ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০২৪,   আষাঢ় ৫ ১৪৩১

ছোট্ট শরীরটায় ব্লেডে কাটা সারি সারি দাগ

শাকেরা আরজু

প্রকাশিত : ০৩:৪০ পিএম, ৬ এপ্রিল ২০২৪ শনিবার | আপডেট: ০৮:২৮ পিএম, ৬ এপ্রিল ২০২৪ শনিবার

চৈত্রের শেষরে সময়টা, বাইরে প্রচন্ড গরম। মুটামুটি ১১ টার মধ্যে বাইরে বেরিয়ে পড়েছি ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন নিয়ে। উদ্দেশ্য পথ শিশুদের নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা। হাইকোর্টের মাজার গেট থেকে শুরু করলাম কাজ। 

যেতে যেতে হঠাৎ দেখি ফকিরাপুলের সড়ক বিভাজনে রোদের মধ্যে বসে ৩ জন শিশু যাদের বয়স ১২ থেকে ১৪ হবে ড্যান্ডি সেবন করছে। ব্যস্ত সড়কের দু পাশ দিয়ে অসংখ্য রিকশা মানুষের চলাচল পাশেই বাস কাউন্টার। যেখোনে ভীড় লেগে রয়েছে, রয়েছে পুলিশদের একটা টহল দল। দেখে মনে হলো ওরা ভাবছে এই পৃথিবীতে শুধু ওরাই আছে আর আছে ড্যান্ডি। আর আশপাশের লোকজনদের মনে হচ্ছে ভাবলেশহীন যন্ত্র মানব, যেন কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। যখন ওদের সাথে কথা বলতে যাই একটু ভয় পেলাম কারন কোথা থেকে যেন আরো ৫ অথবা ৭ জন উড়ে আসলো যেন। সেখানে কোন শিশুই স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক কথা বলতে পারছে না, চোখে অস্থিরতা, ঠোঁট কালো শক্ত হয়ে আছে কথা বলতে গেলে থুতু বের হয়ে আসছে আবার কেউ কেউ অসম্ভব রকমের শান্ত চুপ করে বসে আছে। কারো কারো শরীরজুড়ে ব্লেডে কাটা সারি সারি দাগ! নেশা করে পরে শরীর ব্লেডে দিয়ে নিজেরাই কাটে। কথা বলে জানতে পারি এরা এই সড়ক বিভাজনেই থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ৫০ টাকা দিয়ে খাবার খায়। পরে বস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ভাঙ্গারির কাজে। 

আশেপাশের মানুষজন বলছে সড়কে চলাচলকৃত যাত্রীদের স্বর্ণের কানের দুল চেইন ছিনতাই করে এরা। মাঝে মাঝে পিটুনি খায় চলেও যায় কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। এর আগেও পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করেছি, কখনো মেডিক্যাল বর্জ্যরে হুমকিতে পথ শিশুরা, কখনো শিশু শ্রম, করোনায় ঝরে পড়া, ঝুকিপূর্ণ কাজে পথ শিশুরা। আবার ফুটবল খেলতে বিদেশে যাচ্ছে পথ শিশুরা সেখানে তাদের জন্ম নিবন্ধন পেতে সমস্যা গুলো নিয়ে কাজ করেছি।  এবারের কিছু অভিজ্ঞতা একটু বর্ণনা করে বলি। সড়কে বেড়েছে প্রায় ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী পথ শিশু। তাদের প্রত্যেকের গল্প মিলে যায়। কারো বাবা-মা নেই, কারো বাবা নেই মা আছে কিন্ত হত দরিদ্র। আবার কারো কারো বাবা-মা কেউই নেই, কারো বাবা-মা দুজনেই ছাড়াছাড়ি হয়ে আবার আরেকজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। 

