলার পরিবর্তে অন্য বিষয়ে পড়তেই বেশি আগ্রহ দেখায়। 

অধ্যাপক শেখ মো. রজিকুল ইসলাম বলেন, “কমার্সে পড়লে তার একটি ক্ষেত্র আছে, যেমন ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি। আমার বাংলার ওই রকম তো কোন ক্ষেত্র নেই। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উৎসাহী হয় না যে, স্টুডেন্টকে কোন আশা নিয়ে ভর্তি করাবে।”

দিন বদলাচ্ছে। তাই, বাংলা বর্ণমালাকে এখন আর দুঃখিনি বর্ণমালা বলার সুযোগ নেই। এমনটাই মত ভাষা গবেষকদের। 

এএইচ/