তারা প্রত্যেকেই নির্যাতন , অবহেলা , পেটের দায়ে শহরে পালিয়ে আসে। আরেকটা বিষয় খুব কমন যে তারা  ট্রেনে চেপে পালিয়ে আসে অর্থাৎ ট্রেন যায় যেসব জেলা বিবাগে সেখান থেকে আসে তারা। শহরে এসে খেই হারিয়ে প্রত্যেকেই একটা দলে যুক্ত হয়। যে দলটি বাস করে সড়ক বিভাজনের মাঝখানে, ফুটপাত কিংবা প্ল্যাটফর্মে। দলটি বড় বস্তা নিয়ে সকাল ১১ টা থেকে বোতল কুড়িয়ে বেড়ায় কাছাকাছি বিভিন্ন জায়গায়।  এই সময়টায় বেশিরভাগ শিশুই ড্যান্ডি অথবা গাজা সেবন করে। ড্যান্ডি প্রকাশ্যে সেবন করে আর গাঁজাটা একটু ঝোপঝাড় কিংবা আড়ালে বসে করে। তবে কন্যা শিশু চোখে পড়েনি তেমনটা। যে কজন চোখে পড়েছে তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছে সারাদিন টুকাইয়ের কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরে যায় ঘরে। তাদের বাবা বিভিন্ন কাজ করে, মা বাসা বাড়িতে বুয়ার কাজ করে বলে জানায়। একটু বয়স্ক যেমন ১৫ অথবা ১৬ বছর মেয়েরা কজনকে দেখি ফুটপাতে শুয়ে, দেখে মনে হয় অসুস্থ কিংবা কোন শারিরীক সমস্যা আছে। আর আছে বয়স্ক মহিলা ও পুরুষ। যারা রাজধানীর ফুটপাতেই পলিথিনের ঘর বানিয়ে বাস করে। তাদের জীবনের গল্প আবার ভিন্ন। 

যাই হোক পথশিশুদের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কথা বলছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, পথশিশুরা যা করছে তাদের কোন দোষ নেই, দোষ রাষ্ট্রের, সমাজব্যবস্থার। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, কোন রাষ্ট্র, সরকারী বেসরকারী এনজিও তো আছে। তারা কাজ করছে তবে পদক্ষেপ হতে হবে পরিকল্পনা মাফিক। বিদেশে অনেক দেশে একটি শিশুকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে নানা কার্যক্রম হাতে নেয়। যেমন, একটি শিশুকে বলা হয় তুমি যখন ক্লান্ত হবে তখন একটি নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে বলা হলো এখানে ঘুমাতে এসো, কোন টাকা লাগবে না। তো শিশুটি ঘুমাতে এলো। পরদিন তাকে বলা হলো তোমার জন্য একটি লকারের চাবি আছে কোন প্রয়োজন হলে এখানে জিনিস রাখতে পারো। অর্থাৎ তাকে মোটিভেট করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা।  এটি ব্যয়বহুল চ্যালেঞ্জিং বলে জানান তিনি।

পথ শিশুদের ভবিষ্যত দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করতে বলে জানান আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী তাপস কান্তি বল। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে ভবিষ্যতে এসব পথ শিশুদেরকে তিনি অর্থনীতিতে সুফল যেভাবে বয়ে আনে সেই লক্ষ্যে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। তিনি দেশে সরকারী ৩ টি সংশোধনাগার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এগুলোর ভেতরে অবস্থা মানসম্মত নয়। খাবার শোবার ব্যবস্থার সেবা নাজুক। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে। সরকারকে আহবান জানিয়ে তিনি বলেন দ্রুত পরিস্থিতির উন্নয়নে মনযোগী হবে হবে। সেই সঙ্গে সংখ্যা বাড়াতে হবে  সংশোধানাগারের। 

এই দেশটা সবার। মৌলিক চাহিদা পূরন করে বাচাঁর অধিকার সবারই আছে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি সবার একটু সহানূভূতি ও ভালোবাসার বাড়িয়ে দেয়া হাতই পারে ভবিষ্যতের সম্পদগুলোকে রক্ষা করা। 

লেখক-সিনিয়র রিপোর্টার, একুশে টেলিভিশন।